০৪. প্রথম তিনজন যারা ঢুকল

প্রথম তিনজন যারা ঢুকল তাদের চেনে না জাভেদ। কিন্তু শেষের দুজন হচ্ছে লরেন্স আর বাড়।

ওদের কথা আর উচ্চকণ্ঠের হাসিতে ভরে উঠল বারটা। এখনও জাভেদের উপস্থিতি ওরা টের পায়নি বোঝাই যাচ্ছে। একজন সঙ্গীর মৃত্যু ওদের মনে কোন ছাপ ফেলেছে বলে মনে হয় না।

জাভেদের জন্য স্যান সিদ্রোতে আসা একান্ত জরুরী হয়ে উঠেছিল। চিঠিগুলো পাঠানো, ববের সাথে একটা বোঝাপড়া, এসবের দরকার ছিল তার। চিঠি থেকে তেমন কোন সাহায্য হবে বলে আশা করছে না সে, তবু আইনের আওতায় থাকতে চায় সে। এখানে এসে একটা লাভ তার এর মধ্যেই হয়েছে-বব আর এর মধ্যে বাগড়া দিতে আসবে না। সুতরাং সবটাই এখন নির্ভর করছে তার নিজের উপর।

জাভেদ যেখানটায় বসেছে, জায়গাটা কিছুটা অন্ধকার হঠাৎ কারও এদিকে চোখ পড়লেও তাকে চট করে চিনতে পারবে না। নিজেদের মধ্যেই কথাবার্তায় ওরা মশগুল। লরেন্সই বেশি কথা বলছে, কিন্তু বাড় আগের মতই স্থির আর নীরব রয়েছে। ওদের মধ্যে একজন জাভেদের দিকে একবার চেয়ে দেখে আবার নিজেদের কথায় মন দিল। কিন্তু পরক্ষণেই আবার ফিরে চাইল ওর দিকে। অন্ধকারে বসে থাকা লোকটাকে দেখে কিছু একটা আশঙ্কা জেগেছে তার মনে। ঘুরে পাশের লোকটার কানে কানে কী যেন বলল সে। হঠাৎ করেই থেমে গেল ওদের উৎফুল্ল আলাপ। বব সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ওদের মুখোমুখি হলো। বাডের চোখ পড়ল ডেপুটি শেরিফের উপর।

কোন্ পক্ষ নিচ্ছ তুমি? ববকে জিজ্ঞেস করল বাড়।

আইনের পক্ষ। এখানে কোনরকম গোলমাল চাই না আমি, বাড।

হেসে উঠল লরেন্স।

জাভেদ স্থির হয়ে বসে আছে তার চেয়ারে। টেবিলের উপর রাখা তামাক আর কাগজ তুলে নিয়ে একটা সিগারেট বানাতে আরম্ভ করল সে। বব কী করে দেখার জন্য অপেক্ষা করছে ও। মনে মনে সে ঠিক করে রেখেছে গোলমাল আরম্ভ হলেই প্রথমে বাড়কে শেষ করবে, কারণ এদের মধ্যে সে-ই সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে তার ধারণা। অবশ্য ওদের সব কজনকেই শক্ত সমর্থ আর চালু দেখাচ্ছে।

ববই আবার বলে উঠল, ড্রিঙ্ক শেষ করে এখান থেকে চলে যাও। যদি শহরে কোন গোলমাল করো, তোমাদের পিছু নেব আমি।

আমাদের একজনকে মেরেছে ওই লোক।

হতে পারে, কিন্তু আমি যা বলেছি তা যেন মনে থাকে।

কিছু আসে যায় না শেরিফ, তুমি একটু বাইরে থেকে বেড়িয়ে এসো, কিংবা একপাশে সরে দাঁড়াও।

কোন কথা শুনতে চাই না, গোলমাল করলেই তোমাদের হাজতে ভরব আমি।

আমাদের হাজতে ভরবে তুমি? তাচ্ছিল্যের স্বরে প্রশ্ন করল লরেন্স।

ঠিক তাই, জবাব দিল বব। গোলমালের চেষ্টা করে দেখতে পারো।

ইতস্তত করল লরেন্স। পিস্তলে বেশ ভাল হাত আছে তার, কিন্তু ববও খামোকা শেরিফের পদ পায়নি তা ছাড়া তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে শহরে যেন কোন ঝামেলা না বাধায়

লরেন্সের দিকে একটু এগিয়ে গেল বব। তোমাকে তো বলেছি, লরেন্স, দরকার হয় ড্রিঙ্ক করো, কোন মানা নেই, কিন্তু শহরের ভিতর কিছু করতে পারবে তোমরা

লরেন্সকে ইতস্তত করতে দেখে বাড় বলে উঠল, যেতে দাও, লরেন্স, আমাদেরও সময় আসবে।

কাঁধ ঝাঁকিয়ে বারের দিকে ফিরল লরেন্স। ফ্রেড তার গ্লাসটা আবার ভরে দিল। ফ্রেডকে লক্ষ করল জাভেদ, ওর ডান হাতটা প্রথম থেকেই বারের নীচে সবার চোখের আড়ালে রয়েছে। বুঝে নিল, ছররা বন্দুকটার উপর রয়েছে ওর হাত। পট থেকে আবার নিজের কাপটা ভরে নিল জাভেদ।

বেশ বিপজ্জনক একটা পরিস্থিতি। সার। জেলার ডেপুটি শেরিফ হলেও বব শহরের বাইরে গোলমাল করতে মানা করেনি ওদের, বরং সেটারই ইঙ্গিত দিয়েছে। অর্থাৎ শহরের মধ্যে আইন রক্ষা করবে বব, কিন্তু বাইরে সবাইকে নিজেই নিজের নিরাপত্তা দেখতে হবে। ওরা এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে শহর থেকে বেরুনোর দুটো পথই আটক করবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তার একমাত্র উপায় হচ্ছে প্রধান ট্রেইল ছেড়ে অনেক দিনের হারিয়ে যাওয়া মিসিডোরো ট্রেইলটা খুঁজে বের করে নিয়ে ওটা ধরেই এগিয়ে পাজারিটো পীকের কাছে আবার প্রধান ট্রেইল ধরা। ওরা স্বভাবতই শহর থেকে মাইলখানেক দূরে যেখানে ট্রেইলটা দুই পাহাড়ের মাঝে সরু ফাঁকটার ভিতর দিয়ে গেছে সেইখানটাতে অপেক্ষা করবে ওর জন্য। তার আগেই ওকে অন্য পথ ধরতে হবে।

সিগারেট আর কফি শেষ হলো জাভেদের। শেরিফ আর ফ্রেড ছাড়া বাকি সবাই বেরিয়ে গেল বার থেকে।

ধন্যবাদ, বব, সবাই চলে যেতেই বলে উঠল জাভেদ।

ধন্যবাদের দরকার নেই, রাগত কণ্ঠে জবাব দিল বব। আমার কাজ আমি করেছি।

ঠিক আছে, বলে উঠে দাঁড়াল জাভেদ। বারের কাছে এগিয়ে গিয়ে বিল মিটিয়ে দিল সে।

টাকা ড্রয়ারে রাখতে রাখতে ফ্রেড বলল, সাবধান থেকো জাভেদ, ওরা অপেক্ষা করবে তোমার জন্যে।

জানালা দিয়ে বাইরে চাইল জাভেদ, ওদের ঘোড়াগুলো অদৃশ্য হয়েছে, কেবল দূরে একজন লোককে রাস্তায় ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে।

দাঁত বের করে হাসল জাভেদ যারা ধৈর্য ধরে এই শীতের মধ্যে আমার জন্য বৃথা অপেক্ষা করে বসে থাকবে, ঈশ্বর তাদের মঙ্গল করুন! প্রার্থনা করল সে।

ওদের অতটা হেলা কোরো না, জাভেদ-সাবধানে থেকো।

কিছু খাবার বেঁধে দাও তো আমাকে, বব বেরিয়ে যেতেই নিচু গলায় বলল জাভেদ। আমাকে হয়তো দিন দুয়েক পাহাড়ে পাহাড়েই কাটাতে হবে।

মেয়েটা কেমন আছে, সে চোট পায়নি তো? স্যান্ডউইচ প্যাক করতে করতে জিজ্ঞেস করল ফ্রেড

না, ভালই আছে সে। সত্যিই মেয়েটা অসাধারণ।

ওভারকোট পরে নিল জাভেদ। প্যাকেট করা প্রায় শেষ করে এনেছে ফ্রেড। রাস্তার বাড়িগুলোর কথা ভাবছে জাভেদ-ডাইনে চারটে আর বামে তিনটে বাড়ি রয়েছে সামনের রাস্তাটার উপর। ওগুলোর পিছনে ছড়ানো রয়েছে আরও কতগুলো ঘর। নীনা যে বাড়িটা ভাড়া করেছে সেটা বামদিকের বাড়িগুলোর পিছন দিকে। হঠাৎ একটা বুদ্ধি খেলল ওর মাথায়।

চলি, আবার দেখা হবে, ফ্রেড। বিদায় নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল জাভেদ। সেলুন থেকে বেরিয়ে কালো ঘোড়াটার পাশ দিয়ে খানিকটা এগিয়ে গেল সে। চারদিক ভাল করে দেখে নিয়ে চট করে ফিরে ঘোড়ার পিঠে উঠে বারের পিছন দিকে চলে এল ও

ঘটনাটা এত জলদি ঘটে গেল যে রাস্তায় জাভেদের উপর নজর রাখার জন্য যাকে রাখা হয়েছিল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল সে। সামলে নিয়ে সে ছুটে আসতে আসতে জাভেদ পিছন দিয়ে ঘুরে আর একটা বাড়ির আড়ালে চলে গেল। নরম বালির উপর দিয়ে নিঃশব্দে শুকনো জলাটা পার হয়ে গাছগুলোর আড়ালে চলে এল সে। তারপর সোজা ঘোড়া ছুটাল নীনার বাসার দিকে।

বেশ কিছু গাছ গাছড়ার পিছনে আড়াল হয়ে আছে বাড়িটা। দোতালার সামনের দিকে একফালি বারান্দা। বাড়ির পিছনে আস্তাবল আর গুদামঘর। রাস্তা ধরেই সাহস করে বাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল জাভেদ। এই মুহূর্তে তাকে চিনবে এমন কেউ ওই বাসায় থাকার সম্ভাবনা নেই, তা ছাড়া কালো ঘোড়াটাও এই এলাকায় অপরিচিত।

বাসার ভিতর থেকে সুরেলা কণ্ঠে বিখ্যাত একটা প্রেমের গান ভেসে আসছে। দরজায় দাড়িয়ে কয়েক সেকেন্ড গান শুনে দরজায় টোকা দিল সে। গান থেমে গেল। ভিতরে পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

দরজা খুলে গেল। নীনা নিজেই খুলেছে। দরজায় জাভেদকে দেখে তার চোখে মুখে বিস্ময়ের চিহ্ন ফুটে উঠল।

কেমন আছ, নীনা? মাথা থেকে হ্যাট নামিয়ে জিজ্ঞেস করল জাভেদ। অতিথি দেখে বিরূপ হলে না তো?

মুহূর্তেই বিব্ৰত ভাবটা কাটিয়ে উঠল নীনা। একটু পিছনে সরে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানাল। এসো, ভিতরে এসো। একেবারে চমকে দিয়েছ আমাকে।

তোমার কিছু লোকজনকে দেখলাম একেবারে মারমুখো হয়ে আছে, মন্তব্য করল জাভেদ। ভাবলাম, ওদের একটু ঠাণ্ডা হবার সময় দিই, আর তা ছাড়া আমাদের পরিচয়টাও একটু গাঢ় করে নেয়া যাবে এই সুযোগে।

তুমি ধরেই নিচ্ছ তোমাকে আরও ভাল করে জানার ইচ্ছে আমার আছে?

কেন, তা কি নেই নাকি?

জানি না, হাতের ইশারায় ডিভান দেখিয়ে দিল সে জাভেদের বসার জন্য। তোমার এখানে আসার মত স্পর্ধা আছে দেখে অবাক হচ্ছি।

তোমার কি এরচেয়েও ভাল কোন জায়গা জানা আছে নাকি? লঘু স্বরেই কথাটা বলে জানালা দিয়ে বাইরে রাস্তাটার দিকে নজর রাখা যায় এমন জায়গা বেছে নিয়ে বসল জাভেদ। কিছুটা সময় যখন আমাকে কাটাতেই হবে তখন একজন সুন্দরী মেয়ের সাথে কথা বলে সময় কাটানোর চেয়ে উপভোগ্য আর কী হতে পারে?

জাভেদই কিছু একটা কথা তুলবে আশা করে চুপ করে অপেক্ষা করছে নীনা। ঘরের চারদিকটায় চোখ বুলিয়ে দেখল জাভেদ। ঘরটা বেশ বড়, ঠাণ্ডা পরিবেশ-ভালই, কিন্তু আরও সুন্দর করার প্রচুর অবকাশ রয়েছে। একপাশে একটা পিয়ানোও আছে-বারের বাইরে জাভেদ বহুদিন পিয়ানো দেখেনি।

তোমার গানের গলা তো খুব সুন্দর, তুমি কি পিয়ানোও বাজাতে জানো?

অবশ্যই।

শোনাবে?

জাভেদ, তোমার যদি কোন কাজের কথা থাকে আমার সাথে তবে সেটাই বলো। তোমাকে পিয়ানো বাজিয়ে শোনানোর কোন ইচ্ছে নেই আমার, তোমার এমন ছেলেমানুষী আবদারে অবাক হচ্ছি আমি।

আমরা এই এলাকায় ভাল গান-বাজনা শোনার সুযোগই পাই না, নীনার অস্থিরতাকে পাত্তাই দিল না জাভেদ। বিশেষ করে পুরোনো ইটালিয়ান গান তো মোটেই শুনি না।

তুমি জানো ওই গানটা? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল নীনা

পশ্চিমের কাউ-বয় আমরা অনেক দেশ ঘুরে এসেছি, জবাব দিল সে, পশ্চিমের বেশির ভাগকেই তুমি দেখবে গরু-মহিষ ছাড়াও আরও অনেক কিছু জানে। একটু থামল সে, আচ্ছা নীনা, তুমি এদিকে কেন এলে বলো তো?

কারণ এখানে আমার নিজের জমি আছে, ঠাণ্ডা গলায় জবাব দিল সে। এ ছাড়া আর কী কারণ থাকবে?

কাঁধ ঝাঁকাল জাভেদ। তাই ভাবছিলাম। সাধারণত যাদের ভাল র‍্যাঞ্চ আর এতগুলো পশু আছে তারা নিরুপায় না হলে জায়গা ছেড়ে নড়ে না। ভাবছি তোমরা কেন এলে, আর কেনই বা তোমাদের লোকজন গরু-মহিষের চেয়ে বন্দুকের সাথে বেশি পরিচিত।

দরজার দিকে চাইল নীনা। বাসায় একাই আছে সে। মেক্সিকান রাঁধুনি মেয়েটা ছাড়া আর কেউ নেই। দ্রুত চিন্তা করছে নীনা, কোন ফন্দি করে তার কিছু কর্মচারীকে এখানে হাজির করা যায় কিনা। জাভেদ ঠিকই আন্দাজ করেছে, ওরা আর যেখানেই খুঁজুক এই বাড়িতে তাকে কিছুতেই আশা করবে না। তার প্রতিটি কার্যকলাপ আর মন্তব্যেই আরও চিন্তিত হয়ে উঠছে নীনা। সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে যে জাভেদ লোকটা নেহাত সাধারণ মানুষ নয়।

গভর্নরকে একটা চিঠি দিয়েছি আমি, বলল সৈ।

আড়ষ্ট হয়ে গেল নীনা। কী বললে?

গভর্নরকে চিঠি দিয়েছি আমি। সান্তা ফের ওরা চেনে আমাকে-ওদের লিখে জানিয়েছি আমি এখানে কী ঘটছে।

ভয় পেয়েছে মেয়েটা। বুঝতে পারছে, এবার তারা ভাল মতই ফেঁসেছে। ওরা যখন পশ্চিমে আসার জন্য তৈরি হচ্ছিল তখন অ্যালেক তাকে বুঝিয়েছিল যে জমিটার উপর তার ভুয়ো হলেও একটা দাবি আছে। কোন ঝামেলাই হবে না। এতে, কারণ বর্তমানে জমিটা যে ভোগ করছে, তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে ফেলা হবে। সে অবশ্য সন্দেহ করেছিল যে অ্যালেকের নিউ মেক্সিকোর এই র‍্যাঞ্চে আসার পিছনে তার নিজস্ব কোন গৃঢ় কারণ আছে, কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে আর বেশি ভাবেনি বা খোঁজখবর নেয়নি সে।

এখন যদি চিঠি পেয়ে ওরা টেক্সাসে অনুসন্ধান চালায় তবে সব ফাঁস হয়ে যাবে। তার এই ভয়ের কথা জাভেদকে বুঝতে দেওয়া চলবে না। এখন উপায় মাত্র দুটোই আছে, হয় ভুলিয়ে ভালিয়ে নিজের দলে টেনে নিতে হবে, নইলে মেরে ফেলতে হবে ওকে। সবচেয়ে ভাল হয় যদি গায়েব করে দেওয়া যায়-লোকজন কিছুদিন ওর ফিরে আসার অপেক্ষা করবে বটে কিন্তু কিছুদিন পরে সবাই নির্ঘাত ভুলে যাবে। পড়শীদের সাথে বন্ধুত্ব করে নিয়ে র‍্যাঞ্চ চালাতে তখন আর কোন অসুবিধাই হবে না।

আমাদের মধ্যে এই বিরোধ না থাকলেই ভাল হত। উঠে জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়াল নীনা। তার মাথার মধ্যে দ্রুত চিন্তা চলছে-একটা উপায় ভেবে বের করার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে সে। সত্যি শক্ত মানুষ তুমি, জাভেদ।

সাধারণ লোক আমি।

না, সাধারণ তুমি মোটেও নও। অনেক রকম গুণই আছে তোমার। অন্য কোন পরিবেশে আমাদের আলাপ হলেই ভাল হত। পুরুষের মত র‍্যাঞ্চ চালাতে অভ্যস্ত আমি, আমার মত মেয়ের চোখে এমন সত্যিকার আকর্ষণীয় পুরুষ আর চোখে পড়েনি।

কথাগুলো বলে ফেলে নীনা নিজেই উল্লব্ধি করল, নিছক চাটুকারিতা করছে,–এগুলো তার মনের কথাই। ঘুরে জাভেদের মুখোমুখি দাড়িয়ে নতুন চোখ আবার দেখল ওকে নীনা। এই মানুষটার সাথে আরও আগে দেখা হওয়া উচিত ছিল তার।

সুশ্রী চেহারা, দুঃসাহসীও বটে। অ্যালেকের সাথে জাভেদের মিল নেই কোথাও। অ্যালেক সব সময়ই কিছু একটা অভিসন্ধি নিয়ে থাকে। কেবলই বিনা খাটুনিতে টাকা উপার্জনের ধান্ধায় থাকে সে।

জানালার ধার থেকে জাভেদের দিকে এগিয়ে এল সে। একবার ঘাড় ফিরিয়ে দেখল, বাইরের রাস্তাটা এখনও খালি। আচ্ছা, জাভেদ, জীবনে কী চাও তুমি? মানে এই যে বেঁচে থাকা কাজ করা শেষ পর্যন্ত কী চাও তুমি?

ওই র‍্যাঞ্চটাকে আমি সুন্দর করে গড়ে তুলতে চাই। এটা যে কী রকম কঠিন কাজ হয়তো সে সম্বন্ধে কোন ধারণাই নেই তোমার। সমতল এলাকার মানুষ তুমি, ওদিকেও অনেক সমস্যা আছে, আর সেসব সমস্যার সমাধানও তোমাদের জানা আছে। কিন্তু এখানে নতুন নতুন উপায় আবিষ্কার করে নিতে হয় মানুষকে। সামান্য কয়েকটা পশু নিয়ে আরম্ভ করেছিলাম আমি, অনেক খেটে, অনেক ঠেকে, শিখেছি কীভাবে শীতকালেও ওদের খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখা যায় বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দিয়ে।

সত্যিই কি জীবন এখানে এত কঠিন?

শুধু কঠিন না, আর ও খারাপ। চাইলে তুমি নিজেই এসে দেখতে পারো। তোমার লোকজন হয়তো এখন ভাবছে ওরা জিতে গেছে। কিন্তু আসলে আমরা ইচ্ছে করেই র‍্যাঞ্চ ছেড়ে চলে গিয়েছি। আমরা জানি এই শীতে তোমাদের কী দুরবস্থা হবে, তোমাদের পশুগুলো সব মারা পড়বে, সর্বস্ব হারাবে তোমরা। তাই র‍্যাঞ্চ ছেড়ে দিয়েও নিশ্চিন্তে আছি আমি। তোমার বেশির ভাগ লোকজনও কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে যাবে, কারণ ওদের মধ্যে ম্যাট আর সামান্য দু’একজন ছাড়া র‍্যাঞ্চের কাজে কেউই অভ্যস্ত নয়। তবে বলা যায় না, কপাল ভাল হলে এবারে শীতটা হালকাও যেতে পারে, তাতে কিছুটা রক্ষা পাবে তোমরা।

ওর কথাগুলো যে কতটা সত্যি তার কিছুটা আঁচ নীনা পেয়েছে নিজের চোখে র‍্যাঞ্চটা দেখে। সত্যিই তার যথাসর্বস্ব জড়িয়ে আছে ওই পশুগুলোর মধ্যে, ওগুলো হারালে সবই হারাবে সে।

খেয়াল করে দেখেছ তুমি ওই উপত্যকার মাঠগুলোর দিকে? এই দুই দিনেই মাঠের ঘাস প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এখনও পুরো শীতকালটা তো পড়েই আছে সামনে।

জাভেদকে কী করে সরানো যায়? চিঠির কথায় ভয় পেয়েছে নীনা। এই সম্ভাবনার কথা আগে তার মনেই আসেনি, অথচ এটাই আসলে তাদের বিক্ষে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। কিন্তু জাভেদ যদি কোন কারণে নিরুদ্দেশ হয় তবে জিকো আর মেয়েটাকে নিয়ে তেমন কোন ঝামেলা পোহাতে হবে না তার। সে আর অ্যালেক সান্তে ফি গিয়ে জাভেদের অবর্তমানে আইনের দিকটাও সামলে নিতে পারবে।

আমাদের কি শত্রু হতেই হবে? প্রতিবাদ করল নীনা, বন্ধু হতে পারি না?

কাছে সরে এল সে, জাভেদ, তুমি বুঝতে পারছ আমার অনুভূতি? বাবা আমার জন্যে কেবল ওই জমিটুকুই রেখে গেছেন-ওটাই আমার সর্বস্ব।

আমি বুঝতে পারছি।

আবেগ ভরা চোখে চাইল নীনা, তার ঠোঁট জোড়া সামান্য ফাঁক হয়ে রয়েছে। জাভেদ, প্লীজ, তোমাকে বন্ধু হিসেবে পেতে চাই আমি।

দুষ্টুমির হাসি ফুটে উঠল জাভেদের চোখে। আমন্ত্রণ সত্ত্বেও নীনাকে বুকে টেনে নিল না সে। কিন্তু সরেও গেল না। আমিও শক্ত হতে চাই না তোমার। তুমি তোমার লোকজন নিয়ে সরে গেলেই সব ঝামেলা চুকে যায়।

মুহূর্তে রাগে লাল হয়ে উঠল নীনার মুখ। একটু পিছনে সরে গেল সে। তীক্ষ্ণ একটা হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। না, তা আমি করতে পারব না। আমার বাবার প্রতি অমর্যাদা আর বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে তাতে।

ঘুরে আবার জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল নীনা। ওর কাঁধের উপর দিয়ে চেয়ে দেখল জাভেদ রাস্তাটা এখনও শূন্য। হঠাৎ তার সন্দেহ হলো ওই মেয়েটাও হয়তো নজর রেখেছে রাস্তাটার উপর। তার মানে সে কাউকে আশা করছে।

মেয়েটা জানে যে কোন ছুতোয় কেউ না আসা পর্যন্ত ওকে আটকে রাখতে হবে তার। সে এখন ভাল মতই বুঝে নিয়েছে যে জাভেদকে হত্যা করা ছাড়া আর কোন গতি নেই।

না, আর কোন সন্দেহই নেই তার। কিন্তু তবু কথাটা ভাবতে গিয়ে মনে মনে হোঁচট খেয়ে চমকে উঠল নীনা। অপরিচিত কারও হত্যায় মত দেওয়া আর জেনেশুনে চেনা কোন মানুষকে খুন করার আদেশ দেওয়ায় অনেক তফাৎ। কিন্তু সোজা কথা হচ্ছে র‍্যাঞ্চটা চাইলে যেমন করে হোক জাভেদকে তার হত্যা করতেই হবে।

তার বাবা ছিল তার চেয়ে অনেক নরম প্রকৃতির। লড়াই বাধলে ইতস্তত করত সে। তার ছিল কথা বেশি, কাজ কম। কিন্তু নীনা তেমন ভুল করার মত মেয়েই না-ওটা তার জমি, যে করেই হোক ওটা তাকে পেতেই হবে। র‍্যাঞ্চ দখল করে সে তার চোরাই পশুগুলোকে দূরের কোন উপত্যকায় লুকিয়ে রাখতে পারবে। অ্যালেকের মতে জাভেদ ওই সব জায়গাতেই তার পশুগুলোকে নিরাপদে লুকিয়ে রেখেছে। সরকারী অনুসন্ধান যদি চালানোও হয় ওরা চোরাই পশুর খোঁজ পাবে না কোনদিনই। নীনার বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ থাকবে না।

টুপিটা হাতে তুলে নিল জাভেদ। এবার যেতে হয়, বলল সে। সময়ের সাথে সাথে বিপদও বাড়ছে তার। নীনা যে তার স্বার্থসিদ্ধির জন্য কোন বিপত্তি ঘটাবে তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। তা ছাড়া তার লোর্কজনও যে-কোন সময়ে এখানে এসে হাজির হয়ে যেতে পারে।

এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলল জাভেদ। দ্রুত চিন্তা করছে নীনা, কীভাবে ওকে আর একটু দেরি করানো যায়। হঠাৎ দরজার ফাঁক দিয়ে উঠানে পিস্তল হাতে লরেন্সকে দেখতে পেল সে। জাভেদ যেন চট করে পিস্তল বের করতে না পারে সেজন্য ঝাপিয়ে পড়ে দু’হাতে জাভেদের ডান হাত চেপে ধরল নীনা। লরেন্সের পিস্তল জাভেদের দিকে গুলিবর্ষণ করল। অল্পের জন্য বেঁচে গেল সে। গুলিটা ওর গা ঘেঁষে গিয়ে দরজায় লাগল। ডান হাত আটক হয়েছে দেখে বাঁ হাতে পিস্তলটা তুলে নিল জাভেদ। এরমধ্যেই দ্বিতীয়বার গুলি ছুঁড়ল লরেন্স। কিন্তু নীনার গায়ে লাগতে পারে এই ভয়ে এবারের গুলিটাও মিস হলো। গুলিটা আরও দূর দিয়ে গেছে এবার।

গুলি করল জাভেদ, সেই সাথে ঝাড়া দিয়ে ছাড়িয়ে নিল নিজেকে। ডান কাঁধে গুলি খেয়ে একপাশে ঘুরে গেল লরেন্স। ধাক্কার চোটে নীনা টলতে টলতে পিছিয়ে গেল কয়েক পা।

গুলি খেয়ে হাত থেকে পিস্তল পড়ে গেছিল লরেন্সের। ঝুঁকে বাম হাত দিয়ে ওটা তুলতে চেষ্টা করছে সে। আবার গুলি করল জাভেদ। গুলিটা ওর বেল্টে পিতলের বকলেসে লেগে দিক পরিবর্তন করে লরেন্সের হাতের কিছুটা মাংস ছিড়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল। একছুটে নিজের ঘোড়ার কাছে চলে এল জাভেদ।

বাড়ির ভিতর থেকে একটা রাইফেল গর্জে উঠল। ঝাঁপ দিয়ে ঝোঁপের উপর পড়েই গড়িয়ে সরে গেল জাভেদ। দ্বিতীয় গুলিটা ওর সামনেই ঝোঁপের ভিতর মাটিতে গিয়ে ঢুকল। গড়িয়ে যাবার সময়ে জাভেদের চোখে পড়ল জানালার ধারে দাঁড়িয়ে উইঞ্চেস্টারের লিভার টেনে আবার গুলি করার জন্য তৈরি হচ্ছে নীনা।

কালো ঘোড়াটা গুলির শব্দে চঞ্চল হয়ে উঠেছে। রেকাবে পা গলিয়ে ঘোড়ায়। চড়া অসম্ভব হয়ে উঠেছে। সে-চেষ্টা বাদ দিয়ে সরাসরি লাফিয়ে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসল ও। ছুটন্ত ঘোড়ার উপর চলতে চলতেই সে ঝুঁকে পড়ে রেকাব গলিয়ে নিল পায়ে। রাইফেলের আরও একটা গুলি ওর মাথার উপর দিয়ে বেরিয়ে গেল। পুরো বেগে ঘোড়া ছুটাল সে স্যান সিদ্রো ট্রেইলের দিকে। কিন্তু একটু এগিয়েই সে দেখতে পেল প্রায় বারোজন তোক অর্ধচক্রাকারে ঘিরে ছুটে আসছে তার দিকে। ট্রেইল আর তার মাঝখানে রয়েছে ওরা।

কোন আশাই নেই জাভেদের। ঘোড়াটাকে পিছনের দুই পায়ে দাঁড় করিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে ছুটল সে সোজা পুব দিকে। বাড়ি থেকে আর একটা গুলির শব্দ হলো। জাভেদ ঘোড়া ফিরিয়ে বাড়ির কাছ ঘেঁষে যাবার সময়ে। সামনেই উত্তর-পূর্বদিকে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল খাড়া পাহাড়-পনেরোশো ফুট উঁচু। ওদিকে অনেক ফাটল আর খাজ আছে বটে কিন্তু জাভেদ জানে ওদিক দিয়ে তার পালিয়ে যাবার মত কোন পথ নেই।

দ্রুত দৌড়াচ্ছে ঘোড়াটা, কিন্তু এভাবে কতক্ষণ চলতে পারবে জানে না সে। এই ঘোড়াটাও তার নিজের ঘোড়াগুলোর মত দানা-খাওয়া ঘোড়া। পিছনের লোকগুলো এখন ঘন হয়ে পরস্পরের কাছাকাছি এসে গেছে। কেবল দুজন লোক ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এগিয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে। জাভেদের ওদিক দিয়ে পালাবার পথ বন্ধ করার মতলবে আছে ওরা।

দূরের বড় বাকটার পিছনে হন্ডে ক্যানিয়ন। জাভেদ যদি ওই দুজন ওখানে পৌঁছবার আগে ওদিক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে একমাত্র তবেই সে এই জাল থেকে বেরুতে পারবে। কিন্তু তা না হলেই আটকা পড়ে যাবে ও। ওই পাহাড়ের দিকে পিছু হটে গুলি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওদের হয়তো ঠেকাতে পারবে জাভেদ-কিন্তু গুলি ফুরিয়ে গেলেই নিশ্চিত মৃত্যু হবে তার।

ঘোড়ার পেটে বুটের গোড়ালির খোঁচা দিয়ে তুফান বেগে ছুটল সে বাকটার দিকে। প্রবল বাতাসের ঝাঁপটা লাগছে ওর মুখে। বাতাসে হ্যাটটা মাথা থেকে খুলে গিয়ে থুতনির নীচে বাঁধা সুতোয় ঘাড়ের কাছে এসে উড়ছে। মুখ দিয়ে ফেনা উঠছে কালো ঘোড়াটার, কিন্তু তবু সমান তালেই ছুটে চলেছে ও। পিছন থেকে মাঝে মাঝে গুলির শব্দ হচ্ছে, তবে ছুটন্ত অবস্থায় ওদের পক্ষে জাভেদের গায়ে গুলি লাগানো প্রায় অসম্ভব।

পিছনে একবারও চাইছে না সে। শুধু আড়চোখে নজর রেখেছে তার ডানদিক দিয়ে যারা আসছে তাদের উপর। খুব বেশি পিছনে আর নেই ওরা দুজন। ভীত খরগোশের মত লাফিয়ে ছুটে চলেছে কালো ঘোড়াটা, যেন টের পেয়ে গেছে পিছনেই স্বয়ং মৃত্যু তাড়া করে আসছে।

একটা গুলি মৌমাছির মত গুঞ্জন তুলে জাভেদের চুল ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল। ঝট করে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল সে। চক্রাকারে ঘুরে ওরা দুজন এগিয়ে আসছে দ্রুত। আন্দাজ নিয়ে জাভেদ বুঝল তারই সাথে একই সময়ে ওরাও পৌঁছবে ওই বাকটার কাছে।

উপায় নেই দেখে পিস্তল বের করল জাভেদ। ছুটতে ছুটতেই সে কাছের লোকটার ঘোড়া লক্ষ্য করে পর পর তিনটে গুলি করল। হঠাৎ করে ঘোড়ার গতি ধীর হলো। ভয় পেয়েছে ঘোড়াটা। ওর গায়ে লাগেনি বটে কিন্তু ওর খুব কাছে দিয়েই বেরিয়ে গেছে একটা বুলেট। সামনের ঘোড়াটা গতি কমে যেতেই পিছনের ঘোড়াটা গুতো খেল ওর সাথে। ওরা টাল সামলে উঠতে উঠতেই বাঁক ঘুরে বেরিয়ে গেল জাভেদ।

হন্ডে ক্যানিয়নটা মুখের কাছে মাইলখানেক চওড়া হলেও ধীরে ধীরে সরু হতে হতে কানা গলিতে গিয়ে শেষ হয়েছে। বাম দিক দিয়ে পাহাড়টা পেরিয়ে পশ্চিম ক্যানিয়নে পৌঁছতে পারলেই রক্ষা। চলতে চলতে এক জায়গায় পাহাড়ের। ঢালটা একটু কম দেখে ঘোড়া ছুটিয়ে পাহাড়ে উঠতে আরম্ভ করল জাভেদ।

ঘোড়ার গতি কমে গেল। মাথার কাছে পৌঁছে পিছনের দু’পায়ে লাফাতে গিয়ে পিছলে গেল ঘোড়ার পা। লাফিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে লাগাম ধরে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে পাহাড়ের মাথার দিকে উঠতে শুরু করল জাভেদ। পিছন থেকে গুলির আওয়াজ হলো। গুলিটা ঘোড়ার পায়ের কাছে পাথরের উপর লাগল। পাথরের ছোট ছোট কয়েকটা টুকরো হুলের মত ঘোড়ার পায়ে বিধতেই ঘোড়া লাফিয়ে উঠে পাহাড়ের ওপারে চলে গেল-সাথে জাভেদও।

ঘোড়ার পিঠ থেকে নিজের উইঞ্চেস্টারটা বের করে নিয়ে একটা পাথরের পিছনে শুয়ে পড়ল জাভেদ। নীচের লোকগুলোর দিকে রাইফেল তাক করেই ট্রিগার টিপে দিল সে। চিৎকার করে উঠল একটা লোক। ওদের লক্ষ্য করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটার পর একটা গুলি চালিয়ে যাচ্ছে জাভেদ।

একটা ঘোড়া ধরাশায়ী হয়ে অসহায় ভাবে পা ছুঁড়তে লাগল। আর একটা ঘোড়ার পায়ের কাছে গুলি লাগতেই লাফিয়ে উঠল সেটা, ভারসাম্য হারিয়ে ওর পিঠ থেকে পড়ে গেল সওয়ার। বেকায়দায় পড়ায় বাম টা ফেঁসে গেল রেকাবের সাথে। ওকে মাটির উপর দিয়ে হেঁচড়ে টেনে নিয়ে ছুট দিল ঘোড়াটা। অন্যেরা লাফিয়ে নেমে আড়াল নিল।

পিছু হটে ঘোড়ার কাছে সরে এল জাভেদ। ফেনা ঝরছে কালো ঘোড়াটার মুখ থেকে। পিঠটা ঘামে ভিজে উঠেছে-কাঁপছে সে। লাগাম ধরে ধীর পায়ে ঘোড়াটাকে হটিয়ে নিয়ে চলল জাভেদ। সে জানে নীনার লোকজন ওই ঘোড়ায় টেনে নিয়ে যাওয়া লোকটাকে উদ্ধার করবে সবচেয়ে প্রথম-তারপর ওরা অন্য কোন পথ খুঁজে নিয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করবে। হয়তো আশা করবে জাভেদ সরে গেছে ওখান থেকে, কিন্তু ঝুঁকি নেবে না ওরা। একটা ঘোড়া মরেছে, একজন তো বটেই সম্ভবত দুজন আহত হয়েছে গুলিতে, আর যাকে ঘোড়া টেনে নিয়ে গেছে তার অবস্থাও খুব ভাল থাকবে না। এত কিছুর পরে আজকের মত ওরা হয়তো ফিরেই যাবে। তবে এতটা সৌভাগ্য আশা করছে না জাভেদ।

ঘোড়াটাকে হটিয়ে নিয়ে চলল সে। দুপুর হয়েছে। বেছে বেছে পাথরের উপর দিয়ে চলেছে ওরা যেন পায়ের ছাপ দেখে কেউ টের না পায় কোনদিকে গেছে। অনেক দূর পায়ে হেঁটে এসে ঘোড়ায় চড়ল জাভেদ। এই এলাকায় কেউ আসে না। জায়গাটা একেবারে অপরিচিত ওর কাছে। জিকোর কাছে সে শুনেছে যে ওই ওজো ডেল ওসো পাহাড়ে একটা ঝর্ণা আছে। ভাগ্য প্রসন্ন থাকলে ওটা খুঁজে পেয়ে যেতে পারে ও।

আধঘণ্টা পরে সত্যিই ঝর্ণাটা পাওয়া গেল। ঘোড়াকে পানি খাইয়ে বোতলে পানি ভরে নিল জাভেদ। পিছন দিকে চেয়ে দেখল কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ওরা পিছু নিয়ে থাকলেও বোঝা যাবে না দূর থেকে, কারণ পাথরের উপর দিয়ে আসবে বনে। ধুলো উড়বে না।

পিস্তলে আবার গুলি ভরে নিল সে। পিছনে কেউ আসুক বা না আসুক সব সময়ে তৈরি থাকতে হবে তাকে। উত্তর দিকে রওনা হয়ে গেল জাভেদ। এদিক দিয়ে দরকার হলে উত্তর-পুবে ঘুরে জিকো আর জেনির কাছে পৌঁছতে পারবে ও। বিশ-পঁচিশ মাইল পুবে হচ্ছে রিও গ্র্যান্দে ক্যানিয়ন। ওটাই দুভাগে ভাগ হয়ে ফ্রিজোল আর পেজারিতো ক্ৰীক হয়েছে। বিকেলের ঠাণ্ডা হাওয়া জাভেদের দেহের উপর দিয়ে বারবার তার শীতল পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে।

ঠাণ্ডা। খুব ঠাণ্ডা পড়েছে। আরও উঁচুতে উঠতে হবে তাকে, সেখানে আরও ঠাণ্ডা। স্বেচ্ছায় কেউ এই বিজন এলাকায় আসে না। ঘোড়ার পিঠে কুঁজো হয়ে বসেছে ক্লান্ত জাভেদ। ঘোড়ার চলাতেও আগের সেই ক্ষিপ্রতা আর তেজ নেই।

ঘোড়া থেকে নেমে আবার হাটতে আরম্ভ করল জাভেদ। ক্রমেই আরও উত্তরে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা। ছোট ছোট থোকায় পেঁজা তুলোর মত তুষার পড়তে আরম্ভ করল।

ঘোড়ার পিঠ থেকে ভেড়ার চামড়ার তৈরি কোটটা নামিয়ে পরে নিল জাভেদ। ওভার কোটটা পিছন দিক থেকে অনেক উপর পর্যন্ত চেরা, সুতরাং ওটা পরে ঘোড়া চালাতে কোন অসুবিধে হয় না ওর। কিন্তু ঘোড়ায় না চড়ে দ্রুতপায়ে হেঁটেই পথ চলতে লাগল সে। ডান দিকে একটা বিরাট খাদ। প্রায় খাড়াভাবে নীচে নেমে গেছে পাহাড়টা চারশো ফুট। নীচে দিয়ে একটা ছোট্ট ঝর্ণা বয়ে যাচ্ছে। রাতের মত আশ্রয় নেওয়ার জন্য একটা জায়গা খুঁজছে সে।

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে তবু এগিয়েই চলেছে জাভেদ। চলতে চলতে রাতের মত ক্যাম্প করার একটা জায়গা পেয়ে গেল সে। এমন কিছু না, পাহাড়ের মধ্যে গর্ত মত খানিকটা জায়গা। যা হোক, তুষার আর বাতাসের হাত থেকে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যাবে।

দুটো বড় পাথর যেখানে মিলেছে তারই মাঝে আগুন জ্বালাল জাভেদ। গাছের তলায় আরও কিছু লতাপাতা দিয়ে বুনে ঘোড়াটার জন্য মোটামুটি একটা আশ্রয় তৈরি করে দিল। আগুনের তাপও ওখান থেকে কিছুটা পাবে ঘোড়াটা। গাছের শুকনো ঝরা পাতা কিছু কুড়িয়ে নিয়ে ঘোড়ার গা ডলে দিল সে। তারপর বাইরে পাথরের উপর থেকে তুষার সংগ্রহ করে আনল কফি তৈরি করার জন্য। বোতলের পানি এখনই খরচ করতে চাইছে না সে। ঘোড়ার পিঠ থেকে ফ্রেডের দেওয়া খাবার প্যাকেট, কম্বল আর গ্রাউন্ড শীট নামিয়ে নিয়ে ঘোড়ার গলায় চানার থলে ঝুলিয়ে দিল জাভেদ।–তুমুল তুষারপাত হচ্ছে-সেই সাথে সাগুদানার মত শিলাও পড়ছে। গ্রাউন্ড শীটের উপর কম্বল বিছিয়ে বিছানা করে তার উপর বসে কফি আর খাবার খেতে খেতে জাভেদ ভাবছে জেনি আর জিকোর কথা।

রাতের মধ্যে দুবার শীতে কাঁপতে কাঁপতে উঠে আগুনে কাঠ যোগাতে হয়েছে জাভেদকে। শেষের বার উঠে আর ঘুমাল না সে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়েছে। আগুনের ধারে উবু হয়ে আগুন পোহাতে বসল জাভেদ। বাইরে চারদিক পুরু তুষারে ঢেকে গেছে। তুষারে ওর পথ চলার সব চিহ্ন একেবারে মুছে গেছে। ওরা যদি এই পর্যন্ত ওকে কোনমতে অনুসরণ করে আসতে পারে তবে এর পর থেকে ওদের আর কোন অসুবিধাই হবে না।

ধীরে ধীরে দিনের আলো ফুটে উঠল। বুট পরে নিয়ে ঘোড়ার খাবার জন্য পানি গরম করে নিজেও কফি আর ঠাণ্ডা গরুর মাংস খেয়ে নিল। তারপর কম্বলটা আগুনে গরম করে ঘোড়ার পিঠে বিছিয়ে তার উপর জিন চাপাল।

রওনা হয়ে গেল জাভেদ। বাইরে পৃথিবীর চেহারাটাই একেবারে পালটে গেছে। সাদায় ছেয়ে গেছে চারদিক। ভাল পাহাড়ী ঘোড়া এই কালো ঘোড়াটা। খুব সাবধানে তুষারে পা ফেলে এগিয়ে চলেছে ওটা। প্রায় ছয় মাইল পথ চলার পর হঠাৎ গাছের ভিতর থেকে বেরিয়ে তার চোখে পড়ল সামনেই পাহাড়ে ঘেরা একটা সুন্দর বিরাট মাঠ। জাভেদের কাছ থেকে প্রায় পাঁচশো ফুট নীচে ওই মাঠটা, সস আর অ্যাসপেন ঝোপে ঘেরা-মাঝে মধ্যে একটা দুটো পাইন গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে। গ্রীষ্মে এটা চমৎকার একটা পশু চরবার জায়গা হতে পারে। জাভেদ উপর থেকে মাঠের পুরোটাই দেখতে পাচ্ছে, প্রায় বিশ মাইল লম্বা হবে ওটা। মনে মনে হিসাব করল সে, কমপক্ষে দেড়শো বর্গমাইল হবে এলাকাটা।

ঘোড়াটাও যেন এই নতুন আবিষ্কারে চমকে গেছে, প্রান্তরের দিকে কান দুটো খাড়া করে ঘুরিয়ে অবাক হয়ে চেয়ে রয়েছে সে। কোন সন্দেহ নেই যে আগের দিনের বুড়ো ইন্ডিয়ানরা এই উপত্যকার গল্পই করত।

উপত্যকার কাছ ঘেঁষে নীচে নেমে এল জাভেদ। মাঠের মাঝে এগিয়ে গিয়ে দেখল ক্লিফের ধার দিয়ে বেশ উঁচু হয়ে তুষার জমলেও মাঠে শুধুমাত্র একটা পাতলা আস্তর পড়েছে। তুষার সরিয়ে সুন্দর সবুজ ঘাস দেখতে পেল সে। সুযোগ বুঝে কালো ঘোড়াটা মহা আনন্দে ঘাস খেতে আরম্ভ করেছে।

জাভেদের মনটা খুশিতে ভরে উঠল। এতদিন ধরে সে ঠিক এই রকমই একটা জায়গার খোঁজে ছিল। এখানকার ঘাসও নীচের অন্যান্য মাঠের চেয়ে অনেক ভাল। তার র‍্যাঞ্চটা এখান থেকে মাত্র কয়েক মাইল পশ্চিমে। সহজেই সে তার খামার থেকে পশু নিয়ে আসতে পারবে এখানে। একটা ছোট ঝর্ণাও আছে, ঠিক মাঝখান দিয়ে বইছে ওটা। অর্থাৎ এখানে পানিরও অভাব হবে না। যদি র‍্যাঞ্চের বিরোধ বেশিদিন স্থায়ী হয় তবে জাভেদ তার পশুগুলোকে এখানে নিয়ে এসে রাখতে পারবে।

রওনা হয়ে গেল সে।

গোপন আস্তাবলে পৌঁছে ঘোড়া বদল করে নিল জাভেদ। কাছেই একটা ঘোড়ার পায়ের ছাপ দেখে সে বুঝল তুষার পড়ার পরে জিকো এসেছিল এদিকে। চিহ্ন দেখে অনুসরণ করে এগিয়ে চলল জাভেদ। বিকেল হয়ে আসছে। জিকো আর জেনির ক্যাম্পের কাছাকাছি আসতেই রাইফেলে গুলি ভরার শব্দে একেবারে আড়ষ্ট য়ে দাঁড়াল সে। ভয় নেই, আমি, চিৎকার করে জানাল জাভেদ।

সেটা নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছি, স্যান্ডির গলা শোনা গেল। রাইফেল হাতে দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বেরিয়ে এল সে। এসো, এসো, সবাই তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে।

লাগাম টেনে ঘোড়া ঘুরিয়ে নিয়ে ছুট লাগাবে কিনা একবার ভাবল জাভেদ। ওর দুপাশেই উঁচু পাহাড়, ছুটে পালাবার বিশেষ সুযোগ নেই। ঠাণ্ডায় জমে অবশ হয়ে আছে ওর হাত, নইলে পিস্তল বের করার চেষ্টা করতে পারত সে। ডান হাতের আঙুলগুলো বগলে চেপে ধরে গরম করে নেওয়ার চেষ্টা করল জাভেদ। সময় আছে এখনও, সুযোগও নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। যতক্ষণ পিস্তল আছে ওর কাছে, সুযোগ থাকবে।

গুহাটার মধ্যেই রয়েছে ওরা। ম্যাটকে চিনতে পারছে সে, ওর পাশে বার্টকেও দেখা যাচ্ছে। কোন সন্দেহ নেই, ফাঁদে ধরা পড়েছে সে।

জিকো বসে আছে গুহার দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে। ওর হাত দুটো পিছমোড়া করে বাঁধা। জেনিও রয়েছে ভিতরে, ওর হাত ভোলাই রয়েছে-রান্নায় ব্যস্ত সে

আমি মনে মনে দোয়া করছিলাম যেন তুমি ফিরে না আস, বলল জিকো

বাইরে খুব ঠাণ্ডা, আড়ষ্টভাবে ঘোড়া থেকে নেমে দাঁড়াল জাভেদ। বেশ বরফ পড়েছে।

জাভেদ, বাধা দিয়ে বলে উঠল ম্যাট। পশুদের খাবার কোথাও লুকিয়ে রাখা আছে তোমার-আমি জানতে চাই সেটা কোথায়?

বলব না আমি।

দাঁত বের করে কুৎসিত হাসি হাসল স্যান্ডি। ম্যাট, আমার হাতে ছেড়ে দাও ওকে, এক মিনিটে সব কথা বের করে নেব।

চোখ তুলে ওকে একবার দেখল জাভেদ। সে সাধ্য নেই কারও, বলল সে। আমার কাছ থেকে হাজার চেষ্টা করেও কিছুই জানতে পারবে না।

উত্তরে কী যেন বলতে যাচ্ছিল স্যান্ডি, কিন্তু বিরক্তভাবে তাকে বাধা দিয়ে ম্যাট বলে উঠল, আমার আর করার কিছু নেই, জাভেদ, তোমার খেলা আর বাহাদুরি শেষ। তুমি যদি সহযোগিতা করো তবে হয়তো আমি ওদের অনুরোধ করতে পারি কিন্তু তা না হলে বুঝতেই পারছ! তোমার মৃতদেহ উত্তরের যে কোন একটা নির্জন ক্যানিয়নে ফেলে আসার নির্দেশ দেয়া হয়েছে আমাদের।

একজন অতিথি এসেছিল এখানে, মন্তব্য করল জিকো।

তুমি চুপ করো! ধমকে উঠল স্যাভি।

জেনি আন্দাজ করল কথাটা জাভেদের জানা দরকার। আগুনের পাশ থেকে মুখ তুলে সে বলল, সে বলে গেছে আবার আসবে।

খেপে উঠল স্যান্ডি, তুমিও চুপ করো! পটপট কোরো না তুমি।

আড়চোখে স্যান্ডির দিকে চাইল ম্যাট। যথেষ্ট হয়েছে এবার থামো স্যান্ডি কোন ভদ্রমহিলার সাথে এভাবে কথা বলা তোমার উচিত নয়।

কে ভদ্রমহিলা? মুখের উপর জবাব দিল সে। ওই ছুঁড়ীটা? ও তো…’

কথা শেষ হলো না স্যান্ডির। আগুন থেকে একটা জ্বলন্ত কাঠ তুলে নিয়ে বাড়ি কষাল জেনি। লাফিয়ে পিছনে সরে গেল স্যান্ডি। কিন্তু তার আগেই গনগনে আগুনের বাড়ি পড়ল ওর মুখের উপর। আঘাত খেয়ে টলে উঠে পড়ে গেল স্যান্ডি। পোড়া গাল চেপে ধরে যন্ত্রণায় চিৎকার করছে সে।

উঠে দাঁড়াল জেনি। আমি তোমার জন্যে রান্না করে দিতে রাজি আছি, কিন্তু তাই বলে ওই ধরনের মন্তব্য সহ্য করতে রাজি নই।

দুহাতে মুখ চেপে ধরে ককাচ্ছে স্যান্ডি। সেদিকে একবার চেয়ে ম্যাট বলল, ঠিক আছে, তোমার রান্না তুমি দেখো।

আগুনের ধারে ফিরে গিয়ে রান্নার হাঁড়িটা নেড়েচেড়ে ভাল করে পাথরের টুকরোগুলোর উপর বসিয়ে নিল সে শক্ত করে। তারপর বলল, লুইস এসেছিল। সে জানিয়েছে যে চার্লি আর সে লোমা কয়োটিতে আছে।

হঠাৎ চোখ দুটো সতর্ক হয়ে উঠল ম্যাটের। কী নাম বললে? লুইস ডিকেনসন? রেঞ্জার ছিল যে?

এক সময়ে রেঞ্জার ছিল সে, ব্যাখ্যা দিল জাভেদ। আমার সাথেই কাজ করত, কিন্তু কাজ ছেড়ে দিয়ে একটা ব্যক্তিগত ঝগড়ার নিষ্পত্তি করতে গিয়েছিল।

ওরা এখানে কী করছে?

আমার বন্ধু ওরা। বললাম না, আমিও একসময়ে রেঞ্জার ছিলাম। আমি ট্যাসকোসার রেঞ্জারদের কাছে একটা চিঠি দিয়েছিলাম কয়দিন আগে

জাভেদ বুঝতে পারছে ব্যাপারটা ম্যাটের ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। গুহার মুখে জাভেদের ঘোড়ার কাছে দাড়িয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে চেয়ে রইল সে কয়েক মিনিট। এক কোণে বসে দুহাতে মুখ ঢেকে এখনও গোঙাচ্ছে স্যান্ডি।

ম্যাটের অজানা নেই, রেঞ্জাররা পরস্পরের আপদে বিপদে কেমন একজোট হয়ে সাহায্য করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর লুইস প্রসিদ্ধ লোক। রাইফেলে ওর অব্যর্থ নিশানার কথা কারও অজানা নেই। এ ছাড়াও পেজরা যাদের সাথে ঝগড়া আর মারপিট করে টেক্সাস ছেড়েছে, লুইস ওদের চাচাতো না মামাতো ভাই হয়। সে ওদের অনুসরণ করেনি তো? নাহ, ব্যাপারটা মোটেই ভাল ঠেকছে না ম্যাটের।

চার্লি কে? প্রশ্ন করল সে।

সে-ও আমার বন্ধু। বৎসর দুই আমরা একসাথেই ছিলাম। ও যদি এখানে আমাকে খুঁজে না পায় তুলকালাম কাণ্ড বাধাবে সে।

মোটে দুজনে আর কী করবে? নীনার দলের একজন বলে উঠল

ওদের যে-কোন একজনই তোমাদের সবার চামড়া ছিলে দরজার সাথে লটকে রাখতে পারবে-তাতে ওদের বিন্দুমাত্র ঘামও ঝরবে না, বলল জাভেদ।

যতই ভাবছে পরিস্থিতি ততই জটিল হয়ে উঠছে বলে মনে হচ্ছে ম্যাটের। নীনা পেজকে সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছিল সে, তার উপর এসে জুটল অ্যালেক। সে আসার পর থেকেই ওদের ঝামেলার আর শেষ নেই-নিত্য নতুন ঝামেলা লেগেই আছে

তুষারপাত আরম্ভ হয়ে গেছে, এখন পশুগুলোর খাবার জোটানো আর এক মাথা-ব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাভেদের শীতের জন্য জমানো খাবারগুলো ব্যবহার করতে না পারলে ওদের পশুগুলো একে একে সব অনাহারে মরবে। এতসবের উপর আবার জুটছে ওই রেঞ্জার দুজন।

ওরা যদি ফিরে আসে তবে ওদের খুন না করে কোন উপায় থাকবে না ম্যাটদের, কারণ ওরা এমন সব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবে যার জবাব ওরা দিতে পারবে না।

বর্তমান লড়াইয়ের কথা জানে ওরা? জিকোকে জিজ্ঞেস করল ম্যাট।

অবশ্যই, এই ব্যাপারেই এসেছিল ওরা, জবাব দিল জিকো

সেরকমই আন্দাজ করেছিল ম্যাট। লোমা কয়েটির কথা শুনেছে সে। কয়েকজন লোককে ওখানে পাঠিয়ে ওদের দুজনকে অ্যামবুশ করে মারার ব্যবস্থা করতে পারে সে, কিন্তু তাতে শেষ পর্যন্ত কোনদিকে গড়াবে পরিস্থিতি? খুন করে সমস্যার সমাধান করতে চাইলে খুনের সংখ্যাই কেবল দিনদিন বেড়ে যায়ে, সমস্যার সমাধান আর হয় না। বাইরের ঘনিয়ে আসা অন্ধকারের দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে বিরক্ত ভাবে গাল বকল সে। অ্যালেকের সাথে তার একটা বোঝাপড়া করার সময় ঘনিয়ে এসেছে। কিন্তু সেটাও তার পক্ষে প্রীতিকর কোন ঘটনা হবে না।

ম্যাটের প্রতি নির্দেশ আছে জাভেদকে খুঁজে বের করে খুন করে একেবারে গুম করে ফেলতে হবে। এমনভাবে গুম করতে হবে যেন তাকে কেউ কোনদিন। খুঁজে না পায়। কাজটা তার পক্ষে এখন খুবই সোজা, জাভেদ এখন তার হাতের মুঠোয়। কিন্তু লুইস আর চার্লির মত লোককে নিয়েই ঝামেলা-জাভেদকে হত্যা করলে আরেকটা বিবাদের সৃষ্টি হবে। সেটা আবার কতদিন চলবে কেউ বলতে পারে না। এতসব ঝামেলা নিয়ে কীভাবে মানুষ শান্তিতে খামার করতে পারে? তা ছাড়া এমন জায়গায় কেউ লাভজনকভাবে র‍্যাঞ্চ চালায় কীভাবে? জাভেদ অবশ্য বলে এটা সম্ভব, কিন্তু এ পর্যন্ত সে যা দেখেছে তাতে জাভেদ যে কী করে এখানে র‍্যাঞ্চ চালাচ্ছে তা ভাবতেই অবাক লাগে তার।

খাবারের প্রথম প্লেটটা জাভেদকে দিল জেনি। দ্বিতীয়টা দিল জিকোকে। জিকোর সামনে প্লেট নামিয়ে রেখে শান্তভাবেই তার হাতের বাধন খুলতে শুরু করল সে।

জিকো হাতের কজি দুটো ডলতে ডলতে আড়চোখে জাভেদের দিকে চাইল। নীরবে বসে আছে জাভেদ। বার্ট কোলের উপর রাইফেলটা আড়াআড়ি রেখে বসেছে। গুহার মুখের কাছ থেকে ফিরে এসে জেনিকে ধন্যবাদ জানিয়ে ওর হাত থেকে খাবারের প্লেটটা নিল ম্যাট। গম্ভীর মুখে প্লেটের খাবারের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে খাওয়া শুরু করল সে।

জাভেদকে নিরস্ত্র করা হয়েছে বটে, কিন্তু তার অস্ত্রগুলো তার কাছেই দেয়ালের পাশে রাখা হয়েছে। জাভেদ যেন ওগুলো নেওয়ার চেষ্টা করে সেইজন্য হয়তো স্যান্ডি ইচ্ছে করেই ওর বেশ কাছে ফেলে রেখেছে অস্ত্রগুলো। স্যান্ডির প্রতিটি চাল চলনেই জাভেদের মৃত্যু লেখা আছে বুঝতে পারছে জাভেদ। আসলে ওকে মারা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প উপায়ও খোলা নেই ওদের। খুব সাবধানে নড়াচড়া করছে সে, সবসময়েই হাত দুটোকে সে ওদের চোখের সামনেই রাখছে। খেতে খেতে এখান থেকে পালাবার একটা উপায় ভেবে বের করার চেষ্টা করছে। বোকার মত চুপচাপ বসে থাকলে তার পরিণতি যে কী হবে তা খুব ভাল করেই বুঝতে পারছে জাভেদ।

উত্তরের ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। জাভেদ বলল, এই রকম হাওয়া বইতে থাকলে তুষারের তৃপ জমবে আর তোমাদের গরু-মহিষগুলো না খেতে পেয়ে মারা পড়বে।

চেহারা বেজার করে জাভেদের দিকে চাইল ম্যাট, র‍্যাঞ্চের মানুষকে ওকথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার দরকার পড়ে না। কোন মন্তব্য করল না সে।

জাভেদ তার খাওয়া শেষ করে আরও কফি খেল, তারপর তামাক বের করে সিগারেট বানাতে আরম্ভ করল। ওর হাত বাঁধা হোক এটা চাইছে না সে, সম্ভব হলে জিকোর হাত দুটোও ছাড়াই দেখতে চায় সে, তাই ম্যাটকে কথায় ব্যস্ত রাখতে চাইছে ও। শোনো, ম্যাট, বাতাসের সাথে তোমাদের পশুগুলো যেদিকে যেতে চায় যেতে দাও-ওদের পিছু পিছু তোমরাও বিদায় নাও। এই লড়াই করে কী লাভ হবে তোমাদের? তোমরা যদি আমাদের সবাইকে মেরেও ফেলো তবু হেরে যাচ্ছ তোমরা। তোমরা এত জলদি পশুর খাবারের ব্যবস্থা কিছুতেই করতে পারবে না, সে-কথা তুমি নিজেও ভাল করেই জানো।

একটু থেমে সিগারেটটা বানানো শেষ করে ঠোঁটে লাগাল জাভেদ। আড়চোখে চেয়ে দেখল সে সবচেয়ে কাছে যে পিস্তলটা রাখা আছে, সেটাও তার নাগালের বাইরেই। স্যান্ডি খাচ্ছে না, কাছেই বসে নিজের মুখে চর্বি ঘষছে। ওর উপর ঝাপিয়ে পড়ে হয়তো ওর পিস্তলটা কেড়ে নিতে পারবে জাভেদ-কিন্তু তাতে ঝুঁকি অনেক বেশি।

আমার বন্ধু দুজন ঠিকই ফিরে আসবে আবার, জানি আমি। তারা সরাসরি এসে ফাঁদে পা দেবে না। প্রচণ্ড লড়াই হবে আশা করেই আসবে ওরা, আর তার জন্য তৈরি হয়েই আসবে।

তুমি হয়তো জানো, লোমা কয়োটিতে এই দেশের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আর দুঃসাহসী আট দশজন যোদ্ধা আছে, তোমাদের গরু-মহিষের ভাগ পাবে জানতে পেলে ওরাও আসবে সবাই লুইস আর চার্লির সাথে।

জিম হারভিকে চেনো? টেনেসির লোক। সে-ও এখন লোমা কয়োটিতেই। জিকোকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারো রাইফেলে দুর্দান্ত ওস্তাদ লোক সে। জিকোর ঘনিষ্ঠ বন্ধু-এই লড়াইয়ে যোগ দেওয়ার জন্য সে এক পায়ে খাড়া হয়ে আছে। নিজেই বুঝতে পারছ তোমাদের কিছু পশু যদি শীতের শেষে বেঁচেও থাকে, ওরা খেদিয়ে নিয়ে যাবে সব।

আরও কথা আছে, ম্যাট; তোমাদের পশুগুলোর মার্কা যেন কেমন গোলমেলে। কেউ যদি ওগুলোর একটার ছাল ছাড়িয়ে উল্টো দিক থেকে মার্কা পড়ার চেষ্টা করে তখন কী মার্কা দেখা যাবে কে জানে?

চুপ করো! রাগের মাথায় ধমকে উঠল ম্যাট। বড় বেশি বাজে বকছ তুমি!

আমি চুপ করাচ্ছি, বলল স্যান্ডি। তুমি কেবল একবার বললেই হয়-একেবারে চুপ করিয়ে দেব আমি ওকে, ফোলা ফোলা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বিকৃত শোনা গেল ওর কথাগুলো।

আগুন জ্বলছে গুহার ভিতর পুরো মাত্রায়। বাইরে অবিরাম তুষারপাত চলেছে। এই অবস্থায় পালিয়েও লাভ নেই, সহজেই অনুসরণ করে ধরে ফেলবে ওরা। পালালে এমন ভাবে পালাতে হবে যেন ওরা টের পাবার আগেই পায়ের চিহ্ন তুষারে ঢাকা পড়ে যায়। অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই এখন। পাথরে হেলান দিয়ে আরাম করে বসল জাভেদ। জিকো প্রায়ই বলে, সত্যিকার ইন্ডিয়ানের মতই ধৈর্য তার। একটা ফন্দি এসেছে ওর মাথায়–জিকোর কথা ঠিক কিনা তার প্রমাণ শিগগিরই পাওয়া যাবে

আগুনের আলো কেঁপে কেঁপে খেলছে ওদের মুখের উপর। রাইফেলের নল আর বেল্টের চকচকে ধাতুর উপর প্রতিফলিত হচ্ছে আগুনের আলো। বাইরে নিঃশব্দে ঝরছে তুষার। বিষণ্ণভাবে আগুনের দিকে চেয়ে বসে আছে ম্যাট। ওর ওই অভ্যাসটা খেয়াল করল জাভেদ। কেউ আগুনের দিকে চেয়ে থাকলে হঠাৎ করে অন্ধকারের দিকে চেয়ে সে কিছুই দেখতে পাবে না-অন্তত কিছুক্ষণ তো বটেই, এরচেয়ে বেশি আর কী চাই?

ওরা যদি এখনও জাভেদের লুকানো পশুর খাবার খুঁজে না পেয়ে থাকে, তবে আর ভবিষ্যতে যে পাবে এমন আশা কম। গিরিপথগুলো এখন তুষারে বন্ধ হয়ে থাকবে। জাভেদ জানে কোথায় বেশি তুষার জমে, আর কোন পথে ওখানে পৌঁছা’নো যায়। এই চার বৎসরে দক্ষ জেনারেলের মত সবকিছু লক্ষ করেছে, আর সেগুলো কাজেও লাগাচ্ছে সে।

বার্ট দেয়ালে হেলান দিয়ে ওর ঘোড়ার জিনটাকে বালিশ বানিয়ে আরাম করে বসেছে। সামান্য নাক ডাকছে তার মাঝে মাঝে। স্যান্ডি আহত কুকুরের মত জেনির দিকে চেয়ে আছে নীরবে। জাভেদ আগুনে একটা সরু কাঠ গুঁজে দিয়ে ওটার দপ করে জ্বলে ওঠা দেখল। সে আন্দাজ করে নিয়েছে, তাকে খুঁজে বের করে খুন করার নির্দেশ ম্যাটকে দেওয়া হলেও সেটা কার্যকর করার মত মানসিকতা বা সাহস কোনটাই ওর নেই। বিশাল লোকটা ভাল পশুপালক, লড়াইয়ে সে হয়তো মানুষ হত্যা করতেও কুণ্ঠিত হবে না, কিন্তু ঠাণ্ডা মাথায় কাউকে মারতে সে পারবে না। খুনী নয় সে।

এক্ষেত্রে পালাতে চেষ্টা করলে মারা পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। এত কাছে থেকে গুহার মধ্যে গোলাগুলি চললে যে কেউ মারা পড়তে পারে। জেনিও বিপদের মুখে থাকবে। ওর হাতে জ্বলন্ত কাঠের বাড়ি খেয়ে খেপে আছে স্যাভি। সুযোগ পেলে ছাড়বে না সে।

একটানা তুষার পড়েই চলেছে। জাভেদ বুঝছে সারারাত এমন তুষার পড়লে ওদের পক্ষে এই ক্যানিয়ন ছেড়ে বেরুনো অসম্ভব না হলেও খুব কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

বাতাসের একটা ঝাঁপটা এসে ঢুকল গুহার ভিতরে। আগুনের একটা ফুলকি বাতাসে ঘোড়ার খাবারের ছালার কাছে উড়ে গিয়ে পড়ল। উঠে আগুনটা নিভিয়ে ফেলল জিকো। রাত গভীর হয়েছে।

অস্থির হয়ে উঠে গুহার মুখে গিয়ে দাঁড়াল ম্যাট। বাইরে অন্ধকারের দিকে চেয়ে সে জিজ্ঞেস করল, এই ক্যানিয়নে তুষার কত ফুট পর্যন্ত গভীর হয়?

এখানে? কাঁধ ঝাঁকাল জাভেদ। এই রকম তুষারে মাঝে মধ্যে বাতাসে ঠেলে আট-দশ ফুট উঁচু পও তৈরি করে ফেলে, তবে সাধারণত এর চেয়ে কমই হয়। শীতকালে বিশ ফুট পর্যন্ত তুষারের তৃপও জমে। এ ছাড়া পাহাড়ের চূড়া থেকে বড় বড় ধসও নামে।

ক্লান্ত দেহে পাথরের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে গা এলিয়ে দিল জাভেদ। দেহ ক্লান্ত হলেও মনটাকে সজাগ রেখেছে সে, এই পরিস্থিতিতে মনটাকে সক্রিয় রাখতেই হবে তার। জিকো জেগে আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। ইন্ডিয়ান ইঙ্গিতে জাভেদ জানাল এখন বিশ্রাম নেবে সে। জিকোকে সামান্য মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানাতে দেখল জাভেদ। নিশ্চিন্ত হয়ে নড়েচড়ে আরাম করে ঘুমাবার জোগাড় করল সে। চোখ বোজার আগে অস্ত্রগুলোর অবস্থান আর একবার ভাল করে দেখে নিল ও

আগুন থাকা সত্ত্বেও ভিতরটা খুব ঠাণ্ডা। গুহাটা বেশি গভীর নয়। গাছ আর গুহার ছাদের তলায় জায়গাটা কিছুটা আড়াল পেলেও বাতাস বাগ মানছে না। বারবার ঝাঁপটা মেরে ওদের কাপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। কম্বলের তলায় গুটিসুটি মেরে ঘুমাচ্ছে জাভেদ, আর মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে উঠে বাইরে বাতাসের শব্দ আর আগুনে কাঠ পোড়ার পটপট আওয়াজ শুনছে কান পেতে। থেকে থেকে জিকোর শুকনো ডাল ভেঙে আগুনে দেওয়ার শব্দও কানে আসছে তার। কেউ বলে না দিলেও আগুনটাকে জিইয়ে রাখার দায়িত্ব নিজের কাঁধেই নিয়েছে জিকো। কেউ এতে আপত্তিও করেনি। আসলে সাহায্য করাটা ওর মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, এই অছিলায় নিজের কিছুটা স্বাধীন চলাফেরার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে নিচ্ছে সে-সময়ে এটা কাজে লাগতে পারে তার।

একটুও ঘুমায়নি ম্যাট। কিছুক্ষণ বসে আগুনের দিকে চেয়ে, আর বাকি সময় পায়চারি করে সময় কাটাচ্ছে সে। ওর অস্বস্তিটা উপলব্ধি করতে পারছে জাভেদ, তিন হাজার আধপেটা পশুর দায়িত্ব ওর কাঁধে। খিদের জ্বালায় ওরা যে-কোন দিকে হাঁটা ধরতে পারে।

আড়চোখে জেনির দিকে চাইল জাভেদ। কাছেই ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে জেনি। ঘুমাচ্ছে না। বড় বড় নীল চোখে ওর দিকেই চেয়ে আছে। ওর দিকে চোখ রেখেই কম্বলের তলায় হাত দিয়ে কী যেন সরাল জেনি। কম্বলের ফাঁকে পরিষ্কার একটা পিস্তলের বাঁট চোখে পড়ল জাভেদের। ওর হাত সাথে সাথেই আবার অদৃশ্য হলো কম্বলের নীচে।

একটা পিস্তল!

সাবধানে চিন্তা করছে জাভেদ। জেনি যে কেমন করে কখন ওটা জোগাড় করেছে জানে না সে, কিন্তু এতেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে জেনিও সক্রিয়ভাবে চিন্তা করছে পালাবার কথা। ওই পিস্তলটা তার দরকার কিন্তু ঠিক সময়ে, জায়গা মত পেতে হবে তাকে ওটা। এখনকার মত জেনির কাছেই ওটা নিরাপদ থাকবে, কারণ ওকে সার্চ করার সম্ভাবনা কম।

আবার ঘুমাতে চেষ্টা করেও কিছুতেই আর ঘুম এল না জাভেদের। তার ভেড়ার চামড়ার ওভারকোটটা গায়ে চাপিয়ে নিল সে। তুমি একটু ঘুমিয়ে নাও, জিকো, বলল জাভেদ। আমি আগুনটা দেখছি।

ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখে স্যান্ডি লক্ষ করছে ওকে। ওর মুখটা কাঠের আঘাতে ফুলে ফোস্কাসহ একটা বিকট আকার ধারণ করেছে। চামড়ায় টান লেগে অসহ্য যন্ত্রণা হবে এই ভয়ে মুখের ভাব পরিবর্তন করতেও ভয় পাচ্ছে সে।

আগুনে দেওয়ার মত কাঠ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। জাভেদ তার গ্লাভস্ পরে নিয়ে গুহার মুখের কাছে এসে একটু থেমে বাইরে পা বাড়াল। পিছন দিক থেকে নড়াচড়ার সাথে সা: পিস্তল কক্ করার শব্দ কানে এল তার। সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব দেখিয়ে সহজ ভাবেই সে শুকনো বড় গাছের ডালটা থেকে ছোট শাখাগুলো ভাঙতে শুরু করল। বড় ডালটা জাভেদই গুহার মুখে টেনে এনেছিল।

এটাই একমাত্র উপায় বলে মনে হয়েছে জাভেদের। দুজন ঘুমাচ্ছে, বাকিজন যদি একটু অন্যমনস্ক হয়-একটা সুযোগ করে নিতে পারবে সে। পালালে যদিও কোন অস্ত্র সাথে থাকবে না তার, কিন্তু তাতে ক্ষতি নেই। তার কেবিনের পাশের মেসাতে একটা রাইফেল আর তিনটে পিস্তল লুকানো আছে। স্যান অ্যান্টোনিও উপত্যকার কাছে আর এক জায়গায় লুকানো আছে একটা রাইফেল আর একটা বন্দুক। দু’জায়গাতেই যথেষ্ট খাবারও লুকানো আছে।

জাভেদ নিজে পালাতে পারবে এই উপায়ে। কিন্তু জেনির কী হবে? ম্যাট যতক্ষণ আছে স্যান্ডি রাগে ফুসলেও জেনির গায়ে হাত তোলার সাহস পাবে

কিন্তু কোন কারণে ম্যাট কোথাও গেলে তখন কী হবে? তখন কে ঠেকাবে স্যান্ডিকে?

পরিস্থিতি বিবেচনা করে সত্যিই সমস্যায় পড়ল জাভেদ। আবার নতুন করে সমস্যাটা নিয়ে ভাবতে শুরু করল সে। এতক্ষণ তার বিশ্রামের দরকার ছিল, নিজেদের অবস্থাটা ভাল করে বুঝে নেওয়ার দরকার ছিল। দুটোই হয়ে গেছে, এখন যত জলদি এখান থেকে পালানো যায় ততই মঙ্গল। ম্যাট নিজেই স্বীকার করেছে জাভেদকে খুন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ওকে। নিজে না পারলেও অনায়াসে সে ভোরবেলা স্যান্ডির উপর কাজ শেষ করার ভার দিয়ে নিজের ঘোড়ায় চেপে কেবিনে ফিরে যেতে পারে। বগলে করে অল্প কিছু কাঠ নিয়ে ভিতরে ফিরে এল জাভেদ।

ভোর হয়ে আসছে। শিগগিরই দিনের আলো ফুটবে। এখনও তুষার পড়ছে। ঘোড়া বা খাবার সাথে নেওয়ার কোন সুযোগ পাবে না ওরা, কাজেই সবচেয়ে কাছের ক্যাম্পটায় পৌঁছতে হবে তাদের সবচেয়ে প্রথম। এই তুষারের ভিতর তুষারের জুতো পরে পায়ে হেঁটেই ঘোড়ার চেয়ে তাড়াতাড়ি চলা সম্ভব।

স্নো-শু।

এগুলো নিজেই তৈরি করে নেওয়া যায়। অনেক আগে এক বুড়ো ইন্ডিয়ান তাকে শিখিয়েছিল কী করে ওই জুতো বানাতে হয়। ওই জুতো ঠিক তাড়াতাড়ি চলার জন্য নয়, তুষারে যেন মানুষ ডুবে না যায় সেই জন্য।

প্রথমে ওদের খুব জলদি পথ চলতে হবে, অন্তত ক্যানিয়নটা পার না হওয়া পর্যন্ত। ক্যানিয়নের নীচে প্রায় চার ফুট মত তুষার জমেছে-কোন কোন জায়গায় আরও বেশি। ঘূর্ণি হাওয়া কিছু জায়গায় বেশি তুষার নিয়ে জমিয়েছে। যাওয়ার সময়ে দ্রুত আর নির্দিষ্ট পথে চট করে সরে যেতে হবে ওদের।

আগুনের কাছে বসল জাভেদ। হাত দুটো আগুনে গরম করছে সে। বাম হাতের তালু নীচের দিকে করে হাত বাড়িয়ে আগুনের দিকে আরও নীচে নামাল ও। ডান হাত দিয়েও ঠিক একই ভঙ্গি করল, তারপর বাম হাতে আবার তাই করল। যে-কোন সাধারণ লোকের চোখে মনে হবে যে জাভেদ হাত সেঁকছে-কিন্তু আধা ইন্ডিয়ান জিকোর কাছে এর মানে ইন্ডিয়ান সঙ্কেত: হাটো।

এক মিনিট পরেই সে আবার হাতের তালু উপরের দিকে করে তিন আঙুল দেখিয়ে অন্য হাতে জামার হাতাটা উপরের দিকে টানল।

আগুনের উল্টোদিকে বসা জিকোকে দেখে মনে হচ্ছে আধো ঘুমের মধ্যে রয়েছে সে। চোখের কোণ দিয়ে জেনির দিকে চাইল জাভেদ। ওর দিকেই চেয়ে ছিল জেনি, চোখাচোখি হতেই সামান্য মাথা ঝাঁকাল সে। জাভেদ ভাবতেও পারেনি জেনিও ইন্ডিয়ান সঙ্কেতের অর্থ বুঝতে পারবে। নিশ্চয়ই জিকোর কাছ থেকেই এসব শিখেছে মেয়েটা ছেলেবেলায়।

হঠাৎ ম্যাট গুহার মুখের কাছে এগিয়ে গিয়ে বাইরেটা ভাল করে দেখে নিয়ে বলল, বরফ পড়া থামার কোন লক্ষণ দেখি না। তুষারপাত থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করার মত খাবারও নেই আমাদের কাছে। জাভেদের দিকে ফিরে সে জিজ্ঞেস করল, এখান থেকে তোমার র‍্যাঞ্চ কতদূর?

সরাসরি দক্ষিণে আট মাইল মত হবে।

খুব ঠাণ্ডা পড়েছে, একদিন চলার মত খাবারও নেই আমাদের সাথে, সবাই মিলে মরার জোগাড় হচ্ছে।

ঠিক তাই, যত দেরি করা যাবে ওই তুষার ততই পুরু হবে, আর এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া আরও অসম্ভব হয়ে উঠবে। কে জানে, হয়তো এখনই তা অসম্ভব হয়ে উঠেছে, জবাব দিল জাভেদ।

আট মাইল আর কী এমন পথ? মন্তব্য করল স্যান্ডি। উল্টোভাবে হাতে হেঁটেই ওই পথ পার হওয়া যায়।

ওর কথাকে কোন পাত্তা না দিয়ে জাভেদ ম্যাটকে উদ্দেশ্য করে বলল, কোন কোন জায়গায় তুষার জমে গাছের নিচু ডালের সমান উঁচু হয়ে গেছে এরমধ্যেই। তুষার উড়িয়ে নিয়ে তূপ করে ফেলার জন্যে বেশি বাতাসের দরকার হয় না এখানে।

আমিই যাব, বলে উঠল ম্যাট। আমার ঘোড়াটাই সবচেয়ে ভাল আর তেজী, চেষ্টা করলে আমি যেতে পারব।

জেনির দিকে চেয়ে রয়েছে স্যান্ডি। তার চোখে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছে। ম্যাট চলে গেলে স্যান্ডিই হবে নেতা। প্রথমেই জাভেদ আর জিকোকে মেরে ফেলবে সে। তারপর…। জাভেদ ওর চিন্তাগুলো স্পষ্ট পড়তে পারছে ওর মুখ দেখে। ম্যাট আর ওদের চোখের দিকে চাইতে পারছে না দেখে আরও বুঝতে পারছে যে ম্যাটও একই কথা ভাবছে।

হ্যাঁ, একটা কথা বলছি, হয়তো শিগগিরই নিজেরাও টের পাবে, তোমরা যে ছোট টার্টু ঘোড়া ব্যবহার করো টেক্সাসে, সেগুলো এখানে তুষারে একেবারেই অচল। এখানে দরকার শক্ত হাড় আর সবল পেশীওয়ালা মন্টানা ঘোড়া

আমাদের যা আছে তাতেই কাজ চালিয়ে নেব আমরা, জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে নিজের ঘোড়া আনতে বেরিয়ে গেল ম্যাট।

একটু পরেই ঘোড়ার লাগাম ধরে টানতে টানতে ওটাকে গুহার মধ্যে নিয়ে এল সে। ওর পিঠের উপর থেকে বরফ ঝেড়ে ফেলে একটা কম্বল বিছিয়ে জিন চাপাল। কম্বলটা গরম করে নেওয়ার কথা মনে পড়েনি ওর। ঘোড়াটা অস্থির ভাবে লাফালাফি শুরু করল। স্যান্ডির সাহায্য নিয়ে কোনমতে ঘোড়াটাকে জোর করে ধরে শান্ত করল ম্যাট।

ওর পিঠে কম্বলটা বিছাবার আগে ওটা একটু গরম করে নেয়া উচিত ছিল, মন্তব্য করল জাভেদ। রাগের সাথে ঘুরে দাড়াল ম্যাট।

বেশি জ্ঞান দান করার অভ্যাস তোমার, ব্যঙ্গ করে বলল সে। যেন তুমি ছাড়া আর কেউ কোনদিন খামার চালায়নি!

চালাবে না কেন? তবে কথা হচ্ছে, কেউ শেখে, কেউ শেখে না, হাসি মুখেই জবাব দিল জাভেদ

ওর মনে হলো যেন রাগের চোটে ওকে মারতে আসবে ম্যাট। বিশাল দেহ লোকটা এক পা এগিয়ে এসেছিল ওর দিকে। হাসি মুখে ম্যাটের দিকে চোখ তুলে চাইল সে। একমুহূর্ত জাভেদের দিকে কটমট করে চেয়ে নিজের ঘোড়ার কাছে ফিরে গেল ম্যাট।

একটা কথা কি জানো, ম্যাট? আমরা দুজনে একই পক্ষে কাজ করলে বেশ মিলত আমাদের।

কোন জবাব দিল না ম্যাট-ঘুরেও তাকাল না। জাভেদ নিচু স্বরে আবার বলল, ভাবছি নিজের বিবেককে কী জবাব দেবে তুমি। আজ রাতে শান্তিতে ঘুম হবে তো তোমার?

কথাটা শুনে কাজ করতে করতেই একমুহূর্ত একেবারে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ম্যাট। যখন ঘুরল, জাভেদ দেখল ওর মুখটা একেবারে সাদা হয়ে গেছে। জাভেদের দিকে ইচ্ছে করেই আর চাইল না সে, সোজা ঘোড়ায় উঠে স্যান্ডিকে বলল, তুমি আর বার্ট থাকো এখানে। আমি গিয়েই কিছু খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি। তোমাদের এখান থেকে বেরুবার পথ করার জন্যেও লোক লাগিয়ে দেব আমি, ওরা তোমাদের জন্য পথ করে দেবে। আর বন্দীদের ওপর নজর রেখো।

নিশ্চয়ই! দাঁত বের করে হাসল স্যান্ডি। নজর রাখব আমি। আদর যত্নের কোন ত্রুটি হবে না, অ্যালেক স্পষ্টই বলেছে ওদের কতটা যত্ন নিতে হবে।

আর কথা না বাড়িয়ে তুষারের মধ্যেই রওনা হয়ে গেল ম্যাট। পাহাড়ের সরু ধার ধরে কিছুদূর গিয়ে কিছুটা সমতল জায়গা, ওখানে তুষার বেশি গভীর নয়। একশো গজ যাওয়ার আগেই সে টের পেল অনেক ঝামেলা পোহাতে হবে তাকে।

ঘোড়াটা ধারের বাইরে পা দিয়ে হঠাৎ পেট পর্যন্ত ডুবে গেল তুষারের ভিতর। আরও নীচে ঢুকে যাচ্ছে। বেপরোয়া ভাবে লাফিয়ে তোলপাড় করে কোনমতে ওই সমান জায়গাটায় পৌঁছল ঘোড়া। লাগাম টেনে ঘোড়া থামিয়ে দক্ষিণে চাইল ম্যাট। এবড়োখেবড়ো কঠিন পথটার দিকে চেয়ে বিরক্তিতে মুখ বাঁকাল। এই প্রথম বারের মত মনে মনে ভয় পেল ও

বাইরে খুব ঠাণ্ডা। গুহার ভিতর ঠাণ্ডাটা ঠিক টের পায়নি সে। বাতাস নেই বটে কিন্তু এরই মধ্যে ঘোড়ার গায়ে তুষার জমে বরফ হয়ে উঠতে আরম্ভ করেছে। ম্যাট বুঝতে পারছে জাভেদ ঠিকই বলেছিল। ঘোড়াটা ছোট, সমতল এলাকার জন্য খুব ভাল হলেও এখানে আসলে দরকার ছিল পেশীওয়ালা বড় ঘোড়া টাট্ট ঘোড়াটার এইসব বড় বড় তুষারের তৃপ পেরিয়ে অনায়াসে চলার শক্তি নেই। অসম্ভব ঠাণ্ডা পড়েছে, এখনও তুষারপাত চলেছে। এই এলাকায় ঠাণ্ডায় মানুষ মরাটাও বিচিত্র কিছু নয়।

কিন্তু ফিরে যাবে না সে। ওই গুহায় যা ঘটতে যাচ্ছে তা দেখার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই ওর। অ্যালেকের ইচ্ছাতেই এমন হতে চলেছে, হয়তো নীনার ইচ্ছাও তাই, কিন্তু সে তো খুনী নয়-অনেকটা পালিয়েই এসেছে সে! স্যান্ডির কথা ভাবছে না ও। দুদিন পর্যন্ত খাবার না পাঠালেও ওদের এমন কোন ক্ষতি হবে না। দুজনের জন্য দুই দিন চলার মত যথেষ্ট খাবার গুহায় আছে।

হঠাৎ পিছন থেকে একটা গুলির শব্দ শোনা গেল। অস্পষ্ট শব্দ, কিন্তু অনেক দূর থেকে এলেও ওটা যে গুলির শব্দ তাতে কোন সন্দেহ নেই। বোঝা যাচ্ছে, মোটেও সময় নষ্ট করেনি স্যান্ডি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *