০৪. নড়ো না অ্যালেন

নড়ো না, অ্যালেন, ক্রোধে তপ্ত কণ্ঠে বলল নেবর। পেট ফুটো করে ফেলব তাহলে!

নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকল জেমস, ঘামতে শুরু করেছে। বোঝা যাচ্ছে ভাল গ্যাঁড়াকলে পড়েছে, সহজে ছাড় পাবে না এদের হাত থেকে। নাকি ঝামেলা একেবারে সেরে ফেলবে? পেছনে ভারী পায়ের শব্দ পেল ও, টের পেল হোলস্টার থেকে পিস্তলটা তুলে নিয়েছে কেউ।

জব্বর গল্প করলে, না? রিক স্যাভেজের ভরাট গলা শোনা গেল পেছনে। অপেক্ষা করতে করতে বিরক্তি ধরে গিয়েছিল আমার। কি এত আলাপ করলে?

লেসলি বলছিল তোমার মাথাটা একেবারেই নিরেট, গোবরে ভরা। আমারও তাই মনে হচ্ছে এখন।

কি বললি হারামজাদা? খেপা সুরে তড়পে উঠল মার্শাল।

তোমরা এখানে এসেছ, লপার জানে? সকালে দেখা করতে বলেছে ও, আমাকে নাকি ডেপুটির একটা তারা দেবে। মারিয়া বার্থেজ তোমার পাছার কোন দিকটা ফুটো করেছে, স্যাভেজ? এ ভুলের জন্যে লপার কিন্তু এবার অন্য দিকটা ফুটো করবে…।

ধাপ্পা দিচ্ছে ও! চাপা স্বরে মন্তব্য করল নেবর।

লপারের মাথা খারাপ হয়েছে আর কি, তোমাকে ডেপুটি বানাবে! অবজ্ঞার সুরে হেসে উঠল দানব। নিঃশব্দ রাত্রিতে শব্দটা জোরাল শোনাল, কিন্তু পরোয়া করছে না ওরা। নেবর, পিস্তলটা ধরে রাখো। আমার হাত নিশপিশ করছে! আগে ওকে আচ্ছামত থোলাই দিয়ে নেই, তারপর দেখা যাবে অন্যকিছু। আমার সাথে বাতচিৎ করার খায়েশ জনমের মত মিটিয়ে যদি না দিয়েছি তো আমার নাম রিক স্যাভেজ নয়!

পেটে চেপে থাকা পিস্তলের নল সরে গেছে, টের পেল জেমস। দূরে গিয়ে দাঁড়াল ডেপুটি, শিথিল হাতজোড়া পড়ে আছে কোমরের পাশে। বেচাল দেখলে গুলি করার জন্যে তৈরি। বিপদসঙ্কেত পেল ও, শিরশির করে উঠল ঘাড়ের পেছনটা। বিস্ময়ের সাথে এবার লক্ষ্য করল পেছন থেকে ওর দুই কবজি চেপে ধরেছে রিক স্যাভেজ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হাতগুলো পিঠের ওপর নিয়ে গেল, চেপে ধরল।

নড়ো না, খতম হয়ে যাবে! শাসাল নেবর।

আতঙ্কিত হয়ে পড়ল জেমস। একটু আগেও ভেবেছিল দানবটার মুখোমুখি হওয়ার সুবাদে একটা কিছু করার চেষ্টা করবে। কিন্তু স্যাভেজ সে-সুযোগ রাখছে না, দড়ি দিয়ে ওর কবজি বেঁধে ফেলেছে। হতাশা বোধ করল ও, অসহায়ভাবে মার খেতে হবে।

দানবীয় একটা উল্লাস শুনতে পেয়ে শক্ত হয়ে গেল ওর শরীর, সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। ঘুসিটা কাঁধ ছুঁয়ে গেল কেবল, কিন্তু সেটাই টলিয়ে দিল ওকে। হুমড়ি খেয়ে পড়তে গিয়েও সামলে নিল নিজেকে, ঘুরে দাঁড়াল।

ততক্ষণে এসে পড়েছে দানব। ব্যাপারটা তাহলে মজাদারই হবে! উচ্ছ্বাস মার্শালের গলায়। একটু-আধটু বাধা না দিলে কি আর জমে? এক পা এগোল সে, ইচ্ছে করেই আঘাত করল না। পিছিয়ে গেল জেমস, পরের আক্রমণটা কিভাবে আসে বোঝার চেষ্টা করছে। এড়িয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই, দুহাত বাধা থাকায় রিক স্যাভেজের বিরুদ্ধে একটা শিশুর মত অসহায় হয়ে পড়েছে ও।

বিশাল কাঠামোটার ওপর চোখ রেখে হাত খোলার চেষ্টা করল জেমস। বিন্দুমাত্র শিথিল হলো না, বরং আরও এঁটে বসল। মনে মনে নিজের দুর্ভাগ্যকে অভিসম্পাত করছে, সত্যি কপালে খারাবি আছে আজ! বিদ্যুৎ গতিতে এল ঘুসিটা, কোন রকমে সরে গিয়ে এড়াল। কিন্তু মোক্ষম জায়গায় লাগল পরেরটা, যেন আধমণী একটা পাথর পড়েছে বুকে। উড়ে গিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল ওর দেহ, শরীর পড়ল হাতের ওপর। জেমসের মনে হলো আগুন ধরে গেছে কবজি আর আঙুলগুলোতে। নির্ঘাত মচকে গেছে।

লাথিটা আসতে দেখে গড়িয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল জেমস, সফল হতে পারল না। পেটে লাগল। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল সব বাতাস। বাতাসের জন্যে হাঁসফাঁস করতে লাগল, খাড়ার ঘা হিসেবে আরেকটা লাথি জুটল। ফের সরে যাওয়ার চেষ্টা করেও শক্তি পেল না।

কোথায় গেল তোমার এত তেজ, অ্যালেন? উল্লাস মার্শালের গলায়, দুহাত দূরে দাঁড়িয়ে হাসছে। উঠে এসো তো, বাছা, পুরুষ মানুষের মত সাহস দেখাও। জেমসকে অনড় দেখে মুখ দিয়ে এমন শব্দ করল যেন দারুণ দুঃখ পেয়েছে। নাহ্, তোমাকে দেখছি ধরে তুলতে হবে। ঝুঁকে এল সে, জেমসের বাকস্কিন শার্ট খামচে ধরে ওকে টেনে তুলে ফেলল।

মরিয়া হয়ে উঠেছে জেমস, মাথা চালাল। এমন কিছু হবে আশা করেনি দানব, বড়সড় নাক থেঁতলে দিল ওর কপাল। লোকটা এত জোরে চেঁচিয়ে উঠল যে কানে তালা লেগে গেল ওর। এখনও ওকে ধরে রেখেছে মার্শাল। সুযোগটা কাজে লাগাল-সর্বশক্তি দিয়ে হাঁটু চালাল। নরম মাংসের সাথে সংঘর্ষের ভোতা শব্দটা তৃপ্তিদায়ক লাগল ওর কাছে। ওকে ছেড়ে দিয়েছে স্যাভেজ। দুহাত আকাশে তুলে পিছিয়ে গেল সে। পড়ন্ত অবস্থায় মার্শালের হাঁটুতে বুট চালাল জেমস, ঠক করে আওয়াজ হলো। মাটিতে শুয়ে পড়ার পর জেমস দেখতে পেল দানবের মুখ হাঁ হয়ে আছে, দুহাতে চেপে ধরেছে দুই উরুর সন্ধিক্ষণ, পড়ে যাচ্ছে হাঁটু ভেঙে। ওর ওপরই।

সরে যাওয়ার চেষ্টা করেও পারল না জেমস, পাঁচমণী শরীরটা আছড়ে পড়ল ওর ওপর। ঠেলে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল, পারছে না। নাক-মুখ ভিজে যাচ্ছে ওর গরম তরলে, সমানে রক্ত বেরোচ্ছে স্যাভেজের নাক থেকে। কিছুক্ষণ পড়ে থাকল ওরা দুজন, ককাচ্ছে মার্শাল। খানিক পর ওর ওপর থেকে সরে গেল সে, হুঁশ ফিরল যেন।

স্যাভেজ? নেবর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

কি হয়েছে, ফ্যাচফ্যাচ করছ কেন? যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠে বিরক্তি প্রকাশ করল স্যাভেজ।

মজা বুঝছ এবার? লোকটাকে ছোট করে দেখেছ তুমি। ওঠো এবার। ওকে নিয়ে কি করবে?

উঠে বসল সে, বার কয়েক মাথা নাড়ল। দুহাতে নাক চেপে ধরে পরে তা চোখের সামনে এনে দেখল। নিজের রক্ত দেখে জ্বলে উঠল ওর চোখ, তীব্র ক্রোধে কঠিন হয়ে গেছে সারা শরীর। এর শেষ দেখে ছাড়ব আমি! খরখরে কণ্ঠে শপথ করল, খোদার কসম, ওকে মেরেই ফেলব আজ! কসরৎ করে উঠে দাঁড়াল সে, যন্ত্রণাকাতরমুখটা আবছা আলোয় বীভৎস দেখাচ্ছে।

তোমার নিজের অবস্থাই সুবিধের নয়, সেটা বুঝতে পারছ?

একটা কাঁধ সামান্য কঁকাল স্যাভেজ, নেবরের কথায় মৃদু ভৎসনা টের পেলেও গ্রাহ্য ল না। চুপ করে থাকো, আর দেখো কি করে ওকে জনমের শিক্ষা দেই! ধীর পায়ে এগিয়ে এল সে, বুনো আক্রোশে ফেঁসফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলছে। জান্তব চাঞ্চল্য তার চোখে, শরীর টান টান। আগের মত ভুল করল না এবার, সামনে এসে দাঁড়িয়ে থেকে কিছুক্ষণ দেখল জেমসকে। উঠে দাড়া হারামজাদা, নইলে মাড়িয়ে শেষ করে ফেলব!

পেটের পেশীতে কাঁপন জাগল জেমসের, তলে তলে শীতল ক্রোধে ফুসছে। সরে এল কিছুদূর, উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। শক্তি পাচ্ছে না শরীরে। লাফিয়ে সামনে চলে এল স্যাভেজ, লাথি চালাল পাঁজর লক্ষ্য করে। গড়িয়ে ওটা পিঠে নিল জেমস, কিন্তু এ সুযোগে ঝুঁকে অনায়াসে ওকে তুলে ফেলল মার্শাল। লোকটার মনোবল দেখে বিস্মিত হলো ও, মোক্ষম দুটো আঘাত তাকে মোটেও টলাতে পারেনি।

ঘুসি চালানো শুরু করল সে, যদিও গতি কমে গেছে। জেমস কেবল ওগুলো এড়ানোর চেষ্টা করছে। ব্যর্থ হচ্ছে। ভাগ্য ভাল লোকটার শরীরে আগের মত জোর নেই নইলে কয়েকটা ঘুসিতে দফা-রফা হয়ে যেত। তবু যে কটা মাথা, চিবুক আর বুকে-পেটে লাগল, সেগুলো পুরো বেসামাল করে দিয়েছে ওকে। অসাড় হয়ে গেছে পেটের পেশীগুলো, প্রচণ্ড যন্ত্রণায় মাথা ঝিমঝিম করছে। অনুভব করল বেশিক্ষণ আর টিকতে পারবে না। উন্মত্ত রিক স্যাভেজকে থামানোর বা নিদেনপক্ষে বাধা দেয়ার কোন সুযোগই ওর নেই।

কাছের বাড়িটার জানালা খুলে গেল, একরাশ আলো এসে পড়ল জায়গাটায়। হায় খোদা! লোকটাকে বেঁধে পেটাচ্ছে ওরা! মেয়েলি একটা আর্তনাদ শোনা গেল। মেরেই ফেলবে নাকি?

তুই সরে যা, অস্পষ্ট আরেকটা গলা শোনা গেল। আমি দেখছি।

স্যাভেজ, ওকে ছেড়ে দাও! নেবরের শীতল কণ্ঠ। যথেষ্ট হয়েছে। ছাড়ো ওকে, নইলে তোমাকেই গুলি করব!

জাহান্নামে যাও তুমি! রাগে চেঁচিয়ে উঠল মার্শাল। তার ঘুসিতে চোখে সর্ষে ফুল দেখল জেমস, টলে উঠল ওর পৃথিবী। মাটিতে আছড়ে পড়ল শরীর, অন্ধকার নেমে এল চোখে।

 

জ্ঞান ফিরতে দুজন মহিলার উদ্বিগ্ন মুখ চোখে পড়ল জেমসের। ঘোলাটে মুখগুলো অস্পষ্ট আলোয় পরিষ্কার হতে সময় লাগল, চিনতে পারল এবার—মারিয়া আর রোজালিনা বার্থেজ। নড়াচড়া করতে তীব্র প্রতিবাদ জানাল শরীরের সব কলকজা। মাথাটা একমণ ভারী মনে হচ্ছে, বুক ধুকপুক করছে এখনও। চোখ বুজে পড়ে থাকল কিছুক্ষণ, সারা শরীরের ব্যথা ভোলার চেষ্টা করছে। সুস্থির হতে তাকাল চারপাশে-একই জায়গায় পড়ে আছে। দুই মহিলা ছাড়াও আরও কয়েকজন কাছে-ধারে দাঁড়িয়ে আছে। প্রেয়ারির ঠাণ্ডা বাতাস কাঁপন ধরাল ওর শরীরে, সেইসাথে মনে করিয়ে দিল একটু আগের ঘটনা। জ্ঞান হারিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু অবচেতন মনে স্যাভেজের দেয়া মারের স্মৃতিটুকু দগদগে ঘায়ের মত জেগে আছে মনের পর্দায়।

তোমরা একটু সাহায্য করবে? মারিয়া বার্থেজের উদ্বিগ্ন কণ্ঠে অনুরোধ। ওকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া দরকার। আর, পারলে কেউ একজন ডক শুলজকে নিয়ে এসো।

প্রাণপণ চেষ্টায় উঠে বসল জেমস, মাথা ঝিমঝিম করছে। আমি ঠিক আছি, ম্যাম, ধীর কণ্ঠে বলল ও, কথা বলতেও যে পরিশ্রম হয় তা টের পাচ্ছে এখন। তোমাদের ব্যস্ত হতে হবে না। এমনিতেই আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ।

একটা কথাও বলবে না! কঠিন গলায় শাসাল মিসেস বার্থেজ।

উঠে দাঁড়াল জেমস, বহুকষ্টে নিজেকে স্থির রাখছে। দূরে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে লোকজন, সাহায্য করতে এগিয়ে এল না কেউ। মারিয়া বার্থেজ তাকাল তাদের দিকে, দৃষ্টিতে ঘৃণা ফুটে উঠল। একহাত বাড়িয়ে চেপে ধরল জেমসের কাঁধ।

অস্বস্তি ঘিরে ধরল ওকে। আমি নিজেই যেতে পারব, ম্যাম, মহিলাকে নিরস্ত করতে দ্রুত বলে উঠল।

হয়েছে, আর বীরত্ব দেখাতে হবে না! মৃদু ভৎসনার সুরে বলল মহিলা। এই পুরুষ, মানুষগুলোকে নতুন করে চিনলাম আজ। স্যাভেজের ফাঁপা শরীর দেখে ভয়ে সিটিয়ে গেছে, ভাবছে তোমাকে সাহায্য করলে পরে ওদের ওপর চড়াও হবে সে। কিন্তু তার নিজেরই এখন সাহায্য দরকার বলে মনে হলো আমার। শেষ দিকে হেসে উঠল মারিয়া বার্থেজ।

আমার পিস্তলটা রয়ে গেছে, এগোতে গিয়েও থেমে গেল জেমস।

কোথায় পড়েছে বলো, বোজ খুঁজে আনবে।

লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটা। জুনিপার ঝোপটা দেখাতে সেদিকে এগোল, অনায়াসে খুঁজে পেল সিক্সশূটারটা। ফিরে এসে জেমসের পাশে দাড়াল। আমার কাঁধে হাত রাখো, বলল রোজালিনা।

তোমাদের ঝামেলা বাড়াচ্ছি কেবল, নিজের ওপর বিরক্তি বোধ করছে জেমস, বার্থেজদের সহযোগিতা নিতে ওর পৌরুষে বাধছে। কিন্তু এ ছাড়া উপায়ও নেই, সত্যি দারুণ বিপর্যস্ত ওর শরীর। এলোমেলো পা ফেলছে, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই।

পেছনের দরজা দিয়ে ক্যাফের ভেতরে ঢুকল ওরা। একটা চেয়ারে বসাল জেমসকে। দরজা বন্ধ করার সময় বাইরের লোকগুলোকে একবার দেখল মিসেস বার্থেজ, তারপর সপাটে দরজা আটকে দিয়ে ফিরল মেয়ের দিকে, অসন্তোষ তার চোখে। আজকের ঘটনাটা মনে রাখবি, রোজ, অনেক কিছু শেখার আছে। কাছে গিয়েও অ্যালেনকে সাহায্য করেনি ওরা। মনে রাখবি তোর বিপদেও এভাবে মুখ ফিরিয়ে নেবে। ইয়াঙ্কি হয়েও ওরা তাকে সাহায্য করেনি, আর আমরা তো নোংরা মেক্সিকান! চাপা বিষাদ প্রকাশ পেল কথাগুলোতে। চুলোয় পানি চড়িয়ে দে, মেয়েকে ফরমাশ দিল মহিলা। কফি পেলে চাঙাবোধ করবে ও। জেমসের কাছে এসে লণ্ঠনের আলোয় ওর মুখের ক্ষতগুলো খুঁটিয়ে দেখল। মনে হচ্ছে স্ট্যাম্পিডের শিকার হয়েছ তুমি, অ্যালেন, সহানুভূতির সুরে হাসল। রিক স্যাভেজের হাতদুটো মুগুর নাকি?

হামানদিস্তার চেয়েও ভয়ঙ্কর, হালকা সুরে উত্তর দিল জেমস।

রস এখনও বাকি আছে দেখছি! ভাল, মনোবলটা দৃঢ় না হলে পুরুষ মানুষের চলে নাকি?

গামলা ভরা গরম পানি টেবিলে এনে রাখল রোজালিনা। ওপরে ছুটে গেল এরপর, নরম এক টুকরো কাপড় নিয়ে ফিরে এল। কুসুম গরম পানিতে ওটা ভিজিয়ে ক্ষতগুলো ধোয়া শুরু করল মারিয়া বার্থেজ। প্রশান্তি অনুভব করছে জেমস, যতটা না শুশ্রুষায় তারচেয়ে বেশি প্রায় অচেনা দুজন মহিলার আন্তরিকতায়। কয়েকজন লোক যা করেনি তাই করছে এরা। রিক স্যাভেজ বা রেনে নেবরের ভীতির চেয়ে, একজন বিপদাপন্ন লোককে সাহায্য করাকে বড় ভেবেছে ওরা। দারুণ মহিলা, ভাবল জেমস-উদার, আন্তরিক এবং সদয়।

জেমস নিশ্চিত নয় ওরা তাকে শেষপর্যন্ত খুন করত কি-না। রিক স্যাভেজের ইচ্ছে যা-ই থাকুক না কেন, মার্শালের কাজে নাক গলিয়েছে বার্থেজরা। বলা যায় আইনকে বাধা দিয়েছে। স্যাভেজ ব্যাপারটাকে কিভাবে নেবে তারওপর নির্ভর করছে এদের আগামী দিনগুলো। তবে এটা ঠিক সেধে নিজেদের ঘাড়ে ঝামেলা চাপিয়েছে বার্থেজরা, মার্শাল এর শোধ নিতে চাইলে বিপদে পড়তে হবে ওদের।

আরামে চোখ বুজে ফেলেছিল ও, মহিলা ওর শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করতে চমকে উঠে চোখ মেলল। কঠিন চাহনি হজম করতে হলো ওকে। শার্ট খুলে ওর ঊধ্বাঙ্গ পুরোটাই মুছে দিল মিসেস বার্থেজ। ওর মনে হলো কয়েক জায়গায় মাংসপেশী থেঁতলে গেছে, তবে ভাগ্য ভাল হাড়-গোড় কিছু ভাঙেনি।

কফির সুগন্ধে খিদে চাগিয়ে উঠল ওর, মনে পড়ল সাপার করা হয়নি। বলতে চেয়েও সংবরণ করে নিল নিজেকে। কিন্তু রোজালিনা একটা প্লেটে করে খাবার নিয়ে আসতে কৃতজ্ঞবোধ করল ও। ওর প্রয়োজন ঠিকই আঁচ করে নিয়েছে মেক্সিকান গোলাপ।

নাও, চটপট খেয়ে ফেললা। শরীরে জোর পেতে হলে খাবারের চেয়ে ভাল কিছু আর নেই। উৎসাহ জোগাল মহিলা।

সময় নিয়ে খেল জেমস, বুঝতে দিতে চায় না ওর খিদে কতটুকু। কফির মগ তুলে নিয়ে চুমুক দিতে শরীর জুড়িয়ে গেল, চাঙাবোধ করছে। ঠিক বুঝতে পারছি না কিভাবে কৃতজ্ঞতা জানাব, অসহায় দেখাল ওকে, ঘন ঘন দেখছে দুজনকে। তোমরা সাহায্য না করলে…

বুঝেছিস, রোজ, কৌতুকে নেচে উঠল মহিলার চোখজোড়া। ওর কাছে টাকা নেই।

মা-মেয়ে হেসে উঠল একসাথে।

আছে। তোমরা নিশ্চয়ই নেবে না।

এ ব্যাটা দেখছি আস্ত বোকা! মিসেস বার্থেজের হাসি আরও বিস্তৃত হলো। কিন্তু নিক বলেছিল খুব বুদ্ধিমান।

অস্তস্তি বোধ করছে জেমস, চোখ সরিয়ে নিয়ে তাকাল জানালার দিকে।

দুঃখিত, বাছা, ব্যাপারটা বোধহয় ঠিক পছন্দ হচ্ছে না তোমার। আমরা আসলে মজা করছিলাম। তোমাদের পুরুষদের এই জিনিসটা আমাকে এত আনন্দ দেয়-একজন মহিলার সামনে পড়লে বেশিরভাগ লোকই আর গুছিয়ে কথা বলতে বা চিন্তা করতে পারে না। সবচেয়ে অন্তরঙ্গ পরিবেশে আড়ষ্ট থেকে যায়। অথচ অন্য সময়ে দশজন সঙ্গীর মধ্যে নিজেকে নিশ্চিন্তে জাহির করতে পছন্দ করে।

একজন নয়, মা, মনে করিয়ে দিল রোজালিনা। দুজন মহিলা এখন ওর সামনে।

আরেকবার হাসি, এবং তাতে সহজ হয়ে গেল পরিবেশটা।

টেবিলে রাখা পিস্তল হোলস্টারে খুঁজে উঠে দাঁড়াল জেমস, হ্যাট চাপাল মাথায়। কিছু বলার ইচ্ছে হলো না, এগোল দরজার দিকে। সারা শরীরে দপদপানি চলছে ওর, বিশেষ করে বুক আর পেটে। ভোতা একটা চাপ চাপ অনুভূতি হচ্ছে মাথায়। কিন্তু সেসব চেপে রাখার চেষ্টা করছে। মহিলা দুজনকে বুঝতে দিতে চায় না ঠিক কতটুকু বিপর্যস্ত ও, ওদের আন্তরিক সেবা আর শুশ্রুষার পরও। অবশ্য যতটা আশা করেছিল তারচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। সহজে হাঁটতে পারছে, বুক ভরে শ্বাস নিতে পারছে। মাথাটা পরিষ্কার লাগছে—নিজের বিপদ, পরিস্থিতি আর করণীয় সম্পর্কে সচেতন। বার্থেজরা ওকে সাহায্য না করলে এটুকুও সম্ভব হত না। হয়তো মরা একটা কুকুরের মত রাস্তায় পড়ে থাকতে হত, যতক্ষণ না নিজের বলে উঠে দাঁড়ানোর সামর্থ্য হত…

ঘরে গিয়ে লম্বা ঘুম দাও, তাহলেই অর্ধেকটা সেরে যাবে, পেছন থেকে বলল মিসেস বার্থেজ। সকালে একবার ডকের সাথে দেখা কোরো।

নড করল জেমস, বেরিয়ে গেল এরপর।

উঠে দরজা আটকে দিল রোজালিনা। কাচের ভেতর দিয়ে তাকিয়ে থাকল অস্পষ্ট দেহটার দিকে, দৃঢ় পায়ে হেটে চলে যাচ্ছে জেমস অ্যালেন। ফিরে এসে মায়ের পাশে বসল ও। একটা ধন্যবাদও বেরোয়নি ওর মুখ থেকে, হালকা সুরে বলল, অনুযোগ নয়।

তুই সেটা আশা করেছিস?

না। তবে বললে বোধহয় খুশি হতাম।

সমস্যাটা ওখানেই। একটা মৌখিক ধন্যবাদে শোধ-বোধটুকু শেষ হয়ে যায়। কিছু লোক আছে যারা এটা মোটেও পছন্দ করে না। বিপদের সময় পাশে এসে দাঁড়াবে ওরা, মুখে ধন্যবাদ দেয়ার চেয়ে এটাই ওদের জন্যে সহজ ও পছন্দের।

তারমানে সুযোগ খুঁজবে ও, চিন্তিত স্বরে বলল রোজালিনা। আমাদের সাহায্য করার জন্যে কেবল একটা ছুঁতে চাই ওর। ইশশ, আরেকজন!

ওরকম না ভাবাই ভাল, হয়তো ও তেমন লোক নয়, আত্মবিশ্বাসী দেখাল মারিয়া বার্থেজকে। একটু অন্যরকম…আর সবার চেয়ে আলাদা, কি যেন একটা আছে ওর মধ্যে। লপার বা কুশারের মত জোর কিংবা তোষামোদ করে কিছু অর্জন করা ওর ধাতে নেই।

মনে হচ্ছে যেন ওকে অনেকদিন থেকে চেনো?

অনেক লোক তো দেখলাম, এরা মোটামুটি একই রকম।

বাবার মত? হঠাৎ মুখ ফস্কে জানতে চাইল রোজালিনা।

চিন্তিত দেখাল মারিয়া বার্থেজকে, হাসল এরপর। অনেকটা ওর মতই স্বাধীনচেতা এবং জেদী। কিন্তু এতটা দৃঢ়তা নেই তোর বাবার।

এ জন্যেই সে চলে গেল?

আসল ব্যাপারটা হচ্ছে, এরা চলে গেলেও যতটুকু পারে নিজের সব দিয়ে যাবে তোকে। ভালবাসাকে ঘৃণায় রূপ পেতে দেবে না।

তাকে এখনও ভুলতে পারোনি তুমি, কিন্তু ঠিকই চলে যেতে দিয়েছ একদিন! অভিমান প্রকাশ পেল রোজালিনার কণ্ঠে, বাবা না মা-র প্রতি তা বোঝ গেল না।

সহাস্যে মেয়েকে দেখল, মিসেস বার্থেজ, গাঢ়, শোনাল তার কণ্ঠস্বর। দিয়েছি, কারণ তাকে আটকে রাখার কোন ইচ্ছে আমার হয়নি। ঘুরতে ভালবাসে সে, নেশাটা ওর রক্তের মধ্যে। কেউ তা ছাড়াতে পারবে না, আমিও পারিনি। একসময় ফিরে আসবে ও, আমি জানি, যদি বেঁচে থাকে।

মায়ের বুকে মুখ গুঁজল রোজালিনা। কিন্তু কাউকে এ কথা বলোনি তুমি! সবাই মনে করে বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।

মেয়েকে জড়িয়ে ধরল মিসেস বার্থেজ। ওর নেশার চেয়ে এখানকার টানটাই বড়, রোজ, এ জন্যেই তাকে আটকাইনি। আমি জানি সে ফিরে আসবেই। হয়তো আরও দুটো বছর অপেক্ষা করতে হবে। এখানে একটা ঠিকানা রেখে গেছে সে, ওটাই তার একমাত্র অবলম্বন।

থমকে গেল রোজালিনা, কথাটার তাৎপর্য বুঝতে সময় লাগল। মায়ের দিকে তাকাল ও, কোন রকম দ্বিধা নেই তার মধ্যে, যেন নিশ্চিত জানে। আমি!?

হ্যাঁ, তুই। তোর জন্যেই ফিরে আসবে সে। একজন বাবা তার সন্তানকে কখনোই এড়াতে পারে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *