০৪. দেশের নামকরা সব নাইট

দেশের নামকরা সব নাইট যোগ দেবেন অ্যাশবির টুর্নামেন্টে। তার ওপর এতে উপস্থিত থাকবেন রাজকুমার জন, যিনি রাজা রিচার্ডের পক্ষে এখন শাসন করছেন ইংল্যান্ড। সুতরাং এ প্রতিযোগিতার গুরুত্ব আর দশটা সাধারণ টুর্নামেন্টের চেয়ে অনেক বেশি। নির্দিষ্ট দিনে ভোর থেকেই দলে দলে লোক উপস্থিত হতে লাগলো প্রতিযোগিতার জন্যে নির্ধারিত জায়গায়। বিচিত্র পোশাক-আশাক পরা নানা শ্রেণীর সব দর্শক।

টুর্নামেন্ট হবে অ্যাশবি শহরের ঠিক বাইরে এক বিস্তীর্ণ প্রান্তরে। প্রান্তরের এক ধারে বড় বড় ওক গাছের সারি। অন্য পাশে নিবিড় বনভূমি। মাঝখানে নির্দিষ্ট হয়েছে প্রতিযোগিতার স্থান। সুঁচালো মাথাওয়ালা শক্ত কাঠের খুঁটি পুঁতে ঘিরে ফেলা হয়েছে আধ মাইল লম্বা সিকি মাইল চওড়া জায়গাটা। উত্তর দক্ষিণে প্রবেশ পথ। এক সাথে দুজন যোদ্ধা পাশাপাশি যেতে পারে এই পথ দিয়ে। দুই প্রবেশ দ্বারের দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন করে থোক। প্রতিযোগীরা যখন ভেতরে ঢুকবেন তাদের নাম পরিচয় ঘোষণা করবে ওরা। পুরো প্রতিযোগিতাস্থানটাকে ঘিরে আছে অসংখ্য সশস্ত্র রক্ষী। কোনো গোলমাল হলে শৃঙ্খলা রক্ষা করবে তারা।

দক্ষিণ দিকের প্রবেশ পথের কাছে এক সারিতে পাচটা তাঁবু। আজকের টুর্নামেন্টের পাছ চ্যালেঞ্জার স্যার ব্রায়ান দ্য বোয়া-গিলবার্ট, রেজিনাল্ড ট্রুত দ্য বোয়েফ, ফিলিপ ম্যালভয়সিঁ, স্যার গ্রান্টমেনসিল ও জেরুজালেমের সেইন্ট জন গির্জার নাইট ভাইপন্টের তাঁবু এগুলো। এই পাঁচজন ছাড়া আর যারা টুর্নামেন্টে যোগ দেবে তাদেরকে এই পাঁচজনের একজনকে পছন্দ করে তার সাথেই লড়তে হবে।

উত্তর দিকের প্রবেশ পথের কাছে আর এক সারি তাঁবু। ওগুলোও চমক্কার করে সাজানো। চ্যালেঞ্জারদের মোকাবেলা করবে যেসব নাইট তাদের তাবু ওগুলো।

ঘেরা জায়গার অন্য দুপাশে অর্থাৎ পূর্ব-পশ্চিমে দর্শকদের জন্যে আসন সাজানো হয়েছে। সেরা আসনগুলো নাইট এবং ভদ্রলোকদের জন্যে সংরক্ষিত। অন্যগুলোয় বসবেন ভদ্রমহিলারা। সাধারণ মানুষ, কৃষক, ব্যবসায়ী বা শ্রমজীবীদের জন্যে কোনো আসরে ব্যবস্থা করা হয়নি। তারা যে যেখানে পারে বসে বা দাঁড়িয়ে প্রতিযোগিতা দেখবে।

সংরক্ষিত আসনগুলোর একটা একটু উঁচু এবং সুসজ্জিত। ছোট্ট একটা তাবুর সামনে পাতা আসনটা। তাঁবুর বাইরে রাজকীয় প্রতীক চিহ্ন। এই তাবুর পাহারায় যারা রয়েছে তাদের পরনে ঝলমলে পোশাক। হাতে বর্শা। কোমরে খাপে পোরা তলোয়ার। তবুটা নির্দিষ্ট রাজকুমার জনের জন্যে, আসনটাও। এটার ঠিক উল্টোদিকে আরেকটা জমকালো ভাবু। সেটার সামনে সুদৃশ্য এক সিংহাসন পাতা। কয়েকজন তরুণী পরিচারিকা সুন্দর পোশাকে সেজে দাঁড়িয়ে আছে তাবুটার দুপাশে। তাবুর উপরে অনেকগুলো তিনকোনা পতাকা। নানা রকমের ছবি আঁকা সেগুলোয়। একটায় আঁকা তীর-ধনুক। তাঁবুর দরজার ওপরে লেখা: সৌন্দর্য ও প্রেমের রানী। আজ যাঁকে রানী নির্বাচিত করা হবে তিনি পুরস্কার বিতরণ করবেন টুর্নামেন্টের বিজয়ীদের ভেতর। রানী নির্বাচনের ব্যাপারে বিজয়ীর অধিকার সবচেয়ে আগে। দর্শকদের ভেতর তুমুল জল্পনা কল্পনা চলছে, কে আজ বিজয়ী হবেন, আর কে-ই বা নির্বাচিত হবেন সৌন্দর্য ও প্রেমের রানী?

এর ভেতর সবগুলো আসন পূর্ণ হয়ে গেছে নাইট এবং অন্যান্য গণ্যমান্য দর্শকে। তাদের পোশাক আশাকের চাকচিক্যে চোখ ঝলসে যেতে চায়। মহিলা দর্শকও কম নয়। রুচিসম্মত জমকালো পোশাকে সজ্জিত সবাই। আসন-সারির পেছনে, গাছের ডালে, পাশের টিলায়, কাছের এক গির্জার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বসে সাধারণ মানুষরা। সংখ্যায় তারা অসংখ্য। এখন্ও দলে দলে লোক আসছেই। যারা মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে তাদের ভেতর ঠেলাঠেলি চলছে–একটু এগিয়ে যদি যাওয়া যায়, হয়তো ভালো করে দেখা যাবে লড়াই। কথা কাটাকাটি চলছে অনেকের ভেতর, মুখখিস্তিও চলছে সমানে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত রক্ষীরা হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে এসব ঝগড়া বিবাদ মিটিয়ে শান্তি রক্ষা করতে। যেখানে কথায় কাজ হচ্ছে না সেখানে নির্বিচারে লাঠি চালাচ্ছে তারা।

এক জায়গায় দেখা গেল বয়স্ক এক দর্শক আরেক বয়স্ক–প্রায় বৃদ্ধ দর্শককে গালাগাল করছে; বিধর্মী কুকুর! তোর এত বড় সাহস, আমার মতো একজন নরম্যান ভদ্রলোকের পাশে বসতে চাস!

যে বৃদ্ধকে ধমকানো হচ্ছে তিনি আর কেউ নন, ইহুদী আইজাক। এখন তার গায়ে দামী জমকালো পোশাক। বৃদ্ধ তাঁর মেয়ে রেবেকাকে সামনে বসানোর চেষ্টা করছিলেন, তাতেই এই বিপত্তি।

আইজাকের চেহারায় আগের সেই ভীত ভাব আর নেই। কারণ তিনি জানেন, আইনের চোখে এখানে ইহুদী আর খ্রীষ্টানে কোনো প্রভেদ নেই। তার ওপর কোনো অন্যায় অত্যাচার হলে অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসবে। তাছাড়া, অভিজাতদের অনেকেই প্রয়োজনের সময় ইহুদীদের কাছ থেকে টাকা ধার নেয়। সুতরাং নিজেদের স্বার্থেই তারা তাকে রক্ষা করবে। সবচেয়ে বড় কথা, রাজকুমার জন ইয়র্কের ইহুদীদের কাছ থেকে ক্লেশ মোটা অঙ্কের একটা ঋণ নেয়ার জন্যে আলাপ আলোচনা চালাচ্ছেন। সেই ঋণের সিংহভাগ দেয়ার কথা আইজাকেরই। কাজেই ধার পেতে যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সেজন্যে খোদ জনও নিজের গরজে এগিয়ে আসবেন বৃদ্ধ ইহুদীকে সাহায্য করতে।

এসব কথা ভেবে নরম্যান লোকটাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেন আইজাক। লোকটা তখন রক্ষীদের শরণাপন্ন হলো। এক সাথে ছুটে এলো দুতিনজন রক্ষী।

টাকার গরমে তোমার বুঝি পা মাটিতে পড়তে চাইছে না? হুঙ্কার ছাড়লো একজন। তোমার এত বড় স্পর্ধা, যিনি আগে এসে জায়গা দখল করেছেন তাঁকে সরিয়ে দিতে চাও! গরীবদের কাছ থেকে সুদ খেয়ে পেট মোটা করেছো, ঐ মোটা পেট নিয়ে ঘরের অন্ধকারে বসে থাকোগে, যাও। বাইরে এসে গোলমাল পাকানোর চেষ্টা কোরো না। নইলে তোমার ঐ মোটা পেট আর মোটা থাকবে না, চিমসে হয়ে যাবে।

অন্য রক্ষীরা সায় দিলো তার কথায়। সমবেত দর্শকদের ভেতর থেকেও কয়েকজন হৈ-চৈ করে উঠলো, হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন! ব্যাটা ইহুদীর বাচ্চার এত বড় সাহস!

আইজাক বুঝলেন, পরিস্থিতি খুব একটা সুবিধার নয়। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে সাহায্য করার মতো কাউকে দেখতে পেলেন না। অগত্যা মেয়েকে নিয়ে মানে মানে কেটে পড়ার কথা ভাবলেন তিনি। এই সময় ট্রাম্পেটের আওয়াজে মুখর হয়ে উঠলো আকাশ। শোরগোল উঠলো দর্শকদের ভেতর। রাজকুমার জন তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে এসে পড়েছেন। সবাই ঘুরে তাকালো তার দিকে।

রাজকুমারের সঙ্গী সাথীর সংখ্যা কম নয়। নানা শ্রেণীর, নানা পেশার লোক তারা। পোশাক আশাকেও তেমনি বৈচিত্র্য। প্রায়োর অ্যায়মার তাদের অন্যতম। আজ তার পরনে স্বর্ণখচিত মূল্যবান পোশাক। অন্যদের ভেতর আছেন রাজকুমারের প্রিয় কয়েকজন সেনানায়ক, কয়েকজন অত্যাচারী ব্যারন, লম্পট অনুচর, কয়েকজন নাইট টেম্পলার আর সেইন্ট জন গির্জার নাইট।

নাইট টেম্পলার এবং সেইন্ট জন গির্জার সাথে জড়িত নাইটরা প্যালেস্টাইনে থাকতে সব সময়ই রাজা রিচার্ডের বিরোধিতা করেছেন। যুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে রিচার্ড যে সিদ্ধান্তই নিয়েছেন, ভুল হোক ঠিক থোক, তাদের পছন্দ হয়নি। এর একটা কারণ সম্ভবত রিচার্ডকে ব্যক্তিগতভাবে তাদের কেউই পছন্দ করেন না। কারণ রিচার্ড নরম্যান গোত্রের লোক হওয়া সত্ত্বেও স্যাক্সন নরম্যানে কোনো ভেদ কখনো করেননি। একজন নরম্যানকে তিনি যে চোখে দেখেন স্যাক্সনকেও সে চোখেই দেখেন। ব্যাপারটা কিছুতেই মানতে পারেন না নরম্যান নাইট, নাইট টেম্পলাররা। ফলে রিচার্ডের সঠিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন তারা। আর এ কারণেই ব্যর্থ হয়েছে এবারের ক্রুসেডও। সিরিয়ার সুলতানের সাথে সন্ধি করেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে খ্রীষ্টান পক্ষকে।

রিচার্ড এখনো দেশে ফেরেননি। কোনো দিন যে ফিরবেন সে কথাও জোর করে কেউ বলতে পারে না। জনশ্রুতি, তাঁকে নাকি বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ফ্রান্সে। তবে তার বিরোধী অনেক নাইট, নাইট টেম্পলার ফিরে এসেছেন। এবং এসেই, রিচার্ডের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে শুরু করেছেন জনকে। জনের মানসিকতা রিচার্ডের ঠিক উল্টো। স্যাক্সনদের তিনি দুই চোখে দেখতে পারেন না, নরম্যানরাই তাঁর কাছে সব। তাছাড়া রিচার্ডের অনুপস্থিতিতে দেশ শাসন করে সিংহাসনের প্রতি একটা লোভ জন্মে গেছে তার। এই কবছর কারো কাছ থেকে কোনো বাধা না পেয়ে অস্বাভাবিক বিলাস ব্যসনের ভেতর জীবন কাটাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন তিনি। এখন যদি ভাই দেশে ফিরে শাসন ক্ষমতা কেড়ে নেন খুবই অসুবিধা হয়ে যাবে তাঁর। তাই হঠাৎ করে চার পাশে ভাইয়ের বিরোধী এতগুলো বীরকে পেয়ে খুশি হয়ে উঠেছেন জন। স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন পাকাঁপাকি ভাবে সিংহাসনে বসার।

অত্যন্ত সুপুরুষ রাজকুমার জন। লাল আর সোনালিতে মেশানো জমকালো পোশাক পরনে। তেজী একটা ধূসর রঙের ঘোড়ায় চেপে তিনি আসছেন। পেছনে তাঁর সঙ্গীরা।

প্রথমেই ধীর গতিতে ঘোড়া চালিয়ে প্রতিযোগিতা স্থানটার চারপাশে একটা চক্কর লাগালেন জন। মেজাজটা আজ তাঁর খুব ভালো। মহিলাদের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন তাঁদের। কাকে আজকের সৌন্দর্য ও প্রেমের রানী করা যায় ভাবছে। হঠাৎ নজরে পড়লো ভীড়ের ভেতর এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন আইজাক। সঙ্গে এক তরুণী। তরুণীর সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন জন। তাঁর মনে হলো, সারা ইংল্যান্ডে এমন সুন্দরী দ্বিতীয়টি আছে কিনা সন্দেহ। মুখে প্রকাশ করতেও ছাড়লেন না সে কথা।

এমন রূপ দেখে সাধু সন্ন্যাসীদেরও মন ভোলে, কি বলেন, ফাদার? প্রায়োর অ্যায়মারের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন।

কি বলছেন, মহানুভব! বিস্ময় প্রকাশ করলেন ফাদার। ও তো ইহুদীর মেয়ে!

ইহুদী হোক আর যে-ই হোক, অমন সুন্দরীর স্থান এই ভীড়ের ভেতর হতে পারে না, ওর জন্যে আসমের ব্যবস্থা করতে হবে। আইজাকের কাছে গিয়ে জন জিজ্ঞেস করলেন, মেয়েটি কে

আজানু নত হয়ে কুর্নিশ করলেন আইজাক। মহানুভব, এ আমার মেয়ে রেবেকা।

আচ্ছা! তোমার মেয়ে! সামনে একটা আসনে বসে থাকা এক লোকের দিকে তাকিয়ে হাঁক ছাড়লেন জন, এই, কে ওখানে? সরে বসো, এদের বসার জায়গা করে দাও।

লোকটা, একজন স্যাক্সন। সেড্রিকের দূর সম্পর্কের আত্মীয় এবং সুহৃদ কনিংসবার্গের অ্যাথেস্টেন। ইংল্যান্ডের শেষ স্যাক্সন রাজার বংশধর বলে সমাজে তার বিশেষ মর্যাদা আছে। জনের কথা শুনে রীতিমতো অপমানিত বোধ করলো সে। একটু বিব্রতও হলো। সরে বসার কোনো লক্ষণ না দেখিয়ে সে তাকিয়ে রইলোরাজপুত্রের দিকে। চোখে ক্ষুব্ধ দৃষ্টি।

অ্যাথেলস্টেন-এর এই ঔদ্ধত্যে ভয়ানক চটে গেলেন জন।

এই, গর্দভ, আমার কথা কানে ঢোকেনি? চিৎকার করলেন তিনি। তারপর এক সঙ্গীকে হুকুম দিলেম, বর্শার ডগা দিয়ে ঠেলে ওকে সরিয়ে দাও তো, দ্য ব্রেসি।

হুকুম পাওয়া মাত্র তামিল করতে লেগে গেল দ্য ব্রেসি। বর্শা বাগিয়ে ছুটলো অ্যাথেলস্টেনের দিকে। এবার আর বসে রইলো না অ্যাথেলস্টেন, চট করে সরে গেল এক পাশে। কাছেই বসে ছিলেন সেড্রিক। দ্য ব্রেসিকে। ছুটে আসতে দেখে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন তিনি। খাপ থেকে তলোয়ার বের করে সর্বশক্তিতে চালালেন ব্রেসির বর্শা লক্ষ্য করে। দুটুকরো হয়ে গেল বর্শাটা। এক টুকরো ব্রেসির হাতে ধরা রইলো, ফলা সহ অন্য টুকরোটা ছিটকে পড়লো মাটিতে।

ভয়ঙ্কর রাগে চোখ মুখ লাল হয়ে উঠলো জনের। চিৎকার করে সেড্রিকের জন্যে কিছু একটা শাস্তি ঘোষণা করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সঙ্গীদের, বিশেষ করে প্রায়োর অ্যায়মারের কথায় সামলে নিলেন। এদিকে সেড্রিকের দুঃসাহস দেখে উপস্থিত স্যাক্সনরা খুব খুশি। রাজপুত্র জনের সামনেই অনেকে বলাবলি করছে, জমিদার আজ কাজের মতো কাজ করেছে একটা।

সহচরদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন জন, কিন্তু কিছু বলতে পারছেন না। পাকাঁপাকিভাবে সিংহাসনে বসতে হলে এদের সমর্থন তাঁর লাগবে। এদিকে সেড্রিকের অপমানটা মুখ বুজে হজম করে ফেলতেও ইচ্ছে হচ্ছে না। মনের ঝালটা অন্য কার ওপর ঝাড়া যায় ভাবছেন, এমন সময় চোখ পড়লো এক তীরন্দাজের ওপর। লোকটা এখনো চিৎকার করে বাহবা দিচ্ছে সেড্রিককে। তার দিকে এগিয়ে গেলেন রাজপুত্র।

এই, এমন উল্লুকের মতো চিৎকার করছো কেন? কৈফিয়ত চাইলেন তিনি।

বুক টান করে উঠে দাঁড়ালো লোকটা।

তীর ছোঁড়া বা তলোয়ার চালানোয় কেউ যখন সত্যিকারের নৈপুণ্য দেখায় আমি তার প্রশংসা করি, বললো সে। এটা আমার স্বভাব।

মনে হচ্ছে তুমিও পাকা তীরন্দাজ! এক দফা পরীক্ষা হয়ে যাবে নাকি?

আমি রাজি। যখন খুশি।

আরে, এ দেখছি আর এক ওয়াট টাইরেল! পেছন থেকে কে একজন মন্তব্য করলো। কে, তা অবশ্য বোঝা গেল না।

রাজপুত্র জনের এক পূর্বপুরুষ দ্বিতীয় উইলিয়াম নিউ ফরেস্ট জঙ্গলে নিহত হয়েছিলেন তীরবিদ্ধ হয়ে। তীর ছুঁড়েছিলো ওয়াট টাইরেল নামের এক তীরন্দাজ। কথাটা জানা ছিলো জনের। মন্তব্যটা শুনে মনে মনে একটু সন্ত্রস্ত বোধ করতে লাগলেন তিনি। তাড়াতাড়ি তার দেহরক্ষী দলের প্রধানকে ডেকে নিচু কণ্ঠে বললেন, ঐ লোকটার দিকে নজর রেখো। তারপর তীরন্দাজের দিকে ফিরে যোগ করলেন, তা বেশ, তুমি যখন এতই ওস্তাদ তীর ছোঁড়ায়, সময় মত পরীক্ষা করা যাবে।

বললাম তো, রাজি, যখন খুশি।

হয়েছে, হয়েছে। আগে এই ইহুদী আর তার মেয়েকে বসার জায়গা করে দাও। আমি যখন বলেছি ওরা ওখানে বসবে, ওরা বসবে। আমার কথার নড়চড় হবে না।

আইজাকের দিকে তাকালেন জন, যাও, ওখানে গিয়ে বসো। নইলে তোমার পিঠের চামড়া আমি তুলে নেব।

ভয়ে ভয়ে গ্যালারির দিকে এগোলেন বৃদ্ধ।

জন আবার চিৎকার করে উঠলেন, কে ওকে বাধা দেয় আমি দেখতে চাই!

সেড্রিক তৈরি হয়েই ছিলেন, আইজাক গ্যালারিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবেন তাঁকে। ব্যাপারটা চোখ এড়ায়নি রাজপুত্রের। সেজন্যেই তিনি হুমকির সুরে বললেন শেষের কথাগুলো। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হলো না। সেড্রিক যেমন ছিলেন তেমনি তৈরি হয়েই রইলেন, গ্যালারিতে ওঠামাত্র ঠেলে ফেলে দেবেন আইজাককে। কারো বুঝতে বাকি রইলো না, বেশ একটা গোলমাল পাকিয়ে উঠতে যাচ্ছে। কাছেই বসে আছে ওয়াম্বা। ও-ও বুঝতে পেরেছে গণ্ডগোল একটা লাগতে যাচ্ছে। এবং ফলাফল যে ওর মনিবের জন্যে মোটেই শুভ হবে না তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হঠাৎ একটা বুদ্ধি খেলে গেল ওর মাথায়।

আমি বাধা দেবো, মহানুভব! লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলো ওয়াম্বা।

ভ্রুকুটি করে তাকালেন রাজপুত্র। কিন্তু ওয়াম্বা গ্রাহ্যই করলো না তার কুটি। শরীরের পাশে ঝোলানো থলে থেকে রোস্ট করা একটা আস্ত শুয়োরের ঠ্যাং বের করতে করতে এগিয়ে এলো সে আইজাকের কাছে।

টুর্নামেন্ট শেষ হতে কতক্ষণ লাগবে কে জানে?–এই ভেবে, ওয়ান্ডা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলো শুয়োরের ঠ্যাংটা। কাছে এসে ওটা উঁচু করে, ধরলো আইজাকের নাকের সামনে।

শুয়োরের মাংস ইহুদীদের কাছে অত্যন্ত অপবিত্র জিনিস। গন্ধ পেয়েই ওয়াক ওয়াক করতে করতে ছিটকে পেছনে সরে এলেন আইজাক। ওয়াম্বা এই ফাঁকে কোমর থেকে তার কাঠের তলোয়ারটা খুলে এলোপাথাড়ি ঘোরাতে লাগলো বৃদ্ধ ইহুদীর মাথার ওপর। চমকে উঠে আরো খানিকটা পিছিয়ে এলেন আইজাক। তারপর হোঁচট খেয়ে গড়িয়ে পড়ে গেলেন মাটিতে। সমস্ত দর্শক তাঁর এই দুর্দশা দেখে হেসে উঠলো হো হো করে। রাজপুত্র জনও যোগ দিলেন সে হাসিতে। একটু আগের থমথমে আবহাওয়াটা কেটে গেছে।

এবার আমার পুরস্কার দিন। একহাতে কাঠের তলোয়ার অন্য হাতে শুয়োরের ঠ্যাং ঘোরাতে ঘোরাতে জনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো ওয়াম্বা। শত্রুকে আমি যুদ্ধ করে হারিয়েছি।

রাজপুত্র তখনও হাসছেন।

খুর বীরত্ব দেখালে যাহোক, হাসতে হাসতে বললেন তিনি। তা তোমার পরিচয়টা কী?

আমার নাম ওয়াম্বা। বাবার নাম উইটলেস। দাদার নাম ওয়েদার ব্রেন। পেশায় আমি ভঁড়।

বেশ বেশ। তাহলে এই ইহুদীটাকে গ্যালারির নিচের দিকে একটু জায়গা করে দাও আগে। তোমার কাছে যখন হেবেই গেছে তখন তোমার কাছাকাছি বসা ওর আর সাজে না।

বোকার জন্যে জোচ্চোর সাংঘাতিক। তার চেয়েও সাংঘাতিক শুয়োরের মাংসের কাছে ইহুদীর থাকা।

বাহ, বেশ বলেছো তো! রসজ্ঞান আছে তোমার। দাঁড়াও পুরস্কারের ব্যবস্থা করছি তোমার জন্যে। আইজাকের দিকে তাকালেন জন। কয়েকটা স্বর্ণমুদ্রা দাও তো আমাকে।

হতভম্ব হয়ে গেলেন আইজাক। এদিকে রাজপুত্রের আদেশ অমান্য করবেন সে সাহসও নেই। টাকার থলেতে হাত রেখে ভাবছেন কি করবেন। কিন্তু তাকে বেশিক্ষণ ভাবার সময় দিলেন না জন। নিজেই একটু এগিয়ে হ্যাচকা টানে কেড়ে নিলেন বৃদ্ধের টাকার থলেটা। মুখ খুলে দুটো স্বর্ণমুদ্রা বের করে ছুঁড়ে দিলেন ওয়াম্বার দিকে। তারপর ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেলেন অন্য দিকে। থলেটা ফেরত দেয়ার কথা ভুলে গেলেন বেমালুম। মেয়ের হাত ধরে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলেন বেচারা আইজাক। দর্শকরা ঠাট্টা মশকরা শুরু করেছে তাদের নিয়ে।

.

আসল কথাটাই আমরা ভুলে গেছি, নিজের আসনের দিকে যেতে যেতে প্রায়োর অ্যায়মারকে বললেন জন। আজকের টুর্নামেন্টে প্রেম ও সৌন্দর্যের রানী কে হবে? আমাকে যদি ঠিক করতে বলেন, আমি কৃষ্ণনয়না রেবেকার নাম প্রস্তাব করবো?

ও ঈশ্বর! আতঙ্কিত স্বরে আর্তনাদ করে উঠলেন প্রায়োর। একজন ইহুদীকে এই সম্মানিত আসনে বসাবেন!

তাতে ক্ষতিটা কি?

ক্ষতি কিছু নেই, তবে প্রজারা সব ক্ষেপে উঠবে। একজন বিধর্মীকে প্রেম ও সৌন্দর্যের রানী হিশেবে মেনে নিতে পারবে না কেউ। আমাদের নরম্যান সুন্দরীদের কথা না হয় বাদই দিলাম, স্যাক্সন তরুণী রোয়েনাও অনেক বেশি সুন্দরী এই রেবেকার চেয়ে। আমাকে যদি বলেন, আমি রোয়েনার নাম প্রস্তাব করবো।

ঐ একই কথা হলো, বললেন জন। শুয়োরে আর কুকুরে যেমন তফাৎ নেই ইহুদী আর স্যাক্সনেও তেমনি কোনো পার্থক্য নেই। দুই-ই সমান আমার কাছে। সে জন্যেই বলছি রেবেকাকেই নির্বাচিত করুন, স্যাক্সন কুত্তাগুলো জব্দ হবে তাহলে।

রাজপুত্রের মুখে এমন ইতরের মতো কথা শুনে তাঁর সঙ্গীদের অনেকেই অসম্ভষ্ট হলেন। স্যাক্সনদের যারা দুচক্ষে দেখতে পারেন না তারা পর্যন্ত হতভম্ব হয়ে গেলেন। স্যাক্সনদের তারা নিচু ভাবেন সন্দেহ নেই, তাই বলে ইহুদীদের মতো?

নরম্যান নাইট দ্য ব্রেসি তো মুখের ওপর বলেই ফেললো, এভাবে স্যাক্সনদের অপমান করলে ফল ভালো হবে বলে মনে হয় না।

এর চেয়ে বোকামি আর কিছু হতে পারে না, রাজপুত্রের এক বয়স্ক সহচর ওয়াল্ডেমার বললেন। আপনার সব পরিকল্পনাই পও হবে, আপনি নিজেই নিজের সর্বনাশ ডেকে আনবেন, রাজপুত্র।

গম্ভীর হয়ে উঠলোজনের মুখ।

দেখুন আপনাদের আমি সাথে এনেছি আমাকে সঙ্গ দেয়ার জন্যে, উপদেশ দেয়ার জন্যে নয়, বললেন তিনি।

আমরা যারা আপনার সাথে, আপনার পক্ষে আছি, আপনার সব কাজে সহায়তা করছি, তারা মনে করি, আপনার এবং আমাদের সবার স্বার্থেই আপনাকে পরামর্শ দেয়ার অধিকার আমাদের আছে।

যে সুরে কথাগুলো বলা হলো, জন পরিষ্কার বুঝতে পারলেন অহেতুক গোয়ার্তুমি করলে ফল ভালো হয়ে না। তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে হেসে উঠলেন তিনি।

আপনারা ঠাট্টাও বোঝেন না! আমি যাবো বিধর্মী ইহুদীর মেয়েকে এই সম্মানের আসন দিতে? আমার কি মাথা খারাপ হয়েছে। আপনারা সবাই মিলে কাউকে নির্বাচিত করুন।

আমার মনে হয় নির্বাচনটা আপাতত বন্ধ থাক, বললো দ্য ব্রেসি। আজ যিনি বিজয়ী হবেন তার ওপরেই ছেড়ে দেয়া যাবে নির্বাচনের ভার। তাতে বিজয়ীর প্রতি সম্মান দেখানোও হবে, নির্বাচন নিয়ে বিতর্কেরও সৃষ্টি হবে না।

খুব ভালো প্রস্তাব, প্রায়োর অ্যায়মার বললেন। আমি এ প্রস্তাব সমর্থন করছি।

আমরাও, বললেন ওয়ার্ল্ডেমার। এবার শুরু করতে হয় প্রতিযোগিতা। দর্শকরা সব অস্থির হয়ে উঠেছে।

রাজপুত্র জন আর কথা না বাড়িয়ে সিংহাসনে বসলেন। হাত উঁচিয়ে ইশারা করতেই বেজে উঠলো ট্রাম্পেট। একজন ঘোষক এগিয়ে এলো সামনে। উচ্চ কণ্ঠে সে পড়ে শোনাতে লাগলো প্রতিযোগিতার নিয়মকানুন:

প্রথমত, যিনি-ই প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে চাইবেন, আজকের পাঁচ চ্যালেঞ্জারের যে কোনো একজনের সাথে তাকে লড়তে হবে। প্রতিদ্বন্দ্বী তার পছন্দমতো চ্যালেঞ্জারকে বেছে নিতে পারবেন। নিজের পছন্দ তিনি ঘোষণা করবেন চ্যালেঞ্জারের ঢালে তাঁর বর্শা ছুঁইয়ে। বর্শার ফলা দিয়ে যদি ছোঁয়া হয়, লড়াই চলবে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর অন্তত একজন নিহত না হওয়া পর্যন্ত। আর যদি বর্শার বাঁট দিয়ে স্পর্শ করা হয়, লড়াই চলবে অন্তত একজন আহত না হওয়া পর্যন্ত।

দ্বিতীয়ত, প্রথম দিনের প্রতিযোগিতায় যিনি বিজয়ী হবেন তিনি পুরস্কার হিশেবে পাবেন একটি যুদ্ধের ঘোড়া। সৌন্দর্য ও প্রেমের রানী নির্বাচনের সম্মানও তিনি লাভ করবেন।

তৃতীয়ত, আগামীকাল অনুষ্ঠিত হবে সাধারণ প্রতিযোগিতা। যে কোনো নাইটই তাতে যোগ দিতে পারবেন। সমান সংখ্যার দলে বিভক্ত হয়ে ভঁরা লড়বেন। যতক্ষণ না রাজপুত্র খামার নির্দেশ দেবেন ততক্ষণ চলবে লড়াই। রাজপুত্রের কাছে যিনি সবচেয়ে সাহসী বলে বিবেচিত হবেন তার মাথায় বিজয় মুকুট পরিয়ে দেবেন সৌন্দর্য ও প্রেমের রানী।

ঘোষণা শেষ হতেই গ্যালারির অভিজাত দর্শকরা স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা ছুঁড়ে দিতে লাগলেন ঘোষকের দিকে। এ ধরনের অনুষ্ঠানে আভিজাত্য দেখানোর এ-ই নিয়ম। যে ঘোষণা করেছে শুধু সে-ই না, তার সহযোগীরাও প্রতিযোগিতা স্থানের মাঝখানে এসে কুড়িয়ে নিচ্ছে মুদ্রাগুলো। সাধারণ দর্শক, যারা এভাবে মুদ্রা ছুঁড়ে দিতে পারছে না, তারা চিৎকার করছে আর হাততা লি দিচ্ছে মহা উল্লাসে।

ধীরে ধীরে থিতিয়ে এলো চিৎকার আর হাততা লির শব্দ। অভিজাতদের আভিজাত্যের প্রদর্শনী শেষ হয়েছে। যার যার জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে ঘোষকরা। আগাগোড়া বর্মে মোড়া কয়েকজন অশ্বারোহী মার্শাল ধীর কদমে ঘোড়া চালিয়ে প্রবেশ করলো প্রতিযোগিতা স্থানে। দুপ্রান্তের প্রবেশ পথের পাশে দাঁড়িয়ে গেল তারা মূর্তির মতো। এবার শুরু হবে টুর্নামেন্ট। এক স্বরে বেজে উঠলো অনেকগুলো ট্রাম্পেট।

উত্তর দিকের প্রবেশ পথ দিয়ে পাঁচজন নাইট ঢুকলো প্রতিযোগিতা স্থানে। ঘাড় ঘুরিয়ে দুপাশের দর্শকদের দিকে তাকালো তারা। সামান্য মাথা নুইয়ে অভিবাদনের ভঙ্গি করলো। তারপর ধীরে ধীরে ঘোড় চালিয়ে এগোলো দক্ষিণের প্রবেশ পথের দিকে।

চ্যালেঞ্জারদের সুসজ্জিত তাঁবুর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো তারা। পঁচজন চ্যালেঞ্জারের পাঁচটা ঢাল সাজিয়ে রাখা পাঁচটা তাবুর সামনে। যে নাইট যে চ্যালেঞ্জারের মোকাবেলা করবে ঠিক করেছে সে তার ঢালে নিজের বর্শা ছোঁয়ালো। না, কেউই ফলা দিয়ে স্পর্শ করলো না, করলো বাঁট দিয়ে। অর্থাৎ প্রতিদ্বন্দ্বীদের কেউই মরণপণ করে লড়বে না, লড়বে প্রতিযোগিতার মনোভাব নিয়ে নিছক বীরত্ব প্রদর্শনের জন্যে।

প্রতিদ্বন্দ্বীদের বর্শা চ্যালেঞ্জারদের ঢাল স্পর্শ করতেই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে বেজে উঠলো ঢাক। লড়াই শুরুর সংকেত! পাঁচ প্রতিদ্বন্দ্বী ফিরে এলো উত্তর দিকে, তাদের নির্দিষ্ট জায়গায়। ঘোড়াগুলোকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো চ্যালেঞ্জারদের জন্যে।

এদিকে পাঁচ চ্যালেঞ্জার বেরিয়ে এসেছে যার যার তাঁবু থেকে। নিজের নিজের ঢাল তুলে নিয়ে ঘোড়ায় চাপলো তারা। ধীর কদমে ঘোড় চালিয়ে প্রবেশ করলো প্রতিযোগিতার জন্যে নির্দিষ্ট জায়গায়। দর্শকরা আরেকবার ফেটে পড়লো উল্লাস আর করতালিতে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের সামনাসামনি একই ভঙ্গিতে ঘোড়াগুলোকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো চ্যালেঞ্জাররা।

রাজপুত্রের আরেকটা ইঙ্গিত পেলেই শুরু হবে লড়াই।

বিচারকমণ্ডলী তাকিয়ে আছেন রাজপুত্রের দিকে। রাজপুত্রও তাকিয়ে আছেন বিচারকদের দিকে। ঘাড় ঘুরিয়ে শেষবারের মতো একবার প্রতিদ্বন্দ্বীদের দিকে তাকালেন তিনি, চ্যালেঞ্জারদের দিকেও তাকালেন। হ্যাঁ, তৈরি সবাই। সম্মতি দেয়ার ভঙ্গিতে সামান্য মাথা নোয়ালেন জন।

ল্যাইসে অ্যালের! নরম্যান ভাষায় চিৎকার করে উঠলেন প্রধান বিচারক, অর্থাৎ, শুরু কর!

দুই সারি ঘোড়সওয়ার ভয়ঙ্কর বেগে ছুটলো একে অন্যের দিকে। প্রতিযোগিতা ক্ষেত্রের মাঝখানে এসে মিলিত হলো তারা। প্রত্যেকেই নিজের বর্শা দিয়ে প্রতিপক্ষের বর্মে আঘাত করার চেষ্টা করছে। দর্শকরা রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে। সবাই আশা করছে দারুণ একখানা লড়াই দেখতে পাবে। কিন্তু হতাশ হতে হলো তাদের। চ্যালেঞ্জাররা সত্যিই প্রতিদ্বন্দ্বী নাইটদের চেয়ে অনেক উঁচুদরের যোদ্ধা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই চারজন প্রতিদ্বন্দ্বী পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হলো। একমাত্র ভাইপন্টের প্রতিদ্বন্দ্বীই কিছুক্ষণ টিকলো। দুজনের মধ্যে আক্রমণ ও প্রতিআক্রমণ চলতে লাগলো। শেষ পর্যন্ত দুজনের বর্শাই যখন দুটুকরো হয়ে গেল, থামলো লড়াই।

বিচারকমণ্ডলী চ্যালেঞ্জারদেরই বিজয়ী বলে ঘোষণা করলেন। বুনো উল্লাসে ফেটে পড়লো দর্শকরা।

পরাজিত নাইটরা তাদের ঘোড়া ও অস্ত্রশস্ত্র বিজয়ীদের হাতে তুলে দিয়ে বিরস মুখে ফিরে গেল নিজেদের জায়গায়। চ্যালেঞ্জারদের ভৃত্যরা এসে সেগুলো নিয়ে রাখলো যার যার তাঁবুতে।

কিছুক্ষণ পর আরো পাঁচজন নাইট এগিয়ে এলো চ্যালেঞ্জারদের সাথে লড়বার জন্যে। তারাও অল্প সময়ের মধ্যেই পরাজিত হয়ে ফিরে গেল নিজেদের জায়গায়। এরপর এলো তৃতীয় দল। সেই একই পরিণতি তাদেরও। চতুর্থ দলে এলো মাত্র তিনজন। তারা ব্রায়ান ও রেজিনান্ডকে বাদ দিয়ে অন্য তিন চ্যালেঞ্জারের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামলো। পরাজিত হতে হলো তাদেরও।

এরপর দীর্ঘ সময়ের বিরতি। চ্যালেঞ্জাররা বিশ্রাম নেবে। খোশগল্পে মেতে উঠলো দর্শকরা। যারা সঙ্গে খাবার দাবার এনেছে তারা খেয়ে নিলো। একটু আগে হয়ে যাওয়া লড়াই নিয়ে আলোচনা করছে অনেকে চ্যালেঞ্জারদের বিজয়ে তারা খুশি হতে পারেনি। বদ মেজাজের কারণে রেজিনাল্ড ও ম্যালভয়সিঁকে তারা দুচক্ষে দেখতে পারে না। বিদেশী বলে গ্র্যান্টমেনসিলকেও খুব একটা পছন্দ নয় কমরো। তাই মনে মনে ওদের পরাজয়ই কামনা করেছিলো তারা। কিন্তু ঘটছে উল্টো। সবাই আশা করছে, আগামী লড়াইতে নিশ্চয়ই কেউ একজন পরাজিত করতে পারবে চ্যালেঞ্জারদের কাউকে না কাউকে।

শেষ হলো বিরতি।

দর্শকরা আবার টগবগ করতে লাগলো উত্তেজনায়। নতুন করে লড়াই শুরু হতে যাচ্ছে। চ্যালেঞ্জাররা একে একে ঢুকলো প্রতিযোগিতার জাগায়। আগের মতোই পাশাপাশি সার বেঁধে দাঁড়ালো তারা। এবার প্রতিদ্বন্দ্বী নাইটরা চলে এলেই হয়।

কিন্তু কোথায় প্রতিদ্বন্দ্বী? একটা দুটো করে বেশ কয়েকটা মিনিট পেরিয়ে গেল। উত্তর দিক থেকে এগিয়ে এলো না কোনো নাইট। হতাশ হয়ে পড়তে লাগলো দর্শকরা। সেই সাথে বাড়তে লাগলো তাদের অস্থির চিৎকার।

সবচেয়ে হতাশ হলেন সেড্রিক। কারণ তার কাছে চ্যালেঞ্জারদের বিজয় মানে নরম্যানদের বিজয়। আর নরম্যানদের বিজয় মানে স্যাক্সনদের অপমান। সব ধরনের অস্ত্র চালনায় মোটামুটি পারদর্শী সেড্রিক। তবে টুর্নামেন্টে লড়ার জন্যে যে ধরনের দক্ষতা, দরকার তা তার নেই। তাই নিজে প্রতিযোগিতায় নামতে না পেরে মনে মনে উসখুস করছেন তিনি।

সেড্রিকের পাশেই বসে আছে স্যাক্সন রাজকুমার অ্যাথেলস্টেন। এ ধরনের লড়াইয়ে বিশেষ নৈপুণ্য আছে তার। কিন্তু এ মুহূর্তে প্রতিযোগিতায় নামার কোনো ইচ্ছা দেখা যাচ্ছে না অ্যাথেলস্টেনের ভেতর। সেড্রিক এতক্ষণ আকারে ইঙ্গিতে প্ররোচিত করার চেষ্টা করেছেন তাকে। কিন্তু লাভ হয়নি।

অ্যাথেলস্টেন, নরম্যানরা সব জিতে যাচ্ছে, শেষ পর্যন্ত সেড্রিক সরাসরিই বললেন, স্যাক্সনদের পক্ষ থেকে তুমি লড়বে না?

শক্তিমান, সাহসী ও লড়াইয়ে নিপুণ হলেও একটু অলস প্রকৃতির মানুষ অ্যাথেলস্টেন। তাছাড়া উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা নামের মোহও তার নেই।

না, সেড্রিকের প্রশ্নের জবাবে সে বললো। কাল পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করবো। যদি লড়তেই হয়, তো তারপর লড়বো।

মনে মনে চুপসে গেলেন সেড্রিক। একটু ক্ষুন্নও হলেন। কিন্তু এ নিয়ে আর কথা বাড়ালেন না। বয়েসে ছোট হলেও অ্যাথেলস্টেনকে তিনি সমীহ করে চলেন।

দর্শকরা অপেক্ষা করছে। এখনও তারা আশা করছে, যে কোনো মুহূর্তে কোনো দুঃসাহসী নাইট এগিয়ে আসবে চ্যালেঞ্জারদের সাথে লড়াইয়ের জন্যে। অনেকে নিজেদের ভেতর বলাবলি করছে, এই সামান্য লড়াই দেখার জন্যে এতদূর আসাই ভুল হয়েছে। বৃদ্ধ নাইটরা আক্ষেপ করছেন, আজকালকার তরুণরা তারা যেমন ছিলেন তেমন সাহসী নয়। হারা জেতা পরের কথা, প্রতিযোগিতায় নামার সাহস তো আগে দেখাতে হবে।

এদিকে রাজপুত্র জন আজকের প্রতিযোগিতার সমাপ্তি ঘোষণা করার কথা ভাবছেন। মনে মনে ঠিক করে ফেলেছেন, নাইট টেম্পলার ব্রায়ান দ্য বোয়া-গিলবার্টকেই সবচেয়ে সাহসী ও দক্ষ যোদ্ধা বলে ঘোষণা করবেন। বিচারকরাও যে সেই রায়ই দেবেন তাতে সন্দেহ নেই। কারণ, মাত্র একটা বর্শা দিয়ে সে দুজন প্রতিদ্বন্দ্বীকে ধরাশায়ী করেছে। তৃতীয় প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে লড়ার সময়ও তাকে নতুন বর্শা নিতে হয়নি। সুতরাং দক্ষতায় সে যে শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হবে তাতে আর আশ্চর্য কি।

বিজয়ীর নাম ঘোষণা করার জন্যে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *