০৪. খুনের দায় – চতুর্থ পরিচ্ছেদ

লাঞ্চের পর একটানা সন্ধে পর্যন্ত ফাইল দেখে আজকের মত কাজ শেষ করল রানা। মনের মধ্যে খচ্‌ খচ্‌ করছে সেই দুপুর থেকে। সন্ধ্যা নামতে গিলটি মিয়া ও ক্যাভিন হাওয়ার্ডকে নিয়ে বের হলো ও। প্র মে নিউ ইয়র্ক টাইমসের অফিসে গিয়ে বন্ধুর সাহায্যে পুরনো কাগজ বের করে প্লেনক্রাশের নিউজটা মন দিয়ে পড়ল ও আগাগোড়া। পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়াদের মধ্যে ফিলিপ শেফার্সের নাম রয়েছে। যাত্রীদের প্রায় সবারই একটা করে পাসপোর্ট সাইজ ছবি ছাপা হয়েছে, তার নীচে বিস্তারিত রিপোর্ট। শেফার্সের ছবির নীচে লিখেছে: এয়ারলাইন্সের কর্মচারী হিসাবে নিখরচায় ফ্লাই করছিলেন ফিলিপ শেফার্স। প্যারিসে ছুটি কাটিয়ে ফিরে আসবার সময় জে.এফ.কে ইণ্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় আগুনে পুড়ে মারা যান তিনি। চেহারা সম্পূর্ণ বিকৃত হয়ে গিয়েছিল তাঁর-শনাক্ত করা গেছে সঙ্গের নাম খোদাই করা লাইটারটা দেখে। ওটা বিমান কোম্পানির তরফ থেকে বড়দিনের উপহার দেওয়া হয়েছিল তাঁকে।

মূল খবরের সঙ্গে আর একটা মর্মস্পর্শী সাইডস্টোরিও তুলে ধরা হয়েছে: তাঁর সঙ্গে তাঁর স্ত্রীরও প্যারিস যাওয়ার কথা ছিল। তিনি আমাদের প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন, ‘ট্রান্স-আটলাণ্টিক এয়ারলাইন্সে আমার স্বামীর চাকরির পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে তার সঙ্গে প্যারিস থেকে ঘুরে আসার জন্যে আমাকেও ফ্রি টিকেট দেয়া হয়েছিল। আমার কোম্পানী ছুটি মঞ্জুরও করেছিল। কিন্তু আমার ইমিডিয়েট বস্‌ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় সে-ছুটি বাতিল হয়ে যায়। এর ফলে আমি প্রাণে বেঁচে গেছি বটে, কিন্তু এ-বাঁচা অর্থহীন।’

পত্রিকা অফিস থেকেই টেলিফোনে নিউ ইয়র্ক পুলিশের ক্যাপটেন জোসেফ ক্রাউলিকে চাইল রানা। কর্তব্যরত অফিসার জানালেন, ক্রাউলির ডিউটি রাত দশটা থেকে। যদি তাঁর পক্ষে কোনও সাহায্য…

‘বেশ, দশটার পরেই ফোন করব,’ বলে রিসিভার নামিয়ে রাখল রানা।

পত্রিকা অফিস থেকে বেরিয়েই চলল ওরা কুইন্সভিল রেসিডেনশিয়াল এরিয়ার দিকে। যাওয়ার পথে ক্যাভিনকে জিজ্ঞেস করল রানা, ‘কীভাবে ওটা খুলে আনবে বলে ভাবছ?’

‘বাইরে থেকে একটা ফোন করব, সার, আগে,’ বলল তরুণ শিক্ষানবীশ। ‘যদি কেউ না ধরে, তা হলে বুঝতে হবে বাড়ি খালি। যন্ত্রটা খুলে আনতে আমার একমিনিটের বেশি লাগবে না, সার।’

‘হাঁ, এতক্‌খনে জায়গাটা লিরিবিলি হয়ে যাওয়ার কতা,’ বলল গিলটি মিয়া। ‘তবে ঢোঁকার আগে তোমার পিও ছ্যাঁকরা গাড়িটা ও-বাড়ির কাচ থেকে সরিয়ে লিলে ভাল হয়,’ পরামর্শ দিল সে, ‘তারপর নিচ্চিন্ত হবার লেগে হালকা দুটো টোকা দেবে দরজায়, সাড়া না পেলে তবেই গে ঢোঁকা।’

বাঁক ঘুরে পিজিয়ন লেনে ঢুকতে গিয়ে চমকাল রানা। সম্পূর্ণ বদলে গেছে এলাকার পরিবেশ। শেফার্সদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা লরিসহ তিনটে জিপগাড়ি-রাস্তায় গিজগিজ করছে পুলিশ, এলাকার বেশ কিছু কৌতূহলী লোকও আছে তাদের সঙ্গে। ব্রেক করতে গিয়েও মত পরিবর্তন করল রানা। জটলার পাশ দিয়ে ধীর গতিতে এগিয়ে গেল সামনে।

‘এইবার?’ জিজ্ঞেস করল রানা।

ক্যাভিনকে পরামর্শ দিল গিলটি মিয়া। ‘আর কী! আজ আর হোলোনিকো। যাও, কেবিন ভায়া, লিয়ে এসো তোমার গাড়ি। আগে হুডটা তুলে যন্তোপাতি লাড়াচাড়া করবে, তারপর ইস্টাট দেবে। ওই জটলার কাচে গিয়ে জেনে আসবে কী হয়েচে, এত ভিড়-ভাড়াক্কা কীসের। বুজলে?’

আধঘণ্টা পর ফিরে এল ক্যাভিন, একবার হর্ন বাজিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেল আরও সামনে। রানার গাড়ি চলল ওর পিছু পিছু। কয়েকটা ব্লক পেরিয়ে তারপর থামল ওরা। নেমে এল ক্যাভিন।

‘সর্বনাশ হয়ে গেছে, সার!’ বলল ও। ‘রিটা শেফার্স আজ দুপুরে কোন্‌ এক হোটেলে গিয়ে খুন করেছে আমাদের স্ট্যানলিকে। একেবারে হাতে-নাতে ধরেছে ওকে পুলিশ পিস্তলসহ।’

‘আয়-হায়!’ বলল গিলটি মিয়া। ‘এত দৌড়ঝাঁপ করেও টাকাগুনো দোয়া গেল না ছোঁড়াটার হাতে!’

‘স্বীকারোক্তি দিয়েছে মেয়েটা?’ জিজ্ঞেস করল রানা।

‘না, সার। শুনলাম, খুনের পর থেকে একটা টুঁ শব্দও করেনি রিটা শেফার্স। গ্রেফতারের পর কোনও উকিলের সাহায্যও চায়নি। এক্কেবারে বোবা।’

মাথা ঝাঁকাল রানা। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রানা বলল, ‘চলো, অফিসে ফিরি।’

অফিসে পৌঁছে টেপ রেকর্ডারটা নিয়ে সবাই মিলে ঢুকল রানার কামরায়। টেবিলের উপর ওটা রেখে টেপটা রিওয়াইণ্ড করে নিয়ে চালিয়ে দিল গিলটি মিয়া শুরু থেকে। রিটা শেফার্সের মায়ের কল শোনা গেল প্র মে। মেয়েকে ধৈর্য ও সাহস না হারিয়ে বর্তমান বিপর্যয় মোকাবিলা করার ব্যাপারে অনেকক্ষণ ধরে নানানভাবে উপদেশ দিলেন মহিলা। তারপর শোনা গেল রবার্ট স্ট্যানলির অধৈর্য কণ্ঠ, ‘কী ব্যাপার! দশ মিনিট ধরে চেষ্টা করছি, লাইন পাচ্ছি না। কার সঙ্গে কথা বলছিলে?’

‘মা। ওহ্‌-হো! মাকে তো বলতেই ভুলে গেছি, আগামী কয়েকটা দিন থাকছি না এখানে।’

‘পরে ফোন করে জানিয়ে দিলেই হবে। একটা ব্যাগে তোমার জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও, তবে এখুনি বেরিয়ে পোড়ো না, আমি ফোন করলে তারপর। ক্লিপটনের লেলিয়ে দেয়া ত্যাড়া এক প্রাইভেট আই একটু আগে এসেছিল এখানে, ব্যাটা কী করে জানি খুঁজে বের করে ফেলেছে আমাকে। তাই এই হোটেল ছেড়ে এখনই সরে যেতে হচ্ছে।’

‘তোমার খোঁজ বের করল কেমন করে ওরা? ইশ্‌শ্‌! এসবের মধ্যে না জড়ালেই আমরা ভাল করতাম। ভীষণ ভয় লাগছে আমার, ফিল! এত টেনশন হচ্ছে যে…’

‘মাথা ঠাণ্ডা রাখো, ডারলিং। কিচ্ছু ভেবো না তো! ভয় পাওয়ার মত কিছুই ঘটেনি এখন পর্যন্ত, ভবিষ্যতেও ঘটবে না। উত্তরাধিকারের ব্যাপারে আমার কোনও আগ্রহ নেই জানিয়ে দিয়ে আমি ভাগিয়ে দিয়েছি ব্যাটাকে। আরেকখানে সরে গিয়েই তোমাকে ফোন দেব। সাহস হারিয়ো না, নিজেকে শান্ত রাখো, লক্ষ্মী। বড়লোক হয়ে যাচ্ছি আমরা শীঘ্রি।’

এরপরের কলটা কতক্ষণ পর এল তা বোঝা গেল না, কারণ টেলিফোনের কথা শেষ হয়ে যেতেই টেপ রেকর্ডার বন্ধ ছিল। আবার সেই একই লোকের গলা শোনা গেল। বলছে, ‘সরে এসেছি, রিটা। ম্যানহাটনের ছোট, অখ্যাত, পুরোনো-তবে পরিষ্কার-পরিচ্ছনড়ব একটা হোটেলে; নাম মারলিন। দূর থেকেই একটা মাছের ছবি দেখতে পাবে। ডেস্কে বলে রাখব আমি, তুমি সোজা দোতলার একশ’ তিন নম্বর কামরায় চলে আসবে। এখানে কেউ খুঁজে পাবে না আমাদের। ব্যাগ গুছিয়ে তুমি তৈরি তো?’

‘হ্যাঁ।’

‘গুড! গাড়িটা গ্যারেজেই থাক, একটা ট্যাক্সি নিয়ে চলে এসো তুমি। এখন বাজে তিনটে। এখনই রওনা হলে পৌঁছে যাবে…’

গুলির শব্দে চমকে উঠল ওরা তিনজন। চাপা আওয়াজ-কিন্তু শব্দটা যে গুলির তাতে কোনও সন্দেহ নেই। পিস্তলের নলটা সম্ভবত লোকটার পিঠে ঠেকিয়ে টানা হয়েছে ট্রিগার।

‘উ-উ-হ!’

‘কী হলো! ফিল! ফিল! কীসের…’

খটাং শব্দে ক্রেডলে রাখল কেউ ফোনের রিসিভার। কেটে গেল কানেকশন। থেমে গেল টেপ।

প্র ম থেকে শেষ পর্যন্ত টেপটা আবার একবার শুনল রানা। ডুবে গেল গভীর চিন্তায়। ওকে চিন্তামগড়ব দেখে আলগোছে কামরা থেকে বেরিয়ে গেল গিলটি মিয়া তার সাগরেদকে নিয়ে। ঠিক দশটায় ফোন করে নিউ ইয়র্ক পুলিশের ক্যাপটেন জোসেফ ক্রাউলিকে সিটেই পেল রানা। বহুদিনের পরিচয়, রানার গলা পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠতে যাচ্ছিলেন ক্রাউলি; থমকে গেলেন ওর প্রশড়ব শুনে। জানতে চাইলেন, ‘কোন্‌ খুনটা মিস্টার রানা? মারলিন হোটেলের সেই রবার্ট স্ট্যানলি?’

‘হ্যাঁ। মৃত্যুর সঠিক সময়টা আমার জানা দরকার।’

‘ঠিক আছে, জেনে নিয়ে জানাচ্ছি। আপনি অফিসে না বাসায়?’

‘অফিসে।’

‘ঠিক আছে, জানাচ্ছি… ভাল কথা, এই কেসে কার ব্যাপারে আপনি ইণ্টারেস্টেড?’

‘প্র মত, রিটা শেফার্সের ব্যাপারে।’

‘খুনি মেয়েটাকে ডিফেণ্ড করবেন নাকি?’

‘চেষ্টা করব।’

‘কী বললেন? আপনি একটা খুনির হয়ে…’

‘খুনটা ও করেনি, ক্যাপটেন,’ শান্ত কণ্ঠে বলল রানা।

‘অ্যাঁ?’ মনে হলো খাবি খেলেন ক্যাপটেন ক্রাউলি। ‘বলেন কী, মিস্টার রানা? হাতে-নাতে ধরা হয়েছে ওকে! আপনি প্রমাণ করতে পারবেন যে, কাজটা ওর নয়?’

‘পারব। তবে প্রমাণটা নিশ্ছিদ্র করতে হলে আপনার সাহায্য লাগবে। মেয়েটি নিরপরাধ।’

থমকে গেলেন অফিসার। চুপ করে থাকলেন কিছুক্ষণ। রানার মন্তব্য ঘাবড়ে দিয়েছে তাঁকে। তা হলে কি ভুল মানুষকে ধরে এনেছেন?

‘সত্যিই যদি নিরপরাধ হয়,’ বললেন ক্যাপটেন, ‘একশোবার সাহায্য করব আমি। আর আসল খুনি যদি ধরা পড়ে, তা হলে তো সোনায় সোহাগা! আমি কি চলে আসব আপনার অফিসে?’ ‘আমিই আসছি আপনার কাছে। ইতিমধ্যে মৃত্যুর সঠিক সময়, আর আজ বিকেলে ওই হোটেলে ঠিক কী কী ঘটেছে জেনে নিয়ে তৈরি হয়ে থাকুন। বলা যায় না, আসল খুনি ধরা পড়তেও পারে! ইন দ্যাট কেস, দ্য হোল ক্রেডিট গোজ টু ইউ। ঠিক আছে?’

‘হানড্রেড পার্সেণ্ট!’ বললেন উল্লসিত ক্যাপটেন। ‘তা হলে চলে আসুন। রাখলাম।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *