০৪. এই, কি হচ্ছে এখানে

এই, কি হচ্ছে এখানে? হালকা-পাতলা একজন মানুষ, কাঁধ সামান্য কুঁজো। ধূসর চুল। পুরু কাচের চশমা। ছেলেদের দিকে চেয়ে আছেন।

আমাদের অ্যামিউলেট নিয়ে গেল! নালিশ করল যেন মুসা।

ছুরি দেখিয়ে, রবিন যোগ করল।

তোমাদের অ্যামিউলেট? চোখে বিস্ময় ফুটল মানুষটির। অ তোমাদেরকেই পাঠিয়েছে ক্রিস্টোফার। তিন গোয়েন্দা, না?

আপনিই প্রফেসর হেনরি? পাল্টা প্রশ্ন করল কিশোর।

একটা প্রােমে নিয়ে এসেছ? প্রশ্নের জবাব প্রশ্ন দিয়েই সারলেন প্রফেসর একটা অপরিচিত ভাষা বুঝতে পারছ না।

পোরেম নিয়ে এসেছিলাম, বিষণ্ণ কণ্ঠে রবিন বলল, এখন আর নেই। লোকট, নিয়ে গেছে।

আছে, শুধরে দিল কিশোর। অ্যামিউলেট নিয়ে গেছে, কিন্তু কাগজটা আছে।

পকেট থেকে কাগজটা বের করে হাসিমুখে প্রফেসরের হাতে তুলে দিল গোয়েন্দাপ্রধান।

আশ্চর্য! লেখাটা একনজর দেখেই চেঁচিয়ে উঠলেন প্রফেসর, পুরু লেন্সের ওপাশে চকচক করছে চোখ। এসো এসো, স্টাডিতে গিয়ে বসি।

লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটতে শুরু করলেন প্রফেসর। চোখ কাগজের দিকে। কয়েক কদম গিয়েই প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়লেন একটা গাছের ওপর।

স্টাডিতে ঢুকে হাত নেড়ে ছেলেদের চেয়ার দেখিয়ে দিয়ে নিজে বসলেন ফ্যানটাসটিক!

হ্যাঁ, হ্যাঁ, কোন সন্দেহ নেই। আশ্চর্য! আপনমনে বিড়বিড় করছেন প্রফেসর। ছেলেদের উপস্থিতি ভুলেই গেছেন যেন। রক্তে লেখা। খুব বেশি দিনের নয়! ফ্যানটাসটিক!

কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে নিল কিশোর। পড়তে পারছেন, স্যার?।

আঁ! চোখ তুলে তাকালেন প্রফেসর। হা হা, পারছি। ইয়াকুয়ালি। কোন সন্দেহ নেই। ইয়াকুয়ালি ভাষা। জানোই তো, ইনডিয়ানদের মাত্র কয়েকটা গোত্রের লিখিত ভাষা আছে। স্প্যানিশ অক্ষরের রূপান্তর। মিশনারিদের কাছ থেকে স্প্যানিশ শিখে নিজেরা নতুন একটা ভাষা তৈরি করে নিয়েছিল ইয়াকুয়ালিরা।

চাম্যাশদের মত? প্রশ্ন করল মুসা।

গর্দভ নাকি ছেলেটা? রেগে উঠলেন প্রফেসর। চাম্যাশরা তো আদিম জাত, বুনো। তাদের সঙ্গে ইয়াকুয়ালিদের তুলনা? বলি, ইংরেজি ভাষার সঙ্গে চায়নিজের

তুলনা?

ওরা আমেরিকান ইনডিয়ান তো? ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল রবিন।

নিশ্চয় আমেরিকান, এটা আবার জিজ্ঞেস করতে হয় নাকি? কাগজের লেখার দিকে তাকালেন আবার প্রফেসর। এখানে, এই রকি বীচে, ইয়াকুয়ালিদের হাতের লেখা মেসেজ? নাহ, বিশ্বাসই হচ্ছে না। পর্বতের ওপর থেকে পারতপক্ষে নিচেই নামে না ইয়াকুয়ালিরা, শহরে আসা তো দূরের কথা। সভ্যতাকে ঘৃণা করে ওরা।

ইয়ে, স্যার, কোন্ পর্বত? জিজ্ঞেস করতে কিশোরও ভয় পাচ্ছে। কোথায় বাস করে ইয়াকুয়ালিরা?

কোথায় মানে? মেকসিকো। কোন ক্লাসে পড়ো? কিশোরের দিকে তাকালেন প্রফেসর। এই যেন প্রথম খেয়াল করলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয়, ওরা কিশোর, মাত্র স্কুলে পড়ে, ইনডিয়ানদের ইতিহাস জানার কথা নয় ওদের। লজ্জিত হেসে বললেন, ফরগিভ মি, বয়েজ। ইয়াকুয়ালিরা কোথায় থাকে, তোমরা জানবে কি করে? গোপনে থাকতে পছন্দ করে ওরা, আধুনিক সভ্যতাকে এড়িয়ে চলে।

কিন্তু স্যার, দ্বিধা করছে কিশোর, বলে না আবার বকা শুনতে হয়। মেকসিকো তো এখান থেকে খুব দূরে না। এক-আধজন ইয়াকুয়ালি যদি কোন ভাবে রকি বীচে এসেই পড়ে, অবাক হওয়ার কি আছে?

অসম্ভব! তিন গোয়েন্দাকে চমকে দিয়ে গর্জে উঠলেন প্রফেসর। এত জোরে চেঁচানো উচিত হয়নি বুঝেই যেন কণ্ঠস্বর নরম করলেন। কারণ, ইয়াং মেন, ওরা তাদের এলাকা ছাড়তে নারাজ। মেকসিকোর মাদ্রে পর্বতের দুর্গম অঞ্চলে বাস। লোকালয় থেকে অনেক দূরে, সাংঘাতিক শুকনো এক জায়গা। ডেভিলস গার্ডেন বলে অনেকে, শয়তানের বাগান। পর্বতের অনেক ওপরে, চুড়ার কাছাকাছি থাকে ইয়াকুয়ালিরা, টিকটিকির মত বেয়ে উঠে যায় খাড়া পাহাড়ে, পাহাড়ী ছাগলও ওদের কাছে কিছু না। তাই তো ওদের বলে ডেভিলস অভ দা ক্লিফস।

ডেভিলস? কেঁপে উঠল মুসার গলা। এতই ভয়ানক?

হ্যাঁ, ভয়ানক বটে। আক্রান্ত হলে শয়তানের চেয়েও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কিন্তু, সাধারণত, ওরা খুব শান্তিপ্রিয় জাত। নিজেদের নিয়ে থাকতে ভালবাসে। আরেকটা কাজ ভালবাসে, পাহাড়ে চড়া। সময় অসময় নেই, ইচ্ছে হলেই উঠে যায় উঁচু পর্বতের চূড়ায়।

এত উঁচু থেকে নিচে নামল কি করে তাহলে মেসেজটা? জিজ্ঞেস করে বসল রবিন।

জোরে জোরে চিবুক ডললেন প্রফেসর। তাই তো, কি করে নামল? কয়েক বছর ধরে অবশ্য মেকসিকান গভারনমেন্ট ওদের পোষ মানানোর চেষ্টা করছে। যত যাই হোক, ইয়াকুয়ালিরাও মানুষ, সভ্যতার লোভ পেয়ে বসতে কতক্ষণ?

তারমানে, ধরে নেয়া যায় অন্তত একজন ইয়াকুয়ালি রকি বীচে এসেছে? বলল কিশোর। কাজ করতে?

কি জানি, নিজেকেই প্রশ্ন করলেন যেন প্রফেসর, জোর নেই গলায়। নিজের এলাকা ছেড়ে কোথাও গিয়েছে ইয়াকুয়ালি, বিশ্বাস করতে পারছি না। তাছাড়া এখানে কি করতে আসবে? মেসেজটা রকি বীচে পেয়েছ, শিওর?

হ্যাঁ, স্যার। একটা অ্যামিউলেটের ভেতরে।

হ্যাঁ, মাথা দোলালেন প্রফেসর। ইয়াকুয়ালিরা অ্যামিউলেট পছন্দ করে।

কিন্তু মিস্টার ক্রিস্টোফার তো বললেন, অ্যামিউলেটটা চাম্যাশদের তৈরি, প্রশ্ন তুলল রবিন। এরকম একটা পুতুল নাকি ফিল্ম তৈরির সময় ব্যবহার করেছেন।

চাম্যাশ? আরও অবাক করলে। মিলছে না, মাথা নাড়লেন প্রফেসর। চাম্যাশদের সঙ্গে ইয়াকুয়ালিদের কোন সম্পর্ক নেই। চাম্যাশ পুতুল ইয়াকুয়ালিদের হাতে যায় কি করে? ওই পুতুলটাই তোমাদের কাছ থেকে ছিনতাই হয়েছে?

হ্যাঁ, স্যার, বলল মুসা।

খাঁটি সোনার তৈরি, জানাল রবিন।

বলো কি? ভুরু কুঁচকে ছেলেদের দিকে তাকালেন প্রফেসর। স্বর্ণ? চাম্যাশ। অ্যামিউলেট? অসম্ভব! … সত্যি বলছি, স্যার, জোর দিয়ে বলল কিশোর। আমি স্বর্ণ চিনি।

মিস্টার ক্রিস্টোফারও তো তাই বললেন, রবিন বলল।

তাজ্জব হয়েছেন প্রফেসর। হাঁ হয়ে যাচ্ছে মুখ, ঝুলে পড়ছে নিচের চোয়াল। শাট করে বন্ধ করলেন হঠাৎ। হাত বোলালেন চোয়ালে। কাছাকাছি হয়ে আসছে চোখের পাতা, চিন্তিত। আস্তে করে সামনে ঝুঁকলেন। তাই যদি হয় মাই ইয়াং ফ্রেণ্ডস, সাবধানে শব্দ বাছাই করলেন প্রফেসর, বক্তব্যের গুরুত্ব বোঝানোর জন্যে, তাহলে কাজের কাজই করেছ। দুশো বছরের পুরানো জটিল এক রহস্যের সূত্র এসে পড়েছে তোমাদের হাতে।

বড় বড় হয়ে গেল কিশোরের চোখ। দুশো বছরের পুরানো রহস্য?

ইয়েস, মাই বয়েজ, চাম্যাশ হোর্ডের রহস্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *