০৪. আমি ঈশ্বরকে ডাকছি

আমি ঈশ্বরকে ডাকছি। লর্ড জন নীরবে বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন বাইরের দিকে। মনের অবস্থা ভাল না সামারলির মুখ দেখেই বোঝা যাচেছ। সোফায় এলিয়ে পড়ে আছেন মিসেস চ্যালোর। একটি মাত্র লোকের কোন বিকার নেই, তিনি প্রফেসর চ্যালেঞ্জার। মৃত্যু যত এগিয়ে আসছে, আরও বেশি স্থির, অনেক বেশি শান্ত হয়ে পড়ছেন। অকারণ বসে না থেকে অণুবীক্ষণে অ্যামিবার জীবনপরিক্রমা পর্যবেক্ষণ করছেন। বৈদ্যুতিক আলোয় চকচক করছে যন্ত্রের তলার দিকের ছোট্ট গোল কাচের স্লাহভটা।

হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন তিনি। যন্ত্র থেকে চোখ সরিয়ে সামারলির দিকে তাকালেন। প্রফেসর, জলদি আসুন! কাণ্ডটা দেখে যান!

কি দেখলেন চ্যালেঞ্জার? দারুণ কৌতূহলে সামারলির আগেই লাফ দিয়ে উঠে প্রায় ছুটে গেলাম আমি। জিজ্ঞেস করলাম, কি?

আমার দিকে তাকালেন চ্যালেঞ্জার। তুমি তো কিছু বুঝবে না। আমাকে হতাশ হয়ে যেতে দেখে বোধহয় মায়া হলো। ঠিক আছে, এসো। দেখো। বুঝিয়ে দিচ্ছি আমি।

অণুবীক্ষণের আই-পিসে চোখ ঠেকালাম। হিজিবিজি কতগুলো চিত্র ফুটে উঠল চোখের সামনে। বলে দিলেন চ্যালেঞ্জার, মাঝের ছোট ছোট জিনিসগুলোকে বুলে ডায়াটম। উদ্ভিদ। ওগুলোকে নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না। ডানে দেখো, অতি ধীরে নড়ছে একটা জিনিস। এটাই অ্যামিবা। দেখেছ?

কাঁচের গায়ে চোখ ঠেকানো অবস্থায় মাথা নাড়া যায় না। মুখে বললাম, দেখেছি।

ঘষা কাচের মত অস্বচ্ছ একটা অতি খুদে প্রাণী আলোকিত বৃত্তের মাঝের চটচটে বস্তুর ওপর ভেসে থেকে নড়ছে।

আমি সরে জায়গা করে দিতে এগিয়ে এলেন সামারলি। দেখতে লাগলেন।

কেবল লর্ড জনের কোন আগ্রহ নেই। নিজের জায়গায় বসে থেকে প্রশ্ন করলেন, অ্যামিবা দেখিয়ে কি বোঝাতে চান, প্রফেসর?

যন্ত্র থেকে চোখ সরিয়ে সামারলি বললেন, হ্যাঁ, আমারও সেটাই জিজ্ঞাসা।

এত বড় জীববিজ্ঞানী হয়েও সহজ ব্যাপারটা বুঝলেন না? হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন চ্যালেঞ্জার, দাড়িতে ঝাকি লাগল। খানিক আগে আপনি প্রমাণ চেয়েছিলেন না, কি করে আবার প্রাণের জন্ম হবে? এই যে সেই প্রমাণ। গতকাল এই অ্যামিবাকে স্লাইডে রেখে বাতাসহীন জায়গায় বন্দি করে রেখেছিলাম। ওর বাক্সে অক্সিজেন ঢোকেনি, কিন্তু ইথার ঢুকেছে। ভয়ঙ্কর বিষে শ্বাস নিয়েছে এটা। তারপরও দিব্যি বেঁচে আছে। তারমানে অ্যামিবাদের কোন ক্ষতিই করতে পারছে না ইথারের বিষ।

তাতে আমাদের লাভটা কি? কোন পরিবর্তন নেই লর্ড জনের চেহারায়।

লাভটা কি মানে? অবাক চোখে সর্ডের দিকে তাকালেন চ্যালেঞ্জার। করুণা করার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। আরে সাহেব, আজ নাহয় সবাই মরে গেছে। কিন্তু কয়েক লক্ষ বছর পরে এই অ্যামিবারাই আবার বিশাল বিশাল প্রাণী সৃষ্টি করবে। এককালে যেমন করেছিল। এক অর্থে আমাদের পূর্বপুরুষ বলা যেতে পারে এদেরকে। আমাদের পরে আবার যারা জন্মাবে তাদের পূর্বপুরুষ। মহাকালের কাছে কয়েক লক্ষ বছর কিছুই না। যদি বেঁচে থাকতে পারতেন, দেখতে পেতেন আজকের মতই আরেকটা প্রাণিজগৎ সৃষ্টি করে বসে আছে এই আণুবীক্ষণিক অ্যামিবারাই।

বলেন কি! আগ্রহী না হয়ে আর পারলেন না লর্ড জন। চেয়ার থেকে উঠে লম্বা লম্বা পায়ে এগিয়ে এলেন টেবিলের কাছে। মাইক্রোস্কোপের আই-পিসে চোখ রেখে দেখতে দেখতে বললেন, আমাদের আদিমতম পূর্বপুরুষ, তোমার পিঠে

ওটা কি? শার্টের বোতাম!

কালোমত দেখতে তো? শিশুকে যেন বর্ণ পরিচয় শেখাচ্ছেন চ্যালেঞ্জার, ওটা নিউক্লিয়াস।

নিউক্লিয়াসের ব্যাখ্যা আর শুনতে চাইলেন না লর্ড জন। যন্ত্র থেকে চোখ তুলে বললেন, আমাদের সঙ্গে তাহলে এখনও কোটি কোটি প্রাণী বেঁচে আছে, উদ্ভিদ ছাড়াও। জীবন্ত প্রাণী বলতে আমরা পাচজনই শুধু নই?

না, আরও অনেকে আছে।

তাতে অবশ্য আমাদের কিছু এসে যায় না, নিতান্ত স্বার্থপরের মত বললেন লর্ড জন। খানিক আগে আমিও এ কথা ভেবেছিলাম। অক্সিজেন ফুরালে আমরা মরে যাব। বেঁচে থাকবে এই অ্যামিবা। হিংসে হচ্ছে আমার।

বিজ্ঞানী হলে অবশ্য এ কথা বলতেন না। পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ভেবে খুশি হতেন।

আপনি হচ্ছেন? জিজ্ঞেস করলেন সামারলি।

নিশ্চয়।

মিথ্যে কথা। এসব স্রেফ ভণ্ডামি। নিজে মরে গেলাম, আর ভবিষ্যতে পৃথিবী ফুলেফলে ভরে উঠল, ভাবলে তো বরং রাগই লাগতে থাকে। ভাল লাগা দূরের : কথা। লর্ড জনের সঙ্গে আমিও একমত। আমি মরে গেলে ভবিষ্যতে যা খুশি হোক পৃথিবীর, তাতে আমার কি?

মনে মনে খুশি হলাম ভেবে, আমার মত একই ভাবনা ভাবছে আরও দুজন।

ভণ্ড বলাতে রেগে গেলেন চ্যালেঞ্জার। কোন বিজ্ঞানী যে এতটা স্বার্থপর হতে পারে, এই দেখলাম। পৃথিবীতে ভবিষ্যতে প্রাণের জন্ম হলে আপনার কিছু না?

না, আমার কিছু না, সামারলির সাফ জবাব। নিজে বাঁচলে বাপের নাম। হাত নেড়ে বললেন চ্যালেঞ্জার, আপনি আসলে বিজ্ঞানী নন। কয়েকটা বিশেষ বিশেষ বই মুখস্থ করে ফেললেই বিজ্ঞানী হওয়া যায় না। ভয় পেলাম। রেগে গিয়ে বেচারা সামারলিকে ধরে না এখন জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেন। কিন্তু তেমন কোন অঘটন ঘটালেন না তিনি। বরং শান্ত ভঙ্গিতে হেঁটে গিয়ে স্ত্রীর পাশে বসে পড়লেন।

যাক, একটা ফাঁড়া কাটল, ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম আমি আর লর্ড জন। জানালার কাছে বসে বাইরে তাকালাম।

রাতের পৃথিবী। মরা পৃথিবী। রাত অনেক দেখেছি জীবনে। কিন্তু আজকের মত আর দেখিনি। আর কোনদিন দেখবও না।

চাঁদের আলোর বন্যা বইছে। জ্যোত্সধোয়া বিষণ্ণ রাত। তারার আলোও মলিন। আসলে হয়তো কোন পরিবর্তন ঘটেনি চাদ কিংবা তারার আলোর, কিন্তু আমার চোখে ফ্যাকাসে লাগল। মন ভাল না যে।

খামার বাড়িটা এখনও জ্বলছে। পশ্চিম দিগন্তে লাল আলোর ফুটকি। অরুনডেল, চিকেস্টার, পোর্টসমাউথেও মনে হয় বাড়িঘরে আগুন লেগেছে।

অদ্ভুত শান্ত চারদিক। নিশাচর পাখির ডাক নেই। ঝিঝিরা স্তব্ধ। রাতের কোন শব্দই নেই কোথাও। বড় উদাস হয়ে গেল মনটা। এতদিন কত ফালতু ফালতু ব্যাপার নিয়ে সিরিয়াস হয়ে উঠেছি ভেবে হাসি পেল অহেতুক মানুষে মানুষে হানাহানি, মারামারি, হই-চই। অ্যাংলো-জার্মান সাঁতার প্রতিযোগিতাকোন ব্যাপার হলো এটা? অথচ এই অতি সাধারণ ঘটনাটা নিয়ে কি জ্জতটাই না করল লোকে। মন্ত্রী হয়ে কি লাভ? কিংবা প্রেসিডেন্ট কিংবা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধনী? শেষ পরিণতি তো এই! ঠাস করে পড়ে মরে যাওয়া! ব্যস, সব জারিজুরি খতম!

বাইরের মরা প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে কত কথা ভাবছি। মনে পড়ছে ম্যাকারডলকে। টেবিলে মাথা রেখে পড়ে আছে হয়তো তার লাশ, কিংবা গড়িয়ে পড়েছে নিচে। সম্পাদক বিউমন্ট নিশ্চয় নিজের অফিস ঘরে লাল-নীল টার্কিশ কার্পেটে পড়ে আছেন। রিপোর্টার রূমেরও একই হাল; পাশাপাশি পড়ে আছে ম্যাকডোনা, মুরে, বন্ড। ছড়ানো হাতের কাছে নোটবুক। কোনদিন কোন কাজে আসবে না আর ওগুলো। এই যে এতবড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল পৃথিবীর, এসব খবর আর কোনদিন লিখতে পারবে না ওরা, ছাপা হবে না কোন পত্রিকায়।

এমনি হাজারো সব চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে মাথার ভেতর। সময় কাটছে। পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছে নিশ্চিত মৃত্যু।

অনেক আদর করে গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে স্ত্রীকে ঘুম পাড়িয়েছেন চ্যালেঞ্জার। একটা সোফা ঠেলে ঘরের এক কোণে নিয়ে গিয়ে ওটাকে আড়াল করে পর্দা টেনে দিয়েছেন। স্ত্রীকে তুলে নিয়ে শুইয়ে দিয়েছেন সোফায়। অত কুৎসিত হয়েও কি করে স্ত্রীর মন জয় করেছেন তিনি, বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না এখন আর।

তারপর বই আর কাগজ-কলম নিয়ে বসলেন তিনি। শান্ত, তন্ময়, ভাবগম্ভীর মূর্তি। কাজে ডুবে গেছেন মুহূর্তে। সামনে যে নিশ্চিত মৃত্যু ভুলেই গেছেন যেন।

চেয়ারে এলিয়ে পড়ে ঘুমাচ্ছেন সামারলি। নাক ডাকছে বিশ্রী শব্দে।

লর্ড, জনও চেয়ারে বসে ঢুলতে শুরু করলেন। অবাক লাগল আমার। এমন পরিস্থিতিতে লোকে ঘুমায় কি করে?

খানিক পর আমার চোখও ঘুমে জড়িয়ে আসতে লাগল।

হঠাৎ মাথা ঝাড়া দিয়ে ধড়মড় করে সোজা হয়ে বসলাম। হাতঘড়িতে দেখি রাত তিনটে। ওরে বাবা, এতক্ষণ ঘুমিয়েছি। নিজের ওপরই রাগ হলো। এমন একটা রাত, জীবনের শেষ রাতের বড় একটা অংশ ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিলাম। আর কতক্ষণই বা বাচব!

তবে একটানা পাঁচ ঘণ্টা ঘুমানোয় বেশ ঝরঝরে লাগছে শরীরটা। অন্যেরা কে কি করছেন দেখলাম। পর্দার আড়ালে রয়েছেন এখনও মিসেস চ্যালেঞ্জার। টেবিলে মাথা রেখে চ্যালেঞ্জারও ঘুমিয়ে পড়েছেন। দেখার মত দৃশ্য। চেয়ারে হেলে পড়েছে প্রকাণ্ড কাঠামো। ওয়েস্ট কোটের পেটের কাছটায় আলতো ভাবে পড়ে আছে রোমশ দুই হাত। মাথাটা পেছন দিকে হেলানো। কয়েক গোছা ঘন চুল এসে পড়েছে মুখের ওপর। গলার ওপর চুল এবং ললাম ছাড়া আর কিছু নেই। মুখ-চোখ-নাক কিছু দেখা যাচ্ছে না। চুল-দাড়ি-লোমের একটা বল মনে হচ্ছে। চওড়া বুকের গভীর থেকে গর্জন করে বেরিয়ে আসছে নিঃশ্বাস।

ঘুমাচ্ছেন সামারলি। লর্ড জনেরও ঘুম ভাঙেনি। বাইরে আরও বিষণ্ণ হয়ে গেছে প্রকৃতি। পুবের আকাশ আবছা ধূসর।

তাকিয়ে আছি। জীবনের শেষ ভোর।

ধীরে ধীরে পরিষ্কার হলো পুবের আকাশ। জ্যোত্মা মলিন হলো। কেটে গেল ধূসর ছায়া। উজ্জ্বলতা হারাল চাদ। তোর যে এত সুন্দর খেয়াল করিনি কোনদিন।

আলো ফুটল। বহুদূরে দিগন্তের ওপারে ছোট পাহাড়ের ওপাশ থেকে উঁকি দিল ভোরের সূর্য। কয়েক মুহূর্ত জড়সড় হয়ে থেকে যেন লজ্জা কাটাল। তারপর দ্রুত পাহাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল লাল ভাঁটার মত। সোনালী আলোর বন্যায় ভেসে গেল মরা পৃথিবী। আলোটা অন্য দিনের মতই জ্যাত। কিন্তু ভোরের গান গাইছে না আজ পাখ-পাখালি, আমন্ত্রণ জানাচ্ছে না নবাগত সূর্যকে।

প্রাণভরে দেখলাম সূর্যোদয়। মানুষের চোখে শেষ সূর্য। আজকের পরও সূর্য উঠবে, অস্তও যাব যথানিয়মে, আলো ছড়াবে পৃথিবীর বুকে, কিন্তু সে আলোয় কারও কোন লাভ হবে না। সাগরে জোয়ার আসবে, প্রান্তরে কানাকানি করবে বাতাস। আগের মত ধরাবাধা নিয়মেই চলবে প্রকৃতি, কিন্তু ভোগের জন্যে কোন প্রাণী থাকবে না।

নিচে উঠানের দিকে তাকাতে আবার চোখে পড়ল অস্টিনকে। গোটা মানুষ জাতটার নিয়তির প্রতীক যেন বেকায়দা ভঙ্গিতে পড়ে থাকা ওই লাশ-বড়ই করুণ। মরা মানুষ আর মরা কুকুরের মধ্যে কোন পার্থক্য খুঁজে পেলাম না এ মুহূর্তে।

ঠিক এই সময় বুকে চাপ অনুভব করলাম। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

অক্সিজেন সিলিন্ডারগুলোর দিকে তাকালাম। চমকে উঠলাম। তিনটে খালি। রাতে চতুর্থটা খুলে দিয়েছিলেন চ্যালেঞ্জার। এখন ওটাও শেষ। ফুরিয়ে আসছে অক্সিজেন, সেই সঙ্গে আমাদের জীবন। দ্রুত ধেয়ে চলেছে অন্তিম মুহূর্তের দিকে।

শ্বাসরোধ হয়ে আসার ভয়ঙ্কর অনুভূতিটা আরও জোরদার হচ্ছে। খামচে ধরছে ফুসফুসকে। শেষ সিলিন্ডারটার কাছে ছুটে গেলাম। মুখ খুলতে গিয়ে মাথায় এল চিন্তাটা। যদি না খুলি? ঘুমন্ত অবস্থায় মৃত্যুর ওপারে চলে যাবে চার-চারজন মানুষ। ক্ষতি কি? যাক না? ঘুমের মধ্যে শান্তিতে মরতে তো পারল। আমি নাহয় জেনেবুঝে কষ্ট পেয়েই মরলাম। শেষ মুহূর্তে হিরো হবার একটা অদম্য লোভ জাগল।

কিন্তু সেটা হতে দিলেন না চ্যালেঞ্জারের সাদা ইঁদুর! চিৎকার করে উঠলেন, জর্জ, জর্জ, আমি দম নিতে পারছি না!

ঘুম ভেঙে গেল বাকি সবার।

সিলিন্ডারের মুখ খুলে দিয়ে ঘুরে দাঁড়ালাম। চ্যালেঞ্জারকে দেখে হাসি পেল। রোমশ দুই হাত মুঠো করে চোখ রগড়াচ্ছেন। বিশালকায় গরিলা শিশুর মত। সামারলিও কম হাস্যকর নন। ধড়মড়িয়ে জেগে উঠে সোজা হয়ে বসেছেন। কাপছেন ঠকঠক করে। পালাজ্বরে আক্রান্ত রোগীর মত। বিজ্ঞান সাধকের বৈজ্ঞানিক চেহারার বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট নেই আর।

ধাতস্থ রয়েছেন একমাত্র লর্ড জন। ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে তাঁবুতে রাত কাটিয়ে জাগলেন। হরিণের পাল দেখে যেন কেউ চিৎকার করে তার ঘুম ভাঙাল। বন্দুক নিয়ে বেরোতে হবে এখনই।

জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন চ্যালেঞ্জার। ভোরের আকাশ আর সুর্য দেখতে লাগলেন ধ্যানমগ্ন হয়ে।

ধীর পায়ে পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন তার মিসেস। স্বামীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। বললেন, পৃথিবীর জীবন তো শেষ হলো। জর্জ, সেই গানটা তোমার মনে পড়ে?…সেই যে, বাজাও ঘণ্টা, পালাক প্রাচীন; ঘণ্টা বাজাও, আসুক নবীন।

জবাব দিলেন না চ্যালেঞ্জার। নীরবে মাথা ঝাঁকালেন শুধু।

আমাদের দিকে তাকালেন মিসেস। আপনারা ঘুমোননি নাকি সারারাত?

সবাই ঘুমিয়েছি, জবাব দিলাম আমি। সামারলি আর লর্ড জন সারারাত। আমার ঘুম ভেঙেছে রাত তিনটের দিকে।

ইস, আপনারা মেহমান, চেয়ারে রাত কাটিয়েছেন। আর নিজের বাড়িতে স্বার্থপরের মত সোফায় আরাম করে নাক ডাকিয়েছি আমি।

কিচ্ছু অসুবিধে হয়নি। কোনদিক দিয়ে কেটে গেছে রাতটা, টেরই পাইনি।

বললেই হলো। কষ্ট নিশ্চয় হয়েছে। ঠিক আছে, প্রায়শ্চিত্ত করছি, বলে স্টোভের দিকে এগিয়ে গেলেন। স্টোভে বসানো কেটলির পানি ফুটতে সময় লাগল না। পাঁচ কাপ ধূমায়িত কফি বানিয়ে ট্রেতে করে নিয়ে এলেন। একটা কাপ তুলে দিলেন আমার হাতে। সত্যি, তুলনা হয় না মহিলার। সময়মত আসল জিনিসটা এনে হাজির করেছেন।

কফি শেষ করে চ্যালেঞ্জারের কাছে পাইপ ধরানোর অনুমতি চাইলেন সামারলি। ভেবেছিলাম, নিষেধ শুনতে হবে। কিন্তু জীবনের শেষ ইচ্ছেয় বাধা দিলেন না চ্যালেঞ্জার। মাথা কাত করে অনুমতি দিলেন।

পাইপ ধরালেন সামারলি। আমি আর লর্ড ধরালাম সিগারেট। সতেজ হয়ে এল ক্লান্ত স্নায়ু। বদ্ধ ঘর তামাকের কটু ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। ভারি হলো ঘরের বাতাস। দম আটকানোর অবস্থা। খুকখুক করে কেশে উঠলেন মিসেস। ধোঁয়া বের করার জন্যে দড়ি টেনে ভেন্টিলেটর সামান্য ফাঁক করলেন চ্যালেঞ্জার। ধোঁয়া কমে যেতে আবার বন্ধ করলেন।

আর কতক্ষণ? জানতে চাইলেন লর্ড জন।

বড় জোর আর ঘণ্টাখানেক, জবাব দিলেন চ্যালেঞ্জার।

একটু প্রার্থনা করলে কেমন হয়, জর্জ? মিসেস বললেন।

তোমার ইচ্ছে, গলায় তেমন জোর নেই চ্যালেঞ্জারের। আমি ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়েছি। যেভাবে যেদিকে খুশি নিয়ে যায় যাক। জন্মটা যেহেতু আমার হাতে ছিল না, মৃত্যু ঠেকানোরও ক্ষমতা নেই, অহেতুক এ নিয়ে অনুযোগঅভিযোগ করে লাভ কি? যা হয় হবে।

দাঁতের ফাঁক থেকে পাইপ সরিয়ে গিলে নেয়া ধোঁয়াটুকু নাকমুখ দিয়ে বের করলেন সামারলি। খকখক তরে বেদম কাশলেন পনেরো সেকেণ্ড। তারপর কর্কশ গলায় বললেন, ভাগ্যের হাতে সঁপে দেয়া কিংবা প্রসন্ন মনে আত্মনিবেদনের মত মনের অবস্থা আমার নেই। নিতান্ত নিরুপায় হয়েই হাল ছেড়ে দিতে হচ্ছে। কমপক্ষে আরও একটা বছর বাঁচার ভীষণ প্রয়োজন ছিল আমার। খড়িজীবাশ্মগুলোকে শ্রেণী অনুযায়ী সাজিয়ে ফেলার কাজটা বাকি রয়ে গেছে এখনও।

আপনার খড়ি-জীবাশ্ম, আর আমার বই, চ্যালেঞ্জার বললেন। সবে লেখা শুরু করেছিলাম। সারা জীবনের পড়াশুনা, অভিজ্ঞতার সারমর্ম থাকত ওই বইয়ে। অতবড় যুগান্তকারী সৃষ্টিটা শেষ করে যেতে পারলাম না। পারলে ভাল হতো।

কাজ আমাদের সবারই কিছু না কিছু বাকি রয়ে গেল, বললেন লর্ড জন। আগামী বসন্তে তিব্বতে তুষার-চিতা মারতে যাবার কথা ছিল। হিমালয়ের ইয়েতির খোঁজও করে আসতাম। পারলাম কই! আমার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস, করলেন, ম্যালোন, তোমার কিছু বাকি নেই?

আছে, মাথা ঝাঁকালাম, একটা কবিতার বই লিখছিলাম। শেষ হলো না।

আপনাদের সবারই কিছু না কিছু বাকি রয়ে গেল, মিসেস চ্যালেঞ্জার বললেন। কিন্তু আমার নেই। মরতে খারাপও লাগছে না। জর্জকে নিয়েই তো আমার সংসার। ও যখন সঙ্গে যাচ্ছে, যেখানেই যাই, নতুন ধরনের আরেকটা সংসার আবার সাজিয়ে নিতে পারব।

বাইরে সবুজ ঘাসে শিশির-ভেজা রোদ। মাঠের আল ধরে হেঁটে আসতে বড় সাধ হলো। কিন্তু সেটা অসম্ভব। দরজা খুললেই মারা পড়ব। জীবনের এই অতি সাধারণ শেষ ইচ্ছেটাও আর পূরণ করা হবে না কোনদিন।

আবার ভারি হয়ে উঠছে ঘরের বাতাস। যাবার সময় হয়ে এল।

অক্সিজেন শেষ, ঘন ঘন শ্বাস নিতে নিতে বললেন লর্ড জন।

সিলিন্ডারটায় গ্যাস কম ছিল,চ্যালেঞ্জার বললেন। চুরি করার জন্যে অনেক সময় বোতলে গ্যাস কম ভরে দেয় কোম্পানি। মরে গিয়ে বেঁচে গেল ব্যাটা। নইলে এখনই গিয়ে দিতাম মামলা ঠুকে।

দেয়াই উচিত হতো। ওটা আমার কেনা। নগদ পয়সা দিলাম। তারপরেও ঠকাল। নইলে আরও কয়েক মিনিট বাঁচা যেত, মেজাজ সাংঘাতিক খারাপ হয়ে গেছে সামারলির। এ যুগের চরম শঠতার দৃষ্টান্ত। এখন আর ব্যাটাদের শাস্তি দেবারও কোন উপায় নেই। সবকটা হারামখোর মরে শক্ত হয়ে গেছে।

সামারলির কথায় কান দিলেন না চ্যালেঞ্জার। স্ত্রীর দিকে হাত বাড়িয়ে ডাকলেন, কাছে এসো। তাঁর কোমর জড়িয়ে ধরে রেখে আমাদের দিকে তাকালেন, কষ্ট শুরু হয়ে গেছে। আস্তে আস্তে বাড়বে। তারচেয়ে জানালা খুলে দিই। মরতে দেরি হবে না।

তা ঠিক। ভুগে ভুগে মরার চেয়ে একবারে মরে যাওয়াই ভাল, বললেন লর্ড জন।

সামারলির দিকে তাকালেন চ্যালেঞ্জার, আপনার কি মত, প্রফেসর?।

মাথা ঝাকালেন সামারলি, যেতেই যখন হবে, কি আর করা, দিন খুলে! তা বন্ধু, অনেক ঝগড়া করেছি, অনেক তর্ক করেছি। কিছু মনে রাখবেন না। বিদায়!

উঠে দাঁড়ালেন চ্যালেঞ্জার। এগিয়ে গেলেন জানালার দিকে। পাশ্লার জোড়া আর ফাঁকফোকর সব প্রাস্টার দিয়ে আটকানো। খুলতে দেরি হবে। ওসব ঝামেলার মধ্যেই গেলেন না তাই তিনি। গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বললেন, যে মহাশক্তির হাতে আমাদের সৃষ্টি, তার কাছেই ফিরে চললাম! বলেই প্রচণ্ড এক ঘুসি মারলেন জানালার কাঁচে। ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল কাঁচ। কিছু ভাঙা টুকরো ঘরের ভেতর পড়ল। বাকিটা পড়ল বাইরে।

ভয়ানক বিষাক্ত বাতাস নাকে ঢোকার অপেক্ষায় রইলাম।

তার পরিবর্তে অক্সিজেনে ভরা মিষ্টি হাওয়া ঢুকল আমাদের ফুসফুসে। বুকের চাপ হালকা হয়ে গেল। পরিষ্কার হয়ে গেল মাথার ভেতর। দূর হয়ে গেল ঝিমঝিম ভাবটা।

বিস্ময়ে যোবা হয়ে গেলাম। কতক্ষণ থ হয়ে রইলাম, জানি না। স্বপ্নের ঘোরে যেন চ্যালেঞ্জারের কথা কানে এল, মাই ডিয়ার ফ্রেন্ডস, ইথারের বিষবলয় পেরিয়ে এসেছে পৃথিবী। আর ভয় নেই। মরব না আমরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *