০৪. অসকার গোল্ডম্যানের জীপ চালাচ্ছে অস্টিন

অসকার গোল্ডম্যানের জীপ চালাচ্ছে অস্টিন। পেছনে আসছে পিকআপ এবং দুটো ট্রাক। অস্টিনের পাশে বসে পথ নির্দেশ দিচ্ছে টমরেনট্রি। ক্লেয়ার অ্যাঙ্গেল লেকের উত্তর ধার ঘেঁষে কাঁচা রাস্তা ধরে চলেছে চার গাড়ির ক্যারাভানটা।

অপেক্ষাকৃত সরু আরেকটা কাঁচা রাস্তায় এসে পড়েছে প্রথম রাস্তা। ছোট বড় পাথরে বোঝাই এই দ্বিতীয় রাস্তাটা ক্রমেই উঠে গেছে পর্বতের উপরের দিকে। এটা ধরে মাইল দুয়েক এগোলেই পাওয়া যাবে বেকি দম্পতির ক্যাম্প।

পথ খুবই খারাপ। খাড়াই তো বটেই, তার ওপর কাঁচা পাহাড়ী রাস্তা ঘোট বড় পাথরে বোঝাই। সপ্তাহখানেক আগে বেশ বড়সড় এক ঝড় হয়ে গেছে এদিকটায়। মাঝেমধ্যে রাস্তার ওপর ভেঙে পড়ে আছে রেডউডের বিশাল সব ডাল। পায়ে হেঁটে চলাই কষ্টকর। গাড়ি নিয়ে ওঠা তো অসম্ভব। চেষ্টা করে করে শেষকালে হাল ছেড়ে দিল অস্টিন। পায়ে হেঁটেই যেতে হবে, এছাড়া উপায় নেই।

জীপ থামিয়ে নেমে পড়ল অস্টিন। একে একে নেমে এলেন গোল্ডম্যান আর রেনট্রি। পেছনে পিকআপ আর ট্রাক দুটোও থেমে পড়েছে।

জনা ছয়েক গার্ডকে সঙ্গে নেয়া ঠিক করলেন গোল্ডম্যান। অন্যদের গাড়ি নিয়ে বেস ক্যাম্পে ফেরত যাবার নির্দেশ দিলেন।

উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে অস্টিন। বেকি দম্পতিকে পছন্দ করে সে। বন্ধু। ওদের সাহায্য করার আন্তরিক ইচ্ছে তার। কিন্তু এদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে ক্রমেই।

এদিককার পথ ঘাট জানা নেই অস্টিনের। চেনে একমাত্র রেনট্রি। ওর সঙ্গে হেঁটে যেতে হলে এক দেড় ঘণ্টার ধাক্কা। পথ জানা থাকলে জীপের চেয়েও দ্রুত বেকি দম্পতির ক্যাম্পে পৌঁছে যেতে পারত অস্টিন। অবশ্য চেনা না থাকলেও খুঁজে বের করার ক্ষমতা তার আছে। কিন্তু খোঁজাখুঁজি করতে সময় আরও বেশি লেগে যেতে পারে। তাই রেনট্রির সঙ্গে যাওয়াই ভাল মনে করল সে।

এগিয়ে চলল ওরা। সাধ্যমত দ্রুত চলার চেষ্টা করছে রেনট্রি, সঙ্গে গোল্ডম্যান আর গার্ডেরা। কিন্তু অস্টিনের জন্যে এটা শম্বুকগতির সামিল। ক্রমেই বিরক্ত হয়ে পড়ছে সে।

প্রায় সোয়া ঘণ্টা পর বেকি দম্পতির ক্যাম্পের তাঁবুটা চোখে পড়ল। এখনো অন্তত একশো গজ দূরে আছে। আর থাকতে পারল না অস্টিন। ছুটতে শুরু করল। বায়োনিক গতিবেগ। সামনের রাস্তায় ডালপালা ছড়িয়ে পড়ে থাকা একটা বিশাল রেড উড গাছ স্বছন্দে লাফিয়ে পেরিয়ে গেল। দেখে হাঁ হয়ে গেল রেনট্রি। অস্টিন যে বায়োনিক ম্যান, জানা নেই তার।

আশ্চর্য তো! থেমে দাঁড়াল রেনট্রি। গোল্ডম্যানের দিকে তাকিয়ে বলল সে, অতজোরে ছুটছে কি করে লোকটা? তা ছাড়া অতবড় গাছটা এভাবে লাফিয়ে ডিঙাল… ব্যাপারটা কি?

বোঝাতে হলে অনেক কথা বলতে হবে। এড়িয়ে গেলেন গোল্ডম্যান। আসলে এখন অত কথা বলার সময় বা ধৈর্য কোনটাই নেই তার। আরও অনেক আজব কান্ড করতে পারে স্টিভ। পরে সব কথা বুঝিয়ে বলব খন। এখন চল, যাই।

যে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতার জন্যে তৈরি হয়েই ক্যাম্পের সামনে এসে দাঁড়াল অস্টিন। কিন্তু তেমন কোন বাধা এল না। বেকি দম্পতির ব্যবহৃত জিনিসপত্র, যন্ত্রপাতি জায়গা মতই পড়ে আছে। শুধু মানুষ দুজন অনুপস্থিত। যেন কয়েক মিনিট আগেই কোথাও গেল, আবার ফিরে আসবে। বায়োনিক চোখটা ব্যবহার করল অস্টিন। কাছে পিঠে কোথাও কিছু নেই। দিগন্তের দিকে তাকাল। কিছু থাকলে দুরবীন দিয়ে দেখার মতই পরিষ্কার দেখতে পাবে সে বহুদুর থেকেও। কিন্তু নাহ্! কিছু নেই। কয়েকবার জোরে বেকি দম্পতির নাম ধরে ডাকল সে। বায়োনিক মাইক্রোফোনে জোর আওয়াজ উঠল। কিন্তু সাড়া দিল না কেউ।

পৌঁছে গেল রেনট্রি, গোল্ডম্যান আর গার্ডেরা। প্রায় দুমাইল বিচ্ছিরি পথ হেঁটে এসে দর দর করে ঘামছে সবাই। হাঁপাচ্ছে।

বেকি দম্পতির আশ্চর্য ব্যবহারের চেয়ে অস্টিনের কান্ডকারখানা কম আজব ঠেকছে না রেনট্রির কাছে। সোজা অস্টিনের কাছে এসে দাঁড়াল সে। এই যে সাহেব, অত জোরে ছুটলেন কি করে আপনি? হেঁটে তো নয়, যেন উড়ে এসেছেন। ঘোড়ার মাংসপেশী লাগিয়েছেন নাকি পায়ে?

হি-টেস্ট, গোল্ডম্যানের মতই প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল অস্টিন। তার আসল পরিচয় যত কম লোকে জানে, ততই ভাল। বায়োনিক ম্যান হলেও একজন সিক্রেট এজেন্টের কাজ করতে হয় তাকে। টপ কোয়ালিটি ড্রিংক। গ্যালন এক ডলার দশ পেন্স। খেয়ে দেখুন, আপনিও অমন ছুটতে পারবেন।

কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন গোল্ডম্যানও। জিজ্ঞেস করলেন, অস্টিন, ওদের কোন সাড়া পেলে? কি হল, বুঝছ কিছু?

নাহ! এদিক ওদিক মাথা দোলাল অস্টিন। অত চেঁচালাম, কোন সাড়া নেই! কোথায় গেল, তাও বুঝতে পারছি না!

হু…! কি যেন একটু ভাবলেন গোল্ডম্যান। তারপর রেনট্রির দিকে ফিরে বললেন, টম, এদিককার পথ ঘাট জঙ্গল তো তোমার চেনা। গার্ডদের নিয়ে খুঁজে দেখ তো একটু ভাল করে, প্লীজ!

হ্যাঁ, হ্যাঁ, যাচ্ছি আমি। ঘাড় নেড়ে চলে গেল রেনট্রি।

ফিরে চাইলেন গোল্ডম্যান। ততক্ষণে বেকি দম্পতির পড়ে থাকা জিনিসপত্রগুলোর দিকে নজর দিয়েছে অস্টিন। এগিয়ে গেলেন তিনি।

কোনরকম ধস্তাধস্তির চিহ্ন তো দেখছি না, বললেন গোল্ডম্যান।

মার্লিনের ব্যাগটা তুলে নিল অস্টিন। চেন খোলাই আছে। ফাঁক করে ভেতরে তাকাল সে। একে একে সমস্ত জিনিস বের করল ভেতর থেকে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কিছু খোয়া যায়নি।

ব্যাগটা নামিয়ে রেখে আশপাশটা দেখায় মন দিল অস্টিন। পনের সেকেন্ডের মধ্যেই আবিষ্কার করল রেডিওটা। আঙ্গুল তুলে গোল্ডম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার কারণ এটাই।

এগিয়ে গিয়ে দুজনেই ঝুঁকে বসল দোমড়ানো রেডিওটার কাছে।

কাজটা কার? তোমার মত আরও কেউ আছে নাকি? অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে অস্টিনের দিকে তাকালেন গোল্ডম্যান।

স্লেজহ্যামার দিয়ে মেরে করা যেতে পারে অমন, বলল অস্টিন। কিন্তু আশেপাশে কোথাও তো দেখছি না জিনিসটা!

উঠে দাঁড়ালেন গোল্ডম্যান। আশেপাশের মাটিতে নজর বোলাতে লাগলেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গর্তটা আবিষ্কার করলেন। এটাতেই সেন্সর বসিয়েছিল বেকি দম্পতি।

শুধু স্লেজহ্যামারটাই নয়, আরও একটা জিনিস নেই। বললেন গোল্ডম্যান।

কি? ফিরে তাকাল অস্টিন।

সেন্সর। কোথায় ওটা?

উঠে এসে গর্তটার কাছে বসল অস্টিন। ঠিকই বলেছেন। অন্যান্য টেস্ট ইকুইপমেন্টগুলো পড়ে আছে দেখছি, কিন্তু সেন্সরটা…

সেন্সরটা খুঁজে পেতেই হবে, জোর গলায় বললেন গোল্ডম্যান।

এবং আমার দুই বন্ধুকেও। কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছি না, এভাবে কোথায় গায়েব হয়ে গেল ওরা!

কিডন্যাপ হতে পারে!

তা পারে!

সেন্সরটাও গায়েব। কেন?

বুঝলাম না। আরও অনেকগুলো সেন্সর ট্রিনিটি ফল্টে বসিয়েছে ওরা। স্যান আন্দ্রিজেও। কেউ শুধু এই জিনিস চাইলে সহজেই ওগুলো চুরি করতে পারত। তার জন্যে দুজন লোককে কিডন্যাপ করাটা…

হুমম।

এই সময়েই রেনট্রির চিৎকার শোনা গেল, স্টিভ, অসকার!

পাই করে ঘুরে দাঁড়ালেন গোল্ডম্যান। বসা অবস্থায়ই চরকির মত ঘুরল অস্টিন। রেনট্রিকে দেখা যাচ্ছে না।

টম, কোথায় তুমি? চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল অস্টিন।

এই যে, এখানে, পুবের রেডউডের জঙ্গল থেকে ভেসে এল রেনট্রির কণ্ঠস্বর।

বাঁ চোখের ইনফ্রারেড সিস্টেম চালু করে দিল অস্টিন। শব্দের উৎস বরাবর চাইতেই, জঙ্গলের মধ্যে বসা রেনট্রিকে দেখতে পেল। বিজ্ঞানীর চোখ মাটির দিকে।

উঠে পড়ল অস্টিন। গোল্ডম্যানকে নিয়ে জঙ্গলের দিকে চলল।

কি হল? রেনট্রির কাছে পৌঁছে জিজ্ঞেস করলেন গোল্ডম্যান, ওদের পেয়েছ নাকি?

না, জবাব দিল রেনট্রি, কিন্তু আরেকটা জিনিস পেয়েছি। আঙ্গুল তুলে মাটির দিকে দেখাল। নরম মাটিতে বসে গেছে পায়ের ছাপটা। বিশাল। লম্বায় আঠার ইঞ্চি, চওড়ায় ছয়।

কোন জানোয়ারের? জিজ্ঞেস করলেন গোল্ডম্যান। পার্বত্য সিংহ?

অতিকায় গ্রিজলী ভালুক? জানতে তাকাল অস্টিন।

এদিক ওদিক মাথা নাড়াল রেনট্রি। ছেলেবেলায় দিদিমার কাছে গল্প শুনেছে সে। বড় হয়ে পাহাড়ে জঙ্গলে অনেক খুঁজেছে জীবটাকে। কিন্তু ছায়াও দেখেনি কখনো। না না, সিংহ না। ভালুকও না।

তাহলে? জানতে চাইলেন গোল্ডম্যান।

এদিককার পাহাড়ে জঙ্গলে একটাই জীব আছে ও ধরনের পায়ের ছাপ ফেলে। আমার গায়ের লোকেরা এর নাম দিয়েছে সাসকোয়াচ। শ্বেতাঙ্গরা, মানে তোমরা বল একে…

বিগফুট, রেনট্রির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল অস্টিন।

অবিশ্বাস্য! সত্যিই, একেবারেই বিশ্বাস হচ্ছে না আমার! বললেন গোল্ডম্যান।

অবিশ্বাসের কিছুই নেই, বলল রেনট্রি। উঠে দাঁড়িয়েছে। রেনট্রির চোখে চোখে চাইলেন গোল্ডম্যান।

সত্যিই অবিশ্বাসের কিছু নেই, আবার বলল রেনট্রি। পুরুষানুক্রমে সাসকোয়াচের কাহিনী জেনে আসছে আমার গায়ের লোকেরা।

ওরা তো কুসংস্কারাচ্ছন্ন। হাজারে একজন শিক্ষিত নেই।

কিন্তু বিগফুট নামটা তো দিয়েছে তোমাদেরই অতিশিক্ষিত বিজ্ঞানীরা। তারাও কি কুসংস্কারাচ্ছন্ন?

জবাব দিতে পারলেন না গোল্ডম্যান।

অনেক অবিশ্বাস্য ঘটনাই ঘটে পৃথিবীতে, যার কোন ব্যাখ্যা নেই। এটা নিশ্চয়ই অজানা নয় তোমার। খুবই ছোট আমি তখন, বলে চলল রেনট্রি। ন্যাংটো হয়ে ঘুরে বেড়াই। গাঁয়েরই একটা লোককে এই রেডউডের জঙ্গলে বেমালুম গায়েব হয়ে যেতে দেখেছি। কয়েকদিন পরে অবশ্য খুঁজে পাওয়া গেছে তাকে। আমার দাদুই খুঁজে পেয়েছেন। ঠিক বুঝতাম না তখন, কিন্তু ফিরে আসার পর লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে আঁৎকে উঠেছিলাম। কেমন এক ধরনের শূন্য দৃষ্টি। গাঁয়ের পাড় মাতালগুলোর মত অনেকটা। দাদু বলেছেন, লোকটাকে যেখানে খুঁজে পাওয়া গেছে, তার পাশেই সাসকোয়াচের পায়ের ছাপ ছিল।

রেনট্রির কথা শেষ হওয়ার পরেও কয়েক সেকেন্ড নীরব রইলেন গোল্ডম্যান। অন্য সবাইও নীরব। তন্ময় হয়ে রেনট্রির গল্প শুনেছে ওরা।

যা হবার হয়েছে, ছড়িয়ে পড় সবাই, আদেশ দিলেন গোল্ডম্যান। এদিককার জঙ্গলটাকে ঘিরে ফেল। বিশাল পদচিহ্নটার দিকে চাইলেন গোল্ডম্যান, সন্দেহজনক কিছু দেখলেই হুইসেল বাজাবে।

কে কোন দিকে যাবে নির্দেশ দিতে শুরু করল রেনট্রি।

এক সেকেন্ড পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল অস্টিন আর গোল্ডম্যান। তারপর মাথা ঘুরিয়ে ব্যাটল মাউনটেনের দিকে ইঙ্গিত করে বলল অস্টিন, ওদিকে যাচ্ছি আমি।

পর্বতে? অবাক হলেন গোল্ডম্যান, কেন?

ওপরে উঠব না, মানে চূড়ায় নয়। একটু থেমে বলল, দুটো কারণে যাব। এক একটা আগ্নেয়গুহার কথা জানিয়েছে ইভান আর মার্লিনের বসান সেন্সর। ওই এলাকায়ই আছে কোথাও ওটা। দুই, ওদিককার জঙ্গলের ভেতরই বিগফুটের বেশি আনাগোনার কথা শোনা যায়…। তৃতীয় আরেকটা কারণও অবশ্য আছে। ওদিক যেতে চাওয়ার। তেমন কিছু না…তবে আমার মন বলছে অসাধারণ কিছু একটা পাবই।

ইনফ্রারেডে কিছু দেখতে পেয়েছ?

না। ব্যাটল মাউনটেনের দিকে তাকিয়ে বলল সে, গুহাটা খুঁজে বের করবই। নিজের চোখে দেখতে চাই আমি। ওটা আছেই, আমি শিওর। আর্থ রিসোর্স স্যাটেলাইট, টেলিমেট্রি অ্যানালাইসিস কম্পিউটার ভুল করতে পারে না।

নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

হয়নি। তাহলে রিডিংই দিত না।

বেশ, যাও, বললেন গোল্ডম্যান। কিন্তু নিজের দিকে খেয়াল রেখো।

এখন আর সাধারণ মানুষ নই আমি…

তবু…অসাধারণ শত্রু তো থাকতে পারে।

কথা দিচ্ছি, আগ্নেয়গুহায় আচমকা পড়ে গিয়ে পা ভাঙব না, হাসল অস্টিন। বিগফুট ব্যাটাকেও আমার ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে দেব না। মার্লিনের রেডিওটার যে অবস্থা করেছে ব্যাটা…নাহ্ আমার সিক্স মিলিয়ন ডলার দামের দেহটাকে অত সহজে নষ্ট হতে দেব, ভাবছেন কি করে?

ব্যাটল মাউনটেনের দিকে রওনা হল অস্টিন। বায়োনিক গতিবেগ ব্যবহার করল। রাস্তা ভাল হলে ঘণ্টায় ষাট মাইল বেগে ছুটতে পারে সে। কিন্তু এখানে রাস্তা খারাপ, ঘন জঙ্গলে ছাওয়া চড়াই। প্রাণপণ চেষ্টায় গতিবেগ বড়জোর পনের থেকে বিশের মধ্যে রাখতে পারল অস্টিন।

যতই ওপরে উঠছে, তাপমাত্রা কমছে। পাতলা হয়ে আসছে গাছপালা। বেকি দম্পতি যেখানে ক্যাম্প করেছিল তার কয়েক হাজার ফুট ওপরে উঠে একটু থামল অস্টিন। সামনে রাস্তা মোটামুটি ভাল। বনজঙ্গল তেমন নেই। যদিও খাড়া, কিন্তু বেশি এঁকেবেঁকে না গিয়ে খাড়া উঠে গেছে পথ। যতটা মনে হয় এলক হরিণেরা নিয়মিত যাতায়াত করে এ পথে।

আবার ছুটতে শুরু করল অস্টিন। গতিবেগ দ্রুত। চলতে চলতেই চোখ তুলে তাকাল। মাথার ওপরে এক জায়গায় শেষ হয়ে গেছে বনের সীমানা, তারপরেই বরফ ঢাকা চুড়ার শুরু। চড়া রোদে ঝক ঝক করছে। চোখ ঝলসে যেতে চায়। অবশ্য সাধারণ মানুষের। অস্টিনের বায়োনিক চোখে এসব কোন প্রতিক্রিয়াই ঘটল না।

বনের প্রান্ত সীমানার কাছাকাছি এসে আবার থামল অস্টিন। এদিক ওদিক চেয়ে একটা বিরাট গাছ পছন্দ করে নিল মনে মনে। এগিয়ে গিয়ে গাছটার নিচে দাঁড়াল। ওপরের দিকে তাকাল। গোড়া থেকে প্রায় বিশ ফুট ওপরে মোটাসোটা একটা ডাল, তার ভার সইতে পারবে।

লাফ দিল অস্টিন। শাঁ করে উঠে গেল শূন্যে। নিঃশব্দে এসে নামল ডালটায়। যেন ওজন নেই তার, হালকা তুলো। ডালটা একটু কাপল না পর্যন্ত। মাথার ওপরের একটা সরু ডাল ধরে টাল সামলে দাঁড়াল সে। সামনের ঝোপঝাড়ে ছাওয়া জমির দিকে তাকাল। তার সাধারণ চোখে কিছুই দেখল না। কিন্তু ফাঁকিতে পড়ল না বায়োনিক চোখটা। ঠিকই দেখতে পেল জিনিসটা। পঞ্চাশ থেকে ষাট গজ দূরে একটা কাঁটা লতায় লেগে ছিড়ে আটকে আছে কাপড়ের ছোট্ট একটা টুকরো।

হাওয়ায় ভেসে আবার নিচে নেমে এল অস্টিন। ছুটল। কাপড়ের টুকরোটার কাছে এসে থামল। হাত বাড়িয়ে ছাড়িয়ে নিল কাঁটায় আটকান কাপড়ের ছেড়া টুকরোটা। এক নজর দেখেই চিনল। ইভান বেকির শার্ট থেকে ছিড়েছে। কি মনে করে টুকরোটা পকেটে রেখে দিল অস্টিন।

তাহলে সে যা অনুমান করেছে, ঠিকই। এদিকেই নিয়ে আসা হয়েছে বৈকি দম্পতিকে। আগ্নেয়গুহা থাক আর না থাক, এদিকে অস্বাভাবিক কিছু একটা ঘটছে। কিংবা ঘটতে চলেছে, ভাবল অস্টিন।

পর্বতের আরও ওপরে উঠে চলল সে।

তাকে লক্ষ্য করা হচ্ছে টের পেল না অস্টিন। না, সাসকোয়াচটা দেখছে না তাকে। বিশাল টি ভি-র পর্দায় তার গতিবিধি ফুটে উঠেছে। ব্যাটল মাউনটেনের বরফ ঢাকা চূড়ার নিচের দিকে পাহাড় খুঁড়ে কৃত্রিম গহ্বর সৃষ্টি করে তাকে তৈরি করা হয়েছে অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার। এই গবেষণাগারেরই একটা কক্ষে বসে টিভি-র পর্দায় তাকে দেখছে দুজন পুরুষ আর একজন মেয়েলোক।

আজব ধরনের পোশাক ওদের পরনে। চেহারাটা পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে ঠিক যেন মেলে না। টেলিভিশনের পর্দাটা তিন বাই পাঁচ ফুট। কোণগুলো সমকোণ। সারা ঘর বিচিত্র সব যন্ত্রপাতিতে ঠাসা।

অবাক হয়ে অস্টিনকে দেখছে তিনজনই। আর দশজন সাধারণ মানুষ যে সে নয়, ঠিকই বুঝে নিয়েছে ওরা।

আশ্চর্য! দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকার পর নীরবতা ভাঙল একজন পুরুষ। লোকটার গতি দেখেছ?

অস্বাভাবিক, সত্যি! দ্বিতীয় লোকটা বলল।

অবিশ্বাস্য! বলল মেয়েটা, এমন কি আমাদের জন্যেও।

নাহ্, ওকে পরীক্ষা করে দেখতে হচ্ছে। বলল প্রথম জন।

উঠে পর্দার আরও কাছে এসে দাঁড়াল মেয়েটা। তীক্ষ্ণ চোখে অস্টিনের গতিবিধি লক্ষ্য করছে। সাংঘাতিক খাড়াই বেয়ে তীব্র গতিতে ধেয়ে আসছে অস্টিন। বিন্দুমাত্র হড়কাচ্ছে না। অজানা পথে চলছে, সামান্যতম দ্বিধা নেই।

ঠিকই বলেছ, বলল মেয়েটা। কণ্ঠস্বরে তীব্র কৌতূহল, গুড আইডিয়া! ওকে পরীক্ষা করে দেখা উচিত।

নিশ্চয়ই নিজের সঙ্গীদের খুঁজতে এসেছে লোকটা। সেন্সরটাও ফেরৎ চায় হয়ত। হয়ত জানতে চায় সঙ্গীরা এবং সেন্সর গায়েব হবার পেছনে কারণটা কি? টিভির পর্দার দিকে তাকিয়েই মুচকে হাসল প্রথম জন, টোপ ফেলা যাক।

সাসকোয়াচ? সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে প্রথম জনের দিকে তাকাল দ্বিতীয় লোকটা।

সাসকোয়াচ টোপ না। ওই লোকটা যেই-ই হোক, আমার ধারণা সাসকোয়াচ তার জন্যে যথেষ্ট নয়।

তাহলে? জানতে তাকাল মেয়েটা।

দীর্ঘ এক মুহূর্ত কি ভাবল প্রথম জন। তারপর হঠাৎই ডান হাত তুলে দুআঙ্গুলে চুটকি বাজাল।

ড. ইভান বোককে ফেরৎ পাঠাব। কিন্তু মেয়েটাকে রেখে দেব। কি বল?

চমৎকার প্রস্তাব! সমস্বরে বলল মেয়ে এবং দ্বিতীয় লোকটা।

বনের একেবারে প্রান্তে পৌঁছে গেছে অস্টিন। গাছপালা শেষ। এরপর থেকে শুরু হয়েছে ঘাসবন।

চোখ তুলে ঘাসজমির ওপারে জমাট বরফের দিকে তাকাল অস্টিন। অনুমান করল, ওই বরফের ভেতরে কিছু থাকতে পারে না। ঘাস আর গাছে ছাওয়া বনের সীমানার কাছাকাছি অঞ্চটাই সন্দেহজনক। বায়োনিক চোখের সাহায্যে চারদিকটা একবার পরীক্ষা করে দেখল সে। ভেবেচিন্তে উত্তরে যাওয়াই ঠিক করল।

আধমাইল পরেই জায়গাটা পেল অস্টিন। প্রথমে আর দশটা সাধারণ ঝোপের মতই মনে হল। সাধারণ মানুষের চোখ এড়িয়ে যাবার জন্যে যথেষ্ট। কিন্তু অস্টিনের বায়োনিক চোখকে ফাঁকি দিতে পারল না ব্যাপারটা।

থমকে থেমে দাঁড়াল অস্টিন। উবু হয়ে বসল। ছোট ছোট কয়েকটা ভাঙা ডাল অস্বাভাবিক ঠেকেছে তার কাছে।

বিশাল ঝোপটার সত্তর-পঁচাত্তর ফুট ভেতরে বায়োনিক চোখের দৃষ্টি ফেলল অস্টিন। মাতালের মত টলছে লোকটা। ইভান বেকি। ঝোপের ভেতর দিয়ে বনের প্রান্তসীমার দিকে চলেছে।

ইভান! চেঁচিয়ে ডেকে উঠেই ঝোপঝাড় ভেদ করে ছুটল অস্টিন। চিৎকার শুনে ফিরে তাকাল ইভান। চোখে অদ্ভুত শূন্য দৃষ্টি। ইভান, ইভানের দু কাধ ধরে ঝাঁকুনি দিল অস্টিন, ঠিক আছ তো তুমি?

বার দুয়েক জোরে জোরে মাথা ঝাড়ল ইভান। ভেতরটা পরিষ্কার করতে চাইছে যেন।

কে?…ও স্টিভ? এখানে কি করে এলে?…

তোমাদের খুঁজতে এসেছি। গোল্ডম্যান, রেনট্রি আর গার্ডেরাও এসেছে। নিচে আছে ওরা।

পায়ের কাছে পড়ে আছে একটা গাছের গুঁড়ি। মরা। ঝড়ে উল্টে পড়েছিল হয়ত। ধপ করে ওটাতে বসে পড়ল ইভান। বোকা বোকা চোখে তাকাল অস্টিনের দিকে।

আমাদের খুঁজছ? এই তো কয়েক মুহূর্ত আগে রেডিওতে কথা বলছিলে…নাহ্, কিছু বুঝতে পারছি না!

স্তব্ধ হয়ে গেল অস্টিন। বেস ক্যাম্প থেকে কয়েক মাইল দূরে, ব্যাটল মাউনটেনের চূড়ার কাছাকাছি স্ত্রী আর মহামূল্যবান সাইসমিক সেন্সর হারিয়েও যেন কিছুই হয়নি, এমন ভাবে কথা বলছে কেন লোকটা?

যেন অস্টিনের মনের কথা বুঝতে পেরেই এদিক ওদিক তাকাতে লাগল ইভান।

মার্লিন গেল কোথায়?

এ প্রশ্ন তো আমি করব তোমাকে! বলল অস্টিন। ইভানের মতই চারদিকে তাকাতে লাগল সে। পুরো ক্ষমতা ব্যবহার করছে বায়োনিক চোখের। উত্তরে, বায়োনিক দূরবীনের ক্ষমতাসীমারও ওপারে একটা অস্বাভাবিক নড়াচড়া লক্ষ্য করল অস্টিন। কিন্তু ভাল মত দেখা না যাওয়ায় বুঝতে পারল না ব্যাপারটা ঠিক কি? মানুষ? ইনফ্রারেড ম্যাগনিফিকেশন পুরো ব্যবহার করল অস্টিন। হ্যাঁ, কিছুটা পরিষ্কার হয়েছে এবার। মানুষের মতই দুপেয়ে জীবটা, কিন্তু আরও বড়। ছুটছে। মানুষের চেয়ে অনেক অনেক বেশি দ্রুত।

এখানেই থাক, বলেই ছুটল অস্টিন! জঙ্গলের আরও গভীরে ক্রমশ ঢুকে যাচ্ছে জীবটা। পিছু নিল সে।

স্টিভ, টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল ইভান। অস্টিনকে অনুসরণ করার চেষ্টা করতে করতে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, মার্লিন কোথায়, মার্লিন…?

হঠাৎই মাথা ঘুরে উঠল ইভানের। চোখে অন্ধকার দেখছে। কিছু একটা অবলম্বনের জন্যে হাত বাড়াল। কিন্তু শুধুই বাতাস ঠেকল হাতে। কাটা কলাগাছের মত দড়াম করে মাটিতে আছড়ে পড়ল সে। অজ্ঞান।

পাঁই করে ঘুরল অস্টিন। ঝড়ের গতিতে ছুটে এল। উপুড় হয়ে পড়ে আছে ইভান। ধরে তাকে চিৎ করে শোয়াল অস্টিন। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল জঙ্গলের দিকে। কিন্তু জীবটার ছায়াও দেখা যাচ্ছে না আর।

আপাতত সাসকোয়াচের চিন্তা বাদ দিল অস্টিন। ঝুঁকে বসে ইভানের একটা হাত তুলে নিল নিজের হাতে। নাড়ি দেখল। গতি কম, কিন্তু দুর্বল নয়। তীক্ষ্ণ চোখে ইভানের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে অস্টিন। অস্বাভাবিক কিছু আবিষ্কারের চেষ্টা করছে। নেই। আস্তে করে হাতটা নামিয়ে রেখে প্যান্টের ডান পা-টা উরু পর্যন্ত গুটিয়ে নিল সে।

সাধারণ মানুষের চোখে অদৃশ্য একটা খোপ বসান আছে অস্টিনের ডান উরুতে। টুল বক্স রাখা আছে এখানে। ক্ষুদে একটা অক্সিজেন ট্যাংক আছে এই বাক্সে। আর আছে শ্বাস ফেলার নল যুক্ত একটা মাস্ক। একটা অত্যন্ত শক্তিশালী ক্ষুদে ট্রানসিভারও আছে। যন্ত্রটা এতই শক্তিশালী, পৃথিবীর যে কোন জায়গায় খবর আদান প্রদান করা যাবে এর সাহায্যে। মাঝে মধ্যে বিশেষ অ্যাসাইনমেন্টে গেলে এই চেম্বারে একটা ৩.৮-ও একটা নিয়ে নেয় অস্টিন।

টুলস রাখার চেম্বারের ওপরের প্লাস্টিকের আবরণ সরাল অস্টিন। ভেতরে কয়েকটা ক্ষুদে সুইচ। একটা সুইচ টিপতেই একটা প্লাস্টিকের দরজা সরে গেল। ভেতর থেকে টুল বক্স বের করে ট্রানসিভারটা নিয়ে নিল। একটা বিশেষ সুইচ টিপতেই গোল্ডম্যানের সঙ্গে রাখা রিসিভারে সংকেত পাঠাতে শুরু করল ট্রানসিভার। কয়েক সেকেন্ড পরেই উত্তর এল।

ট্রিনিটি বেস টু অস্টিন, কথা বললেন গোল্ডম্যান। অস্টিনই তো, নাকি?

হ্যাঁ! ব্যাটল মাউনটেনের পশ্চিম ঢালে আছি আমি, বনরেখা বরাবর। ইভানকে পেয়েছি। অজ্ঞান হয়ে গেছে সে।

মার্লিন? ওকে পাওনি? আর সেন্সরটা?

না।

ইভানকে জঙ্গল থেকে বের করে আনতে পারবে?

পারব। মাইল দুই ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে বয়ে আনতে সময় একটু বেশি লাগবে অবশ্য। ততক্ষণে একটা কপ্টার পাঠান সম্ভব?

সম্ভব, জবাব দিলেন গোল্ডম্যান। মেন বেসের সঙ্গে এখুনি কথা বলছি। বিশ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাবে। কিন্তু কোথায় পাবে ওরা তোমাকে?

ইভানকে নিয়ে সোজা খোলা জায়গায় নেমে আসব আমি। তিন-সাড়ে তিন হাজার ফুট ওপরে একটা লম্বা খাদ মত আছে। এর লাগোয়া দক্ষিণে থাকব।

গুড। এখুনি কপ্টার পাঠানর ব্যবস্থা করছি। তা, ইভান আর মার্লিনের কি হয়েছে বলে তোমার ধারণা?

বুঝতে পারছি না। ইভানের সঙ্গে কথা বলেছি আমি, কিন্তু কিছুই যেন জানে সে। কিছু যেন ঘটেনি। নিশিতে পাওয়া মানুষের মতই ভাবসাব দেখাচ্ছে।

ঠিক আছে, ডাক্তাররা পরীক্ষা করলেই বুঝতে পারবেন। ভাল কথা, কপ্টারের সঙ্গে কি আমাদের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের যোগাযোগ রাখতে বলব?

দরকার নেই। শুধু ফড়িঙটাকেই দরকার আমার। বোঝাটা আমার কাঁধ থেকে নামিয়ে দেবে।

ঠিক আছে, যা ভাল বোঝ। হ্যাঁ, আরেকটা কথা। রেনট্রিকে বলুন, তার পূর্বপুরুষরা মিছে কথা বলেনি।

আঁ…

বিশালদেহী জীবটা আমার আশেপাশেই কোথাও আছে, বলল অস্টিন। আর শুধু বিশাল নয়, ভারি দেহটা বইবার মত প্রচন্ড শক্তিও আছে শরীরে।

আঁ… আবারও এই একটা শব্দই বেরিয়ে এল গোল্ডম্যানের মুখ থেকে।

তাই-ই। এবং চেহারা দেখেই বুঝেছি, অতি ভয়ংকর ওই জীবটা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *