০৩. সালেম হাউসের দিনগুলো

সালেম হাউসের দিনগুলো

একমাস পড়লাম মি. মেল-এর কাছে। ভালই চলছিল পড়াশোনা। হঠাৎ একদিন তলব করলেন হেডমাস্টার মি. ক্রীক্‌ল।

মি. ক্রী্ক্‌ল-এর মুখটা দেখতে ভয়ঙ্কর। চোখদুটো ছোট, কুতকুঁতে। নাকও ছোট। বিশাল চিবুক। মাথায় মস্ত টাক।

এটাই তাহলে সেই তরুণ ভদ্রলোকটি-যাকে শেখাতে হবে বাধ্যতা কাকে বলে। যার দাঁত ফাইল দিয়ে ঘসে ছোট করে দিতে হবে, যাতে সে না কামড়ায়। ওর সৎ বাপকে আমি চিনি। তিনি একজন অত্যন্ত ভাল মানুষ, বলতে বলতে তিনি আমার কান মোচড়াতে লাগলেন খুব জোরে জোরে।

আমি কে, জানো? প্রশ্ন করলেন মি. ক্রীক্‌লকল।

যন্ত্রণা-বিকৃত মুখে বললাম, এখনও জানি না, স্যার।

আমার কানে আরেকটা জোর মোচড় দিয়ে তিনি বললেন, আমি এক তাতার। যখন বলি কাউকে দিয়ে একটা কাজ করাব তখন বুঝতে হবে যে করাবই। আমি কর্তব্য পালন করি। তুমি শীঘ্রিই জানবে আমাকে। এখন যাও, বলে ছেড়ে দিলেন আমার কানটা।

যেতে বলায় খুশি হলাম। ছুটে পালাতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু মনে যে একটা নালিশ আছে। সেটা না বলে যেতে পারলাম না। নিজের সাহস দেখে নিজেই অবাক হয়ে গেলাম। বললাম, প্লীজ, স্যার…

আবার কি?

প্লীজ, স্যার, অন্য ছেলেরা এসে পৌছার আগে আমার পিঠের লেখাটা…

আমাকে ভয় দেখানোর জন্য কিনা জানি না, মি. ক্রীক্‌ল এমনভাবে লাফিয়ে উঠলেন চেয়ার ছেড়ে যে আমি আর দাঁড়ালাম না। প্রাণপণে ছুটে চলে গেলাম আমার বেডরূমে। বিছানায় পড়ে কাপতে লাগলাম থরথর করে। বুঝলাম, মি. ক্রীক্‌ল কম কঠোর নন মি. মার্ডস্টোনের চেয়ে। তপ্ত কড়াই থেকে আমি জ্বলন্ত উনুনে পড়ে গেছি।

প্রথম যে ছেলেটি স্কুলে ফিরে এল তার নাম টমি ট্যাস। আমার পিঠের বিজ্ঞপ্তিটা পড়ে হেসে গড়িয়ে পড়ল সে।

এরপর আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো জেমস স্টিয়ারফোর্থের সাথে। উঁচু ক্লাসের ছাত্র। প্রায় ছফুট লম্বা। অত্যন্ত সুশ্রী এবং ভাল ছাত্র। সে আমাকে বলল যে ওখানকার রীতি হচ্ছে কোন নতুন ছাত্র এলে অন্যদেরকে গোপনে ভোজ দেয়া। সে আরও বলল, এক বোতল কার্যাণ্ট মদ, বিস্কুট, কিছু ফলমূল কিনে আমার ঘরে পাচার করবে।

রাজি হলাম, যদিও জানি যে এতে আমার মায়ের দেয়া শেষ আধ-ক্রাউনটিও খরচ হয়ে যাবে।

সেই রাতে আমার বিছানায় খাবারগুলো সাজিয়ে দিল স্টিয়ারফোর্থ। ঘরের অন্য ছেলেরা যোগ দিল আমাদের সঙ্গে। কেউ বসল কাছাকাছি বিছানায়, কেউ কেউ গাদাগাদি করে ফ্লোরে। আমাদের সেই ঘন হয়ে বসা, ফিসফিস করে কথা বলা আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। ছেলেরা সবাই স্কুলের গল্প, মাস্টারদের কাহিনি আমাকে শোনাল।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলল গল্পগুজব। স্কুলটা সম্পর্কে কত রকম কথাই না শুনলাম। শুনলাম, মি, ক্রীকল যে নিজেকে তাতার বলেছেন সেটা মিথ্যে বড়াই নয়। তিনি সত্যিই এক কঠোর নিষ্ঠুর দানব। প্রতিদিন বাচ্চাদেরকে বেধড়ক পিটান। ডানে-বাঁয়ে হাতের কাছে যাকে পান পিটুনি দেন নির্মমভাবে। বেত চালানো ছাড়া আর কিছুই তিনি জানেন না। স্কুলের একেবারে নিচের ক্লাসের ছেলেদের চেয়েও অজ্ঞ লোকটা। জিঞ্জার-বিয়ার বেচতেন ফেরী করে। ওটাতে ফেল মেরে স্কুলের ব্যবসা ফেঁদেছেন।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই যে স্কুলের একটি ছেলের গায়ে হাত তোলার সাহস তার হয় না। সেই ছেলেটি হলো জে. স্টিয়ারফোর্থ। সে নিজেই বলল যে কথাটা ঠিক। হাত তুলে দেখুক না! তুললে সে কি করবে—এ প্রশ্নের জবাবে স্টিয়ারফোর্থ বলল কপালে অ্যায়সা জোরে ঘুসি মারবে যে ব্যাটা চিৎপটাং হয়ে যাবে।

এসব শুনতে শুনতে অনেক রাত হয়ে গেল। আমরা শুতে চললাম।

গুড নাইট, কপারফিল্ড, বলল স্টিয়ারফোর্থ। আমি তোমার দেখাশোনা করব।

আপনার অনুগ্রহ, বললাম কৃতজ্ঞভাবে।

ওই রাত থেকে সুশ্রী, লম্বা, বলিষ্ঠ ছাত্র স্টিয়ারফোর্থ আমার রক্ষক হয়ে দাঁড়াল।

শুয়ে শুয়ে আমি অনেকক্ষণ ভাবলাম ওর কথা। শেষ পর্যন্ত উঠে বসে যাওয়া হলো। ওটা ছিল আমার দশম জন্মদিন। আশা করেছিলাম পেগোটি কিছু পাঠিয়েছে আমার জন্যে। দেখলাম হেড-মাস্টারের বৌ, মিসেস ক্রীক্‌লকল দাঁড়িয়ে আছেন একটা চিঠি হাতে। আমার দিকে গম্ভীরভাবে তাকিয়ে তিনি বললেন, আমি দুঃখিত, ডেভিড, তোমার মা আর ভাইটি মারা গেছে।

মিসেস ক্রীক্‌ল আমাকে সারা দিন রেখে দিলেন বসার ঘরে। আমি কাঁদলাম, ঘুমালাম। আবার কাঁদলাম, আবার ঘুমালাম। পরদিন বিদায় জানালাম ট্র্যাডলস আর স্টিয়ারফোর্থকে। তখনও আমি বুঝতে পারিনি যে সালেম হাউস থেকে ওটাই আমার শেষ বিদায়। আর কখনও যাব না সেই স্কুলে।

বাড়ি পৌঁছলাম। দরজা পর্যন্ত যাবার আগেই পেগোটি এসে জড়িয়ে ধরল আমাকে। ওকে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত ও অবসন্ন দেখাল। মায়ের শেষ দিনগুলোতে সে রাত-দিন বসে ছিল তার পাশে।

একটা কালো সুট পরানো হলো আমাকে মায়ের অন্ত্যেষ্টির জন্যে। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে নিজেকে একেবারে অসহায় ও একা মনে হলো। এতটা অসহায় আর নিঃসঙ্গ দশ বছরের জীবনে নিজেকে আর কখনও ভাবিনি।

মা চলে গেলেন। পরে মিস মার্ডস্টোনের প্রথম কাজটি হলো পেগোটিকে বরখাস্ত করা। আমার বা আমার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি কথাও বলা হলো না। আমার মনে হয়, এক মাসের নোটিসে আমাকেও বরখাস্ত করতে পারলে বোধহয় খুশি হত ওরা। শেষ পর্যন্ত বলা হলো যে আমি আর স্কুলে ফিরে যাচ্ছি না।

মি. ও মিস মার্ডস্টোন কোন মনোযোগই দিলেন না আমার প্রতি। কাছাকাছি কোথাও কাজ না পেয়ে পেগোটি ইয়ারমাউথে ভাইয়ের কাছে চলে যাবে স্থির। করল। সবচেয়ে বড় কথা, আমার ইচ্ছা হলো ওর সঙ্গে যেতে, ছোট্ট এমিলিকে আমার দুঃখের কথা জানাতে। যাবার কথা বলতেই মিস মার্ডস্টোন রাজি হয়ে। গেলেন। মনে হলো, আমাকে বাড়ি থেকে বের করার সুযোগ পাওয়া গেছে ভেবে খুশি হয়ে উঠলেন তিনি। কাজেই আমি চলে গেলাম পেপগাটির সঙ্গে।

ইয়ারমাউথ পর্যন্ত সারাটা পথ মি, বার্কিস মুখ টিপে হাসলেন পেগোটির দিকে চেয়ে।

সাগর-তীরের দিনগুলো কাটতে লাগল আগের মতই দ্রুত। আমি আমার স্কুলের কথা, ট্র্যাডলস আর স্টিয়ারফোর্থের কথা বললাম বন্ধুদেরকে। মা-র কথা কিছুই বলা হলো না। সবাই খুব সদয় ব্যবহার করল আমার সঙ্গে।

একদিন পেগোটি আর বার্কিস এমিলি আর আমাকে বেড়াতে নিয়ে যাবে বলে গাড়িতে বসিয়ে চলল। গাড়ি গিয়ে থামল গির্জার সামনে। পেগোটি আর বার্কিন্স গেল ভেতরে। আমরা বসে রইলাম গাড়িতে। অনেকক্ষণ পরে বেরিয়ে এল ওরা। আমাদেরকে বলল যে ওদের বিয়ে হয়ে গেছে।

বার্কিসের ছিমছাম কটেজে থাকতে যাবার আগ মুহূর্তে পেগোটি আমাকে বলল, মাস্টার ডেভি, আজকের দিন থেকে আমার বাড়িতে তোমার জন্য একটা বিশেষ ঘর থাকবে। টেবিলের ওপর থাকবে তোমার কুমিরের বই-যাতে আগামীকাল, কিংবা বহু বছর পরে এলেও বইটা তুমি পড়তে পারো।

তাকালাম ওর দিকে। ও শুয়ে আছে উপুড় হয়ে। মাথাটা বাহুর ওপর পড়ে আছে। পরে জেনেছি ওর শোবার ওটাই প্রিয় ভঙ্গি।

পরদিন স্কুল শুরু হলো পুরোদমে। মি. ক্রীক্‌ল-এর প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে গোটা স্কুলে নেমে এল কবরের স্তব্ধতা। আমার কাছে এসে তিনি বললেন, ওহে ছোট্ট মিঞা, শুনলাম তুমি নাকি কামড়ানোর ওস্তাদ। আমারও খ্যাতি আছে পিটানোতে। কথাটার তিনি প্রমাণ দিলেন সেদিন আমাকে আর অন্য প্রায় সব ছেলেকে বেদম পিটিয়ে। আমার জামার পিঠে আটকানো বিজ্ঞপ্তিটা বেতের বাড়ি ঠেকিয়ে দিচ্ছিল। তাই ওটা তিনি খুলে ফেলে দিলেন।

বছরের ওই ছমাস বেচারা ট্র্যাডলস প্রতিদিন বেত খেল। অন্য ছেলেরাও খেল। কেবল একজন, জেমস স্টিয়ারফোর্থ ছাড়া।

একদিন স্টিয়ারফোর্থকে বললাম আমার বাবার লাইব্রেরিতে পড়া গল্পগুলোর কথা।

তোমার মনে আছে ওগুলো? জিজ্ঞেস করল সে।

সব মনে আছে, জবাব দিলাম। আমার স্মরণশক্তি ভাল।

তাহলে এক কাজ করা যাক, কপারফিল্ড। আমার ভাল ঘুম হয় না। তুমি। আমাকে গল্পগুলো শোনাও। একটা একটা করে তুমি বলে যাবে, আর আমি শুনব। এমনি করে রাতগুলোকে আমরা আরব্যরজনী বানিয়ে তুলব, বলল সে।

সেইদিন থেকেই শুরু করলাম আমরা। বিছানায় শুয়ে অন্ধকারে গল্প বলতে লাগলাম। বিভিন্ন চরিত্র অনুযায়ী গলার স্বর বদলে। এক ধরনের কোরাস হিসেবে যোগ দিল ট্র্যাডলস। আহা-উহু, কান্নাকাটি, দীর্ঘশ্বাস ইত্যাদি দিয়ে শব্দের আবহ সৃষ্টি করল সে।

এর প্রতিদানে স্টিয়ারফোর্থ আমাকে অঙ্কের ব্যাপারে সাহায্য করল এবং অন্য ছেলেদের জুলুম থেকে রক্ষা করল।

পড়াশোনার ব্যাপারে সালেম হাউসের তেমন সুনাম ছিল না। তবুও আমার কিছু উন্নতি হলো। কারণ, পড়ুয়া হিসেবে আমি ভাল ছিলাম এবং একটা প্রকৃত শিক্ষালাভের প্রথম সুযোগটা আমি উপভোগ করছিলাম।

ছুটির দিন এগিয়ে আসছে। সপ্তাহ গোনার বদলে দিন গোনা শুরু হয়েছে। আমার ভয় হচ্ছিল মি. মার্ডস্টোন আমাকে বাড়ি যেতে ডাকবেন না। কিন্তু একদিন স্টিয়ারফোর্থ একটা চিঠি নিয়ে এল। মায়ের চিঠি। মা আমাকে বাড়ি যেতে বলেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *