০৩. সামান্য আতঙ্ক বোধ করলাম

এই প্রথমবারের মত সামান্য আতঙ্ক বোধ করলাম।

কম্পিউটার পারফেক্ট নয়, ভুল করে, বললাম। ঘুরে তাঁর চেয়ারের কাছে এলাম। কম্পিউটার স্ক্রীনের দিকে দৃষ্টি আমার।

নিজেই দেখো, বললেন মিসেস পোর্টার। এখানে K অক্ষরের মধ্যে কোথাও তোমার নাম নেই।

কম্পিউটারের কথা বাদ দিন, মিসেস পোর্টার। আমার দিকে তাকান-আমি কিশোর পাশা, আমাকে আপনি ছোটকাল থেকে দেখছেন! ঠাট্টাটা অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে না, আপনিই বলুন? আমি ক্লাসে ফিরে যেতে চাই, আমার বইগুলো ফিরে পেতে চাই, এবং চাই এই ননসেন্স বন্ধ হোক!

ঘন-ঘন শ্বাস নিচ্ছি এবং আমার কাঁধ এখন রীতিমত টাটাচ্ছে। ইতিকর্তব্য ঠিক করতে পারছি না। কাউকে বিশ্বাস করার উপায় নেই। সবাই আমার সঙ্গে তামাশা করছে। এর চাইতেও খারাপ ব্যাপার…আমার সন্দেহ হচ্ছে এটা আসলেই তামাশা কিনা। কিন্তু এ ছাড়া আর কীই বা হবে। আমি এক সকালে ঘুম থেকে উঠলাম আর তারপর কেউ আমাকে চিনতে পারছে না এটা কীভাবে সম্ভব!

আহ, কিশোর… পিছন থেকে কে যেন বলল।

ঘুরে দাঁড়ালাম। গভীর ভাবনায় এতটাই ডুবে ছিলাম, টেরই পাইনি মিসেস পোর্টার কখন বেরিয়ে গিয়েছিলেন কামরা ছেড়ে এবং এখন ফিরেছেন। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে মিস্টার লাউয়ি, স্কুলের সাইকোলজিস্ট। সব ছাত্রের সাধারণ পরীক্ষা নেন তিনি, এবং কারও বিশেষ কাউন্সেলিঙের দরকার পড়লে তাও করেন।

মি. লাউয়ি আমার নাম ধরে ডেকেছেন।

বলুন, মিস্টার লাউয়ি? বললাম। অনুভব করলাম বড় ধরনের বিপদের মুখোমুখি হতে পারি। স্কুলের সাইকোলজিস্টকে ডেকে এনেছেন কেন মিসেস পোর্টার?

তুমি আমার নাম জানো? বিস্মিত শোনাল মি. লাউয়ির কণ্ঠ।

অবশ্যই জানি, জবাব দিলাম। আপনি স্কুলের সাইকোলজিস্ট, ছাত্র-ছাত্রীদের ইন্টেলিজেন্স টেস্ট নেন।

ঠিক বলেছ, বললেন মি. লাউয়ি। তা ছাড়া যে সব ছেলে-মেয়ে সামান্য…আপসেট ফীল করে আমি তাদেরকেও হেল্প করি। তুমি কি আপসেট, কিশোর?

ভীষণ আপসেট, মিস্টার লাউয়ি। সবাই বলছে তারা আমাকে চেনে না। আপনি হলেও আপসেট হতেন।

মি. লাঙলিঙের মরবের সাধারণীড়িয়ে মন মরালাম, স্ট্রেই

হ্যাঁ, হ্যাঁ, জানি। কিন্তু, আহ্, মিসেস পোর্টার বলছেন তুমি নাকি নিজেকে এ স্কুলের ছাত্র হিসেবে দাবি করছ। কিশোর, আমরা দুজনই জানি সেটা সত্যি নয়।

আচ্ছা, ওরা এবার স্কুলের সাইকোলজিস্টকেও এ খেলায় জড়িয়েছে।

আমি সিদ্ধান্ত নিলাম নিজের যুক্তি দিয়ে পাল্টা লড়াই করব।

মিস্টার লাউয়ি, আমি যদি এখানকার ছাত্র না-ই হব তা হলে সবার নাম…এমনকী আপনারও নাম জানলাম কীভাবে?

আমরা সেটাই ভাবছি, কিশোর, ঠাণ্ডা গলায় বললেন তিনি। তুমি আমাদের নাম জাননা কীভাবে? আমি তোমার বয়সী এক ছেলের কেসের কথা জানি। সে মরিয়া হয়ে উঠেছিল বিশেষ একটি স্কুলে অ্যাটেও করার জন্যে। সেজন্যে সে সমস্ত ফ্যাকাল্টি মেম্বার আর কিছু ছাত্র-ছাত্রীর নাম মুখস্থ করেছিল। বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে স্কুলটাতে অ্যাটেও করার চেষ্টা করেছিল ও। তবে প্রথম দিনই সে ধরা পড়ে যায়। ব্যাপারটা আসলেই দুঃখজনক।

আপনি বলছেন আমার মাথা খারাপ এবং আমি এখানকার ছাত্র নই।

ঠিক তা না, মৃদু কণ্ঠে বললেন মি. লাউয়ি। কিন্তু, কিশোর, আমরা কখনও কখনও কোন কিছু এত বেশি করে চাই যে কল্পনার লাগাম ছেড়ে দিই।

এটা কি আমার কল্পনা, আমি এবছরের ফুটবল টিমের স্টার্টিং মেম্বার? বলতে গিয়ে গলা চড়ে গেল আমার। মি. লাউয়ি আর মিসেস পোর্টার পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করে আমার দিকে চাইলেন।

তুমি ফুটবল টিমে আছ? মি. লাউয়ি প্রশ্ন করলেন। কণ্ঠস্বর শান্ত। সান্তনা দেয়ার চেষ্টা টের পাওয়া যায়।

হা! টিমের ফটো ঝুলছে এই অফিসের বাইরের দেয়ালে, বললাম আমি।

তা হলে গিয়েই বরং দেখা যাক, বললেন মি. লাউয়ি।

হল ফাঁকা আর চুপচাপ এখনও, তবে শীঘি সরগরম হয়ে উঠবে। প্রথম ক্লাসের ঘন্টা পড়বে যে কোন মুহূর্তে। আমি সোজা এগোলাম ফুটবল টিমের ফটোটার দিকে, ফ্রেমে বাঁধিয়ে যেটা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে মেইন হলওয়েতে।

আমি রোজ ছবিটার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকি। গর্ব বোধ হয় আমার। ফুটবল টিমের সদস্য হিসেবে আলাদা এক অনুভূতি কাজ করে, কেননা গায়ে-গতরে অন্যদের মত শক্তিশালী নই কিনা। আমি সামনের সারিতে। সেন্টার রব মিশেল আর কোয়ার্টার ব্যাক মুসার ঠিক মাঝখানে।

মিস্টার লাউয়ি, আমি যদি এ স্কুলের ছাত্র না হই তবে এর কী ব্যাখ্যা দেবেন

কথা বন্ধ হয়ে গেল আমার। ফটোটার দিকে চাইলাম। সামনের সারিতে রয়েছে রব মিশেল। তার পাশে দাঁড়িয়ে মুসা আমান। কিন্তু আমি নেই। ফটো থেকে আমি উধাও!

মি. লাউয়ি উকি মেরে ছবিটা দেখলেন।

তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না, কিশোর। তুমি ছবিতে কোথায় দাঁড়িয়েছ?

এক পা পিছু হটলাম।

ওরা-ওরা ছবিতে কারসাজি করেছে। আমি টিমে আছি। আমি স্টার্টিং রাইট এণ্ড। যাকে খুশি জিজ্ঞেস করুন!

কিশোর, তুমি আমার সাথে এসো। আমাদের আরও কথা বলা দরকার, মি. লাউয়ি বললেন। হাত বাড়িয়ে আমার কাঁধে রাখলেন, যে কাঁধটা টাটাচ্ছে।

আউ! চেঁচিয়ে উঠে, সত করে সরে গেলাম। সে মুহূর্তে ঘন্টা বাজল এবং হলগুলো ভরে গেল ছাত্র-ছাত্রীতে। শশব্যঙে ক্লাসরুমের দিকে চলেছে তারা।

মি, লাউয়ির কাছ থেকে সরে পড়ার জন্য ছেলে-মেয়েদের স্রোতকে কাজে লাগালাম। লাউয়ির মনে কী ছিল কে জানে, কিন্তু আমি এতে জড়াতে চাই না।

আমি জানি একজন ফ্যাকাল্টি সদস্য আছেন যিনি অদ্ভুত এই খেলায় নিজেকে জড়াবেন না। মি, হালবার্ট, আমার বায়োলজি টিচার। তিনি আমাদেরকে সব সময় সত্য আর জ্ঞানের শিক্ষা দেন, বায়োলজির পাশাপাশি। মি. হালবার্টের কাছে আমাকে যেতে হবে।

ভাগ্যক্রমে, বায়োলজি আমার প্রথম ক্লাস, তাই দ্রুত পায়ে সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের দিকে এগোলাম। কোনা ঘুরতেই দেখতে পেলাম মি. লাউয়ি স্কুলের এক দারোয়ানের সঙ্গে কথা বলছেন।

ঝট করে সরে গেলাম। আমাকে যাতে দেখতে না পায়। আমার ধারণা মি. লাউয়ি লোকটিকে আমার উপর নজর রাখতে বলছেন।

মি. লাউয়ি আর দারোয়ান দুদিকে চলে যেতেই, ক্লাসরুমের দিকে পা বাড়ালাম আমি। শেষ ঘণ্টা পড়ে গেছে ইতোমধ্যে, সুতরাং সবাই এখন যার যার ক্লাসে বসে পড়েছে।

দরজাটা বন্ধ। টান মেরে খুলে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম ভিতরে।

মিস্টার হালবা–বলতে শুরু করেছিলাম, কিন্তু শব্দটা আটকে গেল আমার গলায়।

মি. হালবার্ট সামান্য স্থূলকায়। মাথায় পাতলা, সাদা চুল, বয়স রাশেদ চাচার মত। কিন্তু ক্লাসের সামনে যিনি দাঁড়িয়ে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানুষ। বছর পঁচিশেকের এক মহিলা টিচার। ভদ্রমহিলা হালকা-পাতলা, তেমন লম্বা নন-সম্ভবত চাইনিজ।

আমার দিকে চাইলেন তিনি।

কী চাই? আমার ক্লাসে ডিস্টার্ব করছ কেন? মিস্টার হালবার্ট কোথায়? প্রশ্ন করলাম। কে? মহিলা বললেন। মিস্টার হালবার্ট…যিনি এই ক্লাসটা নেন! বললাম।

অ্যাই, সেই পাগলটা আবার এসেছে, যে বলছিল ফুটবল টিমে আছে, রুমের মাঝখান থেকে একটি কণ্ঠ শোনা গেল।

কণ্ঠস্বর লক্ষ্য করে চাইলাম। মুসা এ কথা বলেছে।

মুসা, আমাকে সাহায্য করো, আমরা না বন্ধু? চেঁচিয়ে উঠলাম। ওরা এমনকী হলওয়ের ছবি থেকেও আমাকে বাদ দিয়েছে।

মিস লি, এর মাথার স্ক্রু ঢিলে।

জোয়ান জেনসেন। জোয়ান! ক্লাসে ও আমার স্টাডি পার্টনার। ও এমন কথা বলতে পারল!

মিস লি আমার দিকে এগিয়ে এলেন।

তুমি ভুল ক্লাসরুমে এসেছ, ইয়াং ম্যান।

আমার মনে হয় ও ভুল গ্রহে এসেছে! বলল মুসা। গোটা ক্লাস হেসে উঠল। আমার বিশ্বাস হলো না। ওরা এমনভাবে আমাকে নিয়ে হাসছে, আমি যেন ভাড়, সঙ!

হাসো, হাসো! চেঁচিয়ে উঠলাম, চোখ জ্বালা করছে অনুভব করলাম। কে তোমাদের চায়! দৌড় দেয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ালাম।

শোনো, মিস লি মৃদু কণ্ঠে বললেন। ঘুরে দাঁড়িয়ে তার দিকে চাইলাম।

বলুন।

আজকে নিজেকে তোমার একদম নতুন মানুষ মনে হচ্ছে, তাই না?

বিস্মিত হলাম। দ্রমহিলা কী বলছেন জিজ্ঞেস করতে চাইলাম। কিন্তু উনি মুহূর্তের জন্য আমার দিকে চেয়ে হাসলেন। এবং তারপর, যেন বাতাসের ধাক্কায়, ক্লাসরুমের দরজাটা দড়াম করে লেগে গেল আমার মুখের উপর। হলওয়েতে একাকী দাঁড়িয়ে রইলাম আমি।

ওই যে ও! আমার উদ্দেশে কে যেন চেঁচিয়ে উঠল। ঘুরে চাইলাম। দারোয়ান আমাকে দেখে ফেলেছে। হঠাৎই সে আর মি. লাউয়ি দৌড়ে আসতে লাগল আমার দিকে। আমাকে পালাতে হবে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *