০৩. মুক্তো-ডুবুরিদের কাঠের বাসাগুলো

মুক্তো-ডুবুরিদের কাঠের বাসাগুলো সাগরতীরের কাছে, শহরের ডান প্রান্তে। বাড়িগুলোর সামনে ক্যানু রয়েছে। কিনো হুয়ানাকে নিয়ে শ্লথ পায়ে নিজেদের ক্যানুর কাছে এল। যাবতীয় সম্পত্তির মধ্যে ক্যানুটাই কিনোর সবচাইতে মূল্যবান সম্পদ। ক্যানুটা বহু পুরানো। কিনোর বাপ-দাদার ছিল ওটা। উত্তরাধিকার সূত্রে এখন জিনিসটা কিনোর।

যার ক্যানু আছে তার না খেয়ে মরার ভয় নেই। প্রতি বছর ক্যানুটায় প্রলেপ মাখায় কিনো, ওর বাবা শিখিয়েছিল। ক্যানুর বাইরেটায় প্রলেপ ক্রমান্বয়ে শক্ত হয়ে, ওটাকে শক্তিশালী আর নিরাপদ করে তোলে।

ক্যানুর তলদেশে ডাইভিং স্টোন, ঝুড়ি আর দড়ি নামিয়ে রাখল কিনো। তারপর কম্বলটা ভাঁজ করে সেটাও রাখল।

ব্লাঙ্কেটে কয়োটিটোকে শোয়াল হুয়ানা। শাল দিয়ে ঢেকে দিল বাচ্চাটাকে, রোদে যাতে কষ্ট না পায়। কয়োটিটো এখন শান্ত। কিন্তু ক্ষতস্থানটা ওর ক্রমেই আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে, হুয়ানা লক্ষ্য করল বিষ ঘাড়ের কাছে উঠে কানের লতি অবধি পৌঁছে গেছে। কয়েটিটোর মুখের চেহারায় তপ্ত আর লালচে ভাব।

কিছু বাদামী রঙের উদ্ভিদ সাগরের পানি থেকে জোগাড় করে, বাচ্চাটার কাঁধের ওপর রাখল হুয়ানা। এই উদ্ভিদের উপকারিতা ডাক্তারের ওষুধের চাইতে কোন অংশে কম নয়। কিন্তু যেহেতু পয়সা লাগে না, লোকের এর ওপর বিশ্বাস নেই।

পেটের ভয়ানক ব্যথাটা এখনও ধরেনি কয়োটিটোকে। হুয়ানা হয়তো সময় মত বিষটুকু টেনে নিতে পেরেছিল। কিন্তু সে এখনও তার একমাত্র সন্তানের জন্যে উদ্বিগ্ন। হুয়ানা সরাসরি খোদার কাছে কয়োটিটোর জন্যে প্রার্থনা করেনি। তার বদলে, ঘুরপথে দোয়া করেছে, কিনো যাতে একটা মুক্তো খুঁজে পায়। তখন ডাক্তারের ফী মেটাতে পারবে ওরা।

কিনো আর হুয়ানা ক্যানুটা ঠেলে বেলাভূমি থেকে পানিতে নামাল। এবার ওতে চড়ে বসল হুয়ানা এবং নৌকার পেছন দিকে ধাক্কা দিল কিনো।

ক্যানুর পাশে পাশে পানিতে হাঁটল কিনো, ওটা যতক্ষণ না চড়াও হলো খুদে খুদে ঢেউয়ের মাথায়। এরপর কিনো আর হুয়ানা বৈঠা মেরে সামনে বাড়াল ওটাকে। পানি কেটে তরতর করে এগোল ক্যানু। অন্যান্য মুক্তো-ডুবুরি আগেই চলে গেছে সাগরে। কমুহূর্ত বাদেই, মুক্তো খেতের আশপাশে তাদের দেখতে পেল কিনো।

কিনোর সাথে দুটো দড়ি। ভারী এক পাথরে বাঁধা রয়েছে একটা। আর অপরটা বাঁধা এক ঝুড়িতে। শার্ট, প্যান্ট খুলে নিল কিনো, ক্যানুর তলদেশে হ্যাটটার সঙ্গে রেখে দিল ওগুলো। পানি এখানে তেলের মত মসৃণ। এক হাতে পাথর নিল কিনো, অপর হাতে ঝুড়ি। ক্যানুর এক পাশ দিয়ে পা দুখানা নামিয়ে দিতে, পাথরটা টেনে ওকে নামিয়ে নিল সাগরতলে। কিনোর পেছনে বুদ্বুদ উঠল, পানি যতক্ষণ না পরিষ্কার হয়ে দৃশ্যমান হলো, উঠতেই থাকল। চোখ তুলে চাইল ও। সাগরের পানি আয়নার মত ঝকঝকে। ক্যানুর নিচটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ও।

সাবধানে নড়াচড়া করছে কিনো, পানি যেন কাদা আর বালিতে ঘোলাটে হয়ে না পড়ে। ওর পাথরটার গায়ে পা রাখল। দ্রুত কাজ করে সাগরতল থেকে ঝিনুক টেনে তুলছে কিনা।

কিনোর গোত্রের লোকজন, বর্তমানে অস্তিত্ব আছে কিংবা অতীতে ঘটে গেছে, এমন সব বিষয় নিয়ে গান গায়। মাছ, উত্তাল সাগর, শান্ত সাগর, আলো, আঁধার, চাঁদ, সূর্য-এ সবই তাদের গানের উপজীব্য। সবাই গাইতে জানে এ গানগুলো। ঝুড়ি ভরার সময়, কিনোর মাথার মধ্যে ঘুরতে লাগল সাগরের নানা গান। দম বন্ধ করে রেখেছে কিনো, শুনতে পাচ্ছে নিজের হৃৎস্পন্দন।

আশপাশ দিয়ে ছোট ছোট মাছ সাঁতরে যাচ্ছে, তাই দেখে আরেকটা গান মনে পড়ল কিনোর। এ গানটি হচ্ছে যদি লেগে যায়। কারণ ঝুড়িতে ও যে ঝিনুকগুলো ছুঁড়ে দিচ্ছে, তার কোনটার মধ্যে মুক্তো আছে কে বলতে পারে। কপাল ভাল হলে লেগেও যেতে পারে। কিনো জানে হুয়ানা মাথার ওপর ক্যানুতে বসে দোয়া-দরুদ পড়ছে। সে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছে তার স্বামী যেন মস্ত বড় এক মুক্তো আবিষ্কার করে, কয়োটিটোর জন্যে যাতে ওষুধ কিনতে পারে।

কিনো পানির নিচে দুমিনিটেরও বেশি থাকতে পারে, এ নিয়ে তার গর্বের শেষ নেই। ঝিনুকের খোলগুলো শক্ত হয়ে এঁটে রয়েছে, কিনো যে নাড়াচাড়া করছে ওগুলোকে, তাই। কিনার সামান্য ডান ঘেঁষে, ছোট্ট এক পাথুরে টিলা ছেয়ে রয়েছে খুদে ঝিনুকে। তবে এগুলো এখনও আহরণের উপযোগী হয়ে ওঠেনি। এবার কিনোর চোখ পড়ল, কাছেই ছোট্ট এক পাথরের পাশে। ইয়া বড় এক ঝিনুক পড়ে আছে ওখানে।

ওটার খোলটা ঈষৎ ফাঁক হয়ে রয়েছে লক্ষ্য করল। ভেতরে, চকচক করে উঠল কি যেন, এবং তার পরমুহূর্তে ঝট করে লেগে গেল খোল। পাথর থেকে লাথি মেরে পা দুটো ছাড়াল কিনো। পানির ওপর উঠে এল ঝিনুক নিয়ে, সূর্যালোকে ঝিকিয়ে উঠছে কালো চুল। ক্যানুর পাশ দিয়ে একটা বাহু নামিয়ে ঝিনুকটা তলদেশে রেখে দিল সে।

কিনো ওঠার সময় হুয়ানা নৌকাটাকে স্থির রাখল। উত্তেজনায় চকচক করছে কিনোর চোখজোড়া, পাথরটা আস্তে আস্তে টেনে তুলল সে। এবার ঝিনুক ভর্তি ঝুড়িটা টেনে তুলে নিল। কিনোর উত্তেজিত ভাব-ভঙ্গি লক্ষ্য করল ওর বউ। হুয়ানা এমন ভান করছে, বড় ঝিনুকটা যেন চোখেই পড়েনি। হুয়ানা বিশ্বাস করে, মনপ্রাণ দিয়ে কিছু চাইলে, ভাগ্য মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিনো ধীরেসুস্থে তার ছোট, শক্তপোক্ত ছোরাটার ফলা বের করল। শ্বাস আটকে বসে রইল হুয়ানা। ঝুড়িটার দিকে চিন্তামাখা চোখে চেয়ে রইল কিনো। সবার শেষে হয়তো বড় ঝিনুকটা খুলবে, ভাবল হুয়ানা। খুদে এক ঝিনুক নিয়ে মাংস কাটল ও, ভেতরটা পরখ করল। তারপর ছুঁড়ে ফেলে দিল সাগরে।

এবার বড় ঝিনুকটার দিকে চাইল ও। ক্যানুর তলদেশে বসে, ঝিনুকটা হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ চেয়ে রইল ওটার দিকে। কালো-বাদামী আলো ঝিকোচ্ছে ঝিনুকটা থেকে। কিনো এখন অনুভব করছে ঝিনুকটা সে খুলতে চাইছে না। ভেতরে চকচকে যে জিনিসটা ওর নজরে পড়েছিল সেটা হয়তো খোলেরই একটা অংশ। পানির নিচে, মানুষ অবাস্তব কত কিছুই তো দেখে।

হুয়ানার দুচোখ কিনোর ওপর স্থির, তর সইছে না তার। কয়োটিটোর ঢেকে রাখা মাথার ওপরে একটা হাত রাখল ও।

খুলে ফেলো, মৃদু স্বরে বলল। কিনো চট করে ছোরা ঢোকাল খোলের মধ্যে। ঝিনুকটা বুজে যেতে চেষ্টা করছিল, কিন্তু কিনো জোর খাটাতে খুলে গেল। দেহটা নড়ে উঠে নিথর হয়ে গেল ঝিনুকটার। মাংসটুকু তুলে ফেলতে ভেতরে পাওয়া গেল প্রকাণ্ড এক মুক্তো। সূর্যের ছটা পড়ে রুপালী দ্যুতি ঠিকরাচ্ছে মুক্তোটা। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মুক্তো এটা।

শ্বাসরুদ্ধ হুয়ানা অস্ফুট শব্দ করে উঠল। মুক্তোর গান তখন জোরালো সুরে বাজছে কিনোর মাথার মধ্যে। চকচকে মুক্তোটা কিনোর সব স্বপ্ন সত্যি করবে। ঝিনুক থেকে মুক্তোটা বের করে তালুতে ধরে রইল ও। উল্টেপাল্টে অনিন্দ্যসুন্দর জিনিসটা পরখ করছে সে। হুয়ান একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে কিনোর হাতের দিকে। ওই হাতটাই আঘাত হেনেছিল পাষাণ ডাক্তারটার বাড়ির গেটে। সাগরের নোনা পানি লেগে এখন ধূসর-সাদা রং ধারণ করেছে জখমি জায়গাটা।

সাত-পাঁচ না ভেবেই, কয়োটিটোর কাছে গেল হুয়ানা, বাবার কম্বলে শুয়ে রয়েছে বাচ্চাটা। ঔষধি তুলে ফেলে কাটা পরীক্ষা করল ও।

কিনো, চেঁচিয়ে উঠল সহসা।

কিনো চোখ তুলে চাইতে লক্ষ্য করল, কাঁধ থেকে মিলিয়ে যাচ্ছে বিষ; চলে যাচ্ছে কয়েটিটোর দেহ থেকে। কিনোর হাত এবার মুঠো করে ধরল মুক্তোটা। মাথাটা পেছনে ঝটকা দিয়ে গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল সে। চোখ ঘুরছে, দেহ আড়ষ্ট, আকাশের দিকে মুখ তুলে চিৎকার করছে কিনো। অন্যান্য ক্যানুর লোকেরা হাঁ করে চেয়ে রইল ওর দিকে। তারপর দ্রুত বৈঠা। মেরে চলে এল এদিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *