মাথা আমার খারাপ হয়ে যায়নি তো! কেবিনে ফিরে নিজেকে প্রশ্ন করল পেদরো জুরিতা। সাগর-দানো বলছে নির্ভুল স্প্যানিশ! স্বপ্ন দেখছি না তো! এক সঙ্গে সবার মাথা খারাপ হয় কি করে? তাহলে অবিশ্বাস্যকেই বিশ্বাস করতে হবে? তাহলে ওটা সাগর-দানো?

মাথা ঠাণ্ডা করতে এরইমধ্যে দুমগ পানি মাথায় ঢেলেছে পেদরো জুরিতা। এবার সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। প্রাণপণে ভেবে চলেছে।

সাগর-দানোর বুদ্ধি মানুষের মতো। ভাষাও। তার মানে ভেবেচিন্তে কাজ করার ক্ষমতা তার আছে। শুশুকের পিঠে বসে ছিল। তার মানে পানির তলায় যেমন তেমনি ডাঙাতেও সে শ্বাস নিতে পারে। ব্যবসা বুদ্ধি খেলল জুরিতার মাথায়। এমন একটা উভচর প্রাণীকে যদি মুক্তো খোঁজার কাজে ব্যবহার করা যায়? একজনই সে একশো ডুবুরির চেয়ে বেশি কাজ করতে পারবে। লাভ আরও বাড়বে, কারণ ডুবুরিদের চার ভাগের এক ভাগ টাকা দিয়ে দিতে হয়। সাগর-দানোক কাজে লাগাতে পারলে কিছু দিতে হবে না। প্রচুর টাকা আয় হবে তাহলে। কিন্তু পোষ মানাতে হবে ওটাকে।

রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে জুরিতা। একের পর এক বুনে চলেছে স্বপ্নের জাল। তার অনেক দিনের স্বপ্ন বড়লোক হবে। তীব্র আকাক্সক্ষা তাকে দুঃসাহসী করে তুলেছে। আর কেউ যেখানে যেতে ভয় পায় সেখানেও জাহাজ নিয়ে হাজির হয়ে যায় সে মুক্তো সংগ্রহের নেশায়।

ভবিষ্যতে ইরান, শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়া এবং লোহিত সাগরে অভিযান চালানোর ইচ্ছে আছে তার। মেক্সিকো, ক্যালিফোর্নিয়া এবং ভেনিজুয়েলার উপকূলে পৃথিবীর সেরা মুক্তো পাওয়া যায়। এসব জায়গায় যাওয়ার ইচ্ছেও সে পোষণ করে মনে মনে। এতদিনে চলেই যেত অভিযানে যেতে পারেনি শুধু তার পুরোনো এই জরাজীর্ণ জাহাজের কারণে। এ জাহাজ নিয়ে খোলা সাগর পাড়ি দেয়া যাবে না। তাছাড়া তার জাহাজে ডুবুরির সংখ্যাও কম! ব্যবসা বড় করতে হলে নগদ টাকাও দরকার। সেটারও অভাব রয়েছে। এসব নানা কারণে পেদরো শুধু আর্জেন্টিনার তীরেই নিজের ব্যবসা সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এবার যদি সাগর-দানোর সাহায্য পাওয়া যায় তাহলে বড়জোর। এক বছর, তারপরই সমস্ত স্বপ্ন পূরণ হবে ওর। কোটিপতি হতে বেশিদিন লাগবে না। তখন শুধু আর্জেন্টিনাই নয়, পুরো আমেরিকার সবচেয়ে ধনী হওয়া তার ঠেকাচ্ছে কে! কে না জানে, টাকার সঙ্গে আসে ক্ষমতা। বিখ্যাত ব্যক্তি হয়ে যাবে সে। কিন্তু সাবধান! নিজেকে শাসাল পেদরো জুরিতা! যা করার তা করতে হবে গোপনেই। কেউ যদি বুঝে ফেলে তাহলে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে তার পরিকল্পনা।

ভেবেচিন্তে তার লোকদের ডাক দিয়ে জড় করল পেদরো জুরিতা, বলল, যারা ওই সাগর-দানোর কথা বলেছে তাদের কি হাল হয়েছে সেটা তোমরা জানো। পুলিশ তাদের গ্রেফতার করেছে। আমাদের সাবধান থাকতে হবে। কাউকে জানানো যাবে না সাগর-দানোকে তোমরা দেখেছ। পুলিশ জানলে কিন্তু নির্ঘাৎ জেল। কাজেই সাবধান!

ডুবুরিদের সতর্ক করে কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করল জুরিতা। বালথাযারকে সঙ্গে নিয়ে কেবিনের ভেতর ঢুকল। ঠিক করেছে বালথাযারের কাছে নিজের মনের কথা গোপন করবে না। খুলে বলল সব।

সব শুনে সায় দিল বালথাযার বলল, কথা ঠিক। ওই সাগর দানোকে ধরতে পারলে এক হাজার ডুবুরির কাজ সে একাই করতে পারবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তাকে ধরা যাবে কি করে?

জাল দিয়ে, তৈরি জবাব দিল পেদরো।

তা কি সম্ভব? যেভাবে হাঙরের পেট চিরে দেয় তাতে তো মনে হয় জালও কেটে বেরিয়ে যাবে।

তার দিয়ে যদি জাল তৈরি করি?

কিন্তু তাকে ধরতে রাজি হবে কেউ? আমার তো মনে হয় এক বস্তা সোনা দিয়েও কাউকে রাজি করানো যাবে না।

ঠিক আছে তোমার কথাই মানলাম, রাজি হবে না কেউ। কিন্তু তুমি? তুমি কি চেষ্টা করে দেখবে?

ওকে ধরা সহজ হবে না।

চেষ্টা করে দেখতে দোষ কি! ভয় পেলে নাকি, বালথাযার? অত ভাবছ কি?

তেমন কিছু না। সাগর-দানো ধরা সাধারণ কাজ নয়। পানির মাছ যদি গাছে চড়ে তাহলে যেমন অবাক ব্যাপার হবে এই ব্যাপারটা অনেকটা সেই রকম। কিন্তু অদ্ভুত শিকারের ঝুঁকি নিতে আমার কোন আপত্তি নেই। বরং ঝুঁকি নিতেই আমি ভালবাসি।

বালথাযারের বাহুতে হাত রাখল পেদরো। উত্তেজনায় আঙুল চেপে বসল মাংসে। ওকে যদি ধরতে পারো তো অনেক টাকা পাবে, বালথাযার। বেশি লোক জানানো চলবে না। বড়জোর পাঁচজন সেরা ডুবুরি সঙ্গে রাখবে তুমি।…আমার মনে হয় প্রথমে ওটার বাসা খুঁজে বের করা দরকার। জাল পাতলে ওখানে পাতাই ভাল হবে।

দ্রুত কাজ করল বালথাযার। সময় নষ্ট করা তার ধাতে নেই। বালথাযারের সঙ্গীসাথীরা নির্দেশ মতো তারের একটা জাল তৈরি করে ফেলল। দেখতে সেটা হলো পিপে আকৃতির। সেটার ভেতরে সাধারণ জাল রাখা হলো, যাতে সাগর-দানো সাধারণ জালে পেঁচিয়ে যায়।

জেলিফিশ জাহাজ তাদের তৎপরতা শুরু করল লা-পাটা উপসাগরের সেই জায়গায়, যেখানে প্রথম বারের মতো সাগর-দানোর দেখা পাওয়া গিয়েছিল। দানোর যাতে সন্দেহ না হয় সেজন্যে জাহাজটা রাখা হলো খড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে। সৌখিন মৎস্য শিকারীদের অনুকরণে সদলবলে খাঁড়ি এলাকায় ঘুরে বেড়াতে শুরু করল পেদরো জুরি। তিনজন নাবিককে সে পাহাড়ের ওপর রাখল। তাদের কাজ সাগরের দিকে লক্ষ রাখা।

সাত দিন পার হয়ে গেল কোন ঘটনা ছাড়াই। সাগর-দানোর দেখা নেই। সাগরবেলার কাছে যে সব রেড ইন্ডিয়ান চাষাবাদ করে দেয় তাদের সঙ্গে এরই মধ্যে আলাপ হয়েছে বালথাযারের। তার মনে কোন সন্দেহ নেই যে ঠিক জায়গাতেই এসেছে তারা। রেড ইন্ডিয়ানদের অনেকেই শঙ্খের আওয়াজ শুনেছে। কেউ কেউ সাব্রতীরবর্তী বালিতে ওট। পায়ের ছাপও দেখেছে। দানোর গোড়ালি মানুষেরই মতো, কিন্তু আঙুলগুলো দীর্ঘ, হাঁসের পায়ের মতো মাঝখানটা চামড়া দিয়ে জোড়া। সাগর-দানো মাঝেমধ্যে বালির ওপর শুয়ে থাকে। সে ছাপও দেখা গেছে। আজ পর্যন্ত রেড ইন্ডিয়ানদের কোন ক্ষতি করেনি সাগর-দানো, কাজেই তারাও সাগর-দানোকে নিয়ে মাথা ঘামায় না। দুবেলা খাবার জোগাড় করতেই তাদের সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকতে হয়। অত খবরে তাদের কাজ কী! তবে একটা কথা জানা গেল। চিহ্ন যতই দেখুক আজ পর্যন্ত সাগর-দানোকে চাক্ষুষ দেখেনি কোন ইন্ডিয়ান।

আরও দুসপ্তাহ পেরিয়ে গেল। খাঁড়ির মুখে অপেক্ষা করছে জেলিফিশ জাহাজ। সারাক্ষণ পালা করে সাগরে নজর রেখেছে পেদরো জুরির ভাড়াটে লোকরা, কিন্তু দেখা দিল না সাগর-দানো। ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে পেদরো জুরিভার। একেকটা দিন পার হওয়া মানেই লোকের বেতন টানা। তারওপর একটা সন্দেহ মনে আসায় মুষড়ে পড়ল জুরিতা। সত্যি যদি সাগর-দানো কোন প্রাণী না হয়ে দেবতা বা অশরীরী গোছের কিছু হয় তাহলে তাকে জাল দিয়ে ধরার কোন উপায় নেই। ধরতে গিয়ে কি বিপদ সৃষ্টি হয় কে জানে! ভয় পেতে শুরু করল কুসংস্কারাচ্ছন্ন পেদরো।

নানা সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে তার মাথায়। একবার মনে হচ্ছে সাগর দানো আসলে অতৃপ্ত আত্মা। তাই যদি হয় তাহলে ওটাকে তাড়াতে যাজকদের সাহায্য নিতে হবে। আবার এমনও হতে পারে ওটা সাধারণ কোন মানুষ, দক্ষ সাঁতারু, দানো সেজে মানুষকে ভয় দেখিয়ে মজা পাচ্ছে। কিন্তু তাই যদি হতো তাহলে ডলফিনকে পোষ মানাল কি করে! আবার হতেও পারে! শোনা যায় ডলফিন পোষ মানে। নানা চিন্তায় মাথা গরম হয়ে গেল জুরির। শেষ পর্যন্ত এক বুদ্ধি এলো, তার মাথায়। ঘোষণা দিল, সাগর-দানোকে কেউ দেখতে পেলে তাকে সে পুরস্কার দেবে। পুরস্কারের লোভে আরও ভাল ভাবে সাগর দানোকে খুঁজবে সবাই, একথা ভেবে জেলিফিশ জাহাজ আরও কিছুদিন ওই শাড়ির কাছেই নোঙর করে রাখল সে।

তৃতীয় সপ্তাহের শুরুতে তার প্রতীক্ষার অবসান হলো, দেখা মিলল সাগর-দানোর।

সারাদিন মাছ ধরা শেষে মাছ ভরা নৌকো তীরে বেঁধে রেখে দেয় বালথাযার। পরদিন ভোর বেলায় সেই মাছ নিতে আসে মাছের ব্যবসায়ীরা। মাছ নিয়ে নগদে দাম পরিশোধ করে। সেদিনও যথারীতি নৌকো তীরে বেঁধে রেখেছে বালথাযার। সে গেছে এক রেড ইন্ডিয়ানের সঙ্গে দেখা করতে। গালগপ্প সেরে ফিরতে বেশ দেরি হলো। এসে দেখে তার নৌকোয় একটা মাছও নেই। হতবাক হয়ে বালথাযার, ভাবল, এত মাছ গেল কই! অন্য কেউ নেবে না। বুঝতে পারল, এ সেই সাগর-দানোর কাজ না হয়েই যায় না।

সেরাতে পাহারার সময় এক রেড ইন্ডিয়ান শুনতে পেল শঙ্খের আওয়াজ। খাঁড়ির দক্ষিণ দিক থেকে আসছে আওয়াজটা।

তার দুদিন পর এক আরাউকানি রেড ইন্ডিয়ান তরুণ এসে জানাল সাগর-দানোর খোঁজ পেয়েছে সে। একটা ডলফিন সমেত সাগর-দানোকে দেখা গেছে। তবে এবার সে ডলফিনের পিঠে ছিল না, চামড়ার তৈরি লাগাম ধরে ডলফিনটার পাশে সাঁতার কাটছিল। খাঁড়ির কাছে এসে লাগামটা খুলে নিয়ে ডলফিব্রেপিঠে স্পর্শ করে সাগর দানো। ডলফিনটা চলে যায় আর সাগর-দানো ডুব দেয় পাহাড়ের কাছে, গভীর সাগরে। তাকে আর দেখা যায়নি।

আরাউকানি যুবককে পুরস্কার দেবে কথা দিয়ে পেদরো জুরিতা বলল, সাগর-দানো বোধহয় আজ আর বের হবে না। মনে হয় খাঁড়ির কোথাও তার বাসা আছে। পানির নিচে ডুব দিয়ে দেখা দরকার।

চুপ করে আছে সবাই, কারও মুখে রা নেই।

তোমাদের মধ্যে ডুব দিতে রাজি আছে কেউ? অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল জুরিতা।

এ ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। কারও সাহস হচ্ছে না যে ঝুঁকিটা নেবে।

কিন্তু বালথাযার পিছিয়ে যাবার মানুষ না। মনের সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে সে বলল, আমি রাজি আছি। আমি ডুব দেব।

ঝুঁকি নিতে সাহস না করলেও মজা দেখার বেলায় কারও উৎসাহে কমতি নেই। খাঁড়ির উদ্দেশে রওনা হলো সবাই। দেখতে চায় বালথাযারের ভাগ্যে কি ঘটে।

কোমরে একটা দড়ি বেঁধে সাগরে নামল বালথাযার। সে যদি আহত হয় তাহলে ওই দড়ি ধরে তাকে টেনে তোলা হবে। একটা ছোরা ছাড়া অস্ত্র বলতে আর কিছু নেই বালথাযারের সঙ্গে। সহজে যাতে ডুবতে পারে সেজন্যে দুপায়ের ফাঁকে একটা পাথর নিয়ে ডুব দিল বালথাযার।

সে অদৃশ্য হওয়ার পর শুরু হলো প্রতীক্ষার প্রহর গোণা। উৎসুক হয়ে অপেক্ষা করছে সবাই। পাহাড়ের ছায়া পড়ায় সাগর এখানে নীল। আলো কম। কেমন আঁধার আঁধার। রহস্যময় গভীর সাগর।

অতি ধীরে যেন কাটছে সময়।

পনেরো সেকেন্ড…বাইশ সেকেন্ড…পঞ্চাশ সেকেন্ড…এক মিনিট।

টান পড়ল দড়িতে!

দড়ি ধরে ওপরে টেনে তোলা হলো বালথাযারকে। অক্ষতই আছে বৃদ্ধ ডুবুরি? একটু সুস্থির হয়ে বলল, সরু একটা খাদ আছে পাহাড়ের নিচে দিয়ে। ভেতরটা কালিগোলা অন্ধকার। ওটাই সম্ভবত সাগর সানোর আস্তানা। খাদের সামনে পাথরের একটা দেয়ালও দেখলাম।

খুশি হয়ে উঠল পেদরো জুরিতা। বলল, খাদের ভেতর অন্ধকার। হওয়ায় ভাল হয়েছে। জাল পাতব ওখানে। এবার ঠিকই ধরা পড়তে হবে সাগর-দানোকে।

সন্ধে হতে না হতে দড়ি দিয়ে বেঁধে তারের তৈরি জালটা নামানো। হলো সুড়ঙ্গের মুখে। দড়ির শেষ মাথাগুলো শক্ত করে তীরের সঙ্গে বাধা হলো পড়িতে কয়েকটা ঘণ্টীও বেঁধে দেয়া হলো। হালকা একটু ছোঁয়া লাগলেই ঘণ্টীগুলো বেজে উঠবে।

পেদরো জুরিতা, বালথাযার এবং পাঁচজন রেড ইন্ডিয়ান অধীর হয়ে অপেক্ষা করছে তীরে, কখন বাজবে ঘণ্টী। বেশ দূরে জেলিফিশ, জাহাজটা দেখা যাচ্ছে। আজকে জাহাজে একজন লোকও নেই।

ধীরে ধীরে রাত নামল, আকাশে উঁকি দিল বাঁকা চাদ, সাগরের পানিতে প্রতিবিম্বিত হলো ক্ষীণ রুপোলি আলো। কোথাও কোন আওয়াজ নেই ঢেউয়ের ছল-ছল-ছলাৎ ছাড়া। একাগ্র হয়ে তিতিক্ষার পালা গুণছে সবাই। যেকোন সময় দেখা দিতে পারে সাগর-দানো।

প্রলম্বিত মুহূর্তগুলো পার হচ্ছে টানটান উত্তেজনার মধ্যে দিয়ে। শ্বাস নিতেও যেন ভুলে গেছে সবাই।

এভাবে কেটে গেল বহুক্ষণ। তারপর সবাইকে চমকে দিয়ে বেজে উঠল ঘণ্টী!

ছুটে গেল সবাই দড়ির কাছে। দড়ি টেনে তাড়াহুড়ো করে জাল ওপরে তুলে আনছে। ওজন বেড়ে গেছে জালের। মনে হলো যেন। ভেতরে আটকা পড়া প্রাণীটা ছোটার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

পানির ওপর জাল তোলার পর চাঁদের আবছা আলোয় দেখা গেল অদ্ভুত এক প্রাণী আটকা পড়েছে। ওপরের অর্ধেক তার মানুষের মতো। যদিও সারাদেহে রুপোলি আঁশ রয়েছে, যেন মাছ! অর্ধেক পশু অর্ধেক মানুষ! জ্যোত্সার ক্ষীণালোকে বিরাট চোখ দুটো চকচক করছে। জালে তার একটা হাত আটকে গেছে! হাতটা ছোটানোর জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করছে সে! ঝটকামারছে থেকে যেকে। ছুটে গেল হাত। এবার কোমরের বেল্ট থেকে একটা ছোরা বের করল সাগর-দানো, জাল কাটার জন্যে জোরে জোরে পোঁচ মারতে শুরু করল।

চাপা গলায় উত্তেজিত বালথাযার বলে উঠল, জাল কাটতে পারবে না ও!

বালথাযারের ধারণা ভুল। অমানুষিক শক্তি সাগর-দানোর দেহে। ছোরার পোঁচে অনায়াসে কেটে ফেলছে সে তারের তৈরি শক্ত জাল। দেখতে দেখতে জালের মাঝে বড় একটা ফোকর তৈরি হলো। শীঘ্রি ওকে ডাঙায় তোলো, চেঁচাল পেদরো জুরিতা। দেরি হলে ছুটে যাবে।

তাড়াতাড়ি! তাড়াতাড়ি! চেঁচাচ্ছে বালথাযার।

প্রাণপণে জাল টানছে সবাই। একবার তীরে ওঠাতে পারলে…।

কিন্তু হতাশ হতে হলো সবাইকে। জাল প্রায় তীরের কাছাকাছি, এমনসময় জালের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এলো সাগর-দানো। দেরি না করে ঝাঁপ দিল সাগরে। হারিয়ে গেল সাগরের অতল গভীরে।

সবাই হতাশ, ক্লান্ত, টানা উত্তেজনার পর এই ব্যর্থতায়।

কিছুক্ষণ পর বালথাযার বলল, পানির নিচের কামাররা আমাদের কামারের চেয়ে অনেক ভাল। কি দুর্দান্ত ছুরি বানিয়েছে! লোহার তারের জাল পর্যন্ত অনায়াসে কেটে ফেলল!

থম মেরে আছে পেদরো জুরিতা। সাগর-দানো যেখানে ডুব দিয়েছে সাগরের সেখানে আটকে আছে তার দৃষ্টি। ভাব দেখে মনে হলো তার সারাজীবনের সঞ্চয় পানির নিচে তলিয়ে গেছে। শোক সামলে নিয়ে বলল, টাকা যত লাগে লাগুক, খাঁড়িতে ডুবুরি নামাব আমি। দরকার হলে ফাঁদ আর জাল দিয়ে খাঁড়ি ভরে ফেলব আমার হাত থেকে পালাতে পারবে না সাগর-দানো।

জেদী একগুঁয়ে লোক সে। দেহে বইছে স্প্যানিশদের তেজী রক্ত। উত্তেজনার খোরাক পেলে আর কিছুর তোয়াক্কা করে না সে।

এখন বোঝা যাচ্ছে সাগর-দানো ভূত-প্রেত অশরীরী নয়, রক্ত মাংসের প্রাণী। শিকল দিয়ে তাকে বেঁধে রাখা সম্ভব। সম্ভব পরিকল্পনা মাফিক তাকে দিয়ে গভীর সাগর থেকে মুক্তো আহরণ করা।

পেদরো জুরিতা মনে মনে শপথ করল, সমুদ্রের দেবতা স্বয়ংও যদি সাগর-দানোর পক্ষ নেন তাহলেও পিছপা হবে না সে।

Share This