০৩. ভোরের ফ্যাকাসে আলোয়

ভোরের ফ্যাকাসে আলোয় পাপাগো ওয়েসে পৌঁছল তিন রাইডার। স্যাডলে টিকে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে মেলানি রিওস; শরীরে যা ক্লান্তি, ওর মনে হলো এই চেষ্টার শেষ হবে না কখনও। শুরু থেকে ড্যান কোয়ানের উপস্থিতি পছন্দ হয়নি বেন ডেভিসের, কিন্তু এ ব্যাপারে কিছু করার নেই বলে আপাতত মেনে নিয়েছে।

মেলানি রিওসের হাতে কোন আঙুটি নেই, খেয়াল করেছে ড্যান। আঙুটি থাকুক বা না-থাকুক, কে লেডি আর কে সাধারণ মহিলা, দেখেই চিনতে পারে ও। মেলানি যে সত্যিকার সম্মানিত লেডি, এতটুকু সন্দেহ নেই ওর।

রিওস…মেলানি রিওস…বিগ জিম রিওসের মেয়ে না তো?

অবশ্যই! ব্যাপারটা খোলসা হয়ে গেল ড্যান কোয়ানের কাছে। জিম রিওসের নাম কে না জানে! পশ্চিমে যত জায়গায় গরু চরে, সর্বত্র এই র্যাঞ্চারের নাম শোনা যায়। জিম রিওসের মেয়ে যদি কারও সঙ্গে পালিয়ে এসে থাকে, স্পষ্টত যে লোকটাকে পছন্দ হয়নি প্রতাপশালী র্যাঞ্চারের। ড্যান নিজেও রোমান্টিক মানুষ, জানে প্রেমের ক্ষেত্রে কোন বাধাই বাধা নয়। মেয়েটি যদি ডেভিসকে ভালবেসে থাকে, আপত্তি করার অধিকার নেই জিম রিওসের। সাবালিকা কোন মেয়ে নিজের পছন্দের মানুষকে বিয়ে করতেই পারে। এটাই নিয়ম।

বেন ডেভিসকে বিচার করল ড্যান। সে যে দ্রলোক, তাতে কোন সন্দেহ নেই। ও নিজে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার মানুষ বলে ডেভিসকে একনজর দেখেই ধাতটা চিনে নিয়েছে-দক্ষিণ আভিজাত্যের ধারক। ড্যান যেখান থেকে এসেছে, উত্তরে একজন মানুষের বিচার গোলাগুলিতে বা খামারের কাজে তার দক্ষতায়, অথচ দক্ষিণের লোকের কাছে এটা বুনো এক সমাজের চালচিত্র। দশ বছর বয়স থেকে সারাক্ষণ সঙ্গে রাইফেল রাখে ড্যান, জানে ওটা কীভাবে ব্যবহার করতে হয়।

ভোরে পাপাগো ওয়েলসে এসেছে ওরা। আগের রাতে এখানে পৌঁছেছে টনি চিডল আর এড মিচেল, তবে ধারে-কাছে কাউকেই দেখতে পেল না। ওরা যখন তেষ্টা মেটাতে ব্যস্ত, একই সময়ে, পুব থেকে পায়ে হেঁটে এগিয়ে আসছে মিমি রজার্স। কিপ্রিয়ানো ওয়েলসের পাশে ঘুমন্ত ইন্ডিয়ানরা তখনও জেগে ওঠেনি।

কুয়ার কাছে এসে ঘোড়া থামাল ওরা। এক কাজ করা যাক, নিচু স্বরে প্রস্তাব করল ড্যান কোয়ান। আমি বরং চারপাশে একটা চক্কর দিয়ে আসি। ইন্ডিয়ানরা থাকতে পারে।

প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল মেলানি, কিন্তু তার আগেই ডেভিস বলে উঠল: ‘বেশ, যাও…সাবধানে থেকো।

তীক্ষ অসন্তোষের চাহনি হানল মেলানি, তবে কোন মন্তব্য করল। ঘোড়াকে আগ বাড়িয়ে ওর পাশে চলে এল বেন, বলল: তুমি যতটা কাঁচা ভাবছ, তা কিন্তু নয় ও। বয়সের তুলনায় যথেষ্ট সেয়ানা। পাহারার কাজটা ওকে দিয়ে করানো যাবে।

এবারও কিছু বলল না মেলানি। ভোরের আলো ফোটেনি এখনও, চাঁদ রয়ে গেছে আকাশে। চাঁদের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে শোলা ক্যাকটাস, জ্বলন্ত মশাল মনে হচ্ছে ওগুলোকে। কান পাতল মেলানি। ড্যান যেদিকে গেছে, নুড়িপাথর গড়ানোর হালকা শব্দ ভেসে এল ওদিক থেকে। হালকা ঝিরঝিরে বাতাস বইছে, কুয়ার লাগোয়া গ্রিজউডের শাখা তিরতির করে কাঁপছে।

পশ্চিম বড় সুন্দর…ভাবছে মেলানি, কিন্তু নির্জন, শূন্য এবং একাকীত্বে ভরা। ঝলমলে শহুরে পরিবেশ, আনন্দময় পার্টি, উজ্জ্বল আলোর তুলনায় কত ম্লান আর নির্জীব! সৌন্দর্য, নৈঃশব্দ্য বা নির্জনতা থাকার পরও; আনমনে মাথা নাড়ল মেলানি, ঊ, এ জায়গা ওর জন্য নয়। এখানে থাকতে পারবে না।

র‍্যাঞ্চে কাটানো দিনগুলি রীতিমত দুর্বিষহ মনে হয়েছে। ওর সঙ্গে রুচির মিল, হতে পারে, এমন একজন মহিলাও নেই মেয়ের সঙ্গে জিম রিওসের অন্তরঙ্গ হওয়ার আড়ষ্ট ও অনভিজ্ঞ চেষ্টা মেকী-মনে হয়েছে ওর কাছে। সর্বক্ষণ, একটা পিস্তল সঙ্গে রাখে ওর বাবা। এই পিস্তলই হাসি-খুশি সুদর্শন এক তরুণের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে মনে এলেই বাপ আর পিস্তলটার প্রতি ঘৃণা বোধ করে মেলানি।

মরুভূমি কোন মহিলার থাকার জায়গা হতে পারে না, নিজেকে শুধাল ও। কী আছে এখানে? মরুভূমি, কেবলই মেয়েদের জীবনীশক্তি কেড়ে নেয়, পুড়িয়ে দেয় কোমল ত্বক, সৌন্দর্য শুষে নেয়। এই নরক ছেড়ে চলে যাচ্ছে বলে খুশি ও। ভাগ্যিস, পরিচয় হয়েছিল বেন ডেভিসের সঙ্গে! নিপাট ভদ্রলোক, অভিজাত পরিবারের সন্তান…

আবছা অন্ধকারে কুয়ার ওপাশে উদয় হলো ড্যান কোয়ান। এবার নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। আশপাশে কেউ নেই। প্রচুর পানি আছে। ঘোড়াগুলোর জন্য নীচের ওঅশে যথেষ্ট ঘাস আছে।

পুব দিগন্তের সঙ্গে মিশে যাওয়া পাহাড়শ্রেণীর খাঁজকাটা চূড়া কমলা আভা পেল সূর্যোদয়ের সময়, ধীরে ধীরে আলোকিত হলো বিস্তীর্ণ মরুপ্রান্তর। সুউচ্চ রীজগুলো রক্তলাল হয়ে গেছে। ক্লান্ত হলেও, ঘোড়াটাকে নীচের কুয়ার কাছে নিয়ে এল মেলানি। ঠাণ্ডা পানি পান করতে ব্যস্ত ঘোড়ার পাশে দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। ছেলেবেলায় এই শিক্ষাটা বাপের কাছ থেকে পেয়েছে ও।

ঘোড়াগুলোর যা অবস্থা, বলল বেন ডেভিস। “বিশ্রাম না নিলেই নয়।’

জায়গাটা ভাল, গোড়ালির উপর ভর দিয়ে মাটিতে বসল ড্যান। ‘আক্রান্ত হলে প্রতিরোধ করতে পারব। এরচেয়ে খারাপও হতে পারত অবস্থা।

বেনের থরোব্রেড় ঘোড়াটার অবস্থা কাহিল। চোখ কোটরে বসে গেছে, ক্ষীণকায় দেখাচ্ছে। এমন উত্তাপ আর পানিশূন্যতায় অভ্যস্ত নয় ওটা। যে-কোন মুহূর্তে হয়তো ঢলে পড়ে যাবে। মেলানির ঘোড়াটা ক্লান্ত হলেও খাড়া আছে এখনও। থরোব্রেডের অবস্থা দেখে খানিকটা শঙ্কিত ও।

কুয়ার উপরে, লাভার চাঙড়ের পিছনে সন্তর্পণে মাথা তুলল এক লোক। কিছুটা বিস্মিত দৃষ্টিতে তিনজনের দলটাকে দেখল সে। কৌতূহল ফুটে উঠল চোখে। একে একে তিনজনকে খুঁটিয়ে দেখল, মেলানিকে একটু বেশি সময় নিয়ে দেখল। তার পাশে মাথা তুলল এড মিচেল, সেও দেখল পানির টানে চলে আসা তিন আগন্তুককে। মাটিতে বসলেও রাইফেল হাতছাড়া করেনি ছেলেটা, দেখে সমীহ ফুটে উঠল মিচেলের চাহনিতে।

পুরুষদের কাউকেই আইনের লোক বলে মনে হচ্ছে না, কিন্তু এখানে এদের উপস্থিতি অস্বাভাবিক। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া এত দুর্গম জায়গায় আসার কথা নয় কারও। বেশ, খুব সাবধানে যাব আমরা, ফিসফিস করল মিচেল। বেতাল কিছু করে বোস না। ছোকরার ব্যাপারে সাবধান। দেখে মনে হচ্ছে আগে গুলি করবে ও, পরে লাশের উদ্দেশে প্রশ্ন করবে।

উঠে দাঁড়াল ড্যান। কফি আছে আমার কাছে, ম্যাম, জানাল সে। গর্তে ছোট করে আগুন জ্বালালে বোধহয় চোখে পড়বে না কারও। ধোয়া যাতে না ওঠে, সেভাবে তৈরি করব।

ধন্যবাদ, ড্যান, বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি দেখা গেল মেলানির মুখে, পাল্টা হাসল ড্যান কোয়ান। তুমি আগুন জ্বালাবে, কিন্তু কফিটা আমি তৈরি করব।

বগলে শুকনো ডালপালা নিয়ে ফিরে আসছে, এসময় লোক দু’জনকে দেখতে পেল ড্যান। ঠায় দাঁড়িয়ে পড়ল সে, পালাক্রমে, দেখল দু’জনকে, দশ কদম দূরে রেখে যাওয়া রাইফেলের দিকে চলে গেল ওর দৃষ্টি। কোমরের বেল্টে সিক্সশূটার আছে বটে, কিন্তু ড্র করতে হলে আগে কাঠ ফেলে দিতে হবে। দুশ্চিন্তার আরও একটা ব্যাপার হচ্ছে, পিস্তলে তেমন চালু নয় ওর হাত।

ঘাবড়ানোর কিছু নেই, দ্রুত বলল মিচেল। পুবে যাচ্ছি আমরা। তোমাদের মতই রাত কাটাতে থেমেছি এখানে।

অপরিচিত কণ্ঠ শুনে ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল বেন ডেভিস। খাটো ঝুলের একটা কোট পরেছে সে, ঝটিতি ড্র করতে যাতে সুবিধা হয়; ঘুরে দাঁড়ানোর সময় কোটের প্রান্ত একপাশে সরিয়ে দিল সে-দেখতে পেল ড্যান-স্রেফ সহজাত প্রবৃত্তি বশে করেছে কাজটা। বোঝাই যায় বহু অনুশীলনের ফসল। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো ড্যানের, বেন ডেভিসের পিস্তলে অস্বাভাবিক ও বিস্ময়কর একটা কিছু নজরে পড়ল। নিজেকে বেকুব মনে হলো ওর। এই লোককে কি-না পুব থেকে আসা নিপাট নিরীহ জ্বলোক ধরে নিয়েছে! যথেষ্ট কারণও ছিল-পশ্চিমা মানুষের চেয়ে ডেভিসের গায়ের রঙ তুলনামূলক ফর্সা; অথচ পশ্চিমের গানফাইটারদের ঢঙে পিস্তল ঝুলিয়েছে সে।

আগুন জ্বালাবে বলে যে-জায়গাটা ঠিক করেছে, মৃদু পায়ে সেখানে চলে গেল ড্যান, কাঠ নামিয়ে রাখল।

পুবে রওনা দেওয়ার আগে ভেবে নাও আসলেই যাবে কি-না, দুই আগন্তুকের উদ্দেশে বলল ড্যান। বেটস ওয়েলে আমার দুই পার্টনারকে খুন করেছে অ্যাপাচিরা।

তা হলে বরং অপেক্ষা করব, সবকটা দাঁত বের করে হাসল মিচেল। ওরা যদি এখানে আসেই, হাড়ে হাড়ে টের পাবে…।

আসবে ওরা।

পাথরের ঝুলন্ত একটা চাইয়ের নীচে আগুন জ্বালাল ওরা। চাইয়ের কারণে আলোর প্রতিবিম্ব উপরে উঠবে না, যদিও আকাশ যথেষ্ট পরিষ্কার হয়ে গেছে, প্রতিবিম্ব তৈরি হলেও দেখা যাবে না এখন। আগুনের পাশে বসে পড়ল ওরা, কফি খাওয়ার ফাঁকে যার যার নিজস্ব ভাবনায় মশগুল হয়ে গেল।

বাবা নিশ্চই বসে থাকেনি, ভাবছে মেলানি, এখন বোধহয় ওদের পিছনে কোথাও আছে। ওর খোঁজে তোলপাড় করে ফেলবে পুরো মরুভূমি। সঙ্গে অন্তত দশ-বারোজন থাকবে…হয়তো তার কাছে পিঠেই রয়েছে রক্তপিপাসু হিংস্র ইন্ডিয়ানরা…

ভাবছে এড মিচেলও, তবে চিন্তাটা মোটেও স্বস্তিকর কিছু নয়। পিছনে ছুটে আসা পাসি ফাঁসির আতঙ্ক তৈরি করেছিল ওর মনে, শেরিফ যদি ইয়োমায় ওদের ফিরিয়ে নিয়েও যেত, বিচারে কোন জুরিই ওদের পক্ষে রায় দিত না-আদৌ, বিচার যে হত, তাও মনে করে না মিচেল। আগন্তুকদের জন্য পশ্চিমের যে-কোন শহরই বড় নির্মম। নির্লিপ্ত অভ্যর্থনার পাশাপাশি অদৃশ্য ও অকারণ বিদ্বেষও থাকে আগন্তুকদের জন্য। শহরের একটা ছেলে খুন হয়েছে, দু’জন আহত হয়েছে, এ-অবস্থায় কেউই ওদের পক্ষ নিত না। তাদের বিবেচনায় উচ্ছল তারুণ্যের কারণে খানিকটা বেসামাল হয়ে গিয়েছিল তিন তরুণ, কিন্তু ঘুণাক্ষরেও কেউ আমল দেবে না যে পরিণত মানুষের তিনটা অস্ত্র ছিল এদের হাতে। ভবঘুরে এক মোষ শিকারী আর এক দোআঁশলা কী করে সুবিচার পায়?

মাঝে মধ্যে আগুনের পাশ থেকে উঠে চলে যাচ্ছে টনি চিডল, চারপাশ রেকি করে ফিরে আসছে। অভিজ্ঞ মানুষ সে, ইন্ডিয়ান রক্ত বইছে শরীরে, যে-কারও চেয়ে মরুভূমিতে তার ইন্দ্রিয়গুলো বেশি সজাগ ও কর্মক্ষম।

সূর্য যখন পর্বতশ্রেণীর খাঁজকাটা চূড়া ছাড়িয়ে খোলা আকাশ ছুঁয়েছে, এসময় অন্যদের সতর্ক করল সে। একটা লোক আসছে!

পাথরের আড়াল থেকে তাকে দেখতে পেল ওরা। জেব্রা ডানে চড়েছে লোকটা। স্বচ্ছন্দ গতিতে ছুটছে ঘোড়াটা। দ্রুতই পৌঁছল সে, তবে একেবারে কাছে আসার আগে সম্ভাব্য প্রতিটি কাভারের আড়াল ব্যবহার করল, বিভিন্ন কোণ থেকে খুঁটিয়ে দেখল কুয়ার আশপাশের এলাকা। একবার ওদের চোখের আড়ালে চলে গেল সে।

বিড়বিড় করে চিডলের উদ্দেশে কী যেন বলল মিচেল, চাপা শব্দে হেসে উঠল। দারুণ সেয়ানা লোক! বাজি ধরে বলতে পারি, ও জেনে গেছে কোথায় আছি আমরা, এমনকী ক’জন তাও জানে! আমাদের ঘোড়াগুলোর অবস্থাও অজানা নেই ওর…দেখেছ না, একটু আগে ছাপ খুঁটিয়ে দেখেছে?

সেয়ানা লোক এমন বোকামি করে নাকি? তাচ্ছিল্যের সুরে বলল বেন ডেভিস। চাইলে এখান থেকে, যে-কোন সময় ফেলে দিতে পারব

পারবে হয়তো, কিন্তু চেষ্টা করতে যেয়ো না। স্ক্যাবার্ডে ওর রাইফেলটা দেখেছ, কীভাবে রেখেছে? আমার তো মনে হয় আমরা যখন ওকে দেখেছি, একই সময়ে আমাদেরকেও দেখেছে সে। তখন যদি রাইফেল তুলতে, এতক্ষণে বুলেট খেয়ে ফুটো হয়ে যেতে। কেন ঘোরাঘুরি করছে ও, জানো? এটা যে ফাঁদ-নয়, নিশ্চিত হয়ে নিচ্ছে। বাজি ধরবে আমার সঙ্গে? এক ডলারে দুই ডলার। ঘোড়ার ওপাশে নামবে ও, আমাদের আর ওর মাঝখানে ঘোড়াটাকে আড়াল হিসাবে ব্যবহার করবে।

ঘোড়াকে হাঁটিয়ে ঢাল ধরে ঝোঁপের কাছে উঠে এল আগন্তুক। আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এল ওরা। সবার আগে আগে এগোল ডেভিস, ত্রিশ গজ দূরে থাকতে থামতে বাধ্য হলো ওরা। পমেলের উপর আড়াআড়ি শুয়ে আছে আগন্তুকের রাইফেল, নলটা ডেভিসের বুক বরাবর স্থির। না তোমাদের বন্ধুগয়েছি।

কফি আছে না তোমাদের? বন্ধুত্বপূর্ণ স্বরে জানতে চাইল এরিক ক্রেবেট। সিকি মাইল দূর থেকে গন্ধ পেয়েছি।

চলে এসো, আহ্বান করল ডেভিস।

স্যাডল ছাড়ল এরিক। নিজের আর ওদের মাঝখানে থাকল জেব্রা ডান, এবং একচুলও নড়েনি রাইফেলের নিশানা। শেষে ঘোড়াটাকে গাছের কাছে নিয়ে গেল সে, মিনিট খানেক পর ওদের কাছে ফিরে এল। এক হাতে রাইফেল, অন্য হাতে ক্যান্টিন আর স্যাডলব্যাগ।

ভোরের দিকে ধোয়ার গন্ধ পেয়েছি, জানাল সে। দক্ষিণে গোলাগুলি হয়েছে, শব্দ শুনলাম।

মেলানির সঙ্গে চোখাচোখি হলো, দৃষ্টি সরিয়ে নিল এরিক। মেয়েটির দেওয়া কফি সানন্দে গ্রহণ করল ও। নিজের উপর এড মিচেলের অনুসন্ধানী দৃষ্টি অনুভব করছে, খুঁটিয়ে ওকে দেখছে লোকটা, চকিত চাহনি হেনেছে ওর জোড়া পিস্তলের উপর।

কফি খাওয়ার ফাঁকে এদের সম্পর্কে ভাবল এরিক ক্ৰেবেট। ও নিশ্চিত, দুটো দল এখানে এসে মিলিত হয়েছে, তবে নিশ্চিত নয় কারা কোন দিক থেকে এসেছে। কাহিল ঘোড়াটার যে-ট্র্যাক দেখেছে, সম্ভবত প্রথম যে-লোকটা ওকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল, সে বা মেয়েটা ওটায় চড়েছিল। তবে মেয়েটার হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

অ্যাপাচিদের হামলায় কোয়ার্নের দুই বন্ধুর মৃত্যুর ঘটনা খুলে বলল এড মিচেল। এখানে থাকলে বোধহয় বিপদে পড়ব, শেষে বলল সে। এই জায়গা চেনে ইন্ডিয়ানরা, পানির জন্য ওরাও আসবে এখানে।

তা হলে গাঁট হয়ে বসে থাকো, পরামর্শ দিল এরিক। ধাওয়া খাওয়ার চেয়ে বরং এখানে থাকাই ঢের নিরাপদ।

আমার নাম এড মিচেল।

সামান্য দ্বিধা করল এরিক। নিজের উপর মেলানির দৃষ্টি টের পেল ও, মেয়েটির দিকে ফিরে পরিচয় দিল।

নামটা শুনেছে মেলানি, তবে আর কিছু মনে পড়ল না। কোথায় শুনেছে তাও জানে না। ক্ষীণ সন্তুষ্টির হাসি দেখা গেল মিচেলের মুখে, যেন নামটা শুনতে ভাল লেগেছে তার। কিছু একটা জানতে মুখ খুলেছিল ড্যান কোয়ান, কিন্তু নিজেকে নিবৃত্ত করে নিল।

পশ্চিমে যাচ্ছি আমরা, জানাল ডেভিস। শুনেছি ইন্ডিয়ানরা পুব অঞ্চলে রয়েছে।

মিনিট কয়েক কেউই কিছু বলল না। ভাবছে এরিক, জানে যে একই ভাবনা মিচেলের মনেও বয়ে চলেছে-ইন্ডিয়ানদের সম্পর্কে আগাম কিছুই বলা সম্ভব নয়, যে-কোন জায়গায় থাকতে পারে রেডস্কিনরা।

নিজের মতামত জানাল ড্যান। এই জায়গাটা মন্দ নয়। ইন্ডিয়ানদের সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত এখানে থেকে যাওয়ার পক্ষপাতী আমি।

শ্রাগ করল বেন ডেভিস, ইশারা করল চিডলের দিকে। ও-ও তো ইন্ডিয়ান…ওর ব্যাপারে কী বলবে?

ইন্ডিয়ান, তবে ও পিমা গোত্রের, বলল মিচেল। অ্যাপাচিদেরকে আমাদের চেয়েও বেশি ঘৃণা করে পিমারা।

ইন্ডিয়ান ইন্ডিয়ানই। ওকে বিশ্বাস করব কীভাবে?

তোমাকে করব কীভাবে? মৃদু স্বরে বলল এরিক। কিংবা আমাকেই বা বিশ্বাস করবে কীভাবে? আমরা সবাই যার যার অপরিচিত।

রাগে জ্বলে উঠল ডভিসের চোখজোড়া,কিন্তু সে কিছু বলার আগেই কফির পট তুলে এরিকের কাপ ভরে দিল মেলানি। আমি বিশ্বাস করি ওকে, বলল মেয়েটি। বাবার কাছে শুনেছি পিমারা খুব ভালমানুষ..তাবৎ ইন্ডিয়ানদের মধ্যে ভালমানুষ।

হঠাৎ মুখ তুলে তাকাল টনি চিডল, সামান্য বিকারও নেই মুখে। তাকে নিয়ে আলাপ, অথচ সামান্যও আগ্রহ বোধ করছে না, কিন্তু মেলানির মন্তব্যে ওর দিকে তাকাতে বাধ্য হলো। পরে, ডেভিস অধৈর্য ভঙ্গিতে অন্যদিকে ফিরে তাকাতে মেলানির দিকে আবার তাকাল চিডল। তোমার স্বামী ও, ম্যাম? মৃদু স্বরে জানতে চাইল সে।

ন-না…এখনও বিয়ে করিনি আমরা। ঠিক করেছি ইয়োমা ক্রসিঙে গিয়ে বিয়ে করব।

যুগলটাকে দেখে এমন কিছুই আঁচ করেছিল এরিক। বেন ডেভিস দারুণ সুদর্শন মানুষ, আচরণে বুঝিয়ে দিয়েছে ব্যাপারটা। নিপাট ভদ্রলোক সে, কিন্তু তারপরও একটা অস্বাভাবিকতা রয়েছে যা মিলছে, বড়সড় কোন অসঙ্গতি। কারণটা সম্ভবত তুমি, নিজেকে শুধাল এরিক, তুমিইঈর্ষা করছ তাকে!

কফিতে চুমুক দেওয়ার সময় আনমনে হেসে উঠল এরিক.

হাসিটা খেয়াল করেছে মেলানি। না চাইলেও লোকটির প্রতি আগ্রহ বোধ করল। রোদপোড়া মুখ সুদর্শন না হলেও আকর্ষণীয় একটা কিছু আছে।

সক্ষম সমর্থ মানুষ এরা, ভাবছে এরিক। মিচেল, চিড়ল, কোয়ান এবং ডেভিস…সবাই লড়াকু লোক। লড়াই যদি করতেই হয়, এটাই হবে উপযুক্ত জায়গা। সঙ্গীদের উপর নিশ্চিন্তে নির্ভর করা যায়। উপরের কুয়ায় এসে ক্যান্টিন ভরে নিল এরিক, তারপর ছায়াঘেরা একটা জায়গা পছন্দ করল ঘুমানোর জন্য। জীবনে আর কিছু না হোক কয়েকটা অভ্যাস গড়ে নিয়েছে ও, কখনও ব্যতিক্রম করে না। পিস্তল সবসময় লোডেড রাখতে হয়, ক্যান্টিন থাকা উচিত পূর্ণ, খাওয়া পেলে দ্বিধা করতে নেই এবং সুযোগ পেলে ঘুমিয়ে নিতে হয়। সময়ের সদ্ব্যবহার না-করাই বোকামি। ভবিষ্যতে কী ঘটবে কেউই বলতে পারে না, সেক্ষেত্রে সর্বক্ষণ তৈরি থাকা উচিত।

চোখ বুজতে মেলানি রিওসকে মনে পড়ল। নিঃসন্দেহে বলা যায়, বেন ডেভিস খুবই ভাগ্যবান। আত্মবিশ্বাসী, ভদ্র, অভিজাত চালচলন…কিন্তু কী যেন একটা অসঙ্গতি রয়েছে লোকটার মধ্যে, ঠিক খাপ খায় না। জিনিসটা ডেভিসের নিজস্ব, খেলো আচরণে নয়।

ঘুমিয়ে পড়ল এরিক।

ধীর গতিতে দিন গড়াচ্ছে। পাথর শুষে নিচ্ছে উত্তাপ, মরুভূমিতে তাপতরঙ্গ ঘোলাটে পর্দা তৈরি করেছে দৃষ্টিপথে, দূরে হ্রদের ন্যায় মরীচিকা জ্বলজ্বল করছে। মাছির ভনভন শব্দে জেগে গেল এরিক, হাত ঝাড়া মেরে ফেলে দিল ওটাকে। মাটিতে পড়ে গড়ান খেল মাছিটা, টলমল পায়ে এগোল কয়েক কদম, তারপর ছুটে চলে গেল সহজ শিকারের উদ্দেশে। উঠে বসল এরিক, হাতের চেটো দিয়ে মুখের ঘাম মুছল।

টানা দুই ঘণ্টা পাহারা শেষে পাথুরে চাতাল থেকে নেমে এল এড মিচেল। পুবে ধুলো দেখলাম। বেশ কয়েকজন লোক। চার থেকে আটজন হতে পারে।

কত দূরে?

অন্তত ঘণ্টাখানেকের পথ তো হবেই…দ্বিগুণও হতে পারে। দেখে মনে হলো ধীরগতিতে এগোচ্ছে। তবে নিশ্চিত হতে পারিনি। জানোই তো, এ ধরনের আলোয় স্পষ্ট ঠাহর করা যায় না।

ঘোড়াকে পানি খাওয়ানোর জন্য নীচের অ্যারোয়োতে চলে এল এরিক, ঘোড়ার সঙ্গে নিজেও পান, করল। উঠে মুখ মুছল ও, সিধে হতে সামনে মেলানি রিওসকে দেখতে পেল, ওকেই দেখছে মেয়েটা। নীরবে পরস্পরকে নিরীখ করল ওরা, একইসঙ্গে দৃষ্টি সরিয়ে নিল দু’জন-যেন অদৃশ্য সম্মতি বিনিময় হয়েছে।

হতাশ ও অসন্তুষ্ট বোধ করছে মেলানি। ক্যাম্পে এসে পানি চড়াল কফি তৈরি করার জন্য। র‍্যাঞ্চে অন্তত একটা জিনিস শিখেছে ও-পশ্চিমের মানুষ কফি পছন্দ করে। ছায়া আছে অ্যারোয়োর এমন এক জায়গায় এরিককে ঘোড়াটা নিয়ে যেতে দেখল ও। স্বচ্ছন্দ লোকটার চলাফেরা। মামুলি কাউহ্যান্ড বা ওরকম কিছু নয় সে, সিদ্ধান্তে পৌঁছল মেলানি, আত্মবিশ্বাস আর অকপটতা অন্যদের মধ্যে আলাদাভাবে চিনিয়ে দেয় তাকে। মেলানি এটাও খেয়াল করেছে, এরিকের সঙ্গে সমীহের সঙ্গে কথা বলছে মিচেল।

ক্ৰেবেট…অপ্রচলিত নাম…এরিক ক্ৰেবেট। পরিচিত মনে হচ্ছে নামটা, তবে মেলানি নিশ্চিত নয় আদৌ শুনেছে কি-না, কিংবা ঠিক কোথায় শুনেছে।

ওর পাশে এসে বসল ডেভিস। চলে যেতে পারলেই ভাল হত, বলল সে। এখানে থাকতে একটুও ভাল লাগছে না। বিচ্ছিরি অবস্থা! দুঃখিত, আমার কারণেই এমন অবস্থায় পড়েছ তুমি।

দূর, এ-নিয়ে চিন্তা কোরো না।

আমার তো মনে হয় অন্তত চেষ্টা করা উচিত। সকালে তরতাজা হয়ে উঠবে ঘোড়াগুলো। হয়তো ইয়োমা ক্রসিঙে পৌঁছতে সক্ষম হব আমরা।

কিন্তু ইন্ডিয়ানদের ফাঁকি দেবে কীভাবে, বেন?

এ-মুহূর্তে পুব দিকে আছে ইন্ডিয়ানরা। মনে হয় না এতদূর আসবে ওরা। ফোর্টের কাছাকাছি গিয়ে বিপদে পড়ার ইচ্ছে নেই ওদের। তবে যাই হোক, ইন্ডিয়ানদের কারণে ফিরে যেতে বাধ্য হবে তোমার বাবা।

বাবাকে তো চেনো না!

যে-হারে রেইড করছে ইন্ডিয়ানরা, এমনকী তোমার বাবাও বাধ্য হবে ফিরে যেতে।

বেন, ইন্ডিয়ানদের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই। পশ্চিমেও আসতে পারে ওরা। বাবার কাছে শুনেছি বহুবারই ফোর্টের কাছে চলে গিয়েছিল ওরা, সৈন্যদের নাকের ডগায় খুন করেছে লোকজনকে। উঁহু, তুমি যা ভাবছ তা নয়, সৈন্যদের একটুও ভয় পায়। না ওরা।

পাথুরে চাতাল থেকে নেমে এল এরিক ক্ৰেবেট, কফি খেতে যোগ দিল ওদের সঙ্গে। ধারে-কাছেই আছে ওরা, মন্তব্য করল সে। মনে হচ্ছে একটা কিছু ঘটার অপেক্ষায় আছে, কিংবা কারও জন্য অপেক্ষা করছে।

কথাটা একটুও বিশ্বাস করেনি বেন ডেভিস। ফালতু কথা বোলো না! উনুনের মত তেতে ওঠা মরুভূমিতে থাকবে কে শুনি?

চোখ তুলে তার দিকে তাকাল এরিক, শান্ত স্বরে বলল: কয়েক ঘন্টা আগেও ওই উনুনে ছিলাম আমরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *