০৩. নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছে তীর্থযাত্রী

নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছে তীর্থযাত্রী। হঠাৎ রোয়েনার এক পরিচারিকা এসে থামালো ওকে।

লেডি রোয়েনা আপনার সাথে একটু কথা বলতে চান, পরিচারিকা বললো।

আমার সাথে কথা বলতে চান! বিস্ময় তীর্থযাত্রীর কণ্ঠে।

হ্যাঁ। আসুন আমার সঙ্গে।

পরিচারিকার সাথে রোয়েনার ঘরে গেল তীর্থযাত্রী। হাঁটু গেড়ে বসে অভিবাদন জানালো।

চুল আঁচড়াচ্ছিলো রোয়েনা। তিনজন পরিচারিকা পেছনে দাঁড়িয়ে সাহায্য করছে। তীর্থযাত্রীকে দেখেই ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালো সে।

এ কি করছেন? রোয়েনা বললো, উঠুন। আমার্কে অমন করে সম্মান দেখাতে হবে না। এই যে চেয়ারটায় বসুন। পরিচারিকাদের দিকে তাকিয়ে যোগ করলো, এলগিটা ছাড়া আর সবাই বাইরে যাও। এই পবিত্র তীর্থযাত্রীর সাথে আমি একটু একা আলাপ করতে চাই।

একে একে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল তিন দাসী।

তীর্থযাত্রী, শুরু করলো রোয়েনা, একটু আগে খাওয়ার ঘরে আপনি উইলফ্রিড অভ আইভানহোর কথা বলছিলেন। আমার অনুরোধ, দয়া করে বলুন, কবে আপনি ওকে শেষ দেখেছেন? ভালো ছিলো তো?

দেখুন, সত্যি কথা বলতে কি আইভানহো সম্পর্কে সামান্যই জানি আমি, জবাব দিলো তীর্থযাত্রী। আপনি ওর ব্যাপারে কৌতূহলী জানলে আরেকটু খোঁজ খবর করে আসতে পারতাম বোধহয়।

খুব শিগগিরই কি দেশে ফিরবে? আগ্রহের সঙ্গে জানতে চাইলে রোয়েনা।

বোধ হয়। আমার ধারণা এখন উনি ইংল্যান্ডে ফেরার আয়োজনেই ব্যস্ত।

ওহ, তাড়াতাড়ি আসুক! নইলে এসে হয়তো দুঃসংবাদ শুনতে হবে ওকে। বাবা অ্যাধেলস্টেনের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করছে। আমার কি করার আছে? শেষ কথাগুলো যেন নিজেকে শোনানোর জন্যেই বললো রোয়েনা। অ লুকানোর জন্যে অন্য দিকে মুখ ফেরালো সে।

তীর্থযাত্রী দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ। কি করবে কিছু বুঝতে পারছে না যেন।

কয়েক সেকেন্ড লাগলো রোয়েনার নিজেকে সামলাতে। চোখ মুছে আবার তাকালো তরুণ তীর্থযাত্রীর দিকে।

আচ্ছা, ওর সঙ্গে যখন আপনার শেষ দেখা হয় তখন কেমন দেখেছেন ওকে?

এমনিতে ভালোই রঙটা একটু ময়লা হয়েছে রোদে পুড়ে, একটু রোগাও হয়েছেন মনে হলো। তাছাড়া একটু যেন দুশ্চিন্তাগ্রস্তও দেখাচ্ছিলো তাকে।

দীর্ঘশ্বাস ফেললো রোয়েনা। এখানে এলেও ওর সেই দুশ্চিন্তা দূর হবে কিনা কে জানে? আইভানহো আমার ছেলেবেলার সাথী, ওর সম্পর্কে যেটুকু সংবাদ আপনি দিলেন সেজন্যে ধন্যবাদ। আপনি মনে হয় ক্লান্ত, আর আপনাকে দেরি করিয়ে দেবো না। আমি এই সামান্য উপহারটুকু দিতে চাই আপনাকে, যদি গ্রহণ করেন আন্তরিকভাবে খুশি হবো।

একটা স্বর্ণমুদ্রা এগিয়ে দিলো রোয়েনা তীর্থযাত্রীর দিকে।

টাকা পয়সার-কোনো প্রয়োজন যে আমার নেই, আপত্তির সুরে বললো অর্থযাত্রী।

আমি জানি। তবু আপনার ভবিষ্যৎ পথচার কথা ভেবে যদি গ্রহণ করেন সত্যিই বলছি আমি কৃতজ্ঞ হবো।

আর আপত্তি করলো না তীর্থযাত্রী। হাত বাড়িয়ে নিলো মুদ্রাটা। মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানিয়ে বেরিয়ে এলো রোয়েনার ঘর থেকে। বাইরে এক ভৃত্য অপেক্ষা করছিলো ওকে ওর ঘর দেখিয়ে দেয়ার জন্যে। তার সাথে হাঁটতে লাগলো তীর্থযাত্রী।

বিরাট বাড়িটার যে অংশে চাকরবাঁকররা থাকে ভৃত্য সেখানে নিয়ে গেল তীর্থযাত্রীকে। একটা ঘর দেখিয়ে বললো, এই ঘরে থাকবেন আপনি। ভেতরে চৌক্তি আছে, ভালো ভেড়ার চামড়া আছে, আশা করি খুব একটা অসুবিধা হবে না ঘুমাতে।

আচ্ছা, ঐ ইহুদীটাকে কোন ঘরে থাকতে দেয়া হয়েছে জানো নাকি? জিজ্ঞেস করলো তীর্থযাত্রী।

আপনার পাশেরটাই। ডানদিকে।

আর গার্থের ঘর?

আপনার বা পাশেরটা।

হাতের মশালটা তীর্থযাত্রীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল ভৃত্য। ঘরে ঢুকলো তীর্থযাত্রী। দরজা বন্ধ করে মশালটা এক কোণে গুঁজে রাখলো। তারপর ঘরের একমাত্র খটখটে চৌকিটায় উঠে শুয়ে পড়লো সটান। কাপড় চেপড় ছাড়ার ঝামেলা পোহালো না। গায়ের ওপর টেনে নিলো ভেড়ার চামড়া।

শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম এলো না। নানা চিন্তায় ভারি হয়ে আছে মাথাটা। বেশ কিছুক্ষণ শুয়ে শুয়ে এপাশ ওপাশ করলো তীর্থযাত্রী। রোয়েনার কথা ভাবছে। ভাবছে নাইট টেম্পলার ব্রায়ানের কথা, স্যাক্সন সেড্রিকের কথা। ভাবতে ভাবতেই এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো সে।

.

সূর্যোদয়ের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ঘুমালো তীর্থযাত্রী। তারপর উঠে প্রার্থনায় বসলো। প্রার্থনা শেষ করে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আইজাকের ঘরে ঢুকলো সে।

বুড়ো ইহুদী তখন দুঃস্বপ্ন দেখছেন। ঘরে ঢুকেই তীর্থযাত্রী শুনতে পেলো তার চিৎকার:

দয়া করো আমাকে! নবী আব্রাহামের নামে মিনতি করছি, দয়া করো, দয়া করো আমাকে! আমার কাছে কিছু নেই। কি দেবো তোমাদের? আমি গরীব! বিশ্বাস করো, কপর্দকশূন্য! আমাকে ছেড়ে দাও! দয়া করো! ওহ!

চিৎকার করছেন আর ঘুমের ভেতরই ছটফট করছেন আইজাক। আস্তে তার কপাল স্পর্শ করলো তীর্থযাত্রী। লাফ দিয়ে চৌকি থেকে নেমে দাঁড়ালেন বৃদ্ধ ইহুদী। বুনো আতঙ্কে বিস্তারিত দুচোখ।

ভয় পাবেন না, আইজাক, কণ্ঠে বললো তীর্থযাত্রী। আমি আপনার বন্ধু।

বন্ধু! বললেন বৃদ্ধ। এই অসময়ে এখানে!

আপনাকে সাহায্য করতে এসেছি। আপনার সামনে সমূহ বিপদ!

কিন্তু আমাকে বিপদে ফেলে কার কী লাভ?

জানি না। আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, কাল রাতে টেম্পলার তার লোকদের যা বলেছে আমি শুনেছি।

কী বলেছে? শঙ্কিত কষ্ঠে প্রশ্ন করলেন আইজাক।

রদারউড থেকে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে ধরে ত দ্য বোয়েফ-এর দুর্গে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে টেম্পলার।

কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়লেন আইজাক। ভয়ে কাগজের মতো শাদা হয়ে হয়ে গেছে মুখ।

ওহ্ নবী আব্রাহাম, ওহ্ ঈশ্বর! কাঁদ কাঁদ স্বরে বললেন তিনি। আমি জানতাম এমন কিছু হবে! ওরা তো একটা একটা করে আমার হাত পা খসিয়ে নেবে! বাঁচান আমাকে! দয়া করুন!

উঠুন, আইজাক, ভয়ে এমন অস্থির হয়ে পড়লে বিপদ আপনার কমবে, বরং বাড়বে। আমার কথা শুনুন, এক্ষুণি–ওরা কেউ জেগে ওঠার আগেই এ বাড়ি ছেড়ে পালাতে হবে আপনাকে।

কিন্তু কি করে পালাবো? এই অসময়ে কে আমাকে ফটক খুলে দেবে?

ও নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না, এখান থেকে যেন নিরাপদে বেরুতে পারেন আমি তার ব্যবস্থা করছি। এ এলাকার পথঘাট সব আমি চিনি। আপনাকে কিছুদূর এগিয়ে দিয়ে আসবো।

প্রথমে একটু ভরসা পেলেন আইজাক। তারপরই সন্দেহ দেখা দিলো তাঁর মনে। মিথ্যে কথা বলছে না তো এই তীর্থযাত্রী? টেম্পলার ব্রায়ানের মনে যা আছে এরও মনে যদি তা-ই থেকে থাকে?

ইহুদী খ্রীষ্টান সবাই এক ঈশ্বরের সৃষ্টি, বললেন বৃদ্ধ। আপনি ভুলিয়ে ভালিয়ে আমাকে বাইরে নিয়ে গিয়ে বিপদে ফেলবেন না তো? আমি নিঃস্ব মানুষ। আমার সাথে প্রতারণা করে কোনো লাভ হবে না আপনার।

হাসলো তীর্থযাত্রী। দেখুন, আপনি নিঃস্ব না হয়ে যদি কোটিপতি হতেন তাতেও আমার কিছু এসে যেতো না। সহজ সাধারণ জীবনযাপনের সংকল্প নিয়ে আমি এ পোশাক পরেছি। জাগতিক সম্পদ, ঐশ্বর্য সব আমার কাছে এখন তুচ্ছ। শুধু একটা ভালো ঘোড়া আর যুদ্ধের পোশাকের লোভ এখনো ছাড়তে পারিনি। ও দুটো জিনিস পেলে কি করবো বলতে পারি না। যা হোক, আপনার মনে যদি সন্দেহ থাকে এখানেই থাকুন। বিপদে পড়লে সেড্রিক আপনাকে বাঁচাবেন আশা করি।

না, না! স্যাক্সন নরম্যান সবাই ইহুদীদের ঘৃণা করে। সেড্রিকও নিশ্চয়ই করেন। উনি আমাকে কোনো সাহায্যই করবেন না। না, আপনার সাথেই যাবো আমি, আর কোনো উপায় নেই! চলুন তাড়াতাড়ি! আপনি তৈরি?

হ্যাঁ তৈরি। তবে আগে একজনের সাথে একটু কথা বলতে হবে। আসুন আমার সাথে।

বৃদ্ধকে নিয়ে নিজের ঘরের বাঁ পাশের ঘরটায় ঢুকলো তীর্থযাত্রী। ঘুমিয়ে আছে গাৰ্থ আর ওয়াম্বা। গার্থের কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে ডাকলো সে, গার্থ, ওঠো তো!

অস্কুট একটা শব্দ করে পাশ ফিরে শুলো গার্থ।

গার্থ! গার্থ! ওঠো! আবার ডাকলো তীর্থযাত্রী। পেছনের দরজাটা বুলে দাও।

এবার ধড়মড় করে উঠে বসলো গাৰ্থ। চোখ কচলে, তাকালো তীর্থযাত্রীর দিকে।

পেছন দিকের দরজাটা খুলে দাও, আবার বললো তীর্থযাত্রী। আমি আর এই ইহুদী এক্ষুণি বাইরে যাবো।

বিরক্তির ছাপ পড়লো গার্থের মুখে।

ইহুদী আর আপনি এক সাথে! ঘুম জড়িত কণ্ঠে সে বললো। যাকগে, কার সাথে যাবেন সে আপনার ব্যাপার, কিন্তু আমি এখন পেছনের দরজা খুলতে পারবো না। যতক্ষণ না ওরা সদর ফটক খুলছে ততক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে আপনাদের। আবার শুয়ে পড়লে গাৰ্থ।

শোনো, গাৰ্থ-, বলে একটু ঝুঁকে ওর কানে কানে কি যেন বললো তীর্থযাত্রী। অমনি তড়াক করে উঠে দাঁড়ালো গাৰ্থ। দুচোখ ভর্তি বিস্ময়।

তাড়াতাড়ি ঠোঁটের ওপর আঙুল রাখলো তীর্থযাত্রী। শ-শ-শ, গার্থ! একটা কথাও না। পরে সব বলবো তোমাকে। এখন তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিয়ে এই বৃদ্ধের ঘোড়াটা নিয়ে এসো। আমার জন্যেও একটা এনো। কাজ

শেষ হয়ে গেলেই আমি ফিরিয়ে দিয়ে যাবো।

ঘুম ঘুম ভাব কোথায় পালিয়েছে! তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নেমে গার্থ  ছুটলো দরজা খোলার জন্যে। ঘর থেকে বেরিয়ে উঠানে এসে দাঁড়ালো তীর্থযাত্রী ও আইজাক। হঠাৎ পেছনে পদশব্দ পেয়ে ঘুরে দাঁড়ালো দুজন। যথারীতি আশঙ্কায় শাদা হয়ে গেছে বৃদ্ধের মুখ। অবশ্য ওয়াম্বাকে দেখে স্বস্তি ফিরে এলো তার মনে।

প্যালেস্টাইনে গিয়ে কি আপনারা শেখেন জানতে বড় ইচ্ছে হয় আমুর, মৃদু হেসে বললো ওয়াম্বা।

বোকা! শিখবো আবার কি? জবাব দিলো তীর্থযাত্রী। ওখানে গিয়ে আমরা প্রার্থনা করি; সারাজীবনে যে পাপ করেছি তার জন্যে অনুশোচনা করি, ক্ষমা ভিক্ষা করি ঈশ্বরের কাছে; উপবাস করি; কখনো কখনো সারারাত জেগে ঈশ্বরের নাম জপি।

উহুঁ, আরো কিছু করেন, কিছু শিখে আসেন। নইলে শুধু প্রার্থনা, অনুশোচনা আর উপবাসের বাণী শুনে গাৰ্থ অমন হন্তদন্ত হয়ে ছুটতে দরজা খোলার জন্যে।

তীর্থযাত্রী আর কিছু বলার আগেই গার্থ হাজির হলো, দুই হাতে টেনে আনছে দুটো ঘোড়া।

বৃদ্ধ ইহুদী এক মুহূর্ত দেরি না করে তার ঘোড়ায় চেপে বসলেন। নীল কাপড়ের একটা থলে পোশাকের ভেতর থেকে বের করে দ্রুত হাতে বেঁধে ফেললেন জিনের সাথে। তারপর আলখাল্লার এক প্রান্ত এমন ভাবে সেটার ওপর ছড়িয়ে দিলেন যে বাইরে থেকে দেখে কেউ বুঝতে পারবে না ওটার নিচে কিছু আছে।

কি থলেটায়? নিচুকণ্ঠে প্রশ্ন করলো তীর্থযাত্রী। তেমন দামী কিছু না। এই দুএকটা কাপড় জামা আর কি।

আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না তীর্থযাত্রী। লাফ দিয়ে উঠে বসলো তার জন্যে আনা ঘোড়াটায়। শুধু ওয়া নয়, আইজাকও খেয়াল করলো, তার ঘোড়ায় চাপার ভঙ্গিটা খুব চৌকস। একমাত্র দক্ষ ঘোড়সওয়ারের পক্ষেই অমন করে ঘোড়ায় চাপা সম্ভব।

দেরি না করে জোর কদমে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলো দুজন। কয়েক ঘণ্টা একটানা ছুটে ছোট একটা পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে লাগাম টেনে ধরলো তীর্থযাত্রী।

আর কোনো ভয় নেই আপনার, বললো সে। ফিলিপ ম্যালভয়সিঁ আর রেজিনাল্ড ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফ দুজনেরই এলাকা আমরা পার হয়ে এসেছি। সোজা পথটার দিকে ইশারা করলো তীর্থযাত্রী। এই পথে গেলে শেফিল্ডে পৌঁছে যাবেন।

আর আপনি? প্রশ্ন করলেন আইজাক।

আমি বিদায় নেবো এখান থেকে।

না! না! করুণ হয়ে উঠলো বৃদ্ধের মুখ। আমাকে এখনই ছেড়ে যাবেন না দয়া করে। সেই টেম্পলার আর তার সঙ্গীরা এখন পর্যন্ত ধাওয়া করে এসে আমাকে ধরবে।

কিন্তু আমাদের যে আর এক সাথে চলা উচিত হবে না। আপনি ইহুদী, আমি খ্রীষ্টান। আমাদের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ আলাদা। তাছাড়া টেম্পলারের সশস্ত্র অনুচররা যদি আক্রমণ করেই বসে আমি নিরস্ত্র, একা আপনাকে বাঁচাবো কি করে?

আপনি ইচ্ছে করলেই আমাকে বাঁচাতে পারবেন, এবং আমার বিশ্বাস প্রয়োজন হলে বাঁচাবেনও। দয়া করুন আমাকে, ভাই। আপনাকে আমি পুরস্কৃত করবো।

আমি তো আগেই বলেছি, টাকা বা পুরস্কারের ওপর আমার কোনো লোভ নেই। যদি আপনাকে সাহায্য করি, এমনিই করবো। এক মুহূর্ত ভাবলো তীর্থযাত্রী। তারপর বললো, ঠিক আছে, আপনি যখন বলছেন, শেফিল্ড পর্যন্ত আপনাকে পেীছে দেবে। প্রয়োজন হলে বিপদে সাহায্যও করবো। বিপন্ন মানুষ–সে ইহুদীই হোক আর মুসলমানই হোক, তাকে সাহায্য করা খ্রীষ্টান ধর্মের বিরোধী নয়।

আহ, আপনি আমাকে বাঁচালেন। ঈশ্বর আপনার ভালো করবেন।

কিন্তু একটা কথা, শেফিল্ডের ওপাশে কিন্তু আমি যেতে পারবো না। ওখানে নিশ্চয়ই আপনার জানাশোনা ইহুদী পরিবার আছে, তাদের কাছে সহজেই আপনি আশ্রয় পেয়ে যাবেন।

শেফিল্ড পর্যন্ত গেলেই চলবে। ওখানে আমার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় আছে। ওর বাড়িতেই আমি উঠতে পারবো।

চলুন তাহলে। আধ ঘণ্টার মধ্যেই আমরা শেফিল্ডে পৌঁছে যাবো।

আর কোনো কথা হলো না তাদের ভেতর। নিঃশব্দে পাশাপাশি ঘোড়া চালিয়ে চললো দুজন। আধঘণ্টার মাথায় পৌঁছে গেল শেফিল্ডে।

এবার আমি যাই, বললো তীর্থযাত্রী।

এই হতভাগ্য ইহুদীর ধন্যবাদ না নিয়েই?

ধন্যবাদের কোনো প্রয়োজন নেই। আপনার জন্যে যেটুকু করেছি মানুষ হিসেবে মানুষের জন্যে এটুকু করা আমার কর্তব্য।

ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে রওনা হতে গেল তীর্থযাত্রী। অমনি তার পোশাকের প্রান্ত ধরে ফেললেন আইজাক।

একটু দাঁড়ান। আপনার সহৃদয়তার প্রতিদান আমাকে দিতেই হবে। এই মুহূর্তে আপনি যা মনে প্রাণে চাইছেন আমি হয়তো তার ব্যবস্থা করে দিতে পারবো।

অবাক হলো তীর্থযাত্রী। আমি যা মনেপ্রাণে চাইছি! বলুন তো কি। চাইছি?

একটা ভালো ঘোড়া আর যুদ্ধের পোশাক আর অস্ত্র।

আপনি কি করে জানলেন!

জানি। রহস্যময় এক টুকরো হাসি উপহার দিলেন বৃদ্ধ ইহুদী।

কিন্তু কি করে? আমার সাধারণ চালচলন, অতি সাধারণ পোশাক, কথাবার্তা–সব দেখেশুনেও আপনার মনে এ সন্দেহ হলো কেন?

কাল রাতেই আমি টের পেয়েছি। আপনি যেসব কথা বলছিলেন শাদামাঠা হলেও তাতে ছিলো আগুনের ফুলকির চমক। সাধারণ একজন তীর্থযাত্রীর মুখ থেকে অমন কথা বেরোতে পারে না। তাছাড়া আজ ভোরে আপনি যখন ঝুঁকে আমাকে জাগাচ্ছিলেন তখন দেখলাম আপনার আলখাল্লার নিচে ঝুলছে নাইটদের হার। তারপর আর সন্দেহ রইলো না।

হাসলো তীর্থযাত্রী। আপনার আলখাল্লার নিচে উঁকি দিলে কি পাওয়া যাবে বলুন তো!

এ কথার কোনো উত্তর দিলেন না আইজাক। কোমরের ছোট্ট চামড়ার বাক্সটা থেকে লেখার সাজ সরঞ্জাম বের করে হিব্রু ভাষায় কি যেন লিখলেন। তীর্থযাত্রীর হাতে লেখাটা দিতে দিতে বললেন, লিস্টার শহরে এক ধনী ইহুদী আছেন, তাঁর নাম কিরজাথ জেরাম। অন্তত ছয় প্রস্থ খুব ভালো যুদ্ধের পোশাক আর অস্ত্রশস্ত্র আছে তার কাছে। এই কিরজাথ জেরামের কাছে গিয়ে আমার এই চিঠি দেখালে উনি আপনাকে এক প্রস্থ পোশাক ও অস্ত্রশস্ত্র দেবেন। ছটার ভেতর থেকে পছন্দমতো বেছে নিতে পারবেন। উনি একটা ঘোড়াও দেবেন আপনাকে। যদি দাম দিয়ে কিনে নিতে পারেন, ভালো, না হল টুর্নামেন্ট শেষে ওগুলো আপনি ফেরত দেবেন কিরজাথকে।

কিন্তু, আইজাক, তীর্থযাত্রী বললো, টুর্নামেন্টে যখন কোনো নাইট পরাজিত হয় তখন তার বর্ম, অস্ত্রশস্ত্র সব তো বিজয়ীকে দিয়ে দিতে হয়। যদি আমি হেরে যাই–

উদ্বেগের ছায়া পড়লো আইজাকের মুখে। কিন্তু মুহূর্তের জন্যে। তারপরই আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠলো বৃদ্ধের চেহারা।

ঠিক আছে, ও নিয়ে ভাববেন না, বললেন তিনি। আপনি যদি একান্ত হেরেই যান, কিরজাথ জেরামের সাথে আমি মিটিয়ে ফেলবো ব্যাপারটা। তারপর অদ্ভুত এক সহানুভূতির দৃষ্টি ফুটে উঠলে তার চোখে। বললেন, টুর্নামেন্টে লড়ার সময় সতর্ক থাকবেন। ঘোড়া বা বর্মের কথা আমি ভাবছি না, ভাবছি আপনার অমূল্য প্রাণের কথা।

আমি সতর্ক থাকবো, বললো তীর্থযাত্রী। আপনার পরামর্শ আর সহৃদয়তার কথা কখনো ভুলবো না। সময় হলে এই উপকারের প্রতিদান আমি দেবো।

আব্রাহাম আপনার মঙ্গল করুন। আপনি জয়ী হোন এই কামনা করি।

একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দুই ভিন্ন পথে রওনা হলেন দুজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *