০৩. কোথায় গেলেন ক্যাপ্টেন

কোথায় গেলেন ক্যাপ্টেন? নিবিড় অন্ধকারে গিডিয়ন স্পিলেটের উদ্বিগ্ন প্রশ্ন শোনা গেল।

পানিতে পড়ে গেলেন কি তিনি? নাকি বেলুন থেকে নামারই সুযোগ পাননি? চারজন লোক নেমে পড়ায় হালকা হয়ে যাওয়া বেলুন হয়তো তাঁকে নিয়েই শূন্যে উধাও হয়ে গেছে। পানিতে পড়ে গিয়ে থাকলে উন্মত্ত ঢেউয়ের বুকে সাঁতার কেটে তীরে পৌঁছুনো অসম্ভব। তবুও-স্পিলেট বললেন, চলো, খোঁজ করে দেখি।

ঘুটঘুটে অন্ধকারে দৃষ্টি চলে না, তবুও হাতড়ে হাতড়ে এগোতে লাগল অভিযাত্রীরা। বেলুনটা যেদিক থেকে উড়ে এসেছে সেদিকেই রওনা হলো সবাই। একটু পর পরই কেউ না কেউ ক্যাপ্টেনের নাম ধরে ডাকছে। সব চেয়ে অস্থির নেব। শেষ পর্যন্ত বলেই ফেলল সে, ক্যাপ্টেনকে ছাড়া এই অজানা দ্বীপে বেশিদিন টিকতে পারব না আমরা। এখন ওকে জীবন্ত পাওয়া গেলে হয়।

প্রত্যেকের মনেই দেখা দিয়েছে দুর্ভাবনাটা  উতলা হয়ে ভাবছে সবাই ভয়ঙ্কর সম্ভাবনার কথা। এত হাক ডাকেরও কোন জবাব নেই। এক সময় হার্বার্ট বলল, কোথাও জখম হয়ে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে নেই তো ক্যাপ্টেন?

হঠাৎ বুদ্ধি বের করল পেনক্র্যাফট। বলল, যাওয়ার পথে আগুনের কুন্ড জ্বালিয়ে গেলে একটা পথের নিশানা থেকে যাবে ক্যাপ্টেনের জন্যে! জ্ঞান ফিরে এলে, নিশানা দেখে তিনি ঠিকই বুঝবেন কোন পথে এগুচ্ছি আমরা।

কথাটা পছন্দ হলো স্পিলেটের। নেবকে বললেন, দেখো তো, ধারে কাছে শুকনো কাঠ পাওয়া যায় কিনা?

কিন্তু দেশলাই আছে তো সাথে? জিজ্ঞেস করল হার্বার্ট।

আছে, উত্তর দিল পেনক্র্যাফট, জামার ভেতরের পকেটে রেখেছিলাম। সাগরের পানি ওটার নাগাল পায়নি।

কিন্তু সমস্যা হলো শুকনো কাঠের। অনেক খুঁজেও কাঠ পেল না নেব। এমন কি ঘাস পাতাও না। ফিরে এসে বলল, নাহ! কাঠ তো কাঠ, একটা কুটোও নেই কোথাও।

পাথর ছাড়া বোধ হয় আর কিছু নেই এদেশে, বললেন স্পিলেট।

অন্ধকারেই হাতড়ে হাতড়ে এগোল ওরা। হঠাৎ সামনে একটা আওয়াজ শুনেই থমকে দাঁড়াল। তীরে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের শব্দ। আর এগোনো চলবে না।

মনিবের নাম ধরে বার কয়েক চেঁচিয়ে ডাকল নেব। কিন্তু বৃথা। উত্তর দিলেন ক্যাপ্টেন সাইরাস হার্ডিং। শুধু নেবের ডাক সামনে কোন কিছুর গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল।

সামনে নদী, সাগর নয়, বলল পেনক্র্যাফট, নদীর ওপারে পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে এ প্রতিধ্বনির সৃষ্টি হচ্ছে। খোলা সাগরে প্রতিধ্বনি হয় না।

পেনক্র্যাফটের যুক্তিতে সায় দিলেন স্পিলেট। গাঢ় অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। নদীর তীর ধরে ঘুরতে ঘুরতে বোঝা গেল এপারের পাথুরে দ্বীপটা খুব একটা বড় নয়। চারদিকে টিলার মত পাহাড়ে গাছপালার চিহ্নমাত্র নেই। কোন হিংস্র জানোয়ার আছে বলেও মনে হয় না। নিশ্চিন্ত হয়ে একটা চ্যাপ্টা পাথরের ওপর বসল সবাই। অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর নীরবতা ভাঙল পেনক্র্যাফট, ক্যাপ্টেনকে বোধ হয় আর ফিরে পাব না।

কিন্তু সহজে হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নন স্পিলেট। বললেন, ভাল করে খুঁজলে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে ওঁকে। কোথায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন, কে জানে।

পেনক্র্যাফটের কথায় একটু মনক্ষুন্ন হলো নেব। বার বার মৃত্যুর মুখ থেকে যিনি বেঁচে এসেছেন, পানিতে ডুবে মরার পাত্র তিনি নন। নিজের হাতে ক্যাপ্টেনের মৃতদেহ স্পর্শ না করা পর্যন্ত কারও কথা বিশ্বাস করবে না সে। বাকি তিনজনের মধ্যে আলোচনা চলল, সকাল হলে কিভাবে ক্যাপ্টেনের খোঁজ করা যায়।

ভোর হলো। আগের রাতে যেদিক থেকে প্রতিধ্বনি শোনা গেছে সেদিকে চাইল সবাই। সত্যি, খরস্রোতা নদীর ওপারে ডাঙা দেখা যাচ্ছে। তন্ময় হয়ে ওদিকে চেয়ে আছেন স্পিলেট, এমন সময় ঝপাৎ করে একটা শব্দে চমকে উঠে ফিরে চাইলেন। দেখলেন, নদীতে ঝাপিয়ে পড়ে সাঁতরে ওপারে চলে যাচ্ছে নেব।

যাচ্ছ কোথায় তুমি, নেব? চেঁচিয়ে উঠলেন স্পিলেট।

ওপারে, সাঁতরে উঠে ওই দ্বীপেই হয়তো আশ্রয় নিয়েছেন ক্যাপ্টেন। সাঁতার কাটতে কাটতেই জবাব দিল নেব।

স্পিলেটও পানিতে ঝাপ দিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আটকাল পেনক্র্যাফট, কি করছেন, মি. স্পিলেট? নেবের মত সাঁতার জানেন না আপনি। এই ভয়ঙ্কর খরস্রোতা নদীতে সাঁতরাতে গিয়ে জান হারাবেন নাকি? একটু অপেক্ষা করুন। ভাটার সময় নদীর পানি কমে গেলে আমরা ওপারে যাব।

কিছুক্ষণেই ওপারে পৌঁছে গেল নেব  এপারের লোকদের উদ্দেশে একবার হাত নেড়ে লম্বা পা ফেলে অদৃশ্য হয়ে গেল পাহাড়ের আড়ালে। নিগ্রো ভূতের প্রভুভক্তি অন্তর দুলিয়ে দিল সবার।

স্থির দৃষ্টিতে ওদিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে ঘুরে দাঁড়ালেন স্পিলেট। তন্ন তন্ন করে আবার খোঁজা শুরু হলো এপারের দ্বীপটায়। কয়েক ঘণ্টা গরু খোঁজা করেও পাওয়া গেল না ক্যাপ্টেনকে। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাহিল হয়ে গেছেন তিনজনই। নদীর পানি কমতে শুরু করেছে তখন। এ হারে কমলে বিকেল নাগাদ একেবারে কমে যাবে পানি। তখন ওপারে গিয়ে দেখা যাবে খাবার কিছু পাওয়া যায় কিনা। কাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি। বেলুনে করে প্রচুর খাবার আনা হলেও প্রাণ বাঁচাবার তাগিদে সব ফেলে দিতে হয়েছে সাগরের পানিতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *