০৩. কি পুরস্কার

কি পুরস্কার… গেয়ে উঠে আবার থেমে গেল কিশোর, তার দিকে খেয়ালই নেই মহিলার, খাঁচার দরজা খুলছেন।

প্লীজ, চেঁচিয়ে উঠল কিশোর, প্লীজ, খুলবেন না। তারপর যথাসম্ভব ভদ্রভাবে মিস কারমাইকেলের হাত থেকে নিয়ে নিল খাঁচাটা। বলল, মনে কিছু করবেন না, এটা আমাদের পায়রা না।

এরপর কি বলবে? মনে মনে ছন্দ সাজাতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে গেল কিশোর। ব্যাখ্যা করে বোঝানো এক কথা, আর সেটা গান গেয়ে শোনানো, তা-ও আবার ব্যাট হাইমসের সুর, নাহ, অসম্ভব। পারবে না। জোরে জোরে চেঁচিয়ে এমননিতেই গলা-মুখ ব্যথা হয়ে গেছে, আর বেশিক্ষণ এই অবস্থা চালালে কথাই বলতে পারবে না শেষে।

ব্যাটল অভ, হাইমসের ধার দিয়েও আর গেল না কিশোর, কিছু মনে করলে করুনগে মহিলা, সে না পারলে কি করবে? নিজেই একটা বেসুরো সুর বানিয়ে নিয়ে চেঁচাল, এখানে আর পারছি না, আর কোথাও চলুন না। অনেক কথা বলার আছে, দয়া করে নবেন কি?

গলায় ঝোলানো তিনরী মুক্তার হারটায় আঙুল বোলাচ্ছেন মহিলা, ছেলেদের দেখছেন। কিশোর ওভাবে খাঁচাটা নিয়ে নেয়ায় মনে আঘাত পেয়েছেন তিনি, তবে প্রকাশ করছেন না।

কিশোরের কথায় মাথা ঝাকালেন; ইঙ্গিত করলেন বাড়ির দিকে। ঘুরে হাঁটতে শুরু করলেন। মাথার ওপর চক্কর দিচ্ছিল বাজ পাখিটা, কাধে বসার আর সুযোগ হবে না বুঝে গিয়ে বসল একটা ডালে। ক্যাঁধের তোতাটা তেমনি বসে আছে, হ্যাটে বসা ক্যানারি ঝিমাচ্ছে আগের মতই। . মিস কারমাইকেলকে অনুসরণ করে বড় একটা জানালা গলে একটা ঘরে ঢুকল। তিন গোয়েন্দা। বিরাট বসার ঘর, প্রচুর আলো। আরও কয়েকটা জানালা রয়েছে, তবে সবগুলোই পুরু কাচে ঢাকা।

খোলা জানালার কাচের পাল্লা বন্ধ করে দিলেন মিস কারমাইকেল। বাইরের কোলাহল তাতে কিছুটা কমল। দেয়ালে বসানো একটা বোতাম টিপলেন। জানালার ফ্রেমের ওপরের একটা খাজ থেকে নেমে এল পুরু কাচের পর্দা, ফ্রেমের নিচের দিকের খাজে শক্ত হয়ে বসে গেল। সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল কোলাহল, নীরব হয়ে গেল ঘর।

চমৎকার ব্যবস্থা, ভাবল মুসা, একেবারে সাগরের তলার নীরবতা। স্কুবা ডাইভিঙের সময় এই নীরবতা খুব লাগে তার, খুব উপভোগ করে। প্রচণ্ড শব্দের পর এই হঠাৎ নীরবতায় হাঁপ ছাড়ল ছেলেরা।

পায়রাটাকে ছেড়ে দিচ্ছ তাহলে? স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন মিস কারমাইকেল, কিশোরের দিকে চেয়ে।

কিশোর বুঝল, বাইরে পাখিদের সঙ্গে একাত্মতা রক্ষার জন্যেই গানের মত করে কথা বলেন তিনি।

কিশোর জবাব দেয়ার আগেই বললেন মিস কারমাইকেল, আমি ভেবেছিলাম ওটাকে এখানে ছেড়ে দেয়ার জন্যে এনেছ। হ্যাণ্ডবিল ছেড়েছি আমি, পত্রিকায় ঘোষণা দিয়েছি, কেউ খাঁচায় বন্দি কোন পাখি এনে এখানে ছাড়লে প্রতিটা পাখির জন্যে বিশ ডলার করে পুরস্কার দেব। বন্দি পাখি দেখলে বড় কষ্ট হয় আমার। এ ভারি নিরতা।

নিষ্ঠুর প্রতিধ্বনি করল যেন তার কাঁধে বসা তোতাটা। নিষ্ঠুর নিষ্ঠুর!

পুরস্কারের ব্যাপারটা পরিষ্কার হলো ছেলেদের কাছে।

কিশোর জানাল মিস কারমাইকেলকে, কবুতরটা তাদের নয়। কিভাবে কোথায় পাওয়া গেছে, খুলে বলল। এখন পাখিটাকে তার আসল মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে চায়।

মিস কারমাইকেলের সঙ্গে কোন একজন অভিনেত্রীর অনেক মিল আছে, ভাবছে রবিন, নামটা মনে করতে পারছে না।

কিশোরের কথা শেষ হলে মুখ খুলল মুসা, আসল মালিকের কাছে টমকে ফিরিয়ে দিতে চাই। আমার বিশ্বাস, ছেড়েই রাখা হবে ওকে।

টম গলার মুক্তোর হারে আঙুল বোলাচ্ছেন মিস কারমাইকেল। এটা কি রকম নাম হলো? না না, পাখির এমন নাম হওয়া উচিত না। তার চেয়ে অন্য কিছু। রাখো, এই যেমন কোন ধাতু কিংবা মূল্যবান পাথরের সঙ্গে মিলিয়ে। ওটার পালক নীলচে তো…এক কাজ করো, কোবাল্ট রাখো…

দুর! নাক কোঁচকাল মুসা।

ঠিক আছে, ঠিক আছে, একটা বিচ্ছিরি কিছু না ঘটে যায়, এই ভয়ে তাড়াতাড়ি হাত তুলে বাধা দিল রবিন, নাম একটা হলেই হলো। কোয়ান্ট নামটাও খারাপ না। কি বলো কিশোর?

হ্যাঁ, যা বলছিলাম, রবিনের কথার জবাব দিল না কিশোর। ম্যাডাম, রবিনের কাছে শুনলাম, রবিনকে দেখাল, সে, লাইব্রেরিতে নাকি পাখি নিয়ে ওর সঙ্গে আপনার আলোচনা হয়েছে। ভাবলাম, আপনার কাছেই খোঁজ পাওয়া যাবে, তাই ছুটে এসেছি। রেসিং হোমারকে ট্রেনিং দেয় এমন কাউকে চেনেন?

জবাব দিলেন না মিস কারমাইকেল। ছেলেদের পেছনে জানালার দিকে নজর। এক মিনিট, বলেই এগিয়ে গিয়ে দেয়ালে বসানো বোতাম টিপে জানালার কাচের পদা উঠিয়ে দিলেন। ঘরের ভেতর ঝাপিয়ে এসে পড়ল যেন প্রচণ্ড কোলাহল।

জানালার পাল্লা খুললেন তিনি। পথের ওপর দাঁড়িয়ে আছে একটা পাখি। একটা দোয়েল। জানালা খুলতেই উড়ে এসে বসল চৌকাঠে।

পাখিটার ঠোঁট থেকে কি একটা জিনিস নিলেন মিস কারমাইকেল।

আহা, কি বুদ্ধিমান বন্ধু আমার, গান গেয়ে উঠলেন তিনি। তাই তো ওকে ডাকি হীরা।

পাখিটা উড়ে বাগানের দিকে চলে গেল।

আবার জানালা বন্ধ করে কাচের পর্দা নামিয়ে দিলেন মিস কারমাইকেল। ছেলেদের কাছে এসে বললেন, চুরি করা, দোয়েল পাখির স্বভাব। তবে আমার পাখি দুটো এমন নয়। হীরা তো খাটি হীরা, অন্য দোয়েলটাও ভাল। চুরিদারি একদম করে, তবে কোথাও কিছু পড়ে থাকলে হীরার সেটা কুড়িয়ে নেয়া চাই-ই। কত সুন্দর সুন্দর জিনিস যে সে এন দেয়,আমাকে। এই দেখো।

মাংসল সাদা হাতের মুঠো খুলে দেখালেন তিনি হীরা কি এনেছে।

মস্ত একটা মুক্তো, ঝকমক করছে।

এই নিয়ে তিনটা হলো, বললেন তিনি, এক মাসে তিনটা মুক্তো এনেছে। কোথায় পায় কে জানে। মুক্তো আমি খুব ভালবাসি। পাখি আর মুক্তো।

হ্যাঁ, যা বলছিলাম, আবার আগের কথা তুলল কিশোর। রেসিং হোমারকে ট্রেনিং দেয়…

মাথা নাড়লেন মিস কারমাইকেল। না, তেমন কারও কথা মনে পড়ছে না।

আচ্ছা, ঠিক আছে, যদি মনে পড়ে… পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে বাড়িয়ে ধরুল কিশোর, দয়া করে এই নাম্বারে ফোন করে জানালে খুব খুশি হব।

কার্ডটা ধরলেন মিস কারমাইকেল, কিন্তু পড়তে পারলেন না। তার আগেই ডাইভ দিয়ে নেমে এল তোতা, কার্ডটা ঠোঁটে করে নিয়ে গিয়ে বসল আবার আগের জায়গায়।

আপনার অনেক সময় নষ্ট করলাম, ব্যাংকিউ, বলল কিশোর। মহিলাকে পছন্দ করতে শুরু করেছে সে। তবে যে কাজে এসেছিল, তার কিছুই হয়নি, কোন রকম সাহায্য হলো না। সাউণ্ডপ্রুফ এই ঘরটাকে এখন একটা খাঁচা মনে হচ্ছে তার, এখান থেকে বেরিয়ে যেতে পারলে বাঁচে।

জানালার কাচের পর্দা সরিয়ে পাল্লা খুলে দিলেন মিস কারমাইকেল। একে একে বেরিয়ে এল ছেলেরা মহাকোলাহলের মধ্যে। একবার ফিরে তাকাল কিশোর, তাদের দিকে নজর নেই মহিলার। হাতের মুক্তোটা দেখছেন, মুখে হাসি।

ড্রাইভওয়ে ধরে সাইকেল চালিয়ে ফিরে চলল তিন গোয়েন্দা। এখানে কথা বলার চেষ্টা বৃথা। দূরে গিয়ে তারপর যা বলার বলবে, ভাবল কিশোর। পাখির কলরব কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে, অসহ্য লাগছে তার।

হঠাৎ তীক্ষ্ণ চিৎকারে থেমে গেল কিশোর। প্রথমে ভেবে ছিল পাখির ডাক, কি ভেবে ফিরে তাকাল বাড়ির দিকে। পাখি নয়, বাজ পাখির গলা নকল করে চেঁচিয়ে উঠেছেন মিস কারমাইকেল, কিশোর ফিরে তাকাতেই হাত তুলে ডাকলেন।

আমার এক বন্ধু আছে, গাইলেন মিস কারমাইকেল, রিচার্ড হ্যারিস নামটি তাহার, বাস করে এই শহরেই; পায়রা পোষার শখ ছিল তার, বলেছে সে একদিন। কি আফসোস, ভুলেই ছিলাম, কি আফসোস, ভুলেই ছিলাম।

ব্যাংকিউ, মিস কারমাইকেল, বলল কিশোর। রিচার্ড হ্যারিস নামটি আমি আর সহজে ভুলব না, শেষের কথাগুলো সুর করে বলল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *