০২. হাসিতে ফেটে পড়লাম

হাসিতে ফেটে পড়লাম। ঠেকাতে পারলাম না।

তোমরা সবাই মিলে মজা করছ! বললাম।

কীসের মজা? প্রশ্ন করল জোয়ান। কে এ?

ওর এবং অন্যদের মুখের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে ওরা আমাকে চেনে না।

মুসার দিকে ঘুরে দাঁড়ালাম।

শোনো, মুসা, বাসাতেও মশকরা করে আমার বইয়ের ব্যাগ লুকিয়ে ক্লান্ত হয়েছে। কাজেই ইংরেজি আর বায়োলজি ক্লাসে তোমার বইগুলো আমাকে ধার দিয়ো, কেমন?

মুসারমুখের চেহারায় ব্যঙ্গ ফুটল। এক পা পিছু হটল ও।

কী বলতে শুরু করেছিল, কিন্তু এসময় স্কুলের ঘণ্টা বাজল।

মুহূর্তে সবাই স্কুল বিল্ডিঙের দিকে পা বাড়াল। আমি প্রথমে যাব তিনতলার হোমরুম ক্লাসে। সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছি, দেখা হয়ে গেল রবিনের সঙ্গে।

অ্যাই, রবিন, পাশ কাটানোর সময় বললাম। ও আমার দিকে চেয়ে ভ্ৰ কুঁচকাল, কিন্তু চলা থামাল না। কী ব্যাপার, রবিন? কিছু হয়েছে?

রবিন পিছু ফিরে আমার দিকে চাউনি বুলাল। ভ্রূ কুঁচকানো এখনও।

কী আবার হবে? পাল্টা বলল ও। তোমাকে চিনতে পারলাম। সিঁড়ি ভেঙে নেমে গেল ও।

চিনতে পারল না মানে? আজব তো। সিঁড়ির মাথায় থেমে দাঁড়ালাম। মনে হচ্ছে সেভেন্থ গ্রেডের সবাই আমার সঙ্গে তামাশা করছে।

ছেলে-মেয়েরা দ্রুতবেগে আমার পাশ কাটাচ্ছে, শেষ ঘণ্টা পড়ার আগেই পৌঁছতে চাইছে হোমরুমে। উপলব্ধি করলাম আমারও তাই করা উচিত।

রুম নম্বর ২০৩-এ প্রবেশ করলাম। জানালার পাশে, আমার ডেস্কের উদ্দেশে পা বাড়ালাম। ওখানে পৌছে দেখি জো লেমন আমার সিটে বসা।

তুমি মনে হয় ভুল সিটে বসেছ, ডেস্কের পাশে দাড়িয়ে বললাম। জো বিশালদেহী ছেলে, মোটেই বন্ধুভাবাপন্ন নয়। নোটবইতে কী সব টুকছিল।

জো মুখ তুলল। কয়েক মুহূর্তের জন্য আমার দিকে চোখ পিটপিট করে চাইল। এবার ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়াল। ও আমার চাইতে পাক্কা চার ইঞ্চি লম্বা। আমার মুখের উপর আস্তে আস্তে গর্জন ছাড়ল, তুমি…আমাকে…কী…বললে?

গলাটা কেমন শুকনো ঠেকল। কাঁধের ব্যথাটা আবারও শুরু হলো।

বললাম তুমি আমার সিটে বসেছ। তুমি সবসময় আমার এক সিট পিছনে বসো। এটা কোন ব্যাপার না, কিন্তু তুমি সরে গেলে আমি আমার সিটে বসতে পারতাম।

কে এ? বলে চারধারে নজর বুলাল জো। অন্যান্য ছেলে-মেয়েরা আমাদের দিকে চেয়ে রয়েছে। বেশিরভাগ শ্রাগ করল। কেউ কেউ হেসে উঠল।

বিরক্ত লাগতে শুরু করেছে আমার। বাসায় আর ক্লাসের বাইরে ঠাট্টা-ইয়ার্কি মেনে নেয়া যায়। কিন্তু ক্লাস বসতে চলেছে, এখন এসব ভাল লাগছে না। তা ছাড়া জো লেমন আমার বন্ধু নয়। ও কেন মশকরা করবে আমার সঙ্গে? আমি এমনকী ওকে পছন্দও করি না।

দেখো, জো, মশকরা করছ বুঝতে পারছি, কিন্তু আমি এখন আমার সিটে বসতে চাই। তুমি পিছনে গিয়ে-

এসময় শেষ ঘণ্টা পড়ল। মিসেস ফিশার, আমাদের হোমরুম টিচার সবাইকে চুপ করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বললেন।

সবাই যার যার সিটে বসে পড়ো, বললেন তিনি। পিছনের দিকে চাইলেন। জো আমার সিটে বসা। আমি ডেস্কের পাশে বোকার মত দাঁড়িয়ে। ওখানে কী হচ্ছে? মিসেস ফিশার প্রশ্ন করলেন।

মিসেস ফিশার, জো লেমন আমার সিটে বসে আছে, ছাড়তে চাইছে না, বললাম।

মিসেস ফিশার করিৎকর্মা মানুষ। আমি জানি এ সমস্যার সমাধান এখুনি হয়ে যাবে।

কিন্তু তুমি কে, ইয়াং ম্যান? প্রশ্ন করলেন তিনি।

চারপাশে নজর বুলিয়ে নিলাম। কমুহূর্ত লেগে গেল উনি কী বলছেন বুঝতে।

আমি কে? বলতে গিয়ে গলা চড়ে গেল সামান্য। মিসেস ফিশার ফিফথ গ্রেড থেকে আমার হোমরুম টিচার।

হ্যাঁ, তোমার নামটা প্লিজ, সাড়া দিলেন তিনি।

মিসেস ফিশারও তামাশায় যোগ দিয়েছেন! ভাল ফ্যাসাদেই পড়া গেছে। কিন্তু মিসেস ফিশার তো কখনও ঠাট্টা করেন না। ঠিক করলাম আমিও খেলে যাব।

আমার নাম কিশোর পাশা, মিসেস ফিশার। মিসেস ফিশার ডেস্কে বসলেন, কিছু কাগজ-পত্র পরীক্ষা করলেন তিনি। এবার মুখ তুলে আমার দিকে চাইলেন।

এই হোমরুমে নতুন কোন স্টুডেন্ট নেয়া হয়েছে এমন কোন ননাটিশ দেয়নি হেড অফিস। তুমি বরং মেইন ফ্লোরে গিয়ে ব্যাপারটা  তাদেরকে চেক করে দেখতে বলল, বললেন মিসেস ফিশার।

ইয়েস, ম্যাম, বললাম। দরজার দিকে এগোলাম। রব মিশেলের পাশ কাটাতে হলো। সামনের দিকে বসা সে। আমাদের ফুটবল টিমের সেন্টার। আজকে প্র্যাকটিসে দেখা হবে, রব, বললাম। রব এমনভাবে আমার দিকে চাইল, আমি যেন মঙ্গলগ্রহ থেকে এসেছি।।

হলওয়ে এখন নির্জন, ছেলে-মেয়েরা সব তাদের হোমরুমে। সিঁড়ি ভেঙে নেমে যাওয়ার সময় মাথায় খেলে গেল এক ঘণ্টা আগে আমি ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে কী কী ঘটেছে।

আমি যাদেরকে চিনি তারা সবাই নাটক করছে। তারা আমাকে কেন বেছে নিয়েছে বুঝলাম না। এর শেষ কোথায় তাও জানা নেই আমার। কিন্তু আমাকে ব্যাপারটা জানতে হবে। স্কুল ফ্রন্ট অফিসটা আমার ঠিক সামনে।

অফিসে প্রবেশ করে দেখি মিসেস পোর্টার তাঁর সেক্রেটারি ডেস্কে বসা, কম্পিউটারে কাজ করছেন। মিসেস পোর্টার আমাকে ছোটকাল থেকেই চেনেন।

হাই, মিসেস পোর্টার, বললাম। তিনি মুখ তুলে চেয়ে মৃদু হাসলেন। আমি অনেকখানি স্বস্তি বোধ করলাম।

গুড মর্নিং, বললেন তিনি। আমি তোমার জন্যে কী করতে পারি?

ঠিক জানি না…ব্যাপারটা বেশ মজার। আমার প্রথমে প্রশ্ন করা উচিত-আপনিও কি এই জোকটার সাথে জড়িত?

আমার দিকে চেয়ে রইলেন তিনি।

জোক? কীসের জোক?

ভাল! ওরা মিসেস পোর্টারকে এরমধ্যে জড়াতে পারেনি। মিসেস পোর্টার আমাকে এই রহস্যের সমাধানে সাহায্য করতে পারবেন।

মানে আজ সকাল থেকে দেখছি চাচা-চাচী থেকে শুরু করে যার সাথেই দেখা হচ্ছে তারা সবাই আমাকে না চেনার ভান করছে। মিসেস ফিশার এমনকী আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন ব্যাপারটার জট খোলার জন্য। হাসির ব্যাপার না?

মাথা ঝাঁকালেন মিসেস পোর্টার, আমার দিকে চাইলেন।

তোমার নাম কী?

আমি একদৃষ্টে চেয়ে রইলাম তার দিকে। ঠিক শুনেছি তো?

আহ, মিসেস পোর্টার, আমি ভেবেছিলাম আপনি এই তামাশাটার সঙ্গে নেই, বললাম।

আমি কোন তামাশা করছি না, বললেন মিসেস পোর্টার। কিন্তু তুমি তোমার নাম না বললে আমি তোমাকে কোন সাহায্য করতে পারব না–

আমি কিশোর পাশা, মিসেস পোর্টার, আপনি কে মনে করেছেন? আমি সেভেন্থ গ্রেডার, হোমরুম ২০৩-এ আছি, ফুটবল টিমের প্লেয়ার–

চেঁচাচ্ছ কেন? বললেন মিসেস পোর্টার, কম্পিউটারের কি টিপতে লাগলেন।

আমি একটু আপসেট হয়ে পড়েছি, বললাম, প্রথমে বললেন আপনি জোকটার মধ্যে নেই, কিন্তু এখন দেখছি আছেন।

জোক হচ্ছে এখানে, বললেন মিসেস পোর্টার, কম্পিউটার স্ক্রীনের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে। কিন্তু জোকটা করছ তুমি।

তার মানে? প্রশ্ন করলাম। কম্পিউটার ফাইলে কিশোর পাশা নামে কারও রেকর্ড নেই। এখন তো নেইই, আগেও ছিল না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *