মাত্র সকাল, অথচ গরম কড়াইয়ের মতো তাপ ঢালছে সূর্যটা। মাথার ওপর নীল আকাশ। একচিলতে মেঘ নেই আজ। বাতাস থমকে গেছে। সাগর শান্ত। বুয়েন্স আয়ার্স শহরের বিশ কিলোমিটার দক্ষিণে এসে হাজির হলো জেলিফিশ জাহাজ। সামনে সাগরের বুকে মাথা তুলে এবড়োখেবড়ো দাঁত দেখিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জাহির করছে দুসারি পাহাড়শ্রেণী। পাহাড় দুটোর মাঝে সরু একটা খাঁড়ি। বালথাযারের কথা অনুযায়ী সরু সেই খাঁড়ির ভেতর জাহাজ নিয়ে যাওয়া হলো।

কাজে নামল ডুবুরিরা। খাঁড়ির চারধারে নৌকো নিয়ে ছড়িয়ে পড়ল। প্রতি নৌকোয় দুজন করে ডুবুরি। একজন ডুব দেবে, অন্যজন নৌকোয় বসে থাকবে। ডুবুরিকে সাহায্য করবে সে উঠে আসার সময়। পরের দফা নামবে নৌকোয় বসা প্রথমজন। এভাবে পালা বদল করে সারাদিন চলবে ঝিনুক আহরণের কাজ।

তীরের সবচেয়ে কাছে যে নৌকোটা, সেটার ডুবুরি প্রকাণ্ড একটা প্রবালখণ্ডের সঙ্গে বাঁধা দড়িতে পা পেঁচিয়ে সাগরে ডুব দিল। সাগরের পানি বেশ উষ্ণ। এতই পরিষ্কার যে তলা পর্যন্ত দেখা যায়। নিচে একটা আলপিন পড়লেও তুলে আনা যাবে। সাগরের মেঝে যেন একটা অপূর্ব সুন্দর বাগান। নানা রঙের নানা আকৃতির প্রবাল সে বাগানের সৌন্দর্য। নিস্তব্ধ নিথরতায় আলোর ঝিলিকু জুলে ছুটে বেড়াচ্ছে অসংখ্য ছোট ছোট মাছ। নানা রং তাদের। কোনটা সোনালি, কোনটা রুপোলি, আবার কোনটা বা লাল-নীল-হলুদ-সবুজ–বিচিত্র রঙা।

সাগরের মেঝেতে নেমে পড়েছে ডুবুরি। ঝটপট হাত চলছে তার। ক্ষিপ্র হাতে ঝিনুক কুড়িয়ে কোমরে বাঁধা থলিতে পুরছে। তার সঙ্গী দড়ির অপর প্রান্তে, নৌকোর ওপর থেকে ঝুঁকে তার কাজকারবার দেখছে। ওপরের লোকটা দেখল হঠাৎ কোন কারণে ভয় পেয়েছে ডুবুরি সঙ্গী। শরীরটা পানির নিচে একটা ঝটক খেল। দড়িতে ডুবুরি এত জোর টান লাগাল যে আরেকটু হলে নৌকো থেকে সাগরে গিয়ে পড়ত সে। তাড়াহুড়ো করে ডুবুরিকে দড়ি টেনে ওপরে তুলে আনল লোকটা। ভয়ে ডুবুরির তামাটে চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। দুচোখ বিস্ফারিত, এখনই যেন অক্ষিকোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসবে।

কি! কি হলো! হাঙরে তাড়া করেছিল? ডুবুরিকে দম নিতে দিয়ে জিজ্ঞেস করল সে।

জবাব দিতে পারল না ডুবুরি, সংজ্ঞা হারিয়ে নৌকোর পাটাতনে ঢলে পড়ল।

সাগরের তলদেশে চোখ বোলাল সঙ্গী। কিসের যেন একটা চাঞ্চল্য শুরু হয়েছে ওখানে। শিকারি বাজের হামলা হলে ছোট ছোট পাখি যেমন দিগ্বিদিক ছুটে পালায়, ঠিক তেমনি করে দিশে হারিয়ে ছুটছে ছোট মাছের দল। প্রবালের আড়ালে লুকাতে ব্যস্ত। একটা বড় পাথরের পাশে লাল ধোয়ার মতো কি যেন একটা ছড়িয়ে পড়ছে! আস্তে আস্তে গোলাপী হয়ে গেল তলার পানির রং। কালো কি একটা পড়ে আছে নিচে! হাঙর ওটা! হাঙরের লাশ। মরা হাঙরটা পাক খেতে খেতে একটা পাথরের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। লালু ধোয়াটা বোধহয় মৃত হাঙরের রক্ত। এই মাত্র খুন করা হয়েছে দানবটাকে। কে করল? নৌকোর ওপর চিত হয়ে পড়ে থাকা ডুবুরি সঙ্গীর দিকে তাকাল সে। এখনও মুখ হাঁ করে পড়ে আছে ডুবুরি, ঘোলা চোখের দৃষ্টি আকাশের গায়ে। তাহলে? কে মারল হাঙরটাকে। আতঙ্কিত ডুবুরিকে নিয়ে জাহাজে ফিরল সঙ্গী।

জাহাজে তো ফিরল, কিন্তু ডুবুবির মুখ দিয়ে কোন কথা বের হচ্ছে। আতঙ্কে বোবা হয়ে গেছে। অনেক চেষ্টা তদবির করার পর শুধু দুএকটা কথা বলতে পারল সে।

স…স…সাগর-দানো! দেখেছি আমি!

অনেক সময় লাগল লোকটার স্বাভাবিক হতে। ততক্ষণে ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে ডুবুরিরা।

তাদের চাপাচাপিতে বলতে শুরু করল ডুবুরি: হঠাৎ দেখলাম একটা কালচে রঙের বিরাট হাঙর আমার দিকে তেড়ে আসছে। মুখটা হাঁ করে রেখেছে, সারি সারি ক্ষুরধার দাঁত দেখলাম। বুঝে গেলাম আজকে আমি শেষ। তারপর দেখলাম আরেকটা কি যেন আসছে!

ডুবুরি চুপ করায় দম আটকে যাওয়ার জোগাড় বাকিদের। একজন প্রশ্ন করল, কি আসছিল? আরেকটা হাঙর?

না। আসছিল সেই সাগর-দানো!

কেমন ওটা দেখতে? মাথা আছে? কিরকম?

মাথা তো আছে, কিন্তু চোখ দুটো বড় বড়, মনে হলো যেন কাচের তৈরি।

আর থাবা?

হ্যাঁ, থাবা আছে?

আছে। একেবারে ব্যাঙের মতো। লম্বা লম্বা সবুজ রঙের আঙুল। সেই আঙুলে ধারাল নখর। সারা গা আঁশে ভরা মাছের মতো। ছুটে এসে হাঙরটাকে এক থাবা মারল, তাতেই হাঙরের পেট চিরে রক্ত বেরোতে শুরু করল।

তো ভয় পেলে কাকে দেখে, হাঙর না সাগর-দানো?

সাগর-দানো আজকে আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে কিন্তু হাঙরটাকে নয়, সাগর-দানোকেই ভয় লেগেছে বেশি।

এক বুড়ো ইন্ডিয়ান বলল, উনি সাগরের দানো। গরীবরা যখন সাগরে বিপদে পড়ে, তখন সাহায্য করেন।

দেখতে দেখতে চারপাশে খবর ছড়িয়ে পড়ল। কাজ অসমাপ্ত রেখেই তাড়াহুড়ো করে জাহাজে ফিরে এলো ডুবুরিদের নৌকোগুলো। ডুবুরিদের মুখে মুখে অতিরঞ্জিত হলো কাহিনী। শেষ পর্যন্ত সাগর দানোর চেহারা পালটে গেল। যে ডুবুরি দেখেছে সে পর্যন্ত তাজ্জব হয়ে গেল বর্ণনা শুনে।

সাগর-দানোর নাক দিয়ে হলকায় হলকায় লাল আগুন বের হয়। তার দাঁতগুলো যেমন বড় তেমনি ধারাল। কানগুলো হাতির কানের মতো নড়ছিল। দেহের দুপাশে দুটো পাখনাও ছিল। পায়ের বদলে নৌকোর হালের মতো তার লেজ।

ডুবুরিদের গালগল্প শুনতে শুনতে পায়চারি করছে পেদরো জুরিতা, ঠোঁটে চুরুট। তার ধারণা যে ডুবুরি হাঙর দেখেছে সে সাগর-দানোর ব্যাপারটা কল্পনা করে নিয়েছে।

কিন্তু তাহলে ওটা কি!

পাহাড়ের পেছন থেকে বাঁশির মতো চিৎকার!

সাগর-দানো!

মুহূর্তে ডুবুরিদের কথাবার্তা গালগপ্প থেমে গেল। হতবিহ্বল ডুবুরিরা নিষ্পলক চোখে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকল। আতঙ্কে জমে যাবার অবস্থা হয়েছে তাদের প্রত্যেকের।

জাহাজের সামান্য দূরে সাগরে খেলা করছিল একদল শুশুক। বাঁশির আওয়াজটা হতেই খেলা সাঙ্গ করে পাহাড়ের দিকে ছুটল ওদের একটা। মনে হলো যেন কেউ তাকে ডেকে পাঠিয়েছে।

হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে জাহাজের ওরা। একটু পরই চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল প্রত্যেকের। শুশুকটা ফিরে আসছে। তার পিঠে বসে আছে মানুষেরই মতো একটা প্রাণী। এই কি সেই সাগর-দানো? এরই কথা বলেছে আতঙ্কিত ডুবুরি? দানোর দেহ মানুষেরই মতো। অবশ্য চোখ দুটো অস্বাভাবিক বড়, রোদের প্রতিফলন হওয়ায় জ্বলজ্বল করছে গাড়ির হেডলাইটের মতো। নীলাভ-রূপোলি তার গায়ের রং। হাতের আকৃতি একেবারেই ব্যাঙের মতো। আঙুলের ফাঁকগুলোয় চামড়ার ঝালর।

সাগর-দানোর হাঁটু রয়েছে সাগরের পানির নিচে, কাজেই পা মানুষের মতো নাকি মাছের মতো সেটা বোঝা গেল না। দানোর হাতে একটা প্যাচানো শঙ্খ। ওটা দিয়েই সে বাঁশির তীক্ষ্ণ আওয়াজ করে। আরেকবার শঙ্খ বাজাল দানো। তারপর সবাইকে হতবাক করে দিয়ে খাঁটি স্প্যানিশে বলে উঠল, জোরে, লিডিং! আরও জোরে ছোট।

শুশুকের পিঠে আলতো করে চাপড় দিল সে। পা দিয়ে শুশুকের পেট স্পর্শ করল। গতি বেড়ে গেল শুশুকের, আরও জোরে ছুটতে শুরু করল।

উত্তেজিত স্বরে যার যার বক্তব্য বলতে শুরু করল ডুবুরিরা। আওয়াজটা কানে যাওয়ায় জাহাজের দিকে তাকাল দানো। মানুষ দেখতে পেয়েই কাত হয়ে চট করে লুকিয়ে পড়ল শুশুকের দেহের আড়ালে।

ডুবুরিরা দেখল, সবুজ একটা হাত আবার আলতো করে স্পর্শ করল শুশুকটাকে। এটা নির্দেশ। সঙ্গে সঙ্গে আরোহী সমেত ডুব দিল শুশুক, ফিরে চলল পাহাড়ের আড়ালে। একটু পরই শুশুক বা সাগর দানো কিছুই আর দেখা গেল না।

মাত্র মিনিট খানেক পার হয়েছে, কিন্তু ডুবুরিদের মনে হলো এক যুগ পেরিয়ে গেছে। সংবিৎ ফিরতে অনেকক্ষণ পেরিয়ে গেল তাদের। একেকজন একেক রকম আচরণ করছে। কেউ দুহাতে মাথা চেপে উদ্দেশ্যহীন ছোটাছুটি করছে, কেউ আবার হাঁটু মুড়ে বসে সাগর দানোর কাছে প্রার্থনা করছে। তরুণ এক মেক্সিকান নাবিকের মাথায় কি ভূত চাপল, সোজা মাস্তুল বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল সে। নিগ্রো খালাসিরা লুকিয়ে পড়ল জাহাজের খোলে, যেন ওখানে তাদের স্পর্শ করতে পারবে না বিপদ।

যা ঘটে গেল তারপর আর ঝিনুক আহরণের প্রশ্নই ওঠে না। ক্যাপ্টেন পেদরো আর বালথাযার অনেক সাধ্যসাধনা করে নাবিক আর ডুবুরিদের মাঝে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনল। দেরি না করে জেলিফিশ জাহাজ রওনা হয়ে গেল খাঁড়ি ছেড়ে। উত্তর দিকে চলেছে।

Share This