০২. বাতাসে একটা শুকনো ঝরা পাতা

বাতাসে একটা শুকনো ঝরা পাতা উড়িয়ে নিয়ে গেল বড় রাস্তার উপর দিয়ে। একাগাড়ির খচ্চরটা একটু নড়ে উঠতেই ওর গলায় বাঁধা ঘন্টাটা মৃদু শব্দে বেজে উঠল। জাভেদের কথা কয়টা বাতাসকে ভারি করে তুলেছে। সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার চ্যালেঞ্জ দিয়ে বসেছে সে।

যে লোকটা মেয়েটাকে গাড়িতে উঠতে সাহায্য করেছিল সে ঘুরে দাঁড়াল। তোমার এ কথার মানে কী? জানতে চাইল সে।

পাতলা ছিপছিপে গড়ন লোকটার। মুখটা সুদর্শন কিন্তু বোঝা যায় ওই মুখের পিছনে লুকিয়ে আছে বর্বরতা। জাভেদ আগেও এই ধরনের চেহারার অন্তরালে কুৎসিত মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। অস্থির চিত্ত হয় এরা। এই অস্থির মনোভাবই এদের নিজের বা অন্যের অনর্থক মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আমার নাম জাভেদ বক্স। “জে” মার্কা র‍্যাঞ্চের মালিক আমি। আর ভাচে ক্রীক আমার এলাকা।

বুঝতে পারছ না তুমি, এবারে কথা বলে উঠল মিস পেজ যেন অবুঝ কোন শিশুকে বোঝাচ্ছে, ঠাণ্ডা সংযত কণ্ঠস্বর। ভাচে ক্রীকের সাথে চল্লিশ দাগ জমি আমাদের সম্পত্তি।

ভাচে ক্রীকে একটাই র‍্যাঞ্চ আছে আর ওখানে মাত্র একটা র‍্যাঞ্চ করার মতই জায়গা আছে-সেই জায়গা আমার। কোন রকম দ্বিধা না করেই ঘোষণা করল জাভেদ।

এক হাতে তার স্কার্টটা ঠিক করে নিল মেয়েটা। তার আশ্চর্য রকম পাতলা ঠোঁটে একটা পোশাকী হাসি লেগে রয়েছে। ঠাণ্ডা চোখে যাচাই করে দেখছে সে। আমার সত্যিই দুঃখ হচ্ছে তোমার জন্যে, কিন্তু আমি নিরুপায়। ভুল করছ তুমি, ওই জমি আমাদের সম্পত্তি সেই ১৮৪৪ থেকে। যারা অন্যায় ভাবে জবর দখল করে ওটা ভোগ করেছে এতদিন তাদের উঠে যেতেই হবে।

নিজের দাবি সম্বন্ধে তোমরা এতই নিশ্চিত যে আগেই ভাড়াটে খুনী পাঠিয়েছিলে জায়গার দখল নেবার জন্যে?

মারমুখো হয়ে এক পা এগিয়ে এল ম্যাথিউ। কী বলতে চাও তুমি?

কথাটা যেভাবে খুশি নিতে পারো তোমরা। ম্যাটই ওদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক লোক, ওর চোখে চোখে চেয়েই কথাগুলো বলল জাভেদ। মাথা মোটা লড়িয়ে লোক ম্যাট, ওকে সহজে সামলানো যাবে না। সেটা বোঝাই যায়। যে দল নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে ভাড়াটে বন্দুকবাজ পাঠায়, তাদের যে নিজেদের দাবি সম্পর্কে কোন আস্থা নেই তা জলের মত পরিষ্কার।

তুমি কি কোন ব্যাপারে আমাদের দায়ী করছ?

শাইনি ডিক এখানে ছেলেখেলা খেলতে আসেনি। আমার কর্মচারীকে গুলি করে সামান্য আহত করেছে সে। শুনেছি ডিককে ভাড়া করতে অনেক টাকা লাগে। আমার ধারণা ওকে পাঠানো হয়েছিল আমাকে হত্যা করে তোমাদের দাবি নির্বিরোধে প্রতিষ্ঠা করার জন্যেই।

ওদের কথা আর বেশিদূর গড়াতে দিল না বব। কথার মাঝেই বাধা দিয়ে সে বলে উঠল, জাভেদ, ঠাণ্ডা মাথায় আমাদের বিচার করে দেখতে হবে ব্যাপারটা। ওদের যদি সত্যিই কোন দাবি…’

ওদের কাগজপত্র যদি কিছু থাকে কানাকড়িও দাম নেই তার, রূঢ় ভাবে বলে উঠল জাভেদ। গুয়াডালুপ ক্যানিয়নে ভাচে ক্রীক ছাড়া এমন কোন জায়গা নেই যেখানে আর একটা র‍্যাঞ্চ করে একটা প্রাণীও বাঁচিয়ে রাখা যাবে। ভাচে ক্রীক আমার জায়গা, আমি সরাসরি জানিয়ে দিচ্ছি যে “জে” মার্কা ছাড়া অন্য কোন পশুকে চরতে দেয়া হবে না ওই এলাকায়।

গাড়ির পিছনের চাকার দাঁড়ায় একটা পা তুলে দিয়ে দাঁড়িয়েছে মলিন বাকস্কিনের জামা পরা পাহাড়ী শিকারী স্টিভ। মিটিমিটি হাসিমুখে কথা শুনছে আর তামাশা দেখছে সে।

মেয়েটা আবার কথা বলে উঠল। আমার নাম নীনা পেজ। ভাচে ক্রীকের আশেপাশের অনেকটা জমি আমার দাদার নামে লিখে দিয়েছিলেন গভর্নর আর্মিজো। আমার দলিলে তার সব শর্তাবলী স্পষ্টভাবেই লেখা রয়েছে। তবে তুমি নিশ্চয়ই জমিটার কিছু উন্নতি করেছ, সেজন্যে আমি তোমার ক্ষতিপূরণ দিতে পারি, হাতের ব্যাগটা খুলল মেয়েটা। আর তোমার যা স্টক আছে তাও আমি কিনে নিতে রাজি আছি।

আপোষে সব মীমাংসা হয়ে যাবার সুযোগ দেখে লাফিয়ে উঠল বব। সে তো খুব ভাল কথা, তাড়াতাড়ি বলে উঠল সে। কী বলো, জাভেদ?

জমিটা আমার এবং আমারই থাকবে। একটু কষ্ট স্বীকার করে সান্তা ফেতে খবর নিলেই তোমরা জানতে পারবে আর্মিজোর কোন দলিল বা চুক্তির কতটুকু দাম দেয়া হয়।

হতবুদ্ধির মত নীনার দিকে মুখ তুলে চাইল ম্যাট। এর জবাব তার জানা নেই, নীনার কিছু বলার অপেক্ষায় রইল সে।

তুমি কি একটা মেয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামবে নাকি? আমার তো ধারণা ছিল পশ্চিমের লোকেরা সত্যিকার পুরুষ।

মুখের কথায় টলার পাত্র নয় জাভেদ। সে জবাব দিল, খেলায় যখন নেমেছ, সুন্দরী, ছেলেই হও আর মেয়েই হও, যে-ই আমার জমিতে পা দেবে তার বুকেই বিধবে আমার বুলেট। আমার জমি নিতে হলে কেবল মুখের মিষ্টি কথায় কাজ হবে না। কোন মেয়ে যদি পুরুষের খেলা খেলতে নামে, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ীই খেলতে হবে তাকে।

শোনো, জাভেদ! উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল শেরিফ, শাইনি ডিকের সাথে এই ভদ্রমহিলার কোন সম্পর্ক আছে এমন কোন প্রমাণ নেই তোমার কাছে। তোমার কথা তোমাকে ফিরিয়ে নিতে হবে। ক্ষমা চাইতে হবে তোমার এই মহিলার কাছে!

শেরিফের কথাকে কোন পাত্তা না দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে বারে গিয়ে ঢুকল জাভেদ। বিলিয়ার্ড টেবিলের উপর থেকে দেহটাকে সরিয়ে নিয়ে পিছনের ঘরে একটা টেবিলে রাখা হয়েছে। ওর দেহের কিছুটা অংশ এঘর থেকে এখনও দেখা যাচ্ছে।

বব রকেটিও জাভেদের পিছন পিছন ঢুকল বারে। হেলান দিয়ে বারের উপর ঝুঁকে পড়ে বন্ধুসুলভ গলায় সে জিজ্ঞেস করল, চলবে এক গ্লাস?

ধন্যবাদ, আমার আর লাগবে না।

খুবই দুঃখের বিষয়,…এভাবে ঠিক শীতের আগে দিয়ে নিজের থাকার জায়গাটা পর্যন্ত হারানো…সত্যিই দুর্ভাগ্যের বিষয়।

জাভেদ কটমট করে ববের দিকে চাইল একবার, কিন্তু কোন জবাব দিল না।

তোমার জায়গায় আমি হলে ওদের সাথে কথাবার্তা বলে একটা আপোষ মীমাংসা করার চেষ্টা করতাম। ওদের জন্তু-জানোয়ারগুলোও তো শুনছি পথে রয়েছে…পৌঁছল বলে।  

তোমার হয়েছেটা কী বলো তো, বব? তুমি এখানকার ডেপুটি শেরিফ নাকি ওদের উকিল? ওই জমিটা আমার। আমি ওখানে বাস করি, ওখানেই খেটে খাই, আর আমার দলিলটাও পাকা দলিল। তুমি কি মনে করেছ কেউ আমাকে মিথ্যে ধাপ্পা দিয়ে ওখান থেকে বের করতে পারবে? তোমার যা কাজ তাই করো তুমি, বব-বেশি বুঝতে যেয়ো না।

রাগে মুখ লাল হয়ে উঠল ববের। আইনের লোক আমি, আইন প্রয়োগ করব। তাতে তোমার অসুবিধা হলেও করার কিছু নেই আমার।

আমার মনে হয়, মাঝখানে নরম গলায় ফোড়ন কাটল স্টিভ, জাভেদের কথাই বেশি টেকসই হচ্ছে এখানে। আমরা সবাই দেখেছি গত চার বৎসর ধরে ওখানে র‍্যাঞ্চ করে রয়েছে সে-জায়গটাও রয়েছে তার দখলেই, আর তার কাছে পাকা দলিল আছে–একথাও জানিয়েছে ও। আমি শেরিফ হলে ব্যাপারটাকে ভাল করে ভেবে দেখতাম।

ওর কথায় আরও খেপে গেল বব। ওর কথার পিছনে জোরাল যুক্তি আছে। অস্বীকার করার উপায় নেই, কিন্তু ওদের মত লোক ধাপ্পা দেবে এটাও তো বিশ্বাসযোগ্য কথা নয়–বিশেষ করে মেয়েটা কিছুতেই অসৎ হতে পারে না। ওদের আভিজাত্য প্রথম নজরেই ধরা পড়ে। ভাল ঘরের মেয়েদের উচিত সম্মান দিতে শেখানো হয়েছে তাকে। একজন বুদ্ধিমতী শিক্ষিত মহিলা জঘন্য একটা ষড়যন্ত্রের সাথে কখনোই জড়িত থাকতে পারে না। তা ছাড়া ওদের যদি কোন দাবিই না থাকবে তবে এত ঝামেলা করে এতসব জন্তু-জানোয়ার নিয়ে অতদূর থেকে ওরা আসবেই বা কেন? টাকা আর ক্ষমতার প্রতি শ্রদ্ধা আছে ববের-আর সে দুটোই আছে এমন অনেক ইঙ্গিত এরই মধ্যে ওদের কাছ থেকে পেয়েছে সে।

ওরকম একটা মেয়ে মিথ্যে কথা বলতে পারে না, বলল বব।

তোমার যদি মেয়েদের সম্বন্ধে ওই ধারণা থাকে তবে বলতে হবে নারীর একশো এক রূপের মাত্র একটাই দেখেছ তুমি! হাসল জাভেদ, কিন্তু সেই হাসিতে ঠাট্টার লেশমাত্র নেই।

দরজা খুলে নীনা পেজ, ম্যাথিউ ব্রিকাবি আর সেই সুদর্শন যুবক ঢুকল বারে।

আমি তোমাকে আবার অনুরোধ করছি, মিস্টার বক্স, ভাচে ক্রীকটা ছেড়ে দাও তুমি।

ঘরে মেয়েটার মুখোমুখি দাঁড়াল জাতে। কেউ তোমাকে খুব ভুল তথ্য সরবরাহ করেছে, মিস পেজ। যে জমি তুমি দাবি করতে এসেছ তা কি নিজে দেখেছ তুমি কোনদিন? তুমি কি সঠিক জানো কীসের মধ্যে ঢুকতে চাচ্ছ তুমি? ওখানে বড় র‍্যাঞ্চ করতে গেলে জানো কী রকম বিপাকে পড়তে হবে তোমাকে? ওই গুয়াভালুপ ক্যানিয়ন এখান থেকে উত্তরে, চওড়ায় কোথাও আধ মাইল কোথাও বা এক মাইল। কিন্তু উপত্যকায় মাত্র কয়েকশো ফুট চওড়া ওটা। আর এর কোথাও একটা পশুর বড় দলকে খাওয়ানোর মত ঘাস নেই।

আরও উত্তরে আরও সরু হয়ে এসেছে। শীতকালে আমরা মাঝে মধ্যে তুষারের জন্যে মাসখানেকও আটকা থেকেছি। গ্রীষ্মে অবশ্য বেশ কিছু পশুর খাবার ওখানে পাওয়া যায় কিন্তু শীতে পশুর খাওয়া জোগানো এই এলাকা। সম্পর্কে কারও বিশেষ জানা শোনা না থাকলে অসম্ভব। সমতল জায়গার রাস্তারদের এসব শিখে নিতে কয়েক বৎ র লাগবে। যাকেই জিজ্ঞেস করো সে-ই বলবে সমুদ্র থেকে দেড় মাইল উপরে র‍্যাঞ্চ করা পাগলামি ছাড়া আর কিছুই না।

আমি বলব এই শীতের আগে দিয়ে এখানে অনেক জন্তু জানোয়ার নিয়ে র‍্যাঞ্চ করতে আসার বুদ্ধি তোমাকে যে-ই দিয়ে থাকুক, খুব ভুল করেছে। এখন আমার পরামর্শ হবে ওগুলো নিয়ে কাছেই কোন ফোর্ট বা মার্কেটে, যেখানে ইন্ডিয়ানদের জন্যে পশু কেনা হয়, গিয়ে ওগুলো বিক্রি করে দাও। তারপর এখানে এক বৎসর নিজেরা থেকে সব দেখার পরও যদি তোমাদের এই এলাকায় র‍্যাঞ্চ করার শখ থাকে তবে তখন তোমরা যে সব জায়গা খালি আছে এখনও তারই একটা বেছে নিতে পারো।

ভাচে ক্রীকেই আমার জমি, মিস্টার জাভেদ বক্স, ঠাণ্ডা স্বরে বলে উঠল মেয়েটা। আমি তোমাকে অনেক সাক্ষীর সামনে ভালয় ভালয় জায়গাটা ছেড়ে দিতে বললাম। কিন্তু তা যদি না দাও তবে আমার লোকেরা আমাদের র‍্যাঞ্চের কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করার জন্যে তোমার ওপর খুব একটা সন্তুষ্ট থাকবে না।

খুবই আশ্চর্য কথা, ধীর শান্ত গলায় বলল জাভেদ। তোমরা এখানে কোন ঘর-বাড়ি তৈরির ব্যবস্থা না করেই এই অসময়ে শীতের আগে দিয়ে হাজির হয়েছ মনে হয় যেন তোমরা আমার কথা আগে থেকেই জানতে, ভেবেছিলে আমাকে তাড়িয়ে আমার ঘরগুলো পাবে। মনে হয় এও তোমরা জেনেই এতগুলো পশু নিয়ে রওনা হয়েছ যে শীতের কিছুটা সময় তোমাদের আগে থেকে জমিয়ে রাখা খাবার খাওয়াতে হবে ওদের-সেখানেও তোমরা আমার জমানো খাবারই ব্যবহার করার পরিকল্পনা নিয়েছিলে। এই জন্যেই কি তোমরা শাইনি ডিককে পাঠিয়েছিলে পথ পরিষ্কার করতে?

ভুরুতে ভাজ পড়ল ববের। নীনা পেজের দিকে চোখ তুলে চাইল সে। এই প্রথম বারের মত তার চোখে সন্দেহের ছায়া পড়ল। কথাগুলো খুবই যুক্তিসঙ্গত, র‍্যাঞ্চ সম্বন্ধে সামান্য জ্ঞান আছে এমন লোকও এই কথার যুক্তি পুরোপুরি বুঝতে পারবে।

দরজার দিকে এগিয়ে গেল নীনা। দরজার কাছে একটু থেমে পিছন ফিরে বলল, আমার বক্তব্য শুনেছ তুমি, তোমাকে সবার সামনে ভাচে ক্রীক খালি করে দেবার জন্যে নোটিশ দেয়া হয়েছে। আমার গরু-মহিষগুলো এসে পড়লেই আমি ভাচে ক্রীকের দখল নেব।

দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেল ওরা। সেলুনের প্রিঙ লাগানো বাদুড়-পাখা দরজার ডালা দুটো সামনে পিছনে দুলতে থাকল। বার আর স্টেজ-স্টেশনের ভিতর সবাই নিশ্ৰুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

ছয়জন আছে ওরা এখানে, স্টিভ তার মতামত জানাল। পশু তাড়িয়ে আনছে যারা তারাও সংখ্যায় ডজনখানেকের কম হবে না,-হুম, বলা যায় বেশ কঠিন লড়াইয়ে জড়িয়ে গেছ তুমি, জাভেদ।

আমার একজনই লোক আছে, কিন্তু সে একাই ওদের একডজনের সমান। তা ছাড়া আমার ঘরে আছে প্রচুর খাবার আর এক হাজার রাউন্ড গুলি। ওরা যদি নিজেদের জন্যে ঝামেলা তৈরি করতে চায় তবে ঠিক জায়গাতেই কড়া নেড়েছে।

গ্লাসের বাকি মদটুকু গলায় ঢেলে দিয়ে দরজার দিকে এগুলো জাভেদ। ফেরার পথ ধরতে হবে এখনই, নইলে রাত হয়ে যাবে তার।

দরজার কাছাকাছি পৌঁছে ডাক শুনে থামল সে।

জাভেদ, নরম নিচু কণ্ঠে বলল সে। আমি ভাবছিলাম একটা কথা-তুমি কি ভেবে দেখেছ, লোকগুলোর চলা-বলা ধরন-ধারণ দেখে মনে হয় ওরা খুব চালু লোক। টাকা পয়সাও ওদের যথেষ্ট, আছে বলেই মনে হয়-কিন্তু তাই যদি হবে, তবে ওরা যেখানে ছিল সেই জায়গাটা কী দোষ করল? একমাত্র গরীব লোকদেরই একখান থেকে আর একখানে গিয়ে আস্তানা বাধতে দেখা যায় ভাগ্য পরিবর্তন করার জন্যে। ওরা বড়লোক, ওদের কেন জায়গা পরিবর্তনের দরকার হলো?

স্টিভের কথাগুলোকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে প্রসঙ্গ পাল্টে বব বলে উঠল, আচ্ছা, জাভেদ, ডিক মরেছে সামনের দিকে গুলি খেয়ে, যে-ই মেরে থাকুক ওকে, সে প্রশংসার পাত্র-কিন্তু আসলে ঘটনাটা কী ঘটেছিল বলো তো?

সংক্ষেপে মাঠের মধ্যে ঘোড়ার চলার দাগ দেখতে পাওয়া থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছে বলল জাভেদ। মনে মনে অবাক না হয়ে পারল না বব। নিজেও সে ভাল লড়তে পারে, ভাল যোদ্ধাও সে। জাভেদ সংক্ষেপে বললেও বাকিটা আঁচ করে নিতে কোন অসুবিধা হলো না তার। বেশির ভাগ লোকই ওই অবস্থায় পড়লে নিশ্চিত ভাবে মারা পড়ত, কিন্তু জাভেদ সেখানে বুঝে শুনে বুদ্ধি খাটিয়ে সামনাসামনি গোলাগুলিতে ডিককে পরাস্ত করেছে।

ওর কি কোন শত্রুতা ছিল তোমার সাথে?

স্টিভ ওর নাম বলার আগে ও যে কে তাই আমি জানতাম না। বব, কোন কিছু ঘটার আগে আমার বিশ্বাস ওদের কাগজপত্রগুলো তোমার একবার ভাল করে পরীক্ষা করা উচিত।

কাগজপত্র?

ওদের কাছে নকল হলেও কিছু না কিছু কাগজ বা দলিল নিশ্চয়ই থাকবে। ওরা কি খালি হাতে ওদের দাবি জানাতে এসেছে বলে তুমি মনে করো?

একেবারে বোকা হয়ে গেল বব। সত্যিই তো! শুধু ওদের মুখের কথাতেই সে প্রায় জাভেদকে র‍্যাঞ্চ ছাড়ার আদেশ দিতে যাচ্ছিল! ওরা কয়েকজন অপরিচিত লোক বৈ তো নয়? কাগজপত্রগুলোই ভাল করে দেখতে হবে তাকে। কিন্তু কথা হচ্ছে পড়াশোনায় কোনদিনই ভাল ছিল না সে। যখন সে এই চাকরিটা নিয়েছে তখন ভেবেছিল এবার নিঝঞ্ঝাটে কাটবে তার-কিন্তু এ কোন ঝামেলায় পড়ল সে? সন্ধ্যায় র‍্যাঞ্চে পৌঁছতেই জিকো লণ্ঠন হাতে কেবিন থেকে বেরিয়ে এগিয়ে এল জাভেদের কাছে। একটু আড়ষ্টভাবেই ঘোড়া থেকে জাভেদকে নামতে দেখল সে। আস্তাবলে ঘোড়ার জিন আর লাগাম খুলতে খুলতে জিকোকে আজ দুপুরের সব ঘটনার বর্ণনা দিল জাভেদ।

কঠিন দল এটা, শেষ পর্যন্ত মন্তব্য করল জাভেদ। আমার ধারণা এই সবকিছুর পিছনে রয়েছে অ্যালেকজান্ডার শার্প, মেয়েটার পালিত ভাই। কোন কথা বলেনি বটে সে তবে তার হাবভাবে ওই রকমই মনে হলো আমার।

ওরা তা হলে ওদের গরু-মহিষ নিয়ে ঢুকতে চাচ্ছে এই ক্যানিয়নে? কিন্তু যদি বেশি তুষার পড়ে এ বৎসর তবে তো ওই জীবগুলোর একটাও বাঁচবে না!

সেটা অবশ্য আমাদের স্বপক্ষেই কাজ করবে…ওদের আসলে এই এলাকা সম্বন্ধে কোন ধারণাই নেই। আমি অল্প থেকে শুরু করেছিলাম, আমার বেশিরভাগ জন্তুর জন্মই এখানে, বাঁচার তাগিদে জন্তুগুলো এই এলাকার কোথায় ঘাস পাওয়া যাবে চিনতে শিখেছে।

স্যান সিদ্রো থেকে জাভেদের র‍্যাঞ্চ আটাশ মাইল উত্তরে। এর চেয়ে কাছে অবশ্য দুটো ইন্ডিয়ান গ্রাম আছে-কিছু সাদা মানুষেরও বাস আছে ওসব গ্রামে। তবে এতে জাভেদের কোন ক্ষতি বৃদ্ধি হয় না। এই কয় বৎসরে কিছু অতিথি আশ্রয় নিয়েছে কখনও কখনও তার র‍্যাঞ্চে-কিন্তু ওদের প্রায় সবাই কোথাও যাওয়ার পথে আশ্রয় নিয়েছিল। ওদের মধ্যে কাউকেই মিস পেজের চর বলে মনে হয় না জাভেদের। হাতের আঙুলে গোণা যায় ওদের, সবাই আইন ফাঁকি দিয়ে লোমা কয়োটির দিকে পালাচ্ছিল।

নীনা পেজ কি জানে এই এলাকাটা আসলে কী রকম? জানে এবড়োখেবড়ো পাহাড়, উঁচু মেসা, চোরা উপত্যকা আর পাহাড়ী মাঠের কথা? জন্তুগুলোকে জাভেদ বেশির ভাগ সময়েই ছোট ছোট দলে ছড়িয়ে রাখে ওরা বেশি ঘাস পাবে বলে। এখন ওদের রাখা হয়েছে গাদা করা কাটা খড়ের কাছাকাছি। নিজের সুবিধা মত এখানে সেখানে অনেক বেড়া তৈরি করেছে জাভেদ। যেখানে সম্ভব প্রাকৃতিক সুবিধাও বুদ্ধি খরচ করে ব্যবহার করেছে সে ওই কাজে। প্রথম শীতটা তো জাভেদের প্রায় ঘোড়ার উপরই কেটেছে, কোথায় তুষার ঘাস ঢাকা পড়ে না, কোনখানে বাতাসে ঠেলে তুষারের তৃপ তৈরি করে না, এই সব খোঁজ নিয়ে বেড়িয়েছে ও। ওই নতুন আগন্তুকদের এই এলাকা সম্পর্কে অনেক কিছু শিখতে হবে এখানে টিকে থাকতে হলে।

পাহাড়ী হিমেল হাওয়ায় শীতে কাঁপছে জিকো। সন্ধ্যার পর থেকেই বেশ ঠাণ্ডা হয়ে আসে আজকাল। তোমার লোকের দরকার হলে বলো, আমি কিছু লোককে চিনি, ওদের বললেই ওরা আসবে, বলল সে।

শোনো জিকো, যদি শেষ পর্যন্ত এই বিরোধ গোলাগুলিতে গিয়ে ঠেকে তবে এর মধ্যে তোমার থাকার কোন দরকার নেই। এটা আমার নিজস্ব লড়াই, আমি…’।

থামবে তুমি? তোমার পক্ষে একা সবদিক সামলানো অসম্ভব। তুমি পারলেও আমি কোনদিন তোমাকে একা ফেলে যাব না এ তুমি ভাল করেই জানো।

লণ্ঠন হাতে পথ দেখিয়ে কেবিনের দিকে যেতে যেতে সে আবার প্রশ্ন করল, ওরা কতটা জমি দাবি করছে?

চল্লিশ দাগ। ওদের ওগুলো সব খুঁজে বের করতেই চার-পাঁচ বৎসর লেগে যাবে।

তোমার জমি কতটা আছে এখানে? কোনদিন তুমি তা বলোনি আমাকে।

তুমি জিজ্ঞেস করোনি কোনদিন তাই আমিও বলিনি। আমার আছে আশি দাগ। আর এর সবটাই আমার লাগবে। আমি ভাবছিলাম সামনের বৎসর কিছু পশু বিক্রি করে কেবল কমবয়সীগুলোকে রাখব আমি। আমার ইচ্ছা, শেষ পর্যন্ত বাড়াতে বাড়াতে স্টকের সংখ্যা পাচ-ছয় হাজারে নিয়ে যাব।

অনেক ঘেসো জমির দরকার হবে তোমার। অত কোথায় পাবে?

একটা জায়গা খুঁজে বের করেছি, অনেক…প্রচুর ঘাস আছে ওখান।। কেবিনের ভিতর ঢুকে চমকে উঠল জাভেদ। পুরো কেবিনটাকেই মেজে ঘষে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে।

কী হে, তুমি কি কাউকে দাওয়াত দিয়ে এসেছ নাকি? ঠাট্টা করে জিজ্ঞেস করল জাভেদ।

না, তা নয়। তবে বলা কী যায়? তুমি ব্যাচেলার মানুষ, শহরে গেছ, কাউকে নিয়েও তো ফিরতে পারো? এবার একটা বিয়ে করা উচিত তোমার

আমি? অবাক হলো জাভেদ। হঠাৎ তোমার এই দুর্বুদ্ধি মাথায় চাপল কী করে? আর এমন মেয়েই বা পাব কোথায় যে আমার মত একটা লোককে বিয়ে করতে রাজি হবে? তা ছাড়া র‍্যাঞ্চার মানুষ আমি, মাথায় শিং না থাকলে প্রাণ থেকে ভালবাসা আসে না আমার-শিংওয়ালা মেয়ে আমি কোথায় পাব?

জাভেদ উঠে গিয়ে নিজেই খুঁজে পেতে একটা বোঝাই করা বেয়ার সাইনের প্লেট বের করে আনল

এখন ওগুলো খেয়ো না বলছি! শাসন করল জিকো। ওগুলো এখন খেলে রাতের খাবার খেতে পারবে না, খিদে মরে যাবে।

মনে হচ্ছে তোমারই বিয়ে করা দরকার, হাসতে হাসতে বলল সে। তুমি দিন দিন খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। বহুদিন আগেই বিয়ে করা উচিত ছিল তোমার

জাভেদকে অবাক করে দিয়ে জিকো বলল, বিয়ে আমি করেছিলাম একসময়ে। একটা শাইয়্যান মেয়েকে বন্দী করে রেখেছিল উতে ইন্ডিয়ানরা। ওকে ওখান থেকে চুরি করে উদ্ধার করে এনে বিয়ে করেছিলাম আমি। খুব সুন্দর আর ভাল ছিল মেয়েটা। উতেদের ভয়ে সব সময়ে তটস্থ থাকত। আমি ওর ভাষা বলতে পারি দেখে স্বভাবতই মেয়েটা আমার প্রতি আকৃষ্ট হয়। একদিন রাতে দুটো ঘোড়া আর মেয়েটাকে নিয়ে পালাই আমি। ওরা আমাদের ধাওয়া করে একশো মাইল মত চলার পরেও ধরতে না পেরে শেষে ফিরে যায়।

তারপরে কী হলো?

আমরা এখান থেকে আরও উত্তরে বাসা বেঁধেছিলাম দুজনে। একটা ছেলেও হয়েছিল আমাদের। কিন্তু ছেলেটা ঘোড়া থেকে পড়ে মারা যায়। সে-ও ওই উতাদেরই উপদ্রবে। পথের মধ্যে আমাদের হঠাৎ আক্রমণ করে ওরা! প্রথম গুলিতেই আমার স্ত্রী মারা যায়। ছেলেটাকে নিয়ে পালাবার সময়ে ছেলেটাও মারা পড়ে।

ইশ, বড় করুণ!

দুঃখ নেই আমার, যতদিন সে ছিল খুব সুখে দিন কেটেছে আমার। একটা মেয়েকেও আমরা পেলেছিলাম ওই সময়ে। চার-পাঁচ বৎসর সে ছিল আমাদের সাথে, পরে তাকে আমি মেক্সিকোতে একটা কনভেন্টে ভর্তি করে দিই। তেরো বৎসর বয়স ছিল তার তখন।

তোমার নিজের মেয়ে না সে?

না, তবে ওকে নিজের মেয়ের মতই ভালবাসি আমি। একটা ওয়্যাগন ট্রেন থেকে কোম্যাঞ্চিরা ওকে নিয়ে গেছিল ওর বাবা-মাকে হত্যা করে। আমি চারটে ঘোড়ার বিনিময়ে ওকে পাই। দুই বৎসর কনভেন্টে থাকার পরে সে একটা সম্রান্ত মেক্সিকান পরিবারের সাথেই বসবাস করছিল। ওরা যখন স্পেনে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্যে চলে গেল তখন সে রয়ে য়। ওদের সাথে স্পেনে যেতে চায়নি সে।

প্লেট ভর্তি করে খাবার নিয়ে টেবিলে বসল জাভেদ। কেবিনের উষ্ণতাটা চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে পরিপূর্ণ ভাবে উপভোগ করছে সে।

তারপর? এখন কোথায় সে? আর দেখা হয়নি ওর সাথে তোমার?

গলা খাঁকারি দিয়ে চুপ করে বসে রইল সে। জাভেদ ওর দিকে চেয়ে দেখল জিকোর মুখটা কেমন পাংশু দেখাচেছ। উদ্বিগ্ন স্বরে সে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে তোমার?

না, ঠিক তা না, মুখ কাঁচুমাচু করে বলল সে। মানে…এখানে আসছে জেনি।

কী! আবেশ ছুটে গেল জাভেদের। ধড়মড় করে সিধে হয়ে বসল সে। তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? এই ঝগড়া বিবাদের মাঝে একটা মেয়েকে এনে কোথায় রাখবে শুনি?

কিন্তু কোথায় আর যাবে বেচারী? আর আমি যখন ওকে আসতে লিখেছি তখন এসব ঝামেলা বাধেনি। তা ছাড়া ও লিখেছে দুনিয়ায় আমি ছাড়া আর ওর কেউ নেই।

উত্তেজিত ভাবে উঠে পায়চারি আরম্ভ করল জাভেদ।

এটা কি একটা মেয়ের থাকার উপযুক্ত জায়গা হলো? তা ছাড়া তোমার সাথে তো রক্তের সম্পর্কও নেই তার।

সেটা না থাকলেও গড়ে উঠেছে। আমাকে সব সময়েই নিয়মিত চিঠি দিত জেনি। সব সময়েই সে কেবল পাহাড়ে আমার কাছে ফিরে আসতে চাইত। ছোটকালে বাপ-মা হারিয়ে আমাকেই সে বাপের মত দেখে। তবে আমি কোনদিনই তার যোগ্য বাপ হতে পারিনি-বুক ভরা আদর জানাতে পারিনি। সে যখনই আমার কাছে আসতে চেয়েছে আমি এটা ওটা নানা অজুহাত দেখিয়ে ঠেকিয়ে রেখেছি। ভেবেছি ওই মেক্সিকান পরিবারের সাথে থাকাটাই ওর জন্যে ভাল হবে-কিন্তু ওরা চলে যাবার পর এখন ওকে আমি কী বলে ঠেকাব?

অস্থির বোধ করছে জাভেদ। জিকোকে দোষারোপ করে লাভ নেই, ওই বা কী করবে? কিন্তু এইভাবে একটা বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে একটা মেয়েকে নিয়ে এসে তাকে বিপন্ন করারও কোন মানে হয় না। তারা দুজনে দরকার হলে ঠাণ্ডায় তুষারের মধ্যে পাহাড়ে পালিয়ে বেড়াতে পারবে, কিন্তু একটা মেয়ে সাথে নিয়ে তো আর তা সম্ভব না? নিজেদেরই খেয়াল রাখবে, না মেয়েটাকে দেখবে?

না হয় ওকে আমি সাথে করে সান্তে ফিতে রেখে আসব, মনের ব্যথা চেপে বলল জিকো। কিন্তু আসলে সে আমার সাথেই থাকতে চেয়েছিল, বাপের ভালবাসা কোনদিন পায়নি তো?

জিকোর দিকে চাইল জাভেদ। বারবার নানা বিপাকে পড়ে প্রিয়জনদের হারাতে হয়েছে ওঁকে। একজন যাওবা আছে তাকেও কাছে রাখার উপায় নেই তার। পরিস্থিতিটাকে হালকা করার জন্য হো হো করে হেসে উঠল জাভেদ।

ভাল ফাঁসা ফেঁসেছি আমরা, কী বলো? লড়াই করতে জানি আমরা, হয়তো বিপদটা কাটিয়ে উঠতে পারব। কিন্তু মেয়ে? কী জানি আমরা ওদের?

রাতের খাওয়া শেষ করে বাতি কমিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এল সে বাইরে। র‍্যাঞ্চের সবকিছু ঠিক আছে কিনা ঘুমাতে যাওয়ার আগে সেটা নিজে একবার ঘুরে দেখাটা তার চিরকালের অভ্যাস। আজকের খবরটায় মনে হচ্ছে জিকোর যাওয়া ছাড়া আর উপায় নেই। অর্থাৎ, এরপরে একাই থাকতে হবে তাকে। দুজন মিলে ওদের ঠেকানো কঠিন কাজ হত, এখন তো ব্যাপারটা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াল

একমুহূর্তের জন্যও মেয়েটাকে এখানে এনে রাখার কথা তার মনে স্থান পেল। কনভেন্টে পড়া মেয়ে দূরে থাক, কোন ইন্ডিয়ান মেয়েকেও এখানে বর্তমান পরিস্থিতিতে রাখা ঠিক হবে না। এই কেবিনে বসে তাদের পক্ষে বেশিদিন ধরে ওদের ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। পালাবার একটা প্ল্যান তৈরি রাখতেই হবে-কেবিন থেকে পাহাড়ে সরে যেতে হবে প্রয়োজন হলে।

লড়াইয়ের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে শক্রর প্রতিরোধ ক্ষমতা বিনষ্ট করা। যতক্ষণ তাদের ইচ্ছেমত নড়াচড়া করার ক্ষমতা থাকছে ততক্ষণ যখন খুশি শত্রুকে আক্রমণ করতে পারবে…কিন্তু কোথাও আটকা বা বাঁধা পড়লেই ধ্বংস অনিবার্য।

লড়াইয়ে জাভেদের নীতিই হচ্ছে আক্রমণ, সব সময় আক্রমণের মুখে রাখতে হবে শত্রুকে। সংখ্যায় প্রতিপক্ষ যত ভারিই হোক না কেন নিজে একা থাকলেও আক্রমণ করতে হবে তাকে। খুব শক্তিশালী শত্রুকেও এই উপায়ে আত্মরক্ষায় ব্যতিব্যস্ত করে রাখা যায়।

এই লক্ষ্য মাথায় রেখেই বিভিন্ন গুপ্ত জায়গায় খাবার আর গোলাবারুদের সমাবেশ আগে থেকেই করে রেখেছে জাভেদ। এমন ভাবে এগুলো সাজিয়েছে, যেন ধীরে ধীরে জঙ্গল থেকে আরও গভীরে তারপর সেখান থেকে পাহাড়ে সরে যেতে অসুবিধা না হয়। আগামীকাল তার জীব-জন্তুগুলোকে আরও দূরবর্তী উপত্যকায় সরিয়ে নিয়ে যাবে ও

পরবর্তী দুই দিন ওরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কঠিন পরিশ্রম করল জগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার কাজে, আর রাতে অনেক রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকল নিজেদের প্ল্যান ঠিক করার কাজে। পরদিন এসে হাজির হলো বব

কাগজপত্র সবই আছে ওদের কাছে, বলল সে। দলিলও আছে ওদের। গভর্নর আর্মিজো লিখিত ভাবে ওদের এই অধিকার দিয়েছে।

কিন্তু আর্মিজোকে জমি বণ্টনের কোন ক্ষমতা দেয়া হয়নি। ওইসব কাগজের আসলে দুই পয়সাও দাম নেই।

সেকথা আমি কিছু জানি না, তবে তোমার এ জায়গা ছাড়তে হবে, জাভেদ।

কোন কোর্টের নির্দেশ আমি পাইনি, বব, আর আমার দলিলটাকেও কোন কোর্ট অচল বলে রায় দেয়নি। এই লোকগুলো একটা চাল খাটাবার চেষ্টা করছে। জমিটা আর্মিজোর অধীনে ছিল না, এমন কী রাষ্ট্রের অধীনেও এটা ছিল না তখন। সুতরাং আর্মিজোর সই করা দলিল শুধুমাত্র একটা সামান্য কাগজের টুকরোই, কোন দাম নেই তার। আমাকে ওঠানো ওদের সাধ্যের বাইরে।

আমাদের একটা আপোষ মীমাংসা করতেই হবে, জাভেদ, আমি চাই না এ নিয়ে একটা তুমুল গোলমাল বাধুক।

তা হলে মনে রেখো, দখল আমার। ইচ্ছা করলে ওরা কোর্টে আমার বিরুদ্ধে নালিশ করতে পারে। সেটাই দাবি প্রতিষ্ঠিত করার আইনসম্মত ব্যবস্থা, লোক ভাড়া করে দখলদারকে হত্যা করাটা নয়।

তুমি জানো না ওটা ওদেরই কাজ কিনা।

তবে কে? দরজার দিকে ফিরল জাভেদ, এসো বব, ভিতরে বসে আলাপ করা যাক। তুমি যা-ই বলল, আমি এই জায়গা না ছাড়লে ওদের কী করার আছে? জোর খাটাবে? বিশ্বাস করো, বব, ওদের কোন খুঁটিই নেই।

তার ঘোড়র উপরই গো ধরে বসে রইল বব, নামল না। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না যে নীনা পেজ আর অ্যালেকজান্ডার শার্পের মত মানুষ এমন কোন দাবি করবে যার কোন আইনগত সমর্থন নেই। সে নিশ্চিত যে জাভেদই অবুঝের মত কেবল নিজের স্বার্থ দেখছে। কোনদিন জমিজমার ব্যাপারে কোর্টে যেতে হয়নি তাকে। মাতাল আর বন্দুকবাজদের শাসনে রাখার মাধ্যমেই তার আইনের সাথে সামান্য যা একটু পরিচয়।

জাভেদ ওর দিকে ফিরে বলল, তুমি ওদের গিয়ে বলে দাও ওরা যেন ওদের দাবি কোর্টে পেশ করে, আমি এখান থেকে নড়ছি না।

খুব যে সবজান্তার মত জোর গলায় কথা বলছ? রাগের স্বরে বলে উঠল বব। তুমি কে, তুমি কি উকিল নাকি?

জাভেদ ঘোড়াটার কাছে ফিরে এল। শোনো, বব, ১৮২৫ থেকে ১৮২৮-এর মধ্যে তিনটে অস্থায়ী গভর্নর ছিল নিউ মেক্সিকোর, আর্মিজো তাদের মধ্যে একজন। ১৮৩৭ সালে টাওসে একটা বিদ্রোহ হয়, বিদ্রোহীরা গভর্নর পেরেজকে হত্যা করে। আর্মিজো একটা দল গঠন করে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে জয়ী হয়ে নিজেই নিজেকে গভর্নর বলে দাবি করে।

অনেক দিন আগের কথা ওসব, অনেকে অনেক রকম কথা বলে, সত্যি যে কী ঘটেছিল তা বলা মুশকিল-কিন্তু শোনা যায় যে আর্মিজো বিদ্রোহী গভর্নরকে হত্যা তো করেই, নিজের দলের অনেক লোককেও নাকি সে ওই সময়ে হত্যা করে। ঘুষ দিয়ে মেক্সিকান কর্তৃপক্ষকে সে তার পদ বহাল রাখতে রাজি করায়।

১৮৪৪ সালে লেজানা গভর্নর হয়ে আসে তার জায়গায়, কিন্তু পরের বৎসরই সে আবার গভর্নর হয়ে আসে তার জায়গায়, কিন্তু পরের বৎসরই সে আবার গভর্নরের পদ ফিরে পায়। সান্তে ফির ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তাদের প্রত্যেক ওয়াগন পিছু মোটা কর আদায় করে অনেক টাকা বানায় সে নিজের জন্যে।

এ ছাড়া কিছু জমি-জমাও সে বন্ধু-বান্ধবের কাছে টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে-কিন্তু আসলে ওই জমি বিক্রি করার কোন অধিকার তাকে দেয়া হয়নি। আমার মনে হয় ওই ধরনেরই কোন দলিল নিয়ে এসে মিস নীনা পেজ এখানে অযথা ঝামেলা করছে।

এতসব কথার মধ্যে বরে মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে। মাতাল, উন্মত্ত জনতা, এসব নিয়েই ওর কাজ। একবার একজন বন্দুকবাজের সাথে গোলাগুলিতেও নামতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু এসব আইনের পঁাচ তার কাছে দুর্বোধ্য। আইনের কাগজ সে একটাই চেনে, সেটা হচ্ছে ওয়ারেন্ট।

হুঁ, এতসবও জানো তুমি? বক্রোক্তি করল সে। তা তোমার এখানকার দাবির ভিত্তি কী-জবর দখল?

ধৈর্য ধরে শান্ত ভাবেই মাথা নাড়ল জাভেদ, না, বব, আমার কাছে আইনসম্মত সব কাগজ-পত্ৰই আছে, পানির অধিকারও দেয়া হয়েছে আমাকে-আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এগুলো ভোগ করছি আমি এবং সব আমার দখলেই রয়েছে। যে কোন কোর্টেই আমার দলিল স্বাকৃত হবে। এই লোকগুলো চক্রান্ত করে আমার নিজের জমি থেকে আমাকে সরাতে চাইছে।

পরে আমাকে দোষ দিয়ো না, রাগত স্বরে বলল বব। সামলাতে না পেরে শেষে আবার আমার কাছে ছুটে এসো না।

না, আমি তোমাকে দোষ দেব না। তবে তোমার উচিত হবে ওদের এই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলা। তুমি এই এলাকার ডেপুটি শেরিফ, ঝামেলা তোমাকেই পোহাতে হবে, কারণ আমি জানি, আইন ভঙ্গ করতেই এসেছে ওরা।

জাভেদের কথা শুনে একটু থমথমে হয়ে গেল শেরিফের মুখ

আমার কাজ আর আমাকে শেখাতে হবে না তোমার! আমার কাজ আমি ভাল করেই জানি, আর কী করতে হবে আমার তাও জানা আছে।

তুমি দেখছি আমার ওপর আইন ফলাবার জন্যে তৈরি হয়েই এসেছ, কাষ্ঠ হাসি হাসল জাভেদ। অথচ আমিই হচ্ছি সেই গো-বেচারা, যে আইন মেনে চলার চেষ্টা করছে!

তোমার ব্যবহারে তো তা মনে হয় না! রোষের সাথে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে ফিরে চলল বব। একবারও পিছন ফিরে চাইল না সে। অন্ধকার হয়ে আসছে, ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে তার। র‍্যাঞ্চের দুই মাইল দূরে নীরে দিকে পাহাড়ের একটা অংশ উপত্যকার মাঝখান থেকে সোজা উপর দিকে উঠে গেছে। ওটার উপর থেকে চারদিকে মাইলের পর মাইল এলাকা পরিষ্কার দেখা যায়। ওখানেই জাভেদ তার ঘাটি করেছে সবদিকে নজর রাখার জন্য। দিনের বেলা ওখান থেকে অনেকদূর দেখা যায় আর রাতের বেলা কানে শোনা যায় বহুদূর থেকে বাতাসে ভেসে আসা শব্দ।

ঘোড়াটাকে কতগুলো অ্যাসপেন গাছের আড়ালে বেঁধে রেখে জাভেদ উপরে  উঠে বাতাস আড়াল করে ভাল একটা জায়গা বেছে নিয়ে বসল।

কয়েকটা রাস্তা বা ট্রেইল এসে মিশেছে এখানে। একটা গেছে ন্যাসিমেনটসের দিকে। ওই রাস্তা ধরেই অন্যদিকে এগুলে পড়বে রিও পিউয়েরকো। কিন্তু এই পথটা বেশি পরিচিত নয়। কিছু ইন্ডিয়ান অভিজ্ঞ লোক হয়তো চেনে, তাও অনেক জায়গায় এটাকে ট্রেইল বলে চেনার উপায় নেই এখন। আর একটা এসেছে পুব দিক থেকে, প্রিঙস্ থেকে সিকেল্লা পর্যন্ত, তারপর এটা তার র‍্যাঞ্চের ধারেই ওই মেসার কাছে গিয়ে শেষ হয়েছে। কিন্তু এসব ট্রেইল নতুন কারও চেনার বা জানার সম্ভাবনা খুব কম।

মাঝরাতে নজর রাখার ভার জিকোর উপর ছেড়ে দিয়ে কেবিনে ফিরে বিশ্রাম নিয়ে আবার ভোরে কিছু মুখে গুঁজেই ঘোড়ায় চাপল সে। ওখানে পৌঁছলে জিকো তাকে বলল, আমার হিসাব অনুযায়ী আজই স্টেজে করে তার আসার কথা। কিন্তু আমি বলি কী, তুমি এখানে পাহারায় বসো, আমিই যাই ওকে আনতে। ওরা আমাকে চেনে না, কোন অসুবিধা হবে না আমার।

ওদের চেনো না তুমি। তোমাকে চিনে নিতে খুব দেরি হবে না ওদের। ওদিকে ঝুঁকি যা থাকে আমি নিচ্ছি, তুমি শুধু শক্ত হয়ে বসে খেয়াল রেখো যেন আমার অবর্তমানে কোন ঝামেলা না হয় এদিকে!

জাভেদ, তুমি যদি চাও আমি লোমা কয়োটি থেকে কিছু ভাল লোক নিয়ে আসতে পারি-কিংবা আমি স্মোক সিগনাল পাঠালেও ওখান থেকে কিছু ভাল যোদ্ধা এসে হাজির হবে।

ওসবের কোন দরকার নেই-তবে পরিচিত কাউকে পেলে জিজ্ঞেস করে রাখতে পারো এখন আশেপাশে কে কে আছে, হয়তো পরে কোন সময়ে ওদের দরকার হতে পারে। ঘোড়া আগে বাড়াতে আরম্ভ করল জাভেদ।

লুইস ডিকেনসন আছে আমি জানি, ঘোড়ার পিছন পিছন হাঁটতে হাঁটতে বলল জিকো। লোকটা তোমার সময়েই বনরক্ষী ছিল। এলপেসোতে একজন লোককে মারার পর ফেরারী হয়েছে, কিন্তু রাইফেলে ওর জুড়ি নেই।

চিনি, খুব ভাল লোক। ঘোড়া ছুটিয়ে দূরে চলে গেল জাভেদ।

স্যান সিদ্রোতে তখন হেমন্তের সূর্য জ্বলছে। দুপুর নাগাদ জাভেদ সেখানে পৌঁছল। শহরে প্রথম সে যাকে দেখল সে হচ্ছে স্যান্ডি উইলিয়াম-নীনার লোক। তারই ফুটখানেক দূরে ঘোড়া বাধল জাভেদ। হয়তো একটু ভয় পাওয়া উচিত ছিল কিন্তু মোটেও ভয় পেল না সে। গোলমালপ্রিয় লোক স্যান্ডি। কিন্তু সার্কাসের ক্লাউনের মতই দর্শক ছাড়া কোন ভূমিকায় সে নারাজ।

তার সেই ময়লা বাকস্কিনের জামা কাপড় পরেই বসে আছে স্টিভ একটা টেবিলের পিছনে। পা দুটো টেবিলের উপর তুলে দিয়েছে। একটা মদের বোতল রয়েছে তার হাতে। জাভেদ আগেও লক্ষ করেছে স্টিভের হাতে সব সময়েই একটা বোতল দেখা যায় বটে, কিন্তু বোতলের ভিতরের জিনিসের পরিমাণ কমে না, সব সময়ে প্রায় একই থাকে।

কামরার ছাদটা বেশ নিচু। কাঁচা ঘর-বারোটা বাড়ির প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে একটা ঘর। মাত্র কয়েকটা টেবিল পাতা রয়েছে, আসবাবপত্র বিশেষ নেই ঘরটাতে। সাজানোরও কোন চেষ্টা করা হয়নি, বারের পিছনে কেবল একটা অসংখ্য দাগে ভরা আয়না ঝুলছে। ফ্রেড একাধারে বারের মালিক, আবার স্টেজ কোচের এজেন্ট বা দালাল। বয়সকালে কয়েকটা হঠাৎ গড়ে ওঠা খনির শহরে বার চালিয়েছে সে, কিন্তু এখন ববের মতই এই শহরে এসে আস্তানা গেড়েছে।

স্টেজ কী দুপুর একটায় আসবে? জিজ্ঞেস করল জাভেদ।

সেই রকমই কথা আছে, বলে একটা বোতল এগিয়ে দিল সে জাভেদের দিকে। লোকটা বেশ পছন্দ করে জাভেদকে। তবে ইদানীং বেশ পয়সা আসছে ওর নতুন লোকগুলোর কাছ থেকে, তাই ও যে এখন কাকে বেশি পছন্দ করবে বলা মুশকিল।

এস, আমার সাথে এই টেবিলে বসো, বলে টেবিলের উপর থেকে পা নামিয়ে নিল স্টিভ। স্যান্ডি ঢুকেছে, বারের দিকে এগিয়ে গেল সে।

নিজের বোতলটা নিয়ে স্টিভের টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল জাভেদ। ভাবটা শান্তির ইঙ্গিত বলে মনে হচ্ছে না, বসতে বসতে মন্তব্য করল সে।

দাঁত বার করে হাসল সিভ। ইঙ্গিত আমিও বুঝতে পারি, জবাব দিল স্টিভ। ঠিক তখনই দরজা ঠেলে আরও দুজন লোক ঘরে ঢুকল। ওই বিশালদেহ লোকটার নাম লরেন্স হারভি। মারপিটে ওস্তাদ। সেদিন একজন পথিকের সাথে গায়ে পড়ে ঝগড়া করে ওকে খুব পিটিয়েছে। আর অন্যজন হচ্ছে বাড়।

ওদের জন্য ট্রেতে করে খাবার নিয়ে এল ফ্রেড। ঘুরে এদিকে তাকাল লরেন্স। নেহাত কম খায় না লোকটা, বলল সে

একটা গাধার ডাক শুনলাম না? প্রশ্ন করল জাভেদ।

লরেন্স চোখ পাকিয়ে চাইল ওর দিকে। ফ্রেড আর স্টিভ দুজনেই হেসে উঠল। পাশের টেবিলের লোক দুজনও হাসছে

কী বললে? জোর গলায় জানতে চাইল লরেন্স

ওর কথার কোন তোয়াক্কা না রেখে নীরবে খেয়ে চলল জাভেদ। লোকটা কটমট করে কিছুক্ষণ জাভেদের দিকে চেয়ে রইল একটা ছুতো পাওয়ার অপেক্ষায়। কিন্তু এদিক থেকে কোন রকম সাড়া না পেয়ে মিনিটখানেক পরে সে বলে উঠল, ভাবছি, লোকটা যত খায় সেই তুলনায় শক্তি সামর্থ্য আর সাহস আছে কি ওর?

কেউ একটু বাজিয়ে দেখলে মন্দ হত না, মন্তব্য করল স্যান্ডি।

জাভেদ আপন মনে খেয়ে চলল। দারুণ উপভোগ করছে সে…ফ্রেডের স্ত্রীর রান্না খুব ভাল। গত দুইদিন বেয়ার সাইন ছাড়া আর কিছু খাওয়া হয়নি আমার, জিকো সেদিন অনেক বানিয়েছিল, সব শেষ করেছি আমি।

তোমার লোকজনের দরকার পড়লে শুধু এই খবরটা ছড়িয়ে দিয়ো। দেখবে এদিক ওদিক থেকে অনেক লোক জুটে যাবে, নিজের গ্লাসে মদ ঢেলে নিল স্টিভ। আমি ষাট সত্তর মাইল দূর থেকেও বেয়ার সাইনের লোভে লোকজনকে ঘোড়ায় চড়ে হাজির হতে দেখেছি।

আর এক গ্লাস মদ শেষ করে বারের দিকে পিছন ফিরে ঘুরে দাঁড়াল লরেন্স। একটা ঝগড়া বাধাবার চেষ্টা করছে সে অথচ কেউ ওকে পাত্তা দিচ্ছে না দেখে ভিতরে ভিতরে আরও উত্তেজিত বোধ করছে ও। তা ছাড়া মদও তার কাজ শুরু করেছে, রক্ত গরম হয়ে উঠেছে ওর।

টেবিলে বসে খেতে খেতে সবকিছুই লক্ষ করেছে জাভেদ। মারপিটের প্রচুর অভিজ্ঞতা আছে, কোন খুঁটিনাটিই নজর এড়ায়নি ওর। স্যান্ডি ধীরে ধীরে দরজার কাছে সরে গেছে যেন দরজা দিয়ে বেরুবার সুযোগ কেউ না পায়। বাড় চলে এসেছে পিছন দিকে। লরেন্স মাঝখানে দাঁড়িয়ে, লম্বা-চওড়া শক্তিশালী লোক, বোঝাই যায়। মাথাটা পেশীবহুল কাঁধের উপর বসানো, ঘাড় এত ছোট যে নেই বললেই চলে। মোটাসোটা হাত দুটো বেরিয়ে আছে গুটানো হাতার ভিতর থেকে। একমুখ ঘন দাড়ি ওর শক্ত চোয়াল দুটো ঢেকে রেখেছে।

নিচু গলায় স্টিভকে বলল জাভেদ, এর মধ্যে তুমি নিজেকে জড়াতে যেয়ে। এটা আমার ব্যক্তিগত লড়াই।

সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে জাভেদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করল সে। কিন্তু তিনজনের বিরুদ্ধে একজন, অনুপাতটা ঠিক সমান হলো না, বলল সে। তা ছাড়া ওই লরেন্স লোকটা দুহাত সমানে চালাতে চালাতে এগিয়ে আসে, ওকে রোখা খুব কঠিন।

লরেন্স তৈরি হচ্ছে মারপিট করার জন্য। জাভেদ বুঝতে পারছে কী ঘটতে চলেছে। মাথা নিচু করে নিজের কাপের দিকে চেয়ে চুপ করে বসে আছে জাভেদ। মাথার মধ্যে অঙ্ক কষে চলেছে কে কোথায় আছে আর কীভাবে কী করলে পরিস্থিতি তার স্বপক্ষে আসতে পারে-ঠিক এই সময়ে নীনা পেজ দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে সোজা তার টেবিলের দিকেই এগিয়ে এল। ভদ্রতা করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল জাভেদ।

আরে! অবাক কাণ্ড! বিদ্রূপ করে বলে উঠল লরেন্স, লোকটা হঠাৎ ভদ্র হবার ব্যর্থ চেষ্টা করছে!

শুনলাম তুমি শহরে এসেছ তাই তুমি র‍্যাঞ্চ ছেড়ে চলে যাবার আগেই তাড়াতাড়ি দেখা করতে এলাম। নীনার চোখ দুটো প্রথম দেখায় যেমন লেগেছিল তার চেয়ে আরও বেশি ঘন সবুজ দেখাচ্ছে আজ। সত্যি আমি খুব দুঃখিত যে র‍্যাঞ্চটা ছেড়ে এভাবে চলে যেতে হচ্ছে তোমার। চলে যাবার আগে বলতে এসেছি যে এখনও তোমাকে আমার আগের প্রস্তাব অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি আছি আমি।

ভুল বুঝেছ তুমি, মিস পেজ। আবারও কেউ ভুল খবর দিয়েছে তোমাকে। আমি র‍্যাঞ্চ ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না।

প্লীজ, কথা শোনো! হাত বাড়িয়ে হাতের আঙুল জাভেদের জ্যাকেটের হাতায় ছোয়াল নীনা। তার চোখ দুটো আরও সুন্দর আর বড় দেখাচ্ছে। জমিটার মালিকানা আমাদের, তোমার যে যেতেই হবে। তুমি নিজের ইচ্ছায় না গেলে আমার লোকজন জোর খাটিয়ে তুলতে চাইবে তোমাকে..কিন্তু সে আমি চাই না। ভাবলাম…তুমি যখন শহরে এসেছ তোমার সাথে কথাবার্তা বলে একটা আপোষ মীমাংসায় পৌঁছতে পারব আমরা।

বোসো তা হলে?

একটু ইতস্তত করে একটা চেয়ার টেনে বসল নীনা। জাভেদও বসতে যাচ্ছিল এমন সময়ে সে শুনল স্যান্ডি জোরে জোরেই সবাইকে শুনিয়ে বলছে, দেখো, একটু পরেই হয়তো চায়ের অর্ডার দিয়ে বসবে লোকটা।

ফ্রেডের দিকে ফিরল জাভেদ। চা পাওয়া যাবে এখন? প্রশ্ন করল সে

চা? চা!..হ্যাঁ,…অবশ্যই, কিন্তু

চা তৈরি করে আমাদের দিয়ে যাও। বেশি করে বানিয়ে যেন সবার হয়…গ্যালনখানেক চা বানাও।

এক গ্যালন? চা?

হ্যাঁ, ঠিক তাই।

চেয়ারে আয়েশ করে হেলান দিয়ে বসে কৌতুকের সাথে জাভেদের কাণ্ডকারখানা দেখছে স্টিভ। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে নীনার দিকে ফিরে জাভেদ বলল, হ্যাঁ, কী যেন বলছিলে তুমি?

বলছিলাম তোমার র‍্যাঞ্চটা ছেড়ে দেয়ার কথা। অবশ্যই তোমার কষ্ট করে র‍্যাঞ্চটার উন্নতি করার জন্যে যোগ্য ক্ষতিপূরণ আমি দেব। তোমাকে বাধ্য হয়ে চলে যেতে হচ্ছে বলে আমি সত্যিই খুব দুঃখিত।

কোন চিন্তা কোরো না তুমি। তোমাকে এত দুঃখ দিয়ে র‍্যাঞ্চ ছেড়ে কক্ষনো যাব না আমি। মিছেই এতদূর কষ্ট করে এসে জানতে হলো তোমার কথাটা-কোন কোর্টে একটু খোঁজ নিলেই তুমি জানতে পারতে তোমাদের দাবি কতখানি ভিত্তিহীন।

তুমি তো জানো কোর্টগুলো কত দূরে দূরে, আর তা ছাড়া ওরা সময়ও নেয় প্রচুর। অত সময় আমাদের হাতে নেই, অ্যালেক…মানে অ্যালেকজান্ডার শার্প অস্থির মানুষ। আর আমার প্রায় তিন হাজার গরু-মহিষ আসছে, তুমি এখন যেতে চাইলেও আমাদের বাধ্য হয়ে তোমাকে জোর করেই সরাতে হবে।

তুমি কি ওই জমি সম্পর্কে কিছু জানো, সুন্দরী?

আমি নিজে ওটা দেখিনি বটে, তবে অ্যালেক দেখেছে। কিন্তু একথা জিজ্ঞেস করছ কেন?

কারণ নিজে দেখলে তুমি হয়তো বুঝতে পারতে যে আমি যদি তোমাদের এখন ওই র‍্যাঞ্চটা আপোষে ছেড়েও দিই তবু তোমরা কোনমতেই তিন হাজার পশু নিয়ে ওখানে একটা শীতও কাটাতে পারবে না। কেউ কোন উৎপাত না করলেও তোমাদের পক্ষে তা অসম্ভব হবে। এত জায়গাও নেই আর এত খাবারও নেই ওখানে। এবারের শীতটা যদি বেশি না পড়ে তবে হয়তো বড়জোর হাজারখানেক পশু বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারে।

বড় বড় চোখে অবাক হয়ে চেয়ে রইল নীনা জাভেদের দিকে। ওর খোলাখুলি আন্তরিকতায় বিস্মিত হয়েছে নীনা। কিন্তু ঠিক যেন বিশ্বাস করতে পারছে না সে। ওর কথা। কিন্তু আমি যে শুনেছি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল ঘাস আর পানি আছে ওখানে।

চমকার ঘাস আর পানি দুটোই ওখানে আছে ঠিকই, কিন্তু কোনটাই পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই। আমার গরু-মহিষের জন্যে আমি তাই সব সময়েই অন্যান্য উপত্যকায় ভাল জায়গা খুঁজে বের করে সেখানে কিছু কিছু পশু রেখে আসার ব্যবস্থা করি। কিন্তু এর অর্ধেকেরও বেশি জায়গা বন-জঙ্গলে ছাওয়া আর অত্যন্ত দুর্গম হয়তো তোমাদের বিমুখ করার সবচেয়ে ভাল উপায় হবে নিজে সরে গিয়ে তোমাদের এখানে র‍্যাঞ্চ চালানোর সুযোগ করে দেয়া। তোমরা গরু-মহিষ, ঘোড়া আর মানুষ সবই হারাবে একে একে।

তোমাকে দেখে তো তোমার কথা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। তুমি বেশ ভালই করছ দেখা যায়।

মাথা নেড়ে সে নীনার লোকজনের প্রতি ইঙ্গিত করল। সে ভাল করেই জানে সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে ওর কথা। সবচেয়ে বড় কথা এতসব লোকজন নিয়ে তুমি কী করবে? নীনার লোকজনের মনের মধ্যে একটা সন্দেহ ঢুকিয়ে দেওয়ার সুযোগটা হেলায় হারাল না সে। ওখানে মাত্র দুই কি বড়জোর তিন জন লোকের কাজ আছে ওই কয়েক একর জমিতে

একর? প্রতিবাদ করল নীনা। একর কী বলছ, ওখানে মাইলকে মাইল জমি আছে আমার। সঠিক হিসেবে চল্লিশ দাগ বা চল্লিশ বর্গমাইল।

ফ্রেড চা নিয়ে উপস্থিত হলো। দুটো কেতলি ব্যবহার করতে হয়েছে আমাকে, ব্যাখ্যা দিল সে। এত বড় অর্ডার আগে কোনদিন পাইনি।

জাভেদ ছোট কেতলিটা থেকে নিজেদের টেবিলের জন্য তিন কাপ চা ঢেলে দিয়ে ঝট করে সে তার পিস্তলটা কোমর থেকে হাতে তুলে নিল। বাকি চা ওদের জন্যে ঢেলে ওদের পরিবেশন করো। পিস্তল তুলে বারের কাছে দাঁড়ানো তিনজনকে দেখিয়ে ফ্রেডকে আদেশ করল জাভেদ। ওরা খায় কি না খায় সেটা আমি দেখছি।

আড়ষ্ট হয়ে গেল স্যান্ডি। তার হাতটা নিজের পিস্তল বের করার জন্য বাড়িয়েও জাভেদের পিস্তলের মুখটা তার দিকে ঘুরতে দেখে থেমে গেল সে। নাও! চুমুক দেয়া আরম্ভ করো! তুমিও, লরেন্স!

দায় পড়েছে আমার! তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল লরেন্স।

জাভেদের পিস্তলটা একটু কাত হলো। টি-পার্টি চেয়েছিলে তোমরা, তাই-ই দেয়া হয়েছে। এবার লক্ষ্মী ছেলের মত চা খেতে আরম্ভ করো নইলে গুলি শুরু করব আমি।

দাঁত বের করে হাসছে স্টিভ। আতঙ্কিত অবস্থায় নীনা বারবার তার লোকজন আর জাভেদের মুখের দিকে চাইছে। আশ্চর্য হয়ে গেছে সে, যা দেখছে তার কিছুই বিশ্বাস করতে পারছে না ও।

আমি তিন গোণার আগে যদি তোমরা চা খেতে শুরু না করা, শান্ত কণ্ঠে ঘোষণা করল সে। তবে একে একে তোমাদের প্রত্যেকের হাত গুড়িয়ে দেব আমি।

উঠে দাঁড়িয়ে সাবলীল ভঙ্গিতে ওদের দিকে এগিয়ে গেল সে। দরজাটা আর নীনাকে গোচরের মধ্যে রেখেছে জাভেদ।

এর জন্যে তোমাকে খুন করব আমি! চেঁচিয়ে হুমকি দিল লরেন্স।

হয়তো–কিন্তু তার আগে এখনই যদি নিজে মারা পড়ো তবে আর সে সুযোগ পাবে না! চা চেয়েছিলে, চা খাও।

ঠাস করে শব্দ করে তার কাপ নামিয়ে রেখে স্যান্ডি চিৎকার করে উঠল, খাব আমি চা! পেয়েছটা কী তুমি? পিস্তল বের করার জন্য হাত বাড়াল সে।

বিদ্যুৎ বেগে ডাইনে আর বামে থেকে পরপর জাভেদের পিস্তলের দুটো বাড়ি পড়ল ওর মুখে। বিনা প্রতিবাদে ঝপ করে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল স্যান্ডি। ভাল চাও তো চায়ে চুমুক দাও, নইলে তোমাদেরও একই অবস্থা হবে, ধীর কণ্ঠে বলল জাভেদ।

রাগে একেবারে কাগজের মত সাদা হয়ে গেছে নীনার মুখ। শোনো জাভেদ, যা খুশি তাই করতে পারো না তুমি!

মেয়েদের ওপর হাত তুলতে ঘৃণা করি আমি, জবাব দিল সে।

ধপ করে আবার বসে পড়ল নীনা। তুমি তোমার অত সাহস নিশ্চয়ই হবে না।

পুরুষের সাথে বাজি লড়তে গেলে তাদের নিয়মেই লড়তে হবে তোমার

পিস্তলটা স্টিভের দিকে বাড়িয়ে দিল জাভেদ। তুমি ওদের দিকে একটু নজর রেখো, লরেন্স আমার সামর্থ্য আর সাহস সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছিল-পরীক্ষাটা হয়েই যাক। মনে হয় আমার সাথে একটু মারপিটের শখ হয়েছে ওর।

কাপ নামিয়ে রেখে ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল লরেন্স। মারামারি? আকাশ থেকে পড়ল সে, মারামারি করবে আমার সাথে?

ঘুসি চালাল জাভেদ।

টলতে টলতে পিছিয়ে গেল লরেন্স। জাভেদ এগিয়ে গিয়ে ওর হাত দুটোর উপর নজর রেখে বাম হাতে ভীষণ জোরে মারল ওর পেটে। লরেন্স মারপিট করতে পছন্দ করে, কিন্তু তারচেয়েও বেশি পছন্দ করে নিজের মারামারির বড়াই করতে। জাভেদ তার সাথে লড়তে চায় শুনেই অবাক হয়ে সে মাত্র বলতে যাচ্ছিল। মারের চোটে কী দুরবস্থা করবে সে জাভেদের-কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই দু’দুটো প্রচণ্ড ঘুসি খেয়ে একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে গেল সে। আরও পিছনে সরে গেল লরেন্স, ওকে সুস্থির হবার কোন সুযোগ দিল না জাভেদ। মুখের উপর পরপর আরও দুটো ঘুসি খেয়ে কেঁপে উঠল ওর দেহ। বেদিশা হয়ে মাথা নিচু করে ঘুসি ঘুড়তে ছুড়তে ষাড়ের মত ছুটে এল সে।

ওর এলোপাতাড়ি ঘুসির একটা লাগল জাভেদের গায়ে, কিন্তু পরক্ষণেই সরে গিয়ে ডান হাতটা নামিয়ে আনল সে প্রচণ্ড বেগে লরেন্সের কিডনীর উপর। হা করে শ্বাস নিয়ে দুহাতে জড়িয়ে ধরতে চেষ্টা করল সে জাভেদকে। চোয়ালের উপর একটা ঘোড়ার লাথির মত ঘুসি খেয়ে মাঝ পথেই থমকে থেমে দাঁড়াল ওর দেহ।

তার উদ্যত হাত দুটোর ফাঁক দিয়ে চাইল সে জাভেদের দিকে। বুঝে নিয়েছে, এই লড়াইয়ের গতি প্রকৃতি তার অন্যান্য মারামারির মত হচ্ছে না। ডান হাতের ঘুসিটা তার মাথা ঘোলা করে দিয়েছে অথচ জাভেদ লোকটা একটু হাঁপাচ্ছেও না, দিব্যি সরে সরে গিয়ে একটার পর একটা ঘুসি মেরেই চলেছে। এই প্রথমবারের মত হারতে যাচ্ছে সে বুঝতে পেরেই রাগে অন্ধ হয়ে আবার তেড়ে এল-সবার সামনে হেরে যাবার অপমান সহ্য করতে পারবে না সে। কিছুতেই। সমানে দু’হাত চলছে তার। দুজনেই প্রচণ্ড বেগে ঘুসি ছুঁড়ছে। পিছাতে পিছাতে দেয়ালের কাছে এসে গেছে জাভেদ। বারবার উৎফুল্ল চিৎকার করে উঠছে বাড়। লরেন্স এখন নিশ্চিত যে জাভেদকে কাবু করে এনেছে সে। তার ডান হাতের একটা ঘুসি প্রচণ্ডভাবে আঘাত করল জাভেদের পাজরে। এতক্ষণে নিশ্চিন্ত হয়ে জাভেদকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার সময় ও সুযোগ দেওয়ার জন্য একটু ঢিল দিল লরেন্স।

ঠিক সেই মুহূর্তেই জাভেদের ডান হাতের ঘুসিটা পড়ল ওর মুখে। ঠোঁট দুভাগ হয়ে কেটে দরদর করে রক্ত পড়তে লাগল ওর শার্টে। জাভেদ এখনও তার সামনেই দুপায়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না সে। তার প্রচণ্ড ঘুসিটা হজম তো করেছেই, উল্টো আঘাত হেনেছে সে!

আবার আক্রমণ করতে তেড়ে গেল লরেন্স। আগের মনের জোর আর তার নেই। এই লড়াইয়ে জিত হবে না, বুঝে নিয়েছে সে। এর আগে তার ডান হাতের প্রচণ্ড ঘুসি খেয়েও কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেনি সে। ওকে দেখে মনে হচ্ছে ওই ঘুসিতে কিছুই হয়নি তার। পশ্চিমে আসার আগে ছোটকালে মিসিগানের কাঠুরেদের সাথে বড় হয়েছে জাভেদ। ওখান থেকেই ঘুসাঘুসিতে মাস্টারস ডিগ্রী নিয়ে এসেছে সে। বক্সিং-এর কায়দা কানুন পশ্চিমের লোকেরা জানে না, ওদের বেশির ভাগ বিবাদেরই মীমাংসা হয় পিস্তল দিয়ে। এর আগের সব মারপিটে লরেন্সের জেতার কারণ হচ্ছে সে ছিল ‘বেনো বনে শিয়াল রাজা’।  ছোটকাল থেকে যুবক বয়স পর্যন্ত প্রচুর মারপিট করেছে জাভেদ। সবই যে জিতেছে এমন নয়, তবে বেশির ভাগ সময়েই তার জিত হয়েছে। জাভেদ যাদের সাথে মারামারিতে জিতেছে তাদের মত কলা-কৌশল জানা নেই লরেন্সের।

তেড়ে আসতে দেখে হঠাৎ পিছনে সরে গেল জাভেদ। টাল সামলাতে না পেরে সামনে ঝুঁকতেই ওর কলার ধরে টেনে হিপ-থ্রো করে ওকে পটকে মাটিতে ফেলল জাভেদ। চিৎপাত হয়ে পড়ে ফ্যালফ্যাল করে বোকার মত চেয়ে রইল সে।

একটু ধাতস্থ হয়ে ধীরে ধীরে উঠতে শুরু করল লরেন্স। ওকে সরে জায়গা করে দিল জাভেদ! উঠে দাঁড়াবার পরে এগিয়ে গেল আবার, ডান হাতে মুখে ঘুসি মারার ভঙ্গি করে বাম হাতে কাধ ঝাঁকিয়ে একটা ঘুসি বসাল বিশাল লোকটার পেটে। পেট ভরা চা নিয়ে খাবি খেতে খেতে পিছিয়ে গেল লরেন্স-মাথা ঘুরছে তার, বমি বমি লাগছে-হাত তুলে অসহায় ভাবে থামতে ইঙ্গিত করল সে জাভেদকে। মার খেয়ে রক্তাক্ত হয়ে ভাল মত পরাজিত হয়েছে স্বীকার করে নিয়েছে সে।

স্টিভের কাছ থেকে পিস্তলটা নিয়ে শান্তভাবে খাপে ভরল জাভেদ। স্যান্ডি এতক্ষণে উঠে বসেছে মাটিতে, দুহাতে নিজের মাথা চেপে ধরে আছে সে।

গোলমাল আর মারপিট করতে চাই না আমি, তবে কেউ করতে চাইলে পিছিয়ে যাবারও অভ্যাস নেই আমার, বলল জাভেদ।

নীনার দিকে ফিরল সে। ওর মুখটা সাদা হয়ে গেছে একেবারে-কিন্তু চোখের ভাব রাগে কঠিন দেখাচ্ছে।

আমার মনে হয় না তুমি ঠিক বুঝতে পারছ ভাচে ক্রীকের আসল চেহারা কী। তুমি একজনকে সাথে নিয়ে এসে নিজের চোখেই দেখে যেতে পারো যদি চাও-স্যান্ডি র‍্যাঞ্চের কাজ বোঝে, ওকে সাথে আনলে সে-ই তোমাকে সব বুঝিয়ে দিতে পারবে ভাল করে। বেশির ভাগ এলাকাই সাত হাজার পাঁচশো ফুটেরও বেশি উঁচুতে। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পাহাড়ী এলাকা ওটা-কিন্তু সেই সাথে সবচেয়ে কঠিন আর ঠাণ্ডা। তুষারও পড়ে খুব বেশি।

ফ্রেড জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে ঘোষণা করল, স্টেজ কোচ আসছে।

টুপিটা মাথায় পরে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল জাভেদ। তার মুঠির গাঁটগুলো কয়েক জায়গায় ছড়ে গেছে, জ্বালা করছে, কিন্তু সেইসাথে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি বোধ করছে সে। অনেককাল পরে আবার মারপিট করল আজ। এবং জিতল।

পিছনে দরজার শব্দে ঘুরে তাকিয়ে দেখল নীনা পেজ তারই দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। ঠাণ্ডা কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে সে-কিছুটা যেন শ্রদ্ধাও মিশ্রিত আছে তার দৃষ্টিতে। তুমি কি সত্যিই আমার গায়ে হাত তুলতে? প্রশ্ন করল সে।

আজ পর্যন্ত কোন মেয়ের গায়ে হাত তোলেনি জাভেদ। কিন্তু সে এমন দৃষ্টিতে চাইল, যেন খুব অবাক হয়েছে প্রশ্নটা শুনে। নিশ্চয়ই, যা বলি তাই করি আমি।

তুমি মোটেও ভদ্র লোক নও জাভেদ!

ওর দিকে চেয়ে হাসল সে। ভাল ভাবে তোমার সাথে কোন চুক্তিতে আসতে পারবে না কোন ভদ্রলোক। কান্নাকাটি করে, তোয়াজ করে কিংবা আদর করে, মিথ্যে কথা বলে ঠকাবে তুমি তাকে। আমার সাথে কিন্তু ওসব চলবে না, লাগতে আসলে চোট পাবে নিজেই।

চোখে চোখে চেয়ে রইল নীনা। আমরা দুজন বিপক্ষ দলের বটে, কিন্তু তুমি একজন সত্যিকার পুরুষ-তোমাকে ভালই লাগে আমার। আমাকে তুমি নীনা বলে ডাকতে পারো।

অত্যন্ত সুন্দরী আর আকর্ষণীয় মেয়ে তুমি। কিন্তু তোমাকে বিশ্বাস করে তোমার সাথে সামান্য রাস্তা পার হতেও ভয় করবে আমার। আমার পরামর্শ শোনো, ফিরে যাও। আমার সাথে টক্কর দিতে এলে সর্বস্ব খোয়াবে তুমি

তোমাকে সাহায্য করার মোটে একটা লোক আছে তোমার, আর আমার আছে তিরিশজন। শেষ পর্যন্ত আমি যে জিতব তাতে কোন সন্দেহ নেই, জাভেদ।

গম্ভীরভাবে মাথা ঝাঁকাল জাভেদ। কথাটা সত্যি, কিন্তু আমার সবচেয়ে বড় মিত্র আবহাওয়া আমার সহায় থাকবে। পুরো এলাকাটা যখন তিন থেকে ছয়ফুট তুষারে ঢাকা পড়ে যাবে তখন তোমার গরু-মহিষ নিয়ে কোনদিকে যাবে তুমি?

স্টেজ-কোচটা একরাশ ধুলো উড়িয়ে বারের দরজার সামনে এসে থামল। গাড়ির ছাদ থেকে আড়ষ্টভাবে নেমে দাঁড়াল ড্রাইভার। ঠাণ্ডা বাতাসে চেহারা একেবারে লাল হয়ে গেছে ওর। যাত্রীদের নামার জন্য স্টেজের দরজা খুলে দিল ফ্রেড। গাড়ির ছাদের উপর দিয়ে দূরের পাহাড়টার দিকে চেয়ে ছিল জাভেদ, মেয়েটা নামতেই ওর দিকে চোখ পড়ল-বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল তার। যা-ই আশা করে থাকুক, এমনটি আশা করেনি সে।

চওড়া ধারওয়ালা সুন্দর বনেটের নীচে আরও সুন্দর একটা মুখ। নীল নিষ্পাপ চোখজোড়াতে শিশুর সরলতা, কিন্তু পোশাক ওর যৌবনকে ঢেকে রাখতে পারেনি। মন্ত্রমুগ্ধের মত দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে জাভেদ। সিঁড়ি বেয়ে উপরে। উঠে এল মেয়েটা। সবাই হাঁ করে চেয়ে আছে মেয়েটার দিকে।

ফ্রেডের দিকে ফিরে সে বলল, আমি “জে” র‍্যাঞ্চের জিকো বা জাভেদ সাহেবকে খুঁজছি।

ফিরে মেয়েটার দিকে চেয়ে কী যেন বলতে গিয়ে কথা হারিয়ে গেল তার। এই অঞ্চলে এত সুন্দরী মেয়ে কোনদিন দেখেনি সে। বোবার মত কেবল হাত তুলে জাভেদকে দেখিয়ে দিল ফ্রেড।

জাভেদের দিকে চেয়ে গম্ভীরভাবে তাকে খুঁটিয়ে দেখল মেয়েটা, তারপর বলল, বাবা যখন নও তখন তুমি নিশ্চয়ই জাভেদ সাহেব।

কথাটা বলেই তার চোখ পাশেই দাঁড়ানো নীনা পেজের উপর পড়ল। ইনি কি তোমার স্ত্রী? প্রশ্ন করল সে।

না, না, হেসে উঠল জাভেদ। এই মেয়েটা আমার শত্রু, মিস নীনা পেজ।

কিছুক্ষণ নীনার দিকে চেয়ে থেকে মুখে চিন্তাযুক্ত একটা ভাব নিয়ে সে বলল, আমার মনে হয় মেয়েটা আমারও শত্রু, ও খুব পছন্দ করে তোমাকে!

তাড়াতাড়ি কথার মোড় ঘুরিয়ে সে বলল, জেনি, তুমি ঘোড়ায় চড়তে পারো তো?…জেনিই তো তোমার নাম-তাই না?

পিঠে লোম আছে এমন সব প্রাণীর ওপরই চড়ে অভ্যাস আছে আমার-তবে সেজন্যে জামা পালটে নিতে হবে আমার। জবাব দিয়েই জেনি আর একবার নীনার দিকে চোরা চাহনিতে চেয়ে নিয়ে নিচু স্বরে প্রশ্ন করল, তুমি পছন্দ করো ওকে?

একটু লাল হলো নীনা। লম্বা গাউনটা সামান্য তুলে ধরে সিঁড়ি দিয়ে নেমে তার এক্কাগাড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাড় গাড়িতে ওঠায় সাহায্য করল তাকে। একবারও পিছন ফিরে না চেয়ে গাড়ি চালিয়ে চলে গেল ওরা

গাড়িতে বসে রাগে ফুসছে নীনা। সেদিনকার পুঁচকে চুড়ী-কতই বা বয়স হবে ওর, তার উপর সব দিক থেকে টেক্কা দিয়ে গেল আজ? স্টেজ স্টেশনের সব কয়টা লোক বেহায়ার মত হাঁ করে ওই মেয়েটার দিকে চেয়ে ছিল। তার দিকে। নজরই পড়ল না কারও?

.

ফ্রেডের বাসা থেকে কাপড় বদলে ফিরে এল জেনি। আঁটসাঁট রাইডিং সুট পরেছে সে। তার সুঠাম দেহের যেটুকু লুকানো ছিল ড্রেসের অন্তরালে তাও এখন ফুটে উঠেছে রাইডিং সুটে। নতুন করে অবাক হলো আবার জাভেদ-মেয়েটাকে সব কিছুতেই মানায়, ভাবল সে।

জেনিকে ঘোড়ায় চড়তে সাহায্য করল জাভেদ। কিন্তু বুঝল আসলে সাহায্যের কোন দরকারই ছিল না তার। মেয়েটি যেমনই হোক ঘোড়ার পিঠে খুব সাবলীল ভঙ্গিতে বসেছে সে।

তোমার কিন্তু র‍্যাঞ্চে থাকা হবে না, আগে থেকেই ওকে সাবধান করে দিল জাভেদ। তোমার জন্যে নিরাপদ হবে না জায়গাটা।

ভয় পাচ্ছি না আমি, তোমার ওপর বিশ্বাস আছে আমার, মিটিমিটি হাসির সাথে জবাব দিল জেনি।

তাড়াতাড়ি ব্যাখ্যা দিতে ব্যস্ত হলো জাভেদ, না, আমি সেকথা বলছি না। র‍্যাঞ্চের অধিকার নিয়ে ওই মিস নীনা পেজের সাথে আমাদের একটা লড়াই হবে। হয়তো গোলাগুলি হতে পারে।

লড়াই কি শুরু হয়ে গেছে? আঙুলের গাঁটগুলো দেখে তো তাই মনে হয়। জাভেদের দিকে গম্ভীর ভাবে চাইল জেনি, আমি কিন্তু মেয়ে হলেও শক্ত আছি, সব কাজ করতে পারি, এমন কী বন্দুকও চালাতে জানি। সত্যিই অনেক জোর আছে আমার। ডান হাত ভাজ করে পেশী শক্ত করার ভঙ্গি করল সে, বলল, বিশ্বাস না হয় ধরেই দেখো?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *