০২. পরদিন আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল

পরদিন আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। আবার দেখা দিল ক্যালিফোর্নিয়ার স্বাভাবিক সূর্য। পরের তিনটে হপ্তা যার যার কাজে ব্যস্ত রইল তিন গোয়েন্দা।

রবিন তার চাকরিতে বাড়তি কাজ করল। দিনে বারো ঘণ্টা করে খাটতে হলো তাকে।

মুসা বাড়ির কাজ করল কিছু কিছু। তবে বেশির ভাগ সময়ই সাঁতার কাটল আর ফারিহার সঙ্গে আড্ডা মেরে বেড়াল। সেই সাথে চলল কারাতের প্র্যাকটিস।

আর কিশোর রইল স্যালভিজ ইয়ার্ডের কাজে ব্যস্ত। দিনে দশ-বারো ঘণ্টা খাটুনি।

একদিন বিকেলে ওয়ার্কশপে একটা নতুন ধরনের সিকিউরিটি ডিভাইস নিয়ে কাজ করছে সে, একটা তালা, ভয়েস অপারেটেড, সাঙ্কেতিক কথা বললে খুলবে। মুসাও আছে ইয়ার্ডে। ওয়ার্কশপের বাইরে ওর গাড়ি মেরামত করছে।

হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল কিশোর, কুকুর হইতে সাবধান!

চমকে গেল মুসা। কি বললে?

কিছু না। বললাম, কুকুর হইতে সাবধান।

তালা খোলার কোডওয়ার্ড এটা।  কিন্তু মুসা বুঝতে পারল না। কি যে বলো বলো! এখানে কুকুর দেখলে কোথায়?

জবাব দিতে যাচ্ছিল কিশোর, এই সময় টেলিফোন বাজল। ফিরেও তাকাল না। জানে, রবিন রয়েছে হেডকোয়ার্টারের ভেতরে। আরেকটা এক্সটেনশন সেট রয়েছে এখানে। রক কনসার্টের জন্যে লিফলেট তৈরি করছে রবিন। হতে পারে তার কোন বান্ধবী ফোন করেছে, কিংবা পরিচিত অন্য কেউ।

কয়েকবার বেজেই থেমে গেল রিঙ। মুসা আবার কাজে মন দিল।

খানিক পরেই বেরিয়ে এল রবিন। কিশোর, মেরিচাচী ফোন করেছেন।

আমার সঙ্গে কথা বলতে চায়? কিছুটা অবাকই হলো কিশোর। আবার কাজ নয় তো? ইদানীং মেরিচাচীও কিশোরের বিশেষ ব্যবস্থায় যোগ দিতে আরম্ভ করেছেন। বুঝে গেছেন, অহেতুক অফিস থেকে বেরিয়ে কষ্ট করে হেঁটে না এসে ফোন করলেই হয়ে যায়। হেঁটে আসার আরেকটা কারণ অবশ্য ছিল, পয়সা বাঁচানো। বকেটকে ঠিক করেছে কিশোর। আবার কোন কাজ দেবে নাকি?

কে জানি এসেছে, তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়।

কে?

মিস্টার ডজ, হাসল রবিন। ওই ধাঁধা প্রতিযোগিতা যেটায় দিয়েছিলে তার ব্যাপারে কিছু বলবে।

তাই? কৌতূহলী হলো গোয়েন্দাপ্রধান। প্রতিযোগিতার কথা ভোলেনি। তবে কাজ নিয়ে এতই ব্যস্ত ছিল, ও ব্যাপারে খোঁজ নিতে পারেনি আর। এখন সুযোগ এসেছে। হয়তো জানতে পারবে এত টাকা খরচ করে মেকসিকোতে পাঠাতে কার এমন দায় পড়েছে।

ওরা ঠিক করল, তিনজনেই যাবে মিস্টার ডজের সঙ্গে দেখা করতে। বাড়ির দিকে রওনা হয়েছে, এই সময় বারান্দায় বেরিয়ে এলেন একজন মানুষ। লম্বা, ছিপছিপে। পরনে জিনস, মাথায় একটা দামি স্টেটসন হ্যাট সামান্য কাত করে বসানো।

তিন গোয়েন্দাকে এগোতে দেখে হাত তুলে নাড়লেন। হাই, আমি ডজ মরিস। ওরা কাছে গেলে একে একে তাকালেন সবার মুখের দিকে। তারপর বললেন, কার কি নাম? না না, রাখ, দেখি আমিই আন্দাজ করতে পারি কিনা? মুসার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। দেখি, কণ্ঠস্বর শোনাও তো তোমার?

আমি মেকসিকো যাব! বলল মুসা। কি জানি কেন ডজকে পছন্দ করতে পারছে না। পিজা খাব!

রবিনের দিকে তাকালেন ডজ। তোমার?

আমার যেতে বড়ই অসুবিধে। অফিসে অনেক কাজ।

মাথা ঝাঁকালেন ডজ। জোর করেই যেন হাসলেন। তারপর তাকালেন কিশোরের দিকে।

কিশোরও তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। লোকটার ব্যাপারে তার প্রথম ধারণাঃ একটু যেন অস্বাভাবিক। হাসি, ভাবভঙ্গি সবই কেমন যেন মেকি মেকি।

এবার তোমার গলা শোনাও? কিশোরকে বললেন ডজ।

মেকসিকো যেতে চাই, কিশোর বলল।

চকচক করে উঠল ডজের চোখ। উত্তেজনা ফুটল চেহারায়। এগিয়ে এসে হাত মেলালেন কিশোরের সঙ্গে।

ডজ বললেন, ধাঁধা প্রতিযোগিতায় তুমিই জিতেছ। আমার র‍্যাঞ্চেও যেতে পারবে তুমি।

কিশোর ভাবছে মেকসিকান র‍্যাঞ্চে যাওয়ার জন্যে অস্থির হয়ে আছে একথাটা সহজে বুঝতে দেয়া চলবে না লোকটাকে। তার আগে কিছু প্রশ্নের জবাব জানা সরকার। বলল সেকথা।

কি জানতে চাও? বলে ফেল।

আর কজন জিতেছে এই পুরস্কার?

শুধু তুমি। একলা।

তারমানে শুধু আমিই ঠিক জবাব দিয়েছি?

দ্বিধা করলেন ডজ। হ্যাঁ।

চিন্তিত ভঙ্গিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে কিশোর। বুঝতে পারছে। মিথ্যে কথা বলছেন ডজ। ওর মত একই জবাব পাঠিয়েছে মুসা আর রবিন। তাহলে শুধু তাকেই বিজয়ী ঘোষণা করছেন কেন তিনি?

 

টাকা আসছে কোত্থেকে? জানতে চাইল সে। এসবের খরচ দেবে কে?

আমি!

কেন?

বিজ্ঞাপনের জন্যে। আমার র‍্যাঞ্চের বিজ্ঞাপন। হ্যাটটা খুলে নিয়ে আবার মাথায় পরলেন ডজ। আত্মবিশ্বাসে ভরা কণ্ঠ। আমার জায়গাটাকে আমি একটা সামার ক্যাম্প বানাতে চাই, যাতে তোমাদের মত সৌখিন টুরিস্টরা গিয়ে বাস করতে পারে। আর এই প্রতিযোগিতাটা সম্পর্কে সানডে পেপারে ভাল একটা আর্টিকেল ছাপতে চাই।

এতক্ষণে বিশ্বাস করার মত একটা যুক্তি শুনল কিশোর। তবে পুরোপুরি নয়।

আরেকটা প্রশ্ন করতে যাবে, এই সময় নীল রঙের একটা শেভ্রলে গাড়ি দেখল ইয়ার্ডের গেটে। কিশোর মনে করল ঢুকবে, কিন্তু ঢুকল না ওটা। মুহূর্তের জন্যে গতি কমিয়েই আবার বাড়িয়ে চলে গেল। উইন্ডশিল্ডে রোদ পড়েছিল বলে ড্রাইভারকে ভালমত দেখতে পায়নি সে। মনে হলো, একজন মহিলা। সোনালি চুল, চোখে কালো কাচের চশমা। গত দশ-পনেরো দিনে ওই গাড়িটাকে আরও কয়েকবার দেখেছে সে।

আবার ডজের দিকে ফিরল সে। ঠিক আছে, আপনার পুরস্কার আমি গ্রহণ করলাম। কিন্তু একটা কথা। আমার এই দুই বন্ধুকে সাথে নিতে পারব?

ভ্রূকুটি করলেন ডজ। তার মানে ওদের খরচও আমাকে দিতে বলছ?

বলছি, দৃঢ়কণ্ঠে বলল কিশোর।

মাথা থেকে হ্যাটটা খুলে নিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে কানা মোচড়াতে শুরু করলেন ডজ। পায়ের ওপর শরীরের ভার বদল করলেন। তাকিয়ে রয়েছেন জুতোর দিকে। তারপর মুখ তুলে হাসলেন। বেশ, যাবে ওরাও।

খটকা লাগল কিশোরের। এত সহজে রাজি হয়ে গেলেন ভদ্রলোক! যেন তৈরি হয়েই এসেছেন, কিশোরকে নিতে হলে তার দুই সহকারীকেও নিতে হবে। মুসার কথা মনে পড়লঃ অনেকটা জোর করেই তিনটে কপি গছিয়ে দিল আমার হাতে! ব্যাপার কি!

দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার একটা ম্যাপ দিলেন ওদেরকে ডজ। তার র ্যাঞ্চের কাছাকাছি শহর লারেটোতে কি করে যেতে হবে বলে দিলেন। ছশো ডলার কিশোরের হাতে দিলেন, ওদের রাহা খরচের জন্যে। নিজের ফোন নম্বর দিলেন যাতে সীমান্ত পার হয়েই তাকে ফোন করে জানাতে পারে। ওদেরকে তখন লারেটো থেকে তুলে নিতে পারবেন।

গাড়িতে গিয়ে উঠলেন ডজ। মেকসিকোর নম্বর প্লেট লাগানো। গাড়িটা চেনা চেনা লাগল মুসার। আগেও যেন কয়েকবার দেখেছে। কোথায়? মনে পড়ে গেল। সুপারমার্কেটে একবার। আর একবার দেখেছে ইয়ার্ডের গেটে। সেকথা বলল কিশোরকে।

পরদিন সকালে অন্যান্য দিনের মতই ইয়ার্ডের ডাকবাক্স খুলল কিশোর। চিঠিপত্র কি এসেছে বের করতে গিয়ে দেখল একটা ম্যানিলা খামও রয়েছে। ভেতরে শক্ত চারকোণা একটা জিনিস। ঠিকানায় তার নাম লেখা। ডাক টিকেট নেই। তার মানে ডাকে আসেনি খামটা, কেউ এসে ঢুকিয়ে রেখে গেছে।

হেডকোয়ার্টারে এনে খামটা খুলল সে। একটা ক্যাসেট। আর কিছু নেই। লেবেলে এমন কিছুই লেখা নেই যা দিয়ে বোঝা যায় কি রেকর্ড করা রয়েছে টেপে।

একটা টেপ রেকর্ডারে ভরে বোতাম টিপল সে। নীরবে ঘুরতে লাগল টেপ। অনেক পরে কথা বলে উঠল একটা শান্ত কণ্ঠঃ মেকসিকোতে এসো না, প্লীজ! মারাত্মক বিপদে পড়বে তাহলে! ক্যালিফোর্নিয়াতেই থাকো…

হঠাৎ করেই নীরব হয়ে গেল কণ্ঠটা।

পুরো টেপটা চালিয়ে দেখল কিশোর। আর কোন কথা নেই।

চেয়ারে হেলান দিল সে। মেসেজটা ভাবনায় ফেলে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। তবে আরেকটা ব্যাপার খচখচ করছে ওর মনে। কণ্ঠস্বর চেনা চেনা লাগল। আগে শুনেছে। কোথায়, মনে করতে পারল না।

কয়েক মিনিট পরে মুসা এসে হাজির। ওকে টেপটার কথা বলল কিশোর। আবার চালিয়ে দিল ওটা।

কিশোরকে অবাক করে দিয়ে হাসতে লাগল মুসা। কেউ মজা করেছে তোমার সঙ্গে। রসিকতা।

রসিকতা?

হ্যাঁ। কেন, নিজের কণ্ঠস্বর চিনতে পারছ না?

নিজের কণ্ঠস্বর? অবাক হলো কিশোর।

হ্যাঁ, অবিকল তোমার নিজের কণ্ঠ। নকল করেছে কেউ। তুমি যেভাবে অন্যেরটা নকল করো। এ এক মস্ত রসিকতা।

আমার কণ্ঠ!

ইচ্ছে হলে বাজি ধরতে পারো। আমার গাড়িটা ধরতে রাজি আছি আমি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *