০২. তিনি ডলার গোনেন কোটির অঙ্কে

তিনি ডলার গোনেন কোটির অঙ্কে। এ থেকে আন্দাজ করা যায় উইলিয়াম ডব্লিউ কোল্ডেরুপ কেমন ব্যক্তি। বলা হয় তার তুলনায় ওয়েস্টমিনস্টারের ডিউক, নেভাদার সিনেটর জোনস, রথসচাইল্ড, পানডেরবিল্ট, নর্দাম্বারল্যান্ডের ডিউক নাকি নিতান্তই মধ্যবিত্ত সাধারণ লোক যেখানে এক-আধ শিলিং ব্যয় করতে মাথা চুলকায়, কোল্ডেরুপ সেখানে লাখ লাখ ডলার বিলিয়ে দেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় অনেকগুলো খনি আছে তার, আছে সমুদ্রগামী জাহাজের বহর। তাছাড়া ইউরোপ আর আমেরিকার বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তাঁর শত শত কোটি টাকা খাটছে। কোল্ডেরুপের টাকা গাণিতিক হারে নয়, বাড়ে জ্যামিতিক হারে। বলা হয়, তার যে কি পরিমাণ টাকা আছে তা নাকি তিনি নিজেই জানেন না। এটা আসলে মিথ্যে প্রচারণা। প্রতিটি ডলারের হিসাব রাখেন কোল্ডেরুপ। তবে ভদ্রলোক কখনও টাকার গরম দেখান না। দেমাক জিনিসটাও তার স্বভাবে নেই।

দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শাখা এই মুহূর্তে বিশ হাজার। আমেরিকা, ইউরোপ আর অস্ট্রেলিয়ায় তার অফিসে কাজ করছে আশি হাজার কর্মচারী। দৈনিক চিঠি লেখা হয় কম করেও তিন লাখ লোককে। তার পাঁচশো জাহাজ সাগর পাড়ি দিচ্ছে। ডাকটিকিট আর রেভিনিউ স্ট্যাম্প কিনতেই তাঁর বেরিয়ে যায় বছরে দশ লাখ ডলার। কোন সন্দেহ নেই যে সানফ্রান্সিসকোর গৌরব ও মহিমা বলতে আজকাল কোল্ডেরুপকেই বোঝায়।

সানফ্রান্সিসকোর সেই গৌরব আর মহিমা যখন একটা ডাক দিলেন, সেটাকে কৌতুক মনে করে হেসে উড়িয়ে দেয়া যায় না। হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে উঠল লোকজন। এখন আর কেউ ঠাট্টা বা ব্যঙ্গ করতে সাহস পাচ্ছে না। সবাই প্রায় একযোগে ফিসফাস শুরু করল, সবই প্রশংসাসূচক। তবে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। তারপরই থেমে গেল সব শব্দ। লোকজন তাকিয়ে আছে বিস্ফারিত চোখে। সবার মনে একটাই প্রশ্ন, এখন যদি কেউ পাল্টা দর হাঁকে? প্রতি জোড়া কান হয়ে উঠল খাড়া। এমন কি কেউ যদি কৌতুক করেও কোল্ডেরুপের দামের ওপর দাম বলে, তাহলে যে কি কান্ড ঘটবে কল্পনা করতেও ভয় পাচ্ছে সবাই। কিন্তু, নাহ, তা কি কখনও হয়! এত সাহস কার যে কোল্ডেরুপের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে দ্বীপটা কিনতে চাইবে?

কোল্ডেরুপ শুধু ধনকুবের নন, মানুষ হিসেবেও অত্যন্ত জেদী। কোন ব্যাপারে একবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে কার সাধ্য তাঁকে টলায়। একবার যখন ডাক দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন যে দ্বীপটা তিনি কিনবেন, এই কেনা থেকে কেউ তাঁকে পিছু হটাতে পারবে না। দৈহিক দিক থেকে প্রকান্ড তিনি-পাঁজরের খাঁচাটা বিশাল, ধড়ের ওপর সাবধানে বসানো মস্ত মাথা। কাঁধ দুটো অস্বাভাবিক চওড়া। শরীরের পেশী ইস্পাতের মত শক্ত। দৃষ্টিতে চঞ্চল ভাব নেই, একদম শান্ত, তবে সেখানে দৃঢ়তার কোন অভাব নেই, সে দৃষ্টি সহজে নত হতে জানে না। চুলের রঙ ধূসর, সামনের দিকটা ব্রাশ করা, তাসত্ত্বেও এমন ঝাকড়া দেখায় তিনি যেন অল্প বয়েসী কোন তরুণ। সমকোণী ত্রিভুজের রেখার মত খাড়া ও সরল তার নাক। গোঁফ না থাকলেও দাড়ি আছে, ইয়াঙ্কি ধাঁচে কাটা, জুলফি জোড়া বেশ চওড়া। আর দাঁতগুলোকে মুক্তো বললেই হয়। সব মিলিয়ে চেহারায় এমন একটা শক্তির ভাব আছে, দেখে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে এই ব্যক্তিকে বড় কোন তুফানও টলাতে পারবে না। সবাই জানে, নিলামে কেউ যদি তার দামের ওপর দাম হাঁকে, উত্তরে তিনি শুধু একবার মাথা ঝাঁকাবেন, সেই সঙ্গে দরটা এক লাখ ডলার করে বেড়ে যাবে। তবে না, তাঁর দামের ওপর দাম বলার লোক এখানে কেউ নেই।

গেল গেল গেল, পানির দরে বিকিয়ে গেল! বারো লাখ ডলার রে ভাই, মাত্র বারো লাখ ডলার! জিনগ্রাস প্রবল উৎসাহে গলা ফাটাচ্ছে। আছেন কেউ প্রতিদ্বন্দ্বী? নতুন একটা দর শোনার জন্যে উন্মুখ হয়ে আছি আমরা! ভেবে দেখুন, মাত্র বারো লাখ ডলারে দ্বীপটা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে! দাম একটু বাড়িয়ে যে-কেউ এটা কিনতে পারেন! যে-কেউ!

গুঁড়িখানার মালিক ওকহা ফিসফিস করছে, এর ওপর কেউ যদি একটা দাম বলে, তাকে যে দ্বীপটা কিনতেই হবে, তা নয়। কারণ একবার যখন কোল্ডেরুপ দাম হেঁকেছেন, এই দ্বীপ তিনি অন্য কাউকে কিনতে দেবেন না।

উত্তরে মার্চেন্ট স্ট্রীটের মনোহারী দোকানের মালিক বলল, কোল্ডেরুপ খুব ভাল করেই জানেন যে তাঁর দামের ওপর দাম বলার সাহস কারও নেই।

শশশ, চুপ! পাশ থেকে এক লোক ধমকের সুরে থামিয়ে দিল ওদেরকে।

সবাই রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে। জানে, নাটকীয় কিছু ঘটবে না; তবু অকশন হাউসের পরিবেশ উত্তেজনায় টান টান হয়ে আছে। কি হয় না হয় ভাব। কোল্ডেরুপ কিন্তু একদম ঠান্ডা। চুপচাপ আছেন তিনি। সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত। ভাবটা যেন, এ-ব্যাপারে তিনি কোন আকর্ষণ বোধ করছেন না। তবে যারা তাঁর খুব কাছাকাছি রয়েছে তারা স্পষ্টই দেখল, কোল্ডেরুপের চোখ হয়ে উঠেছে গুলিভরা রিভলভারের মত-কেউ নতুন একটা দাম হাঁকলেই ডলার ছুঁড়তে শুরু করে দেবে।

আর কোন খদ্দের আছেন? জিজ্ঞেস করল ফেলপর্গ। ঘরের ভেতর পিনপতন নিস্তব্ধতা জমাট হয়ে আছে।

গেল গেল গেল, এবার সত্যি সত্যি দ্বীপটা বিক্রি হয়ে গেল! চিৎকার করে বলল জিনগ্রাস। বারো লাখ ডলার-এক। বারো লাখ ডলার-দুই!

জিনগ্রাস থামতেই শুরু করল ফেলপর্গ, বারো লাখ ডলারে হীরের টুকরোর দ্বীপটা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। সবাই কি নিশ্চিত, আপনারা কেউ নতুন একটা দর বলবেন না। পুরোপুরি নিশ্চিত?

দম আটকে, কান খাড়া করে আছে সবাই। একেবারে শেষ মুহুর্তে কেউ যদি নতুন একটা দর বলে! কিন্তু না, কেউ কিছু বলছে না। টেবিলের দিকে হাত লম্বা করে হাতুড়িটা তুলে নিল ফেলপর্গ টেবিলের ওপর পর পর তিনটে বাড়ি মারবে সে হাতুড়ি দিয়ে, সেই সঙ্গে নিলাম শেষ হয়ে যাবে। তখন আর কারুরই কিছু করার থাকবে না।

টেবিলের ওপর হাতুড়ির প্রথম বাড়িটা পড়ল। এখনও কেউ নতুন দর হাঁকছে না। দ্বিতীয় বাড়িও পড়ল। ঘরের ভেতর সবাই যেন পাথরের মূর্তিতে পরিণত হয়েছে। এবার পড়তে যাচ্ছে তৃতীয় ও শেষ বাড়ি।

টেবিলের দিকে ধীরে ধীরে নেমে এল হাতুড়ি। টেবিল স্পর্শ করলেও, কোন শব্দ হলো না। পরমুহূর্তে বিদ্যুৎবেগে ওপরে উঠল সেটা, তারপরই দ্রুত নেমে আসছে নিচের দিকে।

টেবিলে হাতুড়ি পড়ল না, তার আগেই লোকজনের ভিড় থেকে তিনটে শব্দ উচ্চারিত হলো, তেরো লাখ ডলার!

ঘরভর্তি লোক ডাঙায় তোলা মাছের মত খাবি খেলো, সেটা সম্ভবত টাকার অঙ্কটা শুনেই। তারপর উল্লাসে ফেটে পড়ল সবাই। যাক, শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বী একজন পাওয়া গেছে! যুদ্ধ তাহলে একটা বাধলই। কিন্তু কে সেই বোকা? সানফ্রান্সিসকোর সম্রাটের ওপর দাম হাঁকে, উজবুকটার পরিচয় কি?

তার পরিচয় জে. আর. টাসকিনার। স্টকটনের বাসিন্দা তিনি। টাসকিনার যতটা ধনী, সম্ভবত তারচেয়ে বেশি মোটা। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, তবে কথাটা সত্যি, তার ওজন চারশো নব্বই পাউন্ড। দুনিয়ার সবচেয়ে মোটা লোক কে, তা নির্ধারণ করার জন্যে সেবার শিকাগোতে একটা প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলো–টাসকিনার একটুর জন্যে প্রথম হতে পারেননি। কারণটা ছিল এই যে সেদিন তিনি সময়ের অভাবে নৈশভোজ শেষ না করেই উঠে পড়েন। সেজন্যেই যে লোকটা প্রথম হয়েছিল তার চেয়ে বারো পাউন্ড কম ওঠে টাসকিনারের ওজন।

মাংসপিন্ডের বিশাল এই স্তুপ বা স্তম্ভটি যে-কোন চেয়ারে বা সোফায় বসতে পারেন না। বিশেষ মাপ দিয়ে আলাদাভাবে ওগুলো বানাতে হয় তাঁকে। স্টকটনে তাঁর প্রাসাদ আছে, সেখানকার সব আসবাব-পত্ৰই বিশেষ মাপে তৈরি। স্টকটন হলো ক্যালিফোর্নিয়ার খুব নামকরা একটা শহর, দক্ষিণাঞ্চলের খনি শিল্পের স্নায়ুকেন্দ্র। উত্তরেও খনি শিল্পের এরকম একটা স্নায়ুকেন্দ্র আছে- স্যাক্রামেনটো। স্টকটন আর স্যাক্রামেনটো পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী।

শুধু খনি আছে বলেই টাসকিনার এত ধনী নন। টাকার কুমির হয়েছেন তিনি পেট্রল বেচে। জুয়া খেলা থেকেও মোটা টাকা আয় করেন। লোকে বলে, পোকার খেলায় গোটা যুক্তরাষ্ট্রে তিনিই শ্রেষ্ঠ।

কিন্তু কাড়ি কাড়ি টাকা থাকলে কি হবে, খুব কম লোকই তাঁকে পছন্দ করে। তারা বলাবলি করে, মানুষ হিসেবে টাসকিনারকে শ্রদ্ধা করা যায় না। স্নেহ জাতীয় পদার্থ যা আছে সবই তাঁর শরীরে, মনটা একেবারে শুকনো খটখটে, সেখানে এক ফোটা দয়ামায়া নেই। দয়ামায়া না থাকাতেই তিনি তাঁর প্রিয় রিভলভারটি কারণে-অকারণে প্রায়ই ব্যবহার করেন।

কোল্ডেরুপকে দুচোখে দেখতে পারেন না টাসকিনার। কোল্ডেরুপের অনেক টাকা, এটাই তার ঈর্ষা ও রাগের মূল কারণ। কোল্ডেরুপকে সবাই সম্মান করে, তার খ্যাতি আছে, এসব দেখে হিংসায় জ্বলেন তিনি। কোল্ডেরুপ তাঁর কাছে ঘৃণার পাত্র। যে-কোন সুযোগ পেলেই হয়, কোল্ডেরুপকে উত্ত্যক্ত করতে ছাড়েন না। ঝগড়া করার জন্যে সবসময় এক পায়ে খাড়া হয়ে আছেন। কোল্ডেরুপ অবশ্য এ ধরনের ঈর্ষাকাতর লোক অনেক দেখেছেন, কাজেই তাকে মোটেও গুরুত্ব দেন না। তার সঙ্গে যতবার লাগতে এসেছেন টাসকিনার, প্রতিবার জব্দ করেছেন।

বেশিদিন আগের কথা নয়, স্যাক্রামেনটোর আইনসভার নির্বাচনকে উপলক্ষ করে দুজনের মধ্যে বিরোধটা চরম আকার ধারণ করেছিল। নির্বাচনী প্রচারণার সময় কোল্ডেরুপের নামে গাদা গাদা মিথ্যে অভিযোগ আনেন টাসকিনার। তার মুখে কিছুই আটকায়নি, অশ্রাব্য গালিগালাজের তুফান ছুটিয়েছেন। নির্বাচনে জেতার জন্যে বস্তা বস্তা টাকাও খরচ করেছেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি, শেষ পর্যন্ত ভোটে জিতে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন কোল্ডেরুপই। সেই থেকে আরও বেশি খেপে আছেন টাসকিনার! এই ঘা শুকাতে আরও অনেক সময় লাগবে তার। কে জানে, কোনদিনই হয়তো শুকাবে না।

কেউ জানে না খবরটা কিভাবে পেলেন টাসকিনার। চারদিকে অবশ্য অনেক চর আছে তার। যেভাবেই পান খবর, যে-ই শুনলেন কোল্ডেরুপ স্পেনসার আইল্যান্ড কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অমনি ছুটে এসেছেন তাকে উত্ত্যক্ত করার জন্যে। দ্বীপটা যে কোন কাজে লাগবে না, এ-কথা কোল্ডেরুপ যেমন জানেন, তেমনি টাসকিনারও জানেন। তবু দর বাড়িয়ে দিয়ে কোল্ডেরুপকে খেপিয়ে তোলাই তাঁর উদ্দেশ্য।

আগেই অকশন হাউসে পৌঁছেছেন টাসকিনার, তবে কুমতলবটি কাউকে টের পেতে দেননি। চুপচাপ ছিলেন, ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছিলেন। তার যখন মনে হলো কোল্ডেরুপ নিশ্চিত হয়ে গেছে দ্বীপটা কিনতে তাকে কেউ বাধা দেবে না, ঠিক তখনই বোমা ফাটালেন, তেরো লাখ ডলার!

ঘরভর্তি লোক ঘাড় ফেরাল। ও, মোটকু টাসকিনার! সবাই ফিসফাস শুরু করল।

মোটকু টাসকিনারকে দেশের কে না চেনে। ব্যঙ্গ-চিত্র আঁকিয়েদের কল্যাণে তার বেঢপ শরীরের প্রতিরূপ নামকরা প্রায় সব পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত ছাপা হয়।

উত্তেজনার প্রাথমিক ধাক্কাটা কেটে যেতেই অকশন হাউসে নিস্তব্ধতা নেমে এল। এখন সম্ভবত মাকড়সা জাল বুনলেও শোনা যাবে। এ যুদ্ধ শুধু যে কোল্ডেরুপ বনাম টাসকিনার, তা নয়-এ আসলে ডলার বনাম ডলার যুদ্ধ। দুজনেরই তো টাকার পাহাড় আছে।

নিস্তব্ধতা খান খান হলো ফেলপর্গের আহাজারিতে, গেল গেল গেল, স্পেনসার আইল্যান্ড মাত্র তেরো লাখ ডলারে বিক্রি হয়ে গেল…

কোল্ডেরুপ ধীরেসুস্থে দাঁড়ালেন। সরাসরি চারশো নব্বই পাউন্ড অর্থাৎ টাসকিনারের দিকে তাকিয়ে আছেন। এরইমধ্যে লোকজন সরে গিয়ে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দীকে জায়গা করে দিয়েছে। সানফ্রান্সিসকোর গৌরব আর স্টকটনের উচ্চাশা পরস্পরের দিকে নির্লিপ্ত ভঙ্গীতে তাকিয়ে আছেন। চোখের পলক না ফেলে কোল্ডেরুপ বললেন, চোদ্দ লাখ ডলার।

টাসকিনারও চোখ নামাতে রাজি নন। হাঁকলেন, পনেরো লাখ।

ষোলো লাখ।

সতেরো লাখ।

সেই গল্পটা জানেন, গ্লাসগোর দুই মাতব্বরের? দুজনেই কারখানার মালিক, পরস্পরকে চ্যালেঞ্জ করে বসল, আমার চিমনি তোমার চিমনির চেয়ে উঁচু হবে। এই হলো প্রতিযোগিতার বিষয়। এখানেও যেন তাই ঘটছে, শূন্যে চিমনি খাড়া করছেন কোল্ডেরুপ আর টাসকিনার, দেখতে চান কে কার চেয়ে উঁচুতে তুলতে পারেন-এ চিমনি অবশ্য নিখাদ সোনায় মোড়া।

নতুন দর হাঁকার আগে প্রতিবারই কোল্ডেরুপ একটু সময় নিচ্ছেন। কিন্তু টাসকিনার দ্বিধাহীন ভঙ্গিতে একের পর এক বোমা ফাটিয়ে চলেছেন।

সতেরো লাখ ডলার! চিৎকার করছে ফেলপর্গ। পানির দর, ভাই, পানির দর!, স্পেনসার আইল্যান্ড বাচ্চা ছেলের খেলনা নাকি যে মাত্র সতেরো লাখ ডলারে বিক্রি হয়ে যাবে! আরে সাহেব, সত্যি যদি কিনতে চান, দাম আরেকটু বাড়াতে হবে। হয় আপনি বাড়ান, না হয় আপনি একজন দর বাড়ালে, অপরজন দমে যাবেন না, প্লীজ। আমরা দেখতে চাই না বিনা যুদ্ধে আপনারা কেউ রণে ভঙ্গ দিয়েছেন!

আঠারো লাখ ডলার! সাবধানে, ধীরে ধীরে বললেন কোল্ডেরুপ।

উনিশ! হুঙ্কার ছাড়লেন টাসকিনার।

বিশ লাখ! এবার যেন কোল্ডেরুপ কিছু না ভেবেই দামটা বলে ফেললেন। ইতিমধ্যে তাঁর মুখের রঙ কেমন ম্লান হয়ে উঠেছে। তবে এখনও তিনি জেদ ধরে আছেন। এর শেষ না দেখে ছাড়বেন বলে মনে হয় না।

রাগে দিশেহারা বোধ করছেন টাসকিনার। চোখ জোড়া টকটকে লাল হয়ে উঠেছে তাঁর। মোটা আঙুলগুলো বুক পকেটের ক্রনোমিটারটা নাড়াচাড়া করছে। চব্বিশ লাখ ডলার! এক লাফে দরটা অনেক বাড়িয়ে দিয়ে ভাবছেন, প্রতিদ্বন্দ্বী আর তার নাগাল পেতে চেষ্টা করবে না।

শান্ত গলায় কোল্ডেরুপ বললেন, সাতাশ লাখ।

ঊনত্রিশ।

ত্রিশ।

কোল্ডেরুপ ত্রিশ লাখ ডলার হাঁকতেই তুমুল করতালিতে ফেটে পড়ল অকশন হাউস। টাসকিনার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছেন। কোন কথাই তিনি বলছেন না। নিলামদার টেবিলের ওপর হাতুড়ি পেটাল-একবার, দুবার। আর একবার হাতুড়ির বাড়ি পড়লেই স্পেনসার আইল্যান্ড তাঁর হাতছাড়া হয়ে যাবে। তিনি কোল্ডেরুপের কাছে হেরে যাবেন। কোল্ডেরুপের ত্রিশ লাখ হাঁক শুনে প্রায় কাত হয়ে পড়ে যাবার অবস্থা হয়েছে তাঁর। সেই অবস্থা থেকেই কোন রকমে চিঁচিঁ করে উচ্চারণ করলেন, পঁয়ত্রিশ লাখ।

চল্লিশ লাখ ডলার, সঙ্গে সঙ্গে বললেন কোল্ডেরুপ।

টাসকিনারের মাথায় যেন কুড়ুলের কোপ লাগল। মাথাটা আপনা থেকেই হেঁট হয়ে এল তাঁর। পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হলেন তিনি। টেবিলে হাতুড়ি পড়তে শুরু করেছে। একবার, দুবার, তিনবার।

মাথা তুলে তাকালেন টাসকিনার, দুচোখ থেকে আগুন ঠিকরে বেরুচ্ছে। এর প্রতিশোধ কিভাবে নিতে হয় আমার তা জানা আছে, হিসহিস করে বললেন তিনি। ঘুরে চলে গেলেন অকসিডেন্টাল হোটেলের দিকে। রাগে ও ঘৃণায় তার সর্বশরীর হুহু করে জ্বালা করছে।

ওদিকে অকশন হাউসে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। উল্লাসে নাচানাচি করছে লোকজন। এ আনন্দ-উল্লাসের কারণ এই নয় যে কোল্ডেরুপ দ্বীপটা কিনতে পেরেছেন, আসল কারণ হলো টাসকিনারকে অপমান করা গেছে। ভিড় ঠেলে মন্টোগোমারি স্ট্রীটে ফিরে গেলেন কোল্ডেরুপ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *