০২. ডাক্তার আসবে না

ডাক্তার আসবে না, দরজায় দাঁড়ানো প্রতিবেশীরা বলল।

না, হুয়ানাকে বলল কিনে। ডাক্তার আমাদের এখানে আসবে না।

হুয়ানা কিনোর দিকে চাইল। ওর চোখজোড়া শীতল, নিস্পৃহ। কয়েটিটো হুয়ানার প্রথম সন্তান। তার সাত রাজার ধন মানিক।

তাহলে আমরাই যাব, বলল সে। শালের এক প্রান্ত দিয়ে মাথা ঢাকল হুয়ানা। শালের অন্য কিনারা রাখল

বাচ্চাটার চোখের ওপর। দোরগোড়ায় সমবেত মানুষগুলো পেছনে চেপে দাঁড়ালে হুয়ানা বেরিয়ে পড়ল। কিনো আর হুয়ানা গেট পেরিয়ে ছোট পথটা ধরল। ওদের অনুসরণ করছে পড়শীরা। কিনো আর হুয়ানার সাথে তারাও ডাক্তারের কাছে যাচ্ছে।

শহরের প্রাণকেন্দ্রে দ্রুত পা চালিয়ে চলে এল ওরা। মাটিতে কালো কালো ছায়া ফেলেছে জ্বলন্ত সূর্য। সমস্ত লোকজন আর তাদের কালো ছায়ারা শহরের উদ্দেশে হনহন করে এগিয়ে চলেছে।

কাঠের ছোট বাসাগুলো ছাড়িয়ে পাথুরে বাড়ি শুরু হয়েছে, সেখানে এসে হাজির হলো দলটা। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড দেয়াল ঘেরা বাগান রয়েছে শহরের এ অঞ্চলে। দেয়ালের ওপর লটকে রয়েছে নানা রকমের লাল, সাদা ফুল। বাগানে খাচাবন্দী পাখিরা গান গাইছে, শুনতে পাচ্ছে হুয়ানা অার কিনো।

গরীব মানুষগুলো স্কয়্যার পেরিয়ে, গির্জার সামনে দিয়ে হেঁটে এসেছে। অনুসরণকারীর সংখ্যা ইতোমধ্যে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সবার মুখে কয়োটিটো আর বিছের কামড়ের কথা। জনতা জানে ওরা স্বামী-স্ত্রী বাচ্চাটাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছে।

গির্জার সামনে বসে থাকা ভিখিরির দল কিনো আর হুয়ানার দিকে চেয়ে ছিল। হুয়ানার নীল রঙা শতচ্ছিন্ন স্কার্ট, আর অসংখ্য ফুটোঅলা শালটা দেখেছে ওরা। কিনোর ছেড়া কম্বলটার দিকেও তাদের কৌতূহলী দৃষ্টি ছিল। লোকটা গরীব, স্পষ্ট বোঝা যায়। দেখি তো কি হয়, এই ভেবে ভিখিরিরাও পিছু নিয়েছে ওদের।

শহরের নাড়ী-নক্ষত্র ভিখিরিগুলোর জানা। ছোট-বড় সমস্ত অপরাধের খুঁটিনাটি তাদের নখদর্পণে। গির্জার বাইরে ঘুমায় ওরা। ওদের অজান্তে এ শহরে কিছুই ঘটার জো নেই।

ভিখিরিরা ডাক্তারটিকেও চেনে। সে যে কী চিজ ভাল করেই জানা আছে তাদের। লোকটা টাকা ছাড়া দুনিয়ায় আর কিছু বোঝে না। রোগীর রোগ সারাতে পারে না লোকটা, তাও তাদের জানা। গির্জার ভেতর লাশগুলো ওদের নাকের ডগা দিয়েই তো ঢোকে।

গির্জায় এখন কেউ নেই। টাকাঅলা কেউ গির্জায় ঢোকেনি, ব্যবসা মন্দা, ফলে কিনো আর হুয়ানাকে অনুসরণ করছে ভিখিরিরা। কুড়ের হদ্দ, মোটা ডাক্তারটা কি চিকিৎসা দেয় বাচ্চাটিকে জানতে আগ্রহী ওরা।

ডাক্তারের বাড়ির প্রকাণ্ড ফটকটার কাছে এসে থেমেছে জনতা। বাড়ির ভেতর থেকে রান্নার সুঘ্রাণ ভেসে আসছে। কিনোর মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে ডাক্তারটির কথা।

লোকটা কিনোর স্বগোত্রীয় নয়। প্রায় চারশো বছর ধরে কিনোর গোত্রের ওপর লুটপাট আর অত্যাচার চালাচ্ছে ডাক্তারের গোত্র। প্রচণ্ড ক্রোধ আর ভীতি অনুভব করে কিনো, যখনই প্রতিপক্ষের কারও সামনাসামনি হয়। কিনো অনুভব করছে, কথা বলার চাইতে বরং ডাক্তারটিকে খুন করাই সহজ হবে তার পক্ষে। ডাক্তারের গোত্রের লোকেরা এমনভাবে কিনোর গোত্রের মানুষদের সাথে কথা বলে, তারা যেন জন্তু-জানোয়ার।

দরজায় টোকা দিতে ডান হাত তুলল কিনো। ভেতর ভেতর রাগ ফেনিয়ে উঠছে ওর। ঠোঁটজোড়া পরস্পরের সাথে শক্ত হয়ে চেপে রয়েছে, কিন্তু তারপরও বাঁ হাতে হাট খুলে নিল ও। গেটে টোকা দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল কিনো। হুয়ানার কোলে ডুকরে কেঁদে উঠল কয়োটিটো। মৃদু কণ্ঠে বাচ্চার সাথে কথা বলল হুয়ানা। জনতা কাছিয়ে এল কি হয় দেখতে। শুনতেও।

মুহূর্ত পরে, মস্ত গেটটা কইঞ্চি ফাঁক হলো। গেট যে খুলেছে সে কিনোর এক জ্ঞাতি ভাই। ইন্ডিয়ান ভাষায় তার সাথে কথা বলল কিনো।

আমার বাচ্চাটাকে, বলল কিনো। বিছেয় কামড়েছে।

গেট লেগে যেতে শুরু করল। কিনোর জ্ঞাতি ভাই, অর্থাৎ কাজের লোকটা, ইভিয়ান ভাষায় কথা বলতে গররাজি।

একটু দাঁড়াও, স্প্যানিশে বলে গেটটা লাগিয়ে দিল লোকটা। সাদা দেয়ালে ছায়া পড়েছে জনতার।

নিজের কামরায় বিছানার ওপর বসে ছিল ডাক্তার। লাল সিঙ্কে তৈরি ড্রেসিং গাউন তার পরনে। কাপড়টা এসেছে প্যারিস থেকে। সুদৃশ্য কাপ থেকে গরম চকোলেট পান করছে লোকটা। আলতো হাতে কাপটা ধরে রয়েছে সে। অসন্তুষ্ট দেখাচ্ছে তাকে।

ডাক্তারের পাশে, টেবিলে খুদে এক কলিং বেল আর কিছু সিগারেট। কামরার আসবাবপত্র, পর্দা সবই ভারী আর কালচে। ঘরে লটকানো ছবিগুলো ধর্মের বাণী প্রচার করছে। তবে বিশাল এক রঙীন ছবিও রয়েছে। ডাক্তারের স্ত্রীর। ভদ্রমহিলা মারা গেছেন।

ডাক্তার আরেক কাপ চকোলেট পান করল, একটা বিস্কুট মুখে দিল। গেট খুলতে-যাওয়া লোকটা খোলা দরজার কাছে এসে অপেক্ষা করছে।

কি? ডাক্তার বলল।

বাচ্চা নিয়ে এক ইন্ডিয়ান এসেছে, বলল লোকটা। বাচ্চাটাকে বিছেয় কামড়েছে।

ডাক্তার ধীরে ধীরে কাপটা নামিয়ে রাখল, খেপে উঠছে সে।

ইন্ডিয়ানদের বাচ্চাদের ভাল করা ছাড়া আর কি কোন কাজ নেই আমার? গর্জে উঠল। আমি কি পশুর ডাক্তার?

এবার দুমুহূর্ত কি যেন ভেবে নিয়ে আবার বলল, ইডিয়ানদের কাছে পয়সা থাকে না। যাও, গিয়ে দেখে এসো ওর কাছে আছে কিনা।

যাই, স্যার।

কাজের লোকটা গেট সামান্য ফাঁক করে অপেক্ষমাণ জনতার উদ্দেশে চাইল। এবার ইন্ডিয়ান ভাষায় কথা বলল লোকটা।

তোমার টাকা আছে? জানতে চাইল।

কম্বলের নিচে হাত দিল কিনো। বের করে আনল এক টুকরো কাগজ। কাগজটা আস্তে আস্তে খুলল ও, লোকটা যাতে মুক্তো আটখানা দেখতে পায়। ধূসর, হতশ্রী মুক্তোগুলো প্রায় মূল্যহীন। ওগুলো হাতে নিয়ে গেটটা ফের বন্ধ করল ভূত্য। খুব দ্রুত ফিরে এল সে এবার। গেট খুলে মুক্তো ফিরিয়ে দিল কিনোর হাতে।

ডাক্তার বাসায় নেই, বলল। রোগী দেখতে চলে গেছেন। লজ্জিত বোধ করছিল, তাই ঝট করে গেট বন্ধ করে দিল লোকটা।

উপস্থিত সব লোক লজ্জায় অধোবদন, তারা কেউ কিনোকে সাহায্য করতে পারছে না। ধীরে ধীরে সরে পড়তে লাগল জনতা। গির্জার সিড়িতে ফিরে গেল ভিখিরির দল। বাড়ি ফিরে গেল কিনোর বন্ধু-বান্ধবরা। কিনো আর হুয়ানার কথা এবং লজ্জাবোধ ভুলে যেতে চেষ্টা করল তারা।

গেটটার সামনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল স্বামী-স্ত্রী। ধীরেসুস্থে মাথায় হ্যাটটা চাপাল কিনো। তারপর আচমকা দুম করে এক ঘুসি মেরে বসল গেটের গায়ে। চোখ নামাতে, আঙুলের ফাঁক গলে রক্ত গড়াতে দেখল ও। অবাক হয়ে গেল কিনো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *