০২. ডাইনিং রূমে খাওয়া শেষ করে

ডাইনিং রূমে খাওয়া শেষ করে দোতলায় যাবার পথে সবে হলঘরে ঢুকেছি, এমন সময় বেজে উঠল টেলিফোন। এগিয়ে গিয়ে রিসিভার তুলে নিলেন চ্যালেঞ্জার। গমগম করে উঠল তার গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর। হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমিই বলছি••প্রফেসর চ্যালেঞ্জার.••এখন কাঁদেন কেন? যখন বলেছিলাম তখন তো শোনেননি।…অবস্থা খারাপের আর দেখেছেন কি? দয়া করে আমাকে বিরক্ত করবেন না। বরং ঈশ্বরে বিশ্বাস থাকলে বসে বসে তাকে ডাকুন… খটাস করে ক্রেডল রিসিভার রেখে দিলেন তিনি। আমাদের দিকে ফিরে বললেন, মেয়র। এতক্ষণে টনক নড়েছে। মরুকগে, ব্যাটা!

ওপর তলায় পড়ার ঘরে নিয়ে গেলেন আমাদের। বিরাট ঘর, প্রচুর আলোবাতাস। প্রথমেই চোখে পড়ে মেহগনি কাঠের প্রকাও এক টেবিল। তাতে কয়েকটা টেলিগ্রাম পড়ে আছে। খামগুলো খোলা হয়নি।

একটা খাম তুলে নিতে নিতে বললেন চ্যালেঞ্জার, নামটা আমার অনেক বড়। ছোট একটা নাম রাখলে ভাল হয়, অনেক খরচ কমে যাবে বেচারাদের। নোয়া রোদারফিল্ড নামটা কেমন?

পচা! জবাব দিয়ে দিলেন সামারলি।

কুঁচকে গেল গরিলার মুখ। পরক্ষণে ব্যঙ্গের হাসি ফুটল মুখে। তাচ্ছিল্য করলেন সামারলিকে। কড়াৎ করে একটানে ছিড়ে ফেললেন খামের মুখটা। বোঝাতে চাইলেন ইচ্ছে করলে তাকেও ওরকম ছিড়ে ফেলতে পারেন।

এক এক করে খাম ছিড়ে টেলিগ্রামগুলো পড়তে লাগলেন চ্যালেঞ্জার। আমি গিয়ে দাঁড়ালাম জানালার কাছে। আমার দুপাশে এসে দাঁড়ালেন লর্ড জন আর প্রফেসর সামারলি।

পাহাড়ের গায়ে ঘুরে ঘুরে উঠে এসেছে মূল রাস্তা। সেটা থেকে শাখা বেরিয়ে এসেছে চ্যালেঞ্জারের বাড়ি পর্যন্ত। দক্ষিণে খোলা মাঠ। ঢেউয়ের মত ওঠানামা করতে করতে মিলিয়ে গেছে দিগন্তে। পাহাড়ের গোড়ায় সবুজ ঘাসে ঢাকা গলফ, ফিল্ড। গলফ খেলছে লোকে। ডানে জঙ্গল। গাছপালা তেমন ঘন নয়। ফাঁক দিয়ে লন্ডন-ব্রাইটন রেলপথটা চোখে পড়ে।

চ্যালেঞ্জারের বিস্ময়ধ্বনি শুনে ঘুরে দাঁড়ালাম। সব কটা টেলিগ্রাম পড়া শেষ করেছেন তিনি। চোখে উত্তেজনা।

কি হয়েছে? জানতে চাইলেন সামারলি।

আমাদের তিনজনের মুখের দিকে এক এক করে নজর বোলালেন চ্যালেঞ্জার। জিজ্ঞেস করলেন, লন্ডন থেকে আসার পথে অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়েছে আপনাদের?

কি কথা জানতে চাইছেন চ্যালেঞ্জার বুঝতে পারলাম না। লর্ড জনের দিকে তাকালাম। চুপ করে আছেন। অবশেষে সামারলি বললেন, ম্যালোন একটা অস্বাভাবিক কাণ্ড করেছে, যা সে সাধারণত করে না-মদ খেয়ে মাতাল হয়ে গিয়েছিল…।

মিথ্যে কথা বলছেন কেন? ও মদ খায়নি, আমার পক্ষ নিয়ে বললেন লর্ড জন। আমি ওর একেবারে গা ঘেঁষে বসেছিলাম। মদ খেলে গন্ধ পেতাম। অস্বাভাবিক কাণ্ড যেটা করেছেন, সেটা আপনি। জন্তু-জানোয়ারের ডাক ডেকে কান ঝালাপালা করেছেন আমাদের। আপনার মাথার সুস্থতা সম্পর্কেই সন্দেহ।, হয়ে গিয়েছিল আমাদের।

আপনি কি কম বকর বকর করেছেন নাকি? চটে উঠলেন সামারলি। কোথাকার কোন এক ভারতীয় রাজা আর নিগ্রো মেয়ের প্রেমের গল্প সেই সঙ্গে যোগ করলেন মোষ শিকারের কাহিনী, তা-ও আবার এক ল্যাংড়া মোব…

বুনো মোষ জখম হলে সাক্ষাৎ যম হয়ে যায়, জানেন সেটা?

না, জানি না। জানার দরকারও মনে করি না। মোয় দিয়ে আমি কি করব?

বড় বেশি প্যাঁচাল পাড়েন আপনারা! বিরক্ত হয়ে হাত নাড়লেন চ্যালেঞ্জার। এটা খোশগল্প কিংবা ঝগড়াঝাটির সময় নয়। পরিস্থিতি কতটা খারাপ কল্পনাও করতে পারছেন না আপনারা।

না পারার কোন কারণ নেই, সামারলি বললেন। পরিস্থিতি খুবই ভাল। আমার মাথা এত ঠাণ্ডা বহুদিন ছিল না। ইথারে বিষক্রিয়ার কথা বলবেন তো? এর একটা বর্ণও বিশ্বাস করি না আমি।

তাই নাকি? লম্বা দাড়িতে দ্রুত আঙ্গুল চালাতে শুরু করলেন চ্যালেঞ্জার। মাই ডিয়ার গ্রেট প্রফেসর, জানতে পারি কি, কি কারণে অধমের এত জোরাল বৈজ্ঞানিক মতবাদটাকে এহেন পথের ধূলির মত অবজ্ঞা?

ছাগুলে দাড়িতে চ্যালেঞ্জারের ভঙ্গিতে ঘন ঘন আংল চালালেন সামারলিও। ঠোঁটের কোণ বাঁকিয়ে হাসলেন। খুব সোজা যুক্তি। পৃথিবীর চারদিকেই ইথার। একদিকের ইথার বিষাক্ত হয়ে পড়ার মানে অন্যদিকেও একই ব্যাপার ঘটা। এবং তাই যদি হয়ে থাকত, ট্রেনেই টের পেতাম।

ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠলেন চ্যালেঞ্জার। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে রোমশ কপালের ঘাম মুছে জিজ্ঞেস করলেন, টের কি পাননি? আপনাদের কথাবার্তা শুনেই তো বুঝতে পারছি সারাটা পথ পাগলামি করতে করতে এসেছেন। যার যা স্বভাব নয়, সেসবই করেছেন। এর মানেটা কি?

আপনার কি ধারণা? পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন সামারলি।

আমার ধারণা শুনতে চান? তার আগে শুনুন আজ আমি নিজে কি করেছি। আমার হাউস-কীপারের কাজ করে একটি মেয়ে। নাম সারা। পুরো নামটা জানি না। জানার চেষ্টাও করিনি। স্মৃতির ওপর বোঝা যত কম চাপানো যায় ততই ভাল। মেয়েটা রসকষহীন, উদাসীন, শান্ত, নির্লিপ্ত, আবেগশূন্য। আজ সকালে উঠেই তার ওপর একটা পরীক্ষা চালানোর ভীষণ ইচ্ছে হলো। মেয়েটা কতখানি ঠাণ্ডা মেপে দেখার ইচ্ছে। নাস্তা আনতে বললাম ওকে। ও বেরিয়ে যেতেই টেবিলের তলায় ঢুকে পড়লাম। লুকিয়ে বসে রইলাম। নাস্তার ট্রে হাতে ঘরে ঢুকল সে। টেবিল ঘেঁষে এসে দাঁড়াতেই দিলাম হাঁটুর নিচে কামড়ে। এতটা সাকসেসফুল হব কল্পনাও করিনি। আমার দিকে হতবুদ্ধির মত কয়েক সেকেণ্ড ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে তীক্ষ্ণ এক চিৎকার দিয়ে দিল দৌড়। টেবিলের তলা থেকে বেরিয়ে আমিও ওর পিছু নিলাম। কেন কামড় দিয়েছি বুঝিয়ে বলার জন্যে। ও ভাবল আরও কামড়াতে যাচ্ছি। এমন জোরে দৌড় দিল, কিছুতেই ধরতে পারলাম না। ডিয়ার প্রফেসর সামারলি, এ রকম একটা উট ঘটনা কেন ঘটালাম অনুমান করতে পারেন? আপনার চৌকস মগজের ভেতরটা ঘেঁটে দেখুন তো কিছু ঢোকে কিনা? লর্ড জন, আপনি বুঝতে পারছেন কিছু?

পারছি, গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন জন। নিজেকে সামলানোর এখনও সময় আছে, প্রফেসর, নইলে বিপদে পড়বেন। পাগলামিটা একটু কমান।

সামারলি, আপনার কি মত?

মাথাটা পুরোই বিগড়ে গেছে আপনার। ভাল আর হয় কিনা সন্দেহ।

রাগলেন না চ্যালেঞ্জার। শান্ত ভঙ্গিতে আমার দিকে ফিরলেন। বয়স্কদের মতামত শোনা গেল। ম্যালোন, তোমার কি ধারণা?

সকালের সৃষ্টিছাড়া সমস্ত ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। লর্ড জনের বিসদৃশ গল্প, আমার অকারণ কান্না, প্রফেসর সামারলির দুর্বোধ্য মেজাজ আর আচরণ, লন্ডনের রাস্তায় দাঙ্গা-মারামারি, ডাইভারদের এলোপাতাড়ি গাড়ি চালানো, অক্সিজেনের দোকানে কুলিদের সঙ্গে ঝগড়া, সব কথা ছবির মত ভেসে উঠল মনের পর্দায়। এই সব উন্মওমর একটাই কারণ মনে হলো আমার। চেঁচিয়ে উঠলাম, বিষ! বিষ ঢুকেছে আমাদের সবার রক্তে। আজব বিষ! মগজ গড়বড় করে দিয়েছে।

ঠিক বলেছ! তুড়ি বাজালেন চ্যালেঞ্জার। বিষে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছি আমরা। ইথারের বিষ বলয়ে ঢুকে পড়েছে পৃথিবী। মিনিটে লক্ষ লক্ষ মাইল গতিতে ঢুকে যাচ্ছে আরও গভীরে। সকাল থেকে উলটোপালটা যা কিছু ঘটেছে শুধু এই কারণে! ইথারের বিষেই মাথা বিগড়েছে আমাদের সকলের। সকালে সারার পা কামড়ে দেয়ার পর থেকে অনেক ভেবেছি। ওরকম একটা উদ্ভট ইচ্ছে জাগল কেন মনে? এতদিন তো জাগেনি। শুধু কি তাই? আমার স্ত্রীকে দরজার আড়াল থেকে হুঙ্কার ছেড়ে চমকে দেবার ইচ্ছে হয়েছিল। বাইরে বেরিয়ে দেখি এঞ্জিনের ওপর উবু হয়ে কাজ করছে অস্টিন। পেছন থেকে কষে এক লাথি মারার ইচ্ছে হলো ওর পাছায়। চিন্তায় পড়ে গেলাম। এ রকম অস্বাভাবিক ইচ্ছে হওয়ার কারণ কি? নাড়ি দেখলাম। মিনিটে দশ স্পন্দন বেশি। পরিষ্কার হয়ে গেল রহস্য। ইথারের বিষক্রিয়া, আর কিছু না। অন্য কিছু হতেই পারে না। এই যে এখন ইচ্ছে করছে। প্রফেসরের দাড়ি ধরে হ্যাচকা টান মেরে ঘাড়টা মচকে দিতে, এটাকে কি সুস্থতার লক্ষণ বলবে কেউ?

লাফ দিয়ে সরে গেলেন সামারলি। তবে তর্ক করলেন না আর। ট্রেনে নিজেদের আচরণের কথাটাও গুরুত্ব দিয়ে ভাবলেন। তারও মনে হতে লাগল, চ্যালেঞ্জারের যুক্তিই ঠিক। কর্কশ কর যতটা সম্ভব মোলায়েম করে জিজ্ঞেস করলেন, এ থেকে বাঁচার উপায় কি? ভেবেছেন কিছু?

অনেক ভেবেছি। কোন উপায় নেই। মরতে হবে আমাদের সবাইকেই। একলাফে টেবিলে উঠে বসলেন চ্যালেঞ্জার। পা দোলাতে দোলাতে বললেন,

পৃথিবীর একটা প্রাণীও বাঁচবে না। সব মরবে।

জানালার দিকে ঘুরে গেল আমার চোখ। বাইরে তাকালাম। গ্রীষ্মে অপরূপ সাজে সেজেছে প্রকৃতি। ঢেউ খেলানো ফসলের মাঠ, চাষীদের খামার বাড়ি, বনজঙ্গল-আকাশ..সবই পুরানো দৃশ্য। কিন্তু আজ যেন সবকিছু নতুন লাগল চোখে। সাধারণ জিনিসগুলোকেও মনে হতে লাগল অসাধারণ। কতই না সুন্দর!

চ্যালেঞ্জার বলছেন, অনেক বয়েস হয়েছে পৃথিবীর। অনেক জঞ্জাল আর আবর্জনা জমেছে। সব সাফ করতে চান বোধহয় সৃষ্টিকর্তা। ইথারের বিষে চুবিয়ে পুরানো সব ধ্বংস করে দিয়ে আবার নতুন করে সৃষ্টি করতে চান।

 ঘরে পিনপতন নীরবতা। চুপচাপ চ্যালেঞ্জারের কথা শুনছি। এ-কি ভয়ঙ্কর সম্ভাবনার কথা বলছেন তিনি। কারও মুখে টু শব্দ নেই। চমকে দি। পাশের ঘরে রাখা টেলিফোনের কর্কশ আর্তনাদ।

আসছি! লাফ দিয়ে টেবিল থেকে নেমে বেরিয়ে গেলেন চ্যালেঞ্জার।

চুপ করে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম আমরা। কারোরই কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।

ঠিক দুমিনিট পর গম্ভীর মুখে ফিরে এলেন তিনি। ব্রাইটনের মেডিক্যাল অফিসার ফোন করেছে। জানাল, সাগর তীরে নিচু অঞ্চলগুলোতে পাগল হয়ে যাচ্ছে মানুষ। মারা যাচ্ছে দলে দলে। রোগটা ধরতে পারছেন না। আমার কাছে জানতে চাইলেন ইধারের বিষের কারণেই এস ঘটছে কিনা। বলে দিলাম, ঘটছে। নিশ্চয় নিচু অঞ্চলের ভারি বাতাসে ভর করে বিষাক্ত ইধার নেমে গেছে তাড়াতাড়ি। উঁচু অঞ্চলগুলোতে আরেকটু দেরিতে আঘাত হানবে। তবে খুব একটা সময় নেবে না। বড় জোর কয়েক ঘণ্টার এদিক ওদিক।

জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন সামারলি। পনেরো সেকেণ্ড বাইরের প্রকৃতি দেখলেন। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, চ্যালেঞ্জার, পরিস্থিতি খুবই খারাপ বুঝতে পারছি, বাজে তর্ক করার সময় এখন নেই, গলা কাঁপছে তার। ধরে নিচ্ছি আপনার কথাই ঠিক, ইধারে বিষক্রিয়ার কারণেই ঘটছে এসব। বিপদটা কি কোনভাবেই কাটিয়ে ওঠা যায় না?

সত্যি কথাটা শুনবেন? আমি নিজেও ঠিক বুঝতে পারছি না। বিষাক্ত ইথারে কতক্ষণ ডুবে থাকবে পৃথিবী, তার ওপর নির্ভর করবে আমাদের বাঁচামরা।

লর্ড জন বললেন, আজ হোক কাল হোক, জন্মেছি যখন একদিন না একদিন মরতে তো হবেই। যা ঘটে ঘটুক। মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না।

চেয়ারের হাতলে কনুইয়ে ভর রেখে বসে আছি আমি। ঠোঁটে সিগারেট পুড়ছে। টান দিতে ভুলে গেছি। কেমন ঘোর লাগা অবস্থা। ক্লান্তিও লাগছে। বিষের জন্যে হতে পারে।

রোমশ কপাল আর ঘন ভুরু কুঁচকে দাড়িতে কয়েকবার হাত চালালেন চ্যালেঞ্জার। কি যেন ভেবে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, লওন ছাড়ার আগে শেষ খবর কি শুনেছ?

গেজেট অফিসে ছিলাম দশটা নাগাদ। সিঙ্গাপুর থেকে রয়টার খবর পাঠিয়েছে, রহস্যজনক একটা রোগ দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়েছে সুমাত্রায়। সুন্দায় লাইট হাউসে আলো জ্বলেনি, কারণ, কর্মচারীরা সব বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিল।

হুঁ, চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা দোলালেন চ্যালেঞ্জার। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, এ সময় আবার বাজল টেলিফোন। নেমে চলে গেলেন। এক মিনিট পর ফিরে এসে বললেন, সাহায্য চাইছে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি। যেতে অনুরোধ করেছে। মানা করে দিয়েছি। এখন গিয়ে কোন লাভ নেই।…যাকগে, যেটা আলোচনা করছিলাম আমরা-ইথারের বিষক্রিয়ার প্রথম লক্ষণ মানসিক উত্তেজনা। উত্তেজনার পর ক্লান্তি। তারপর সংজ্ঞাহীনতা। এবং সবশেষে মৃত্যু।

বির্ষের ক্রিয়া পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর মধ্যে শুরু হয়ে গেছে কয়েক ঘণ্টা আগেই, তুঙ্গে উঠবে আরও কয়েক ঘণ্টা পর। কম উন্নত জাতের ললাকেরা আক্রান্ত হয়েছে সবার আগে। শোচনীয় খবর এসেছে আফ্রিকার কোন কোন অঞ্চল থেকে। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা সব প্রায় নিশ্চিহ্ন। বোঝা যাচেছ, উত্তর গোলার্ধের চেয়ে দক্ষিণের মানুষের প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। এই দেখুন, একটা টেলিগ্রাম হাতে তুলে নিলেন চ্যালেঞ্জার। এটা এসেছে মার্সেই থেকে। সকাল পৌনে দশটায়…পড়েই শোনাচ্ছি, দেশ জুড়ে উন্মত্ত উত্তেজনা। নিসের আঙুর খেতে চাষীরা ক্ষিপ্ত। টুলোনে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। আজ সকাল থেকে মাথা ঘুরে পড়ে যেতে আরম্ভ করেছে ওখানকার মানুষ। তারপর আর উঠছে না। রাস্তাঘাটে মানুষের লাশ। কাজকর্ম বন্ধ, সব জায়গায় হট্টগোল। ঠিক এক ঘণ্টা পর আরেকটা টেলিগ্রাম এসেছে ওখান থেকেই-সারা দেশ ধ্বংসের মুখোমুখি। গির্জাতে তিলধারণের জায়গা নেই।…একই রকমের টেলিগ্রাম এসেছে প্যারিস, থেকে। ফ্রান্স প্রায় জনশূন্য। অস্ট্রিয়ার পাভোনিকরা সব শেষ। সমভূমি আর সাগরতীরের অধিবাসীরা দ্রুত আক্রান্ত হচ্ছে। উঁচু অঞ্চলের ওপর তেমন মারাত্মক প্রতিত্রি?য়া এখনও হয়নি। আমরা পাহাড়ে রয়েছি। আঘাত আসবে আমাদের ওপরও জানা কথা, তবে কিছুটা দেরিতে। বড় জোর কয়েক ঘণ্টা সময় পাব আর।

হাতের উলটো পিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছলেন লর্ড জন। এত কিছু জানার পরও এমন নিশ্চিন্তে টেবিলে বসে পা দোলাচ্ছেন! আশ্চর্য লোক আপনি, প্রফেসর! ভয় পাচ্ছেন না?

না, বরং হাসি পাচ্ছে আমার, চ্যালেঞ্জার বললেন। বুঝতে পারছি, এটাও অস্বাভাবিক। ইথারের বিষের জন্যেই হচ্ছে এ রকম। ভোতা করে দিয়েছে ভয়ের অনুভূতিগুলো।

তাহলে আমাদের দিচ্ছে না কেন?

একেকজনের স্নায়র জোর একেক রকম। বিষের ক্রিয়াও সম্ভবত মায়র সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ওর ভয়ফয় বাদ দিন। ভয় পেয়ে কোন লাভ নেই। তারচেয়ে যেটা করা দরকার সেটাই করি চলুন। খেয়ে নিই। আমার স্টোরে আঠারশো ছিয়ানব্বই সালের মদ আছে। বোতলটা ভোলার এটাই উপযুক্ত সময়। টেবিল থেকে নামলেন প্রফেসর। হাসি হাসি মুখ। মৃত্যু নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই। আসুন।

দেরি করলে খাওয়ার শেষ আনন্দ থেকে বঞ্চিত হব।

দেহটা ঝিমঝিম করছে আমার, কিন্তু খেলাম প্রচুর। সামনে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও যে মানুষ এভাবে খেতে পারে, নিজেরা না খেলে সেটা বিশ্বাস করতে পারতাম না। ভবিষ্যৎ ভাগ্যের হাতে। কিন্তু বর্তমান তো আমাদের। এর প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করলাম। খাবার টেবিলে মাতিয়ে রাখলেন চ্যালেঞ্জার। সামারলিকে বার বার খোঁচা দিয়ে কথা বলতে লাগলেন। টিংটিঙে প্রফেসরও কম যান না। সমান তেজে জবাব দিতে লাগলেন।

অবাক লাগল মিসেস চ্যালেঞ্জারের ভাবভঙ্গি দেখে। একেবারে নির্বিকার। স্বামীর চেয়ে যেন তার স্নায়ুর জোর আরও অনেক বেশি।

খাওয়া শেষ হলো। হাতে-পায়ে এক ধরনের বিচিত্র সুড়সুড়ি অনুভব করছি। কাত হয়ে টেবিলে কনুইয়ে ভর দিয়ে বসলেন লর্ড জন। সোজা থাকার শক্তি পাচ্ছেন না যেন। নেতিয়ে পড়লেন সামারলি।

ধীরে ধীরে জাল গুটিয়ে আনছে অত মৃত্যু। অবসাদ বাড়ছে।

টেবিলে সিগারেটের প্যাকেট এনে রাখল অস্টিন। চলে যাচ্ছিল, ডাকলেন চ্যালেঞ্জার, অস্টিন?

স্যার, ঘুরে দাঁড়াল সে।

তোমার সেবাযত্নের কথা মনে থাকবে।

অস্টিনের মুখের কুঁচকানো চামড়ায় হালকা হাসির আভাস খেলে গেল। ইয়েস, স্যার।

পৃথিবীর প্রাণীকুল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, জানো তো?

কটার সময়, স্যার?

ঠিক সময় বলা কঠিন। তবে সাঁঝের মধ্যে।

আচ্ছা।

তুমি এখন যাচ্ছ কোথায়?

গাড়ি ধুতে।

এই আরেকজনকে দেখলাম, নির্বিকার। পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী মরে সাফ হয়ে যাবে, তাতেও তার কোন মাথাব্যথা নেই। কাজটাই আসল কথা। চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে যারা ঘনিষ্ঠভাবে দীর্ঘদিন বাস করে তারা বুঝি এমন নির্বিকারই হয়ে যায়।

আর ধুয়ে কি হবে? চ্যালেঞ্জার বললেন। ওটাতে চড়ার আর প্রয়োজন হবে না কোনদিন।

বসে থেকে কি করব? কাজ করিগে। মৃত্যু যখন আসে, আসবে। গাড়িটা থোয়া শেষ করেই চলে এসো বেগম সাহেবার মেকাপ রূমে। জলদি জলদি। আমরা সবাই থাকব সেখানে। দেরি করলে হয়তো আর আসার সময়ই পাবে না। এতদিন একসঙ্গে একবাড়িতে থেকেছ, মৃত্যুটা একসঙ্গেই হোক। নাকি, আপত্তি আছে?

না, স্যার। আপনি যা বলবেন তাই হবে। চলে আসব। সেলাম দিয়ে। বেরিয়ে গেল অস্টিন।

সিগারেট ধরালেন চ্যালেঞ্জার। বাঁ হাত রাখলেন স্ত্রীর হাতে। ভয় করছে।

না। যন্ত্রণা হবে?

না।

তাহলে আর ভয় কি?

ভয় নেই।

বাঁচার কি কোন উপায় নেই? লর্ড জন করেছেন, প্রফেসর সামারলি করেছেন, একই প্রশ্ন আবার করলাম আমি।

মরতে ইচ্ছে করছে না, তাই না? হাসলেন চ্যালেঞ্জার। পৃথিবীটা এমনই এক জায়গা, যেখান থেকে যেতে চায় না কেউ। না, ম্যালোন, বাঁচার সত্যি কোন উপায় নেই। থাকলে কি আর ব্যবস্থা না করে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতাম? সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন, তবে বাড়তি কয়েক ঘণ্টা প্রাণটাকে ধরে রাখার উপায় একটা আছে। তাতে লাভ কিছু হবে না তেমন, শেষ পর্যন্ত বাচব না, তবে অন্যদের মৃত্যু দেখে যেতে পারব। কিভাবে মহাবিষের খপ্পরে পড়ে শেষ হয়ে গেল পৃথিবী, জেনে যেতে পারব…

অক্সিজেন কি সেজন্যেই আনতে বলেছেন? জানতে চাইলেন সামারলি।

হ্যাঁ।

কিন্তু সরাসরি অক্সিজেন নাকে টেনে নেয়া তো বিপজ্জনক।

সরাসরি নেব কে বলল আপনাকে?

তাহলে কিভাবে?

বদ্ধ ঘরে ছেড়ে দেব অক্সিজেন। ঘরের বাতাস বিষাক্ত হওয়ার আগেই তাতে ঢুকে বসে থাকব সবাই। আমার স্ত্রীর মেকাপ রূমটা কাজে লাগিয়েছি। দরজাজানালার ফাঁকফোকর সব এমনভাবে বন্ধ করে দিয়েছি যাতে বাতাস ঢুকতেও না পারে, বেরে তও না পারে।

কুঁচকে গছে সামারলির কপালের চামড়া। কি দিয়ে করেছেন?

মোম আর ভার্নিশ পেপার দিয়ে।

মাথা নাড়তে নাড়তে সামারলি বললেন, বাতাস আর ইথার এক জিনিস নয়, প্রফেসর চ্যালেঞ্জার, সেটা আপনার চেয়ে ভাল কেউ জানে না। ঘরের বাতাস আটকানো গেলেও ইথার আটকাতে পারবেন না…।

জানি, পারব না। তবে এটাও জানি, বিষাক্ত ইথারেও অক্সিজেনের পরিমাণ বেশি থাকলে বিষের ক্রিয়া কমে যাবে। তাতে বেঁচে গেলেও যেতে পারি। ইতিমধ্যেই একটা পরীক্ষা আমি করে দেখেছি। বদ্ধ ঘরে বিষাক্ত গ্যাস ছেড়ে দিয়ে তার মধ্যে অতিরিক্ত অক্সিজেন মিশিয়ে দিয়েছি। বসে থেকেছি তার মধ্যে। দম নিতে কষ্ট হয়েছে কিছুটা, কিন্তু মরিনি। এমনকি অজ্ঞানও হইনি। এই পরীক্ষায় সফল হওয়ার পর পরই আপনাদের সিলিন্ডার নিয়ে আসতে টেলিগ্রাম করেছি। আমার স্টকে ছিল দুটো, আপনারা এনেছেন তিনটা। এই পাঁচটা দিয়ে যতক্ষণ টিকতে পারি, টিকব…

কতক্ষণ পারব?

জানি না। নিতান্ত দরকার না পড়লে ব্যবহার করব না। কয়েক ঘণ্টা টিকতে পারি, কিংবা কয়েক দিন।…যা হয় হবে, চেয়ারটা পেছনে ঠেলে সরিয়ে উঠে দাঁড়ালেন চ্যালেঞ্জার। চলুন, আমাদের জায়গায় গিয়ে ঢুকে পড়ি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *