০২. খাওয়ার সময় হয়ে গেছে

খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। রদারউডের জমিদার স্যাক্সন সেড্রিক বসে আছেন তার বাবার ঘরে।

সেড্রিক মানুষটা মাঝারি উচ্চতার। চওড়া দৃঢ় কাঁধ, দেখলেই বোঝা যায় অপরিমেয় শক্তি ধরেন এ কাঁধের মালিক। দীর্ঘ, পরিপাটি চুলগুলো ঝুলে পড়েছে ঘাড়ের নিচে। মুখটায় অদ্ভুত এক সারল্য। প্রথম দর্শনেই মনে হয়, ঘোরপ্যাচ নেই এ লোকের অভাবে। যা করার সোজাসুজি করেন। ফারের কিনারা দেওয়া সবুজ একটা কোট পরে আছেন তিনি। দুহাতে সোনার বাজু, গলায় সোনার চাকতি।

কয়েক জন ভৃত্য দাঁড়িয়ে আছে পাশে, প্রভুর আদেশের অপেক্ষায়। আরো কয়েক জন দাঁড়িয়ে একটু দূরে, দরজার কাছে। এক পাল কুকুর বসে আছে আগুনের সামনে। সেড্রিকের সবচেয়ে প্রিয়, বিশ্বস্ত উলফ-হাউন্ড বলডার বসে আছে তার পায়ের কাছে। যেন ভৃত্যদের মতো সে-ও অপেক্ষা করছে প্রভুর আদেশের।

সেড্রিকের খাবার ঘরটা বিরাট। যেমন লম্বায় তেমনি চওড়ায়। অনেক মানুষ এক সাথে বসে খেতে পারে। দুখানা খাবার টেবিল এ ঘরে। একটা বেশ বড়, ঘরের প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে আছে। সাধারণ এক কাঠের তৈরি। উপরে কোনো ঢাকনা নেই। রদারউডের সাধারণ বাসিন্দারা এটায় খাওয়া দাওয়া করে। অন্য টেবিলটা ছোট, বড়টার চেয়ে সামান্য উঁচু। দামী কাঠের তৈরি। দেখতেও সুন্দর। অন্যটার চেয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। রঙিন একটা ঢাকনি পাতা সেটার ওপর। এক প্রান্তে দুটো চেয়ার, অন্য চেয়ারগুলোর চেয়ে একটু উঁচু। সেড্রিক আর রোয়েনা ছাড়া আর কারো বসার অনুমতি নেই ও দুটোয়। বিশিষ্ট অতিথি অভ্যাগত এলে এই টেবিলেই তাদের খেতে দেয়া হয়।

বদমেজাজী সেল্লিকের মেজাজটা মোটেই ভালো নেই। সারা সন্ধ্যা একা একা কাটিয়েছেন।

দূরের এক গির্জায় গিয়েছিলো রোয়েনা। মাত্র কয়েক মিনিট আগে ফিরেছে ভিজতে ভিজতে। গার্থ এখনও ফেরেনি শুয়োরের পাল নিয়ে। কোথায় যেতে পারে ও? ভাবছেন সেড্রিক। নরম্যানরা কি শুয়োরের পালসুদ্ধ ধরে নিয়ে গেল ওকে? আর ওয়াম্বা? সে-ই বা কোথায়? ও থাকলেও না হয় দুচারটে মজার কথা শোনা যেতো। ওকেও কি ধরে নিয়ে গেছে নরম্যানরা? রাগের সাথে সাথে হঠাৎ এক অদ্ভুত দুঃখ মেশানো অনুভূতি হলো সেড্রিকের

আহ, আমার ছেলে, মনে মনে বললেন তিনি, তুই যদি এখন কাছে। থাকতি এই বুড়ো বয়সে আমাকে বন্ধুহীন একা একা দিন কাটাতে হতো না। দীর্ঘ একটা নিশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুকের গভীর থেকে।

বেশ খিদে পেয়েছে সেড্রিকের। খাবার সময়ও হয়েছে অনেকক্ষণ আগে। অথচ রোয়েনা না আসা পর্যন্ত খেতে বসতে পারছেন না। মেজাজ খারাপ হওয়ার এটাও একটা কারণ। একটু পরপরই বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন কোনো ভূতের দিকে। যেন রোয়েনার দেরি করে আসাটা তারই দোষ। মাঝে মাঝে বিড় বিড় করছেন, গির্জায় যাওয়ার আর দিন পেলো

হঠাৎ রোয়েনার খাস পরিচারিকা এলগিটাকে দরজার সামনে দিয়ে যেতে দেখলেন তিনি। অমনি হেঁড়ে গলায় চিৎকার: এত দেরি করছে কেন রোয়েনা, হ্যাঁ?

কাপড় বদলাচ্ছেন, বিনীত কণ্ঠে বললো এলগিটা। পুরোদস্তুর ভিজেছেন বৃষ্টিতে।…আর বোধহয় বেশিক্ষণ লাগবে না।

চলে গেল এলগিটা। এই সময় বাইরে থেকে বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে ভেসে এলো শিঙার আওয়াজ। ঘরে যতগুলো কুকুর ছিলো সব কটা এক সঙ্গে ঘেউ ঘেউ করে উঠলো। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো বলডার। সে-ও সমানে চিৎকার করছে।

এক ভৃত্যের দিকে তাকিয়ে সেড্রিক আদেশ করলেন, যাও তো, কে এলো দেখে এসো।

কয়েক মিনিটের ভেতর ফিরে এলো ভৃত্য।

জরভক্স মঠের প্রায়োর অ্যায়মার আর নাইট টেম্পলার ব্রায়ান দ্য বোয়া-গিলবার্ট এসেছেন, সে বললো। রাতের মতো খাদ্য ও আশ্রয় চাইছেন। পরশুদিন অ্যাশবিতে যে টুর্নামেন্ট (অস্ত্র চালনা প্রতিযোগিতা) হবে তাতে যোগ দেবার জন্যে যাচেছন অরা। হঠাৎ করে ঝড়-বাদল শুরু হয়ে যাওয়ায় এখানে আশ্রয় চাইছেন।

ফাদার অ্যায়মার! টেম্পলার ব্রায়ান! চিন্তিত মুখে ভাবলেন জমিদার, দুজনেই নরম্যান!–হোক নরম্যান তবু তো অতিথি। অতিথির জন্যে রদারউডের দুয়ার সবসময় ভোলা। ওরা এখানে থাকতে চায় ভাল কথা। আরও ভালো হতো যদি আরেকটু এগিয়ে গিয়ে অন্য কোথাও উঠতো। যাকগে তা যখন ওঠেনি–একটা রাতেরই তো ব্যাপার, নিশ্চয়ই কাল ভোরেই ওরা চলে যাবে, তাহলে আর চিন্তা কি? ভৃত্যের দিকে ফিরে হাঁক ছাড়লেন, যাও নিয়ে এসো ওদের। অতিথিদের ঘরে নিয়ে যাবে আগে। হাত-পা ধোঁয়ার পানি দেবে, যদি ভিজে গিয়ে থাকে শুকনো কাপড় দেবে। তারপর নিয়ে আসবে এখানে। সহিসকে বলবে ওদের ঘোড়াগুলোর যেন যত্ন নেয়।

ভূত্য ঘুরে দাঁড়াতেই তিনি আবার বললেন, ওদের বোলো, আমি নিজেই যেতাম। কিন্তু আমার একটা প্রতিজ্ঞা আছে, যে কারণে স্যাক্সন ছাড়া অন্য কাউকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্যে এই চেয়ার ছেড়ে তিন পায়ের বেশি আমি নড়তে পারি না। ওরা যেন কিছু মনে না করেন।

চলে গেল ভৃত্য। আবার চিন্তার সাগরে ডুব দিলেন সেড্রিক।

প্রায়োর অ্যায়মার, মদ মাংসের পাগল! আর ব্রায়ান দ্য বোয়া গিলবার্ট, ভালো মন্দ দুকারণেই বিখ্যাত তার নাম। দুর্ধর্ষ সৈনিক, তবে ভয়ানক অহঙ্কারী, নিষ্ঠুর আর বদ স্বভাবের। অতিথি ভেবে বাড়িতে তো জায়গা দিচ্ছি, তারপর কি হবে কে জানে?

অসওয়াল্ড! চিৎকার করে তাঁর প্রধান ভূত্যকে ডাকলেন সেড্রিক। তলকুঠুরিতে যাও। সবচেয়ে ভালো মদের পিপেটার মুখ ভোলো। আরেক ভৃত্যকে বললেন, তুমি যাও, এলগিটাকে পাঠিয়ে দাও।

এলগিটা এলো।

রোয়েনাকে বলে এসো, আজ আর ওর এখানে খেতে আসার দরকার নেই। অবশ্য ও যদি আসতে চায় সে আলাদা কথা।

উনি আসছেন, সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলো এলগিটা। কাপড় পরা শেষ, আর দুএক মিনিটের ভেতর এসে পড়বেন। প্যালেস্টাইনের খবরাখবর শোনার জন্যে খুবই আগ্রহী দেখলাম ওঁকে।

থাম, ছুঁড়ি! গর্জে উঠলো সেড্রিক। যা বললাম গিয়ে রোয়েনাকে বলে আয়। তারপর ও বুঝবে কি করবে না করবে।

মাথা নিচু করে চলে গেল এলগিটা।

প্যালেস্টাইন! আপন মনে বলতে লাগলেন সেড্রিক। আহ! কি ব্যাকুল হয়ে আছে আমার হৃদয় প্যালেস্টাইনের খবর জানার জন্যে! আমার ছেলে-! কিন্তু না, এ কি ভাবছি আমি! যে আমার অবাধ্য সে আমার ছেলে হতে পারে না। ওর খবর জানার জন্যে কেন আমি ব্যাকুল হবো? হাজার হাজার ক্রুসেডার রয়েছে প্যালেস্টাইনে, ওদের যা হবে ওর-ও তাই হবে। কেন আমি ওর কথা ভাবতে যাবো? না, আমি ওর কথা ভাববো না…

ধীরে ধীরে বুকের ওপর ঝুলে পড়লো স্যাক্সন সেড্রিকের মাথা। অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন তিনি। কপালে দেখা দিলে কুঞ্চন। এমন সময় দরজার বাইরে পদশব্দ পাওয়া গেল। ভৃত্যের সাথে ঘরে ঢুকলেন অতিথিরা।

.

ভেজা কাপড় ছেড়ে নতুন ঝকঝকে দামী কাপড় পরে এসেছেন প্রায়য়ার এবং নাইট। প্রায়োরের পরনে আলখাল্লা, কিনারাগুলো চমৎকার ফারে মোড়া। টেম্পলার পরেছে টকটকে লাল রেশমী টিউনিক। তার ওপরে শাদা লম্বা একটা আলখাল্লা। ডান কাঁধে কালো রঙে ক্রুশ আঁকা।

দুজনের পেছনে সেই তীর্থযাত্রী। তার গায়ে শাদামাঠা কালো জোব্বা, হাতে তীর্থযাত্রীদের লাঠি। নিঃশব্দে হেঁটে গিয়ে আগুনের সামনে একটা চেয়ারে বসলো সে।

উঠে দাঁড়ালেন সেড্রিক অতিথিদের স্বাগত জানানোর জন্যে। গুণে গুণে তিন পা এগোলেন চেয়ার থেকে। তারপর দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, দুঃখিত, আমি আর এগোতে পারবো না। কেন, নিশ্চয়ই আমার ভূতের মুখে শুনেছেন। আপনাদের সবাইকে স্বাগতম আমার রদারউডে। এক মুহূর্ত বিরতি নিয়ে জমিদার বললেন, আমি কিন্তু স্যাক্সন ভাষায় কথা বলবো আপনাদের সাথে, কিছু মনে করবেন না যেন। নরম্যান আমি একদম বলতে পারি না, বুঝিও না।

নীতিগত ভাবে আমি নরম্যান ছাড়া অন্য কোনো ভাষা বলার পক্ষপাতী নই, জবাব দিলো টেম্পলার। নরম্যান হলো রাজদরবারের ভাষা। তবে স্যাক্সনও আমি জানি। যখন সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলতে হয় তখন স্যাক্সন ভাষায়ই বলি।

তেলে বেগুন পড়লো যেন। দপ করে জ্বলে উঠলো সেড্রিকের চোখ দুটো। অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে সামলে নিলেন তিনি। রাগ গোপন করে বজ্রকণ্ঠে অতিথিদের বললেন, আপনারা বসুন দয়া করে।

বসলেন প্রায়োর অ্যায়মার। ব্রায়ান দ্য বোয়া-গিলবার্টও বসলো। টেবিলে খাবার পরিবেশন করার আদশে দিলেন সেড্রিক।

ব্যস্ত হয়ে উঠলো ভূত্যরা থালা, বাটি, গ্লাস, ডিশ, গামলা নিয়ে। মিনিট পেরোনোর আগেই টেবিল পূর্ণ হয়ে উঠলো নানারকম উপাদেয় খাবারে। জিভে পানি এসে গেল ধর্মযাজকের। একটু নড়ে চড়ে বসলেন তিনি।

এবার তাহলে শুরু করা যাক, ফাদার, স্যার নাইট, বললেন সেড্রিক।

ঠিক সেই সময় পাশের একটা দরজা স্কুল গেল। এক ভৃত্য চিৎকার করলো, লেডি রোয়েনা আসছেন!

সেড্রিক একটু অবাক হলেন, একটু বোধহয় বিরক্তও। তবু তাড়াতাড়ি উঠে দরজার কাছে গেলেন তিনি।

চারজন দাসীর সঙ্গে ঘরে ঢুকলো লেডি রোয়েনা। উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখালেন, অতিথিরা। সেড্রিক তার হাত ধরে নিয়ে এসে বসালেন নিজের ডান পাশের চেয়ারটায়। টেম্পলারের চোখ চক চক করছে।

এমন রূপসী আমি ভাবতেও পারিনি! বসতে বসতে প্রায়োরের কানে কানে ফিসফিস করলো সে। নাহ্, ফাদার বাজিতে আপনিই জিতবেন মনে হচ্ছে। আপনার কলারের সোনার কাঁটা পূরার সৌভাগ্য আমার হবে না।

আমি তো আগেই বলেছিলাম, একই রকম ফিসফিস করে বললেন অ্যায়মার। এখন দয়া করে একটু চুপ করুন, সেড্রিক আপনার দিকেই চেয়ে আছে।

সত্যিই অসাধারণ সুন্দরী রোয়েনা। অপরূপা শব্দটা বোধ হয় এমন নারীদের জন্যেই সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘাঙ্গিনী, অপূর্ব মুখশ্রী। সে যে হেঁটে এলো চেয়ার পর্যন্ত, সবার মনে হলো রানী আসছেন। দুধের মতো শাদা তার গায়ের রঙ। নীল চোখ দুটোয় মহামূল্য রত্নের উজ্জ্বলতা। সোনালি চুলগুলো ঈষৎ এলো হয়ে ছড়িয়ে আছে কাঁধের ওপর। সাগর রঙের একটা রেশমী পোশাক তার পরনে। হাঁটার সময় মনে হলো সাগরের মতোই ঢেউ উঠছে তাতে।

প্রায়োরের সতর্কবাণী সত্ত্বেও টেম্পলার দৃষ্টি ফেরাতে পারলো না রোয়েনার অনিদ্যসুন্দর মুখ থেকে।

ব্যাপারটা খেয়াল করলো রোয়েনা। সামান্য গোলাপী হলো তার গাল। আস্তে করে মুখের ওপর টেনে দিলো মস্তকাবরণের এক প্রান্ত। রোয়েনার ভাবান্তর দৃষ্টি এড়ালো না সেড্রিকের।

স্যার ব্রায়ান, একটু রূঢ় কণ্ঠেই তিনি বললেন, আমাদের স্যাক্সন তরুণীদের গাল সূর্যের আলোও সইতে পারে না, আপনার মতো যোদ্ধার অগ্নিদৃষ্টি কি করে সইবে?

লজ্জা পেলো টেম্পলার। মাথা নুইয়ে আরেকবার সম্মান জানালো রোয়েনাকে। বললো, যদি আপনাকে দুঃখ দিয়ে থাকি, দিয়েছি অনিচ্ছায়। আমাকে ক্ষমা করবেন। সেড্রিকের দিকে তাকালেন তিনি। আপনার কাছেও আমি ক্ষমা চাইছি। এমন অশোভন আচরণ আর কখনো হবে না আমার দিক থেকে।

মুখ ঢেকে ফেলে আমাদের সবাইকেই শাস্তি দিয়েছেন লেডি রোয়েনা, অ্যায়মার বললেন, যদিও দোষ করেছে মাত্র একজন। আশা করি পরশু টুর্নামেন্টের সময় এতটা নির্দয় উনি হবেন না।

টুর্নামেন্টে আমরা যাবো কিনা এখনও বলতে পারছি না, জবাব দিলেন সেড্রিক। আপনাদের এই সব টুর্নামেন্ট আমার একদম ভালো লাগে না। ইংল্যান্ড যখন স্বাধীন ছিল, আমাদের সেই পূর্বপুরুষদের আমলে এর চেয়ে কত ভালো ভালো খেলা ধুলা প্রচলিত ছিলো!

সেড্রিকের কথায় কোনো গুরুত্বই দিলেন না প্রায়োর।

তবু আমরা আশা করবো আপনারা যাবেন, বললেন তিনি। অবশ্য আজকাল যা অবস্থা হয়েছে–ভদ্রমহিলাদের নিয়ে পথ চলাই দায়। তবে আমরা, বিশেষ করে স্যার ব্রায়ান সাথে থাকলে ভয়ের কোনো কারণ আছে বলে মনে হয় না।

স্যার প্রায়োর, শান্ত শীতল কণ্ঠে বললেন সেড্রিক, আমার নিজের তলোয়ার আর আমার বিশ্বস্ত অনুচররাই আমার নিরাপত্তার জন্যে যথেষ্ট। আমরা যদি টুর্নামেন্টে যাই-ও, যাবো আমার বন্ধু অ্যাথেলস্টেনের সাথে। আপনাদের সাহায্য দরকার হবে না। সাহায্য করতে চেয়েছেন বলে ধন্যবাদ। ফাদার অ্যায়মার, আসুন, আপনার সুস্বাস্থ্য কামনা করে পান। করি।

আমি পান করবো লেডি রোয়েনার নামে, ভরা গ্লাস তুলে নিতে নিতে বললো টেম্পলার। আড়চোখে সেড্রিকের দিকে তাকিয়ে যোগ করলো, তার চেয়ে যোগ্য আর কাউকে দেখছি না এখানে।

আপনার এই সৌজন্যের জন্যে শুধু ধন্যবাদ জানিয়েই যে নিষ্কৃতি দেবো তা ভাববেন না। এই প্রথম কথা বললো রোয়েনা। টেম্পলারের মনে হলো মিষ্টি মধুর ঘণ্টাধ্বনি হলো যেন ঘরের ভেতর। রোয়েনা বলে চললো, আল্লার কাছ থেকে আমরা প্যালেস্টাইনের সর্বশেষ খবরাখবর শুনতে চাই।

সিরিয়ার সুলতানের সঙ্গে নতুন করে সন্ধি হয়েছে, এছাড়া বলবার মত খবর তেমন কিছু নেই।

কখন যে গাৰ্থ আর ওয়াম্বা এসে দাঁড়িয়েছে ঘরের ভেতর কেউ খেয়াল করেনি। টেম্পলারের জবাব শুনে ভড় বলে উঠলো, এইসব সন্ধির ফলে আর কিছু না হোক আমার বয়েস বেড়ে যাচ্ছে খামোকা।

আরে, ওয়াম্বা, তুই কখন এলি? সবিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন সেড্রিক। ওয়াম্বার পাশে গার্থকে দেখে স্বস্তি বোধ করলেন তিনি।

এই তো, স্যার, কিছুক্ষণ আগে, আপনারা কথা বলছিলেন তখন।

তা কি যেন বলছিলি তুই, বয়েস বেড়ে যাচ্ছে…

হ্যাঁ, স্যার, বিধর্মীদের সাথে এই সব সন্ধি করছেন রাজারা, আর আমার বয়েস বেড়ে যাচ্ছে।

ওর কথায় বিরক্ত না হয়ে মৃদু হাসলেন জমিদার। কি যা তা বলছিস?

যা-তা কেন হবে, স্যার? এর আগেও তিনবার সন্ধি হয়েছে। প্রত্যেক বার পঞ্চাশ বছরের জন্যে। সেই হিশেবে আমার বয়েস এখন কমপক্ষে দেড়শো।

ওয়াম্বাকে দেখেই চিনেছে টেম্পলার। অগ্নিদৃষ্টিতে একবার তার দিকে তাকিয়ে সে বললো, আমাদের যেমন ভুল পথ বলে দিয়েছিলে অন্য কোনো পথিকের সাথে অমন আর কোরো না। যদি করো, দেড়শো কেন, আর দেড় বছরও যেন তুমি বাঁচতে না পারে সে ব্যবস্থা আমি করবো।

মানে, স্যার ব্রায়ান ও আপনাদের ভুল পথ দেখিয়ে দিয়েছিলো নাকি? জিজ্ঞেস করলেন সেড্রিক।

ওকেই জিজ্ঞেস করে দেখুন।

মুখ কাঁচুমাচু করে দাঁড়িয়ে আছে ওয়া।

হতভাগা! বদমাশ! গর্জে উঠলেন সেড্রিক, পথচারীদের তুই ভুল ঠিকানা দিস! চাবকানো দরকার তোকে।

নিরুত্তর ওয়াম্বা। তেমনি মুখ কাঁচুমাচু করে দাঁড়িয়ে আছে এখনও।

শুধু বদমাশ নয়, তুই একটা হাঁদা, গর্দভ! আবার চেঁচালেন সেকি।

সে তো সবাই জানে, ভালোমানুষের মতো মুখ করে জবাব দিলো ওয়াম্বা। কিন্তু আমার চেয়েও যে হাঁদা দুনিয়ায় আছে তা জানেন? আমি তো শুধু ডান বায়ের ভুল করেছি। ডাইনে যেতে না বলে বাঁয়ে যেতে বলেছি; কি এমন বোকামি হলো তাতে? আমার মতো বোকার কাছে পথ জানতে চাওয়া আরো বেশি বোকামি না?

এমন ভঙ্গিতে কথাগুলো বললো ওয়াম্বা যে হেসে উঠলেন সবাই। নাইট টেম্পলার স্যার ব্রায়ান কেবল হাসলো না। কার ভাষায় কিছু একটা বলার জন্যে মুখ খুললো সে। এমন সময় অসওয়াল্ড এসে খবর দিলো, অচেনা এক লোক এসেছে। রাতের মতো আশ্রয় চাইছে।

মুখের কথা মুখেই রয়ে গেল টেম্পলারের।

যে-ই হোক, ঢুকতে দাও তাকে, আদেশ করলেন সেড্রিক।

চলে গেল অসওয়াল্ড। একটু পরেই ফিরে এসে মনিবের কানে কানে ফিসফিস করে বললো, লোকটা ইহুদী, স্যার। নাম আইজাক। ইয়র্কের লোক। এখানেই নিয়ে আসবো ওকে?

নিশ্চয়ই, বললেন সেড্রিক।

একটু ইতস্তত করে অবশেষে অসওয়াল্ড বলেই ফেললো, ওকে নিয়ে আসার জন্যে আমাকেই যেতে হবে, স্যার?

কি দরকার? গার্থের ওপর চাপাও, সেড্রিক জবাব দেয়ার আগেই বলে উঠলো ওয়াম্বা। একজন ইহুদীকে স্বাগত জানানোর জন্যে শুয়োর-চরানো রাখালই যথেষ্ট।

এতক্ষণে উপস্থিত অন্যরা বুঝতে পারলেন কি নিয়ে কানে কানে কথা বলছিলো অসওয়াল্ড।

হায় মা মেরি! আর্তনাদের মতো শোনালো প্রায়োরের গলা, একজন অবিশ্বাসী ইহুদীকে আমাদের পাশে বসানো হবে।

প্রভু যীশুর সমাধিভূমি উদ্ধারের জন্যে যে যুদ্ধ করছে তার সামনে আসতে দেয়া হবে একজন ইহুদী কুকুরকে? ক্রোধ সেই সাথে হতাশা মেশানো টেম্পলার ব্রায়ানের কণ্ঠস্বর।

নাইট টেম্পলাররা দেখছি ইহুদীদের গায়ের বাতাসও সইতে পারেন, ব্যঙ্গের সুরে মন্তব্য করলো ওয়াম্বা, অথচ ওদের বাসস্থান কেড়ে নিতে তাদের আপত্তি নেই।

এতক্ষণ চুপ করে শুনছিলেন সেড্রিক। বিতর্কের অবসান করার উদ্দেশ্যেই যেন তিনি বললেন, মাননীয় অতিথিবৃন্দ! আপনাদের অবগতির জন্যে জানাচ্ছি, আপনাদের ভালো লাগুক আর নাই লাগুক, আমার দরজা থেকে কেউ হতাশ হয়ে ফিরে যেতে পারবে না। ইচ্ছা না হলে আপনারা ওর সাথে কথা বলবেন না, বা এক টেবিলে খাবেন না। অসওয়াল্ডের দিকে ফিরলেন তিনি, যাও ওকে নিয়ে এসো। এর পর অন্য এক ভৃত্যের দিকে তাকিয়ে যোগ করলেন, ইহুদী লোকটার জন্যে আলাদা টেবিলের ব্যবস্থা করো।

.

লম্বা, দীর্ঘদেহী এক বৃদ্ধ ঢুকলেন সেড্রিকের খাবার কামরায়। সামান্য ঝুঁকে হাঁটছেন তিনি। বয়েসের ভারে নুয়ে পড়েছেন যেন। পরনে শাদাসিধে কালো আলখাল্লা। পায়ে থ্যাবড়া জুতো। কোমরে মোটা কাপড়ের ফিতে, তার এক দিকে একটা ছুরি ঝোলানো, অন্য দিকে ছোট একটা চামড়ার বাক্সে লেখার সাজসরঞ্জাম। মাথায় হলদে রঙের অদ্ভুতদর্শন এক টুপি, ইহুদী সম্প্রদায়ের লোকেরাই কেবল এ ধরনের টুপি পরে।

সেড্রিক এবং ঘরের অন্যদের দিকে তাকিয়ে মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানালেন বৃদ্ধ। তারপর দাঁড়িয়ে রইলেন চুপচাপ, কি করবেন কিছু বুঝতে পারছেন না। তার অভিবাদনের জবাব দেয়নি কেউ, কেউ তাকায়নি পর্যন্ত তার দিকে। অবশেষে সেড্রিক সামান্য মাথা নেড়ে চাকরবাঁকরদের টেবিলটা দেখিয়ে বসতে ইশারা করলেন তাঁকে।

ধীর পায়ে এগোলেন বৃদ্ধ নিচু টেবিলটার দিকে। আগুনের পাশের চেয়ারটা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো তীর্থযাত্রী। অদ্ভুত এক মায়া অনুভব করছে সে বৃদ্ধের জন্যে। নিজের শূন্য চেয়ারটা দেখিয়ে বললো, আপনি এখানে। বসুন। আমার খাওয়া শেষ, কাপড়ও শুকিয়ে গেছে।

ঘরের সব কটা চোখ এক সাথে ঘুরে তাকালো তীর্থযাত্রীর দিকে। আর বৃদ্ধ ইহুদী অসহায় দৃষ্টিতে তাকালেন সেড্রিকের দিকে। বুঝতে পারছেন না তরুণ তীর্থযাত্রীর আহ্বানে সাড়া দেয়া উচিত হবে কিনা।

কই এখানে এসে বসুন, আবার বললো তীর্থযাত্রী।

ভয়ে ভয়ে এগোলেন বৃদ্ধ চেয়ারটার দিকে। তীর্থযাত্রী আগুনে কয়েকটা কাঠ গুঁজে দিয়ে টেবিল থেকে কিছু খাবার নিয়ে দিলো তাকে। তারপর দ্রুত গিয়ে বসে পড়লো ঘরের অন্য প্রান্তে একটা নিচু চেয়ারে। তাকে ধন্যবাদ জানানোর সুযোগটুকুও পেলেন না বৃদ্ধ আইজাক।

ধীরে ধীরে ঘরের আবহাওয়া স্বাভাবিক হয়ে এলো আবার। একটা দুটো করে কথা ফুটতে লাগলো সবার মুখে। অবশেষে পানপাত্র তুলে নিলেন সেড্রিক।

স্যার ব্রায়ান, তিনি বললেন, আসুন, যে সব সাহসী নাইট প্যালেস্টাইনে জীবনপণ করে লড়ছে তাদের নামে এক পাত্র পান করি।

তাহলে আমি আমার স্বগোত্রীয়দের নামেই পান করবো, জবাব দিলো টেম্পলার, ওখানে যারা লড়ছে টেম্পলাররাই তাদের ভেতর সবচেয়ে সাহসী।

না, না, তা কেন, বললেন ধর্মযাজক অ্যায়মার, যে সব নাইট ওখানে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে আহত, অসুস্থ ক্রুসেডারদের সেবা করছে তাদের নামেও পান করা উচিত, বলতে বলতে তিনি তাঁর গেলাস তুলে নিলেন।

আমার কোনো আপত্তি নেই, মাঝখান থেকে ফোড়ন কাটলো ওয়াম্বা। গম্ভীর স্বরে বললো, তবু একটা কথা বলতে চাই, রাজা রিচার্ড যদি আমার মতো ভাঁড়ের পরামর্শ চাইতেন তাহলে বলতাম, দেশ থেকে নতুন নতুন নাইটদের না নিয়ে গিয়ে যে সব সাহসী বীরদের কারণে ওখানে আমরা হারছি তাদের ওপর যুদ্ধের ভার দিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত থাকলেই পারতেন।

এতক্ষণ চুপ করে শুনছিলো রোয়েনা। এবার সে কথা বললো সেই মিষ্টি মধুর স্বরে।

রাজা রিচার্ডের বাহিনীতে কি টেম্পলার আর হসপিট্যালার (আহত ও অসুস্থ সৈনিকদের সেবা শুশ্রুষায় নিয়োজিত ক্রুসেডার) ছাড়া আর কোনো বীর নেই যাদের কথা একটু বিশেষভাবে বলা যায়?

সত্যি কথা বলতে কি, না, মিলেডি, জবাব দিলো ব্রায়ান। প্রচুর। ইংরেজ নাইটকে প্যালেস্টাইনে নিয়ে গেছেন রিচার্ড। তারা সত্যি সত্যিই সাহসী, বীর এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবু, আমি বলতে বাধ্য, বীরত্বে তারা সবাই টেম্পলারদের নিচে।

মিথ্যে কথা! চিৎকার করে উঠলো তীর্থযাত্রী।

প্রত্যেকেই ঘাড় ফিরিয়ে তাকালেন তার দিকে।

মিথ্যে কথা, আবার বললো সে। রাজা রিচার্ডের নাইটরা বীরত্বে কারো চেয়ে নিচে নয়। বরং আমি বলবো উপরে। তারাই সবচেয়ে সাহসের পরিচয় দিয়েছে।

কি বলছো জেনে, বুঝে বলছো তো? শান্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করলো টেম্পলার।

নিশ্চয়ই। প্রমাণ চান? তাহলে বলছি শুনুন: অ্যাকর-এর প্রতিরোধ চূর্ণ করে ক্রুসেডাররা যখন শহরটা দখল করলো তারপর এক টুর্নামেন্টের আয়োজন করেছিলেন রিচার্ড। আমি নিজে তাতে উপস্থিত ছিলাম। রিচার্ড তার মাত্র পাঁচজন নাইটকে নিয়ে সেদিন যে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছিলেন। এক কথায় অতুলনীয়! যারাই সেদিন তাদের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় নেমেছিলো সবাইকে মুখে মাখতে হয়েছিলো পরাজয়ের কালি। পরাজিতদের ভেতর টেম্পলার ছিলেন মাত্র সাত জন। আমার চেয়ে স্যার ব্রায়ান আরো ভালো জানেন একথা, রোয়েনার দিকে তাকিয়ে শেষ করলো তীর্থযাত্রী।

অপমানে মুখ কালো হয়ে উঠেছে টেম্পলারের। ভয়ানক ক্রোধে তরবারি বের করতে গিয়েও সামলে নিলো। এই বেয়াদব তীর্থযাত্রীকে উপযুক্ত শাস্তি তিনি দেবেন, তবে এখানে না। এখানে তেমন কিছু করতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

তীর্থযাত্রীর কাছে স্বদেশবাসী নাইটদের বীরত্বের কথা শুনে ভীষণ খুশি হয়েছেন সেড্রিক।

তীর্থযাত্রী, মৃদু হেসে তিনি বললেন, রিচার্ডের পক্ষে যারা লড়েছিলেন তাদের নাম যদি বলতে পারো আমার হাতের এই সোনার বাজুবন্ধ তোমাকে পুরস্কার দেবো।

পুরস্কারের কোনো প্রয়োজন নেই, এমনিতেই আমি তাদের নাম বলবো। আমার একটা শপথ আছে তাতে বর্তমানে আমার সোনা স্পর্শ করা নিষেধ।

ওয়াম্বা আর চুপ করে থাকতে পারলো না। যদি অনুমতি দেন আপনার হয়ে আমিই না হয় পরবো বাজুবন্ধটা।

কেউ খুব একটা গুরুত্ব দিলো না তার কথায়।

প্রথমেই যার নাম করতে হয় তিনি সিংহ-হৃদয় রিচার্ড স্বয়ং, বললো তীর্থযাত্রী, তার পরে আসে লর্ড লেস্টারের নাম, তিন নম্বরে স্যার টমাস মুলটন-

উনি তো স্যাক্সন, তাই না? বাধা দিয়ে বললেন সেড্রিক।

হ্যাঁ, তারপর স্যার ফোক ডয়লে-।

উনিও তো স্যাক্সন!

পঞ্চম হচ্ছেন স্যার এডুইন টার্নহ্যাম।

আরে, উনিও তত খাঁটি স্যাক্সন! সবিস্ময়ে মন্তব্য করলেন সেড্রিক। তারপর, ছ নম্বরে কে?

একটু ইতস্তত করলো তীর্থযাত্রী। ষষ্ঠজন এক তরুণ নাইট। বিখ্যাত কেউ না, পদ মর্যাদায়ও নিচু। নামটা আমি ঠিক মনে করতে পারছি না।

আমি পারছি, চিৎকার করে উঠলো টেম্পলার। সবগুলো নাম বলার পর এখন যদি বলো ভুলে গেছি, কে বিশ্বাস করবে? তবু আমি বলছি, দেখ তোমার মনে পড়ে কি না। ছনম্বর নাইটের নাম ছিলো উইলফ্রিড অভ আইভানহো। হ্যাঁ, আপনাদের সবার সামনে বলছি, আমার বিরুদ্ধেই লড়েছিলো সে। কিন্তু সেদিন ভাগ্য আমার বিপক্ষে ছিলো। প্রথমবারেই আমার বর্শা ভেঙে যায়, ঘোড়াটাও হুমড়ি খেয়ে পড়ে মাটিতে। ফলে পরাজয় স্বীকার করে নেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না আমার। ও যদি এখন ইংল্যান্ডে থাকে, আর পরশুর টুর্নামেন্টে আসে, আমি তার সাথে আবার লড়বো। এবার কে জিতবে তা আমি জানি!

আইভানহো যদি ফিরে থাকে, তীর্থযাত্রী বললো, আমার মনে হয়, অন্তত একবার জয়লাভের চেষ্টা করার সুযোগ দেবে আপনাকে। আমি জামিন থাকছি।

তুমি যে জামিন থাকছে তার প্রমাণ কি? জিজ্ঞেস করলো স্যার ব্রায়ান।

ধীরে ধীরে পোশাকের ভেতর থেকে ছোট্ট একটা হাতীর দাঁতের বাক্স বের করলো তীর্থযাত্রী।

এই বাক্সটা আমি আমার জামিনের প্রমাণ হিশেবে জমা দিচ্ছি স্যার প্রায়ারের কাছে, বললো সে। প্রভু যীশুকে যে ক্রুশে বিদ্ধ করা হয়েছিলো তার ছোট্ট একটা টুকরো আছে এতে।

ব্রায়ান তাঁর গলা থেকে একটা সোনার হার খুলে ছুঁড়ে দিলো টেবিলের ওপর।

আমি যে আবার ওর সাথে লড়তে চেয়েছি তার প্রমাণ হিশেবে এই হারটা আমি জমা রাখছি প্রায়োরের কাছে, বললো সে। তারপর সরোষে যোগ করল, আইভানহো ইংল্যান্ডে ফিরেদি আমার সাথে না পড়ে তাহলে আমি ইউরোপের সমস্ত দেশে প্রচার করে দেবো, আইভানহো ভীতু কাপুরুষ।

তার বোধহয় প্রয়োজন পড়বে না, শান্ত কণ্ঠে বললো রোয়েনা। আইভানহো এখানে নেই, তবু ওর পক্ষ থেকে আমি বলছি, আইভানহো আপনাকে সুযোগ দেবে।

রোয়েনার কথা শুনে সেড্রিক প্রথমে বিস্মিত পরে বিরক্ত হলেন।

এসব বিষয়ে কথা বলা ঠিক হয়নি তোমার, রোয়েনা, বললেন তিনি। আমাদের পক্ষ থেকে কিছু যদি বলতেই হতো, আমি বলতে পারতাম। তুমি কেন?…যাক যা হওয়ার হয়েছে, এখন আর ও নিয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।

হ্যাঁ, রাত অনেক হয়েছে, বললেন প্রয়োর অ্যায়মার। আইভানহোর সাথে স্যার ব্রায়ানের লড়াইটা যতদিন না হচ্ছে এই পবিত্র হাতির দাঁতের বাক্স আর এই সোনার হারটা আমার মঠের কোষাগারে জমা থাকবে। এবার শুতে যাওয়ার আগে আসুন লেডি রোয়েনার স্বাস্থ্য কামনা করে সবাই একপাত্র পান করি।

সবাই যার যার গ্লাসে চুমুক দিলেন। পান শেষে অতিথিরা মাথা নুইয়ে সম্মান জানালেন গৃহকর্তাকে। রোয়েনা তার দাসীদের সাথে চলে গেল।

ঘর থেকে বেরোনোর সময় সোজা দরজার দিকে না গিয়ে সামান্য ঘুরে বুড়ো আইজাকের পাশে কয়েক সেকেন্ডের জন্যে দাঁড়ালো টেম্পলার।

কি, ইহুদীর বাচ্চা, টুর্নামেন্টে যাচ্ছো? নিচু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো সে।

প্রায় হাঁটু পর্যন্ত মাথা নুইয়ে বৃদ্ধ জবাব দিলো, জি।

নিশ্চয়ই প্রচুর টাকা এনেছে সাথে?

ভয়ার্ত চেহারা হলো আইজাকের।

না! না! কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি। একটা পেনিও নেই আমার কাছে। সত্যিই বলছি। আমার গায়ের কাপড়টা দেখছেন, এটা পর্যন্ত ধার করে আনা।

ক্রুর একটা হাসি খেলে গেল বোয়া-গিলবার্টের মুখে। আর কিছু না বলে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা আরব সহচরদের দিকে এগিয়ে গেল সে। ওদের ভাষায় কিছুক্ষণ কথা বললো ওদের সাথে। কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলো তীর্থযাত্রী। প্রতিটা কথা বুঝলো সে। কিন্তু অন্য কেউ একটা কথাও বুঝলো না, তীর্থযাত্রী যে বুঝেছে তা-ও টের পেলো না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *