০২. আহ, ছুটির কি আনন্দ

আহ, ছুটির কি আনন্দ! অনেক পেছনে ফেলে এসেছে স্কুল। অক্টোবরের রোদে উষ্ণ আমেজ। শরতের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে প্রকৃতি, গাছে গাছে হলুদ, লাল, সোনালি রঙের সমারোহ। রোদে যেন জ্বলছে। জোরে বাতাস লাগলে বোটা থেকে খসে, যাচ্ছে মরা পাতা, ঢেউয়ে নৌকা যেমন দোলে, তেমনি দুলতে দুলতে নামছে মাটিতে।

ছোট্ট যে গাঁয়ে বাস থেকে নেমেছিল ওরা, সেটা পেছনে ফেলে এল। খুব ভাল লাগছে হাঁটতে। আঁকাবাঁকা সরু পথে নেমেছে এখন। দু-ধারে পাতাবাহারের ঝাড় এত ঘন হয়ে জন্মেছে, আর এত উঁচু, ওপর দিয়ে দেখা যায় না ওপাশে কি আছে। মাথার ওপরে ডালপাতা দু-পাশ থেকে এসে গায়ে গায়ে লেগে চাদোয়া তৈরি করে দিয়েছে, তার ফাঁক-ফোকর দিয়ে চুইয়ে আসছে যেন আলো।

এ-তো দেখি একেবারে সুড়ঙ্গ, বলল মুসা। নাম কি জায়গাটার?

এটার নাম কি ঠিক বলতে পারছি না, বলল কিশোর। তবে এটা হরিণ পাহাড়ে চলে গেছে।

হরিণ পাহাড়? ভুরু কোঁচকাল রবিন। ডিয়ার হিল। বাংলা করলে হরিণ পাহাড়ই পঁড়ায়, নাকি?

হ্যাঁ, তা হয়, তার বাংলা শব্দের সীমিত ভাণ্ডার খুঁজল রবিন। শুনতেও ভাল লাগছে।

ঐখানের নামগুলোই সুন্দর। অন্ধ উপত্যকা, হরিণ পাহাড়, কুয়াশা হ্রদ, হলুদ দীঘি, ঘুঘুমারি…

ওফ, দারুণ তো! বলে উঠল জিনা। অরিজিনাল নামগুলো কি?

ব্লাইন্ড ভ্যালি, ডিয়ার হিল, মিসটি লেক, ইয়েলো পণ্ড, ডাভ ডেথ…

অপূর্ব! বলল রবিন। বাংলা ইংরেজি দুটোই।

বাংলাটাই থাক না তাহলে? দ্বিধা করছে কিশোর, যার যার মাতৃভাষা তার কাছে প্রিয়, বন্ধুরা আবার কি মনে করে। বাইরের কারও সঙ্গে বলার সময় লাগছেন করুক, ইংরেজিই বলতে হবে, আমরা নিজেরা নিজেরা…

আমি রাজি। আমার কাছে বাংলাই ভাল লাগছে, সঙ্গে সঙ্গে বলল মুসা। নিজের ভাষা কিছু কিছু জানি, কিন্তু সেটা না জানারই শামিল, বাংলার চেয়েও কম জানি। সেই কবে কোন কালে আফ্রিকা ছেড়ে চলে এসেছিল আমার দাদার দাদা…ভুল বললাম, চলে আসেনি, জোর করে ধরে আনা হয়েছিল, গোলাম করে রাখার জন্যে…শ্বেতাঙ্গরা…

আড়চোখে জিনার দিকে চেয়ে তাড়াতাড়ি হাত তুলল কিশোর, থাক থাক, পুরানো ইতিহাস ঘাটাঘাটির দরকার নেই, ঝগড়া লেগে যাবে এখন। ছুটির আনন্দই মাটি হবে। হ্যাঁ, যা বলছিলাম…

কথা বলতে বলতে এগোচ্ছে ওরা।

হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল রাফিয়ান। খরগোশের গন্ধ পেয়েছে।

আরিব্বাপরে! জিন অবাক। এত্তো খরগোশ! এই দিনের বেলায়? আমার গোবেল দ্বীপেও তো এত নেই।

হরিণ পাহাড়ে এসে উঠল ওরা। বসল, খরগোশ দেখার জন্যে। রাফিয়ানকে নিয়ে হয়েছে মুশকিল, কিছুঁতেই আটকে রাখা যাচ্ছে না। খরগোশের গন্ধে পাগল হয়ে গেছে যেন সে। এক ঝাড়া দিয়ে জিনার হাত থেকে বেল্ট ছুটিয়ে নিয়েই দিল দৌড়।

রাফি! রাফি! চেঁচিয়ে উঠল জিনা।

কিন্তু কে শোনে কার কথা? রাফিয়ানের কানেই ঢুকল না যেন ডাক, তার এক চিন্তা, খরগোশ ধরবে।

এত বোকা নয় খরগোশেরা যে চুপচাপ বসে থেকে কুকুরের খপ্পরে পড়বে। সুড়ুৎ করে ঢুকে গেল গর্তে। ভোজবাজির মত, এই ছিল এই নেই।

অনেক চেষ্টা করেও একটা খরগোশ ধরতে পারল না রাফিয়ান। তার কাণ্ড দেখে হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল মুসা আর জিনা।

অবশেষে হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে এল ব্যর্থ রাফিয়ান, জিভ আধহাত বেরিয়ে পড়েছে।

ভুল নাম রেখেছে, বলল রবিন। নাম রাখা উচিত ছিল আসলে খরগোশ পাহাড়। চলো, উঠি।

চূড়া পেরিয়ে পাহাড়ের উল্টোদিকের ঢাল ধরে নামতে শুরু করল ওরা। এদিকে খরগোশ যেন আরও বেশি। রাফিয়ান বোধহয় ভাবল, অন্যপাশের চেয়ে এপাশের ওরা বোকা, তাই আবার তাড়া করল।

সেই একই কাণ্ড। সুড়ুৎ।

রেগে গেল রাফিয়ান। গর্তে ঢোকা? দাঁড়াও, দেখাচ্ছি মজা। বড় একটা খরগোশকে বাইরে দেখে তাড়া করল। খরগোশটাও সেয়ানা। এঁকেবেঁকে এপাশে ওপাশে লাফিয়ে লাফিয়ে গিয়ে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল বড় একটা গর্তের ভেতর।

কোন রকম ভাবনাচিন্তা না করেই মাথা ঢুকিয়ে দিল রাফিয়ান, ঢুকে গেল গর্তে। তারপরই পড়ল বিপদে। আটকে গেল শরীর। না পারছে ঢুকতে, না বেরোতে। অসহায় ভাবে পেছনের পা ছুঁড়তে লাগল শুধু।

আরে! দৌড় দিল জিনা। এই রাফি, রাফি, বেরিয়ে আয়। আয় জলদি।

বেরোতে পারলে তো বাঁচে এখন রাফিয়ান, জিনার ডাকের কি আর অপেক্ষা করে? কিন্তু পারছে তো না। পেছনের পায়ের নখ দিয়ে আঁচড়ে ধুলোর ঝড় তুলেছে, বেরোনোর চেষ্টায়।

পুরো বিশ মিনিট লাগল রাফিয়ানকে বের করে আনতে। প্রথমেই গর্তে ঢোকার চেষ্টা করল মুসা। তার বিরাট শরীর ঢুকল না। কিশোর আর জিনাও ঢুকতে পারল না। রোগা-পটকা ক্ষীণ দেহ একমাত্র রবিনের, তাকেই মাথা ঢোকাতে হলো অবশেষে।

রাফিয়ানের পেছনের পা ধরে টানতে লাগল রবিন, তার অর্ধেক শরীর গুহার বাইরে, অর্ধেক ভেতরে। কুকুরটার কাঁধের পেছন দিক আটকে গেছে একটা মোটা শেকড়ে, টেনেও বের করা যাচ্ছে না। ব্যথায় গুঙিয়ে উঠল।

আহ, এত জোরে টেনো না, চেঁচিয়ে উঠল জিনা। ব্যথা পাচ্ছে তো।

জোরে টেনেও তো বের করতে পারছি না, গর্তের ভেতর থেকে চেঁচিয়ে জবাব দিল রবিন। জোর পাচ্ছি না। আমার পা ধরে টানো।

অনেক টানা-হেঁচড়ার পর বের করা গেল অবশেষে। বিধ্বস্ত চেহারা, কুঁইকুই করে গিয়ে জিনার পায়ের কাছে গড়িয়ে পড়ল রাফিয়ান। খুব ভয় পেয়েছে বেচারা।

সাংঘাতিক ব্যথা পেয়েছে কোথাও, কুকুরটার সারা গা টিপেটুপে দেখতে শুরু করল জিনা। চারটে পা-ই টেনে টেনে দেখল। ভাঙেনি। জখমও দেখা যাচ্ছে না। ব্যথা পেয়েছেই। নইলে এমন কো কো করত না। কিন্তু লাগল কোথায়?

ভয়ে অমন করছে, কিশোর বলল। জখম থাকলে তো দেখতামই। পা-ও ভাঙেনি।

কিন্তু নিশ্চিন্ত হতে পারল না জিনা। পশু ডাক্তারকে দেখালে হয় না?

এখানে পশু ডাক্তার পাবে কোথায়? খামোকা ভাবছ। রাফিয়ান ঠিকই আছে। চলো, হাঁটি।

ঘুঘুমারিও পেরিয়ে এল ওরা। আলাপ-আলোচনা আর হাসিঠাট্টা তেমন জমছে। গুম হয়ে আছে জিনা। বার বার তাকাচ্ছে পাশে রাফিয়ানের দিকে। কোন অসুবিধে হচ্ছে কিনা বোঝার চেষ্টা করছে।

ব্যথা পেয়েছে, এমন কোন ভাব দেখাচ্ছে না রাফিয়ান, ঠিকমতই হাঁটছে, মাঝে মাঝে গুঙিয়ে উঠছে শুধু।

এখানেই লাঞ্চ সারা যাক, কি বলো? আরেকটা পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল কিশোর।

হ্যাঁ, তা যায়, মাথা কাত করল মুসা। নাম কি এটার?

ম্যাপে কোন নাম নেই। তবে আমি রাখতে পারি..ঢালু পাহাড়? খুব মানাবে। দেখেছ, কেমন ঢালু হয়ে নেমে গেছে অনেক দূর… স্বপ্নিল হয়ে উঠেছে কিশোরের অপূর্ব সুন্দর দুই চোখ।

ভাল লাগার মতই দৃশ্য। মাইলের পর মাইল একটানা ছড়িয়ে রয়েছে বিশাল নিঃসঙ্গ প্রান্তর, ঘন সবুজ ঘাস চকচক করছে রোদে। তাতে চরছে লাজুক হরিণ আর উদ্দাম ছোট ছোট বুনো ঘোড়া। যেন পটে আঁকা ছবি।

বসে পড়ল ওরা ঘাসের গুচ্ছের নরম কার্পেটে।

অবারিত মাঠ গগন ললাট চুমে তব পদধূলি, ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি, দিগন্তের দিকে চেয়ে বিড়বিড় করল কিশোর, মন চলে গেছে তার হাজার হাজার মাইল দূরের আরেক স্বপ্নরাজ্যে, তার স্বপ্নের বাংলাদেশে। সেই দেশটাও কি এত সুন্দর, ভাবল সে, কবিতা পড়ে তো মনে হয় এর চেয়েও সুন্দর।

দেশটা সত্যি ভারি সুন্দর, কিশোরের মতই দূরে তাকিয়ে রয়েছে রবিন। এই সবুজ একদিন ঢেকে যাবে ধবধবে সাদা বরফে, তুষার ঝরবে পেঁজা তুলোর মত, আকাশের মুখ অন্ধকার, মেরু থেকে ধেয়ে আসবে হাড় কাঁপানো কনকনে ঠাণ্ডা…

ওদিকে স্যাণ্ডউইচগুলো তো কাঁদতে শুরু করেছে, খাচ্ছি না বলে, বেরসিকের মত বাধা দিল মুসা। কাব্যচর্চা রেখে আগে পেটচৰ্চা সেরে নাও। আরে এই জিনা, এত গভীর হয়ে আছো কেন? তোমার মুখ কালো দেখলে তো আমার বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে…

অন্য সময় হলে কথার-করাত চালাত জিনা, এখন শুধু মাথা নাড়ল। রাফি…

দূর, তুমি খামোকা ভাবছ। কিচ্ছু হয়নি। দেখো, একটু পরেই ঠিক হয়ে যাবে। পেটে বোধহয় খিদে দেখছ না আমার কেমন খারাপ লাগছে? ওরও বোধহয় তেমনি…

মুসার কথায় হেসে ফেলল জিনা। অন্যদের মুখেও হাসি ফুটল।

 

হুঁ, সমঝদারের ভঙ্গিতে মাথা দোলাল মুসা, দারুণ হয়েছে। ডিকের মায়ের হাতে যাদু আছে। নে, রাফি, এই কাবাবটা চেখে দেখ।

কাবাব চিবাতে চিবাতে আস্তে মাথা নাড়ল রাফিয়ান, গোঁ করে উঠল। ব্যথায়,

কেন, সে-ই জানে। কিন্তু এটাকেই সম্মতি ধরে নিয়ে মুসা হাসল, কি, বলেছি না ভাল?

সবার চেয়ে অনেক বেশিই খেলো রাফিয়ান, তবে চুপচাপ রয়েছে। এই ব্যাপারটাই ভাল লাগছে না জিনার।

একেক জনের ভাগে তিনটে করে স্যাণ্ডউইচ বাঁচল। আর অর্ধেক টুকরো করে কেক। বাকি সব সাবাড় করে ফেলেছে।

ডিকের চেয়ে কম কি আমরা? ভুরু নাচাল মুসা। ও ছ-টা খায়, আমরা পাঁচটা…

তুমি সাতটা খেয়েছ, শুধরে দিল রবিন। নিজেদেরগুলো সেরেও আমাদের ভাগ থেকে মেরেছ তুমি আর রাফি…

ঘউ, করে স্বীকার করল যেন রাফিয়ান। কেকের টুকরোর দিকে চেয়ে লেজ নাড়ছে। জিভে লালা। তাকে কেক দেয়া হয়নি।

বলেছিলাম না, খেলেই ভাল হয়ে যাবে রাক্ষসটা, হেসে বলল মুসা। নে খা, তুই আমার কাছ থেকেই নে… খানিকটা কেক ভেঙে কুকুরটার মুখের কাছে ফেলল।

এক চিবান দিয়েই কোত করে গিলে ফেলল রাফিয়ান। করুণ চোখে তাকাল মুসার হাতের বাকি কেকটুকুর দিকে।

তাড়াতাড়ি সরিয়ে নিল মুসা। না বাবা, আর দিচ্ছি না। রাতে খেতে হবে আমার। তুমি বাপু যত পাও ততই চাও…

হাসল সবাই। কেটে গেল নিরানন্দ ভাবটা।

চলো, ওঠা যাক, বলল কিশোর। পাঁচটার আগেই ফার্মটায় পৌঁছতে হবে। এখানে আবার তাড়াতাড়ি রাত নামে।

কোন ফার্ম? জানতে চাইল রবিন।

হলুদ দীঘি।

যদি থাকার জায়গা না থাকে?

জিনাকে একটা ঘর দিতে পারলেই হলো। আমরা গোলাঘরে খড়ের গাদায়ই ঘুমোতে পারব।

কেন, আমি পারব না কেন? গলা লম্বা করে ঝাঁকি দিল জিনা।

কারণ, তুমি মেয়ে। ছেলের পোশাক পরে আছে বটে, কিন্তু মেয়ে তো।

দেখো, মেয়ে মেয়ে করবে না। মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে কম কিসে?

তাহলে ছেলে সেজে থাকো কেন? ফস করে বলে বসল মুসা।

থাকি, থাকি, আমার খুশি,রেগে উঠল জিনা। তোমার কি?

এই তো রেগে গেল, বিরক্ত হয়ে উঠল কিশোর। তোমাদের জ্বালায় বাপু শান্তিতে পরামর্শ করারও জো নেই। জিনা, খামাকো জেদ করছ। তুমি মেয়ে, কিছু অসুবিধে তোমার আছে, ছেলেদের যা নেই। এটা কি অস্বীকার করতে পারবে?

চুপ করে রইল জিনা। মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। তবে আর তর্ক করল না। আরেক দিকে মুখ ফিরিয়ে রাখল।

মালপত্রের বোঝা পিঠে তুলে নিয়ে আবার রওনা হলো ওরা। রাফিয়ান শান্ত। লাফঝাপ সব যেন ভুলে গেছে, জোরে হাঁটার চেষ্টাও করছে না। পা ফেলছে অতি সাবধানে, মেপে মেপে।

ব্যাপারটা জিনার চোখ এড়াল না। কি হয়েছে রাফি? খারাপ লাগছে?

জবাবে শুধু কাঁউ করল কুকুটা।

আরও খানিক দূর যাওয়ার পর খোড়াতে শুরু করল রাফিয়ান। পেছনের বাঁ পা ঠিকমত ফেলতে পারছে না।

থামল সবাই।

বসে পড়ে পা-টা ভালমত দেখল জিনা। মনে হয় মচকেছে, রাফিয়ানের পিঠে হাত বোলাল সে।

মৃদু গাউক করে উঠল রাফিয়ান।

যেখানে হাত লাগলে ব্যথা পায় কুকুরটা, সে জায়গার নোম সরিয়ে দেখল জিনা। আরে, যখম! রঞ্জু জমেছে, ফুলেছেও। ওইটানাটানির সময়ই লেগেছিল।

দেখি তো, বসে পড়ে কিশোরও দেখল। না, বেশি না। সামান্য। রাতে ঘুমোলেই সেরে যাবে।

কিন্তু শিওর হওয়া দরকার, খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে জিনাকে। কিশোর, গ্রাম আর কদ্দূর?

এই সামনেই। র‍্যাংকিন ভিলেজ। গায়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করব, পশু ডাক্তার কোথায় পাওয়া যাবে।

জলদি চলো। ইস, কেন যে এত বড় হলো কুকুরটা, নইলে কোলে করেই নিতে পারতাম। হাঁটতেই পারছে না বেচারা।

যা পারে হাঁটুক এখন, বলল মুসা। একেবারে না পারলে তো বয়ে নিতেই হবে। সে তখন দেখা যাবে।

খুব আস্তে আস্তে হাঁটছে রাফিয়ান। বেশি খোড়াচ্ছে। শেষে আর পা-ই ফেলতে পারল না। মচকানো পা-টা তুলে তিন পায়ে লাফিয়ে এগোল।

ইস, কি কষ্ট বেচারারকেঁদে ফেলবে যেন জিনা।

র‍্যাংকিন ভিলেজে এসে ঢুকল বিষণ্ণ দলটা। গাঁয়ের ঠিক মাঝখানে একটা সরাইখানা, নাম র‍্যাংকিন রেস্ট।

ঝাড়ন দিয়ে জানালার কাচের ধুলো ঝাড়ছে এক মহিলা।

কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল কিশোর, ম্যাডাম। কাছাকাছি পশু ডাক্তার কোথায় আছে?

রাফিয়ানের দিকে তাকাল মহিলা। কাছাকাছি বলতে তো ছ-মাইল দূরে, ডারবিনে।

শুকিয়ে, এতটুকু হয়ে গেল জিনার মুখ। ছয় মাইল! কিছুঁতেই হেঁটে যেতে পারবে না রাফিয়ান।

বাস-টাস কিছু আছে? জিজ্ঞেস করল জিনা।

না, বলল মহিলা। তবে মিস্টার নরিসকে বলে দেখতে পারো। তার ঘোড়ার গাড়ি আছে। কুকুরটার পা বেশি খারাপ?

হ্যাঁ। ম্যাডাম, তার বাড়ি কত দূর?

এই আধ মাইল। ওই যে পাহাড়টা, ওখান থেকে ডানে চাইলেই বাড়িটা দেখতে পাবে। বড় বাড়ি। দেখলেই চিনবে। চারপাশে আস্তাবল, ঘোড়া পালে মিস্টার নরিস। খুব ভাল মানুষ। যদি বাড়িতে না পাও, বোসসা কিছুক্ষণ। রাতে বাইরে থাকে না, যেখানেই যাক ফিরে আসবে।

দ্রুত পরামর্শ করে নিল চারজনে। কিশোর বলল, মিস্টার নরিসের কাছেই যেতে হবে বোঝা যাচ্ছে। তবে সবার যাওয়ার দরকার নেই। মুসা, রবিনকে নিয়ে তুমি হলুদ দীঘিতে চলে যাও। রাতে থাকার ব্যবস্থা করে রাখখাগে। আমি জিনার সঙ্গে যাচ্ছি। ফিরতে কত রাত হয় কে জানে।

ঠিক আছে, বলল মুসা। টর্চ আছে তো তোমার কাছে? গাঁয়ে তো রাস্তায় বাতি নেই, রাতে খুব অন্ধকার হবে।

আছে, জানাল কিশোর।

চলো, কিশোর, তাড়া দিল জিনা। রবিন আর মুসার দিকে চেয়ে হাত নেড়ে বলল, রাতে দেখা হবে।

জিনা আর কিশোর পাহাড়ের দিকে রওনা হলো। পাশে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলেছে রাফিয়ান।

সেদিকে চেয়ে আনমনে বলল মুসা, ভাল হয়ে গেলেই বাঁচি। নইলে ছুটিটাই মাটি হবে।

ঘুরে আরেক দিকে রওনা হলো সে আর রবিন।

নির্জন পথ।

এক জায়গায় একটা লোকের সঙ্গে দেখা হলো। টমটম চালিয়ে আসছে। বিষণ্ণ চেহারা, মাথাটা অনেকটা বুলেটের মত।

ডাকল মুসা।

ঘোড়ার রাশ টেনে থামাল লোকটা।

এ-রাস্তা কি ইয়েলো পণ্ডে গেছে? মুসা জিজ্ঞেস করল।

আ, মাথা নুইয়ে বলল লোকটা।

সোজা? নাকি ডানে বাঁয়ে আর কোন গলি আছে?

আ, আবার মাথা নোয়াল লোকটা।

এটাই পথ তো? মানে ওদিকে যেতে হবে? গলা চড়িয়ে হাত নেড়ে দেখাল মুসা।

আ, বলে চাবুক তুলে পেছন দিক দেখাল লোকটা, তারপর পশ্চিমে দেখাল।

ডানে ঘুরতে হবে?

আ, মাথা নোয়াল লোকটা। হঠাৎ খোঁচা মারল ঘোড়ার পেটে। লাফিয়ে সামনে বাড়ল ঘোড়া, আরেকটু হলেই দিয়েছিল মুসার পা মাড়িয়ে।

খালি তো আ আ করল, মুসার মতই রবিনও অবাক হয়েছে লোকটার অদ্ভুত ব্যবহারে। কি বোঝাল সে-ই জানে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *