০২. আবার এগিয়ে চলল ওরা

আবার এগিয়ে চলল ওরা। ঘোড়ার পায়ের ছাপ পাহাড় ঘেঁষে সীডার আর স্প্যানিশ বেরোনেটের ছোট ঝোঁপগুলোর দিকে গেছে। ঝড় বাদলে ক্ষয়ে যাওয়া ফাটল আর প্রান্তরের উপর দিয়ে আগ্নেয়লাভার কালো স্রোত সরু আঙুরের মত দেবাচেছ-মনে হচ্ছে কেউ যেন একটা বিশাল কালো হাত বাড়িয়েছে নীচের লোকটাকে ধরার জন্য।

শক্ত-পাল্লার কোন তাড়া নেই। রেড ইন্ডিয়ানদের মত দক্ষতার সাথে এগিয়ে চলেছে সে। ঘোড়ার চলতে সুবিধা হবে জেনেও সোজা পথ না ধরে কঠিন। পথে চলছে লোকটা। নিজের অজান্তেই ওদের মনে একটা অজানা ভয় ঢুকেছে-সবাই ভাবছে, ওই প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী লোকটার সামনাসামনি দাড়ালে কী। ঘটবে?

ছোট মেসাটার (mesa-মালভূমির মত জায়গা) মাথায় উঠে ঘোড়াটাকে একটু বিশ্রাম দেওয়ার জন্য থামল লী। অল্পক্ষণের মধ্যেই দলের বাকি সবাই ওকে ঘিরে দাড়াল। প্রত্যেকেই ওরা পরিশ্রমী লোক, কিন্তু নিজের র‍্যাঞ্চ ছেড়ে এর আগে আর এতদূর উত্তরে আসেনি কেউ।

লোকটার মতলবটা কী বলো তো, গিবন? প্রশ্ন করল লী। আমি যতদূর জানি ওদিকে কিছুই নেই-একেবারে ফাঁকা।

পশ্চিমে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না-ওদিকটায় গভীর খাড়া খাদ। ওদিক দিয়ে যেতে হলে বন্ধুকে পাখা গজিয়ে উঠে যেতে হবে। সামান্য একটু পানি মুখে নিয়ে কুলি করল গিবন। তারপর আবার বলল, ওদিকটায় কিছু নেই বলেই জানি আমরা-কিন্তু কে জানে? একমাত্র শক্ত-পাল্লাই বলতে পারবে ওখানকার খবর। পানির বোতলটা আবার সাবধানে ঘোড়ার পিঠে ঝুলিয়ে রাখল সে। মাথা নাড়ল এপাশ-ওপাশ। কঠিন লোকের পাল্লায় পড়েছি-সহজে ধরা যাবে না ওকে।

যত কঠিনই হোক, ওকে ফাঁসিতে না ঝুলিয়ে কোনমতেই ফ্রীডমে ফিরছি না আমি, মনের ক্ষোভ প্রকাশ পেল লী-র কথায়

কোন স্থির সিদ্ধান্ত এখনও নিতে পারেনি ইউজিন। সে জানে শহরের অধিবাসী হিসাবে তারা নিজেরাই সেখানকার আইন-শৃঙ্খলার জন্য দায়ী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারলে স্বেচ্ছাচার আর বিশৃঙ্খলার মাঝে বাস করতে হবে তাদের। এগিয়ে যাওয়ার পিছনে জোরাল যুক্তি অবশ্যই আছে-তবু মন থেকে উৎসাহ বা সায় পাচ্ছে না সে। অন্যান্য শান্তিপ্রিয় লোকের মত সেও চায় নিঝঞ্ঝাটে স্ত্রীকে নিয়ে জীবনটা উপভোগ করতে। পরিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার স্বাদ গ্রহণ করতে চায় সে।

লী-র দিকে চেয়ে ইউজিনের নিজেকে খুব ছোট মনে হলো। অন্যান্য সবার মত নিষ্ঠা কেন নেই তার? এটা তো সত্যি কথাই যে কঠিন হাতে আইন রক্ষা করতে না পারলে কারোই জানমালের কোন নিরাপত্তা থাকবে না। তবু তার মনে হচ্ছে এই কাজে তাকে নিজে উপস্থিত থাকতে না হলেই যেন ভাল হত। এই ভীরু মনোভাবের জন্য মনে মনে লজ্জা পাচ্ছে সে-কিন্তু শহরে সবাই ভোট দিয়ে একজন মার্শাল নিযুক্ত করে তার উপরই এসব কাজের দায়িত্ব দিলেই তো পারে?

মেসাটা প্রায় বর্গাকার। দৈর্ঘ্য আর প্রস্থে দু’দিকেই প্রায় সিকি মাইল হবে। ঘোড়ার খুরের চিহ্ন মাঝে মধ্যে দেখা যায়। একটা অস্পষ্ট সাদা আঁচড়ের দাগ রয়ে গেছে পাথরের উপর। লোকটা মেসা থেকে কোন্ পথে নেমেছে তা খুঁজে বের করতেই ওদের প্রায় আধঘণ্টা সময় লেগে গেল।

নীচে নামার পথে বিজ্ঞের হাসি হেসে গিবন বলল, ওর মাত্র কয়েক মিনিট লেগেছে-কিন্তু আমাদের অনেক বেশি সময় লাগল। ঘনঘন এরকম চাল চালতে পারলে ওর আর ছুটে পালাবার দরকার পড়বে না।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। নিচু জায়গাগুলোতে অন্ধকার ছায়া নেমেছে। আকাশে চলেছে বিচিত্র রঙের খেলা। ওদের সামনে যতদূর দেখা যায় ছোট বড় সারি সারি অগুনতি বালির ঢিবি। তারপরই প্রায় হাজার ফুট উঁচু একটা মেসা।

আমাদের ভাগ্য ভাল লোকটা ওঁৎ পেতে বসে নেই, বলল গিবন। থাকলে নিজের খুশি মত এক এক করে সাবাড় করতে পারত আমাদের।

ঠিক সেই মুহূর্তে একটা বিকট শব্দের সাথে একটা গুলি ছুটে এসে পাথরে বাড়ি খেয়ে আর এক দফা গর্জে উঠল। ছুটাছুটি করে ওরা যে যেখানে পারল আশ্রয় নিল।

বার্ট তার ঘোড়া থেকে গড়িয়ে নীচে পড়ে হামাগুড়ি দিয়ে একটা বালির স্তূপের আড়ালে লুকাল। ঘোড়াটা হতভম্ব হয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। জিনের পিছনে পানির পাত্রটা উঁচু হয়ে রয়েছে। আবার গুলি হলো। ঘট করে একটা বুলেট গাথার শব্দ হতেই ঘোড়াটা লাফিয়ে উঠল।

অশ্রাব্য গালি বেরিয়ে এল বার্টের মুখ দিয়ে। ঘোড়াটাকে যদি মেরে ফেলে। তা হলে…’

একটু অস্থিরভাবে নড়ে উঠে অক্ষত অবস্থায় সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল ঘোড়াটা। ফুটো পাত্র থেকে দ্রুত ধারায় পানি গড়িয়ে পড়ছে।

কাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়বে ওরা? চারদিক খুঁটিয়ে চেয়ে দেখেও কাউকেই ওদের নজরে পড়ল না। ট্রেইল অনুসরণ করে একটা বালির ঢিবির আড়ালে চলে। এসেছে ওরা। ঢিবির, ওপাশ থেকেই এসেছে গুলি।

পানির বেগ কমে গিয়ে এখন কেবল ফোঁটা ফোঁটা পড়ছে। গুলিটা পাত্রে না লেগে কারও মাথায় লাগলে মাথাটারও ওই অবস্থা হত।

সবাই বেশ বুঝতে পারছে ওদের পানির পাত্র খালি হবার পরিণাম কী হতে পারে। ঝর্ণা থেকে সবাই নিজেদের পাত্র ভরে নিয়েছে সত্যি, পানির টান পড়ার কথা নয়-কিন্তু যার পিছু ওরা নিয়েছে সে ছাড়া, কত পথ ওদের চলতে হবে তা কারোই জানা নেই। নিশ্চয়ই অকারণে নোকটা ওটা ফুটো করেনি।

কেউ নিজের জায়গা ছেড়ে নড়ছে না। ঢিবির আড়ালে ছায়ায় এখন কিছুটা কম হলেও যথেষ্ট গরম। সবাই ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে।

অনেক আগেই কেটে পড়েছে লোকটা, আর চুপ করে থাকতে না পেরে শেষ পর্যন্ত মন্তব্য করল ক্লাইভ। কিন্তু ওর কথাটা সত্যি কিনা তা পরীক্ষা করে দেখার আগ্রহ কেউ প্রকাশ করল না। মাথা থেকে হ্যাটটা খুলে একটা পাথরের পিছন থেকে সামান্য উঁচু করে তুলে ধরল সে। কিছুই ঘটল না। অনেকক্ষণ হ্যাটটা শূন্যে ধরে থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে ওটা নামিয়ে নেওয়ার সাথে সাথেই একটা গুলি এসে ওর খুব কাছেই বালি ছিটিয়ে মাটিতে ঢুকল। নিজের উপস্থিতি বুঝিয়ে দিল শক্ত-পাল্লা’-সেই সাথে আরও একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেল, এসব ফালতু ছেলে ভুলানো চালাকিতে কাজ হবে না।

ওদের ঘোড়াগুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বিশ্রাম নিচ্ছে। উত্তপ্ত বালির উপর শুয়ে ওদের আরও গরম বোধ হচ্ছে। অত্যন্ত ক্লান্ত ইউজিন। একটু একটু করে ছায়ার দিকে সরে গিয়ে বিশ্রামের চেষ্টায় দেহটাকে শিথিল করে ছেড়ে দিয়েছে সে।

আধঘণ্টা পেরিয়ে গেল। কিছুই ঘটল না দেখে গিবন সাহস করে ধীরে ধীরে ক্রল করে ঘুরে টিলার পিছন দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল। আরও অনেকক্ষণ সময় পার হলো। দূর থেকে একটা ডাক শুনে ইউজিনের ঝিমুনি ছুটে গেল। যেখান থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে সেখানে দাড়িয়ে গিবন হাতের ইশারায় ওদের ডাকছে। ঘোড়ার পিঠে চড়ে গিবনের দিকে এগিয়ে গেল সবাই।

বালুর উপর পাশাপাশি তিনটে ব্যবহৃত পিতলের কার্তুজ পড়ে আছে। আঁচড় কেটে মাটিতে একটা তীর চিহ্ন আঁকা। নীচে লেখা-চিহ্ন দেখে এগোও।

রাগে মাথা থেকে হ্যাট খুলে লেখাটার উপর ছুঁড়ে মারল লী। স্পর্ধা দেখে গা জ্বলে যায়। শালা হারামীর বাচ্চা! পা দিয়ে ঘষে লেখাটা মুছে ফেলল সে।

লোকটা টিটকারি মেরে খেলো করতে চাইছে আমাদের, তিক্ত ভাবে বলে উঠল বার্ট। ব্যাটার উচিত শাস্তি হওয়া দরকার!

আবার রওনা হলো ওরা। পরিষ্কার চিহ্ন রেখে গেছে সামনের লোকটা। জায়গায় জায়গায় আবার ভাঙা ডালপালা বা পাথর দিয়ে তীর চিহ্ন এঁকে রেখে গেছে।

প্রত্যেকেই ওরা দায়িত্বশীল লোক-গুরুত্বপূর্ণ কাজে বেরিয়েছে। এই ধরনের ইয়ার্কি ফাজলামি ওদের অক্ষমতার জ্বালা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। লোকটা শুধু ওদের বোকা বানিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে, সেটা আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েও দিচ্ছে। কিন্তু কথা হচ্ছে ওর সাথে যে জাতের ঘোড়া রয়েছে তাতে চলতে জানলে কয়েকদিন কেন, কয়েক সপ্তাহও একটানা চলতে পারবে সে।

বিশাল ঢালের মাঝখানে ছোট লেকটাকে পিছনে ফেলে অনেকদূর এগিয়ে এসেছে ওরা। পড়ন্ত বিকেলের নিস্তেজ সূর্যের আলোয় একটা ঝাঁপসা বেগুনী পর্দার আড়ালে হারিয়ে গেছে ওটা। সামনেই একটা ছোট পাহাড়ের গায়ে একটা বড় পাথরের উপর খড়িমাটি দিয়ে লেখা রয়েছে-ছায়া, এখানে বিশ্রাম নিলে সর্দিগরমির ভয় নেই।

ক্লান্ত অবসন্ন অবস্থায় নির্বাক হয়ে লেখাটার দিকে চেয়ে রইল ওরা। ঘোড়াগুলোও ক্লান্ত, এগোতে চাইছে না আর। ঘুরে পিছন দিকে চাইল ইউজিন।

বিস্তীর্ণ মরু এলাকা পিছনে ফেলে এসেছে ওরা। পাহাড় আর ঢিবিগুলোর চূড়ায় সোনালী ছোঁয়া লেগেছে। পশ্চিম দিক থেকে গাঢ় লাল রেখা বেরিয়ে আসছে আকাশ চিরে। অনেক দূরে ইউজিনের র‍্যাঞ্চের দরজায় ফ্রীডম শহর থেকে ফেরার পথে তারই অপেক্ষায় চেয়ে রয়েছে জেনেফার। নিরাশ হয়ে শেষে আস্তাবলের ঘোড়াগুলোকে খাইয়ে বাচ্চাটাকে খাওয়াবে সে। আজ রাতের খাবার একাই খেতে হবে ওকে। খেতে বসেও বার বার বুকভরা আশা নিয়ে পথের দিকে চাইবে বেচারী।

কতদিন যে তাকে এমনি বাইরে বাইরে কাটাতে হবে তার কোন ঠিক নেই। কোনদিনই যদি ওরা আর ফিরতে না পারে? হঠাৎ এই অশুভ চিন্তায় ইউজিনের বুকের ভিতরটা ছ্যাৎ করে উঠল।

কেমন লোক ওই সামনের মানুষটা? বারবার ওদের বোকা বানিয়ে চলেছে কিন্তু একবারও কাউকে মারার চেষ্টা করেনি। লোকটা যদি পিঠে গুলি করার মত

দুর্নীতিবাজই হবে, তবে এত সুযোগ পেয়েও ওদের ছেড়ে দিচ্ছে কেন?–ক্লাইভ আর কীথ সবার আগে পাশাপাশি চলছিল; হঠাৎ ওরা দুজনেই থেমে দাঁড়াল। অন্যান্য সবাই এগিয়ে এসে ওদের ঘিরে দাঁড়াল। দু’পাশের পাহাড় ওদের সামনে খুব কাছাকাছি ঘেঁষে এসেছে। পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে একটা খুব সরু পথ সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। মাটির উপর পাথর দিয়ে তৈরি একটা তীর চিহ্ন ওই পথটাই নির্দেশ করছে। ওরই ফাঁক দিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। ওখান দিয়ে এগোতে হলে পাশাপাশি দু’জনের যাবার উপায় নেই-এক এক করে এগোতে হবে।

পকেট থেকে তামাক বের করে একটা সিগারেট বানিয়ে চোখ দুটো ছোট ছোট করে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে চারপাশটা জরিপ করে দেখল কীথ।

তুমি কী বলো, গিবন? প্রশ্ন করল সে।

লোকটা এখনও সেই চেষ্টা করেনি বটে, কিন্তু যদি রুখে দাঁড়াবার মতলব থেকে থাকে তবে আমার মনে হয় উপযুক্ত জায়গাই বেছে নিয়েছে সে। আমরা যদি ওর ভিতরে একবার ঢুকি তা হলে রাইফেল চালাতে জানা যে কোন লোক মুঠোর মধ্যে পেয়ে যাবে আমাদের।

আমার মনে হয় না সে তা চায়, কোন কিছু না ভেবেই কথাটা বলে ফেলল ইউজিন।

কী বলতে চাও তুমি? অবাক হয়ে প্রশ্ন করল লী। ওর গলাটা খুব রুক্ষ শোনাল।

না, মানে….’ কথাটা যে কারণেই সে বলে থাকুক, লী-র কঠিন দৃষ্টির সামনে মিইয়ে গেল ইউজিন। আমি বলছিলাম যে সুযোগ তো সে আগেও পেয়েছিল কিন্তু কাউকে মারেনি।

কেউ ওর কথায় আমল দিল না। কিন্তু মন্তব্য যখন একটা করেই ফেলেছে, ওদের শুনিয়ে আর কিছু না বললেও নিজের মনে মনে সে তার স্বপক্ষে যুক্তি খাড়া করার চেষ্টা করল।…হ্যাঁ, তাই তো। প্রথমবার যখন লোকটা ওদের চিঠি দিয়ে সাবধান করেছিল তখন সে চাইলে অন্তত কয়েকজনকে অবশ্যই শেষ করতে পারত।

পানির বোতলটা গুলি করে ফুটো করার সময়ে সে অন্তত তিনশো গজ দূরে ছিল। অতদূর থেকে সে কী করে জানল ওটা পানিরই বোতল? তবে কি ওর কাছে বিনকিউলার আছে? হতে পারে এই মুহূর্তে সে ওটা দিয়ে সবার চেহারা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ করছে-ঠোঁট নড়া দেখে আন্দাজ করে নিচ্ছে কে কী বলছে?

যা হবার হবে, বলেই রাইফেল বাগিয়ে ধরে সরু পথটার দিকে এগিয়ে গেল। গিবন। অগত্যা অন্যান্য সবাই একে একে ওর পিছু নিল।

ভিতরটা বেশ অন্ধকার। পথটা অপ্রশস্ত। চলতে গিয়ে ইউজিনের রেকার ঘষা খাচ্ছে পাহাড়ের খাড়া দেয়ালের সাথে। উপরে সরু এক চিলতে আকাশ দেখা যাচ্ছে। আরও অনেক উপরে একটা-দু’টো তারা দেখা যাচ্ছে।

প্রতি মুহূর্তেই তার ভয় হচ্ছে এই বুঝি প্রচণ্ড শব্দ করে একটা গুলি ছুটে এল-কিন্তু তেমন কিছুই ঘটল না। এঁকেবেঁকে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর সামনে আলো দেখা গেল। গিরিপথের শেষে ফাঁকা জায়গায় বেরিয়ে এসেছে ওরা। একটা উজ্জ্বল তারা দেখা যাচ্ছে-তারা নয়, ওটা ক্যাম্পের আগুন।

ছড়িয়ে পড়ে ধীর গতিতে অত্যন্ত সাবধানে এগিয়ে চলেছে ওরা। প্রত্যেকেরই রাইফেল কক করা-তৈরি।

ইতস্তত কয়েকটা বড় গাছ, কিছু ছোট ছোট ঝোঁপও রয়েছে। কাঁটা ঝোপে বাধা পাচ্ছে ওদের দৃষ্টি-সবটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। গালির তুবড়ি ছুটেছে লী-র মুখ থেকে-সে-ই প্রথম আগুনের কাছে পৌঁছেছে।

ছোট্ট পানির ধারার পাশে আগুন জ্বালা হয়েছে, কাছেই আগুনে দেওয়ার জন্য কিছু কাঠও মজুদ রাখা আছে। দুটো পাথর চাপা দিয়ে বিছানো একটুকরো কাগজের উপর দু’টো ছোট তূপে রাখা রয়েছে কফি আর চিনি।

হতভম্ব হয়ে দাড়িয়ে ওরা প্রচ্ছন্ন বিদ্রূপটাকে হজম করার চেষ্টা করছে। লোকটা তাদের ছেলেমানুষ ঠাউরেছে! কয়েকজন নাবালকের দেখাশোনা করছে যেন!

ওই কফি আমি কক্ষনো খাব না! রাগে ফেটে পড়ল, বার্ট।

দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে গিবন বলল, ক্ষতি কী? সুযোগের পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করাই ভাল। তা ছাড়া এই রাতের অন্ধকারে তো আর ওকে অনুসরণ করা যাবে না।

নীরবে ঘোড়ার পিঠ থেকে কেতলি নামিয়ে ঝর্না থেকে পানি ভরে আগুনে চাপিয়ে দিল কীথ। বাস্তব চিন্তাধারা ওর-কফির প্রতি আসক্তিও তার খুব বেশি।

জিন নামিয়ে ঝর্ণার ধারে সামান্য একটু যা ঘাস জন্মেছে তার উপরই চরার জন্য ঘোড়া ছেড়ে দেওয়া হলো। কারও থলেতেই বেশি খাবার নেই-ওরা লম্বা। সময়ের জন্য তৈরি হয়ে বেরোয়নি। বুঝেশুনে চলতে হবে।

বার্টের রাগ পড়ে গেছে। এখন সে অদ্ভুত বিস্মিত দৃষ্টিতে ঝর্নার পানি যেখানটায় পড়ে জমা হচ্ছে সেদিকে চেয়ে রয়েছে। এবার মনে পড়েছে, অভিভূতের মত বলল সে। এই জায়গার গল্প অনেক শুনেছি আমি-এটাই সেই কিংবদন্তীর ‘মরমন কুয়া’।

আগুনে কাঠ দিচ্ছিল গিবন। বার্টের কথা শুনে সিধে হয়ে দাঁড়াল সে। খুঁটিয়ে চারদিক ভাল করে লক্ষ করে দেখল। শহরে, ক্যাম্পে যে-সব গল্প সে শুনেছে তার সাথে মনে মনে মিলিয়ে নিয়ে সে বলল, হ্যাঁ, মনে হচ্ছে ঠিকই ধরেছ তুমি-সবই মিলছে।

আচ্ছা, লোকটা আমাদের এখানে কেন নিয়ে এল বলতে পারো? জিজ্ঞেস করল ক্লাইভ।

ইউজিন বোকার মত সবার মুখের দিকে একবার করে চেয়ে দেখে শেষে প্রশ্ন করল, মরমনের কুয়া আবার কী? আগে শুনিনি তো?

কেউ ওর কথার জবাব দিল না। বার্ট কুয়ার পাশটা ভাল করে ঘুরে দেখে এসে উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, বোকা লোকটা সত্যিই আমাদের পথ দেখিয়ে মরমনের কুয়ার কাছে নিয়ে এসেছে। আমি বাজি রেখে বলতে পারি ব্যাটা এই ঘটনার কথা কিছুই শোনেনি।

গিবনের চোখে ঈষৎ কৌতুকের আভাস দেখা দিল। ক্লাইভের প্রশ্নেরই পুনরুত্থাপন করল সে। তা হলে লোকটা আমাদের এখানে কেন এনেছে?

লী তিক্ত স্বরে বলল, ওসব মরমন কুয়া-টুয়া গাঁজার আসরের গল্প।

তুমি কী জানো? খেপে উঠল বার্ট। তুমি বললেই হলো? ওই গুপ্তধনের বাক্স থেকে আনা এক খণ্ড সোনা আমি নিজের চোখে দেখেছি! নিজের হাতের তালু চিৎ করে খুলে আবার বন্ধ করল সে। এই হাতের মুঠোয় আমি ধরেছি তা। আমি বিশ্বাস করি এখান থেকে কয়েক মাইলের মধ্যেই সোনা রয়েছে। এত সোনা, যা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না।

সোনা? বিস্মিত ইউজিনের গলা দিয়ে মাত্র একটা শব্দই বেরুল।

গল্পটা তোমারই সবচেয়ে ভাল জানা আছে, গিবন, বলল ক্লাইভ। তুমিই শোনাও ওকে।

গল্পের সময় এটা নয়। তোমরা কি বুঝতে পারছ না জেকব ব্যাটার মতলব? আমরা যদি এখন সোনা খোজায় মন দিই তবে ওর কথা ভুলে যাব-এটাই সে চাইছে। সুন্দর কেটে পড়তে পারবে তা হলে।

গোপনে এই কুয়া খুঁজে বের করার লোভে এ-পর্যন্ত অন্তত ডজনখানেক লোক প্রাণ হারিয়েছে-আর ভাগ্যের ফেরে আমরা কিনা আজ খোদ জায়গা মত হাজির!

নিজের নিজের চিন্তায় সবাই ব্যস্ত। কেউ কথা বলছে না। নীরবতা ভঙ্গ করে বার্টই প্রথম কথা বলল। ঠিক আছে, আমরা পরেও আবার এখানে ফিরে আসতে পারব। জেকবকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ফিরে আসব আমরা। ওর গলায় উৎসাহের। অভাব সুস্পষ্ট।

ক্লাইভ একটু নড়েচড়ে উঠল। একবার এই জায়গায় ছেড়ে গিয়ে কেউ আবার এটা খুঁজে পেয়েছে বলে শুনিনি আমি। যারা সোনা লুকিয়ে রেখে গেছিল স্বয়ং তারাও পায়নি। মরমনের কুয়া আজ পর্যন্ত আলেয়াই রয়ে গেছে।

একটু বুদ্ধি কেন খাটাও না?অস্থির উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল লী। সত্যিই যদি সোনা এখানে লুকানো থাকত তবে কি লোকটা সেটা নিজে না নিয়ে আমাদের পথ দেখিয়ে এখানে নিয়ে আসত?

আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, বলল ইউজিন। এখানে কি কোথাও সোনা পুতে রাখা আছে?

বিজ্ঞের হাসি হেসে গিবন বলল, বোঝা যাচ্ছে জেকবের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। এবার অনায়াসে পালাতে পারবে শয়তানটা।

তোমরা মানুষ, না আর কিছু? উত্তেজিত হয়ে উঠেছে লী। কল্পনার নাঙীন ফানুসের পিছনে ছোটার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছ। ভুলেই গেছ যে জেকবকে ফাঁসিতে ঝুলাবার উদ্দেশ্যেই আমরা বেরিয়েছিলাম।

ভুলিনি, প্রতিবাদ করল ইউজিন। কিন্তু গল্পটা শুনতে দোষ কোথায়?

লী, কেলভিনের কথা তোমার মনে আছে? প্রশ্ন করল গিবন।

হঠাৎ ওর কথা তোমার মনে পড়ল কেন এখন?

এই এলাকাটা চিনত কেলভিন। অনেক বছর ধরে সে হারানো ওয়্যাগনগুলো খুঁজেছে এখানে। নাভাজো ইন্ডিয়ানদের চেয়েও ভাল করে চেনে সে এদিককার এলাকা। এটা মরমন কুয়া হলে ঠিক এইখানটায় হচ্ছে মার্শ-পাস। একটা গাছের চিকন ডাল দিয়ে বালিতে আঁচড় কেটে এঁকে দেখাল গিবন। শক্ত-পাল্লা জেকব পুবে কিংবা উত্তর-পুবে যেতে চাইলে তাকে এই মার্শ-পাস দিয়েই যেতে হবে। তা হলে ওকে নদীটা পার হতে হবে-আর নদী পার হওয়া এখানে মাত্র দু’টো জায়গাতেই সম্ভব। দু’টোই এখান থেকে আরও পশ্চিমে।

আমার মনে হয় দুই ফেরির মাঝামাঝি জায়গায় পৌঁছে আমাদের ফাঁকি দিয়ে ঘুরে এসে কাছের ফেরি অর্থাৎ ফাদার্স ফেরিতেই নদী পার হবে সে, মন্তব্য করল লী।

লী-র কথায় বাধা দিতে গিয়েও চুপ করে গেল ইউজিন। লক্ষ করল গভীর মনোযোগের সাথে বালির উপর আঁকা ম্যাপটা দেখছে লী। যাই হোক, তাদের শিকার অত্যন্ত দুর্গম এলাকার দিকেই এগিয়ে চলেছে। অবশ্য কলোরাডো আর স্যান জুয়ান ক্যানিয়ন ওর পথ অনেকাংশে রোধ করবে।

সামনে এগিয়ে গিয়ে ওর পথ আটকালে কেমন হয়? প্রস্তাব দিল ক্লাইভ।

এই এলাকায়? অসম্ভব! বলল গিবন। এখানে একবার ওর ট্রেইল হারালে সারা জীবনেও তা আর খুঁজে পাব না আমরা।

বলা যায় না, এবার মুখ খুলল ইউজিন। আমি ওই মাথার ক্লিপটার কথা ভাবছি।

ক্লিপ?

হ্যাঁ, বেছে বেছে যে ক্লিপটা সাথে এনেছে জেকব। বোঝাই যাচ্ছে পৃথিবী উল্টে গেলেও ক্লিপটা যার জন্যে আনা, তার সাথে দেখা করবেই ও।

চোখ তুলে ইউজিনের দিকে চাইল গিবন। ঠিকই বলেছ। বুদ্ধিমানের মত বেশ চমৎকার একটা নতুন লাইন বের করেছ তুমি!

সবার সামনে একটু ব্ৰিত বোধ করলেও মনে মনে খুশিই হলো সে। নতুন উদ্যম নিয়ে লী আর গিবন ঝুঁকে পড়ল ম্যাপটার উপর। মেয়েটাকে যদি এদিকে কোথাও লুকিয়ে রেখে থাকে তবে অবশ্যই সে তার কাছেই যাবে প্রথমে। কিন্তু মাথা খারাপ না হলে কেউ নিজের প্রিয়তমাকে এই এলাকায় বেশিদিন একা ছেড়ে যাবার সাহস পাবে না।

আর কী করতে পারত সে?

সবাই চিন্তা করছে। মেয়েমানুষকে একা র‍্যাঞ্চে রেখে যাওয়ার অসুবিধাগুলো ওদের সবার ভাল করেই জানা আছে। তবে সুবিধা এই যে ওদের বন্ধু-বান্ধব আছে। কারও যদি বাধ্য হয়ে বৌকে একা রেখে কোথাও যেতে হয় তার প্রতিবেশী খোঁজ-খবর নেয়, দেখাশোনা করে। কিন্তু এই লোকের বেলায়। মেয়েটাকে কে দেখবে? কে তার সাহায্যে পাশে এসে দাঁড়াবে?

শেষ পর্যন্ত ওরা স্বীকার করে নিল যে শক্ত-পাল্লার মত তার প্রেমিকা বা স্ত্রীরও অসাধারণ আর স্বাবলম্বী হওয়া বিচিত্র কিছু নয়।

আমরা যখন ওর নাগাল পাব তখন সে একা নাও থাকতে পারে। হয়তো এই কারণেই সে মোটেও চিন্তিত নয়। হয়তো সে আমাদের একটা ফাঁদের দিকেই নিয়ে চলেছে। কে বলতে পারে?

গিবনের দিকে চাইল বার্ট। ওর মুখের ভাব বিমূঢ়। সবার মনেই একই চিন্তা-জেকবকে ফাঁসিতে ঝুলাতে বেরিয়েছে ওরা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেরাই প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবে কী? জেনেফারের কথা ইউজিনের মনে পড়ল আবার। এ কোন ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ল সে?

কিছুক্ষণ পরে লী বলল, শোনো, আমাদের অন্য দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিচার করতে হবে। দেশে আইন আমাদেরই বজায় রাখতে হবে। তা যদি আমরা না পারি তবে শেষ পর্যন্ত কেউই রেহাই পাব না। অন্যায় আর অবিচার পায়ের নীচে পিষে মারবে আমাদের এক এক করে।

ইউজিন ভাবছে অন্য কথা। লোকটাকে তাড়িয়ে ধরায় আর তার মন নেই। সে ভাবছে অসংখ্য ওয়্যাগন ভর্তি তাল তাল সোনার কথা। ভাগ্যে যা আছে তা তো ঘটবেই-একটু কল্পনা বিলাসে ক্ষতি কী? অন্তত স্বপ্নে রসগোল্লা খাওয়ার মত, স্বপ্ন না ভাঙা পর্যন্ত তো ভাল লাগবে? তার নিজের ভাগের সোনা দিয়ে সে নতুন একটা বাড়ি বানাবে খুব সুন্দর করে-নতুন আসবাবপত্র থাকবে তাতে। কোন কিছুরই আর অভাব থাকবে না তাদের। জেনেফারের বাপ-দাদার কত করিৎকর্মা লোক ছিল, এসব কথাও আর মুখ বুজে শুনতে হবে না তাকে।

সুখ-স্বপ্ন দেখা শেষ করে ইউজিন বলল, ভাবছি আসলে জেকব লোকটা কেমন।

তাতে আর কিছু আসে যায় না এখন, জবাব দিল লী। আমার একমাত্র চিন্তা ওকে ফাঁসিতে ঝুলাব কী করে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *