০২. অ্যাজটেক যোদ্ধার ছবিটবি

তুমি ভাবছো, ফাউলার বললেন। এর মধ্যে অ্যাজটেক যোদ্ধার ছবিটবি আছে?

চিলেকোঠার দরজায় পৌঁছে গেল ওরা। কিশোর বললো, হ্যাঁ। হয় লোকটার। নয়তো জিনিসটার।

স্লাইডগুলো কোথায় বসে দেখবে? কিশোর বললো, নিচে গিয়ে দেখাই ভালো। চিলেকোঠায় বসে দেখতে অসুবিধে। কথাটা পছন্দ হলো ফাউলারের। বললেন, সেই ভালো। চলো। স্লাইড দেখতে তো প্রোজেক্টর আর পর্দা লাগে। আছে যে তুমি জানলে কি করে?

সহজ। স্লাইড যখন আছে, প্রোজেক্টর আর পর্দাও আছে। এ-তো জানা কথা। তবে আমি দেখেছি নিচতলার ঘরগুলো খোঁজার সময়। চলুন।

চলো। তিনজনে মিলে বাক্সগুলো নিচে নামিয়ে আনলো। তারপর প্রোজেক্টর আর পর্দা বয়ে নিয়ে এলো লিভিং রুমে। বাক্সের ওপর বিভিন্ন দেশের নাম লেখা রয়েছে। গ্রীস, ইটালি, মিশর, আর ভারত লেখা বাক্সগুলো সরিয়ে রাখলো কিশোর। অ্যাজটেক যোদ্ধাকে এগুলোতে পাবো না, বললো সে। আমি শিওর। আমরা যাকে খুঁজছি তাকে পাবো মেকসিকোয়।

পর্দাটা টেনে নামিয়ে দিয়ে এলো রবিন। প্রোজেক্টর রেডি করে তাতে স্লাইড ঢোকালো কিশোর। একটা বাক্সের ওপরে কিছু লেখা নেই, সেটা থেকেই নিয়েছে প্রথম ছবিটা। দেখলো। তারপর একের পর এক ছবি ঢোকাতে থাকলো।

কিছু ছবি দেখে মনে হলো, সেগুলো রকি পর্বত থেকে তোলা হয়েছে। তারপর এলো হাওয়াই, ক্যানাডা আর ইংল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গার দৃশ্য।

মেকসিকোতে ভোলা একটা ছবিও চোখে পড়েনি এখনও, তবু বিমোহিত হয়ে দেখছে কিশোর রবিন। খুবই ভালো লাগছে ওদের। অজানা অচেনা দুর্গম সব জায়গার ছবি। কিছু কিছু তো বিস্ময়কর। কোন দিক দিয়ে যে একটা ঘণ্টা পেরিয়ে গেল টেরই পেলো না ওরা। ফাউলারও মুগ্ধ হয়ে দেখছেন। হঠাৎ কি মনে হতে হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, আরিব্বাবা, অনেক দেরি হয়ে গেছে! আর বেশিক্ষণ থাকতে পারবো না আমি। অফিসে যেতে হবে।

প্রোজেক্টরের দায়িত্ব নিয়েছে এখন রবিন। একের পর এক স্লাইড তুলে দিচ্ছে কিশোর, সেগুলো মেশিনে ঢোকাচ্ছে সে। ছবি দেখতে বেশিক্ষণ আর সময় নিচ্ছে না ওরা। দ্রুত দেখছে। তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে।

দাঁড়াও, দাঁড়াও! প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন ফাউলার। মেক্সিকো! ওই বিল্ডিংটা মেকসিকো সিটিতে, ওখানকার বিশ্ববিদ্যালয়!

গিয়েছিলেন নাকি ওখানে?

হ্যাঁ।

ছবিটা ভালো করে দেখে সরিয়ে দিলো রবিন। আরেকটা ছবি দেখে ফাউলার জানালেন, ওটা পিরামিড অভ দি সান। মেকসিকো সিটির বাইরে বিশাল এক প্রাচীন ধ্বংসস্তূপ।

রবিন, ধরে রাখ ছবিটা, কিশোর বললো। এটাই অ্যাজটেক। কোনো সূত্র আছে কিনা দেখ।

অনেকক্ষণ দেখেও কিছুই বের করা গেল না ছবিটা থেকে। ছবিতে কয়েকজন লোক রয়েছে। কারোর চেহারাই স্পষ্ট নয়, চেনা যায় না।

বোতাম টিপে দিলো আবার রবিন। চলতে শুরু করলো আবার প্রোজেক্টর। কয়েকটা ছবিতে নানা রকম ক্যাকটাস দেখা গেল, ক্যান্ডেল ক্যাকটাসও রয়েছে তার মধ্যে। একটা হ্রদ দেখা গেল। মাছ ধরছে জেলেরা। জালগুলো অদ্ভুত।

ওটা লেক প্যাজকুয়ারো, ফাউলার জানালেন। আর ওই জালগুলোকে বলে প্রজাপতি জাল। দুনিয়ায় একমাত্র ওই হ্রদেই ওরকম জাল দিয়ে মাছ ধরা হয়, আবার ঘড়ি দেখলেন তিনি। আর তো বসতে পারছি না আমি। এবার যেতে হয়। বাকি ছবিগুলো দেখার জন্যে আবার নাহয় একসময় ফিরে আসা যাবে।

আমরা থাকি? কিশোর অনুমতি চাইলো। ছবিগুলো দেখেই যাই আমি আর রবিন। অসুবিধে আছে?

হাসলেন উকিল সাহেব। ব্যক্তিগত ভাবে আমার কোনো অসুবিধে নেই। কিন্তু আমি একটা দায়িত্ব পালন করছি। একজনের সম্পত্তি আমার কাছে গচ্ছিত রয়েছে। লোকে জানলে খুব সমালোচনা করবে।

কিশোর কথা বলছে, সময় নষ্ট না করে এই সুযোগ আরেকটা স্লাইড ঢুকিয়ে দিয়েছে রবিন। দুটো লোককে দেখা গেল পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে।

অস্ফুট শব্দ করে উঠলো কিশোর। একজনকে চিনতে পেরেছে। বায়ের মানুষটি মিস্টার চেস্টার রেডফোর্ড।

অন্য লোকটা কে? রবিনের প্রশ্ন। দেখতে তো অনেকটা ইনডিয়ানদের মতো লাগছে।

স্প্যানিশ-ইনডিয়ান! বিড়বিড় করলো কিশোর। ফাউলারের দিকে তাকালো। কে ও? পিন্টো আলভারো?

বলতে পারবো না, মাথা নাড়লেন উকিল সাহেব। স্থির দৃষ্টিতে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে কিশোর। অ্যাজটেক যোদ্ধার সত্যিকারের বংশধর হতে পারে! চেহারা অন্তত তা-ই বলছে।

কিশোর আর রবিনের মতোই উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন ফাউলার। যাওয়ার কথা ভুলে গিয়ে তাকিয়ে রয়েছেন ছবিটার দিকে। দ্রুত পরের ছবিগুলো চালিয়ে দিলো রবিন। প্রতিটিতেই দুজনের ছবি, নানা ভঙ্গিতে, চমৎকার একটা বাগানের মধ্যে তোলা।

মিস্টার ফাউলার, আবার অনুরোধ করলো কিশোর। ছবিগুলো তো সবই প্রায় এক। একটা নিয়ে গেলে কোনো অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। নিতে পারি? প্রিন্ট করে নেবো।

ভেবে দেখলেন উকিল। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে অনুমতি দিলেন।

সব চেয়ে পরিষ্কার ছবিটা বেছে বের করলো কিশোর। সাবধানে রুমালে জড়িয়ে পকেটে রাখলো।

প্রেজেক্টর, পর্দা আর বাক্সগুলো যেখানে ছিলো, সেখানে রেখে এলো আবার তিনজনে মিলে। বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে। সদর দরজার তালা লাগালেন ফাউলার। তারপর ছেলেদের নিয়ে এসে গাড়িতে উঠলেন। পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ডে ওদেরকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেন।

ভেতরে ঢুকেই সোজা হেডকোয়ার্টারের দিকে এগোলো দুই গোয়েন্দা। পথে দেখা হয়ে গেল রাশেদ পাশার সঙ্গে। পুরানো একটা গার্ডেন চেয়ারে বসে পাইপ টানছেন তিনি। গভীর মনোযোগে কি যেন দেখছেন ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে। ওদের সাড়া পেয়ে মুখ তুললেন। হাত নেড়ে ডাকলেন, দেখে যা।

গেল দুজনে। ময়লা পুরানো একটা কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, দুটো আঙুলের ছাপ আছে। দেখ তো একরকম না আলাদা?

অবাক হয়ে চাচার মুখের দিকে তাকালো কিশোর। নীরবে হাত বাড়িয়ে কাগজ আর গ্লাসটা নিলো। ভালোমতো দেখে ফিরিয়ে দিতে দিতে বললো, আলাদা। একজনের না।

মুচকি হাসলেন রাশেদ পাশা। আমি যদি বলি একজনের?

চাচার মুখের দিকে তাকিয়েই রয়েছে কিশোর। কি হয়েছে তোমার, চাচা? পুরানো মাল বাদ দিয়ে হঠাৎ এই গোয়েন্দাগিরি!

তুই যদি পুরানো মাল আর গোয়েন্দাগিরি একসাথে চালাতে পারিস, আমি পারবো না কেন?

তা বটে। কিন্তু হঠাৎ তোমার এই শখ কেন?

হঠাৎ দেখলি কোথায়? তোরা যখন কোনো কেসে কাজ করিস, আমি কি ইনটারেস্টেড হই না? খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক প্রশ্ন করি না?

তা করো…

নতুন একটা খবর শুনবি? হাসিটা ছড়িয়ে পড়েছে রাশেদ পাশার চোখে। গোঁফের কোণ ধরে টানলেন। আমিও একসময় গোয়েন্দা ছিলাম।

বোমা ফাটলো যেন, এমন ভাবে চমকে গেল কিশোর রবিন। গোয়েন্দা! একই সঙ্গে বলে উঠলো দুজনে।

হ্যাঁ, গোয়েন্দা। জীবনে অনেক কাজই করেছি, জানিস। বাড়ি থেকে পালিয়ে সার্কাসের দলে যোগ দিয়েছি। ছন্নছাড়ার মতো ঘুরে বেড়িয়েছি দেশে দেশে। জাহাজের নাবিক হয়েছি। মরুভূমিতে গিয়ে বেদুইনদের সঙ্গে বাস করেছি…

সেসব জানি, বাধা দিয়ে বললো কিশোর। জনতাম না শুধু গোয়েন্দা হওয়ার খবর।

ভালো ডুবুরি ছিলাম আমি, সেখবর জানিস? প্রশান্ত মহাসাগরের এক দ্বীপে বহুদিন থেকেছি আমি, মুক্তো-শিকারীদের দলে।

আশ্চর্য! এতো কিছু ছিলে তুমি…

তোর বাপও অনেকটা এরকমই ছিলো। তোর দাদাও। নইলে রহস্য আর, রোমাঞ্চের এই তীব্র নেশা এলো কোত্থেকে তোর রক্তে?

হুঁ! বিমূঢ় হয়ে গেছে যেন কিশোর। রবিন থ। তা গোয়েন্দাটা কবে ছিলে? কোথায়?

জাহাজে থাকতে। একদিন এক কোটিপতি মহিলার নেকলেস হারিয়ে গেল। জাহাজের ডিটেকটিভ কিছুই করতে পারলো না। আমার খুব আগ্রহ হলো, দেখি তো চেষ্টা করে? দুই ঘণ্টার মধ্যেই বের করে দিলাম নেকলেসটা…

এত্তো তাড়াতাড়ি! চোখ বড় বড় করে ফেললো রবিন।

হ্যাঁ। সেদিনই আমাকে সহকারী গোয়েন্দার চাকরি দিয়ে ফেললেন ক্যাপ্টেন। ছমাসের মধ্যেই আসল ডিটেকটিভকে ছাড়িয়ে আমাকে তার জায়গায় বহাল করলেন। কিন্তু টিকলাম না। বছরখানেক পরেই পালালাম। আফ্রিকার উপকূল ধরে চলছিলো তখন জাহাজ। সিংহ আর হাতি শিকারের লোভ সামলাতে পারলাম …

আচমকা কি হলো কিশোরের কে জানে! চট করে বসে পড়ে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে ফেললো চাচাকে। এতো কথা কোনোদিন কিন্তু জানাওনি তুমি আমাকে!

জানাবো কি? আমার এই ছন্নছাড়া জীবনের কথা শুনলেই তোর চাচী খেপে যায়। বলে ফালতু সময় নষ্ট করেছি আমি। কে যায় অহেতুক সংসারের শান্তি নষ্ট করতে…

হুঁ! মাথা দোলালো কিশোর। তা এই আঙুলের ছাপের ব্যাপারটা কি, বল তো? আবার গোয়েন্দাগিরি শুরু করেছে নাকি?

না। পুরানো ডায়েরী ঘাঁটতে গিয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়লো কাগজটা। অবসর সময়ে ধাঁধার খেলা আমার খুব ভালো লাগতো। বসে বসে খেলতাম। এই আঙুলের ছাপ আমারই। এই যে এটা আসল। আর এটা নকল।

নকল! বুঝতে পারলো না রবিন। কিশোর বুঝে ফেলেছে। বললো, বুঝেছি। রবারের নকল চামড়া লাগিয়ে নিয়েছিলে। এভাবে নকল ছাপ দিয়ে বাঘা বাঘা গোয়েন্দাকে ধোকা দিয়ে দেয় অপরাধীরা।

হ্যাঁ, মাথা ঝাঁকালেন রাশেদ পাশা। ভাইপোর মুখের দিকে তাকালেন সরাসরি। খুব উত্তেজিত মনে হচ্ছে। কোনো কেস পেয়েছিস নাকি?

পেয়েছি, খুলে বললো কিশোর। ছবিটা প্রিন্ট করার কথা বললো।

চল, আমিও দেখি। হাতে কাজটাজ বিশেষ নেই। ভাবছি, পুরানো পেশাটা আবার নতুন করে ঝালিয়ে নেবো। মন্দ হয় না, কি বলিস?

একটুও না, খুশি হয়ে বললো কিশোর। স্যালভিজ ইয়ার্ডের পাশাপাশি নতুন কতো ব্যবসাই তো করো। এই যেমন জন্তুজানোয়ার ধরে বিক্রি করার ব্যবসাটা। একটা ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলে ফেললেই বা ক্ষতি কি?

তোদেরকে দেখে সেকথা ভাবছি অনেকদিন থেকেই। সাহস পাই না, বুঝলি, অফিসের দিকে তাকালেন তিনি। ভেতরে কাজ করছেন মেরিচাচী। তোর চাচীর এসব কাজ একদম পছন্দ না।

কই, আমাকে তো কিছু বলে না?

তোকে বলে না। আমাকে বলবে। ওই বেরোচ্ছে। নিশ্চয় খেতে ডাকবে।

বারান্দায় বেরিয়ে এলেন মেরিচাচী। হাত নেড়ে সবাইকে যেতে ডাকলেন। ঠিকই আন্দাজ করেছেন রাশেদ পাশা। খেতেই ডাকলেন তিনি।

টেবিলে বসে সবে প্লেট টেনে নিয়েছে কিশোর, মেরিচাচী জিজ্ঞেস করলেন, এই কিশোর, মিস্টার সাইমন ফোন করেছিলেন কেন রে? নিশ্চয় নতুন কোনো কেস?

হ্যাঁ। তেমন কিছু না… এড়িয়ে যেতে চাইলো কিশোর।

কেসটা কি? মিথ্যে বলে পার পাবে না, বুঝে গেল, কিশোর। বলতেই হলো। বারোজের কথায় আসতেই রেগে গেলেন। কড়া গলায় বললেন, শয়তান! ওটাকে আবার সম্পত্তি দিতে গেলেন কেন মিস্টার রেডফোর্ড! ও তো একটা চোর!

কিন্তু সত্যিই কিছু চুরি করতে গিয়েছিলো কিনা আমরা জানি না।

নিশ্চয় গিয়েছিলো! নইলে লুকিয়ে চিলেকোঠায় উঠতে যাবে কেন? উকিল সাহেবের জায়গায় আমি হলে সোজা সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে বারোজের বাড়িতে তল্লাশি চালাতাম। আজই পয়লা নয়, আমার দৃঢ় বিশ্বাস আরও চুরি করেছে সে। তার বাড়িতে চোরাই মাল পাওয়া যাবেই।

তুমি রেগে যাচ্ছাে কেন? মোলায়েম গলায় বললেন রাশেদ পাশা। তবে একেবারে ভুল কথা বলোনি। চোর হতেও পারে। যাই হোক, পালিয়ে তো আর যেতে পারছে না। হাসপাতালে রয়েছে। পুলিশ ছাড়বে না। সুস্থ হলেই গিয়ে প্রশ্ন শুরু করবে।

দেখবে তখন, আমার কথাই ঠিক, বলে রান্নাঘরে চলে গেলেন তিনি।

খাওয়ার পরে লিভিং রুমে এসে বসলো সবাই। হাসপাতালে ফোন করলো কিশোর। জানা গেল, তখনও হুঁশ ফেরেনি বারোজের।

অ্যাজটেক যোদ্ধার কেস নিয়েই চললো আলোচনা।

মেকসিকোর পুরানো ইতিহাস ঘাটতে হবে, কিশোর বললো একসময়। বিশেষ করে সেই সময়কার, যখন অ্যাজটেকরা ক্ষমতায় ছিলো।

বাড়িতে বড় একটা লাইব্রেরি গড়ে তুলেছে কিশোর। অবশ্যই সেটা গড়তে সাহায্য করেছেন রাশেদ পাশা আর মেরিচাচী। বইয়ের ব্যাপারে তিনজনেরই প্রচন্ড আগ্রহ। মোটা মোটা দুটো বই নিয়ে এলো কিশোর।

একটা রবিনকে দিয়ে আরেকটা নিজের কোলের ওপর রেখে পাতা ওল্টাতে শুরু করলো। দেখতে দেখতে নিমগ্ন হয়ে গেল বইয়ের পাতায়।

নীরবে পাইপ টানছেন রাশেদ পাশা। মেরিচাচী একটা পেপারব্যাক উপন্যাস নিয়ে বসেছেন।

বাপরে! কি জল্লাদ ছিলো! হঠাৎ বলে উঠলো রবিন। কিভাবে মারতে মানুষগুলোকে! দেবতার ভোগ! স্বাস্থ্যবান দেখে একজন তরুণকে বেছে নিতো। একটা বছর তাকে ভালো ভালো খাবার খাওয়াতো, কাপড় দিতো, আনন্দের যতো রকম উপকরণ আছে, সব দেয়া হতো। তারপর নিয়ে গিয়ে তাকে বলি দিতো যুদ্ধ দেবতার উদ্দেশ্যে।

হ্যাঁ, তিক্ত কণ্ঠে বললো কিশোর। ধর্মের নামে ধরে ধরে খুন করতে অসহায় মানুষগুলোকে। সব শয়তানী ওই ধর্মগুরুগুলোর। ধর্মযাজক না ছাই! আস্ত পিশাচ একেকটা!

পুরানো আমলের নরবলি নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনা চললো। তাতে রাশেদ পাশা আর মেরিচাচীও যোগ দিলেন। অ্যাজটেক যোদ্ধাদের কয়েকটা ছবি রয়েছে বইতে। বিচিত্র পোশাক পরা। একটা দেখিয়ে রবিন বললো, দেখ দেখ, কি অদ্ভুত!

রঙিন ছবি। কাকাতুয়ার পালকের মুকুট মাথায়। গায়ের খাটো জামাটাও তৈরী হয়েছে কাকাতুয়া আর কিছু দুর্লভ পাখির পালক দিয়ে। সোনার সুতো দিয়ে গাঁথা হয়েছে পালকগুলো। এছাড়াও জায়গায় জায়গায় সোনার কারুকাজ।

আরেকটা ছবিতে দেখা গেল পুরো এক স্কোয়াড্রন যোদ্ধা। পরনে জাগুয়ারের চামড়ার তৈরি ইউনিফর্ম। হাতে বর্ম, তাতেও সোনার কারুকাজ। প্রজাপতি আর সাপের প্রতিকৃতি। পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল। তাতে সোনা। সোনার ছড়াছড়ি। প্রচুর স্বর্ণখনির মালিক ছিলো ওরা, বোঝা যায়।

মন দিয়ে দেখছে কিশোর আর রবিন, এই সময় এঞ্জিনের শব্দ হলো। বিকট শব্দ করতে করতে অফিসের কাছে এসে থামলো গাড়িটা।

হাসলো কিশোর নিশ্চয় মুসা।

উঠে জানালার কাছে চলে গেল রবিন। ঠিকই বলেছো।

দরজায় দেখা দিলো মুসা। এই যে আছো। ব্যাপার কি? কেস তাহলে সত্যিই মিললো? মিস্টার সাইমন সেজন্যেই ডেকেছিলেন?

হ্যাঁ, রবিন বললো। তা কি কি করে এলে?

তেমন কিছু না, জবাব দিলো কিশোর। দেরাজের নিচে চাপা পড়া একজন মানুষকে বের করে হাসপাতালে পাঠিয়েছি। আর একজন অ্যাজটেক যোদ্ধার খোঁজ করছি।

বড় হয়ে গেল মুসার চোখ। কিসের খোঁজ করছো!

অ্যাজটেক যোদ্ধার, মুসাকে কেসটার কথা খুলে বললো কিশোর আর রবিন।

এই যোদ্ধার ব্যাপারটা ভাল্লাগছে না আমার। পুরানো ব্যাপার-স্যাপার তো, ভূত বেরিয়ে পড়তে পারে। পুরানো, বাড়িতেই ভূত বেশি থাকে জানোই তো, মুসা বললো। তবে মেকসিকোর ব্যাপারটা বেশ ইনটারেসটিং।

এই উইলের ব্যাপারটা পাগলামি মনে হচ্ছে আমার, মুসা বললো। তবে মেকসিকো বেশ মজার। কিছু ইতিহাস আমিও পড়েছি। পুরানো ওই অ্যাজটেকরা কি খেতে জানো?

না, মাথা নাড়লো রবিন।

ফুল মিশিয়ে খাবার রান্না করতো, নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো মুসা। রবিন আর কিশোরের কাছে বিদ্যে জাহির করার সুযোগ কমই পায় সে। পেয়ে আর ছাড়তে চাইলো না। তাতে নাকি অনেক অসুখ দূরে থাকে। এই যেমন, অ্যাকাশে ফুল নাকি মেলানকালিয়া মানে বিষন্নতা দূর করে, প্রাচীন অ্যাজটেক ওঝারা বিশ্বাস করতো। ডিমের সঙ্গে মিশিয়ে, তাতে চিনি আর দারুচিনি দিয়ে ভাজা করে খেতো, ঠোঁট চাটলো সে। টেস্ট খারাপ হবে না। ভাবছি একদিন বানিয়ে খেয়ে দেখবো।

কেন, তোমাকে মেলানকালিয়া ধরলো কবে থেকে? হেসে জিজ্ঞেস করলো কিশোর।

আর কোনো ফুল খেতো? রবিনের প্রশ্ন।

নিশ্চয় খেতো। পাই ফিলিং তৈরি করতো গোলাপ ফুল দিয়ে। তাতে মেশাতো চিনি আর লেবু। একধরনের শরবত বানাতে জ্যামাইকা গাছের লাল কুঁড়ি দিয়ে। আর স্কোয়াশ কুঁড়ি খাওয়ার কথা তো নিশ্চয় শুনেছো। শোনোনি? সূর্যদেবতার পুজোর সময় ওই কুঁড়ি মুখে পুরে পানের মতো চিবাতো।

ছাগল ছিলো নাকি ব্যাটারা! মেরিচাচী বললেন।

এক কাজ করো, মেরি, হেসে বললেন রাশেদ পাশা। একদিন জেরানিয়াম, ফুল দিয়ে স্যুপ বানিয়ে দেখ না। অ্যাজটেকরা খেতে পারলে আমরা কেন পারবো না?

হাসতে শুরু করলো সবাই।

হাসতে হাসতে মুসা বললো, কেন এসেছি, সেটা শুনলে না?

নিশ্চয় পার্টসটা পেয়ে গেছ, সেটা বলতে, কিশোর বললো। চমৎকার হয়ে যাবে এবার ভাঙা গাড়িটা। একেবারে নতুনের মতো।

মতো না। নতুনই! তর্জনী নাচিয়ে জোর দিয়ে বললো মুসা। আবার যেতে হবে আমাকে। আরেকটা পার্টসের খোঁজে। এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম। ভাবলাম, বলেও যাই, জিজ্ঞেসও করে যাই, মিস্টার সাইমন ডেকেছিলেন কেন? যাক, তোমরা অ্যাজটেক যোদ্ধাকে খোঁজাখুঁজি করো। প্রয়োজন পড়লে আমাকে নিও। আগে গাড়ির কাজটা শেষ করে নিই…

ঠিক আছে, যাও।

বেরিয়ে গেল মুসা। একটু পরেই শোনা গেল তার জেলোপি গাড়ির ভটভট শব্দ। ইয়ার্ড থেকে বেরোনোর পরেও কিছুক্ষণ শোনা গেল শব্দটা।

বিশ্রাম নেয়া হয়েছে। অফিসে চলে গেলেন মেরিচাচী। ইয়ার্ডের কাজ করতে বেরিয়ে গেলেন রাশেদ পাশা। একা হয়ে গেল কিশোর আর রবিন।

তারপর? রবিন জিজ্ঞেস করলো। এই কেসের ব্যাপারে আর কি করা যায় বলো তো?

তোমার গাড়িটা নিয়ে এসোগে। মিস্টার সাইমনের ওখানে যাবো। তাঁকে সব জানাবো। আর ভাবছি, আজ রাতে আরেকবার যাবো রেডফোর্ড হাউসে। ভেতরে ঢোকা নিষেধ, বাইরে থেকে দেখতে তো বাধা নেই।

তা নেই। কি দেখবে?

দেখি!

মিস্টার সাইমনের সঙ্গে দেখা করে ফিরে এলো দুজনে। রাতের খাবারের পর আবার বেরিয়ে পড়লো। চললো রেডফোর্ড এস্টেটে। গেটের পাশে এনে গাড়ি রাখলো রবিন। এখানেই রেখে যাই, কি বলো?

আরেকটু সরিয়ে রাখো, কিশোর বললো।

গাড়ি থেকে নেমে ড্রাইভওয়ে ধরে হেঁটে চললো দুজনে। আলো রয়েছে তখনও, টর্চ জ্বালার দরকার পড়লো না। বাড়ির বাঁ পাশে পৌঁছে থমকে গেল ওরা। একজন মহিলা, ওপর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মোটাসোটা। মাথায়, শাদা চুল।

শব্দ শুনে ফিরে তাকালো মহিলা। একটা মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ওদের দিকে। তারপর হাসলো। গুড ইভনিং। চমকে দিয়েছিলে। চোর মনে করেছিলাম। তা নও, দেখেই বুঝতে পারছি। আমার নাম ক্লারা অ্যাডামস। এখানেই কাজ করতাম, বাড়ির মালিক থাকতে।

মিস্টার রেডফোর্ড? জিজ্ঞেস করলো কিশোর।

মাথা ঝাঁকালো মহিলা। খুব ভালো লোক ছিলেন। তাঁর কাছে কাজ করে শান্তি ছিলো। কি আরামে ছিলাম ভাবলে কষ্টই লাগে এখন।

কতোদিন আগে কাজ করেছে, জানতে চাইলো কিশোর।

ক্লারা জানালো, বছর দুই আগে চলে গিয়েছিলাম। ইদানীং বেশি বেশি বাইরে যেতেন মিস্টার রেডফোর্ড, নিয়মিত কাজের লোক তেমন লাগতো না।

মিস অ্যাডামস, অ্যাজটেক যোদ্ধার নাম কখনো বলতে শুনেছেন মিস্টার রেডফোর্ভকে? প্রশ্ন করে বসলো কিশোর।

শূন্য দৃষ্টি ফুটলো মহিলার চোখে। নাহ্।

মেকসিকোতে যেতেন, তাই না? জিজ্ঞেস করলো রবিন।

প্রায়ই। অনেক সুভনির এনেছেন ওখান থেকে।

ওগুলো কি করেছেন? কিশোর জানতে চাইলো।

কিছু নিজের কাছে রেখেছেন। কিছু দিয়ে দিয়েছেন একে-তাকে।

মেকসিকোর কোনো বন্ধু বা পরিচিতজনের নাম উল্লেখ করেছেন কিনা তিনি। কখনও, জিজ্ঞেস করলো কিশোর।

মাথা নাড়লো ক্লারা। সত্যি বলতে কি, মিস্টার রেডফোর্ড কথা তেমন বলতেনই না। বাড়ির চাকর-বাকরের সঙ্গে তো নয়ই। তবে কার সাথে যেন কথা বলার সময় একবার বলতে শুনেছিলাম, মেকসিকোতে গিয়ে ইনডিয়ান অস্ত্রশস্ত্র জোগাড়ের চেষ্টা করেন তিনি, সংগ্রহে রাখার জন্যে। ওই সময় একটা লোক ছিলো তার সঙ্গে। নামটা বলেননি।

অনেক অস্ত্র সংগ্রহে আছে বুঝি তার? রবিন জিজ্ঞেস করলো।

আছে। মিউজিয়ামে দান করে দেবেন বলতেন। দেখলে বুঝতে কি সব জিনিস! রোজ ওগুলোর ধুলো মুছে পরিষ্কার করে রাখতাম আমি। কয়েকটা অস্ত্র ছিলো ভয়ংকর, দেখলেই হাত-পা সিঁটিয়ে যেতো আমার।

কোনো অন্ত্রের কথা বলতে গিয়ে অ্যাজটেক শব্দটা কি বলেছেন?

নাহ্, শুনিনি। কিছু কিছু অস্ত্র আনা হয়েছে আফ্রিকা আর ইউরোপ থেকে। মেকসিকো থেকে যেগুলো এনেছেন, সেগুলোর নাম বলার সময়ও কখনও অ্যাজটেক কথাটা বলেননি।…দেরি হয়ে গেল। যাই। তোমাদের সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগলো।

আপনি কি এখানে প্রায়ই আসেন? প্রশ্ন করলো কিশোর।

কিশোরের দিকে নীরবে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ ক্লারা। সন্দেহ করছো, না?

না, না, এমনি…

হাসলো মহিলা। করলে অবশ্য তোমাকে দোষ দেয়া যায় না। এরকম সময়ে বন্ধ একটা বাড়িতে একজন মহিলাকে দেখলে সন্দেহ হওয়ারই কথা। হ্যাঁ, আসি। মানে, আসতাম। মালিক বেঁচে থাকতে তার সঙ্গে দেখা করতে আসতাম। তাছাড়া বাড়িটার মায়া আমি কিছুতেই কাটাতে পারি না।…ঠিক আছে, চলি। গুড বাই।

দ্রুত হেঁটে চলে গেল মহিলা।

তাকে নিয়ে খুব একটা ভাবছে না দুই গোয়েন্দা। তাদের মনে তখন অন্য চিন্তা। অ্যাজটেক যোদ্ধা কোনো অস্ত্রের নাম নয় তো?

লনের ধার দিয়ে হেঁটে বাড়ির সামনের দিকে চলে এলো দুজনে। অনেক বড় বাড়ি। ডান পাশে চোখ পড়তেই থমকে গেল ওরা।

একটা বাক্সের ওপর উঠে জানালা দিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে একজন মানুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *