০১-০৫. দুপুরের প্রখর ফোস্কা-পড়া রোদে

গোড়ার কথা

ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়ার আগে তোমার আর নতুন কিছু বলার আছে, হার্ভি?

রুক্ষ প্রশ্নটার সুরে আসন্ন মৃত্যুর পূর্বাভাস সুস্পষ্ট। এবং বক্তার কাছে এটা কেবল একটা নিছক আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। শক্ত গড়নের লোকটার বয়স তিরিশের কাছাকাছি হবে। হাতের দুটো বুড়ো আঙুলই নিজের গান-বেল্টে গুঁজে গোড়ালির ওপর সে সামনে-পিছনে দুলছে। কোটরে ঢুকানো দুটো চোখ আর ওর বাঁকা নাকে ওকে অনেকটা মড়া-খেকো শকুনের মতই দেখাচ্ছে। নিচের দিকে নামানো চওড়া গোঁফ ওর নিষ্ঠুর চিবুক আর ঠোঁট মোটেও ঢাকতে পারেনি।

যাকে সম্বোধন করে কথাটা বলা হয়েছে সে সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতের মানুষ। বক্তার চেয়ে তার বয়স অন্তত বিশ বছর বেশি। পাক ধরা চুল আর দাড়িওয়ালা চেহারায় রয়েছে একটা কঠিন ধৈর্যের ছাপ, যেটা অত্যন্ত কঠিন পরিশ্রম করার পরেও জীবনের পথে তেমন কোন উন্নতি করতে না পারার ফল। এর কারণ হচ্ছে সে আমেরিকার এমন একটা নিষ্ফলা জমিতে বাস করছে যেখানে কেবল কোনমতে বেঁচে থাকাটাই প্রায় অসম্ভব। হাত বাঁধা অবস্থায় সে একটা কাঠের গুঁড়ির ওপর হতাশ ভাবে নিরুপায় হয়ে বুকে চিবুক ঠেকিয়ে বসে আছে। চেহারায় বিফল হওয়ার চিহ্ন স্পষ্ট। একটা ছোট ঝর্নার ধারে সে নিজের হাতে তৈরি করেছে তার কেবিন। নিজের হাতে তৈরি র‍্যাঞ্চটাকে সে ভালবাসে; কিন্তু এটা যখন মাত্র লাভজনক হয়ে উঠতে শুরু করেছে, তখনই তাকে বাধ্য হয়ে এটা ছেড়ে যেতে হচ্ছে। সেটাও অনেক নির্যাতন আর মিথ্যা অপমানের লাঞ্ছনা মাথায় নিয়ে। পুরো ব্যাপারটাই তার কাছে অবাস্তব ঠেকছে। আজও সূর্য উঠেছে, পাখিরা গান গাইছে, মৃদু আওয়াজ তুলে বয়ে যাচ্ছে ঝর্না-তবু বাতাসটা যেন দুঃখের ভারে ভারী হয়ে আছে।

তাকে অর্ধ-চক্রাকারে ঘিরে দাড়ানো লোকগুলোর ওপর একবার ঘুরে এলো হার্ভি বোলটনের চাখ। ওদের চেহারায় নিষ্ঠুর একটা কৌতূহল ছাড়া আর কিছুই নেই। ওরা সবাই কাউবয়-এবং বক্তার ভাড়া করা লোক। ওদের কাছে কোনরকম সুবিচারই আশা করে না হার্ভি। ওদের যেমন হুকুম দেয়া হয়েছে। তা-ই ওরা করবে।

এবার মুখ তুলে তাকিয়ে ওদের লীডারের দিকে চেয়ে কথা বলল হার্ভি। গলার স্বর শান্ত এবং নিচু-চেহারায় ভয়ের চিহ্নমাত্র নেই।

আমি আগেও যা বলেছি সেটাই আবার বলছি-আমি তোমার কোন গরু ছুঁইনি, বার্ট, ভারী স্বরে বলল সে।

তাহলে ওগুলো তোমার করালে এলো কিভাবে? ওগুলোর মার্কাও বার বি থেকে ফোর বি করা হয়েছে, অবজ্ঞার সাথে ভেঙচি কেটে বলল বার্ট। আমার গরু চুরি করার জন্যে সুবিধামত একটা ব্র্যান্ডই তুমি বেছে নিয়েছ বটে!

এখানে আসার বহু বছর আগে থেকেই ওটা আমার নিজস্ব ব্র্যান্ড। আমার নামও বোলটন-এবং নামের সাথে মিল রেখেই ওই ব্র্যান্ড রেজিস্ট্রি করেছিলাম। আমি, যুক্তি দেখাল সে। আর তাছাড়া তুমি কি মনে করো আমি এতই থোকা যে ব্র্যান্ড পাল্টে তোমার গরু চুরি করে থাকলে সেগুলোর ক্ষত শুকাবার আগেই আমি ওদের করালে ঢোকাব?

ওহ, তোমাদের মত নেস্টাররা মনে করো তোমরা যা খুশি করেও পার পেয়ে যাবে, কিন্তু তুমি জানতে না যে আমরা তোমাকে সন্দেহ করে তোমার ওপর নজর রেখেছিলাম! অস্থির স্বরে বলল বার্ট। ওই গরুগুলোর পাখা নেই যে ওরা তোমার বেড়া দেয়া করালে উড়ে এসে ঢুকেছে! এর কি ব্যাখ্যা দেবে তুমি?

ওগুলো এখানে কিভাবে এলো তা আমি জানি না। গতকাল আমি এখানে ছিলাম না, হোপ শহরে রসদ আনতে গেছিলাম; আমার অনুপস্থিতিতে আর কেউ ওগুলো ঐখানে এনেছে।

হ্যাঁ, ভাল একটা গল্প ফেঁদেছ বটে! এদিককার কাজ সেরে তুমি অন্যত্র থাকার অজুহাতে রেহাই পাওয়ার আশায় ছিলে; ভাল একটা প্ল্যান করলেও এতে কোন কাজ হবে না।

অভিযুক্ত লোকটা দ্বিধাগ্রস্ত ভাবে মাথা নাড়ল। সে বুঝতে পারছে তার আর বাঁচার কোন রাস্তা নেই। যখন থেকে সে এখানে বসবাস শুরু করেছে তখন। থেকেই তাকে টিকে থাকার জন্যে লড়তে হয়েছে। তাকে হুমকি দেয়া হয়েছে, ঘোড়াকে খোড়া করা হয়েছে-একবার তার জমির খড় পুড়িয়ে দিয়ে শীতের জন্যে পশুর খাবার নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তবু সে হাল ছেড়ে বসে থাকেনি, ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছে-ভেবেছে আপন মনে নিজের কাজ করে গেলে নেস্টারদের প্রতি স্থানীয় মত একদিন পাল্টাবে। এবং এটা হয়ত ঘটত, কিন্তু কেবল বার্টের জন্যেই তা সম্ভব হয়নি।

এখানে আমার অধিকার আছে, বলল সে। এটা সরকারি জমি।

এটা ফ্রী রেঞ্জ, কঠিন স্বরে বলল বার্ট।

হ্যাঁ, তোমার জন্যেই কেবল ফ্রী, আমার জন্যে নয়, প্রতিবাদ জানাল বন্দি লোকটা।

এখানে আমিই প্রথমে এসেছি, যুক্তি দেখাল বার্ট; তারপর আবার বলল, এসব কথা আগেও হয়েছে, তাই এখন তার নতুন করে বলে কোন লাভ নেই। এখানে গরু চোরের জন্যে একটা জিনিসই কেবল ফ্রী, সেটা হচেছ ফাঁসির দড়ি।

গাছের গুড়ির ওপর বসা লোকটা হতাশ ভাবে কাঁধ উঁচাল। আমি চোর নই, কিন্তু তোমরা যেভাবে আমাকে আটক করে বেঁধে রেখেছ তাতে আমার বিদায় নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। আমার ছেলেটা না থাকলে কোন তোয়াক্কাই ছিল না আমার। এভাবে লড়াই করে টিকে থাকার কোন অর্থই হয় না, কিন্তু আমি ছাড়া, ছেলেটার আর কেউ নেই।

এতদিনে তোমার বিদায় নেয়ার কথা মনে পড়ল? কঠিন আর নিষ্ঠুর স্বরে বলল বলিষ্ঠ লোকটা। এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, এখন আর তা হয় না-তোমাকে বহুদিন আগেই এখান থেকে চলে যেতে বলা হয়েছিল, তখনই তোমার যাওয়া উচিত ছিল। আমার কথায় তুমি কান দাওনি; এখন ফাঁসি ছাড়া তোমার আর কোন পথ নেই।

হার্ভি ধীরে মুখ তুলে তাকাল। চেহারায় বিস্ময়ের চিহ্ন ফুটে উঠল। এতক্ষণ পর্যন্ত তার ধারণা ছিল যে তাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করা হবে, কিন্তু এখন বার্টের নিষ্ঠুর চেহারা দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারছে, তাকে মেরে ফেলাই লোকটার উদ্দেশ্য। অভিযোগটা বাই তাকে মেরে ফেলার জন্যে সাজিয়েছে। আবার একে একে সে সবার চেহারা দেখল। ওদের মধ্যে কেবল বার্ট আর হেনডন ছাড়া আর সবাই তার অপরিচিত। ওদের সবাই ওর দিকে নিষ্ঠুর চোখে। চেয়ে থাকল, একমাত্র হেনডনই তার চোখ নামিয়ে নিল। বাকি সবার চোখে সে একজন ঘৃণ্য গরু চোর ছাড়া আর কিছুই না। কোনরকম করুণার অযোগ্য।

তোমরাও কি এই অবিচার মুখ বুজে সহ্য করবে? হতাশ স্বরে প্রশ্ন করল

কেবল হেনডনই ওর পক্ষ নিয়ে কথা বলল। শোনো, বস, ও যদি সত্যিই দেশ ছেড়ে চলে যায়– শুরু করেছিল সে।

ধমক দিয়ে ওকে থামিয়ে দিল বার্ট। অসম্ভব! ওকে অনেক দয়া দেখানো। হয়েছে। আমরা অনেকদিন ওর অত্যাচার সহ্য করেছি, আর নয়। নেস্টার আর ইন্ডিয়ানদের মধ্যে কোন তফাত নেই–মৃতগুলোই কেবল ভাল। চুরির মাল সমেত ধরা পড়েছে ও। এটা হয়ত অন্যান্য নেস্টারদের জন্যেও একটা দৃষ্টান্ত হবে; ওরা বুঝবে এখানে ওদের দৌরাত্ম সহ্য করা হবে না। তোমার দড়িটা নিয়ে এসো, ডোভার।

যাকে আদেশ করা হলো সে এগিয়ে তার ঘোড়ার পিঠে ঝোলানো দড়ির কয়েলটা নিয়ে ফিরে এলো।

আমার বাবাকে তুমি ছেড়ে দাও, নইলে তোমাকে আমি সোজা জাহান্নামে পাঠিয়ে দেব, বার্ট।

আদেশটা চড়া চিকন সুরে এলো। ওর কচি স্বরটা রাগে নাকি ভয়ে কাঁপা শোনাল তা ঠিক বোঝা গেল না। সবাই বক্তার দিকে ফিরে তাকাল। দেখল একটা বারো-তেরো বছর বয়সের নীল শার্ট পরা বাচ্চার থেকে চূড়ান্ত আদেশটা এসেছে। বড়দের কাছে ওটা একটা হাসির ব্যাপারই মনে হত, কিন্তু ওর হাতে সরাসরি বার্টের বুক লক্ষ্য করে ধরা ভারী রাইফেলটা হালকা ভাবে নেয়া যায় না। এবং ছেলেটার চেহারা গভীর আবেগে ভরা।

আমি ঠাট্টা করছি না, বার্ট, চেঁচাল সে। আমার বাবাকে ছেড়ে দাও বলছি, নইলে তোমাকে মেরে ফেলব আমি!

হুমকির মুখে বার্ট হেসে উঠল। ঠিক আছে, বাছা, বলে সে হার্ভির দিকে এগোল। কিন্তু একই সাথে সে দড়ির ফাস হাতে লোকটার দিকে চেয়ে উদ্দেশ্যপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়ে চোখ টিপল। ছেলেটা বার্টের ওপর চোখ রেখেছিল। তাই সে ডোভারের কজির হঠাৎ নড়ে ওঠা লক্ষ করল না। যখন টের পেল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে; দড়ির ফাসটা ছেলেটার কাঁধে এঁটে বসেছে। একটা জোর হেঁচকা টান ওকে মাটিতে ফেলে দিল। তবু পড়ে যাওয়ার আগেই সে ট্রিগার টেনে দিল, কিন্তু গুলিটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো।

নরকের শয়তানের বাচ্চা, ছেলেটাকে কাবু করে বেঁধে ফেলার পর অবজ্ঞার সাথে মন্তব্য করল বার্ট। ওর বয়স আর একটু বেশি হলে ওকে স্রেফ খুন করে ফেলতাম আমি। তোমাদের কেউ আমাদের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওকে ঘরে নিয়ে আটকে রাখো।

হেনডন নিজে থেকেই ওই কাজের ভার নিতে এগিয়ে এসে ওকে ঘরে নিয়ে গেল। ছেলেটা সমানে গালি দিচ্ছে আর নিষ্ফল ভাবে পা ছুঁড়ছে। বার্ট তার ভাড়াটে গুণ্ডাদের দিকে ফিরল।

তোমাদের কাজ শেষ হলে ছাপরায় আগুন ধরিয়ে করাল থেকে সবগুলো গরু তাড়িয়ে নিয়ে এসো, কঠিন সুরে সাঙ্গপাঙ্গকে আদেশ দিয়ে নিজের ঘোড়া নিয়ে সে রওনা হয়ে গেল। যাকে সে আসন্ন মৃত্যুর মুখে ফেলে গেল তার দিকে একবার ফিরেও তাকাল না।

*

একঘণ্টা পর ছেলেটা ক্ৰীকের ধারের ঝোঁপের ভিতর তার লুকানো অবস্থান থেকে বেরিয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে পুড়ে ছাই হওয়া বাড়ি পার হয়ে বড় কটুউড গাছটার দিকে এগোল। ছাপরা থেকে এখনও ধোঁয়া উঠছে। গাছে ঝুলানো বাবার নিথর মৃতদেহটা দেখে সে ভীষণ ভাবে কেঁপে উঠল এক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে থাকার পরে পা নড়তে না চাইলেও মনের জোরেই সে আবার এগোল। মৃতদেহের নিচেই কতগুলো জিনিস স্তূপ হয়ে পড়ে আছে–পুরোনো একটা মানিব্যাগ, তামাকের থলি আর একটা পাইপ, একটা লকেট, যার ভিতর ওর মায়ের ছবি আছে বলে সে জানে, একটা ভাঁজ করা বড় ছুরি, আর একটা কাগজ।-ওটাতে দ্রুতহাতে পেনসিল দিয়ে লেখা কয়েকটা শব্দ:

গুডবাই, বাছা। খুশি মনেই আমি বিদায় নিচ্ছি। আমাকে ভুলে যেয়ো না। আমি জানি উচিত কাজই তুমি করবে। বাবা।

পানি ভরা ঝাপসা চোখে মেসেজটা পড়ল সে।

রূদ্ধস্বরে সে আপন মনেই বলল, আমি যা উচিত সেটাই করব, বাবা, ওই। শয়তানটাকে আমি উচিত সাজাই দেব।

এর আগে যা সে বহুবার নিছক আনন্দের জন্যে করেছে, তাই তাকে আবারও করতে হলো; তবে এবার তা মোটেও আনন্দময় হলো না। গাছে চড়ে ছুরি দিয়ে ফাঁসির দড়িটা কেটে দিল। ঝপ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল হার্ভির শিথিল দেহ। মাথাটা ঝিমঝিম করছে ওর। কয়েক মুহূর্ত গাছের ডাল আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামলে নিয়ে নিচে নেমে এলো। বাবার গালে একটা চুমো খেয়ে ছোট্ট বাগান থেকে একটা বেলচা হাতে ফিরে এসে কবর খোড়া শুরু করল।

ছোট ছেলের জন্যে একটা কঠিন পরিশ্রমের কাজ। কবর দেয়া শেষ করতে বিকেল হয়ে গেল। চলে যাওয়ার জন্যে রওনা হতে গিয়েও সে হঠাৎ কি মনেকরে থমকে দাঁড়াল। পকেট থেকে ছুরিটা বের করে গাছের গোড়ায় সে তার বাবার ব্র্যান্ড ফোর বি বড়বড় অক্ষরে খোদাই করল।

সন্ধ্যা হয়ে আসছে, তবু সদ্য গাছের বাকল তুলে লেখা নামটা যেন ঝলমলে সাদা দাঁত খিচিয়ে অন্যায় লিঞ্চিঙের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

ছেলেটা দেখতে পেল করালের কাছেই একটা গাছের সাথে তার ঘোড়াটা বাধা আছে। ওটার পিঠে তারই পুরোনো জিনটা চড়ানো হয়েছে। এসবের জন্য মনেমনে হেনডনকে ধন্যবাদ জানাল টেড।

আমি তোমার বাবার জন্যে কিছুই করতে পারব না, বাছা, ওর বাঁধন খুলে দিয়ে বলেছিল হেনডন। তবে তোমাকে পায়ে হেঁটে এখান থেকে বিদায় নিতে হবে না। তোমার জন্যে আমি একটা ঘোড়ায় জিন চাপিয়ে করালের পাশে রেখে যাব।

ঘোড়ার পিঠে উঠে শেষ বারের মত পিছন ফিরে তাকাল টেড। সব শেষ হয়ে গেছে।

আমি আবার ফিরে আসব, ব্ল্যাক বার্ট, বিড়বিড় করে বলল টেড বোলটন। এবং যখন ফিরব তখন তৈরি হয়েই ফিরব।

০১.

দুপুরের প্রখর ফোস্কা-পড়া রোদে হোপ এগেইন শহরটা ঝিমাচ্ছে; এই প্রচণ্ড গরমে পরিশ্রম করাটা অভিশাপ, আর ছায়া হচেছ একটা আশীর্বাদ। শহরের এই অদ্ভুত নামকরণের কারণ কেউ সঠিক বলতে পারবে না। হতে পারে নতুনের সন্ধানে কোন অভিযাত্রী-দল হয়ত বহু ধকল সহ্য করে প্রায় মরমর অবস্থায় দূর থেকে এদিকে গাছপালা দেখে এখানে পৌঁছে আশ্রয় পেয়ে শহরের ওই নাম রেখেছিল।

তবে এখানকার বাসিন্দাদের কাছে এখন এটা কেবল বোপ নামেই। পরিচিত। কিন্তু মরুভূমি ছাড়া আর কোনদিক থেকে আসা মানুষের কাছে নামটা অযৌক্তিক বলেই মনে হবে। এটা সীমান্তের অন্যান্য যেকোন শহরের মতই। রাস্তার দুপাশের বাড়িগুলো এমন দেখায় যে মনে হয় নিজেদের অসমান আর দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থার জন্যে যেন ক্ষমা চাইছে। বাড়িগুলোর ফাঁকে ব্যবহার করা খালি টিন আর বিভিন্ন আবর্জনা। এগুলোর মধ্যে দুটো দালানই কেবল শহরের মান কিছুটা রক্ষা করে দাঁড়িয়ে আছে; এগুলোর একটা হচ্ছে হোটেল, আর দ্বিতীয়টা হিউগো সেলুন, যেটার নামের তলায় ‘আবার এসো’ লিখে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এই সেলুনের সংলগ্ন একটা ডান্স হলও রয়েছে। শহরে আর যা আছে তার মধ্যে রোদে পোড়ানো ইটের তৈরি একটা মজবুত ব্যাঙ্ক, দুটো জেনারেল স্টোর, যার মধ্যে একটা পোস্ট অফিসের কাজও করে। এছাড়া একটা কামারশালা আর কয়েকটা ছোট সেলুনও আছে। রাস্তার দুপাশে চওড়া কাঠের ফুটপাত লোকজনের পথ চলার কাজ অনেকটা সহজ করে দিয়েছে। উত্তরের মেসা মাউন্টিন থেকে নেমে আসা ছোট্ট নদীটার ওপর একটা কাঠের ব্রিজও আছে; ওই নদীই শহরবাসীর যাবতীয় পানির চাহিদা মেটায়। তবে নদীটা শহর থেকে মাইলখানেক এগিয়েই মরুভূমির বালুর ভিতর হারিয়ে গেছে। মরুভূমির সৌজন্যে শহরের প্রত্যেকটা বাড়ির ওপরই পুরু ধুলোর পরত পড়েছে।

শহরটাকে একেবারে পরিত্যক্ত বলেই মনে হচ্ছে। পুরো শহরে কেবল একটা ছোট সেলুনের দরজার মুখে দাঁড়ানো দুজন মানুষ ছাড়া আর কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। তাদের একজন বেঁটে আর মোটা সেলুনের মালিক, ফেনটন যার চোখ দুটো নির্মল কৌতুকে সর্বক্ষণ ঝিকমিক করছে। অন্যজন, নবাগত স্ট্রেঞ্জার।

স্বভাবতই নবাগত লোকটার সম্পর্কে জানার কৌতূহল বোধ করছে ফেনটন। কিন্তু প্রকাশ করছে না, কারণ সে ভাল করেই জানে পশ্চিমে বেশি কৌতূহল প্রকাশ করাটা ডিনামাইটের মতই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

লোকটা বেশ লম্বা, বয়স সম্ভবত তিরিশের কোঠায়। চওড়া কাঁধ আর পাতলা কোমরে তাকে দেখেই বোঝা যায় লোকটা শক্ত ধাতুতে তৈরি। কোমরের দুপাশে দুটো পিস্তল ঝুলছে, দ্রুত বের করার সুবিধার জন্যে ওগুলো পায়ের সাথে ফিতে দিয়ে বাঁধা। ওর পরনের কাউবয় পোশাক সাধারণ হলেও পরিচ্ছন্ন। ওর পিস্তল দুটোও যে বহুল ব্যবহার দেখেছে তা দেখেই বোঝা যায়। ওর ঘোড়ার ব্র্যান্ড দেখেও ফেনটনের কোন লাভ হলো না, কারণ ওটা তার অপরিচিত।

ফেনটন আড়চোখে আগন্তুককে দেখে এবার আঁচ করার চেষ্টা করছে। এই শক্ত গড়নের লোকটা কি কোন বেকার কাউবয়, নাকি একজন পিস্তলবাজ, অথবা দুটোই? লোকটা কি কারণে হোপে এসেছে, এটা তো সরাসরি আর কোথাও যাওয়ার পথে পড়ে না-তাহলে লোকটা এখানে কি কারণে এসে। থাকতে পারে? লোকটার এই অদ্ভুত নীরবতা ওকে আরও কৌতূহলী করে তুলেছে।

রাস্তার একটু আগে দোতালা সেলুনের দিক থেকে পিস্তলের গুলির মত শব্দে একটা চাবুক ফোঁটার শব্দ শোনা গেল; একই সাথে একটা কুকুর আর্তচিৎকার দিয়ে প্রায় উড়ে এসে হোটেল থেকে বাইরের রাস্তায় ধুলোর ওপর আছড়ে পড়ল। অকথ্য ভাষায় গালি দিতে দিতে একটা লোক চাবুক হাতে বাইরে বেরিয়ে এলো। কুকুরটা নিজের দুরবস্থা কিছুটা সামলে উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে রাস্তা ধরে ফেনটনের সেলুনের দিকে মাত্র রওনা হয়েছিল, কিন্তু তার আগেই। চাবুকের দ্বিতীয় একটা বাড়ি ওর পিঠের কিছুটা ছাল তুলে নিল।

আমাকে কামড়াতে চেষ্টা করার উচিত শিক্ষাই তোকে আজ আমি দেব, বেজন্মা শয়তান!

কুকুরের ‘কেউ’ শব্দের সাথে লোকটার উল্লাসের হাসি শোনা গেল। পিস্তলের গুলির মত শব্দে যেন ম্যাজিকের মত লোকজনের মাথা হাজির হলো বিভিন্ন বাড়ির দরজা আর জানালায়। কৌতূহলী কিছু লোক ফুটপাতেও নেমে এলো, কিন্তু খুব সতর্ক আছে ওরা, যদি গোলাগুলিই হয় তবে সীসার গুলি কোনদিকে যাবে তার কোন ঠিক নেই। কি ঘটছে দেখার পর ওদের কয়েকজন হেসে উঠল। একজন মন্তব্য করল, পাগলা মার্টি আবার খেপেছে!

চাবুকটা ফেলে দাও! কঠিন স্বরে আদেশ এলো।

স্ট্রেঞ্জার হঠাৎ সজীব হয়ে নিমেশে ফুটপাতে নেমে এলো, ওই কথাটা সে-ই বলেছে। মার্টির খুদে চোখ দুটোতে বুনো বিস্ময় ফুটে উঠেছে।

জাহান্নামে যাও তুমি, রোষের সাথে জবাব দিল সে।

ওটা ফেলে দাও বলছি, পাজি খটাস! আবার নির্দেশ এলো। এবার ওর স্বরে ঠাণ্ডা হুমকির পরিষ্কার স্পষ্ট আভাস।

সেটা টের পেয়ে একটু থমকাল মার্টি। সে স্পষ্ট বুঝে নিয়েছে এখন হয় ওকে আদেশটা মানতে হবে অথবা লড়তে হবে। সে একসাথে দুটোই করার সিদ্ধান্ত নিল। চাবুকটা ফেলে দিয়ে পিস্তল বের করার জন্যে হাত বাড়াল সে। নবাগত লোকটাকে দেখে মনে হলো তার যেন কোন তাড়া নেই। মাটি তার খাপ থেকে পিস্তল না বের করা পর্যন্ত নবাগত লোকটা একেবারে স্থির দাঁড়িয়ে। থাকল। কিন্তু পিস্তলটা খাপ থেকে বের করার সাথেসাথেই কোমরের পাশ থেকে স্ট্রেঞ্জারের বাম হাতের পিস্তল গর্জে উঠল। মার্টি কাত হয়ে ধুলোর ওপর পড়ল। পিস্তলটাও হাত থেকে ছুটে ধুলোয় গড়াচ্ছে। এবার নবাগত লোকটা মার্টির। দিকে এগিয়ে গেল।

ওই কুকুরটা কি তোমার? প্রশ্ন করল সে।

আহত লোকটা রোষের সাথে জবাব দিল, হ্যাঁ, কিন্তু তাতে তোমার কি?

আমি তোমার কুকুরটাকে কিনে নিচ্ছি, ঠাণ্ডা স্বরে জবাব দিল লোকটা। তারপর পকেট থেকে নোটের একটা মোটা বান্ডিল বের করে ওখান থেকে একটা নোট খুলে মার্টির দিকে ছুঁড়ে দিল। কুকুরের দামের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি দিলাম, এবং তোমার পঞ্চাশ গুণ, অবজ্ঞার সুরে বলল সে।

ব্যাপারটার এখানেই শেষ নয়-এর পুরো শোধ আমি তুলে ছাড়ব! রাগে দাঁত কিড়মিড় করে বলল মার্টি।

আগে নিজেকে সামলে নাও তারপর আমার সামনে দাড়াবার কথা ভেবো।

বাম হাত দিয়ে ডান হাতের জখম চেপে ধরে উঠে দাঁড়াল সে। ওর আঙুলের ফাঁক দিয়ে ফোঁটাফেঁটা রক্ত বেয়ে পড়ছে। ওকে কয়েক সেকেন্ড লক্ষ করে কুকুরটার দিকে নজর দিল বিজয়ী। ওটা অবলা প্রাণী হলেও পুরো ঘটনা দেখে সে ঠিকই বুঝেছে অকথ্য নির্যাতন থেকে ওকে কে বাঁচিয়েছে-এবং কে ওর বন্ধু। লেজ নাড়তে নাড়তে কম বয়সী কুকুরটা ওর ত্রাণকর্তার দিকে এগিয়ে এলো। ঝুঁকে মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে একটু আদর করে দিল লোকটা।

তোমাকে অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে, বাছা, বলল সে। তোমার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে নিয়মিত খাবারও তোমার কপালে জোটেনি। ঠিক আছে, সেটার ব্যবস্থা আমি করব।

কাপুরুষ!

স্বরটা নিচু, এবং যেটা মিষ্টি হওয়ার কথা, সেটা এখন রাগ আর বিদ্বেষে। ভরপুর। কুকুরটাকে আদর করা ছেড়ে অবাক হয়ে লোকটা মুখ তুলে চাইল। পাশের একটা দোকান থেকে কথাটা বলা হয়েছে। বক্তা মাঝারি উচ্চতার। পাতলা গড়নের সুন্দরী এক তরুণী মেয়ে। রাইডিং পোশাক পরায় ওর সুগঠিত দেহের সৌন্দর্য আর বাঁকগুলো যেন স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। মেয়েটার গলায় একটা রুমাল কাউবয় স্টাইলে পেঁচানো রয়েছে। মাথার মোটা কাপড়ের নরম হ্যাটটা ওর বাদামী চুল পুরোপুরি চাকতে পারেনি। ওই চুলের ওপর রোদ পড়ে একটা চমৎকার তামাটে উজ্জ্বলতা এনেছে।

লোকটা মরে যেতে পারত, রাগের সাথে বলে চলল সে।

স্বভাবতই স্ট্রেঞ্জার বুঝতে পারছে যে মেয়েটা কুকুরের মালিক সম্পর্কেই কথা বলছে। লোকটার চোখে দুষ্টুমির হাসি ফুটে উঠল।

আমি চাইলে সে অবশ্যই মরত, গম্ভীর স্বরে জবাব দিল সে। কিন্তু আমি কেবল ওর পিস্তল ধরা হাতটা জখম করেছি। মনে হচ্ছে তুমি কুকুর পছন্দ করো না, ম্যাম?

তোমার ধারণা ভুল-আসলে কুকুর আমার খুব প্রিয়, জবাব দিল মেয়েটা। কিন্তু ওদের আমি মানুষের সম পর্যায়ের বলে মনে করি না।

স্ট্রেঞ্জারের চোখদুটো আনন্দে ঝিলিক দিয়ে উঠল। তুমি ঠিক কথাই বলেছ, বলে উঠল সে। কোনকোন সময়ে সেটা কুকুরকে অপমান করারই সামিল হয়।

মেয়েটা নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল। তুমি ওই লোকটাকে উস্কে পিস্তল ড্র করতে বাধ্য করেছ। কারণ তুমি জানতে তুমিই ওর আগে গুলি ছুঁড়তে পারবে।

যাকে আমি আগে কখনও দেখিনি তার ক্ষিপ্রতা সম্পর্কে আমি কিভাবে জানব? শান্ত স্বরে নিজের পক্ষে যুক্তি দেখাল সে। তাছাড়া সে তার পিস্তল বের করে ফেলেছিল, এবং তার উদ্দেশ্য মোটেও ভাল ছিল না।

হ্যাঁ, সমান সমান সুযোগ-পেশাদার খুনীর সেই চিরাচরিত অজুহাত, মেয়েটা ঘৃণার সাথে বলল। তুমিও একটা খুনী, তাই ওই অজুহাত দেখাচ্ছ, আমার ধারণা পিস্তলে আরও একটা আঁচড় বাড়াবার উদ্দেশ্যেই তুমি এটা করেছ। জানো, গুলি ছোড়ার সময়ে আমি তোমাকে হাসতে দেখেছি!

এক ঝটকায় পিস্তলের হাতল দুটো মেয়েটাকে দেখাতে তুলে ধরল সে। তারপর ওগুলো আবার খাপে ভরে রেখে কুকুরটার উদ্দেশে বলল, মনে হচ্ছে এখন থেকে বাঁট দুটোতে আমার কিছু আঁচড় কাটা শুরু করতে হবে; এই কাজটা পুরোপুরি আমাদের নজর এড়িয়ে গেছে, বাছা।

আগুন বর্ষানো চোখে মেয়েটা ওর দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে তুমি অসম্ভব রকম উদ্ধত, বলে আবার দোকানে ঢুকে পড়ল।

মেয়েটার সাথে কথা বলার সময়ে লোকটা মাথা থেকে হ্যাটটা নামিয়ে নিয়েছিল, সেটা আবার পরে নিয়ে কুকুরটাকেই বলল, এখানে আমরা একেবারেই অবাঞ্ছিত, বাছা, ওর কাছে আমাদের মূল্য রাস্তার ধুলোর চেয়েও কম। তবে মেয়েটা দেখলে যে চোখ জুড়িয়ে যায় তাতে কোন সন্দেহ নেই।

ওর কথা শেষ হতেই চারজন ঘোড়সওয়ার ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে ফেনটনের সেলুনের পাশে এসে থামল। ওদের লীডার বিশাল দেহধারী কালো চুলের একটা লোক; নাকটা টিয়ার ঠোঁটের মতই বাঁকা। বোঝাই যাচ্ছে লোকটার মেজাজ খুব চড়ে আছে।

তুমিই সেই লোক যে আমার একজন লোককে গুলি করেছে? এক নিঃশ্বাসে বলল লোকটা।

তুমি কি আমার সাথে কথা বলছ? মুখ তুলে চেয়ে প্রশ্ন করল স্ট্রেঞ্জার। আমি একটা দুপেয়ে খটাসকে গুলি করেছি বটে; সে যদি ভোমার আউটফিটের কেউ হয়, তাহলে বলতেই হবে মানুষ আর জন্তুর তফাৎ তুমি বোঝ না।

লোকটা অপমানটা উপেক্ষা করে বলল, একটা কুকুর আর তার মালিকের মধ্যে কোন অধিকারে নাক গলিয়েছ তুমি?

আমার ডাইনে আর বায়ে দুদিকেই একটা করে অধিকার ঝুলছে, দাঁত বের করে হেসে পিস্তলের বাঁট দুটো ছুঁয়ে জবাব দিল সে।

হুম, তাহলে তুমিও বেয়াড়া দলের একটা লোক, অবজ্ঞার সাথে বলল সে। এখানে তোমার কি কাজ?

সেটা আমার নিজস্ব ব্যাপার, উদ্ধত স্বরে বলল স্ট্রেঞ্জার; তুমি জিজ্ঞেস করার কে? তুমি কি এখানকার শেরিফ বা তার কোন ডেপুটি?

যেমন ধীর স্বরে কথাগুলো উচ্চারিত হলো তা সুস্পষ্ট ভাবেই অপমানজনক। দলপতির চোয়াল দুটো রাগে শক্ত হয়ে ফুলে উঠল।

আমি শেরিফ নই, বলল সে। কিন্তু

কিন্তু তোমার আদেশেই সে চলে, ওকে বাধা দিয়ে ব্যঙ্গের সুরে বলল স্ট্রেঞ্জার। ভাল, সেটা তো প্রায় সমান কথাই হলো, তাই না? এবার কঠিন সুরে বলল, তোমার পিছনের লোকটা যদি তার হাত স্থির না রাখে তাহলে তোমার আরও একটা লোক কমে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

এর মধ্য নাক গলাতে এসো না, ডোভার, যা করার তা আমিই করব, বলল লীডার। তারপর আবার স্ট্রেঞ্জারের দিকে ফিরে বলল, আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এখানে তোমার কি কাজ। আমার ধৈর্যের সীমা পরীক্ষা করতে চাওয়ার ফল ভাল হবে না।

অপরিচিত লোকটা হাসল। তোমার ধৈর্যের সীমা! বলল সে। না, তোমার কতটা নার্ভ আছে সেটাই আমি দেখতে চাই। ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই লোকগুলো চেয়ে, অবাক হয়ে দেখল দুহাতে দুটো পিস্তল বাগিয়ে ধরে ওদের কাভার করে আছে স্ট্রেঞ্জার। ও যে কখন পিস্তল বের করেছে তা টেরই পায়নি কেউ। শোনো, তোমাদের ভালর জন্যেই আমি বলছি, ঠাণ্ডা স্বরে হুমকি দিল সে, তোমাদের চারজনকে ফেলে দিতে আমার চার সেকেন্ড সময় লাগবে না। লোকটা যে মিথ্যে হুমকি দেয়নি সেটা ওর পিস্তল ড্র করার ধরন দেখেই নিঃসন্দেহে বুঝে নিয়েছে ওরা। ফিরে যাওয়ার জন্যে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিল সবাই। শেষ কথাটা ওদের দলপতিই বলল।

এবারে তোমার জিত হলো বটে, কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ হলো মনে করলে খুব ভুল করবে-আবারও আমাদের দেখা হবে।

আমিও সেই আশাতেই থাকলাম, জবাব দিল, স্ট্রেঞ্জার।

অনেকগুলো কৌতূহলী লোকের বিহ্বল দৃষ্টির সামনে অভিভূত আর অপমানিত দলটা ধীর গতিতে এগিয়ে আবার এসে সেলুনের সামনে ঘোড়া থামিয়ে দরজা দিয়ে ভিতরে অদৃশ্য হলো। নবাগত লোকটা ঘুরে দাড়িয়ে দেখল ফেনটন সেলুনের মালিক অবাক চোখে ওর দিকেই চেয়ে আছে।

কি হলো, ওল্ড টাইমার? কোন সমস্যা হয়েছে?

সমস্যা আমার হয়নি-সমস্যাটা হয়েছে তোমার। তুমি জানো ওই লোকটা কে? ওকে মাথা নাড়তে দেখে সে বলে চলল, ওর নাম ব্ল্যাক বার্ট, যদিও ওর সামনে কেউ ওকে ওই নামে ডাকতে সাহস পায় না, কেবল বার্ট বলেই ডাকে। ও যখন কথা বলে, কেউ ওর চোখে চোখ রেখে কথা বলে না-মাথা হেট করে থাকে।

তাই নাকি? সহজ সুরে বলল সে। তাহলে তো এটা ওর জন্যে নতুন একটা অভিজ্ঞতা হলো।

হ্যাঁ, কিন্তু এর গুরুত্ব ঠিক বুঝতে পারছ না তুমি। সোজা ভীমরুলের চাকে হাত দিয়েছ তুমি। এটা মোটেও হাসির ব্যাপার নয়। এই পুরো শহরটাই ওর হাতের মুঠোয়। প্রথম সুযোগেই তোমাকে সে তার দলবল নিয়ে গুলি করে আঁঝরা করবে।

আশা করি এই শহরে বেশ বড়সড় কবরখানা আছে, কারণ ওরা আমার সাথে লাগতে এলে ওটার প্রয়োজন হবে, জবাব দিল সে। কবরে গেলে আমি একা যাব না, ওদেরও সাথে নিয়ে যাব।

এটা ঠিক যে তুমিও ওদের কিছু লোককে মারতে পারবে বটে, কিন্তু তাতে কি লাভ হবে? একজন লোক কি বিশজনের বিরুদ্ধে জিততে পারবে? বার্টের সাথে আমার মোটেও সখ্যতা নেই, কিন্তু তোমার পক্ষ নিলে সে আমার দোকান লণ্ডভণ্ড করে দেবে-তবু প্রয়োজন হলে তোমাকে আমি সাহায্য করব।

স্ট্রেঞ্জারের চোখ দুটো খুশিতে উতল হয়ে উঠল। তুমি খুব সাদা মনের লোক, স্যার, বলল সে। এখনকার মত আমি নিজের পথ ধরছি; পরে আবার দেখা হবে।

ওর চলায় কোনরকম তাড়া দেখা গেল না। সোজা দোকানের সামনে রাখা নিজের ঘোড়র কাছে গিয়ে সে জিনে চেপে বসে শিস দিয়ে কুকুরটাকে ডাকল।

অবলা প্রাণী হলে কি হবে, ওর চোখের সামনে যা যা ঘটেছে সবই সে লক্ষ করেছে। কে যে তার বন্ধু সেটা সে ঠিকই বুঝেছে। শিস শোনার সাথেসাথে সে দৌড়ে ছুটে এল। শহর ছেড়ে ট্রেইল ধরার পর থেকে সে-ই ঘোড়ার আগে আগে ছুটল। যেন কাল্পনিক খরগোশের পিছনে ধাওয়া করছে। কিন্তু অল্পক্ষণ পরপরই আবার ফিরে এসে নতুন প্রভুকে উত্তেজিত স্বরে অভিনন্দন জানাচ্ছে।

তুমি একটা কৃত বাচ্চা কুকুর, তাই না? কুকুরের উচ্ছ্বসিত আনন্দের প্রকাশ দেখে মন্তব্য করল রাইডার। এখনও তোমার দাম পুরোপুরি চুকানো হয়নি বলেই আমার বিশ্বাস।

সেলুনের মালিক ওকে যতক্ষণ দেখা যায় দরজার মুখেই দাঁড়িয়ে থেকে শেষে নিজের খালি সেলুনের বারের পিছনে দাঁড়াল; গভীর চিন্তায় মগ্ন তার চেহারা।

সবাই তোমরা চুপ করো, বিড়বিড় করে খালি সেলুনে যেন নিজেকেই বল সে, শহরে একটা লোক এসেছে বটে!

০২.

জ্যাক মাস্টারসন, লেজি এম র‍্যাঞ্চের মালিক তার র‍্যাঞ্চহাউসের বারান্দায় একটা চুরুট মুখে বসে চিন্তামগ্ন মনে ট্রেইলের দিকে চেয়ে আছে। ওটা একটা সরু সাদা ফিতের মত এঁকেবেঁকে হোপ এগেইন শহরের দিকে এগিয়ে গেছে। সাধারণত হাসিখুশি চেহারার লোকটাকে গত কয়েক বছর ধরেই মাঝেমাঝে একটা কালো বিষণতায় ডুবে থাকতে দেখা যায়। এই এলাকার সবথেকে ভাল এবং অনেক বর্গমাইল জায়গা জুড়ে তার র‍্যাঞ্চ থাকা সত্ত্বেও ওর এই বিষণ্ণতার কি কারণ থাকতে পারে এটা বোঝা ভার।

অল্পক্ষণের মধ্যেই র‍্যাঞ্চারের অভিজ্ঞ চোখে ট্রেইলের ওপর বহু দূরে একটা ছোট্ট বিন্দুর মত কি যেন ধরা পড়ল। পনেরো মিনিটের মধ্যেই ওটা বড় হয়ে একজন রাইডারে পরিণত হলো। ওর সামনে আরও একটা ছোট বিন্দুর মত কিছু ছুটছে।

এটা নিশ্চয় সেই লোক, আপন মনেই বলল র‍্যাঞ্চার। কিন্তু একটা কয়োটিকে সে কেন ধাওয়া করছে?

র‍্যাঞ্চহাউসের ঢাল শুরুর কাছে ট্রেইলটা বাঁক নিয়েছে বলে রাইডার। কিছুক্ষণের জন্যে বাঙ্কহাউসের আড়ালে অদৃশ্য হলো। জ্যাক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অস্থির ভাবে বারান্দায় পায়চারি করা শুরু করল। ওকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না; শীঘ্রি রাইডারকে আবার দেখা গেল। হাত তুলে সংবর্ধনা জানিয়ে বিশ গজ দূরে ঘোড়া থামিয়ে দাঁড়াল সে।

হ্যালো, জেমস; আবার তোমার দেখা পেয়ে খুব খুশি হলাম। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে ভিতরে এসো।

যে কামরায় ওরা ঢুকল সেটা এই সময় আর দিনকাল অনুযায়ী অত্যন্ত বিলাসী। পুরো কামরার মেঝে কারপেটে মোড়া; ভারী ওকের আসবাবপত্র শোভা পাচ্ছে; একটা পিয়ানোও রয়েছে। বোঝা যাচ্ছে চল্লিশ মাইল দূরে অবস্থিত স্টেশন থেকে ওগুলো ওয়্যাগনে করে এখানে বয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। খোলা ফায়ার প্লেসের সামনে পাতা রয়েছে একটা ভালুকের চামড়া। দেয়ালে শোভা পাচ্ছে নানারকম ইন্ডিয়ান ট্রোফি আর ছবি অতিথি আপ্যায়নের জন্যে টেবিলের ওপর একটা বোতলের সাথে দুটো গ্লাস রেখে চুরুটের বাক্সটা ওর দিকে ঠেলে দিল সে। একটা চুরুট তুলে নিয়ে অপেক্ষায় রইল জেমস।

দুহপ্তা আগে আমার ফোরম্যান স্টিভকে কেউ পিছন থেকে গুলি করে হত্যা করেছে,’ কথা আরম্ভ করল র‍্যাঞ্চার। আমি ওদের অনেক টাকা দিয়েছি, কিন্তু এখন আমার পক্ষে আর টাকা জোগাড় করা সম্ভব নয়। স্টিভ খুব অনুগত আর শান্ত প্রকৃতির লোক ছিল, এবং ওর কোন শত্রু ছিল বলে আমার জানা নেই। যে লোক ওর জায়গা নেবে তাকেও একই রকম বিপদ পোহাতে হবে। পরিস্থিতিটা বুঝতে পারছ তো?

নিশ্চয়, বেপরোয়া সুরে জবাব দিল জেমস।

অনেক বছর ধরে একটা লোক আমার পিছনে লেগে আছে। এখন সে আমার গরু নিয়ে যেতে শুরু করেছে। ওকে উচিত শিক্ষা দেয়ার একটা পরিকল্পনা আমার আছে। কিন্তু এতে আমি বিফলও হতে পারি। কারণ কাজটায় বেশ ঝুঁকি আছে। তাই একজন যোগ্য লোকের হাতে আমি এই র‍্যাঞ্চের ভার তুলে দিতে চাই। সেইজন্যেই আমি তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি। তোমার কি মত?

লোকটা কে? প্রশ্ন করল আগন্তুক।

ব্ল্যাক বার্ট, বার বির মালিক। মেসা মাউন্টিনের কাছে ওর র‍্যাঞ্চ, জবাব দিল জ্যাক। এবার সে আমার র‍্যাঞ্চের দিকে হাত বাড়াবে।

আমি তোমাকে সাহায্য করব, সংক্ষেপে জবাব দিল সে।

র‍্যাঞ্চারের চেহারা আশ্বস্ত দেখাল। পরবর্তী কথায় বোঝা গেল লোকটা আসলেই সৎ। সে বলল, তুমি যদি আমার প্রস্তাবটা বিবেচনা করে দেখার জন্যে দু’এক দিন সময় নিতে চাও তাতে আমি কিছু মনে করব না। তুমি বরং একটু ভেবেচিন্তেই জবাব দিয়ো। কারণ যে-প্রস্তাবটা আমি দিয়েছি সেটা সত্যিই একটা শক্ত কাজ। এই এলাকায় বার্টই হচেছ সর্বেসর্বা। কেউ ওর বিরোধিতা করলে সে বেশিদিন বাঁচে না-সেইজন্যেই তোমাকে আমি সময় নিয়ে ভেবে জবাব দিতে বলছি।

আমার তরফ থেকে এতে ভেবে দেখার কিছুই নেই, বলল জেমস। কিন্তু একটা কথা তোমাকে আমার জানিয়ে রাখা উচিত, সেটা হচেছ জাজ এমারি তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময়ে আমাকে জেমস গ্রীন বলে পরিচয় দিলেও আমার আসল নাম হচ্ছে এরফান জেসাপ। টেক্সাসে আমি বিদ্যুৎ এরফান বলেই বেশি পরিচিত; হয়ত নামটা তুমি শুনেছ?

হঠাৎ সোজা বসে অবাক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ এরফানের দিকে চেয়ে থেকে সে বলল, শুনেছি মানে? ওই নাম এদিকের সবার কাছেই পরিচিত। পিস্তলে তোমার হাত বিদ্যুতের মত দ্রুত চলার গল্প এখানে আমরা অনেক শুনেছি।

সেইজন্যে জাজকে আমার নামটা গোপন রাখতে আমিই অনুরোধ করেছিলাম, এবং তোমাকেও আমি একই অনুরোধ করছি তুমি আমাকে জেমস বলেই ডেকো। এখানে কথাটা এত সহজে জানাজানি হয়ে যাক এটা আমি চাই না; এতে আমার কাজ কিছুটা সহজ হবে।

বেশ, তুমি যা চাও তাই হবে। আমি জানি তোমাকে আউটলরাও যমের মতই ভয় করে। তোমার পরিচয় জানলে সহজে তোমার কাছে কেউ মুখ খুলবে না এটা আমি ভাল করেই জানি। ওই বার্ট লোকটা একটা পাকা শয়তান। সে-ই এখন আমাকে জ্বালাতন করছে। র‍্যাঞ্চার এরফানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। শেক, বলল সে।

হাত মিলিয়ে এরফান বলল, তাহলে আমিও তোমাকে জ্যাক বলেই ডাকব।

জ্যাক বলল, এখন আমার আশা হচ্ছে যে আমার কপাল সত্যিই বদলাতে শুরু করেছে। আমি তো শুনেছি তোমার নিজেরই ওয়াইওনিঙে একটা বিরাট র‍্যাঞ্চ রয়েছে: তুমি এর মধ্যে নিজেকে জড়াতে যাচ্ছ কেন?

এমারি আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, এবং এতে আমার নিজস্ব কারণও কিছু আছে। তাছাড়া ইতোমধ্যে এর সাথে হরে আরও কিছু কারণ যোগ হয়েছে। শহরে ব্ল্যাক বার্টের সাথে যা যা ঘটেছে তা খুলে বলল সে মেয়েটার কথাটা কেবল এড়িয়ে গেল।

বার বি মালিকের এভাবে সবার সামনে অপমানিত হওয়ার বর্ণনা শুনে হো হো করে হেসে উঠল জ্যাক ব্ল্যাক বার্ট আর তার তিন সঙ্গীর ওই দুরবস্থা, নিজের চোখে দেখার জন্যে আমি ওরডান হাত কেটে দিতেও আপত্তি করতাম না। আমার মনে হয় আগে তাকে কখনও চারজন থাকা সত্ত্বেও একজনের বিরুদ্ধে এই ধরনের অপমান হজম করতে হয়নি। এটা সে সহজে ভুলবে না, জেমস। পাগল মাটিও সাইড ওয়াইন্ডার সাপের মতই বিও। (ওই মরু-সাপের মুখ সামনের দিকে থাকলেও ওরা এঁকেবেঁকে পাশের দিকে চলে বলেই ওই সাপের এই নামকরণ করা হয়েছে) তোমার এখন থেকে একটু সাবধানে চলাফেরা করা দরকার।

আমি সবসময়েই সাবধানে চলি, বলল এরফান। তোমার সব লোকজন কি বিশ্বাসী?

র‍্যাঞ্চার মাথা নাড়ল। আমার সেটা জানা নেই, জবাব দিল সে। ওটা তোমার নিজেকেই বিচার করে বুঝে দেখাতে হবে। কিছু লোককে বাটের চাপে পড়ে আমাকে কাজে নিতে হয়েছে। এই ব্যাপারে তোমার পুরো স্বাধীনতা থাকবে।

মাথা ঝাঁকাল এরফান। তুমি বলছ বার্ট তোমার গরু নিয়ে যাচ্ছে। তুমি কি বলতে চাও সে ওগুলো চুরি করছে?

না, ও একটা সাক্ষাৎ শয়তান, খেপে উঠল জ্যাক। সে শুধু বলে দেয়। পঞ্চাশ বা একশোটা গরু পাঠিয়ে দাও, এবং আমাকে বাধ্য হয়ে তাই পাঠাতে হয়। একটা বিশেষ কারণ আছে যেজন্যে ওর প্রস্তাব আমি এখনও প্রত্যাখ্যান করতে পারছি না। তুমি এখানে এসে পড়ায় আমি স্বস্তি পাচ্ছি, জেমস; আমার বিশ্বাস যদি কেউ পারে তাহলে একমাত্র তুমিই ফিল আর আমাকে এই সমস্যা থেকে উদ্ধার করতে পারবে।

ফিল? আমি জানতাম না তোমার একটা ছেলেও আছে।

না, আমার কোন ছেলে নেই; ফিলিপা আমার মেয়ের নাম। আমার কোন ছেলে নেই বলে ওকেই আমি ফিল বলে ডাকি।

এই সময়ে বাইরে থেকে পাতলা স্বরে একটা ডাক শোনা গেল। হ্যালো, দা হাউস।

ওই যে ফিল এসে গেছে, বলে উঠে দাঁড়াল র‍্যাঞ্চার। আমি একটা ছেলেই চেয়েছিলাম, কিন্তু যখন মেয়ে হলো তখন ওকে দিয়েই আমাকে ছেলের সাধ মেটাতে হলো। মনে রেখো, ও কিন্তু এসব কোন কথাই জানে না।

জ্যাকের পিছন পিছন এরফানও বারান্দায় বেরিয়ে এলো। মেয়েটা বাবাকে আন্তরিকভাবে জড়িয়ে ধরে আদর জানানোর পরে শহরে দেখা নবাগত লোকটার দিকে ওর চোখ পড়ল। ওকে দেখামাত্র বাবাকে ছেড়ে পিছিয়ে গেল সে।

ফিল, তোমাদের পরিচয় করিয়ে দিই, বলল সে। এ হচ্ছে জেমস গ্রান, স্টিভের জায়গায় ওকে কাজে নিয়েছি আমি।

মেয়েটা হ্যান্ডশেক করার জন্যে হাত বাড়াল। ওর চোখে কোন স্বাগত জানানোর চিহ্নও ফুটে উঠল না। মিস্টার গ্রীনের সাথে আমার আগেই দেখা হয়েছে, নির্লিপ্ত স্বরে বলল সে।

র‍্যাঞ্চার অবাক হয়ে চেয়ে আছে দেখে ব্যাখ্যা করল এরফান।

আমি কুকুরটা কেনার সময়ে মিস মাস্টারসন ওখানে উপস্থিত ছিল। আমার সাথে, বেশ কিছু কথা কাটাকাটি হওয়ার পর লোকটা পিস্তল বের করে। আমি হাতে গুলি করে ওর পিস্তলের হাত জখম করেছি সেটা তোর তোর ঠিক পছন্দ হয়নি।

গম্ভীর সুরেই কথা বলেছে এরফান; কিন্তু তবু মেয়েটার কাছে মনে হয়েছে ওর চোখদুটো যেন বঙ্গভরে হাসছে। এতে ওর রাগ আরও বড় র‍্যাঞ্চারের চোখ এরফানের ঘোড়ার পাশে ধৈর্য ধরে বসে থাকা কুকুরটার ওপর পড়ল।

কুকুর সম্বন্ধে আমার বিশেষ জ্ঞান নেই, তবে ওটাকে দেখে তো আমার কাছে নিতান্ত সাধারণ একটা কুকুর বলেই মনে হচ্ছে; ওটার জন্যে তুমি এত ঝামেলা পোহাতে গেলে কেন?

সাধারণ কুকুরই আমার পছন্দ। ওটা অন্তত গর্বে নাক উঁচু করে আমাকে সাধারণ কাউবয় হিসেবে হেয় মনে করবে না। না, স্যার, ওই কুকুরটা যথেষ্ট বুদ্ধি রাখে। ওর চোখদুটো বেশ দূরে বসানো; আমার সাথে চলার যোগ্যতা ওর আছে।

র‍্যাঞ্চার ওর কথায় হেসে উঠল, কিন্তু মেয়েটা ওই হাসিতে কোন অংশ নিল। জেমস তার বিনয়ী কথার অন্তরালে যেন ভদ্র ভাষায় তাকেই খোঁচা দিল। বলে মনে করে কঠিন হলো তার চোখ।

তুমি কি আমাদের সাথে সাপার খাবে, জেমস? প্রশ্ন করল র‍্যাঞ্চার।

ধন্যবাদ, কিন্তু আমি অন্যান্য কাউবয়দের সাথেই খাব, জবাব দিল এরফান। প্রস্তাবটা যে ফিলিপাও সমর্থন করেনি এটা নতুন ফোরম্যানের নজর এড়ায়নি।

র‍্যাঞ্চার মাথা ঝাঁকাল। এই সময়ে কাউহ্যান্ডদের ফিরে আসার শব্দে সে বলল, এসো তোমার সাথে ওদের পরিচয় করিয়ে দিই। আমি এখনই ফিরে আসছি, ফিলি।

মেয়েটা নবাগত লোকটাকে ছোট্ট একটা নড় করে ওখানেই দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত ওদের যাওয়া লক্ষ করল। লোকটাকে ওর পছন্দ না হলেও ওকে চিতার মত মসৃণ ভাবে চলতে দেখে নিজের অজান্তেই কেন যেন সে শিউরে উঠল।

লোকগুলো ঘোড়ার পিঠ থেকে জিন নামাচ্ছিল, কিন্তু মালিক কিছু বলতে এগিয়ে আসছে দেখে থামল। পরিচয়ের পালা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হলো।

এ হচ্ছে জেমস গ্রীন, বয়েজ। স্টিভের জায়গায় ওকে নেয়া হয়েছে, এবং এখন থেকে সেই তোমাদের বস।

কিছু লোক হাওডি বলল, কেউ কেবল নড করল, কয়েকজন শুধু চেয়ে থাকল। এরফানের কাছে ওদের দৃষ্টি ঠিক বন্ধুসুলভ বলে মনে হলো না। সে নিজেও নীরব থেকে মনেমনে ওদের কেবল যাচাই করল।

পাশের ওটাই তোমার থাকার কামরা, জেমস, বলে আঙুল তুলে পাশেই কাঠের তৈরি ছোট একটা বাসা দেখাল জ্যাক। ওটা আগে থেকেই গুছিয়ে রাখা হয়েছে, তোমার যদি আর কিছুর দরকার হয় তবে রাধুনীকে জানালেই তা। পাবে; পরে আবার দেখা হবে।

এরফান ঘোড়ার পিঠ থেকে জিন আর ব্যাগ নামিয়ে ওকে করালে ছেড়ে দিয়ে নিজের নির্দিষ্ট ঘরে গিয়ে ঢুকল। এক রূমের কেবিনটায় একটা বিছানা, একটা টেবিল আর কয়েকটা চেয়ার রাখা আছে সামনে এবং পিছনে একটা কারে জানালা রয়েছে, বাচচা কুকুরটা ভিতরে ঢুকে চারপাশ একবার ভাল করে শুঁকে দেখে বিছানার গোড়ায় কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে প্রভুর দিকে চেয়ে শুয়ে থাকল।

কি রে, জায়গাটা তোর পছন্দ হয়েছে তো, টমি? প্রশ্ন করল এরফান। সে ওটার নাম রেখেছে টমি।

টমি কোন জবাব দিল না। জামা কাপড় থেকে ধুলো ঝেড়ে ফেলে দরজার দিকে এগোল এরফান। বাইরে থেকে কথাবার্তার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।

কুকুর আমি মোটেও পছন্দ করি না, বলছিল রাঁধুনী ড্যানিয়েল। রাতের বেলা ওদের আমি ভীষণ ভয় পাই।

এরফানের আগমনে ওর কথায় ছেদ পড়ল। বিশালদেহী নিগ্রো লোকটা ছোট্ট টমিকে দেখে ভয়ে যেভাবে কুঁকড়ে গেল তাতে নতুন ফোরম্যান হেসে ফেলল।

আমি তোমাকে ওদের বশ করার নতুন একটা বুদ্ধি শিখিয়ে দিচ্ছি, ড্যানিয়েল, বলল সে। তুমি ওকে একটা বড় মাংসের টুকরো খেতে দাও, দেখবে সে তোমার সারা জীবনের বন্ধু হয়ে গেছে। ওরা মানুষের মত নয়-একবার তোমার কাছ থেকে ভাল ব্যবহার পেলে সেটা সে কখনও ভুলবে না।

কালো লোকটা বিশদ একটা হাসি দিল। ঠিক আছে, স্যার, ওকে আমি পেট ভরেই খেতে দেব, বলল সে।

সাপারের সময়ে তাই ঘটতে দেখা গেল। লম্বা টেবিলের মাথায় বসে আর সবার সাথে খাচ্ছে এরকান। ওর পায়ের কাছে বসে বড় এক টুকরো মাংস চিবাচ্ছে টমি। এরফান নিজে চুপ করে খাওয়ার ফাঁকে তার সামনে বসা লোকগুলোকে যাচাই করে দেখছে। ওখানে মোট দশজন লোক রয়েছে, সে জেনেছে আরও তিনজন লোক দূরবর্তী লাইন ক্যাম্পে কাজ করছে। যুবক বয়সের লোকের সাথে কিছু মাঝবয়সী লোকও রয়েছে, ওখানে। ওদের সবাইকে বেশ শক্ত সমর্থ লোক বলেই এরফানের ধারণা হলো। তবে ওদের মধ্যে একজন বিশেষ করে ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করল। লোকটার নাম বুল ডেভিস। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি; নামের সাথে ওর যথেষ্ট মিল আছে। যাঁড়ের মতই শক্তিশালী মাঝারি গড়নের মানুষটার চোখদুটো ওর বিশাল মাথায় খুদে দেখাচ্ছে। ও যে এরফানের কর্তৃত্ব ঠিক মেনে নিতে পারেনি এটা ওর চেহারায় স্পষ্টই প্রকাশ পাচ্ছে। বিরক্তি নিয়ে সে এখন তার কফির দিকে চেয়ে আছে।

এই কালো কালির ডিব্বা, চিৎকার করল সে, এটা কি তৈরি করেছ তুমি?

একটু মুচকি হেসে এরফান তার কফিতে চুমুক দিয়ে স্বাদ নিয়ে দেখল। আমার কাছে তো বেশ ভালই মনে হচ্ছে, শান্ত স্বরে বলল সে।

তোমার কাছে তাই মনে হচ্ছে? টিটকারির সুরে বলল বুল। যে যেমন খেয়ে অভ্যস্ত স্টিভ কখনও এটা বরদাস্ত করত না-সে তার কাজ ঠিকই বুঝত। ওর মত ভাল ফোরম্যান আমরা আর সহসা পাব না।

ইচ্ছাকৃত ভাবে বেয়াড়া ব্যবহার করার চেষ্টা ওর ভাবে স্পষ্ট প্রকাশ পাচ্ছে। কিন্তু এরফান কোন জবাব দেয়ার আগেই পাতলা গড়নের ছেলে ল্যাঙ্কি বলে উঠল, হ্যাঁ, স্টিভ সত্যিই ভাল লোক ছিল বটে, বুল, কিন্তু তুমি এটা আবিষ্কার করতে একটু বেশি দেরি করে ফেলেছ না? দাঁত বের করে হাসল সে। এতদিন পরে দরদ হঠাৎ করে কেন উথলে উঠল? আমরা সবাই স্টিভের লাশ আনতে যাওয়ার সময়ে তুমি কোথায় ছিলে? ওর জন্যে কোন শোক তুমি প্রকাশ করোনি। এমনকি ওকে কবর দেয়ার সময়েও আমরা কেউ তোমাকে দেখিনি। আমার তো সন্দেহ হয় ওর জায়গায় নিজেফোরম্যান হওয়ার আশায় হয়ত তুমি নিজেই, ওকে খুন করেছ বা করিয়েছ!

ওদের মধ্যে কথা কাটাকাটি মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আগেই এরফান এতে বাধ সাধল।

মাস্টারসন আমাকে বলেছিল যে স্টিভের মত্যটা পুরোপুরি একটা রহস্য, ওর কোন শক্রই ছিল না, টেবিলে উপস্থিত সবার উদ্দেশে শান্ত স্বরে বলল এরফান।

এতে রহস্যের কিছু নেই, বলে উঠল বান্ডি, যাকে সবাই ঠাট্টা করে হাড়ের বান্ডিল বলেই ডাকে-কারণ ওর দেহে হাড় আর চামড়াই কেবল আছে। কাজটা ব্ল্যাক-মাস্ক ছাড়া আর কারও নয়; এটা আমি বাজি ধরে বলতে পারি।

এমন কথা প্রচার করে বেড়ালে তুমি নিজেই স্টিভের সাথে আলাপ করে উত্তরটা জেনে নেয়ার সুযোগ পাবে, সাবধান করল ল্যাঙ্কি।

এই ব্ল্যাক-মাস্কটা কে? প্রশ্ন করল এরফান। ওর কথা আমি এই প্রথম শুনলাম।

অর্থাৎ ওল্ড ম্যান (মালিক) তোমাকে ওর কথা কিছুই বলেনি? আশ্চর্য ব্যাপার! বলে উঠল ল্যাঙ্কি। ওর কথার সুরে বোঝা গেল এমন জরুরী একটা কথা না জানানো নতুন ফোরম্যানের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করারই সামিল।

উক্তিটা উপেক্ষা করেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বান্ডির দিকে তাকাল এরফান।

ব্ল্যাক-মাস্ক একজন লোক নয়, ওরা একদল ডাকাত; যারা এদিক-ওদিক সবখানেই ডাকাতি করে বেড়ায়। ওদের পরিচয় কেউ জানে না, জবাব দিল বান্ডি। শোনা যায় পাহাড়ের চূড়ার কাছে একটা গুহায় ওরা থাকে। হোপের একটা লোক দাবি করেছিল যে ওদের আস্তানা সে চেনে। পাসিকে পথ দেখিয়ে ওখানে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাবও সে দিয়েছিল; কিন্তু শেরিফ টেলর হেসেই ওর কথা উড়িয়ে দিয়ে ওকে ঘুমিয়ে মাথা ঠাণ্ডা করতে বলল। এখন সে তাই করছে-কবরখানায়।

সে কিভাবে মরল? জানতে চাইল ফোরম্যান।

লোকটা হোপে একজন স্ট্রেঞ্জারের বিরুদ্ধে ছুরি ছেড়ার প্রতিযোগিতায় নেমে হেরে যায়, ব্যাখ্যা করল সে।

ওদের কি স্টিভের বিরুদ্ধে কোন আক্রোশ ছিল?

মনে হয় না, তবে হতে পারে যে সে ঘুরতে ঘুরতে ওদের আস্তানার কাছাকাছি কোথাও পৌঁছে গেছিল, নিজের মত জানাল সে। ব্ল্যাক-মাস্কের দলটা সত্যিই সাংঘাতিক। ব্লাডি বার্ট পর্যন্ত ওদের চটাতে সাহস পায় না।

হাহ, তোমার কথা শুনে হাসি পায়, বলে উঠল বুল ডেভিস। একটু অবসর পেলেই বার্ট ওখানে হানা দিয়ে ওদের জ্যান্ত চিবিয়ে খাবে। বান্ডির উক্তিতে বুলকে এমন কঠিন প্রতিবাদ শুনে এরফানের ধারণা হলো সম্ভবত জ্যাককে চাপ দিয়ে বাটই এই লোকটাকে তার র‍্যাঞ্চে কাজে নিতে বাধ্য। করেছে।

বার্টের একটু অবসর পেতে খুব লম্বা সময় লাগছে, মন্তব্য করল শান্ত প্রকৃতির মাঝ-বয়সী রে এদারটন। আমার মনে হয় এখানে যদি বিদ্যুৎ এরফান থাকত, যে হ্যাচেটস ফলি গ্যাঙকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল, তাহলে ব্ল্যাক মাস্কের দল পালিয়ে কুল পেত না।

শুনেছি ওর হাত নাকি দারুণ চালু, যোগান দিল ল্যাঙ্কি।

শুধু চালু? বলে উঠল রে। বিদ্যুৎই ওর উপযুক্ত নাম।

হাহ্, আমি বাজি ধরে বলতে পারি ওর হাত এখন আর আগের মত চালু নেই, বলল বুল। বিয়ে করে সংসারী হওয়ার পর মানুষ অনেক ধীর হয়ে যায়।

টেবিলের মাথায় বসে এরফান ওদের কথাবার্তা শুনে মনেমনে পুলকিত হচ্ছে। তাহলে বিদ্যুৎ এরফানের কথা এরা এখনও ভোলেনি। সে ভাবছে বয়স্ক এদারটন নোকটা তাকে আগে কখনও দেখেনি তো? কিন্তু কাউবয়ের চেহারা খুঁটিয়ে লক্ষ করেও লোকটার চেহারায় তাকে চেনার কোন লক্ষণ দেখতে পেল না। সে মনে করে না যে বিয়ে করায় পিস্তলে তার দক্ষতার একটুও ঘাটতি ঘটেছে। সময়ই এর প্রমাণ দেবে। যাহোক, আবার খেলায় নেমে সে বেশ ভাল বোধ করছে। খাওয়ার শেষে কিছুক্ষণ সে তার কর্মচারীদের সাথে এটা-ওটা নিয়ে আলাপ করে নিজের ঘরে ফিরল। তৃপ্ত টমিও ওর পিছন পিছন কামরায় ঢুকল-রাঁধুনী ওর ভাল তুই নিয়েছে। পুরো একঘণ্টা এরফান, সিগারেট ফুকে আর বিভিন্ন চিন্তা করেই সময় কাটাল। এটা সুস্পষ্ট যে মাস্টারসন খুব দুশ্চিন্তায়। আছে। র‍্যাঞ্চটা কিভাবে রক্ষা করা যাবে তাই নিয়েই ওর এত চিন্তা। সন্দেহ নেই যে সে খুব বিপজ্জনক একটা পথ বেছে নিয়েছে। তার পুরোনো বন্ধু জাজ। এমারি নিজে এসে ওকে এই কাজটা নিতে অনুরোধ জানাল, তখনই সে বুঝেছিল কাজটা মোটেও সহজ হবে না।

০৩.

পরদিন সকালে নাস্তা শেষ করার পরেই এরফান বাইরে বেরিয়ে দেখল কাউবয়রা সবাই কাজে যাওয়ার জন্যে তৈরি হয়ে করালের কাছে দাঁড়িয়ে ওর নির্দেশের অপেক্ষায় আছে। ওইদিন কাকে কোন কাজে যেতে হবে সেটা জানতে পারলেই ওরা রওনা হবে। বুল ডেভিস, হেনডন, এবং একজন মেক্সিকান-যাকে সে মারিও নামে ডাকতে শুনেছে, ওরা একটা পৃথক দলে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে দেখে নতুন ফোরম্যান গোলযোগের গন্ধ টের পেয়ে সোজা ওদের দিকে এগিয়ে গেল।

স্টিভের মৃতু্যর পর থেকে তুমিই অস্থায়ী বস হিসেবে কাজ চালাচ্ছিলে, বুলকে বলল সে, ওকে করে অসন্তুষ্ট ভাবে নড় করতে দেখে এরফান বলল, আপাতত তুমি সেটাই চালিয়ে যাও।

বুলের চোখদুটো একটা হিংস্র আনন্দে জ্বলে উঠল। সে মনে করল এই নতুন ফোরম্যান যদি তাকে ভয় নাও পায়, তবু লোকটা ঝামেলা এড়িয়ে যেতে চাইছে। কাধ সোজা করে চ্যালেঞ্জিং ভঙ্গিতে বুক ফুলিয়ে সে বলল, যে চাকরিটা তুমি পেয়েছ সেটা ন্যায্যত আমাদেরই কারও পাওয়া উচিত ছিল। আমার বিশ্বাস র‍্যাঞ্চার এই আউটফিটের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে বাইরের একজনকে ধরে এনে আমাদের মাথার ওপর ফোরম্যান করেছে।

ঝড়ের আগের থমথমে একটা পরিবেশ বিরাজ করছে। চুপ করে দেখছে সবাই। এরফানের মাথায় দ্রুত চিন্তা চলছে। সে এখনই দলের কারও সাথে সরাসরি বিরোধে যেতে চাইছে না বটে, কিন্তু যাদের নিয়ে তাকে কাজ করতে। হবে তাদের অন্তত বুঝিয়ে দেয়া দরকার; যে-কাজের ভার তাকে দেয়া হয়েছে। সেটার জন্যে সে সত্যিই উপযুক্ত লোক। ডেভিসের দিকে তাকাল সে, ওর চাহনিতে আমোদ পাওয়ার ভাব একটা দেখা যাচ্ছে।

এতে আমার কি করার আছে? প্রশ্ন করল সে। তুমি কি আশা করছ আমারই মাস্টারসনকে গিয়ে বলা উচিত যে সে ভুল লোককে কাজে নিয়েছে?

দর্শক কয়েকজনকে চাপা হাসি হাসতে শোনা গেল। বোঝা যাচ্ছে ওদের কাছে বড় গলায় নতুন ফোরম্যানের মুরোদ সে আজ পরীক্ষা করে দেখবে বলে বড়াই করে এসেছে; কিন্তু এখন বুঝতে পারছে লোকটার সাথে কথায় পারা যাবে না।

মাস্টারসনকে কিছু বলার দরকার হলে সেটা আমি নিজেই বলতে পারব, ওর মুখটা রাগে লাল হয়ে উঠেছে।

বেশি কিছু বলার দরকার নেই, শুধু এটুকু বললেই চলবে যে আমি তোমাকে কাজ থেকে বরখাস্ত করেছি। তোমার পাওনা টাকা সে বুঝিয়ে দেবে, শান্ত স্বরেই কথাগুলো বলল এরফান। কিন্তু ওকে হুমকির ভঙ্গিতে পিস্তলের বাঁটে হাত রাখতে দেখে বলল, ওটা ধরে মিছেই তুমি আমাকে ভয় দেখাবার চেষ্টা করছ; ওটা খাপ থেকে বের করার সাহস তোমার নেই।

কয়েক সেকেন্ড পরস্পরের দিকে চেয়ে স্থির দাঁড়িয়ে থাকল ওরা। মাত্র দুগজ দূরে দুজনেই ড্র করার ভঙ্গিতে একটু কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে অপর পক্ষ থেকে সামান্যতম নড়াচড়ার ওপর সতর্ক নজর রেখেছে। তারপর বুল এদিক ওদিক চেয়ে শেষে চোখ নামিয়ে নিল।

আমি যেমন বলেছিলাম-কাপুরুষ, বলে এরফান ফেরার জন্য অর্ধেকটা মাত্র ঘুরেছে।

ড্যাম ইউ, চিৎকার করল বুল। আমি

কিন্তু ছোবল দিয়ে বুল পিস্তল বের করার আগেই আড়চোখে ওর হাত নড়ে উঠতে দেখে এরফান স্টীলের মত শক্ত আঙুলে বাম হাতে ওর কজি ঠেসে ধরল। একই সাথে ওর ডান হাত বুলের গলায় চেপে বসল।

নড়াচড়ায় অক্ষম লোকটা প্রচণ্ড ঝাঁকি খেল। এরফানের আঙুলগুলো বুলের গলায় আরও এটে বসছে। লোকটার চোখদুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে, চেহারাটাও বেগুনি হয়ে ওর প্রায় মরার দশা হয়েছে দেখে জোরে আকস্মিক একটা ধাক্কায় ওকে মুখ থুবড়ে ধুলোর ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিল এরফান। ফুপিয়ে শ্বাস নিয়ে নিজেকে কিছুটা সামলে উঠে দাঁড়াতে সে বেশ সময় নিল।

র‍্যাঞ্চহাউসে গিয়ে নিজের পাওনা বুঝে নিয়ে ট্রেইল ধরো, ওকে সংক্ষেপে নির্দেশ দিল ফোরম্যান।

শয়তানের মত একটা চাহনি দিয়ে বিড়বিড় করে ওকে হুমকি দিতে দিতে মাথা নিচু করে ওর নির্দেশ পালন করল পরাজিত বুল।

এরফান আর সবার দিকে ফিরে দাঁড়াল। পুরো অ্যাসিডে ভরা স্বরে সে বলল, আর কারও কোন বক্তব্য আছে?

আমিও মিস্টার ডেভিসের সাথে যাচ্ছি, বলল মেক্সিকান।

মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানাল ফোরম্যান। সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে এবার হেনডনের দিকে তাকাল সে। একটা হাসি দিয়ে ওর অব্যক্ত প্রশ্নের জবাব দিল হেনডন।

আমি এখানেই থাকছি, জানাল সে।

ভাল কথা, বলে সবাইকে দিনের কাজ বুঝিয়ে দেয়ার কাজে মন দিল সে।

ঈশ্বর! হেনডনের সাথে কাজে যেতে যেতে বলল ল্যাঙ্কি। তুমি দেখেছ? লোকটা বুলকে শায়েস্তা করার সময়ে রীতিমত হাসছিল!

হাসছিল? খেপে উঠল হেনডন। হ্যাঁ, নেকড়ে যখন বাছুরকে শিকার করে, মাটিতে ফেলার সময়ে যেমন দাঁত খিচায় ঠিক তেমনি। আমার বিশ্বাস বুলের কাছে এখন ফাঁসি আর নতুন কোন অভিজ্ঞতা বলে মনে হবে না।

লোকজনকে কাজে পাঠিয়ে এরফান সোজা র‍্যাঞ্চহাউসে ঢুকল। বাইরের কামরাতেই জ্যাক আর তার মেয়ের দেখা পাওয়া গেল। মেয়েটা রাইডিঙে যাওয়ার পোশাক পরেছে। এরফানকে দেখে মেয়েটার ভূরু একটু কুঁচকাল।

হ্যালো, জেমস, তুমি এখনই আগাছা ছাটতে শুরু করে দিয়েছ শুনলাম, স্বাগত জানাল র‍্যাঞ্চার।

হ্যাঁ, দুজন কর্মচারীকে বিদায় দিতে বাধ্য হলাম, এরফান একটু হাসল। এখানকার কাজে ওদের মন ছিল না।

তুমি আসার আগে পর্যন্ত ওরা মন দিয়েই কাজ করছিল, আপত্তি জানাল ফিল। ওরা দুজনই বিশ্বস্ত লোক ছিল, মিস্টার বার্টের সুপারিশে ওরা এসেছিল।

এই তীব্র আক্রমণের তিক্ততা এরফানকে অবাক করল। কিন্তু শান্ত আর স্বাভাবিক স্বরেই এরফান বলল, আমি জানতাম না যে ওরা তোমার প্রিয়পাত্র, মিস মাস্টারসন।

আমি কাউবয় বা মেক্সিকানদের সাথে বন্ধুত্ব করি না, ঠাণ্ডা স্বরে জবাব। দিল ফিল। আমার ধারণা তোমার নিজস্ব পদ্ধতি অনুসরণ করেই তুমি ওদের উস্কে পিস্তলের লড়াইয়ে নামাতে চেয়েছিলে?

সচিলে হাসল এরফান। এবং আমার পিস্তলে আরও দুটো আঁচড়, না? ভালই বুঝেছ; বুলকে উস্কানোর জন্যে আমি যা করেছিলাম, সেটা হচ্ছে ওকে আমি ডেপুটি ফোরম্যান নিযুক্ত করতে চেয়েছিলাম, সে বিনা যুক্তিতে প্রত্যাখ্যান করল-একটা ধন্যবাদও দিল না। বরং আমি ঘুরতেই সে যখন আমাকে পেছন থেকে গুলি করে মারার চেষ্টা করল, তখন বাধ্য হয়েই ওকে আমার একটু শায়েস্তা করতে হলো। মেক্সিকানটাও ওর পিছু নিল।

মিস্টার বাট ব্যাপারটা পছন্দ করবে না, মেয়েটা বলল।

ড্যাম বার্ট, রাগে ফেটে পড়ল জ্যাক। এটা আমার র‍্যাঞ্চ এবং আমিই এটা চালাচ্ছি। আমি যখন একটা লোককে এটা চালাবার ভার দিয়েছি, তখন তাকে আমি শেষ পর্যন্ত ব্যাক করব। সত্যিই প্রয়োজন মনে করলে তুমি ইচ্ছে করলে এই আউটফিটের সবাইকে বরখাস্ত করতে পারো, জেমস। আমার সাথে কি তোমার আর কোন কথা ছিল?

না, আমি এখন রেঞ্জটা একটু ঘুরে দেখে আসতে যাচ্ছি, বলল এরফান। আড়চোখে রাইডিঙের পোশাক পরা ফিলিপার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ একটা দুষ্ট বুদ্ধি খেলল ওর মাথায় সে বলে উঠল, আমি ভাবছি মিস মাস্টারসনের যদি রাইডিঙে যাওয়ার প্ল্যান থেকে থাকে তাহলে সে হয়ত আমাকে রেঞ্জটা একটু ঘুরিয়ে দেখাতে পারে।

এরফানের ঔদ্ধত্য দেখে মেয়েটার চেহারায় বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠল। না, আমার মা একটা কাজ আছে, সে সংক্ষেপে জবাব দিল।

রেঞ্জটা ঘুরে দেখতে বেরিয়েছে এরফান। উফুল, টমি ঘোড়ার কয়েক গজ আগে আগে ছুটছে। ওর উদ্দেশে এরফান বলল, ওই রাজকুমারীর অন্য কাজ আছে, টমি, কাজটা আমাদের নিজেদেরই করতে হবে। মেয়েটা আমাদের মোটেও দেখতে পারে না। না, এটা খুশি হওয়ার কোন কথা নয়-ওর ঘাড়ে আমরা একটা বিষ ফেঁড়া ছাড়া আর কিছুই নই।

*

প্রায় মাঝরাত হবে হঠাৎ এরফানের ঘুম ভেঙে গেল বিছানার পায়ার কাছে শোয়া টমির গলার ভিতর থেকে নির্গত নিচু গরগর শব্দে! উঠে চারপাশে চেয়ে দেখল সে। আকাশে চাঁদ নেই, কিন্তু তারার ক্ষীণ আলোয় অস্পষ্ট ভাবে কিছুটা দেখা যাচ্ছে। তার মনে হলো যেন পিছনের জানালায় আবছা কিছু ওর চোখে পড়ল।

চুপ থাকো, বাছা, ফিসফিস করে টমিকে নির্দেশ দিয়ে স্থির হয়ে বসে থাকল সে। ডান হাতে চলে এসেছে ওর একটা পিস্তল।

যেটাকে সে ছায়া ভেবেছিল সেটা আবার দেখতে পেল সে। এবার জানালাটা একটু ককিয়ে উঠল, মনে হলো কেউ যেন জোর করে ওটা খোলার চেষ্টা করছে। এরফান একটুও নড়ল না; অল্প সময়ের জন্যে কোন শব্দ হলো না। সম্ভবত ঘুমন্ত ব্যক্তির ঘুমের কোন ব্যাঘাত হয়নি মনে করেই নিশ্চিন্ত হয়ে গোপনে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা আবার শুরু করল। আবার জানালা ককিয়ে ওঠার শব্দ শোনা গেল। জানালাটা এখন ইঞ্চি দুয়েক ফাঁক হয়েছে। ফ্লপ শব্দে মেঝের ওপর কিছু পড়ার পরই জানালা থেকে একটা মুখ অদৃশ্য হলো। কিন্তু তার আগেই সে দেখতে পেয়েছে ওই মুখটা কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল নিজের মনেই হাসল এরফান; সম্ভবত এই আউটফিটেরই কেউ নতুন ফোরম্যানের সাথে মস্করা করার জন্যেই ওকে ব্ল্যাক-মাস্কের গল্প শুনিয়েছে।

ড্যাম ফুল, সে যেই হোক, বিড়বিড় করল এরফান, আমি যদি গুলি করতাম–

ওর বাক্যটা অসমাপ্তই রয়ে গেল, কারণ ওই মুহূর্তেই সে মেঝের ওপর পড়া কুণ্ডলীর থেকে একটা ক্রুদ্ধ হিসহিসানির সাথে র্যাটল স্নেকের লেজের ঝুনঝুনি শুনতে পেল। বিপদ টের পেয়ে কুকুরটাও ঘেউঘেউ শুরু করল। কুকুরের মাথায় হাত রেখে ওকে শান্ত করল এরফান।

কান পেতে শুনে সে বোঝার চেষ্টা করছে সাপটার অবস্থান। কিন্তু মাটির মেঝের ওপর ওটার নড়াচড়ার কোন শব্দই শোনা গেল না। এরফান জানে র্যাটল স্নেক ভীতু প্রাণী। একান্ত কোণঠাসা না হলে ওরা কাউকে আক্রমণ করে না। কিন্তু আবদ্ধ অবস্থায় থাকার পর ওটার মেজাজ এখন কেমন আছে তার কোন ঠিক নেই। ভয়ে ভয়ে অন্ধকারে হাতড়ে বিছানার পাশে রাখা বুট দুটো তুলে পরে নিল সে।

উত্তেজনাময় একটা পরিস্থিতি। লম্বা লম্বা দুই কদমে ঘরের মাঝখানে পৌঁছে টেবিলের ওপর থেকে হাতড়ে ম্যাচের বাক্স খুঁজে পেল বটে কিন্তু বাতিটা হাতের কাছে পেল না। ওটা খুজতে পায়ে পায়ে এগোচ্ছে আর প্রতি পদক্ষেপেই ভয় হচ্ছে এই বুঝি সাপটা পায়ের তলায় চাপা পড়ল। তা ঘটলে সাথেসাথে ওর পায়ের মাংস ভেদ করে ঢুকে যাবে সাপের তীক্ষ্ণ বিষদাঁত। টেবিলের ওপর রাখা বাতিটা খুঁজে পেয়েই ম্যাচ জ্বালাল এরফান। ম্যাচের আলোয় ওর চোখে পড়ল মাত্র এক গজ দূরেই সাপটা আধা কুণ্ডলী পাকিয়ে মাথা তুলে আঘাত হানার জন্যে তৈরি হয়েছে। ঠিক সময় মতই লাফিয়ে পিছিয়ে গিয়ে সাপের চ্যাপ্টা মাথায় গুলি করল এরফান! বাতিটা জ্বালিয়ে লাথি মেরে মৃত সাপটাকে দূরে পাঠিয়ে দিল সে। মারা গেলেও সাপের দেহটা তখনও পাকাচ্ছে। বাইরে একদল লোকের ছুটে আসার শব্দ আর কথাবার্তার সাড়ার সাথে দরজার ওপর নক করার আওয়াজ শোনা গেল। ওটা খুলে সে দেখল তারই লোকজন গুলির শব্দে রাতের পোশাক পরেই ছুটে এসেছে। কিন্তু সবার হাতেই রয়েছে পিস্তল।

কি ঘটেছে? প্রশ্ন করল হেনডন-সেই সবার আগে ছিল।

একটা ডায়মন্ড-ব্যাক (র‍্যাটল স্নেকের স্থানীয় নাম) দেখা করতে এসেছিল, ব্যাখ্যা করল এরফান। বাধ্য হয়ে ওটাকে মেরে ফেলতে হলো।

লোকগুলো ভিতরে ঢুকে সাপটাকে পরীক্ষা করে দেখল! বিশাল লম্বা একটা সাপ।

দশটা র‍্যাটল, (প্রতি বছর ওদের লেজে বিষাক্ত র‍্যাটলের সংখ্যা একটা করে বাড়ে) মন্তব্য করল ওদের একজন। নিশ্চয় ওটার অনেক বাচ্চাকাচ্চা আছে। ওরাও সঙ্গে আসেনি তো?

সবাই মিলে কামরাটা ভাল করে খুঁজেও আর কোন সাপ দেখতে পেল না। ওরা নিশ্চিন্ত হয়ে বাঙ্কহাউসে ফিরে গেল; কেবল হেনডন ইতস্তত করছে।

ওটার এখানে ঢোকাটা সত্যিই একটা আশ্চর্য ব্যাপার, বলল সে। এই কামরার চারপাশেই কাঁকর দিয়ে ছাওয়া আছে, এবং ওরা কাকরের ওপর দিয়ে চলা পছন্দ করে না।

জানালার কাছে গিয়ে সে ঝুঁকে একটা কিছু হাতে তুলে নিল। ওটা এখানে বাস করার জন্যে তৈরি হয়েই এসেছি-সাথে সে নিজের ব্যাগও নিয়ে এসেছিল; চামড়ার ব্যাগটা তুলে ধরল :নে। ওটায় ফিতে টেনে মুখ বন্ধ করার ব্যবস্থা আছে। ওটা থেকে ব্যাটল স্নেকের বোটকা গন্ধ বেরোচ্ছে। তোমার জীব-জন্তু প্রীতির কথা সবাই জানে, বলে চলল সে। এর পরে তুমি, হয়ত একটা দুর্গন্ধময় স্কাঙ্কই পোষা শুরু করবে।

আজ রাতেই একটাকে আমি পেতে পারতাম, জবাব দিল ফোরম্যান, কিন্তু আর কোন তথ্য সে প্রকাশ করল না। যদিও এই লোকটাকে এখনও বিশ্বাসী বলেই মনে হয়, তবু এখনই কিছু বলা ঠিক হবে না। তাকে হত্যা করার একটা জঘন্য চেষ্টা যে আজ করা হয়েছিল তাতে কোনই সন্দেহ নেই। তার হাতে এমন কোন প্রমাণ নেই যাতে ওই অপরাধীকে চিহ্নিত করা যেতে পারে। হেনডন চলে যাওয়ার পর টমিকে সময় থাকতে ওকে সাবধান করার জন্য একটু আদর করে ধন্যবাদ জানিয়ে এরফান আবার শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুমানোর আগে সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, যেহেতু হেনডন, বুল আর মারিওর সাথেই দাড়িয়ে ছিল, তাই ওর ওপর সে নজর রাখবে।

সকালে সূর্য ওঠার সাথেই এরফান বাইরে জানালার কাছে গিয়ে ট্র্যাক খোঁজ শুরু করল। কিন্তু হেনডনের কথাই ঠিক, চারপাশে খোয়া বিছানো থাকায় কোন চিহ্নই দেখা গেল না। কিন্তু দশ গজ দূরে এক চিলতে বালু ঘাস থেকে খোয়াকে বিছিন্ন করেছে। ওখানেই ট্রাকের প্রথম চিহ্ন দেখতে পেল এরফান। এক জোড়া গভীর গোড়ালির ছাপ রয়েছে ওখানে। লোকটা যে ওখানে দাড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেছে, সেটা ছাপের গভীরতায় স্পষ্ট বোঝা যাচে। ওটা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে এরফান দেখল ডান গোড়ালির বুটে ছোট্ট একটা ক্রস চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। মাস্টারসন পুরো ঘটনা শোনার পর হেসেই কথাটা উড়িয়ে দিল।

ব্ল্যাক-মস্কের কাছ থেকে আমাদের ওপর কখনও কোন হামলা আসেনি, এবং সেটা আমি চাইও না, বলল সে। ওরা বড় জোর মাঝেমধ্যে আমাদের একটা-দুটো গরু হয়ত নেয়; কিন্তু সেটা শুধু খাবার উদ্দেশেই-বিক্রি করার জন্যে নয়। এমন নীচ কাজ কখনও ওরা করবে না। মনে হয় এতে কোন গ্রীজারের হাত আছে। (ঘৃণা প্রকাশ করতে আমেরিকানরা মেক্সিকানদের ওই নামে ডাকে)।

র‍্যাঞ্চারের মতবাদ এরফানের সাথে মিলে যাওয়ায় আর কথা না বাড়িয়ে ওখানেই কথা শেষ করলো এরফান। সারাদিন আবার রেঞ্জ দেখে কাটিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে সে দেখল একতা লোক ওর সাখে দেখা করার জন্যে অপেক্ষা করছে। মাঝারি উচচতার লোকটা নাদুসনুদুস গড়নের। গোলগাল চেহারা রোদে পুড়ে বাদামী না হয়ে একটু লালচে দেখাচ্ছে।

আমি আন্দাজ করছি তুমিই এই আউটফিটের ফোরম্যান, বলল কমবয়সী যুবক।

তোমার আন্দাজ করার ক্ষমতা, বেশ ভাল, বলল এরফান। তা তোমার সমস্যাটা কি?

অতিথির হালকা নীল চোখদুটো ঝিলিক দিচ্ছে। একমাত্র পকেটে প্রচণ্ড শূন্যতা ছাড়া আমার আর কোন সমস্যা নেই, জবাব দিল সে।

তুমি কি চাকরি খুঁজছ? প্রশ্ন করল এরফান।

একটা চাকরি আমার প্রয়োজন, যেটা সম্ভবত একই কথা হলো, জবাব দিল সে। মুশকিলটা হচ্ছে বহু বছর আগেই আমি খুব খারাপ একটা অভ্যাস করে ফেলেছি, যেজন্যে নিয়মিত খাবার না খেলে এখন আর আমার চলে না।

এই ধরনের অভ্যাস ছাড়া খুবই কঠিন, স্বীকার করল এরফান। তুমি গরু সম্পর্কে কিছু জানো?

গরু? বলল কি? বলতে গেলে গরুর দুধ খেয়েই তো আমি বড় হয়েছি, হেসে বলল স্ট্রেঞ্জার।

তাই নাকি? খাটো লোকটার দিকে চেয়ে শান্ত স্বরে বলল এরফান। তাহলে বলতে হয় ওরা তোমাকে বেশি বড় করতে সক্ষম হয়নি-হয়েছে? এই কথায় যে হাসির রোল উঠল নবাগত লোকটাও সেই হাসিতে যোগ দিল।

তোমার যেকোন আদেশ পালন করতে আমি একান্ত বাধ্য কুকুরের মতই ছুটে আসব, জবাব দিল হাসিখুশি লোকটা।

ঠিক আছে, ফোরম্যান হেসে বলল, আমাদেরও একজন বাড়তি লোকের প্রয়োজন ছিল; আমরা তাহলে তোমাকে সানসেট বলেই ডাকব-ওটা তোমার গায়ের রঙের সাথে সুন্দর মেলে।

মুহূর্তের জন্যে ওর হালকা নীল চোখদুটো খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল এবং বিশদ একটা হাসিতে ওর মুখটা আরও লাল হলো।

সানসেট নামটাও চলবে, যদিও আমার আসল নাম লরি লরি বই, বলল সে।

মাথা ঝাঁকাল এরফান। শীঘ্রি সাপার তৈরি হয়ে যাবে, ওকে জানাল সে। ল্যাঙ্কি তোমাকে তোমার বাঙ্ক দেখিয়ে দেবে।

সন্ধ্যার পরে বস্টন চুপিচুপি ফোরম্যার দরজায় নক • করেই ভিতরে ঢুকে পড়ল এবং নির্লজ্জ ভাবে নতুন বাসের দিকে তাকিয়ে হল।

জবাবে সেও হেসে বলল, সানসেট, তোমাকে স্বাগতম

আমি যদি জানতাম তুমি আমার ওপর এমন একটা গম চাপিয়ে দেবে, তাহলে চাকরির জন্যে আমি

আমার সাথে ঝামেলায় না জড়ালেই তুমি ভাল করবে, ওকে সাবধান করল এরফান। তাছাড়া তোমার একজন সঙ্গীও জুটেছে: জেন্টল অ্যানি।

জেন্টল অ্যানি? হেসে উঠল সানসেট। এমন একটা নাম তুমি কোথায় খুঁজে পেলে?

আজ সকালেই সে অসুস্থ বাছুরের মত হেড়ে গলায় গাইছিল, জেন্টল অ্যানি, তুমি কি আমাকে আগের মতই ভালবাস? আমি ওই নাম নিজে থেকে আবিষ্কার করিনি। তবে ছেলেটা সত্যিই ভাল, একেবারে লোহার মত শক্ত।

ওরা আর সবাই কি ধরনের লোক? প্রশ্ন করল লরি।

আমি চাই সেটাই তুমি খোঁজ নিয়ে বের করে, বলল নতুন ফোরম্যান। শোনো, আমি হোপে আসার পর থেকে কি কি ঘটেছে তা তোমাকে বলছি।

হোপ শহরে পৌঁছানোর পর থেকে শুরু করে তার কামরায় ব্যাটল স্নেক ঢুকিয়ে তাকে হত্যা করার চেষ্টা পর্যন্ত সব ঘটনাই ওকে জানাল এরফান। সব শুনে সানসেটের হাসি ধীরে ধীরে আরও প্রশস্ত হলো!

হুঁ, তুমি দেখছি কোন সুযোগই হাতছাড়া করোনি, মন্তব্য করল সে। মনে হচ্ছে দুহপ্তার মধ্যেই তুমি গুটি-বসন্তে আক্রান্ত রোগীর মত জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। হাসি-ঠাট্টার সুর বদলে এবার সে একটু সিরিয়াস হলো। তুমি কখনও ভেবে দেখেছ কেন আমি তোমার সাথে এখানে আসার জন্যে এমন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম?

আমার তো ধারণা তুমি নিয়মিত কাজে ফাঁকি দেয়ার সুযোগ নিতেই আমার পিছু নিয়েছ। তারপর ঠাট্টার সুর ছেড়ে সে বলল, আচ্ছা, তুমিই না হয় বলো।

তোমার সাথে কাজ করার একটা আলাদা উদ্দেশ্য আছে আমার। ওর কোমল চেহারাটা এবার পাথরের মত কঠিন হয়ে উঠল। ছেলেমানুষি ভাবটা এখন ওর চেহারা থেকে পুরোপুরি মুছে গেছে। র্সে ভারী স্বরে বলে চলল, আমার আসল নাম টেড; টেড বোলটন। আমার বাবা হার্ভি বোলটনের বিরুদ্ধে মিথ্যা গরু চুরির অভিযোগ সাজিয়ে ব্লডি বার্ট তাকে বিনা বিচারে ফাঁসি দিয়েছিল। তখন আমার বয়স ছিল বারো বছর। এখন বড় হয়ে আমি তার প্রতিশোধ নিতে এসেছি।

এরপর ধীর গলায় সেই ঘটনার পুরো বিবরণ দিল সে। সবটা শুনে এরফানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে উঠে দাঁড়িয়ে টেডের কাঁধে হাত রেখে সহানুভূতির স্বরে প্রশ্ন করল, ওখানে যারা উপস্থিত ছিল তাদের সবাইকে তুমি চেনো?

ওদের সবার নাম জানা না থাকলেও ওদের চেহারাগুলো আমি কোনদিন ভুলব না, জবাব দিল যুবক। ওদের একজন ছিল তোমার আউটফিটের হেনডন। কিন্তু বার্ট আমাকে বেঁধে ছাপরার ভিতর বন্দী করে রেখে ছাপরা আগুনে পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়ে গেলেও সে আমাকে পিছনের দরজা দিয়ে বের করে দিয়ে আমার জন্যে ঝোঁপের ভিতর একটা ঘোড়া রেখে গিয়েছিল বলে ওকে আমি ক্ষমা করে দিয়েছি। কিন্তু বার্টের সাথে আর যারা ছিল তাদের কাউকে আমি ছাড়ব না। ওদের কেবল তিনজনের নাম আমার জানা আছে। ওদের একজনকে ডোভার বলে সম্বোধন করা হয়েছিল; একজনকে মারিও আর অন্যজনকে ফিলিপ।

ফিলিপের কথা তোমাকে ভাবতে হবে না; সে ডেজার্ট এজে আমার বিরুদ্ধে পিস্তল ড্র করে মারা পড়েছে। মারিও এখানেই কাজ করত, কিন্তু বুল ডেভিসের সাথে সেও কাজ ছেড়ে চলে গেছে। তবে ওদের •গাল আমরা পরেও পাব।

তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ, লরি কেবল এটুকুই বলতে পারল। তারপর কিছুক্ষণ অস্বস্তিকর নীরবতার পর সে প্রশ্ন করল, মাস্টারসনের ওপর বার্টের কি ধরনের চাপ রয়েছে যে ওকে বাধ্য হয়ে ওই শয়তানটার সব কথাই মেনে নিতে চ্ছে?

না, সেটা সে আমাকে বলেনি, তবে আমার ধারণা অত্যন্ত কঠিন কোন চাপ হবে। কারণ র‍্যাঞ্চারকে দেখে আমার নরম লোক বলে মনে হয়নি।

মেয়েটা কেমন? ওর দ্বিতীয় প্রশ্ন এলো।

খুব সুন্দরী, কিন্তু মেয়েদের মতই-অদ্ভুত প্রকৃতির, হেসে জবাব দিল এরফান।

হাহ, হাসল লরি। তুমি ওর প্রেমে পটে যাওনি তো?

নিষ্ঠাবান বিবাহিত পুরুষের পরকীয়া প্রেম করা সাজে না। না, লরি, তেমন কিছুই ঘটেনি বা ঘটার কোন সম্ভাবনাও নেই।

তাহলে দেখা যাচ্ছে এখানে এই বাচ্চা-কুকুরটাই তোমার একমাত্র প্রকৃত বন্ধু।

আসলে কুকুরই হয় মানুষের সত্যিকার বন্ধু, মন্তব্য করল এরফান। এখন আমার দুটো হয়েছে।

কি! তুমি আমাকে কুকুর বলে

না, বন্ধু বললাম। টমি তোমাকে হিংসে করবে না, কারণ সে কুকুরের চেয়ে নীচ মানুষও অনেক দেখেছে। কথা শেষ করে ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল। তবে তুমি টেড হলেও তোমাকে আমি লরি বা সানসেট বলেই ডাকব। আর, মনে রেখো, ফোরম্যান সবার সামনে তোমার বন্ধু নয়, এবং তুমি তাকে বিশেষ পছন্দও করো না-বুঝেছ?

তোমাকে পছন্দ না করার পার্টে অভিনয় করতে আমার এক বিন্দুও অসুবিধা হবে না; ওটা স্বাভাবিক ভাবেই আসবে, খোঁচা দেয়ার সুযোগটা ছাড়ল লো লরি! তোমার সাথে কথার যুদ্ধ ভালই জমবে, বিদায় নিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল সে।

৪.

তারই পাঠানো দুজন কাউবয়কে লেজি এম র‍্যাঞ্চ থেকে ছাঁটাই করে ফেরত পাঠানোটা বার বির মালিক বার্ট তাকে সরাসরি অবত্ত করা হয়েছে বলেই ধরে নিল। পরের দিন বিকেলেই সে ঘোড়ার পিঠে জ্যাকের ব্যাঞ্চে গিয়ে হাজির হলো। ওর হাক শুনে বেরিয়ে এলো জ্যাক।

হ্যালো, মাস্টারসন, অভিবাদন জানাল সে। ফিকে রাইডে নিয়ে যেতে এসেছি, কিন্তু তার আগে তোমার সাথে কিছু কথা আছে।

এত বড় দেহ নিয়েও সে যেমন অনায়াসে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামল সেটা দেখে কেউ বুঝবে না, ওর বয়স এখন চল্লিশ পার হয়ে গেছে। জ্যাককে অনুসরণ করে সে বসার ঘরে ঢুকল।

বুল আর মারিওকে তোমার এভাবে ছাঁটাই করার কি কারণ? রুক্ষ স্বরে প্রশ্ন করল সে।

বুলকে অস্থায়ী ফোরম্যানের কাজ করার প্রস্তাব দেয়ায় সে খেপে গিয়ে আমার ফোরম্যানকে গুলি করার জন্যে পিস্তল বের করার চেষ্টা করেছিল, ব্যাখ্যা করল জ্যাক। আর মারিও নিজের ইচ্ছেতেই কাজ ছেড়েছে।

ভাল, কিন্তু বুলকে যদি তোমার অপছন্দই ছিল তাহলে তুমি সেটা আমাকে জানালেই পারতে, আমি ওর বদলে আর কাউকে পাঠাতাম, বলল বার বি র্যঞ্চের মালিক। কিন্তু এই জেমসের খোঁজ তুমি কোথায় পেলে?

ডেজার্ট এজে ওর কথা আমি শুনেছি, জবাব দিল জ্যাক। মনে হলো আমার কাজের জন্যে লোকটা সত্যিই যোগ্য।

হতে পারে, ঠাণ্ডা স্বরে বলল বার্ট। কিন্তু ওকে আমার মোটেও পছন্দ নয়, মাস্টারসন, ওকে বিদায় করো।

র‍্যাঞ্চারের দুচোখে মুহূর্তের জন্যে অবাধ্য একটা ভাব ফুটে উঠল। কিন্তু বার্টের কঠিন দৃষ্টির সামনে সে চোখ নামিয়ে নিতে বাধ্য হলো।

হয়ত কিছুদিন পরে আমি তাকে

না, বাধা দিয়ে বলে উঠল বার্ট। আগামীকালই ওকে যেতে হবে। ও, আর একটা কথা, ট্রেইলে পাঠাবার জন্যে আমার পঁচাত্তরটা তিন-বছরবয়সী গরু কম পড়েছে; ওগুলো নেয়ার জন্যে আমি দুদিনের মধ্যেই তোক পাঠাব।

রাগে র‍্যাঞ্চার ভিতরে ভিতরে জ্বলছে; কিন্তু মনের ইচ্ছাটা মনেই রয়ে গেল। লোকটাকে গুলি করে মারার সাহস হচ্ছে না, কারণ বার্ট ওকে বহুবার সাবধান করেছে, মনে রেখো, জ্যাক, আমি যতদিন বেঁচে আছি কেবল ততক্ষণই তুমি নিরাপদ।

বাইরে থেকে ঘোড়ার খুরের শব্দ ওকে কোন জবাব দেয়ার একটা কঠিন পরিস্থিতি থেকে রেহাই দিল। ফিলকে দেখা গেল দরজায়। রাইডিঙের পোশাক পরে তৈরি হয়ে কাউপোনি নিয়েই এসেছে সে। বার্টকে নিয়ে বেড়াতে চলে গেল মেয়েটা। কাউবয়, স্টাইলে স্যাডল হর্নের খুব কাছে বসে দ্রুত ঘোড়া ছুটাল ফিল। ওর উৎফুল্ল ডাকে সাড়া দিতে বার্টও ঘোড়া ছুটিয়ে পাশাপাশি এসে হাজির হলো। ওদের যেতে দেখে বাঙ্কহাউসে ঢুকল এরফান।

ওই লোকটাই তো তোমাদের নতুন ফোরম্যান, তাই না? প্রশ্ন করল বার্ট। ওর সম্পর্কে তোমার কি ধারণা?

ওসব সাধারণ কর্মচারীদের নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না, হালকা সুরে বললেও কথাটা সম্পূর্ণ সত্য বলেনি ফিল।

তাহলে তো আমার দুশ্চিন্তার কিছুই নেই, বলল তার সঙ্গী। আমি তোমার বাবাকে বলেছি ওকে যেন কালই বিদায় করা হয়। আমার ভয় ছিল তোমার যদি ওকে ভাল লেগে থাকে

ওকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে ফিল বলল, আমার প্রশ্রয় পাওয়া এত সহজ নয়, মিস্টার বার্ট। আশা করি বাবা তোমার উপদেশ মতই কাজ করবে।

মুখে ওই কথা বললেও ওর মনে একটা সন্দেহ থেকেই গেল। ফিলের ধারণা নতুন ফোরম্যান আসার পর থেকে ওর বাবা যেন দুশ্চিন্তা ছেড়ে আবার সেই আগের প্রত্যয় ফিরে পেয়েছে।

বাটও মেয়েটার কথায় নিশ্চিন্ত হয়ে জেমসের কথা, আর তুলল না। মাঝেমাঝে সে তার পাশের অপরূপা সুন্দরী যুবতীর দিকে ফিরে তাকাচ্ছে। যেকোন মূল্যেই হোক মেয়েটাকে তার চাই। যদিও ওদের মধ্যে বয়সের বেশ ব্যবধান রয়েছে, তবু সে আকারে ইঙ্গিতে ওকে এটা জানিয়েছে। তবে সে প্রকাশ্যে কখনও ওর সাথে প্রেম করার চেষ্টা করেনি। সে নিজেকে বুঝিয়েছে যে তার এখনও বয়স এমন কিছু বেশি হয়নি, এবং এছাড়াও তার যথেষ্ট ধন সম্পত্তি আর প্রতিষ্ঠা আছে-এটাও ফেলনা কিছু নয়।

মেয়েটার চিন্তাও প্রায় একই খাতে বইছে। সে ভাল করেই জানে যে বার বির মালিক তার প্রেমে পাগল-এটা ভেবে নিজেও সে মনেমনে পুলকিত হচ্ছে। বার্টের পরনে রেঞ্জে কাজ করার উপযুক্ত কাউবয়দের মত পেশাক থাকলেও তা উন্নত মানের দামী কাপড়ে তৈরি এবং পরিচ্ছন্ন। নিজেকে কেমন দেখাচ্ছে সে সম্পর্কে লোকটা সচেতন। এদিককার মেয়েদের মতে লোকটা পৌরুষোচিত, আত্মপ্রত্যয়শীল, এবং চাইলে সে অতন্ত ভাল আর আনন্দদায়ক সঙ্গী হতে পারে। যদিও বিষয়টা নিয়ে কখনও গভীর ভাবে ভাবেনি ফিল, তবু সে মনে করে এই মেলামেশার পরিণতিতে বার্টের সাথেই তার বিয়ে হবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আজ বেড়াতে বের হয়ে কেন যেন বারবারই ওর মনে হচ্ছে যার সম্পর্কে সে ভাবে মা বলেছিল, তার সামনে এই লোকটার ব্যক্তিত্ব নেহাতই খেলে। হয়ত এই কারণেই ফিলের বেড়ানোটা আজকে অন্যান্য দিনের মত উপভোগ্য হলো না।

ওইদিনই সন্ধ্যার পরে ফোরম্যান তার দরজায় খুব হালকা একটা নকের আওয়াজ শুনতে পেল। দরজা খুলে জ্যাককে দেখে ওকে ভিতরে ঢুকতে দিল সে। র‍্যাঞ্চারের চেহারাটা বিষণ দেখাচ্ছে, কিন্তু কথা বলার সময়ে তার স্বরটা দৃঢ়প্রত্যয়ে কঠিন শোনাল।

বার্ট আজ এখানে এসেছিল, এ নে হচ্ছে পরিস্থিতি চূড়ান্ত একটা সংঘর্ষের দিকে দ্রুত এগিয়ে চলেছে, শুরু করল সে। আমাকে পঁচাত্তরটা গরু হস্তান্তর করার আদেশের সাথে কালই তোমাকে বিদায় করে দিতে বলা হয়েছে। তার আগে ওর সাথে আমি নরকে দেখা করব। এক মুহূর্ত অপেক্ষা করার পরও এরফান কোন মন্তব্য করল না দেখে র‍্যাঞ্চার আবার বলে চলল, এটা আমি আরও দেরিতে ঘটবে বলে আশা করেছিলাম, কিন্তু এখন আর করার কিছু নেই। একটা কথা জেনে রাখো, আমি ব্যক্তিগত কারণে বার্টের মুঠোয় আছি-কিন্তু আমি যদি এখানে না থাকি

এরফান বোঝার ভঙ্গিতে হেসে মাথা ঝাঁকাল! মালিক যদি উপস্থিত না থাকে তাহলে লেজি এম র‍্যাঞ্চের ওপর বার্টের আর কোন অধিকারই খাটবে না।

আমার প্ল্যানটা হচ্ছে, আমি কাউকে কিছু না জানিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাব। এবং তুমি র‍্যাঞ্চ চালাবার ভার নেবে। আমি যদি একটা যুক্তিসম্মত সময়ের মধ্যে ফেরত না আসি, তখন সবাই ধরে নেবে আমি মারা গেছি এবং ডেজার্ট এজের জাজ এমারি আমার উইল অনুযায়ী চার্জ নিয়ে ফিলের অভিভাবক হিসেবে কাজ করবে। ফিলের পরিণত বয়স্কা হতে এখনও বারো মাস দেরি আছে। তুমি জানো জাজের সুপারিশেই তোমাকে আমি কাজে নিয়েছি। সে জানে না আমি কি প্ল্যান করেছি, তোমার যেকোন ঝামেলায় সে তোমাকে সাহায্য করবে।

তোমার মেয়ের জন্যে এটা খুব কষ্টদায়ক হবে। সে জানবে না তুমি বেঁচে আছ কি না।

সেটাও আমি ভেবে দেখেছি, কিন্তু এর বিকল্প আর কোন পথ নেই, জবাব দিল র‍্যাঞ্চার। আমি যদি কোন মেসেজ রেখে যাই তবে পুরো প্ল্যানটাই পণ্ড হয়ে যাবে-ওর আচরণেই সে ধরা পড়ে যাবে। এবং ব্ল্যাক বার্ট আমাকে খুঁজে বের করবে। আমি চাই বার্ট মনে করুক আমি মারা গেছি। এতে আমি নিশ্চিন্তে কাজ। করতে পারব। তাছাড়া ফিলের বয়সে দুঃখ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বার্টকে দেয়ার জন্যে জাজ এমারি আমার র‍্যাঞ্চ বন্ধক রেখে ব্যাঙ্কের কাছ থেকে আমাকে টাকা জোগাড় করে দিয়েছিল। আমার ধারণা ব্যাঙ্ক এত সহজে জাজকে টাকা ফেরত দিতে তাগিদ দেবে না। তাছাড়া ব্রিজের ধারে এক্স টি র‍্যাঞ্চ লেজি এম থেকে আশিটা গরু কিনতে চেয়েছে; ওরা ক্যাশ টাকাই দেবে। ওই টাকা দিয়েই কিছুদিন তুমি র‍্যাঞ্চের খরচ চালাতে পারবে। ব্যস, ওই সময়টুকুই আমার জন্যে যথেষ্ট হবে। জাজ এমারি তোমার সম্পর্কে আমাকে যা বলেছে সেই ভিত্তিতেই তোমাকে বিশ্বাস করে সব ভার তোমার ওপর ছেড়ে যাচ্ছি।

তুমি আমার ওপর আস্থা রাখতে পরো, শান্ত স্বরে বলল এরফান।

হ্যাঁ, তোমার ওপরই আমি আমার শেষ কড়িও বাজি রাখছি, জবাব দিল জ্যাক। আর মনে রেখো, আজ তোমার সাথে আমার দেখা হয়নি-এবং তুমি আমার গতিবিধি সম্পর্কেও কিছু জানো না। অ্যাডিঅস।

অনেকক্ষণ পরস্পরের হাত চেপে ধরে হ্যান্ডশেক করার পর যেমন চুপিচুপি এসেছিল তেমনি নিঃশব্দে বেরিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল র‍্যাঞ্চার। এখন ওর মন অনেকটা হালকা ঠেকছে। সে একটা মরিয়া অবস্থায় পড়েছিল, এতদিন পরে মুক্তি পেয়ে যেন ওর মনটা এখন হাওয়ায় উড়ছে। যদিও সদ্য পরিচিত একটা স্ট্রেঞ্জারের হাতে সে সব ভার তুলে দিয়ে এসেছে, তবু ওর মন বলছে উপযুক্ত লোকের কাছেই সে দায়িত্ব দিয়েছে।

সকালে খাবার টেবিলে বাবার অনুপস্থিতি ফিলের কাছে কিছুটা অস্বাভাবিক ঠেকলেও আর কেউ এ নিয়ে মাথা ঘামাল না। কারণ মাঝেমাঝে সকালে উঠে সে তার প্রিয় ঘোড়া নিয়ে বেড়াতে বের হয়। তবে কেউ ওকে বেরোতে দেখেনি। যখন পরের দিনও তার কোন খবর পাওয়া গেল না তখন ফিলের উদ্বেগ আশঙ্কায় পরিণত হলো যদিও সে জেমস লোকটাকে পছন্দ করে না, তবু তার কাছেই গিয়ে হাজির হলো মেয়েটা। কিন্তু সে কিছুই বলতে পারল না।

ওর এক্স টি র‍্যাঞ্চের সাথে একটা ব্যবসা করার কথা ছিল, হয়ত সে ওখানেই গেছে, বলল এরফান। অথবা এমনও হতে পারে কোন কাজে ডেজার্ট এজে গিয়ে সে আর ফেরার সময় করে উঠতে পারেনি।

ফিল মাথা নাড়ল। আমাকে না জানিয়ে বাবা এর আগে আর কোথাও যায়নি, বলল সে। তারপর একটা লোককে এগিয়ে আসতে দেখে মেয়েটা প্রশ্ন করল, কি খবর হেনডন?

ফিলের প্রশ্নে লোকটা খুব অস্বস্তি বোধ করছে বলে মনে হলো। আমি ফোরম্যানের সাথে একটু আলাপ করতে চাই, মিস মাস্টারসন, জবাব দিল সে।

মেয়েটার চেহারা ফেকাসে হয়ে গেল। কথাটা যদি আমার বাবার বিষয়ে কোন খবর হয়, তাহলে আমিও সেটা শুনতে চাই। ফিলের স্বরটা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ শোনাল।

কাউবয়কে তবু ইতস্তত করতে দেখে এরফান বলল, তুমি কি খবর এনেছ সেটা বলেই ফেলো শুনি।

মালিকের ঘোড়াটা এইমাত্র ফিরে এসেছে, জানাল হেনডন। ওটা ওখানে করালের ধারে দাঁড়িয়ে আছে।

ফিল কোন মন্তব্য করল না, কিন্তু ওর ঠোঁট পর্যন্ত সাদা হয়ে গেছে এবং থরথর করে কাঁপছে। সোজা করালের দিকে রওনা হলো মেয়েটা।

ওর পিছু নিয়ে এগোবার সময়ে হেনডন ফিসফিস করে বলল, ওকে কি তুমি একটু সরিয়ে রাখতে পারো না? ঘোড়াটার জিনের ওপর রক্তের দাগ রয়েছে।

মাথা নাড়ল এরফান। এখন আর তা সম্ভব নয়, অনেক দেরি হয়ে গেছে। লম্বা লম্বা পদক্ষেপে মেয়েটা প্রায় করালের কাছে পৌঁছে গেছে। ঘোড়াটা মাথা। নিচু করে ওখানে দাঁড়িয়ে আছে; পরিষ্কার বোঝা যাচেছ ওটা অত্যন্ত ক্লান্ত এবং পরিশ্রান্ত। খাপে রাইফেলটা নেই-এবং জিনের ওপর শুকনো রক্তের দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মেয়েটা বিস্ফারিত আতঙ্কিত চোখে ওদিকে চেয়ে আছে। এর মানে কি হতে পারে বোঝার বুদ্ধি তার আছে।

এরফানের কথায় সবার চটকা ভাঙল। তোমরা সবাই চটপট কাজে ব্যস্ত হও, বলল সে, ঘোড়া, রাইফেল আর খাবার নিয়ে দুমিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে নাও। আমি তোমাদের এখানে হাজির চাই। আমরা আজ জ্যাকের খোঁজে পুরো রেঞ্জ চষে ফেলব।

এরফানের জোরালো আদেশে ফিলেরও অভিভূত অবস্থাটা কেটে গেল। আমিও আমার ঘোড়া নিয়ে তৈরি হয়ে আসছি, বলে সে উদ্ধত দৃষ্টিতে এরফানের দিকে তাকাল, যেন আশা করছে। তাকে যেতে নিষেধ করবে, ফোরম্যান।

এরফান কিন্তু ঠিক তার উল্টোটাই করল। নিশ্চয়, বরং তোমার সাহায্যই আমাদের বেশি প্রয়োজন হবে, বলল সে, এই এলাকা তোমার চেয়ে বেশি আর কেউ চিনবে না। তাছাড়া জ্যাক যেসব জায়গায় বেড়ানো পছন্দ করত সেগুলো তুমি চেনো।

জোড়ায় জোড়ায় বিভক্ত করে সবাইকে বিভিন্ন দিকে পাঠাল এরফান, কারণ অনেক এলাকা জুড়ে ওদের খুজতে হবে। তবে কড়া নির্দেশ থাকল কেউ যেন একা কোন দিকে না যায়। ফিলকে পাঠানো হলো রে এদারটনের সাথে। কেবল বাকি থেকে গেল সে নিজে। অবশ্য টমি ওকে সঙ্গ দিল। স্টিভের লাশ যেখানে পাওয়া গেছিল সেই এলাকাটাই প্রথমে খুঁজে দেখার সিদ্ধান্ত নিল এরফান।

যাওয়ার পথে পুরো ব্যাপারটা একবার ভেবে দেখল সে। কিন্তু ওকে স্বাকার। করাতেই হলো যে এখন পুরো ঘটনাটাই কেমন যেন গোলমেলে ঠেকছে। এই এলাকায় কোন মানুষই স্বেচ্ছায় কেউ ঘোড়া ছেড়ে পায়ে হেঁটে কোথাও যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে না। তাছাড়া রাইফেলটাও খাপ থেকে অদৃশ্য হওয়ার অর্থ একটাই হতে পারে-সেটা হচ্ছে স্টিভের ভাগ্যে যা ঘটেছিল তাই ঘটেছে র‍্যাঞ্চারের। কিন্তু তাই যদি হয় তাহলে হত্যাকারী কে হতে পারে? এতে বার্টের কোন হাত থাকতে পারে না, কারণ র‍্যাঞ্চার বেঁচে থাকলেই তার লাভ। তবে কি ব্ল্যাক মাস্ক দলের কারও সাথে জ্যাকের শত্রুতা ছিল? এসব প্রশ্নের কোন সমাধান না পেয়ে শেষে সে ওসব চিন্তা মাথা থেকে আপাতত বাদ দিয়ে খোজার কাজে মন দিল। এমনও হতে পারে যে গুলি খেয়ে আহত অবস্থায় কোথাও পড়ে আছে র‍্যাঞ্চার। তাহলে তাকে যত তাড়াতাড়ি খুঁজে পাওয়া যায় ততই মঙ্গল।

কিন্তু ওর সব চেষ্টাই বৃথা গেল; আহত জ্যাক বা তার লাশ সে খুঁজে পেল। লেজি এম-এ ফিরে এরফান দেখল ওর মতই আর সব কাউবয়রাও বিফল হয়ে ফিরেছে। র‍্যাঞ্চারকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ডেজার্ট এজ আর হোপেও খবর পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু ওদিকেও তার কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

ষষ্ঠদিন খুব সকালে এরফান দেখল র‍্যাঞ্চহাউসের বারান্দায় বসে বার্ট আর ফিল আলাপ করছে। বিশাল লোকটা ব্যাখ্যা দিল যে সে কিছুদিন বাইরে ছিল-ফিল্পে খবরটা শুনেই ছুটে এসেছে। ফোরম্যানকে দেখেই তার চেহারা রাগে। বিকৃত হলো।

যদি চাও তুমি আমার আউটফিটের লোকজনকেও খোঁজার কাজে ব্যবহার। করতে পারো, ফিল, বলল সে। আমি বুঝতেই পারছি না জলজ্যান্ত লোকটা হঠাৎ এভাবে অদৃশ্য হলো কিভাবে। এবার এরফানের দিকে ফিরে সে প্রশ্ন করল, তোমরা পুরো এলাকা ভালভাবে খুঁজে দেখেছ তো? জবাবে ওকে নড করতে দেখে সে আবার বলল, তাহলে আর খোজাখুঁজি করে কোন লাভ নেই, সে যদি মাটির উপরে থাকে তবে নিজে থেকেই ফিরে আসবে-আর তা না থাকলে- ইঙ্গিতপূর্ণ ভঙ্গিতে কাঁধ উঁচাল বার্ট। তারপর, হঠাৎ ফোরম্যানকে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, এই ব্যাপারে তোমার কোন আইডিয়া আছে?

না, এসম্পর্কে আমি পুরো অন্ধকারে, জবাব দিয়ে বার্টের তীক্ষ্ণদৃষ্টি উপেক্ষা করে ওর চোখেচোখে চেয়ে থাকল এরফান।

বার্ট আবার ফিলের দিকে চোখ ফেরাল। এখন আমাদের আর করার কিছুই নেই। আশা রেখে আমাদের দৈনন্দিন জীবন চালিয়ে যেতে হবে। হ্যাঁ, ভাল কথা, তোমার বাবা আমাকে ট্রেইল হার্ড তৈরি করার জন্যে পঁচাত্তরটা গরু দেবে বলে কথা দিয়েছিল।

তুমি দেখো ওগুলো যেন পাঠিয়ে দেয়া হয়, এরফানকে নির্দেশ দিল ফিল।

তুমি ওগুলোর জন্যে কত টাকা দিচ্ছ? প্রশ্ন করল এরফান।

বেকায়দা পাল্টা প্রশ্নে বার্টের মুখ কালো হলো। এখানে দামের কোন প্রশ্ন উঠছে না, বলল সে। গরুগুলো আগের দেনা পরিশোধ করার আংশিক দাম, ফিলকে জানাল সে।

দেনা আছে প্রমাণ করার জন্যে লিখিত কিছু আছে? এরফান জানতে চাইল।

এতে তোমার নাক গলাবার কি আছে? খেপে উঠল বার্ট। তোমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে, ব্যস!

তুমি আমাকে আদেশ দেয়ার কে? শান্ত স্বরে পাল্টা জবাব দিল এরফান। এখানে এখন আমিই ইনচার্জ, মিস মাস্টারসনের ইচ্ছা বিবেচনা করে যদি আমি সেটা যুক্তিসঙ্গত মনে করি তবেই তা আমি পূরণ করব। আমি আমার মালিকের সবকিছুর জন্যে দায়ী, তাই একমাত্র মালিকের আদেশ ছাড়া যার-তার মুখের কথায় আমি কোনকিছুই কাউকে দিতে বাধ্য নই।

তুমিই ইনচার্জ, না? দাঁত খিচিয়ে বলল বার্ট। ভাল, কিন্তু এখন আর তুমি তা নও। মিস মাস্টারসন তোমাকে এই মুহূর্তেই বিদায় করবে।

ফিলের দিকে তাকাল এরফান। মেয়েটার ঠোঁট কাঁপছে, মুখ লাল হয়ে উঠেছে এবং বোঝা যাচ্ছে বাক্টই ওর হয়ে কথা বলুক, সে এটাই চাইছে।

ওটা তার পক্ষে সম্ভব নয়, চট করে জবাব দিল সে।

পারে না, না? আবার দাঁত খিচাল বার্ট। তাহলে তোমার ধারণা র‍্যাঞ্চটা ওর নয়?

তুমি ঠিকই ধরেছ, উল্লেখ করল ফোরম্যান। মালিক মৃত তা প্রমাণিত হওয়ার আগে তো নয়ই। এবং সেটা যদি সত্যি হয় তার পরেও ওকে পরিণত বয়স্কা না। হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। মাস্টারসন আমাকে এই পদে বসিয়েছে, এবং আমি এখান থেকে যে নড়ছি না, এসম্পর্কে তুমি নিশ্চিত থাকতে পরো।

বার্টকে তার শেষ কথা জানিয়ে দিয়ে সে ঘুরে নিজের কাজে চলে গেল।

বার্ট সেদিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থেকে মেয়েটাকে বলল, ওর একটা উচিত শিক্ষা হওয়া উচিত। আমি নিজে এর একটা ব্যবস্থা করব। ওকে সাজা দেয়ার কাজটা আমার হাতে ছেড়ে দিয়ে তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো।

অতিথি বিদায় নিয়ে চলে যাবার পরেও ফিল অনেকক্ষণ ধরে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে বারান্দাতেই বসে থাকল। পরিস্থিতিটা ভালমত বিচার করে উপলব্ধি করতে চেষ্টা করছে সে। সারা সপ্তাহটা বাবার শোকে মুহ্যমান হয়ে সারাদিন তাকে খুঁজে বেড়িয়েই কেটেছে ওর-কারণ অন্যান্য কাউবয়ের সাথে সমানে তাল রেখে সে-ও হন্যে হয়ে জ্যাককে খুঁজেছে। তখন তার আর কিছু ভাবার অবসর ছিল না। কিন্তু এইমাত্র বার্টের সাথে ফোরম্যানের ইচ্ছার বিরোধ দেখার পর। নিজের অবস্থান এখন সে ঠিকই বুঝতে পারছে। যদিও তার কাছে জেমসের কঠিন হাতে র‍্যাঞ্চের কর্তৃত্ব তুলে নেয়াটা ঠিক পছন্দ হয়নি, তবু যেন মনে ক্ষীণ একটা স্বস্তি বোধ করছে। স্বীকার না করলেও জেমসকে সে যে তার উদ্ধত আচরণের জন্যে পছন্দ করে না, এটা সত্যি। বার্ট যদি ওকে সত্যিই শায়েস্তা করতে পারে, তবে সে মনেমনে খুশিই হবে।

০৫.

এক এক করে দুহপ্তা পার হয়ে গেল, কিন্তু নিরুদ্দেশ র‍্যাঞ্চারের কোন খবর পাওয়া গেল না। গতানুগতিক নিয়মে র‍্যাঞ্চের কাজ ঠিকই চলছে। বুল ডেভিসকে ফোরম্যান যেভাবে সামলেছে তাতে আর সবাই বুঝে গেছে যে জেমসের সাথে লাগতে যাওয়ার ফল ভাল হয় না। এতে এ-ও বোঝা গেছে যে লোকটা কাজ বোঝে। তাই ওকে আর কেউ ঘটাতে সাহস পায়নি।

একদিন সকালে রাঁধুনী আর র‍্যাঞ্চহাউস দেখাশোনা করার পোর্ক ড্যানিয়েল এসে এরফানকে খবর দিল যে মিস মাস্টারসন ওকে দেখা করতে বলেছে। ওখানে পৌঁছে সে দেখল, ফিল বড় কামরাটায় তার অপেক্ষাতেই বসে আছে। মেয়েটাকে ফেকাসে দেখাচ্ছে, চোখের নিচে কালি পড়েছে; এসব এতদিন দুশ্চিন্তায় কাটানোর ফল।

আমি শুনলাম তুমি কিছু গরু একত্রে জড়ো করছ, বলল সে। ওগুলো কি মিস্টার বার্টের জন্যে?

না, বলল এরফান। ওগুলো এক্স টি র‍্যাঞ্চে বিক্রি করা হবে। তোমার বাবাই এর ব্যবস্থা করেছিল-তাছাড়া আমার কিছু টাকার দরকার হয়ে পড়েছে।

তোমার দরকার? ব্যঙ্গাত্মক সুরে খোঁচা দিল ফিল।

নিশ্চয়; আমাকে কর্মচারীদের বেতন আর খরচ দিতে হবে, জবাব দিল সে। হয়ত এক্ষেত্রে আমার না বলে আমাদের বলাটাই বেশি সঙ্গত হত; কিন্তু হরেদরে সেটা একই কথা হলো।

আমি ডেজার্ট এজ থেকে না ফেরা পর্যন্ত দয়া করে বিক্রিটা তুমি স্থগিত রেখো, ঠাণ্ডা স্বরে বলল ফিল।

ওর কথায় জেমস কোনরকম কৌতূহল প্রকাশ না করায় খুব নিরাশ হলো। মেয়েটা। এরফান কেবল বলল, তোমাকে এতদূর পথ আমি একা যেতে দিতে পারি না। অপেক্ষা করছে ফিল, সে ভাবছে লোকটা হয়ত নিজেই তার সাথে যাওয়ার প্রস্তাব দেবে, আর সে অত্যন্ত রূঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে মনের ঝাল মেটাবে। কিন্তু আবারও তাকে নিরাশ হতে হলো। বস্টনকে আমি তোমার সঙ্গে পাঠাতে পারি, ওর তেমন কোন কাজ নেই, বলল এরফান।

ওরা দুজনে বেশ দ্রুত গতিতেই ডেজার্ট এজের ট্রেইল ধরে এগোচ্ছে। প্রথমে ফিলের কিছুটা পিছনে থেকেই এগোচ্ছিল সে। কিন্তু কোন কথা ছাড়া চুপচাপ পথ চলতে চলতে বিরক্ত হয়ে শেষে মেয়েটা নিজেই ওকে এগিয়ে এসে পাশাপাশি চলতে বলল; গোলগাল চেহারার নতুন কাউহ্যান্ডকে আসলে ফিলের বেশ ভালই লেগেছে। যুবককে একটু লাজুক প্রকৃতির আর নিরীহ বলেই ওর। মনে হচ্ছে। যখন ফিল প্রশ্ন করল র‍্যাঞ্চটা ওর কেমন বলে মনে হয়, সে এক কথায় জবাব দিল চমৎকার কিন্তু ওকে যখন ওর ফোরম্যান কেমন জিজ্ঞেস করা হলো, তখন জবাবটা আগের মত তাড়াতাড়ি এলো, না বা তেমন উৎসাহও দেখা গেল না।

কিছুক্ষণ ভেবে সে বলল, লোকটা তার কাজ খুব ভাল বোঝে বটে, কিন্তু ওকে সন্তুষ্ট করা সহজ কাজ নয়। আসল কথা কি জানো, মিস, সে যখন কাউকে কোন কাজ করতে দেয়, কাজটা ঠিক ওর মন মত না হলে সে লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে বসতে পারে।

অর্থাৎ প্রচণ্ড উদ্ধত একটা হেঁকড়া লোক, মন্তব্য করল ফিল।

লরি বস্টন আড়চোখে মেয়েটার দিকে চেয়ে খিকখিক করে হেসে উঠল। ওকে আমি ঠিক উদ্ধত বলবনা-তবে সে তার নিজস্ব কঠিন আইডিয়ায় চলে, এটা সত্যি, বলল লরি।

আমার মতে সে একজন পেশাদার পিস্তলবাজ রোষের সাথে বলল ফিল।

অবশ্যই তা হতে পারে, স্বীকার করল লরি, কিন্তু আমার তা মনে হয় না; কারণ ওই ধরনের লোকের চোখগুলো সাধারণত নীচ দেখায়। তবু আমি বলব কেউ যদি ওর বিরুদ্ধে পিস্তল ড্র করতে যায় তবে হয়ত টের পাবে একটু দেরি করে ফেলেছে সে।

এরপর লরি মেয়েটাকে খুনী আর গান-ফাইটারদের অনেক গল্প শোনাল; ওয়াইল্ড বিল হিকক, শ্লেইড, বিদ্যুৎ এরফান, এবং আরও অনেকের কথা, সেইসাথে ওকে বোঝাবার চেষ্টা করল ওরা দেশে শান্তি আর শৃঙ্খলা আনার জন্যে কিভাবে লড়াই করেছে। কিন্তু মেয়েটা যখন প্রতিবাদ জানিয়ে বলল যে ওসব দেখার জন্যে দেশের আইন রয়েছে, আইনের লোকেরাই যারা খারাপ কাজ করে তাদের ধরে শাস্তি দেবে, তখন লরি হাসল।

মৃত লোকের কাছে আইন থাকলেই বা কি লাভ? প্রশ্ন করল সে। না, ম্যাম, ওইসব আইন-শৃঙ্খলাহীন এলাকা এবং এই এলাকায় মানুষকে আইন তার কোমরে হাতের কাছে তৈরি রাখতে হয়। যেখান থেকে সে যেকোন সময়ে দ্রুত কোমরে ঝোলানো আইনের সাহায্য পেতে পারে। আমি নিজে একজন ভদ্র মানুষ, কিন্তু তা হলেও আমাকে পর্যন্ত নিজেকে রক্ষার জন্য কোমরে অস্ত্র ঝোলাতে হয়।

এইসব কথাবার্তার মাঝেই ফিলকে ব্যস্ত আর আমোদে রেখে ওকে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিল কাউবয়। ডেজার্ট এজ ঠিক হোপের মতই আর একটা শহর। যদিও ফিল আরও কয়েকবার তার বাবার সাথে পুবে যাওয়ার সময়ে এখামে এসেছে, তবু এই শহর ওর কাছে বিশেষ পরিচিত নয়। এক পাকা চুলওয়ালা বুড়োর কাছে জাজ এমারির ঠিকানা জিজ্ঞেস করল ও। লোকটার মাথায় হ্যাট না থাকলেও স্বভাবজাত ভাবেই বুড়ো তার হ্যাট খোলার চেষ্টায় বিফল হয়ে একটু লজ্জা পেয়ে বাড়িটা দেখিয়ে দিল।

জাজ লোকটা বেশ লম্বা বয়স ষাটের মত হবে; তাকে মুখ দেখে টাইটেলটা দেয়া হয়নি। আসলেই সে সরকারি জাজ এবং আইন তার ভালভাবেই জানা আছে। কাজের মেয়েটা যখন তাকে জানাল যে মিস মাস্টারসন তার সাথে দেখা করতে এসেছে, সে তখন শার্ট পরিহিত অবস্থায় বসার ঘরে বসে চুরুট কুঁকছিল। ওটা তাড়াতাড়ি নিভিয়ে লম্বা কালো কোর্ট চাপিয়ে সাথে সাথেই বেরিয়ে সে নিজেই অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে এলো।

তাহলে তুমিই জ্যাক মাস্টারসনের সেই ছোট্ট মেয়েটা, না? এসো ভিতরে চলো। আমি ধরেই নিচ্ছি জ্যাকের কোন খবর তোমরা এখনও পাওনি? যাক, এখনই হতাশ হওয়ার কিছু নেই, পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে যেতে বলল এমারি। এখন সুস্থির হয়ে বসে বলো তোমাকে আমি কিভাবে সাহায্য করতে পারি।

প্রথম দৃষ্টিতেই জাজকে পছন্দ করে ফেলেছে ফিল। বসার আগেই সে ভাবল: এই লোককে বিশ্বাস করা যায়।

আমি বাবার কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করছিলাম, এই সময়ে দেখি ওগুলোর একটায় লেখা আছে তার যদি কিছু হয়, তাহলে আমি যেন এসে তোমার সাথে দেখা করি।

খুবই যুক্তিসঙ্গত কথা, বলল জাজ। এর প্রকৃত কারণ হচ্ছে তোমার। বাবার সব ব্যবসা বহু বছর ধরে আমিই দেখাশোনা করি। কয়েক মাস আগে আমার কাছে সে একটা উইল করে। ওটার শর্ত অনুযায়ী এখন আইনত আমিই তোমার অভিভাবক। বলতে বাধা নেই যে আমি আমার বর্তমান মর্যাদায় গর্বিত। সে একটা আনুষ্ঠানিক কুর্নিশের ভঙ্গি করে মেয়েটাকে সম্মান দেখাল। যখন দেখল ব্যাপারটা ফিলের মাথায় ঠিক ঢোকেনি তখন জাজ বলল, এর মানে হচ্ছে তোমার বাবা না ফেরা বা তার সম্পর্কে কোন নিশ্চিত খবর না পাওয়া। পর্যন্ত আমাকেই তোমার ভালমন্দ দেখতে হবে-তুমি প্রাপ্ত বয়স্কা হলেই কেবল র‍্যাঞ্চের মালিকানা পাবে।

মেয়েটা চুপ করে বসে আছে, ভাবছে। এবং ধরো-যদি এর মধ্যে আমি বিয়ে করতে চাই-তবে তোমার অনুমতি আমার নিতে হবে, এই তো?

ওর কথা শুনে ধূর্ত জাজের চোখে একটা ঝিলিক দেখা দিল, কারণ সে বুঝেছে এই তরুণী কেবল সুন্দরীই নয়, বুদ্ধিমতীও বটে। হ্যাঁ বলল সে, জ্যাক যে কেন এই শর্তটার ওপর এত জোর দিল তা আমার বোধগম্য হয়নি-কিন্তু এটা ওর উইল, সুতরাং আপত্তি করার কোন উপায় আমার ছিল না। ওতে আরও বলা হয়েছে, তুমি যদি আমার মতের বিরোধিতা করো তবে পুরো সম্পত্তির বদলে তুমি কেবল একটা সামান্য মাসিক ভাতা পাবে। কেন যে সে এই শর্তের ওপর এত গুরুত্ব দিল তা আমি নিজেও জানি না।

মেয়েটা আবার চুপ করে থাকল। আবছা ভাবে তার ধারণায় ছিল যে সে যদি বার্টকে বিয়ে করে তাহলে হয়ত:জেমসকে র‍্যাঞ্চ থেকে তাড়ানো অনেক সহজ হবে। এখন সে ভাবছে, এই শর্তটা কি বার বির মালিকের উদ্দেশেই করেছে বাবা? তার বাবার সাথে বার্টের সবসময়ে সদ্ভাবই ছিল; কিন্তু ইদানীং সে লক্ষ করেছে তার বাবার সাথে তার সম্পর্কে যেন কেমন একটা চিড় ধরেছে। এখন সে আর তাকে আগের মত পছন্দ করে না।

তুমি যদি তোমার র‍্যাঞ্চ সম্পর্কে দুশ্চিন্তায় থাকো তার কোন প্রয়োজন নেই, মন্তব্য করল জাজ। তোমাদের ফোরম্যান অত্যন্ত উপযুক্ত লোক।

আমি ওকে পছন্দ করি না, পরিষ্কার জানিয়ে দিল ফিল। সে এমন ব্যবহার করে যেন ওই র‍্যাঞ্চটা তারই সম্পত্তি।

সে তার মালিকের প্রতিনিধি হয়ে কাজ করছে, তাকে আদেশ দেয়ার অধিকার দেয়া হয়েছে, ওকে মনে করিয়ে দিল জাজ এমারি।

কিন্তু তাই বলে আমাকেও? প্রতিবাদ জানাল মেয়েটা।

তা কি সে কখনও করেছে? প্রশ্ন করল এমারি।

একটু ইতস্তত করে ফিল বলল, না, ঠিক তা নয়, তবে আমার ওকে পছন্দ হয় না, আমার আদেশও সে উপেক্ষা করেছে, বলে সে ওর সামনে বার্টকে গরু দিতে অস্বীকার করার পুরো ঘটনা খুলে বলল।

পুরোপুরি ঠিক কাজুই করেছে সে, বলল জাজ। তোমাদের র‍্যাঞ্চের ব্যবসা সংক্রান্ত সব কথাই জানি। আমার জানামতে বাটের কাছে কোন দেনা মাস্টারসনের নেই। এবং এটাও তোমাকে জানিয়ে রাখছি যে তোমার বাবার কাছে আমিই ওই লোককে রাখার সুপারিশ করেছিলাম। শুনে খুশি হলাম যে সে আমার বিশ্বাস ভঙ্গ না করে ঠিক মতই র‍্যাঞ্চ চালাচ্ছে।

আবার, মেয়েটা চুপ থাকল। সে ভেবেছিল বার্টকে বিয়ে করলে বিনা রক্তপাতেই ফোরম্যানকে সহজে বিদায় করা যাবে। কিন্তু তার বাবা উইলে ওই শর্তটা জুড়ে দিয়েই তার সব প্ল্যান পণ্ড করে দিয়েছে। সে আগে মনে করত তার বাবা বার্টকে পছন্দই করে, কিন্তু পরের দিকে তার মনে সন্দেহ জাগতে শুরু করেছিল। এখন তার মনে হচ্ছে হয়ত বার্টকে ঠেকাবার উদ্দেশ্যেই ওই শর্তটা। উইলে ঢুকানো হয়েছে। চতুর বুড়ো জাজই হয়ত এমন ভাবে উইলটা লিখেছে যেন বেকায়দা পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়। তার বার্টের পাওনার কথা এভাবে উড়িয়ে দেয়া থেকেই বোঝা যায় যে জাজেরও বার্ট সম্পর্কে তেমন উঁচু ধারণা নেই। তার এতদূর আসাটাই বৃথা হলো বুঝে বেজার মুখে যাওয়ার জন্যে উঠে দাড়াল সে। ওর এই তিক্ত চেহারার ভুল অর্থ করল জাজ।

দরদভরা স্বরে সে বলল, শোনো, লক্ষ্মী:মেয়ে, এখনই ভেঙে পড়ার কিছু নেই; আশপাশের সবকটা শহরে খবর নেয়ার ব্যবস্থা আমি করেছি, আশা করছি কয়েকদিনের মধ্যেই তোমার বাবার সন্ধান আমরা পেয়ে যাব। যদি যে-কোন করণে প্রয়োজন হয় তবে তুমি সোজা আমার কাছে চলে এসো, অথবা আমাকে একটা খবর পাঠালে আমি নিজেই চলে আসব-তবে তোমার ফোরম্যানকে তুমি বিশ্বাস করতে পারো।

লরির সঙ্গী ফিরতি পথে একেবারে নীরব থাকল। আসলে ওর মাথায় বিভিন্ন রকম চিন্তা চলছে এখন। সকালে ডেজার্ট এজের পথে রওনা হওয়ার সময়ে সে অনেক আশা নিয়ে বেরিয়েছিল যে জাজের সাথে দেখা করে এটা প্রতিষ্ঠিত করেই ফিরবে আসল মালিক কে, এবং কার আদেশ ফোরম্যানকে মেনে চলতে হবে; কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তার হাত-পা বাঁধা। ফোরম্যান বা জাজের কথা অনুযায়ীই ওকে চলতে হবে-অন্তত পরিণত বয়স না হওয়া পর্যন্ত তাকে এইভাবেই চলতে হবে। ওর এই অসহায় অবস্থার কথাটা জাজ এমারি যেন ভদ্র ভাষায় হাতুড়ি ঠকে ওর মাথায় ভাল করে ঢুকিয়ে দিয়েছে। তবে বার্ট ওর পক্ষে আছে, সে জানবে এই অবস্থা কিভাবে মোকাবিলা করতে হবে।

পরদিন সকালে বার বির মালিক আবার ওর সাথে দেখা করতে এলো, তখন সে জাজের সাথে দেখা করা থেকে শুরু করে নিজের বর্তমান অসহায় অবস্থার সব কথা সবিস্তারে জানাল ওকে। বার্ট তার নিজের বিরক্তিটা লুকাতে সক্ষম হলো বটে, কিন্তু কথার শেষে দেখা গেল তার ভুরুতে গভীর ভাঁজ পড়েছে।

আমি ভাবছি তোমার বাবা এই বুড়ো গাধাটাকে কেন কর্তৃত্ব দিতে গেল? মন্তব্য করল সে। এর পিছনে নিশ্চয় কোন গৃঢ় কারণ আছে। আমাদের সাবধান থাকতে হবে, ফিল, এটা একটা ফাঁদও হতে পারে।

তুমি কি বোঝাতে চাইছ? প্রশ্ন করল মেয়েটা।

আমি বলছি না যে এটাই সত্যি, কিন্তু ভেবে দেখো এমারিই ওই উইলটা লিখেছে, এবং সে নিজেই ওই জেমস গ্রীন লোকটাকে ফোরম্যান করার পরামর্শ জ্যাককে দিয়েছে। তারপর তোমার বাবা নিখোঁজ হলো; অর্থাৎ এখন এমারি আর জেমূসই হয়ে বসল এই সবথেকে বড় আর ভাল র‍্যাঞ্চটার কর্তা। আমি বাজি ধরে বলতে পারি যে তোমাকে এমারির অনুমতি ছাড়া বিয়ে করতে দেয়া হবে না।

না, আমি পরিণত বয়স্কা না হওয়া পর্যন্ত তা পারব না, ফিল স্বীকার করল।

আমি জানতাম! উত্তেজনায় প্রায় চেঁচিয়ে উঠল বার্ট। ওরা আটঘাট বেঁধেই কাজে নেমেছে। প্রথমে স্টিভকে সরানো হলো, এবং ওর জায়গায়। জাজের পরামর্শেই নেয়া হলো জেমসকে। পুরো র‍্যাঞ্চটাই এখন ওদের দুজনের হাঁতে। এখন জেমসু তোমার সাথে ঘনিষ্ঠ হতে পারলেই মেয়েটা বাঁকা হাসি হাসল। ফিল কি ভাবছে আঁচ করে নিল বার্ট। তুমি কোন ভুল করতে যেয়ো না-কিছু লোকের বিশ্বাস কোন মেয়েকে কঠিন ফাঁদে ফেলতে পারলেই তার মন জয় করে নেয়া যায়। আমি বাজি ধরে বলতে পারি ওর সাথে বিয়েতে জাজের অমত হবে না। কিন্তু ওকে সেই সুযোগ আমরা দেব না, তুমি কি বলো, ফিল? আমরা ওদের ঠিকই হারিয়ে দেব-ওদের চালাকি আমরা ধরে ফেলেছি। তুমি জানো ওর কাছে ক্যাশ কি পরিমাণ আছে?

রিজের মাথায় এক্স টি র‍্যাঞ্চে সে আশিটা গরু বিক্রি করবে।

ওগুলো সে কবে পাঠাচ্ছে?

আগামী পরশু।

খুব ভাল কথা, বিশাল লোকটা হাসল। এতে আমি ওর প্যানে কিছুটা বাগড়া বাধাবার যথেষ্ট সময় পাব।

মেয়েটা জিজ্ঞেস করল ন বা কি করবে; সে ধারণা করল কোন না কোন উপায়ে গরুর ডেলিভারি ঠেকানো হবে। এতে করে কোন নগদ টাকাই জেমস পাবে না। কিন্তু জেমসের প্রতি তার রাগ ওকে এমনই অন্ধ করে দিয়েছে যে সে। বুঝছে না যে এতে সে হয়ত তার নিজেরই ক্ষতি করছে। বার্ট তার মনে ওদের জঘন্য প্লটের মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে ওর মনটা এতই বিষিয়ে দিয়েছে যে নিজের ফোরম্যানকে ঠেকাতে সে যে-কোন কাজই এখন করতে প্রস্তুত।

One thought on “০১-০৫. দুপুরের প্রখর ফোস্কা-পড়া রোদে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *