০১. সামনে বিশাল বিজন প্রান্তর

জ্বলন্ত পাহাড় – কাজী মাহবুব হোসেন
সেবা প্রকাশনী – প্রথম প্রকাশ: ১৯৮৩

সামনে বিশাল বিজন প্রান্তর, পিছনে একদল সশস্ত লোক। প্রত্যেককেই ফাঁস তৈরি করা দড়ি নিয়ে তাড়া করে আসছে। উদ্দেশ্য একটাই-‘শক্ত-পাল্লা’কে ফাঁসিতে ঝুলাবে। যুবককে পরিচিতেরা ওই নামেই ডাকে। দাঁড়িপাল্লা মার্কা ঘোড়ায় চড়ে বলেই তার ওই নামকরণ। দাড়ি-পাল্লা’র জায়গায় ‘শক্ত-পাল্লা’ কেন ডাকা হয়, তা ওকে কিছুটা চিনলে বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না।

একা বলে ভয় পাবার মানুষ সে নয়। প্রচুর শক্তি, ধৈর্য আর একটা আত্মবিশ্বাসী শক্ত মন আছে তার। তা ছাড়া সামনের জনহীন এলাকা সম্বন্ধে কিছুটা জানা আছে বলেই যেন ওর আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেছে।

যারা ওর পিছনে ধাওয়া করেছে তারা খারাপ লোক না। রুক্ষ দেশের কট্টর রীতিনীতি ওদের কঠিন করেছে। প্রচলিত আইন অনুযায়ী অপরাধীকে শাস্তি পেতেই হবে। কোন ক্ষমা বা দয়া দেখানো হবে না। মরু-এলাকার মানুষ-এই একটা ক্ষেত্রে ওরা মরুভূমির মতই নির্মম আর নিষ্ঠুর

অ্যারিজোনা সীমান্তের কাছে চলে এসেছে শক্ত-পাল্লা। উত্তর দিকে দিগন্তে ওপাশে রয়েছে ইউটাহ অঞ্চল। সামান্ত পেরুতে হলে খটখটে শুকনো একটা মরুভূমি পাড়ি দিতে হবে। যদি সে পালানোর সিদ্ধান্তই নেয়, তবে আজ পর্যন্ত মরুভূমিতে বেঁচে থাকার যত কৌশল সে রপ্ত করেছে, সবই কাজে লাগবে এবার

শক্ত-পাল্লা’কে যারা ধাওয়া করেছে তাদের কেউ ওই সীমান্তের কথা জানে। ওদের কাছে সীমান্ত হচ্ছে ম্যাপের উপর অর্থহীন একটা দাগ। আইনের সাথে বেআইনের, ন্যায়ের সাথে অন্যায়ের আর সত্যের সাথে মিথ্যার সীমারেখাই কেবল চেনে ওরা। ওদের মতে সেই সীমা লঙ্ঘন করেছে শক্ত-পাল্লা। মুখ বুজে যা সহ্য করা যায় না, তাই করেছে সে।

সামনাসামনি মোকাবিলায় কেউ কাউকে গুলি করে হত্যা করাটা ওদের চোখে কোন অপরাধ নয়। ইউরোপেও আত্মসম্মান বজায় রাখার জন্য জুয়েলের চল ছিল।

কিন্তু পিছন থেকে গুলি করে কাউকে হত্যা করা অবশ্যই কঠিন অপরাধ। ওদের বিশ্বাস শক্ত-পাল্লা তাই করেছে। শাস্তি: ফাঁসিতে ঝুলতে হবে তাকে।

‘শক্ত-পাল্লা’ ওদের এই ধারণার কথা ভাল করেই জানে-বোঝেও। যারা ওর পিছু নিয়েছে তাদের কাউকেই সে ব্যক্তিগত ভাবে চেনে না। ওদের মধ্যে ভাল লোকও নিশ্চয়ই আছে, জানে সে-ভিন্ন পরিস্থিতিতে সে নিজেও ওদের একজন হতে পারত। ওদের মত মানুষের পাশে দাড়িয়ে হাতে হাত মিলিয়ে বহুবার বহু কাজ সে করেছে। একসাথে লড়েছে। পরিশ্রমী খেটে খাওয়া মানুষ ওরা। তাদের যা বিশ্বাস সেই অনুযায়ী উচিত কাজই করছে তারা।

এখন হয় তাকে পালাতে হবে নতুবা রুখে দাঁড়িয়ে মোকাবিলা করে ওদের ঠেকাতে হবে। যুদ্ধে নামলে হত্যা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে-অথচ ওদের কারও সাথে তার শত্রুতা নেই। ওদের চেনেই না সে।

.

লোকটা যাচ্ছে কোথায়?

কোথায় আর যাবে-সম্ভবত বাড়ি ফিরছে। তবে বেশিদূর যাবার মত রসদ ওর সাথে নেই। শিগগিরই ওকে ধরে ফেলব।

ব্যাটা কোথাকার লোক?

জানি না। এদিককার কেউ চেনে না ওকে। দোকানে জানা গেল পালাবার আগে ব্যাটা মেয়েদের একটা মাথার ক্লিপ ছাড়া আর কিছুই সাথে নেয়নি।

চুলের ক্লিপ?

হ্যাঁ, বিশ্বাস করো, স্প্যানিশ মেয়েরা মাথার চুলের কারুকাজ করা চিরুনির মত যেসব ক্লিপ ব্যবহার করে, সেইরকম একটা ক্লিপই কেবল নিয়েছে।

সূর্যের প্রখর আলোয় চোখ ছোট করে দূরে দিগন্তের দিকে চাইল কীথ। লোকটার ঘোড়াটা খুব ভাল। চমৎকারর মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে চলেছে।

ঘোড়াটাকে দেখেছি আমি-বড় বাকস্কিন। ঘোড়ার মার্কা হচ্ছে দাঁড়িপাল্লা। এই মার্কা আগে কখনও দেখিনি।

কয়েক মিনিটি কেউ আর কথা বলল না। কেবল ঘোড়ার খুর আর চামড়ার জিন মোচড় খাওয়ার শব্দ হচ্ছে।

মনে হচ্ছে অনেকখানি পথ এগিয়ে গেছে লোকটা, দলের সবচেয়ে কমবয়সী সদস্য ইউজিন মন্তব্য করল। শুধু সর্বকনিষ্ঠই নয়, এই এলাকায় মাত্র চার বৎসর হলো এসেছে সে।

ওদের মধ্যে গিবনই ছাপ আর চিহ্ন দেখে অনুসরণ করায় সবচেয়ে অভিজ্ঞ। প্রথম থেকেই একটা ব্যাপার খেয়াল করে বেশ বিচলিত হয়ে উঠেছে সে-সামনের আরোহী একবারও তার ঘোড়াটাকে ঊর্ধ্বশ্বাসে দুটায়নি। ঘোড়ার পায়ের ছাপ থেকে সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে লোকটা, একটুও তাড়াহুড়ো করছে না। তার মানেই অনেক পথ পাড়ি দেওয়ার মতলব আছে ওর। অস্বস্তিভরে ভাবছে সে, অনেকটা সেধেই ঝামেলা কাঁধে নিয়েছে ওরা।

ঘাগু লোক, গিবনের মনের কথাটাই যেন ব্যক্ত করল লী। ঘোড়াকে অযথা বেশি হয়রান না করে পথ চলতে জানে। তা ছাড়া এসব এলাকাও ওর অপরিচিত নয়।

খুর থেকে ধুলো উড়ছে। উত্তপ্ত রোদে ওদের পিঠ পুড়ে যাচ্ছে। তেতে উঠছে বিস্তীর্ণ পাথুরে প্রান্তর। খটখটে শুকনো জমির উপর তাপের ঢেউ দূর থেকে ঠিক পানির মত দেখাচ্ছে। আরও দূরে পাহাড়ের নীল মিছেই প্রাণ-জুড়ানো শীতলতার আশ্বাস দিচ্ছে।

বালির উপর দিয়ে, ঘোড়ার পায়ের ছাপ ট্রেন-লাইনের মত সোজা সামনে এগিয়ে গেছে। পথে বড় পাথরের চাঁই বা কাটা ঝোঁপ এড়াতে দু’একবার একটু বাঁক নিয়ে সামান্য ঘুরে গেছে। ছয়জনের অনুসরণকারী দলটা কিছুটা অনিশ্চিত ভাবেই সামনের লোকটার মনে কী আছে ভাবতে ভাবতে এগিয়ে চলেছে।

চিহ্ন দেখে দেখে কাউকে অনেকক্ষণ অনুসরণ করলে লোকটা সম্পর্কে অনেক কিছু আপনাআপনি জানা হয়ে যায়। মাটির উপরকার দাগ দেখেই লোকটার কোমলতা, নিষ্ঠুরতা, অজ্ঞতা, চাতুরী, শক্তি, সাহস আর দুর্বলতার অনেক আভাস পাওয়া যায়। ছাপার অক্ষর পড়তে না জানলেও কেউ কেউ চিহ্ন দেখেই একজনের নাড়িনক্ষত্র বলে দিতে পারে।

ফ্রীডম শহর ছেড়ে বেরিয়ে শক্ত-পাল্লা’র পিছু নিয়ে এখন পর্যন্ত অনেক কিছুই জেনেছে ওরা-তবু জানার এখনও প্রচুর বাকি।

ব্যাপারটা কীভাবে শুরু হলো? প্রশ্ন করল ওদের একজন।

হাতের ঘাম মুছতে অন্য হাতে রাইফেলটা ধরল গিবন। বাতাসে পিছনের লোকটা যেন শুনতে পায় এমন ভাবে একটু ঘাড় ফিরিয়ে সে জবাব দিল, লোকটা দোকান থেকে খাবার কিনছিল, এইসময়ে ডেরিক কিছু একটা মন্তব্য করলে লোকটা খেপে যায়। ডেরিকের কোমরে পিস্তল থাকলেও লোকটা ছিল নিরস্ত্র। তাই ডেরিক ওকে পিস্তল সহ তৈরি হয়ে আসতে বলেছিল। শাসিয়েছিল ফিরে না এলে তাকে খুঁজে বের করে কুকুরের মত গুলি করে মারবে সে

ও যখন ফিরে আসে ডেরিক তখন বারে দাঁড়িয়ে। ঠেলা দিয়ে বারের দরজা খুলেই ডেরিকের পিঠে পরপর দু’বার গুলি করে সে। বারে মদ খাচ্ছিল ডেরিক। ততীয় গুলিতে একটা হুইস্কির বোতল ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

এক মুহূর্ত নীরব থেকে ইউজিন জানতে চাইল, আমরা ওকে ফাঁসি দেব ডেরিককে মারার, নাকি হুইস্কির ভরা বোতল ভাঙার অপরাধে?

প্রশ্নটা যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু ওর প্রশ্নের জবাব দিয়ে নিজেদের খেলো করল না কেউ।

সামনে সাদা আর তামাটে রঙের প্রান্তরে বিক্ষিপ্ত ভাবে একবার চোখ বুলাল ইউজিন। কোথাও গভীর ফাটল, কোথাও বা পুরোনো লাভা স্রোতের কালো ধারা জমিতে ছেদ ঘটিয়েছে।

কাউকে ধরে বেঁধে হত্যা করা সমর্থন করে না ইউজিন। তা ছাড়া যার পিছনে ধাওয়া করা হচ্ছে তাকে চেনা তো দূরের কথা কোনদিন চোখেও দেখেনি সে। মিলেমিশে থাকতে হলে প্রতিবেশীদের সুখে দুঃখে তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত, তাই নেহায়েত কর্তব্য পালন করতে এসেছে ও

ফ্রীডম শহরে কোন আইন-আদালত নেই। জনমতই ওখানকার আইন। প্রত্যেকে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার শিখে নেয় ছেলে বেলাতেই। দরকার পড়লেই অস্ত্র ব্যবহার করে ওরা। পশ্চিমের এই ধরনের শহরেই সাধারণত বেআইনী ডাকাত আর বন্দুকবাজ লোকেদের আস্তানা গড়ে ওঠেকিন্তু ফ্রীডমের বেলায় তা ঘটেনি।

গোলাগুলিটা কে দেখেছে? হঠাৎ প্রশ্ন করল ইউজিন।

আসলে এত দ্রুত ঘটে গেছে যে কেউই ঠিক দেখেনি কেমন করে কী ঘটল। বারের অন্যদিকে কাজে ব্যস্ত ছিল ফ্রেন্ড। তবে এটা ধরেই নেয়া যায় লোকটা ডেরিককে কোন সুযোগই দেয়নি-পিস্তলে ডেরিকের খুব ভাল হাত ছিল।

কথাটা ইউজিনকে মনে মনে স্বীকার করতেই হলো। পিস্তল চালনায় রীতিমত ওস্তাদ ছিল ডেরিক। এ নিয়ে বেশ গর্বও ছিল তার। তবে নতুন লোকের সাথে ডেরিকের একটু বেয়াড়া ব্যবহার করার অভ্যাস ছিল।

বাতাসে ধুলোর পরিমাণ বেড়েই চলেছে। অন্যদের দেখাদেখি ইউজিনও মুখে রুমাল বেঁধে নাক মুখ ঢেকে নিল। ঘোড়ার সাথে বাধা পানির বোতলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দে পানির পিপাসা প্রবল হয়ে উঠছে তার। কিন্তু দলের প্রবীণ কেউ এখনও পানি ছোঁয়নি-তা ছাড়া পানির স্বাদও এখন ঝাঁঝাল আর গরম হবে ভেবে ওই চিন্তা বাদ দিল সে।

কীথ, লোকটাকে দেখলে চিনতে পারবে তুমি? প্রশ্ন করল লী

মনে হয় পারব। তিরিশের কাছাকাছি বয়স-শক্ত-সমর্থ মাঝারি গড়ন। দোকানের লোকজনের ধারণা লোকটা খুব শক্তিশালী। সেইজন্যেই ওকে শক্ত পাল্লা নাম দিয়েছে ওরা।

লী নিজেও দড়ির মত পেশীওয়ালা শক্তিধর পুরুষ। অত্যন্ত পরিশ্রমী লোক সে। ফ্রীডম শহরে এসে প্রথম বছরেই অমানুষিক পরিশ্রম করে নিজের পশু খামারটাকে দাঁড় করিয়ে ফেলেছে ও। প্রতিবেশী হিসাবেও সে খুব ভাল। ইউজিনের বাসার কাছে যখন বনে আগুন লেগেছিল তখন লী-ই প্রথম ছুটে এসেছিল সাহায্য করতে।

লী পৌঁছানোর প্রায় সাথে সাথেই কীথও ওয়্যাগন ভর্তি ভিজে ছালা আর কোদাল নিয়ে হাজির হয়েছিল। গত বছর গিবন ভাঙা পা নিয়ে যখন বিছানায় পড়ল তখনও কীথই কঠিন শীতের মাসগুলোতে নিজের পশুর জন্য তুলে রাখা খাবার খাইয়ে গিবনের গরু-মহিষগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। এজন্য ওকে প্রচুর বাড়তি পরিশ্রমও করতে হয়েছিল।

লী-র বন্ধু ছিল ডেরিক। লী-কে ওর পশু তাড়িয়ে আনতে সাহায্য করার উদ্দেশ্যেই এসেছিল সে। এদিকে একটা পছন্দসই জায়গা পেয়ে শেষ পর্যন্ত এখানেই থেকে যায়।

ডেরিক ছিল যেমন দুঃসাহসী তেমনি বখাটে। তামাশার খাতিরে অন্যের ক্ষতি করতেও দ্বিধা করত না। তবু লোকটা খুব ফুর্তিবাজ ছিল বলে সবাই বেশ পছন্দ করত ওকে। কারও বুনো ঘোড়া পোষ মানানোর দরকার পড়লে নিজে থেকেই এগিয়ে যেত সে। নিছক উত্তেজনা আর চ্যালেঞ্জের টানেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিনে পয়সায় অন্যের ঘোড়া বশ করে দিত। চতুর পিস্তলবাজ ছিল সে। সামনাসামনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ওর সাথে কারও পারার উপায় ছিল না।

ফ্রীডমে এসে ইউজিন তার মিষ্টি স্বভাব দিয়ে সবার সাথে বন্ধুত্ব গড়ে নিতে দেরি করেনি। ওহাইওতেও খামারের কাজই করত। পশ্চিমের আচার আর রীতির সাথে নিজেকে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিয়েছে সে। পশ্চিমী নিয়মে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যখন তাকেও দলের একজন হিসাবে নির্বাচন করা হলো, গর্বে ওর বুকটা ফুলে উঠেছিল। ওরা যে তাকে নিজেদের একজন করে নিয়েছে, এ বিষয়ে এখন সে নিঃসন্দেহ।

কিন্তু ইউজিনের মনে পড়ে সে এই এলাকায় যখন নতুন, ডেরিক কিছুতেই তাকে সহ্য করতে পারত না। লী আর অন্যান্য সবাই ওকে মেনে নেওয়ায় বাধ্য। হয়েই শেষে চুপ হয়ে গেছিল ডেরিক। অবশ্য, ওর যত দোষই থাকুক না কেন, পিঠে গুলি করে ওকে মারা খুবই অন্যায় হয়েছে আগন্তুকের।

ঘোড়া থেকে নেমে পায়ে হেঁটে চলছে লোকটা। হঠাৎ উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল লী।

লোকটা খুব চালাক, মন্তব্য করল গিবন। বেশ ভোগাবে বলেই মনে হচ্ছে।

হয়তো ওর ঘোড়াটা খোড়া হয়ে গেছে, বলল ক্লাইভ।

না, খুঁড়িয়ে চলার কোন চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু একটা মতলব আছে ওর।

ধীরে ধীরে আরও মাইল দুয়েক পথ এগিয়ে গেল ওরা। বালির বদলে এদিকটায় পুরু ধুলো। একটা জায়গায় ধুলোর উপর পাশাপাশি দুটো চাপড়া দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কিছু যেন ছলকে পড়েছে। ওদিকে এগিয়ে গিয়েছিল বার্ট। পানি, জানাল সে।

সাবধানে খরচ না করলে পানির টান পড়বে ওর, বলল ইউজিন।

বাজি রেখে বলতে পারি পানি দিয়ে ঘোড়ার নাক মুছিয়েছে লোকটা, বলল লী। এই ধুলো ঘোড়ার শ্বাসের খুব ব্যাঘাত ঘটায়। এর মধ্যে দিয়ে কেউ ঘোড়া ছুটিয়ে চললে ঘোড়া মারা পড়তে পারে।

ওরা যাকে অনুসরণ করছে সে তার ঘোড়াকে স্বাভাবিক গতিতেই এতক্ষণ চালিয়ে এসেছে। কিন্তু তাকে যদি ওরা ধরে ফেলার উপক্রম করে তবে সে ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘোড়া ছুটিয়ে পালাবে, সন্দেহ নেই। মাথা থেকে হ্যাটটা খুলে ঘাম মুছল ইউজিন। বিশেষ করে ওর জন্যই পাথরের জগে দুধ রাখে ওর বৌ-ঠাণ্ডা থাকে। বাড়ি ফেরার জন্য ওর মনটা কেমন যেন ছটফট করে উঠল।

সূর্যের দিকে চাইল সে। এতক্ষণ ওটা ডাইনে ছিল-হঠাৎ করে কী করে যেন সেটা তাদের বায়ে চলে এসেছে। খেয়াল করে দেখল ট্রেইলটা এখানে এসে এত চক্রাকারে ঘুরে গেছে। গিবন নেতৃত্ব দিচ্ছিল-একটা গালি দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়া সে

সবাই ওর পাশে পৌঁছে দেখল অল্প কিছু দূরে শুকিয়ে যাওয়া খালের মত একটা জায়গা। যেখানে ঘোড়া বাধার চিহ্ন রয়েছে। তার পাশেই পাথর চাপা দেওয়া একটা কাগজ বাতাসে শব্দ তুলে উড়ছে

ঘোড়া চালিয়ে নীচে নেমে কাগজটা তুলে নিয়ে এল লী। কাগজের উপর চোখ বুলিয়ে মুখে বিরক্তিসূচক একটা শব্দ করে ওটা গিবনের দিকে এগিয়ে দিল সে। চিরকুটটা ওদের উদ্দেশেই লেখা হয়েছে।

গোলাগুলিতে আমার দিক থেকে কোন অন্যায় হয়নি-তবু আমার পিছনে লেগেছ কেন? আর লাগতেই যদি চাও মোটে ছয়জন এলে কেন? ফিরে যাও, আরও লোকজন নিয়ে এসো। ছাইয়ে রঙের ঘোড়াটার জিনের পেটি এখনই শক্ত করে বাঁধা না হলে ওর পিঠের দশা খুব খারাপ হবে।

লেখাটার নীচে কোন সই নেই।

আসপর্ধা! বিড়বিড় করে বলল বার্ট। কিন্তু ওর রাইফেলের মুখে মাত্র চল্লিশ গজের মধ্যে আমাদের সবাইকে পেয়েছিল লোকটা!

লজ্জায় লাল হয়ে ঘোড়ার জিনের পেটি শক্ত করে বেঁধে নিল ইউজিন। কিন্তু ওকে লক্ষ করছে না কেউ। সবাই তার মতই অপ্রস্তুত হয়েছে ওই চিরকুটটা ওদের সবার জন্যই অপমানজনক। ওতে কিছু ভাল উপদেশ থাকলেও চটেছে সবাই। কিন্তু চটলে কী হবে-সেই সাথে একটা অজানা ভীতিও ওদের মনে ঢুকছে। এত কাছে থেকে ইচ্ছা করলে লোকটা সহজেই ওদের কয়েকজনকে ঘায়েল করতে পারত!

শক্ত-পাল্লা’ ওদের খেলাচ্ছে! আত্মসম্মানে ঘা লেগেছে ওদের। ওরা ধরেই নিয়েছিল যে লোকটা ওদের সামনে রয়েছে-প্রাণভয়ে পালাচ্ছে সে। ওরা যে কতটা অসতর্ক তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ায় ওরা মনে মনে খেপেছে।

অন্যায় হয়নি! বললেই হলো? ফুসে উঠল ক্লাইভ। পেছন থেকে পিঠে গুলি করে এখন সাফাই গাইছে ব্যাটা!

অত্যন্ত সাবধানে আবার এগোল ওরা। একবার ওদের হাতে পেয়ে ছেড়ে দিলেও পরেরবার লোকটা কী করবে বলা যায় না।

অনুসরণ করা এখন কঠিন হয়ে উঠছে। নানা রকম ফন্দি খাটিয়ে লোকটা ধোকার সৃষ্টি করছে। চিরকুটটা পাওয়ার পর থেকেই আরও সাবধানী হয়েছে ওরা। ফাঁদ পাতা যায় এমন প্রতিটি জায়গায় ওরা খুব সতর্কতার সাথে নিশ্চিত হয়ে তবে এগোচ্ছে। বারবার দেখা যাচ্ছে মিছেই ভয় পেয়েছে ওরা-কিন্তু বেশি সাহস দেখাতে গিয়ে মরতে রাজি নয় কেউ।

একটা উপত্যকার ভিতর দিয়ে চলেছে ওরা। একটু আগে মাঝে-মধ্যে দমকা হাওয়া বইছিল-এখন তাও নেই। দু’পাশের দেয়াল আর মাটি থেকে আভেনের মত ভাপ বেরুচ্ছে। তাপে গা ঝলসে যাচ্ছে-ঘামের লবণে জ্বলছে চোখ। শরীরের ভাজে ধুলো জমে ঘামের সাথে মিশে লেই-এর মতো চাপড়া বেঁধেছে-চুলকাচ্ছে। তবু এগিয়েই চলল ওরা।

আর একটু সামনে দেখা গেল উপত্যকাটা চওড়া হয়ে বিস্তৃত একটা গামলার আকার নিয়েছে। বৃষ্টির পানি জমে মাঝখানে একটা লেকের সৃষ্টি হয়েছে। বদ্ধ পানি, ক্ষারে ভরা

শক্ত-পাল্লার’ পায়ের ছাপ লেকের পানিতে নেমে মিলিয়ে গেছে। বোকার মত সেদিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল ওরা।

এর ভিতর দিয়ে কিছুতেই পাড়ি দেয়নি লোকটা, বলে উঠল গিবন। মাঝখানে অনেক পানি-তা ছাড়া কাদায় ঘোড়া ফেঁসে যাবার সম্ভাবনাও আছে।

দু’টো দলে ভাগ হয়ে লেকের পাড় দিয়ে দু’দিকে রওনা হলো ওরা। পাঁচশো গজ যেতে না যেতেই পিছন থেকে ডাক শুনে ইউজিন ঘাড় ফিরিয়ে চাইল। লী। ওদের হাতের ইশারায় ফিরে যেতে বলছে। লোকটা ঘোড়া নিয়ে কোথায় পানি থেকে উঠে এসেছে তা খুঁজে পেয়েছে লী।

খুব সহজ সাধারণ একস্টা চালাকি। কিন্তু ওদের এতে বেশ কিছুটা সময় নষ্ট হলো। ভিতরে ভিতরে রেগে উঠছে ইউজিন। ছিপে মাছ খেলানোর মতই ওদের খেলাচ্ছে লোকটা!

রওনা হবার সময়ে ভেবেছিল কাজ শেষ করে আজ রাতেই নিজের র‍্যাঞ্চে ফিরতে পারবে সে কিন্তু যতই সময় যাচ্ছে ওর কাছে ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে আসছে যে কাজটা মোটেই সহজ হবে না। ওরা রাতে কোথায় কখন ক্যাম্প করে একটু বিশ্রাম নেবে সেটা পর্যন্ত ওই লোকটার ইচ্ছার উপর নির্ভর করছে এখন। ওরা না জানলেও শক্ত পাল্লা ঠিকই জানে সে কোথায় চলেছে। ইচ্ছা করেই সবচেয়ে কঠিন আর দুর্গম পথ সে বেছে নিয়েছে। হয়তো আশা করছে অতিষ্ঠ হয়ে ফিরে যাবে ওরা।

খুরের ছাপগুলো দ্রুত বাঁ-দিকে ঘুরে পাহাড়ের ঘন ঝোঁপগুলোর দিকে এগিয়ে গেছে।

ব্যাটা যাচ্ছে কোন চুলোয়? অসহিষ্ণু স্বরে বলে উঠল লী। আমি তো এর মাথা-মুণ্ডু কিছুই বুঝছি না।

ওর কথার জবাব দিল না কেউ। লম্বা সার বেঁধে ক্লান্ত দেহে আবার এগিয়ে চলল ওরা। সবার আগে কীথ। চলতে চলতে হঠাৎ রাশ টেনে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। পাহাড়ের ফাটল থেকে ছোট্ট একটা পানির ধারা ফোঁটায় ফোঁটায় নীচে পড়ে পাথরের বাটির মত একটা জায়গায় জমা হচ্ছে।

কী আশ্চর্য! বলে উঠল গিবন। আমি ভাবতেও পারিনি এখানে পানি আছে।

ঘোড়া থেকে নামল কীথ। ওর দেখাদেখি অন্যেরাও। খুব তেষ্টা পেয়েছে আমার-সাধ মিটিয়ে পানি খেয়ে নিই। পাথরে ঘেরা পরিষ্কার পানি দেখিয়ে সে বলল, মনে হচ্ছে এটা যেন নতুন তৈরি করেছে কেউ।

আশপাশটা ঘুরে দেখছিল গিবন। নতুন পুরোনো সব রকম পায়ের ছাপ পরীক্ষা করে দেখে সে মন্তব্য করল, এটা ওরই কাজ। কিন্তু অবাক লাগছে। ভাবতে যে ব্যাটা এই জায়গাটা খুঁজে পেল কীভাবে?

আমার মনে হচ্ছে এই এলাকা লোকটার চেনা, বলল বার্ট।

শব্দ করে হেসে উঠল গিবন। সত্যি শক্ত-পাল্লায়ই পড়েছি আমরা। পথ দেখিয়ে আমাদের এমন জায়গায় নিয়ে এসেছে যে বাধ্য হয়ে দেরি করতেই হবে। দু’টো ঘোড়াকে খাওয়াতেই পানি শেষ হয়ে যাবে। অন্য ঘোড়াগুলোকে খাওয়ানোর জন্যে কতক্ষণে আবার পানি ভরবে সেই আশায় আমাদের বসে থাকতে হবে।

চালাকি সবই জানা আছে ব্যাটার-ধড়িবাজ লোক, নিজের মতামত প্রকাশ করল ক্লাইভ।

তোমার কি মনে হয় নোকটা রুখে দাঁড়িয়ে ফাইট করবে? প্রশ্ন করল বার্ট।

সংঘর্ষ অবশ্যম্ভাবী, মুরুব্বিয়ানা চালে জবাব দিল লী। আমিও তাই চাই-দেখতে চাই কত বড় বাহাদুর সে।

ওর রাগে লাল হওয়া চেহারাটা চট করে একবার দেখে নিয়ে নিচু স্বরে গিবন বলল, তোমার মত না পারলেও কারও রেখে যাওয়া চিহ্ন দেখে মানুষটাকে আমিও মোটামুটি চিনতে পারি। পুরোপুরি বুঝে কথাটা বলছ তো?

জিভ দিয়ে নিজের শুকনো ঠোঁট চেটে একেএকে সবার মুখের দিকে চাইল ইউজিন। কেউ যেন একটা কঠিন শীতল স্রোত বইয়ে দিয়েছে মেরুদণ্ডের ভিতর দিয়ে। স্পষ্ট ভয়ের ছাপ দেখা যাচ্ছে ওদের প্রত্যেকের চেহারায়।

নিজের উপর লোকটার সম্পূর্ণ আস্থা আছে। সে জানিয়ে দিয়েছে ন্যায়সঙ্গত ভাবেই মরেছে ডেরিক। ওদের সবাইকে হাতের মুঠোয় পেয়েও কেবল চিঠি দিয়ে সাবধান করেই ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু ইচ্ছা করলে সে সবাইকে ওখানে গুলি করে হত্যা করতে পারত। বোঝাই যাচ্ছে যদি রুখে দাঁড়াতেই হয়, তবে নিজের সুবিধা মত, আর ওদের জন্য সবচেয়ে বেকায়দা জায়গা বেছে নিয়েই সে তা করবে।

কাপুরুষ নয় ইউজিন। কিন্তু জেনেফারের কথা ভেবে মনে মনে খুব দমে গেছে সে। র‍্যাঞ্চে তার স্ত্রী একা। আজ যদি সে এখানে মারা যায় তবে জেনেফার চলবে কী করে? তাকে ছাড়া যে কিছুই বোঝে না সে-ওই ছোট খামারটাকে ঘিরে ওদের দুজনের এত আশা, এত পরিকল্পনা সব ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। সবকিছু বেচে দিয়ে তাকে বাপ-মার কাছে ফিরে যেতে হবে।

সূর্যের প্রচণ্ড তাপ কিছুটা কমে এসেছে। অস্ত যাবার আগে সূর্যটা যেন একটু নরম আর রঙীন শুভেচ্ছার প্রলেপ মাখিয়ে দিচ্ছে উত্তপ্ত মরুভূমির উপর। দূরে কোথাও একটা তিতির পাখি ডেকে উঠল। ওদের ডান দিক থেকে আর একটা তিতির তার জবাব দিল

ক্ষান্ত দিলেই তো হয়-ভাবল ইউজিন। উপায় থাকতে থাকতেই তাদের ফেরা উচিত।

মনে মনে ভাবলেও কথাটা কাউকে জানাল না সে। হয়তো কথাটা অন্যদের মনেও উদয় হয়েছে, কিন্তু মুখে কেউ তা বলল না। একটা কাজ নিয়ে বেরিয়েছে ওরা, এর শেষও ওদেরই দেখতে হবে। অন্যায়কারীকে শাস্তি দিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

লোকটা আমাদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে, বলল লী।

যাকে অনুসরণ করা হচ্ছে সে-ই যেন শুরু থেকেই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। পালাবার সময়ে বেশির ভাগ লোকই কোনমতে প্রাণ নিয়ে বাচার চিন্তায় থাকে, পিছনে যারা ধাওয়া করছে তারা কী ফন্দি আঁটছে, এ নিয়ে মাথা ঘামায় না। কিন্তু এই লোকটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। কোন তাড়াই যেন নেই ওর। নিশ্চিত মনে নিজের খুশি মত ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, দেরি করাচ্ছে, খেলাচ্ছে।

অস্বস্তির মধ্যে সবার মনে ঘুরে ফিরে বারবার একই ভাবনা হচ্ছে-এর শেষ কোথায়? লোকটা যখন আবারও নিজের ইচ্ছামত ওদের মুঠোর মধ্যে পাবে, তখন কী ঘটবে? ওদের কয়জন মারা পড়বে?

ন্যায়নিষ্ঠাই ওদের ফিরে যেতে বাধা দিচ্ছে। ডেরিকের জীবনের বিনিময়ে নিজের জীবন দিয়েই দেনা শোধ করতে হবে লোকটাকে।

আবার জেনেফারের কথা ইউজিনের মনে পড়ে গেল। এখন নিশ্চয়ই বাচ্চাটাকে খাওয়াচ্ছে সে, আর মনে মনে তার কথা ভাবছে। কখন সে ফিরবে এই আশায় আভেনে তার খাবার গরম রাখছে। এমন ঘটবে তা কেউই আশা করতে পারেনি। সবাই মনে করেছিল সামান্য গোলাগুলির পরে সহজেই কাজ উদ্ধার করে ফিরতে পারবে ওরা।

চিন্তিত হলো ইউজিন। শেষ পর্যন্ত প্রাণ নিয়ে ফিরতে যদি পারেও, অন্তত সপ্তাহখানেক বাইরেই কাটাতে হবে তাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *