০১. শুরুতে জায়গাটা ছিল একেবারে অন্যরকম

শুরুতে জায়গাটা ছিল একেবারে অন্যরকম, ঊষর, বৈরী এক প্রান্তর। কোন ভাবেই এখনকার অবস্থার সাথে মেলানো যাবে না। তিন বছরে বদলে গেছে সবকিছু-মরগান পিসের আলীশান শরীরের পাশে চার কামরার ছোট র‍্যাঞ্চ হাউস, লাগোয়া বার্ন, করাল; অন্যপাশে বেড়ায় ঘেরা ওঅটর ট্রাফ। সামনে ঢালু জমি কয়েক মাইল দূরে বাফেলো টাউনের ট্রেইলে গিয়ে যেখানে মিশেছে তার পুরোটাই সবুজ ঘাসে পরিপূর্ণ। স্যামুয়েল ব্রুকসের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। এখন আর বোকা বলে ওকে অবজ্ঞা করতে পারবে না কেউ, বরং বিস্মিত হবে। মরুভূমির মত ঘাসহীন এ জায়গায় বসতি গড়ায় শুরুতে সবাই একচোট হেসেছে ওর বোকামিতে। এখন সময় হয়েছে ঈর্ষা করার-আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এ তৃণভূমি হয়ে উঠবে এ তল্লাটে গরু চরানোর জন্যে আদর্শ জায়গা। তবে জায়গাটা ছোট, সব মিলিয়ে এর পরিধি হবে বড়জোর ত্রিশ মাইল। স্যামুয়েল ব্রুকসের তাতে আক্ষেপ নেই, সে অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষী নয়।

সার্কেল-এফ বাথানের ট্রেইলটা ক্রীক ছাড়িয়ে মূল ট্রেইল থেকে সরে উত্তরপুবে চলে গেছে। মরগান পিক্‌সের শুরু এখান থেকেই, এরপর ধনুকের ছিলার মত ক্রমশ উত্তরে বেঁকে গেছে। বাঁকের কেন্দ্রে ব্রুকসের র‍্যাঞ্চ হাউস। এতদূর থেকে ওটাকে দেখাচ্ছে ছোট্ট একটা লগ কেবিনের মত। সন্তুষ্টচিত্তে পুরো লেআউটের ওপর চোখ বুলাল ও, তারপর ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে স্পর দাবাল। এগোল সার্কেল-এফের ট্রেইল ধরে। তিন মাইল পরে ওদের সীমানার শুরু।

সার্কেল-এফ ওকে কি ধরনের অভ্যর্থনা জানায় এটা একটা চিন্তার বিষয়। কারণ বাফেলো টাউন আর আশপাশের এলাকায় স্যামুয়েল ব্রুকসের পরিচিতি কম কথার মানুষ ও ঘরকুনো হিসেবে। কারও সাথে মেশার আগ্রহ ওর মধ্যে কেউ দেখেনি কখনও। সাপ্লাই নিতে মাসে একবার বাফেলোতে আসে, কাজ শেষে ফিরেও যায়। কারও সাথে খোশ-গল্প দূরে থাক, এক পেগ হুইস্কিও গেলে না। জেনারেল স্টোরের মালিক উইলিয়াম লকহার্ট এ জন্যে ওকে কঞ্জুস হিসেবে আখ্যা দিতেও ছাড়েনি যদিও সেসব আমল দেয় না ব্রুকস। হুইস্কি একে তো সয় না তারওপর কষ্টার্জিত টাকা এভাবে খরচ করার ইচ্ছে ওর নেই। প্রতিটি পেনির পেছনে ঘাম ঝরাতে হয়েছে ওকে, মাঝে মাঝে জীবনের ঝুঁকিও নিতে হয়েছে।  আশার কথা সার্কেল-এফের লোকেরা আন্তরিক ও মিশুক, ওর ঠিক উল্টো স্বভাবের। বেসিনের যে কেউ ফ্ল্যাগানদের সম্পর্কে এ কথাটাই আগে বলবে।

সার্কেল-এফের বিশাল র‍্যাঞ্চ হাউসের সামনে এসে গতি কমাল ব্রুকস। দূর থেকে চোখ বুলাল বারান্দা আর সামনের ফ্লাওয়ার বেডের ওপর। দারুণ র‍্যাঞ্চ হাউস, জেমস ফ্ল্যাগানের রুচি আছে, স্যাডল ছাড়ার সময় ভাবল ও। সময় নিয়ে গায়ের ধুলো ঝাড়ল, আসলে কারও বেরিয়ে আসার অপেক্ষায় আছে। সময়টা অবশ্য ওর বিরুদ্ধে, রাউন্ড-আপের ব্যস্ততায় পুরুষদের থাকার সম্ভাবনা কম। হ্যাট খুলে অবিন্যস্ত চুলে আঙুল চালাল, তারপর হিচিং রেইলের সাথে বাঁধল ঘোড়ার লাগাম।

হাউডি!

ধীরে পাশ ফিরল ব্রুকস। করালের দরজায় দাঁড়ানো মেয়েটিকে দেখে নড করল। ফ্ল্যাগান-কন্যা লরিয়া, কমনীয় মুখটা আগেও দুএকবার দেখেছে। তবে দূর থেকেই, পরিচয় হয়নি কখনও। আমি স্যামুয়েল ব্রুকস, ম্যাম, তোমাদের প্রতিবেশী, নিজের পরিচয় দিল ও। জেমস ফ্ল্যাগানের কাছে এসেছি।

বাবা তো রাউন্ড-আপে। দক্ষিণে মেকিট ক্রসিঙের কাছে পাবে ওকে।

কত দূর যেতে হবে?

উঁ…তুমি কি একটু অপেক্ষা করবে? বাবা হয়তো এসে পড়বে, বলেছিল এখানে এসে লাঞ্চ করবে। কাছে চলে এল মেয়েটি, চোখে একরাশ কৌতূহল। খুঁটিয়ে দেখছে ওঁকে। আমি লরিয়া ফ্ল্যাগান। সহাস্যে হাত বাড়িয়ে দিল।

দস্তানা খুলে হাত মেলাল ব্রুকস।

বাবার অফিসে গিয়ে বসতে পারো তুমি, কোণের একটা কামরা দেখিয়ে বলল লরিয়া।

কামরাটায় ঢুকল ব্রুকস। বড় একটা টেবিল, কয়েকখানা চেয়ার আর ডেস্ক-এই হচ্ছে আসবাবপত্র। উল্টোদিকে ভেতরের দিকে যাওয়ার দরজা। একটা চেয়ার টেনে বসল ও।

ঠিক দুই মিনিট পর এল মেয়েটি। হাতে ট্রে, তাতে কফির পেয়ালা আর থালায় দুই রকমের বিস্কুট। মি. ব্রুকস, মা তোমাকে এখানে লাঞ্চ করে যেতে অনুরোধ করেছে, ট্রে নামিয়ে রাখার সময় বলল লরিয়া। কেউ তোমার অপেক্ষায় থাকবে না তো?

উত্তর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করল না ও, কফির পেয়ালা তুলে চুমুক দিল। নিজের ওপর মেয়েটির কৌতূহলী দৃষ্টি অনুভব করছে।

বাফেলো টাউন ছাড়া এই প্রথম অন্য কোথাও এলে তুমি।

দরকার পড়েনি। স্মিত হেসে কৈফিয়ত দিল ও।

প্রতিবেশীর বাড়ি গিয়ে এক কাপ কফি খাওয়া বা সৌজন্যমূলক আলাপ করা, তোমার ধারণায় এটা প্রয়োজনের মধ্যে পড়ে না? তুমি তা করোনি, বোধহয় চাও-ও না কেউ তোমার বাথানে যাক।

সৌজন্য দেখাতে কেউ আমার বাথানে যায়নি, আমিও তা করতে গিয়ে অযথা কারও সময় নষ্ট করিনি।

বোঝা যাচ্ছে ভুল শুনিনি, হাসল মেয়েটি। সত্যি তুমি রহস্যময় লোক এবং বোধহয় একাই থাকতে চাও। কিন্তু শেষপর্যন্ত কি তা পারবে? র্যাঙ্কিং করতে হলে প্রতিবেশী বাথানগুলোর সাথে ভাল সম্পর্ক থাকতে হয়। ঝামেলার কথা নাই-বা বললাম, রাউন্ড-আপ বা ড্রাইভের কথাই ধরো-এসময় অন্যদের সাহায্য তোমার লাগবেই।

হাসল ব্রুকস, মেয়েটি ওকে বাজিয়ে দেখতে চাইছে। কথাগুলো বলছে সমালোচনার সুরে কিন্তু তাতে কৌতুকের মেশালও আছে। এতদিন তো দরকার হয়নি, তাই আমিও কারও কাছে যাইনি। এখন থেকে শুরু করলাম…

সৌভাগ্য আমাদের সবাইকে বলতে পারব স্যামুয়েল ব্রুকস নামের ঘরকুনো লোকটা সাহায্যের প্রত্যাশায় সার্কেল-এফে প্রথম এসেছে, উজ্জ্বল দেখাচ্ছে মেয়েটির সবুজ চোখ, গলায় হালকা সুর। দারুণ একটা খবর!

নির্লিপ্ত থাকল ব্রুকস, লরিয়ার আয়ত চোখে উপহাস খোজার প্রয়াস পেল, কিন্তু সেখানে কেবলই কৌতুক। অনুমতি নিয়ে সিগারেট ধরাল, ধীরে ধোয়া ছাড়ল যাতে সবুজনয়নার দিকে না যায়। মেয়েটির স্বতঃস্ফুর্ত ভঙ্গি ওকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। এমনভাবে আলাপ করছে যেন ওরা মোটেও সদ্য পরিচিত নয়। কারণটা-মেয়েটির চেনা পরিবেশ ও আন্তরিকতা। জেমস ফ্ল্যাগান, এসে ওকে উদ্ধার করুক, মনে মনে এটাই চাইছে।

একটা প্রশ্ন করব?

চোখ তুলে তাকাল ও।

তোমরা এ জিনিসটা খাও কেন?

একজন নিঃসঙ্গ মানুষের প্রিয় সঙ্গী এটাই, খানিক ভেবে হালকা সুরে বলল ব্রুকস। তবে অল্প সময়ের জন্যে।

অবাক হয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকল মেয়েটি, তারপর ফিক করে হেসে ফেলল। যুক্তি বটে! আরও কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু বাইরে খুরের শব্দ হতে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। বাবা, দেখো কে এসেছে। একটু পর লরিয়ার অতি উৎসাহী গলা শোনা গেল।

ব্রুকস বুঝে উঠতে পারে না সবাই ওর সম্পর্কে এত কৌতূহলী কেন। সে একজন নির্বিরোধী মানুষ, কারও সাতে-পাঁচে নেই, একা থাকতে পছন্দ করে। এতে সবারই খুশি থাকার কথা, অথচ বাফেললা টাউনের আশপাশের লোকজন ওর সম্পর্কে জানতে চায়, বিশেষ করে যে-জীবন ও পেছনে ফেলে এসেছে তা সম্পর্কে।

পারকারদের কেউ নয়, ভরাট একটা গলা শোনা গেল। ওরা আমার এখানে আসবে না। খানিক থেমে উৎফুল্ল স্বরে বলল: বুঝেছি! ওই লোকটা, তাই না?

বুঝলে কি করে? হতাশা লরিয়ার কণ্ঠে।

কালো রোয়ানটা দেখে। ওই তেজি ঘোড়াটাকে বোধকরি বেসিনের সবাই চেনে। … তুমি কি দয়া করে আমার সোরেলটাকে করালে রেখে আসবে, ম্যাম? হেঁয়ালিভরা কণ্ঠ জেমস ফ্ল্যাগানের। আমি ওর সাথে কথা বলি। আশা করছি ওকে অনেকক্ষণ বসে থাকতে হয়নি।

ততক্ষণে পোর্চে বেরিয়ে এসেছে ব্রুকস।

মানুষটা ছোট-খাট, পঞ্চাশের মত হবে বয়স। বেল্টের ওপর মাঝারি সাইজের একটা উঁড়ি। চলার মধ্যে দৃঢ় একটা ভাব আছে, বোঝা যায় আত্মবিশ্বাসী লোক। ধূসর চোখজোড়ায় একইসাথে কৌতূহল আর বন্ধুসুলভ চাহনি। সেকেন্ড কয়েকের জন্যে মিলিত হলো দুজোড়া চোখ, পরস্পরকে বুঝে নিল ওরা। এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিল সার্কেল-এফ মালিক। সবল হাতটা ধরে ছেড়ে দিল ব্রুকস, ফ্ল্যাগানের পিছু নিয়ে এগোল। অফিস রূমে এসে, বসা পর্যন্ত আর কোন কথা হলো না। নিজের চেয়ারে বসে ড্রয়ার খুলে চুরুট বের করল ফ্ল্যাগান, অফার করল ওকে। তুমি-নিশ্চই কোন কাজে এসেছ?

আমার কয়েকটা বাছুর দরকার। লকহার্টের কাছে শুনলাম বেচবে তুমি।

লরিয়া ঢুকতে ওর দিকে তাকাল ফ্ল্যাগান। খাবার রেডি করবি, লরা? খুব খিদে পেয়েছে। আর ব্রুকস আমাদের সাথে খাবে। মেয়ে চলে যেতে অতিথির পানে ফিরল। কয়টা?

তিনশো।

কবে নেবে?

সম্ভব হলে আজই।

উঁহু, আজ নয়। কুলাতে পারব না। দুদিন পর ঠিক এসময়ে এসো। দক্ষিণে মাইল খানেক দূরে আমরা ক্যাম্প করেছি।

পকেট থেকে টাকা বের করে এগিয়ে দিল ব্রুকস। পনেরোশা, বান্ডিল করা বিশ ডলারের নোট। টাকা গুনে ড্রয়ারে ভরে রাখল ফ্ল্যাগান, তারপর সাদা কাগজে রসিদ লিখে দিল। এক কাজ করতে পারো-…এক ফাঁকে তোমার ব্র্যান্ডিং রডটা দিয়ে যেয়ো। মার্কা বসিয়ে গরুগুলো পৌঁছে দেবে আমার ছেলেরা। ওদের ভাল করে কফি খাইয়ে দিলেই চলবে।

কৃতজ্ঞতা অনুভব করছে ব্রুকস, ওর পরিশ্রম কমিয়ে দিয়েছে ফ্লাগান। এতগুলো গরু বাথান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া ওর একার পক্ষে সম্ভব হত না, তোক ভাড়া করতে হত। ব্র্যান্ডিংয়ের কাজটাও কি কম ঝামেলার?

ভেতর থেকে ডাক পড়তে খাবার ঘরে চলে এল ওরা। বেসিনে হাত-মুখ ধুয়ে টেবিলে বসল ব্রুকস। মাঝবয়সী সুশ্রী এক মহিলার সাথে ওকে পরিচয় করিয়ে দিল ফ্ল্যাগান। উঠে দাঁড়িয়ে মিসেস ফ্লাগানকে বাউ করল ও। ক্ষীণ হেসে ওর থালায় খাবার তুলে দিল মহিলা। নীরবে খাওয়া শুরু করল ব্রুকস, এরকম আন্তরিক পরিবেশে অনভ্যস্ত বলে মৃদু অস্বস্তি অনুভব করছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, প্রথম পরিচয়ে এমন আন্তরিক আতিথেয়তা ঘুণাক্ষরেও আশা করেনি। অথচ ও নিজে ঠিক উল্টো স্বভাবের।

আর কদিন লাগবে, বাবা?

তিনদিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।

এরপর ড্রাইভে যাবে?

যেতে তো হবেই। বেশি গরু রেখে লাভ কি! তাছাড়া ওগুলো বেচলে টাকাও আসবে।

কোন কথা ছাড়া খাওয়া শেষ করল ব্রুকস। চমৎকার রান্না, ওর মনে পড়ল এত ভাল রান্না শেষ কবে খেয়েছে। মিসেস ফ্ল্যাগানকে ধন্যবাদ জানিয়ে অফিস রূমে চলে এল। সাথে সার্কেল-এফ মালিক।

একটু পর বিদায় নিয়ে ফিরতি পথ ধরল ও।

লোকটা কেমন যেন, পোর্চে বাপের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে লরিয়া। ঠিকমত ধন্যবাদও দেয়নি। যেভাবে দিল তাতে মনে হলো ইচ্ছের বিরুদ্ধে দিচ্ছে।

এখানকার বেশিরভাগ লোকই এরকম, সাফাই গাইল বাথান মালিক। মুখে সৌজন্য প্রকাশ করার চেয়ে বিনিময়ে প্রতিদান দেয়াই ওদের পছন্দ।

কি যেন একটা আছে ওর মধ্যে…ঠিক খাপ খায় না। যতটা সহজ মনে হয়, ও হয়তো তা নয়। সাথে পিস্তল নেই, অথচ থাকলেই যেন মানাত ওকে।

এখন নেই কিন্তু হলফ করে বলতে পারি বহুবার পিস্তল ব্যবহার করেছে ও। ওর বুড়ো আঙুলে হ্যামার টানার দাগ দেখেছিস? আমার ধারণা নিজেকে লুকিয়ে রাখতে এখানে এসেছে ও। এ জন্যেই পিস্তল ছেড়ে সাধারণ মানুষের মত চলাফেরা করার চেষ্টা করছে।

তুমি ওকে গরু দিচ্ছ?

পরিশ্রমী লোক। বিশ্বাসই হতে চায় না মরুভূমির মত ওই জায়গাটায় ঘাস ফলিয়েছে, তা-ও আবার একা। প্রতিবেশী হিসেবে ওকে আমাদের সাহায্য করা উচিত। তাছাড়া ড্রাইভে গরুর সংখ্যা কমাতে পারলে সময় আর পরিশ্রম দুটোই বাঁচবে। দিগন্তে স্যামুয়েল ব্রুকসের অবয়ব প্রায় মিলিয়ে গেছে, সেদিকেই তাকিয়ে আছে ফ্ল্যাগান।

কিছু একটা ভাবছ তুমি, বাবা?

চলাফেরায় বোঝা যায় ব্রুকস সাধারণ লোক নয়। পশ্চিম এমন এক জায়গা যেখানে কেউ ইচ্ছে করলে সহজেই নিজেকে আড়াল করতে পারে, বিশেষ করে আউট-লরা।

ওকে সেরকম ভাবছ নাকি?

এটা তো ঠিক, এখানে সবচেয়ে রহস্যময় লোক ও-ই, হেসে ফেলল ফ্ল্যাগান, গলায় দ্বিধার সুর। কেউই ওর সম্পর্কে বেশি কিছু জানে না। হয়তো ও সত্যি নিরীহ, শুধু শুধুই আমরা সমালোচনা করছি। ঘুরে অফিসের দিকে এগোল সার্কেল-এফ মালিক, পেছনে আসছে লরিয়া। আমার ধারণা খুব শিগগিরই ঝামেলায় পড়বে ব্রুকস। পারকাররা ওর জমির ওপর থাবা বসালে মোটেই অবাক হব না।

তোমার ধারণা ভুলও হতে পারে, তর্ক করল লরিয়া। তিন বছর ধরে এখানে থাকছে সে, কই পারকাররা তো ওর পিছু লাগেনি?

হেসে সিগার ধরাল বাগান মালিক, আয়েশ করে বসেছে নিজের চেয়ারে। এতদিন অপেক্ষা করেছে। কেন জানিস? সবকিছু যাতে ওদের জন্যে তৈরি হয়ে যায়। পাহাড়ে নালা কেটে জমিতে পানি বইয়ে দিয়েছে ব্রুকস, মরা ক্রীকটাতে গ্রীষ্মের সময়ও পানি থাকছে, জমিতে ঘাস ফলেছে। পারকাররা এসব কষ্ট করতে যাবে কেন? তা করার ইচ্ছে থাকলে তো অনেক আগেই ওই জমিটার জন্যে ক্লেইম করতে পারত, এতদিন তো খালি পড়ে ছিল আর ব্রুকস এসেছে এই সেদিন।

তুমি অযথাই ওদের দোষ দিচ্ছ, বাবা!

বেসিনে চল্লিশ বছর ধরে আমি আছি, কম তো দেখিনি, জুলিয়াস পারকারের বাপকে দেখেছি, ওকেও দেখছি এখন। কয়েক হাজার একর সীমানা বার-পির, কিন্তু এর খুব কম জায়গাই নিজেদের হাতে গড়া, বেশিরভাগ অন্যান্য আউটফিটকে উচ্ছেদ করে জবরদখল করা। নিজের বিশাল সীমানার সাথে আরও ত্রিশ মাইল জায়গা বাড়াতে পারলে খুশিই হবে পারকার। মরগান পিকসের ঝর্না আর ওঅটর হোলগুলোর দখলও সে পেয়ে যাবে-পানির সমস্যা থাকবে না, শীত মরসুমের জন্যে পাবে একটা বাড়তি জায়গা। জুলিয়াস পারকার এ সুযোগ ছাড়বে না, কোন একটা উসিলায় ওর ওপর ঠিক চড়াও হবে, দেখিস। বাজি ধরবি?

মেয়ের মধ্যে তর্ক করার বা চ্যালেঞ্জের কোন অভিব্যক্তি দেখতে পেল না ফ্ল্যাগান। বরং চিন্তিত মনে হলো ওকে। এটা অন্যায়, মাথা নাড়ল লরিয়া, জোর করে এভাবে…।

সবাই জানে সেটা, মেয়েকে বাধা দিল সার্কেল-এফ মালিক। কিন্তু কার-ই বা কি করার আছে! মার্শাল জ্যাক হবস হয়তো কিছু করতে পারত, কিন্তু এসব ব্যাপারের চেয়ে হুইস্কির বোতলের দিকে ওর মনোযোগ বেশি।

ব্রুকস নিশ্চয়ই রুখে দাঁড়াবে।

কি করবে তা সে-ই জানে। সময়ই বলে দেবে। তবে আমার ধারণা, পারকাররা সহজে ছাড় পাবে না। সমস্যা কেবল এক জায়গায়—স্যামুয়েল ব্রুকস একা। ত্রিশ মাইল জমি আর ওদের মাঝখানে কেবল একটা লোক, ওকে সরিয়ে দিতে পারলেই তো জমিটা বার-পির হয়ে যাবে।

 

স্যামুয়েল ব্রুকস সবে নাস্তা শেষ করেছে। একা থাকার দিন সম্ভবত ফুরিয়ে এসেছে, কফির মগে চুমুক দেয়ার সময় ভাবল ও-রান্না করার জন্যে একজন লোক দরকার এবং কমপক্ষে দুজন কাউহ্যান্ড। এ কয়দিনে তিনশো গরু সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। গরু সামলে এসে রান্না করা ভারী কষ্টের কাজ, এক মগ কফি তৈরি করতেও অনীহা জাগে। আলসেমি, না বুড়িয়ে যাচ্ছে? উহু, তা হবে কেন, সবে উনত্রিশে পড়ল কেবল। জীবন গড়ে নেয়ার আদর্শ সময় তো এটাই।, ফ্ল্যাগান সত্যিকার ভদ্রলোক, আন্তরিক এবং সৎ, কৃতজ্ঞচিত্তে ভাবছে ব্রুকস। ইচ্ছে করলে ওকে গড়পড়তা কিছু গরু দিয়ে দিতে পারত। সে-সুযোগ নেয়নি সার্কেল-এফ মালিক।

মিনিট দশ পর সবকিছু গুছিয়ে স্যাড়লে চাপল ও, বাফেললা টাউনের উদ্দেশে ঘোড়া ছোটাল। নিজের জমি ছাড়িয়ে মূল ট্রেইলে এসে গতি বাড়াল। কাজ শেষ করে দ্রুত ফিরতে চায়।

মাইল তিন পর, ট্রেইলটা বাক নিয়ে দক্ষিণে চলে গেছে। হাতের বামে পারকারদের বার-পি। তৃণভূমির যতটুকু চোখে পড়ছে দিগন্তের শেষ সীমানা পর্যন্ত অবারিত সবুজ ঘাস, অগুনতি তাগড়া গরু চরে বেড়াচ্ছে। নিঃসন্দেহে বারপি এ তল্লাটের সবচেয়ে বড় ও সমৃদ্ধ বাথান।

বাঁকের মুখে সাইক্যামোর ঝোপের সারি, পাশে বিশাল জোড়া কটনউড। গাছ দুটোর ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ-এ পর্যন্ত অন্তত সাতজন গরুচোরকে ঝোলানো হয়েছে ওগুলোয়। রাসলারদের ব্যাপারে পারকাররা খুব নির্দয়, দেরি না করে ধরামাত্র কাজ সেরে ফেলে।

হঠাৎ চোখে পড়ল দৃশ্যটা-সাইক্যামোর ঝোপের কাছে ব্যস্ত এক জোড়া নারী-পুরুষ। ওদের পেরিয়ে যাওয়ার সময় মৃদু গোঙানির শব্দ পেল ব্রুকস। ভাল করে তাকাতে দেখতে পেল মেয়েটাকে-লরিয়া ফ্ল্যাগান। জোর করে ওকে চুমো খাওয়ার চেষ্টা করছে লোকটা, তৃতীয় আরেকজনের উপস্থিতি খেয়াল করেনি বা ভ্রুক্ষেপ করছে না।

দ্রুত স্যাডল ছাড়ল স্যামুয়েল ব্রুকস, প্রায় নিঃশব্দে পৌঁছে গেল। লরিয়াকে ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে লোকটা। দুহাত দূরে এসে তার কাঁধে হাত রাখল ও। মেয়েটাকে ছেড়ে দিয়ে ঘুরল সে, চোখে রাগ আর বেপরোয়া চাহনি। অবাক হলো ব্রুকস-উনিশ কি বিশ হবে ছেলেটির বয়স।

কোন নরক থেকে উঠে এসেছ, আঁ? তড়পে উঠল তরুণ। এত সাহস যে আমার কাঁধে হাত রাখো! ঝট করে কোমরে হাত বাড়াল।

তৈরি ছিল ব্রুকস, জানত এরকম কিছু হতে পারে। দুপা এগিয়ে ব্যানডানা ধরে টান দিতে ওর দিকে প্রায় উড়ে এল তরুণ। আচমকা আক্রমণে থমকে গেছে। হোলস্টার থেকে বের করে ফেলেছিল পিস্তল, টানের চোটে সেটা ছুটে গেল মুঠি থৈকে। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল সে, একটা চড় এসে পড়ল গালে।

তোমার দেখছি কিছুই শেখা হয়নি, মাটিতে পড়ে যাওয়া পিস্তল বুট দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দেয়ার সময় বলল ব্রুকস, গলায় মৃদু ভৎসনা। পরেরবার কোন মেয়েকে চুমো খাওয়ার আগে অনুমতি নিয়ো, কেমন?

ও তোমার মেয়েমানুষ নাকি, মিস্টার? অবজ্ঞা ফুটে উঠল ছেলেটার চোখে। থুথু ছিটাতে তা ব্রুকসের মুখে এসে পড়ল।

সেকেন্ড কয়েকের জন্যে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাল ব্রুকস। তরুণের গাল টকটকে লাল হওয়ার পর চড় থামাল। তারপর পেছনে ঠেলে দিতে কটনউডের সাথে বেমক্কা ধাক্কা খেয়ে ককিয়ে উঠল ছেলেটা, হুড়মুড় করে মাটিতে পড়ে গেল। এগিয়ে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াল ব্রুকস, কুঁকে ব্যানডানা খুলে নিয়ে মুখ মুছল, তারপর ওটা ছুঁড়ে দিল তরুণের দিকে। একটা কথা না বলে পারছি না। এখন থেকে ড্র করার আগে দেখে নিয়ে অন্যজনের কাছে পিস্তল আছে কি-না। তবে এ-ও ঠিক আমি নিরস্ত্র বলেই এখনও বেঁচে আছ।

ঘুরে লরিয়ার দিকে ফিরল ব্রুকস, দুঃখ প্রকাশ করল। খেয়াল করল মেয়েটার ফর্সা গালে চড়ের দাগ লাল হয়ে আছে। কিছুটা আড়ষ্ট আর বিমূঢ় দেখাচ্ছে। পাশেই সার্কেল-এফের ছাপ মারা একটা বাদামি অ্যাপলুসা দাড়িয়ে ছিল। ওটার লাগাম ধরে কাছে নিয়ে এল ও, ফ্ল্যাগান-কন্যাকে স্যাডলে চড়তে সাহায্য করল। কেঁপে উঠল মেয়েটার শরীর, ভয় পেয়েছিল, তারই প্রতিক্রিয়া।

উফ, খোদা! তুমি না এলে কি যে হত… দ্রুত বলল লরিয়া, শেষ করল না।

কিছুই ঘটত না, ভাবল ব্রুকস, দুএকটা চুমো খাওয়ার চেয়ে বেশি কিছু করার সাহস বোধহয় তরুণের ছিল না। নিজের রোয়ানে চেপে লরিয়ার দিকে ফিরল ও। কোথায় যাচ্ছিলে?

শহরে।

বাফেলোতে যাওয়ার ইচ্ছে আছে এখনও?

মাথা ঝাঁকাল লরিয়া। কাজ আছে।

এগোল ওরা। একবার পেছন ফিরে তরুণকে দেখল ব্রুকস, সামলে নিয়ে স্যাডলে চেপে বসেছে।

ভবিষ্যণ্টা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, একটু পর ছোটার মধ্যে বলল লরিয়া, ঝামেলায় পড়বে তুমি। ও এত সহজে মার ভুলে যাওয়ার লোক নয়।

ব্রুকস কিছু বলল না, মুখ দেখে মনে হচ্ছে না এ-নিয়ে বিশেষ চিন্তা আছে ওর।

তুমি কি ওকে চেনো না? এমন ভাব করছ যেন আমি বাড়িয়ে বলছি! লরিয়ার কণ্ঠে অসন্তোষ।

ও বাড পারকার, এই তো?

তোমার কাছে পারকার নামটার কোন গুরুত্ব নেই?

তা নয়। ও একটা ভুল করতে যাচ্ছিল, শাস্তিও পেয়েছে। পশ্চিমে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা ঘৃণ্য কাজ। একটু আগে তুমিই বলেছ, মারের ব্যাপারটা সহজে ভুলবে না বাড পারকার। আমিও মনে করি আজকের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে পারে ও।

ও তা করবে না। পুরো ব্যাপারটাকে হালকাভাবে নিচ্ছ তুমি।

তুমি কি ভয় পাচ্ছ, ম্যাম?

সেটাই তো স্বাভাবিক। পারকারদের বিরুদ্ধে যাওয়ার স্পর্ধা বেসিনে কেউ দেখায় না।

হয়তো। কিন্তু কোন কিছুই একতরফা ভাবে বেশিদিন চলে না।

চুপ করে থাকল লরিয়া, বুঝতে পারছে পারকারদের আলাদাভাবে গুরুত্ব দেয়ার পক্ষপাতী নয় এ লোক। দুঃসাহস হয়ে গেল না? বাড পারকার যদি এর শোধ নিতে চায় তো নির্ঘাত ওর কপালে খারাবি আছে।

শহরে পৌঁছানো পর্যন্ত কেউই আর কোন কথা বলল না।

বাফেলো টাউন ছোট্ট অগোছাল শহর। কয়েকটা জেনারেল স্টোর, সেলুন, কামারশালা, ব্যাংক, নাপিতের দোকান, আস্তাবল, পশ্চিমের আর সব শহরে যা থাকে। মাঝামাঝি জায়গায় ল-অফিস। চল্লিশোর্ধ্ব জ্যাক হবস আর ডেপুটি টিম ম্যাসন হচ্ছে বাফেলোর আইনের লোক। এ শহরের পত্তন জুলিয়াস পারকারের বাবা ফ্রেডারিক পরকারের হাতে, সে-ই প্রথম আসে এখানে। শহরটা তেমন বেড়ে ওঠেনি যতটা বার-পির বেলায় ঘটেছে। পারকারদের রোষে পড়েছে, আবার বেসিনেও টিকে আছে, এমন কিছু এখানে ঘটেনি। হয় দেশছাড়া হয়েছে নয়তো পারকারদের হাতে মারা পড়েছে। হাতে-গোনা দুএকজন ছাড়া কেউই জুলিয়াস পারকারের দিকে চোখ তুলে কথা বলার সাহস দেখায় না। এককথায় পারকাররাই বেসিনের হর্তা-কর্তা-বিধাতা।

উইলিয়াম লকহার্টের স্টোরের সামনে ঘোড়া থামাল ওরা। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সঙ্গিনীর দিকে তাকাল ব্রুকস। হাসল মেয়েটি, ধকলটা কাটিয়ে উঠেছে। মিসেস লকহার্টের কাছে যাব। তুমি কি অপেক্ষা করবে?

নড করল ব্রুকস। স্যাডল ছাড়ার সময় খেয়াল করল বিস্ময়ের সাথে ওদের দেখছে স্টোর মালিক, পাশে এসে দাড়িয়েছে ওর বউ। কি যেন বলল মহিলা, সায় জানিয়ে মাথা ঝাঁকাল লকহার্ট।

হিচিং রেইলের সাথে ঘোড়াগুলোর লাগাম বাধল ব্রুকস, তারপর গায়ের ধুলো ঝেড়ে স্টোরে ঢুকে পড়ল। ওকে অভ্যর্থনা জানাল লকহার্ট, যেমনটা সব খরিদ্দারকে জানায়। মাথা ঝুঁকিয়ে মহিলাকে সম্মান দেখাল, প্রত্যুত্তরে হেসে লরিয়াকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল বুড়ি।

নিজের চাহিদার ফর্দ স্টোর মালিককে ধরিয়ে দিয়ে একটা টুলে বসল ব্রুকস। তোমার তো একটা সেলুন আছে?

তাক থেকে কফির জার নামাচ্ছিল সে, ফিরে তাকাল।

দুজন পাঞ্চার আর একজন কূক দরকার আমার। কেউ আগ্রহী হলে পাঠিয়ে দিয়ো।

মাথা ঝাঁকাল সে।

সিগারেট ধরিয়ে আনমনে ফুঁকে চলল ব্রুকস। দৃষ্টি রাস্তার ওপর, পথচলা লোজন দেখছে।

একটু পর ভেতর থেকে বেরিয়ে এল লরিয়া। সামনে এসে দাঁড়াল। আমার সাথে একটু আসবে, মি. ব্রুকস?

স্টোর থেকে বেরিয়ে ফুটপাথ ধরে এগোল ওরা। বেশ খানিকটা আসার পর ছুটন্ত ঘোড়ার শব্দে ঘুরে তাকাল ব্রুকস, দ্বিতীয়বারের মত দেখতে পেল তরুণকে। পেরিয়ে যাওয়ার সময় বিষদৃষ্টিতে তাকাল একবার, ক্ষত-বিক্ষত রাস্তায় একরাশ ধুলো উড়িয়ে পারকারদের সেলুন প্যালেস-এর সামনে থামল। স্যাডল ছেড়ে লাফিয়ে সিঁড়ি টপকে পোর্চে উঠে গেল, ঘোড়াটাকে রেইলে বাঁধার সময় পায়নি। ব্যাটউইং দরজা সপাটে ঠেলে ঢুকে পড়ল ভেতরে।

ক্রস টের পেল ওর কনুই চেপে ধরেছে লরিয়া। তোমার এক্ষুণি সরে পড়া উচিত, মি. ব্রুকস! আতঙ্ক মেয়েটার কণ্ঠে। বাড নিশ্চয় একগাদা লোক নিয়ে তাড়া করবে তোমাকে। সেলুনটাতে বার-পির লোকজন সবসময়ই থাকে।

আমরা কোথায় যাচ্ছিলাম?

আমি ভেবেছিলাম তোমার সাথে কফি খাব।

সত্যি কফি খেতে চেয়েছ? হেসে জানতে চাইল ব্রুকস।

লরিয়া বিস্মিত। আমি মিথ্যে বলি না!

কিছু মনে কোরো না, ম্যাম। কোন ভদ্রমহিলা, তা-ও তোমার মত সুন্দরী, আমার সাথে কফি খেতে চাইল এই প্রথম, ফের হাসল ও, চোখে কৌতুক। সেসৌভাগ্য আমি হারাতে চাই না।

অস্বস্তিবোধ করছে লরিয়া, ভয় হচ্ছে ওর। তোমার কাছে অস্ত্র নেই, অথচ সুযোগ পেলেই গুলি করবে ওরা। বাড তো একবার চেষ্টা করেছিল, আবার করতে দোষ কোথায়?

মিছে ভয় পাচ্ছ, ওরা তা করবে না…এই মেয়ে, আমার সাথে কফি খাওয়ার ইচ্ছে আর নেই তোমার, তাই না?

ন-না।

তাহলে চলল।

এবার উল্টোদিকে এগোল লরিয়া। ব্রুকস বুঝতে পারল হালকা কথাবার্তায়ও মেয়েটির আশঙ্কা দূর করতে পারেনি ও। ওকে যদ্দূর সম্ভব পারকারদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইছে লরিয়া, এ জন্যেই উল্টোদিকে এগোচ্ছে।

বেশ খানিকটা এসে হাতের ডানে প্রথম রেস্তোরাঁ পেয়ে ঢুকে পড়ল ওরা। ছোট, গোছানো। প্রায় ফাকাই। মাঝবয়সী এক মহিলা উষ্ণ সম্বর্ধনা জানাল ওদের। লরিয়াকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেল মহিলা, মৃদু স্বরে অনুযোগ করল: তুমি তো আমার এখানে আসোই না! ব্রুকসের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে নিজ থেকে পরিচয় দিল। মিসেস রিচার্ডস।

একটা টেবিলে বসল ওরা। ব্রুকস বসেছে দেয়ালের দিকে পিঠ দিয়ে যাতে দরজা আর রাস্তার ওপর অনায়াসে চোখ রাখতে পারে। লরিয়ার আশঙ্কা হেসে উড়িয়ে দিলেও জানে তা একেবারে অমূলকও নয়। জুলিয়াস পারকারের তিন ছেলের মধ্যে বাডই সবচেয়ে উদ্ধত ও বদমেজাজী। আজকের ঘটনা কিছুতেই ভুলবে না সে। একটু আগে তরুণের মধ্যে যে অস্থিরতা দেখেছে তাতে ধরে নেয়া যায় খুব শিগগিরই আবার ওদের দেখা হয়ে যাবে।

মিসেস রিচার্ডস কফি আর কেক দিয়ে গেছে। তটস্থ হয়ে আছে লরিয়া, আনমনে সোনালি চুলের কয়েক গাছি নাড়াচাড়া করছে। অন্যহাতে কফির মগ, কিন্তু চুমুক দিচ্ছে না।

মিস্ ফ্ল্যাগান?

তাকাল লরিয়া।

কফি ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।

ক্ষীণ হেসে চুমুক দিল মেয়েটি আমার খুব ভয় লাগছে।

ব্রুকসের চোখে জিজ্ঞাসা।

পারকারদের খুব ভাল করে চিনি. আমি। তোমাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না ওরা। বাড হচ্ছে ওদের ফোরম্যান জেফরি করবেটের শিষ্য, বাডের ঝামেলাগুলো সে-ই সামলায়। লোকটা বন্দুকবাজ, মারামারিতে আরও ভয়ঙ্কর। একবার ডাবলএসের দুজন পাঞ্চারকে এমন পিটিয়েছিল যে হপ্তাখানেক বিছানা থেকে উঠতেই পারেনি ওরা।…আমি তোমাকে ঝামেলায় ফেলে দিলাম। আমার জন্যেই…

হাত তুলে ওকে থামাল ব্রুকস। অযথা ভয় পাচ্ছ, ম্যাম। ওরকম কিছু হবে না, অন্তত এখুনি নয়।

চুপ করে থাকল লরিয়া, বোঝা যাচ্ছে নিশ্চিত হতে পারছে না।

উঠবে, এসময় দলটাকে দেখতে পেল ব্রুকস। বাড পারকারের সাথে আরও দুজন যোগ দিয়েছে। রেস্তোরাঁর কয়েক গজের মধ্যে চলে এসেছে ওরা, কাচের দেয়াল ভেদ করে তরুণের দৃঢ় জেদি মুখ দেখা যাচ্ছে। দ্রুত এগোচ্ছে, জানে কোথায় আসতে হবে।

একটু অপেক্ষা করো, ম্যাম। উঠে দাঁড়াল ব্রুকস।

ঝট করে পেছনে ফিরল লরিয়া, আতঙ্ক ফুটে উঠল চোখে। মি. ব্রুকস…

দ্রুত এগোল ও, বেরিয়ে পোর্চে এসে দাঁড়াল। তিনজনের দলটা ঠিক পাঁচ হাত দূরে। বাড পারকারের মুখে উপচে পড়া রাগ, মুখিয়ে আছে শোধ তোলার জন্যে। অন্য দুজনকে সাধারণ পাঞ্চার মনে হলো ব্রুকসের, সম্ভবত করবেট এদের মধ্যে নেই।

বাড, এই লোকটাই?

মাথা ঝাঁকাল তরুণ, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চাহনিতে ঘৃণা।

এসো পারকারদের গায়ে হাত তোলার সাহস ওর জনমের মত মিটিয়ে দেই! উস্কে দিতে চাইল অপর সঙ্গী। উৎসাহটা তারই বেশি।

বার-পি তাহলে এভাবেই খেলতে অভ্যস্ত, একজনের খেলা কয়েকজনে মিলে শেষ করে? আর এই নিয়ে তোমাদের এত অহঙ্কার? তাচ্ছিল্যভরে বলল ব্রুকস। তোমাদের যখন এতই শখ! আমারও আপত্তি নেই। এসো, দেরি কিসের? কফিটা ঠাণ্ডা হচ্ছে, আরেক কাপ নেয়ার ইচ্ছে আমার নেই।

প্রতিপক্ষের আত্মবিশ্বাস চিড় ধরাল ওদের মনোবলে, তবে তা ক্ষণিকের জন্যে। তীব্র গাল বকলবাড পারকার, তারপর তিনজনে মিলে ঝাপিয়ে পড়ল।

ভেতর থেকে তা দেখে দম বন্ধ হয়ে এল লরিয়ার। আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, কিন্তু মুখ ফুটে কোন শব্দ বেরোল না। পরের দশ মিনিট সদ্য পরিচিত লোকটিকে ভিন্ন রূপে দেখতে পেল-ভয়ঙ্কর, হিংস্র এবং নির্দয়। প্রচণ্ড মার খেয়ে ধূলিশয্যা নিল ওরা, চোটটা বেশি গেল বাডের ওপর দিয়ে। বেছে, দেখে-শুনে মারল ব্রুকস যাতে প্রতিটি আঘাত মোক্ষম জায়গায় লাগে। শেষে, যেন কিছুই হয়নি এমনি নির্বিকার মুখে রেস্তোরাঁর ভেতরে ঢুকল। বেসিনে হাত-মুখ ধুয়ে এসে বসল ছেড়ে যাওয়া আসনে।

লরিয়ার মোর তখনও কাটেনি।

আরেক কাপ নেবে, ম্যাম? মৃদু স্বরে জানতে চাইল ব্রুকস, আগের মতই শান্ত দেখাচ্ছে।

মাথা ঝাঁকাল লরিয়া, অবাক হয়ে সঙ্গীকে দেখছে। পারকারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে তুমি, একটু পর বলল ও। এখন আর পিছিয়ে আসার উপায়। থাকল না। মনে পড়ল কয়েকদিন আগে এমন আশঙ্কাই করেছিল ওর বাবা, এখন ঠিক তাই ঘটেছে। বার-পির সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছে স্যামুয়েল ব্রুকস।

অথচ নিরুদ্বিগ্ন, নির্বিকার দেখাচ্ছে তাকে।

কি হয়েছিল, লরা? কফি পরিবেশন করার সময় জানতে চাইল মিসেস রিচার্ডস।

বয়ান করল লরিয়া।

সাবধানে থেকো, ব্রুকসের উদ্দেশে বলল মহিলা। আমার মনে হয় এখন থেকে সাথে একটা অস্ত্র রাখাই উচিত হবে তোমার। পেছনেও একটা চোখ রেখো। সুযোগ পেলে পিঠে গুলি করার মত লোকও ওদের আউটফিটে দুএকজন আছে।

মৃদু হাসল ব্রুকস, ধন্যবাদ দিয়ে বিল মেটাল।

রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে লকহার্টের স্টোরে এল ওরা। তাজা খবরটা তখন সারা শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। ব্রুকস খেয়াল করল করুণাভরে ওকে দেখছে কেউ কেউ। এ-নিয়ে ভাবার ইচ্ছে বা ফুরসৎ হলো না ওর, বরং লোকগুলোর প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মে যাচ্ছে-মেরুদণ্ডহীন, পারকারদের ভয়ে সিঁটিয়ে আছে। স্বয়ং লকহার্ট পর্যন্ত মুখে তালা মেরে রেখেছে। পাওনা বুঝে নিয়ে রসিদ দিল সে, একটা কথাও বলল না।

চিন্তিত দেখাচ্ছে লরিয়া ফ্ল্যাগানকে, প্যালেস-এর দিকে দৃষ্টি চলে যাচ্ছে বারবার। একটু আগে কয়েকজন এসে বিধ্বস্ত দেহ তিনটে সরিয়ে নিয়ে গেছে সেখানেই। লরিয়ার ভয় হচ্ছে এখুনি হয়তো একটা দল ছুটে এসে ঘিরে ফেলবে ওদের, সবাই মিলে এরপর ব্রুকসকে পেটাবে নয়তো কোন ঝামেলায় না গিয়ে কপাল বরাবর একটা বুলেট পাঠিয়ে দেবে। ওদের পক্ষে সবই সম্ভব। নির একটা লোককে খুন করা সহজ যদি আইনের পরোয়া না করা যায়। এ তল্লাটে পারকাররা যা বলে সেটাই আইন, অন্তত যা বলে তা ঘটে যায়।

শহর ছাড়িয়ে ট্রেইলে এসে ভয় কাটল লরিয়ার। সঙ্গীর দিকে তাকাল, ভাবলেশহীন দৃঢ় একটা মুখ, দিগন্তে ট্রেইলের ওপর দৃষ্টি স্থির। খানিক আগে যে ভয়ঙ্কর মানুষটাকে দেখেছে তার ছিটেফোঁটাও নেই এখন। শান্ত কিন্তু সতর্ক।

মি. ব্রুকস?

ফিরে তাকাল সে। এটা তোমার আসল নাম নয়, তাই না?

খুটিয়ে লরিয়াকে দেখছে ব্রুকস, অবাক হয়েছে।

সঙ্গীর বিস্ময়ে পুলকিত লরিয়া, উপভোগ করছে। তিনজন লোক যা পারেনি ওর একটা কথাই তাকে বিমূঢ় করে দিয়েছে। বাবার ধারণা তুমি একজন টাফ লোক এবং এর আগে হামেশাই পিস্তল ব্যবহার করেছ। আজ বোধহয় তার কিছু প্রমাণও মিলেছে। আর, আমার ধারণা বসতি করতে এখানে এসেছ তুমি, তাই না? লরিয়া খেয়াল করল গম্ভীর দেখাচ্ছে ব্রুকসকে, সতর্ক দৃষ্টি ফুটে উঠেছে চোখে।

কোন মেয়ে এত অল্প বয়সে সবকিছু এভাবে তলিয়ে দেখতে পারে, আমার জানা ছিল না, মৃদু স্বরে মন্তব্য করল ব্রুকস, এড়িয়ে গেল আসল প্রসঙ্গ। তুমি আমাকে অবাক করেছ, মিস্ ফ্যাগান।

কয়টা মেয়েকে জানো তুমি? যদ্দূর বুঝতে পারছি মেয়েদের ব্যাপারে তুমি আনাড়ি।

ব্রুকস নীরব।

আমি যা বললাম তা কি সত্যি?

হতে পারে।

তুমি স্বীকার করছ না, আবার অস্বীকারও করছ না!

মৃদু হাসল ব্রুকস, জবাব দিল না।

লরিয়ার কৌতূহল হচ্ছে, কিন্তু চাপাচাপি করার ইচ্ছেও নেই। পশ্চিম এমন একটা জায়গা যেখানে কেউ চায় না অন্যরা তার ব্যাপারে কৌতূহল দেখাক। স্যামুয়েল ব্রুকস তারচেয়ে এক কাঠি বাড়া, তিনটে বছর লোকজনকে এড়িয়ে চলেছে সে। তবে এটা ঠিক সত্যের অনেকটাই কাছাকাছি চলে এসেছে ও, ব্রুকসের চমকে ওঠা অভিব্যক্তি তার প্রমাণ। তাছাড়া সে অস্বীকারও করেনি।

আমাদের বাথানে যাচ্ছ তো?

না। সীমানা পর্যন্ত তোমাকে এগিয়ে দেব।

কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ পরেও পাওয়া যাবে, ভাবল লরিয়া। তাই তর্ক করল না। এ লোকটিকে অনেকটাই বুঝতে পেরেছে, এর সাথে তর্ক করে লাভ নেই। একরোখা লোকদের সাথে তর্ক চলে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *