০১. মার্লিন এবং ইভান বেকিকে দেখে

মার্লিন এবং ইভান বেকিকে দেখে কিন্তু মোটেই বিজ্ঞানী মনে হয় না। অবশ্য দুর্বল দেহ, সাদা চুল পেছন দিকে উল্টে আঁচড়ানো, কথায় জার্মান টান, গোমড়ামুখো এবং অত্যন্ত পুরু লেন্সের ভারি চশমা পরা হতেই হবে বিজ্ঞানীকে, অমন ধারণা অনেকদিন আগেই পাল্টে গেছে।

মার্লিন এবং ইভান দুজনেই সুদর্শন। বয়েস সবে তিরিশে পড়েছে। দুজনেরই মাথায় বাদামী চুলের গোছা। ইভানের লম্বা চুল ঘাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে। ওদিকে স্বামীর চেয়ে অনেক ছোট মার্লিনের চুল, পুরুষালী কায়দায় ছোট ছোট করে ছাটা। চুল ছোটই হোক কিংবা বড়, দেখে মনে হয় আঁচড়ানোর সময় করে উঠতে পারে না কেউই। লাইব্রেরীতে বইয়ে মুখ গুঁজে থাকার চাইতে বাইরে প্র্যাকটিক্যাল ওয়ার্কই বেশি পছন্দ তাদের।

জুন মাস। ক্যালিফোর্নিয়ার উত্তরাঞ্চলে স্যামন পর্বতমালার পাদদেশ ঘেঁষে ইন্ডিয়ানদের আনাগোনার চিহ্ন। এখানেই কাজ করছে বেকি দম্পতি।

স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ভূতত্ত্ববিদ, আপাতত ক্যালিফোর্নিয়ার ম্যানলো পার্কের ন্যাশনাল সেন্টার ফর আর্থকোয়েক রিসার্চ-এর হয়ে কাজ করছে।

দুর্গম পার্বত্য এলাকায় একটা ভূমিধসের কারণ অনুসন্ধান করতে এসেছে বেকি-দম্পতি। এলাকাটার বদনাম হয়ে গেছে। ইদানীং প্রায়ই ধস ঘটে এখানে। আর এরই জন্যে নাকি ঘন ঘন ভূমিকম্প হচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়ায়। এই ধসের ওপর থিসিস লিখেই স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট নেবার ইচ্ছে মার্লিন-ইভানের। কাজেই স্যামন-ট্রিনিটি আল্পসের বুনো এলাকা তন্ন তন্ন করে অনুসন্ধান করে বেড়াচ্ছে তারা।

পর্বতের উপত্যকা থেকে শুরু করে ক্রমশ উপরের দিকে উঠে গেছে কনিফারের জঙ্গল। দূর থেকে দেখতে চমৎকার লাগে। বসতিশূন্য বনের ভেতর থেকে ভেসে আসে পাইন-নীডল-এর মাতাল করা গন্ধ। ডানে, আকাশ ফুঁড়ে উঠে গেছে নহাজার ফুট উঁচু থম্পসন পীক। আরও অনেক নিচে, পর্বতের গা ঘেঁষে ভেসে বেড়ায় মেঘের ভেলা, দৃষ্টিশক্তি চুড়া পর্যন্ত পৌঁছতে দেয় না। এর উত্তর পূর্বে খানিকটা সরে এসে ব্যাটল মাউনটেন। বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চোখের সামনে। ওদিককার দিগন্তের অনেক খানিই পাহাড়টার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। দুটো পর্বতের মাঝ বরাবর থেকে রওনা হয়ে উত্তরে ট্রিনিটি সেন্টারের ছোট্ট ইন্ডিয়ান-গ্রামের দিকে এগিয়ে গেছে সাউথ ফর্ক ক্রীক। আগে বসতি ছিল এখানে, কিন্তু ইদানীং ক্রমাগত ভূমিধসের ফলে ভয়ে পালিয়েছে ইন্ডিয়ানরা। এই গ্রামের প্রান্তেই তাঁবু খাটিয়েছে বেকি-দম্পতি।

ক্রীকের দিকে চলে যাওয়া একটা ক্ষুদে নদী পেরিয়ে ইন্ডিয়ানদের পায়ে হাঁটা পথ ধরে কয়েকশো গজ নিচে একটু খোলামত জায়গায় এসে দাঁড়াল মার্লিন আর ইভান। অঞ্চলটা ঢালু। ঘাসে ছাওয়া। থম্পসন ক্রীক এবং ব্যাটল মাউনটেন দুটোই চোখে পড়ে এখান থেকে। মাঝে মধ্যে কানে ভেসে আসছে পশ্চিমা তানাজার পাখির ডাক আর পাহাড়ী ঘুঘুর বিলম্বিত বিলাপ। চলতে চলতে হঠাৎই থেমে দাঁড়াল ইভান। আশেপাশের টিলার এবং নিচে জমির দিকে তাকিয়ে মনে মনে কি অনুমান করে নিল। তারপর কাঁধে ঝোলান প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে ঠাসা ভারি ব্যাগটা নামিয়ে রাখল পায়ের কাছে। শ্বাস নিল লম্বা করে।

এক্কেবারে আদিম জঙ্গল। বলল সে।

কাঁধের অপেক্ষাকৃত হালকা বোঝাটা নামিয়ে রাখছে মার্লিন।

হুঁ।

আমার ভাল লাগছে না। মনে হচ্ছে প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীতে এসে পড়েছি।

ঠিকই বলেছ। আশেপাশের ঝোপঝাড় আর গাছপালা দেখে এমনই লাগছে। কেমন যেন বেশি নির্জন। কাছে পিঠে লোকবসতির চিহ্নও দেখা যাচ্ছে না।

এতে একটা ব্যাপারে কিন্তু সুবিধে হয়েছে, পেছন থেকে বৌয়ের কাঁধে হাত রাখল ইভান।

কি? দূরের পাহাড়টার দিকে তাকিয়ে আছে মার্লিন।

দুকাঁধ ধরে নিজের দিকে ফেরাল ইভান বৌকে, কেউ ডিস্টার্ব করবে না আমাদের।

এটা কি নতুন নাকি? স্যান আন্দ্রিজের উত্তর ধার ঘেঁষে বসালাম বাইশটা সেন্সর, ট্রিনিটি ফল্টে আঠারটা। কিন্তু কোনটা বসানোর সময়ে ডিস্টার্ব করল লোকে? লোকের আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই, সেন্সর বসান দেখতে আসবে। আসলে একঘেয়ে কাজ করতে করতে বিরক্ত হয়ে উঠেছে মার্লিন।

সেকথা বলছি নাকি আমি? মিটি মিটি হাসছে ইভান।

তো কোন ক …! হঠাৎই বুঝে ফেলল মার্লিন কি বলতে চাইছে ইভান। নাহ, তোমাকে নিয়ে পারা যাবে না। এটা একটা সময় হল নাকি, না জায়গা?

খারাপ জায়গা কি? একটু আগেই তো বললে চমৎকার? আর সময়, সেটা করে নিলেই হল। তা ছাড়া প্রাগৈতিহাসিক জায়গায় প্রাগৈতিহাসিক মানুষের মত প্রেম করব আমরা। ওই নদীটায় গোসল করব, ফাঁদ পেতে ঘুঘু ধরে আগুনে ঝলসে খাব, রাতে ঘুমাব খোলা আকাশের নিচে। ওফ, যা দারুণ জমবে না, নতুন করে হানিমুন করা হয়ে যাবে আরেকবার। বৌকে জড়িয়ে ধরেছে ইতিমধ্যেই ইভান।

আরে আরে দেখে ফেলবে কেউ, ছাড়, ছাড়! স্বামীর আলিঙ্গন থেকে ছাড়া পাবার চেষ্টা করতে লাগল মার্লিন।

কেউ দেখবে না। অবশ্য যদি পাখিরা দেখে ফেললে লজ্জা পাও, তো আলাদা কথা। মুখ নামিয়ে আনছে ইভান।

এর জন্যে এসেছ তুমি এখানে? ধমক লাগাল মার্লিন। ওদিকে কত কাজ পড়ে আছে। উনিশ নম্বর সেন্সরটা বসাতে হবে না? জোর করে নিজেকে মুক্ত করে নিল সে। আগে হাতের কাজ শেষ কর।

বসে পড়ে ব্যাগ খুলতে শুরু করল মার্লিন।

হুঁহ, কাজ আর কাজ। বিড় বিড় করতে লাগল ইভান, ঠিক আছে। উনিশ নম্বরটা বসাই আগে।

উপরের খোপ থেকে চকচকে স্টিলের সিলিন্ডারের মত একটা জিনিস বের করে আনল মার্লিন। লম্বায় দশ ইঞ্চি, বেড় ইঞ্চি পাঁচেক। নিরাসক্ত চোখে বৌয়ের কাজকর্ম দেখছে ইভান। যেন নিতান্তই হতাশ হয়েছে সে।

স্বামীর গোমড়া মুখের দিকে চোখ তুলে তাকাল মার্লিন। হাসল। ওমা, দাঁড়িয়ে আছ কেন এখনো?

তুমি একাই বসাওগে। ইভানের গলায় ঝাঁঝ।

অমন করে না, লক্ষ্য্মী। আমি তো আর পালিয়ে যাচ্ছি না। এস, কাজটা সেরে নিই আগে… স্বামীর দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হাসল মার্লিন।

মনে থাকে যেন… বসে পড়ে ব্যাগ খুলতে শুরু করল ইভান।

ব্যাগ থেকে বের করে একটা বেজ-লোডেড ভি, এইচ, এফ, টেলিমেট্রি অ্যানটেনা লাগাল মার্লিন সিলিন্ডারের ওপর। নিচে লাগাল তিন ফুট লম্বা একটা স্টেনলেস স্টিলের তৈরি প্রোব।

এতগুলো সেন্সর বসালাম, কিন্তু এখনো পুরোপুরি বিশ্বাস হচ্ছে না আমার। যন্ত্রটার দিকে তাকিয়ে থেকেই বলল মার্লিন।

কি? ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করে দিয়েছে ইভান। একটা হ্যাঁন্ড ড্রিলের সাহায্যে মাটিতে ছিদ্র করছে।

এগুলো ভূমিকম্পের পূর্বসংকেত জানাবে কিনা।

জানাবে, জানাবে।

না জানালে কষ্টটাই মাঠে মারা গেল। প্রোবটা ঠিকমত লাগল কিনা পরীক্ষা করে দেখছে মার্লিন।

ছিদ্র করা শেষ হল ইভানের। মাটির গভীর থেকে ড্রিলের ফলাটা তুলে আনল। ফলায় মাটির কণা লেগে আছে। মাটিতে আস্তে করে টোকা দিয়ে ড্রিলের গা থেকে কণা পরিষ্কার করতে করতে বলল, এস, প্রোবটা ঢোকাও গর্তে। দেখ, আরও গভীর করতে হবে কিনা।

এগিয়ে এসে প্রোবটা ছিদ্রে ঢুকিয়ে দিল মার্লিন। ঠিকই হয়েছে। নরম মাটির ওপর খাড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে সিলিন্ডার আকৃতির সেন্সর রেডিওটা। থির থির করে মৃদু মৃদু কাঁপছে ওপরের অ্যানটেনা।

বেস-এ কল দিয়ে দেখত এবার, নির্দেশ দিল ইভান।

স্যামন-ট্রিনিটি আল্পস ওয়াইল্ডারনেসের উত্তর দিকের প্রান্ত ঘেঁষে একটা ছোট্ট শহর। বেসের জন্যে নির্ধারিত স্থান। শহরের প্রান্তে কয়েকটা তাঁবু ফেলা হয়েছে। গাড়িও আছে গোটা তিনেক। এই নিয়েই বেস। তিনটে গাড়ির একটা ওয়্যারলেস ভ্যান, টেলিমেট্রি ভ্যানও বলা হয় এটাকে। ভ্যানের ছাদ ছাড়িয়ে কয়েক ফুট উঠে গেছে রেডিও অ্যানটেনা। প্রায় একই রকম দেখতে আরেকটা গাড়িতে জেনারেটর বসান হয়েছে। ক্যাম্পে আলো এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি চালানোর জন্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় এখান থেকে। তৃতীয় গাড়িটা একটা আধটনী আর্মি পিকআপ। শহরের ভেতরে চলে যাওয়া ধূলিধূসরিত পথটার ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যেন ঝিমোচ্ছে কিম্ভুত দর্শন গাড়িটা।

রেডিও ভ্যান থেকে বেরিয়ে আসা কতগুলি তার নিয়ে আসা হয়েছে গজ দশেক দূরের একটা ফর্মিকার তৈরি টেবিল পর্যন্ত। যোগ করা হয়েছে টেবিলে রাখা একটা রেডিও ট্রানসিভার, একটা ভ্রাম্যমাণ টেলিফোন এবং একটা রেকর্ডিং সাইসমোগ্রাফের সঙ্গে। ট্রিনিটি ফল্ট এবং তার আশেপাশে বসান সিলিন্ডার রেডিওগুলোর পাঠান সংকেত একটা সরু কাগজের ফিতের ওপর ধরে রাখার কাজ করে এই শেষোক্ত যন্ত্রটা।

টেবিলের সামনে রাখা একটা মেটাল ফোল্ডিং চেয়ারে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে আছে একজন অতি সুদর্শন লোক। বয়েস তিরিশ। নাম স্টিভ অস্টিন।

হাত দুটো পিছনে বাঁকিয়ে, আঙ্গুলগুলো খাঁজে খাঁজে আটকে, দুই তালুর ওপর আরাম করে মাথা রেখেছে অস্টিন। দৃষ্টি, গজ পাঁচেক দূরের একটা ডগলাস ফার গাছের ডালে। ছোট্ট ব্লু বার্ড পাখিটার নাচানাচি দেখছে তন্ময় হয়ে। ওদিকে একটানা গুন গুন করছে জেনারেটর। পেছনের জঙ্গল একেবারে নিস্তব্ধ। প্রকৃতির এই খোলামেলা পরিবেশ দারুণ ভাল লাগছে তার।

লোকবসতি শূন্য খোলামেলা বুনো কিংবা পার্বত্য এলাকা খুবই পছন্দ অস্টিনের। ট্রিনিটি ফল্টে বৈজ্ঞানিক অভিযানের সঙ্গে আসার প্রস্তাবটা তাই লুফে নিয়েছে সে। মাত্র কিছুদিন আগে, এই অঞ্চলে বৈজ্ঞানিক অভিযানে এসে রহস্যজনকভাবে অচেনা শক্রর হাতে আক্রান্ত হয়েছে দুটো দল। কাজেই এবারের দলটার সঙ্গে দেয়া হয়েছে অস্টিনকে। শত্রুর ওপর নজর রাখার দায়িত্ব তার। এরকমই একটা কাজ চাইছিল অস্টিন মনে মনে। অ্যাডভেঞ্চার খুবই ভাল লাগে তার।

টেবিলে রাখা সাইসমোগ্রাফটার দিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে অস্টিনকে। কিন্তু সেদিকে তার খেয়ালই নেই। একমনে লক্ষ্য করছে গাছের ডালের অপূর্ব সুন্দর নীল পাখিটাকে।

হঠাৎই যেন পাখিটার মনে হল, যথেষ্ট দর্শন দেয়া হয়েছে নিচের আধশোয়া মানুষটাকে। কোনরকম জানান না দিয়েই ফুড়ুৎ করে উড়াল দিল ওটা। অনেক দূরের একটা গাছে গিয়ে বসল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জীবন্ত হয়ে উঠল টেবিলে রাখা রেডিও। পরিষ্কার কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে মার্লিন বেকির।

ট্রিনিটি মোবাইল টু ট্রি নিটি বেস, বলল মার্লিন, শুনতে পাচ্ছো, স্টিভ?

নিরুৎসুকভাবে সোজা হয়ে বসল অস্টিন। আড়মোড়া ভাঙল। তারপর হাত বাড়িয়ে তুলে নিল মাইক্রোফোন। শুনতে পাচ্ছি, মার্লিন। গুড মর্নিং।

মর্নিং, স্টিভ।

তা খবর কি? কোত্থেকে বলছ?

পজিশন নাইনটিন। ট্রিনিটি ফল্ট। লাস্ট সেন্সরটা এই মাত্র বসালাম।

কোন গোলমাল?

না। তোমার ওখানে?

ভাল। ভালই কাজ করছে টেলিমেট্রি। পাঁচ নম্বর সেন্সরটার সঙ্গে টেলিমেট্রির যোগাযোগ মিনিট পাঁচেকের জন্যে বন্ধ হয়ে গেছিল অবশ্য একটু আগে। কিছু না, শর্ট সার্কিট। কি করে যেন এক টুকরো তার খসে পড়েছিল সার্কিট বোর্ডের ওপর। তেমন কিছু না।

ওই পাঁচ মিনিটে তাহলে সেন্সর ফাইভ থেকে কোন সংকেত রেকর্ড করতে পারেনি কম্পিউটার?

না।

খারাপ কথা। যাকগে, যা হবার হয়েছে। একটু থামল মার্লিন, হ্যাঁ, শোন, আমাদের কাজ শেষ।

ভেরি গুড। জলদি ফিরে এস। ডাটা কালেকশন আর ভাল লাগছে না আমার। নদীতে মাছ ধরতে যেতে চাই এবার আমি।

কাজ শেষ বলেছি। ফিরে আসার কথা তো কিছু বলিনি।

ঠোঁট বাঁকাল অস্টিন।

কিন্তু দুদিন হয়েছে গেছে তোমরা। কাজও শেষ বললে। ফিরে আসতে বাধা কোথায়?

হেসে উঠল মার্লিন।

নতুন বিয়ে করেছি আমরা, ভুলে যাচ্ছ কেন?

আরে সেজন্যেই তো আরও বেশি তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে। কোথায় ক্যাম্পে ফিরে শান্তিতে রাত কাটাবে, না বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ। কেমন তরো লোক তোমরা, অ্যাঁ?

ভুল বলছ তুমি। এখানে, জঙ্গলেই তো হানিমুন জমছে, ভাল। কেউ ডিস্টার্ব করছে না।

করছে না, না? হুঁশিয়ার করল অস্টিন, ভুলে যেও না, আমার সামনের রেডিওটা সাংঘাতিক সেনসিটিভ। তোমাদের পজিশন জানা আছে আমার। ইচ্ছে করলেই তোমাদের ওখানকার যে কোন শব্দ, যে কোন ধরনের…বুঝেছ তো? নিখুঁতভাবে ধরতে পারে। কাজেই ডিস্টার্ব করতে অসুবিধে হবে না। হাঃ হাঃ হাঃ…

এখানকার রিসিভার অফ করে রাখব।

এবং সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ভূকম্পন সংকেত ধরতে পারবে না। সুতরাং…

অর্থাৎ আমাদের শান্তিতে থাকতে দেবে না?

এখন থেকে তোমাদের প্রতিটি নড়াচড়া রেকর্ড করব!…তাতে তোমাদের শান্তি বিঘ্নিত হলে… একটা ধাতব শব্দে থেমে গেল অস্টিন। টেলিমেট্রি ভ্যানটার দিকে চোখ তুলে তাকাল। ভ্যানের ছাদের এক প্রান্তে বসান বিশাল অ্যান্টেনাটা ট্রিনিটি ফল্টের দিক থেকে আসা সেন্সরগুলোর সংবাদ রিসিভ করে রেডিওতে পাঠায় যেটা, একশো চল্লিশ ডিগ্রী কোণ করে বেঁকে গেছে। পড়েই যাবে হয়ত। এক মিনিট, মার্লিনকে বলল অস্টিন, অ্যান্টেনাটা আবার বেঁকে গেছে। কিছুতেই কারণটা বুঝতে পারছি না। ধরে থাক, ঠিক করে রেখে আসছি ওটা।

একটু আগে বললে তেমন কোন সমস্যাই নেই ওখানে! বলল মার্লিন।

এই অ্যান্টেনার গন্ডগোলটা তো গতকাল থেকেই শুরু হয়েছে। একটু ধর, আসছি আমি।

পরে কথা বলব। ছেড়ে দিচ্ছি এখন।

নীরব হয়ে গেল রেডিও। মাইক্রোফোনটা টেবিলে নামিয়ে রাখল অস্টিন। ঠেলে পেছনে সরাল চেয়ারটা। ঘুরে রওনা দিল টেলিমেট্রি ভ্যানের দিকে।

ভ্যানের পেছনে পৌঁছে চারদিকে একবার দ্রুত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিল অস্টিন। এটা তার স্বভাব। কেউ নেই। শরীরের উপরের অংশ সোজা রেখে হাঁটুটা কয়েক ইঞ্চি ভাঁজ করল সে। তারপর আচমকা স্প্রিঙের মত লাফ দিল। হালকা পালকের মত উঠে গেল শূন্যে। তারপর পালকের মতই বাতাসে ভাসতে ভাসতে নেমে এল ভ্যানের ছাদে, মাটি থেকে দশ ফুট উপরে। স্টিভ অস্টিন সম্পর্কে যারা কিছু জানে না, ব্যাপারটা স্বপ্নের মতই মনে হবে তাদের কাছে।

আসলে ঠিকমত বসান হয়নি অ্যান্টেনাটা। কোন শিক্ষানবিশ কারিগর বসিয়েছে হয়ত। খুব কাঁচা হাতে লুব্রিকেট করা হয়েছে। বিয়ারিঙের ঠিক ওপরে অ্যান্টেনার দন্ডটা মুঠো করে ধরল অস্টিন, তার অসামান্য শক্তিশালী বায়োনিক আঙ্গুল দিয়ে। অন্য যে কেউ হলে, দুহাতে চেপে ধরেও এক চুল নড়াতে পারত না ভারি অ্যান্টেনাটা। কিন্তু স্টিভ অস্টিনের কথা আলাদা। সে তো আর দশজনের মত সাধারণ মানুষ নয়।

তীক্ষ্ণ ধাতব শব্দ উঠল। আস্তে আস্তে সোজা হতে শুরু করল অ্যান্টেনা। আবার আগের জায়গায় এসে গেল দন্ডটা। উঠে দাঁড়াল অস্টিন। চোখের সামনে মেলে ধরে তার বায়োনিক আঙ্গুলগুলো দেখল। ইচ্ছে করলে, এই আঙ্গুলের এক মোচড়ে কঠিন ইস্পাতের দন্ডটা ভেঙে দিতে পারে সে। চাই কি, দুআঙ্গুলে টিপে ধরে চ্যাপ্টা পর্যন্ত করে দিতে পারে।

কম্পিউটার না বানিয়ে, আসলে আমার মত আরও কিছু বায়োনিক ম্যান বানান উচিত বিজ্ঞানীদের, ভাবল অস্টিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *