০১. তিমির ফোয়ারা

ওই যে, তিমির ফোয়ারা! চেঁচিয়ে উঠল উত্তেজিত রবিন। আরে দেখছ না, ওই যে…ওইই, সাগরের দিকে হাত তুলে দেখাল সে।

এইবার দেখল মুসা। ঠিকই। তীর থেকে মাইল তিন-চার দূরে ভেসে উঠেছে যেন ছোটখাট এক দ্বীপ, পানির ফোয়ারা ছিটাচ্ছে। মিনিটখানেক এদিকওদিক পানি ছিটিয়ে ডুবে গেল আবার ধূসর মস্ত জীবটা।

সৈকতের ধারে উঁচু পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে তিন গোয়েন্দা ও কিশোর পাশা, মুসা আমান আর রবিন মিলফোর্ড। আবার এসেছে বসন্ত, স্কুল ছুটি। এই ছুটিতে তিমির ওপর গবেষণা চালাবে ওরা, ঠিক করেছে। খুব ভোরে তাই সাইকেল নিয়ে ছুটে এসেছে সাগর পারে, তিমির যাওয়া দেখার জন্যে।

প্রতি বছরই ফেব্রুয়ারির এই সময়ে আলাসকা আর মেকসিকো থেকে আসে তিমিরা, হাজারে হাজারে, প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল ধরে চলে যায়, যাওয়ার পথে থামে একবার বাজা ক্যালিফোর্নিয়ায়। মেয়েরা বাচ্চা দেয় ল্যাগুনের উষ্ণ পানিতে, পুরুষেরা বিশ্রাম নেয়।

কয়েক হপ্তা পর বাচ্চারা একটু বড় হলে আবার বেরিয়ে পড়ে ওরা। এবার আর থামাথামি নেই, একটানা চলা। প্রায় পাঁচ হাজার মাইল সাগরপথ পেরিয়ে গিয়ে পৌঁছায় উত্তর মেরুসাগরে। গরমের সময় ওখানকার পানি ছেয়ে থাকে খুদে চিঙড়ি আর প্ল্যাঙ্কটনে, ধূসর তিমির প্রিয় খাবার।

যাওয়ার সময় সবাই দেখে ওদেরকে, বলল রবিন, কিন্তু ফেরার সময় দেখে। আগের দিন রকি বীচ লাইব্রেরিতে তিমির ওপর পড়াশোনা করে কাটিয়েছে সে। যা যা গিলেছে সেগুলো উগড়াচ্ছে এখন।

কেন? জানতে চাইল মুসা।

ফেরার পথে হদিস রাখা যায় না বোধহয়, হাতের খোলা নোটবুকের দিকে তাকাল আরেকবার রবিন। যাওয়ার সময় দল বেঁধে যায় ওরা, সবার চোখে পড়ে। ফেরার পথে বড় একটা পড়ে না, হয়তো একা একা ফেরে বলে। কারও কারও মতে ফেরে একা নয়, জোড়ায় জোড়ায়। তাহলেও বিশাল সাগরে দুটো তিমির পেছনে কে কতক্ষণ লেগে থাকতে পারবে? পথ তো কম নয়, হাজার হাজার মাইলের ধাক্কা।

তা ঠিক, সায় দিল মূসা। কিশোর, তোমার কি মনে হয়? কিন্তু ওদের কথায় কান নেই গোয়েন্দাপ্রধানের। দূরে সাগরের যেখানে তিমির ফোয়ারা দেখা গেছে, সেদিকেও চোখ নেই। সে তাকিয়ে আছে নিচের নির্জন সৈকতের একটা অগভীর খাঁড়ির দিকে। আগের দিন রাতে ঝড় হয়েছিল, ঢেউ নানারকম জঞ্জাল-ভাসমান কাঠের গুড়ি, প্ল্যাসটিকের টুকরো, খাবারের খালি টিন, উপড়ানো আগাছা, শেওলা, আরও নানারকম টুকিটাকি জিনিস এনে ফেলেছে খাঁড়িতে।

কি যেন একটা নড়ছে, বলে উঠল কিশোর। চলো তো, দেখি। কারও জবাবের অপেক্ষা না করেই ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করল সে। তাকে অনুসরণ করল অন্য দুজন।

ভাটা শুরু হয়েছে, ইতিমধ্যেই অর্ধেক নেমে গেছে পানি। খাঁড়ির কাছে এসে থামল কিশোর, আঙুল তুলে দেখাল।

আরে তিমি! মুসা বলল। মাথা ঝাঁকাল কিশোর। আটকে গেছে। সাহায্য না পেলে মরবে।

তাড়াতাড়ি জুতো-মোজা খুলে নিল তিনজনে। শুকনো বালিতে রেখে, প্যান্ট গুটিয়ে এসে নামল কাদাপানিতে।

ছোট্ট একটা তিমি, মাত্র ফুট সাতেক লম্বা। বাচ্চা তো, তাই এত ছোট-ভাবল রবিন। ঝড়ের সময় কোনভাবে মায়ের কাছছাড়া হয়ে পড়েছিল, ঢেউয়ের ধাক্কায় এসে আটকা পড়েছে চরায়।

সৈকত এখানে বেশ ঢালু, ফলে খুব দ্রুত নামছে পানি। ওরা তিমিটার কাছে আসতে আসতেই গোড়ালি পর্যন্ত নেমে গেল পানি এতে সুবিধেই হলো ওদের। বেশি পানি হলে অসুবিধে হত, ভীষণ ঠাণ্ডা পড়েছে, বরফ-শীতল পানি। তবে পানি কমে যাওয়ায় বাচ্চাটা পড়ল বিপদে, সাগরে নামতে পারছে না।

তিনজনে মিলে গায়ের জোরে ঠেলা-ধাক্কা দিল, কিন্তু নড়াতে পারল না ওটাকে। হাজার হোক তিমির বাচ্চা তো, যত ছোটই হোক, মানুষের জন্যে বেজায় ভারি। তিরিশ মণের কম না, ভাবল কিশোর। বান মাছের মত পিচ্ছিল শরীর, হাত পিছলে যায়। তার ওপর না ধরা যাচ্ছে পাখনা, না লেজ, কিছু ধরে টেনেটুনে যে সরাবে তারও উপায় নেই। বেশি জোরে টানাটানি করতেও ভয় পাচ্ছে, কি জানি কোথাও যদি আবার ব্যথা পায় তিমির বাচ্চা।

ওদের মোটেও ভয় পাচ্ছে না বাচ্চাটা, যেন বুঝতে পেরেছে, ওকে সাহায্য করারই চেষ্টা হচ্ছে। অদ্ভুত দৃষ্টিতে দেখছে ওদেরকে। কথা বলতে পারলে বুঝি বলেই উঠত মারো জোয়ান হেঁইও, জোরসে মারো হেঁইও। .

রবিন এসে দাঁড়াল মাথার কাছে। বিশাল মাথা ধরে ঠেলার চেষ্টা করতে গিয়েই খেয়াল করল, ফোয়ারার ছিদ্রটা অন্যরকম। ভুল ভেবেছে এতক্ষণ। বাচ্চা তিমি না এটা।

কিশোর আর মুসাকে কথাটা বলতে যাবে, এই সময় বিশাল এক ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল, এক ধাক্কায় চিত করে ফেলল ওদেরকে। হাঁচড়ে-পাঁচড়ে আবার খাড়া হলো ওরা, ততক্ষণে চলে গেছে পানি। ঢেউ আসার আগে গোড়ালি অবধি ছিল, সেটা কমে গিয়ে হয়েছে বুড়ো আঙুল সমান। খাঁড়ি থেকে উঠে তিমিটা গিয়ে আরও খারাপ জায়গায় আটকেছে, সৈকতের বালিতে। খাঁড়িতে যা হোক কিছু পানি আছে, ওখানে তা-ও নেই।

মরছে, বলে উঠল মুসা। এবার আরও ভালমত আটকাল। জোয়ার আসতে আসতে কর্ম খতম।

বিষণ্ণ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল রবিন। হ্যাঁ, আরও অন্তত ছয় ঘণ্টা।

শুকনোয় এতক্ষণ বাঁচতে পারে তিমি? জিজ্ঞেস করল মুসা।

মনে হয় না। পানি না পেলে খুব তাড়াতাড়ি ডি-হাইড্রেটেড হয়ে পড়ে ওদের শরীর, চামড়া শুকিয়ে খসখসে হয়ে যায়।

ঝুঁকে বিশাল মাথাটায় আলতো চাপড় দিল রবিন, দুঃখ হচ্ছে তিমিটার জন্যে। পানিতে রাখতে হবে, নইলে বাঁচবে না।

কথা বুঝতে পেরেই যেন ক্ষণিকের জন্যে চোখ মেলল তিমি। বিষণ্ণ হতাশা মাখা দৃষ্টি, রবিনের তা-ই মনে হলো। ধীরে ধীরে আবার চোখের পাতা বন্ধ করল তিমিটা।

কিভাবে রাখব। বলল মুসা, পানিতে যখন ছিল তখনই ঠেলে সরাতে পারিনি, আর এখানে তো খটখটে শুকনো।

জবাব দিতে পারল না রবিন। কিশোরের দিকে তাকাল। অনেকক্ষণ কোন কথা বলছে না গোয়েন্দাপ্রধান, তাদের আলোচনায় মন নেই।

গভীর চিন্তায় মগ্ন কিশোর, ঘন ঘন তার নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটা দেখেই সেটা বোঝা যাচ্ছে। বিড়বিড় করল, পর্বতের কাছে যদি যাওয়া না যায় পর্বতকেই কাছে আনতে হবে।

আরে, এই কিশোর, জোরে বলল মুসা, কি বলছ? ইংরেজী বললো, ইংরেজী বললো। এখানে কিসের পর্বত? আমরা পড়েছি তিমি-সমস্যায়।

মাঝে মাঝে কঠিন শব্দ বলা কিংবা দুর্বোধ্য করে কথা বলা কিশোরের স্বভাব।

তিমির কথাই তো বলছি। সাগরে দেখাল কিশোর, ওই যে, পর্বত, ওটাকেই কাছে আসতে বাধ্য করতে হবে। একটা বেলচা দরকার। আর…আর একটা তুরপুলিন। আর পুরানো একটা হ্যাণ্ড পাম্প, গত মাসে যেটা বাতিল মালের সঙ্গে কিনে এনেছে চাচা…

গর্ত, চেঁচিয়ে উঠল রবিন।

গর্ত! কিসের গর্ত? মুসা অবাক।

একটা গর্ত খুঁড়ে, তাতে তারপুলিন বিছিয়ে পাম্প করে পানি দিয়ে ভরে দিতে হবে গর্তটা, বলল কিশোর। ছোটখাট একটা সুইমিং পুল বানিয়ে দেব তিমিটার জন্যে, যতক্ষণ না জোয়ার আসে টিকে থাকতে পারবে।

দ্রুত সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর ঠিক হলো, সাইকেল নিয়ে পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ডে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আসবে মুসা আর রবিন। ততক্ষণ তিমিটাকে পাহারা দেবে কিশোর।

মুসা, রবিন চলে গেল। কিশোর বসে রইল না। প্লাসটিকের একটা বাঁকাচোরা বাকেট খুঁজে আনল খাঁড়ি থেকে। হাত দিয়ে চেপেচুপে কোনমতে কিছুটা সোজা করে নিয়ে ওটাতে করে পানি এনে গায়ে ছিটাল তিমিটার।

পরের আধ ঘণ্টা পানি ছিটানোয় ব্যস্ত রইল কিশোর। রবিন আর মুসা যা করতে গেছে, তার চেয়ে কঠিন কাজ করতে হচ্ছে তাকে, সন্দেহ নেই। ঢালু ভেজা পাড় বেয়ে সাগরে নেমে পানি তুলে নিয়ে দৌড়ে ফিরে আসতে হচ্ছে, এতবড় একটা শরীর ভিজিয়ে রাখা সোজা কথা নয়। ছোট বাকেটে কতটুকুই বা পানি ধরে, তার ওপর তিমির চামড়া যেন মরুভূমির বালি, পানি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুঁষে নিচ্ছে।

গতর খাটাতে কোন সময়েই বিশেষ ভাল লাগে না কিশোরের। ঠেকায় পড়লে কাজ করে, তার চেয়ে মগজ খাটানো অনেক বেশি পছন্দ তার। ওই যে, এসে গেছে, তিমিটাকে বলল সে।

হাঁপাতে হাঁপাতে এসে দাঁড়াল দুই সহকারী গোয়েন্দা। যা যা দরকার নিয়ে এসেছে। প্রায় নতুন একটা বেলচা, তারপুলিনের রোল, হ্যাণ্ড-পাম্প, হোস। পাইপের কুণ্ডলী নামিয়ে রাখল বালিতে।

কিশোরও হাঁপাচ্ছে। বলল, ওটার গা ঘেষে গর্ত খুঁড়তে হবে। তারপর যে ভাবেই হোক ঠেলেঠুলে ফেলব গর্তে। তিনজনের মাঝে গায়ে জোর বেশি মুসার, কায়িক পরিশ্রমেও অভ্যস্ত, বেলচাটা সে-ই আগে তুলে নিল। গর্তের বেশির ভাগটাই সে খুঁড়ল। ভেজা বালি, আলগা, খুঁড়তে বিশেষ বেগ পেতে হলো না, সময়ও লাগল না তেমন। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই দশ ফুট লম্বা, তিন ফুট চওড়া আর তিন ফুট মত গভীর একটা গর্ত খুঁড়ে ফেলল ওরা।

গর্তে তারপুলিন বিছিয়ে দিল ভালভাবে, চারপাশের দেয়ালও তারপুলিনে ঢাকা। পড়ল, ফলে পানি শুঁষে নিতে পারবে না বালি। পাম্প নিয়ে সাগরের দিকে দৌড়াল মুসা। রবিন আর কিশোর হোস পাইপের কুণ্ডলী খুলল, পাম্পের সঙ্গে এক মাথা লাগিয়ে আরেক মাথা টেনে এনে ফেলল গর্তে। পাম্পটা বেশ ভাল, কোন মাছধরা নৌকায় পানি সেঁচার কাজে ব্যবহার হত হয়তো।

পালা করে পাম্প করে অল্পক্ষণেই গর্তটা পানি দিয়ে ভরে ফেলল ওরা।

সব চেয়ে শক্ত কাজটা এবার, ফোস করে নিঃশ্বাস ফেলল কিশোর।

আল্লাহ ভরসা, হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছল মুসা। এসো ঠেলা লাগাই।

দাঁড়াও, একটু জিরিয়ে নিই, ধপাস করে বালিতে বসে পড়ল কিশোর। আর কয়েক মিনিটে মরবে না।

জিরিয়ে নিয়ে উঠল ওরা। ভারি পিপে ঠেলে গড়িয়ে নেয়ার ভঙ্গিতে তিমির গায়ে হাত রেখে দাঁড়াল কিশোর আর মুসা। মাথার কাছে চলে এল রবিন। তিমির মাথায় আলতো চাপড় দিল।

চোখ মেলল তিমি। রবিনের মনে হলো, তার দিকে চেয়ে হাসছে।

ঠেলো বললেই ঠেলা লাগাবে। এক সঙ্গে… কিন্তু কিশোরের কথা শেষ হলো না। তার আগেই ভীষণভাবে নড়ে উঠল তিমি। বান মাছের মত মোচড় দিয়ে শরীর বাঁকিয়ে, বালিতে লেজের প্রচণ্ড ঝাপটা মেরে পাশে সরে গেল, ঝপাত করে কাত হয়ে পড়ল পানিতে। পানি ছিটকে উঠল অনেক ওপরে।

তিমির গায়ে বেশি ভর দিয়ে ফেলেছিল মুসা, উপুড় হয়ে পড়ে গেল সে। লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল আবার। চেঁচিয়ে উঠল, ইয়াল্লা!

আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল রবিন।

হাতের তালু ঝাড়তে ঝাড়তে কিশোর বলল, যাক বাবা, বাঁচা গেল। নিজের কাজ নিজেই সেরে নিল।

পুরো এক মিনিট পানিতে গা ডুবিয়ে রইল তিমি, মুখ দিয়ে পানি টানল, তারপর সামান্য ভেসে উঠে ফোয়ারা ছিটাল মাথার ফুটো দিয়ে, তিন গোয়েন্দার গা ভিজিয়ে দিয়ে যেন ধন্যবাদ জানাল।

ঝকঝকে সাদা দাঁত বের করে হাসল মুসা। ব্যাটা, আবার রসিকতা জানে…

যাক, মুসার কথায় কান না দিয়ে বলল রবিন, জোয়ার আসাতক বেঁচে থাকতে পারবে।

জোয়ার তো সময়মত ঠিকই আসবে, আমাদেরও সময়মত যাওয়া দরকার, বলল কিশোর। মনে নেই, আজ ইয়ার্ডে কাজ আছে? তাছাড়া নাস্তা…

যাহ, মুসা বলল, এক্কেবারে ভুলে গেছি! আপেলের বরফি আর মুরগীর রোস্ট খাওয়াবেন কথা দিয়েছেন মেরিচাচী! চলল, চলো। তিমিটার দিকে ফিরল, হেই মিয়া, তুমি পানি খাও, আমরা যাই, মুরগী ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।

মুসার কথায় সায় জানাতেই যেন আরেকবার তাদের গায়ে পানি ছিটাল তিমি।

গর্তের কিনারে এসে দাঁড়াল রবিন। তিমিটার উদ্দেশ্যে বলল, থাক। কোন অসুবিধে হবে না। আবার আসব আমরা।

তাড়াহুড়ো করে জুতোমোজা পরে নিল তিনজনে। পাম্প, বেলচা আর হোসপাইপ গুছিয়ে নিয়ে এসে উঠল পাড়ের ওপর। মাটিতে শুইয়ে রাখা সাইকেলগুলো তুলে মাল বোঝাই করল। রওনা হতে যাবে, এই সময় একটা শব্দে ফিরে তাকাল কিশোর।

মাইল দুয়েক দূরে ছোট একটা জাহাজ-একটা কেবিন ক্রুজার, আউটবোর্ড মোটর-ধীরে ধীরে চলেছে। দুজন লোক দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এত দূর থেকে চেহারা বোঝা গেল না।

হঠাৎ আলোর ঝিলিক দেখা গেল জাহাজ থেকে। পর পর তিনবার।

আয়নার সাহায্যে সিগন্যাল দিচ্ছে, বলল মুসা।

মাথা নাড়ল কিশোর, আমার মনে হয় না। যেভাবে ঝলকাচ্ছে, কোন নিয়মিত প্যাটার্ন নেই। অন্য কোন জিনিস, বোধহয় বিনকিউলারের কাচে রোদ লেগে প্রতিফলিত হচ্ছে।

ব্যাপারটা অন্য দুজনের কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো না, কিন্তু কিশোর সাইকেলে চড়ল না। স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে জাহাজটার দিকে। নাক ঘুরে গেছে ওটার, ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে এদিকেই।

কি হলো, চলো, অধৈর্য হয়ে তাড়া দিল মুসা। সব কিছুতেই রহস্য খোঁজার স্বভাব ছাড়ো। রোজ শয়ে শয়ে লোক এদিক দিয়ে যায় আসে, তাছাড়া ইদানীং অনেকেই আমাদের মত শখের তিমি গবেষক হয়েছে। তিমির যাওয়া দেখার শখও আমাদের একলার না।

জানি, সন্তুষ্ট হতে পারছে না কিশোর, হ্যাণ্ডেল ধরে ঠেলে নিয়ে চলল সাইকেল বাধ্য হয়ে রবিন আর মুসাকেও ঠেলেই এগোতে হলো। কিন্তু বোটের লোকটা তিমি দেখছে না। ওর বিনকিউলারের চোখ তীরের দিকে, এদিকে। আমাদেরকেই দেখছে না তো?

দেখলে দেখছে। কোন অসুবিধে আছে তাতে? বলল মুসা।

জবাব দিল না কিশোর।

 

মেরিচাচী অপেক্ষা করছেন। হাসিখুশি মানুষ, সারাক্ষণ হাসি লেগেই আছে মুখে। হাসেন না শুধু ছেলেদেরকে কাজ করানোর সময়, আর ইয়ার্ডের দুই কর্মচারী-দুই ব্যাভারিয়ান ভাই বোরিস আর রোভারকে খাটানোর সময়। ও, আরও একটা সময় হাসেন না, যখন রাশেদচাচা একগাদা পুরানো বাতিল জঞ্জাল মাল নিয়ে আসেন, যেগুলো কোনভাবেই বিক্রি করা যাবে না, তখন।

মাল জোগাড়েই ব্যস্ত থাকেন রাশেদ পাশা, ইয়ার্ডের দেখাশোনা মেরিচাচীকেই করতে হয়। কোনটা সহজেই নেবে খদ্দের, কোনটা নেবে না, স্বামীর চেয়ে অনেক ভাল বোঝেন তিনি।

তিন ছেলেকে দেখে হাঁ হাঁ করে উঠলেন মেরিচাচী, এই, তোরা কি রে? সেই কখন থেকে খাবার নিয়ে বসে আছি, সব জুড়িয়ে গেল, সাইকেল থেকে কিশোরকে পাম্প নামাতে দেখে অবাক হলেন তিনি। আরে এই কিশোর, পাম্প নিয়েছিলি কেন? রবিন আর মুসা নিয়ে যাওয়ার সময় দেখেননি তিনি, বোরিসের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে গিয়েছিল ওরা।

সাগর সেঁচতে গিয়েছিলাম, চাচী, হাসল কিশোর।

তোর মাথা-টাতা খারাপ হয়ে যায়নি তো, এই কিশোর।

মুসার এখন পেট জ্বলছে, মজা করার সময় নেই, তাড়াতাড়ি সব বুঝিয়ে বলল মেরিচাচীকে।

ভরপেট নাস্তা খেয়ে কাজে লেগে গেল তিন গোয়েন্দা। দুপুর পর্যন্ত গাধার মত খাইল। দুপুরের খাওয়া রেডি করে ডাকলেন মেরিচাচী। হাতমুখ ধুয়ে এসে খেতে কসল ওরা।

খাওয়ার পর আবার রওনা হলো সাগর পারে, তিমিটাকে দেখতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *