০১. ঝমঝম বৃষ্টি পড়ছে

পাতকী – কাজী মাহবুব হোসেন
সেবা প্রকাশনী – প্রথম প্রকাশ: ১৯৮৩

০১.

ঝমঝম বৃষ্টি পড়ছে। মনে হচ্ছে যেন চারদিকে কেউ একটা বৃষ্টির ফোঁটায় বোনা পর্দা টাঙিয়ে দিয়েছে। ঘোড়ার খুর অনেকখানি ডেবে যাচ্ছে বৃষ্টি ভেজা নরম মাটিতে। বর্ষাতি গায়ে ঘোড়ার পিঠে কুঁজো হয়ে বসে ঘোড়া চালাতে চালাতে তার সুন্দর উষ্ণ কেবিন আর এক কাপ গরম কফির কথাই ভাবছিল জাভেদ। হঠাৎ আর একটা ঘোড়ার পায়ের চিহ্ন নজরে পড়ল ওর।

মানুষের পায়ের চাপে লোকটা যেদিকে যাচ্ছে সেদিকেই হেলে পড়ে ঘাস। কিন্তু ঘোড়া ছুটিয়ে গেলে ঘোড়ার খুর ঠিক উল্টোদিকে নুইয়ে দেয় ঘাসকে। যে ট্রেইলটা জাভেদের চোখে পড়ল, সেটা দক্ষিণ-পশ্চিমের জনমানবহীন নির্জন পাহাড়ের দিক থেকে এসে আরও নির্জন পাহাড়ের দিকে গেছে তার র‍্যাঞ্চের ওপাশে।

ভুরু কুঁচকে চোখ ছোট করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়েও কিছুই নজরে পড়ল না তার-কেবল একটা লোকের ঘোঘাড়ায় চড়ে ওই পাহাড়ের দিকে চলে যাবার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে হাঁটু-সমান ঘাস বিছানো মাঠে।

অবাক কাণ্ড! নিজে নিজেই বলে উঠল জাভেদ, এমন দিনে কারও ওই পাহাড়ের দিকে যাবার কী এমন দরকার পড়তে পারে?

শুধু এমন দিনে বলে নয়, ভাল দিনেও কারও ওদিকে কোন দরকার থাকতে পারে না।

দুনিয়ার প্রায় কোনকিছুই কারণ ছাড়া ঘটে না বলে জাভেদের বিশ্বাস। এর কোন কারণ খুঁজে না পেয়ে বিব্রত বোধ করছে সে। কয়েকদিন ধরেই এদিকে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। নিউ মেক্সিকোর উত্তরাঞ্চলে এর মধ্যে কেউ প্রমোদ ভ্রমণে বেরুবে না।

ঘোড়াটা যে চালকবিহীন ছিল তাও নয়। কারণ চালক না থাকলে কোন ঘোড়া এত সোজা চলবে না, আর এত জোরেও ছুটবে না।

স্বাভাবিকভাবে এই ট্রেইলটা জাভেদের চোখে পড়ার কথা নয়, কারণ এই পথে সে যাতায়াত করে না। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে সে তার ফার্মের জগুলোকে বিশ মাইল দূরে ভ্যালে ডি স্যান অ্যানটোনিও বলে পরিচিত একটা জায়গায় সরিয়ে নিতে আরম্ভ করেছে। পানি আর ঘাস, দুটোই যথেষ্ট পরিমাণে আছে ওখানে।

তিনদিন আগেই সে আরও বারোটা গরু-মহিষ তাড়িয়ে নিয়ে পৌঁছে দিতে গেছিল ওখানে। ওই এলাকায় পাহাড়ী সিংহের উৎপাত হচ্ছে দেখে ফাঁদ তৈরি করে দুটো সিংহ মেরে সে তার প্রায় তিনশো জীবজম্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা করে এসেছে।

ফেরার পথে নজরে পড়েছে এই ট্রেইল। ঘণ্টাখানেকের বেশি পুরোনো নয় এটা।

এদিক দিয়ে যে-ই গিয়ে থাক না কেন, ঘটনাচক্রে সে এই পথ দিয়ে যায়নি। ইচ্ছা করেই এই পথ সে বেছে নিয়েছে যেন অন্যের নজরে না পড়ে-নইলে ওখানে পৌঁছানোর আরও ভাল আর সহজ পথ অনেক ছিল।

জাভেদের র‍্যাঞ্চ অনেকটা দূরে পাহাড়ের ভিতর লুকানো। যে কোন প্রচলিত চলার পথ থেকে বেশ দূরে। র‍্যাঞ্চটা একাই চালায় জাভেদ। ওকে সাহায্য করে জিকো ওয়াইল্ড, আধা ইন্ডিয়ান লোকটা। আর্মি ছাড়ার পর থেকে জাভেদের সাথেই আছে সে।

ট্রেইলটার দিক বা উপস্থিতি কোনটারই একটা যুক্তিসঙ্গত কারণ সে খুঁজে পেল না। অযৌক্তিক কিছুই পছন্দ করে না জাভেদ, তাই তার মনের মধ্যে একটা খটকা রয়েই গেল।

মাঠের প্রান্তে এসে চওড়া গুয়াডালুপ ক্যানিয়নটার দিকে চাইল সে। ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাওয়া চালটা বেয়ে অনেক উপরে উঠে তারপরে তার র‍্যাঞ্চ। ধরে আসা বৃষ্টিতে এখন র‍্যাঞ্চের কেবিনটা আর তার আশেপাশের গাছগুলো বেশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এখান থেকে তিন মাইল দূরে প্রায় এক হাজার ফুট উঁচুতে ওর র‍্যাঞ্চ।

একটু অস্বস্তির সাথে ভাল করে র‍্যাঞ্চ আর আশেপাশের পুরো এলাকাটা খুঁটিয়ে দেখল সে। অজানা আগন্তুক উত্তর বা পশ্চিমের পাহাড়ের দিকে গেছে। জাভেদের ধারণা পশ্চিমেই গেছে সে।

সারাটা জীবন জাভেদকে নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই নিশ্চিত করতে হয়েছে। অযথা নিরর্থক ঝুঁকি নেওয়ার পক্ষপাতী সে কোনদিনই ছিল না। এই জন্য ছেলেবেলায় তার খেলার সাথীদের কাছ থেকে তাকে অনেক মস্করা সহ্য করতে হয়েছে। তবে পরবর্তী জীবনে এই গুণটাই অনেকবার রক্ষা করেছে তার জীবন। নিজে ঝুঁকি নেয় না সে-কিন্তু যারা নিয়েছে তাদেরকে কবরে যেতে সাহায্য করেছে সে বিনা দ্বিধায়।

আজও ঝুঁকি নিল না সে। ধীরে, খুব সাবধানে, সাধারণত যে পথে যায় সেই পথে না গিয়ে অন্য পথ ধরে গাছের আড়াল দিয়ে এগিয়ে চলল। নবাগতের চিন্তাটা মাথা থেকে যাচ্ছে না তার, অথচ র‍্যাঞ্চের কাছাকাছি এসেও অস্বাভাবিক কিছুই চোখে পড়ল না ওর। কেবল একটা ক্ষীণ ধোয়ার রেখা এঁকেবেঁকে আকাশে উঠে যাচ্ছে তার কেবিনের চিমনি থেকে। এ ছাড়া কোনকিছুই নড়ছে না কোথাও। আস্তাবলের পিছনে এসে ঘোড়া থামাল জাভেদ। আর একবার চারদিক ভাল করে খুঁটিয়ে দেখল সে।

সামনের একখণ্ড পরিষ্কার আঙিনার ওপাশে তার কেবিন। তার পিছনেই পাহাড়টা খাড়াভাবে পাচশো ফুট উপরে উঠে গেছে-উপরটা সমতল মালভূমির মত। এই মেসার তলাতেই খুঁজে পেয়েছে জাভেদ র‍্যাঞ্চ করার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপকরণ-পানি। প্রচুর পানি।

ডজনখানেক ঝর্না আর ফোয়ারার পানি পাহাড়ের ফাটল আর গুহা বেয়ে এসে অনবরত জমা হচ্ছে পাহাড়ের ঠিক নীচেই গামলার মত একটা বিরাট গর্তে। ওখান থেকে উপচে পড়া জলের ধারাটা আগে র‍্যাঞ্চ থেকে বেশ কিছুটা দূরে গিয়ে ভ্যাচেক্রীকে হারিয়ে যেত। কিন্তু এখন জাভেদ সেটাকে ঘুরিয়ে নিয়ে কিছুটা পানি ব্যবহার করে তার বাগান আর একর তিনেক জমি চাষ করার জন্য, আর বাকিটা একসারি ছোট ছোট চৌবাচ্চায় জমিয়ে রাখে তার পোষা জন্তু-জানোয়ারের জন্য।

ছোটকাল থেকেই এদিক ওদিক চরে বেড়ানোর অভ্যাস ছিল জাভেদের। একদিন একটা পুরোনো ইন্ডিয়ান ট্রেইল ধরে চলতে চলতে হঠাৎ আবিষ্কার করে সে এই জায়গা। কেবল বন্য জীবজন্তু ছাড়া আর কোন জীবনের সাড়া ছিল না। এখানে। কোনদিন এখানে মানুষের পা পড়েছে বলে মনে হয়নি, তাই এখানেই গড়েছে সে তার কেবিন আর র‍্যাঞ্চ। এর চারপাশে বহুমাইল পর্যন্ত বিস্তৃত কেবল নির্জন এলাকা।

এই এলাকার নির্জনতাই তাকে আজ সন্দিগ্ধ করে তুলেছে। শহরের আশেপাশে তিনচারটে গুণ্ডা দলের খবর তার জানা আছে, কিন্তু তাদেরও কেউ আইন ফাঁকি দিয়ে পালাবার জন্য এই পথ বেছে নেবে না কখনও। লোকটা জাভেদের অজানা কোন শত্রু না হলে তার একাকী এভাবে এদিকে আসার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণই থাকতে পারে না।

প্রায় ছয় ফুট লম্বা, চওড়া কাঁধ আর ছিমছাম শক্তিশালী গড়ন জাভেদের। হাসির রেখা সাধারণত তার ঠোঁটে না ফুটে কালো চোখ জোড়াতেই ফুটে উঠতে দেখা যায়। কথা বলার চেয়ে শোনে সে বেশি। তাকে ঘাটাতে গেলে যে তার ফল শুভ হয় না সেটা সে কয়েকবারই প্রমাণ করেছে শহরে। কিন্তু নির্জনতা তার খুব প্রিয় বলে শহর থেকে এতদূরে এসে ডেরা করেছে সে।

চার বৎসর হলো র‍্যাঞ্চটা করেছে জাভেদ। এতদিনে তার ফার্মের পশু কেবল বেড়েইছে, কারণ একটাও বিক্রি করেনি সে। বরং আরও কিছু কিনেছে ঝর্ণা থেকে হেঁকে তোলা সোনার বিনিময়ে। তার দৈনন্দিন খরচ পুষিয়ে নিয়েছে সে ন্যাসিমিয়েনটো আর স্যাংগ্রে ডি ক্রিস্টোর পাহাড়গুলোতে রাইফেল দিয়ে শিকার করে। চার বৎসর এখানে একা কাটিয়েও তার ধার মোটেও কমেনি-শিকারে অভ্যাস তাকে আরও তীক্ষ্ণ, সাবধানী আর সচেতন করে তুলেছে। ওই লোকটার অনেক রকম কারণই থাকতে পারে এই গুয়াডালুপ ক্যানিয়নে আসার, কিন্তু পুবের পাহাড় অতিক্রম করে এত কঠিন পথ ধরে আসার কোন দরকার ছিল না তার। একমাত্র সবার অলক্ষ্যে লুকিয়ে এখানে পৌঁছতে হলেই কেউ ওই পথ ব্যবহার করবে। কার কাছ থেকে লুকিয়ে থাকতে চাইছে ও? জাভেদের, না জিকোর কাছ থেকে?

একাকী থাকা পছন্দ করলেও অতিথিপরায়ণ বলে নাম আছে তার। তবে কেন কেউ সোজা পথে না এসে এভাবে লুকিয়ে এসেছে? সে কি তার শত্রু? ক্ষতি করতে চায়?

প্রায় পনেরো মিনিট ঝোঁপের আড়ালে ঘোড়ার পিঠে নিজেকে গোপন রেখে দাঁড়িয়ে রইল সে। তার সমস্ত সত্তা তাকে বিপদের আগাম দিচ্ছে।

বৃষ্টিটা কিছুক্ষণের জন্য থেমেছিল, আবার অল্প অল্প আরম্ভ হলো। শীত এসে যাচ্ছে, যে কোন সময়ে তুষার পড়তে শুরু করতে পারে।

ভুরু কুঁচকে আর একবার সে একে একে কেবিন, পাহাড়, জঙ্গল আর মেসার উপরের ধারটা লক্ষ করে দেখল। যদি কোন শত্রু বা চোর তাকে খুন করে কিছু রসদ আর ঘোড়া চুরি করার উদ্দেশ্য নিয়ে এসে থাকে তবে সে ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করবে তার সচরাচর চলাচলের পথে। ইচ্ছা করেই ওই পথ দিয়ে আজ ফেরেনি সে। তার আঙিনাটা মেসার উপরের রিম থেকে বা কেবিনের পিছনের ঢাল থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। কিন্তু গুদাম ঘরটায় সে নিজেকে মোটামুটি আড়াল রেখেই পৌঁছতে পারবে।

জাভেদের গেল্ডিং ঘোড়াটা অস্থিরভাবে মাটিতে পা ঠকল। ঘোড়া থেকে নেমে বর্ষাতিটা খুলে ফেলল জাভেদ। নীল জিনসের শার্ট রয়েছে তার পরনে। বহুবার ধোলাইয়ের ফলে শার্টের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে এসেছে কয়েক জায়গায়। উলের ট্রাউজার্স নীচের দিকে ভাঁজ করে উঁচু বুটের মধ্যে ঢুকানো। কোমরের ডানদিকে একটা ছয় ঘোড়ার কোল্ট ঝুলছে বেশ একটু নিচুতে। বেল্ট সরিয়ে কোল্টটাকে সুবিধামত জায়গায় নিয়ে এল সে, তারপর নিজে ঘোড়ার আড়ালে থেকে ঘোড়াটাকে হটিয়ে নিয়ে আস্তাবলে ঢুকল।

প্রথমেই ঘোড়ার যত্ন নিল সে। জিন নামিয়ে রেখে লাগাম খুলে দিল। একটা ছালার টুকরো দিয়ে ঘোড়ার গা ডলে দিতে দিতে আবার মাথার মধ্যে সমস্যাটাকে উল্টে পাল্টে দেখল। হয়তো অযথাই ঘাবড়াচ্ছে সে, এমনও হতে পারে যে লোকটা হারিয়ে গিয়ে আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছে।

কেবিন থেকে কোনরকম শব্দ কানে এল না তার। জিকো সাধারণত এসে হাজির হয় জাভেদ ফিরলেই-কিন্তু আজ সে এল না। সামান্য ফাঁক করা দরজা দিয়ে সে কেবিনটাকে ভাল করে খুঁটিয়ে দেখল। অন্ধকার হয়ে এসেছে, জিকো কখনোই আলো ছাড়া ঘরে থাকবে না-অথচ কোন আলো জ্বলছে না ঘরে।

জিকোর ঘোড়াটা আস্তাবলেই আছে, তার জিনটাও ঠিক জায়গা মতই রয়েছে। তবে কেন তাকে অভ্যর্থনা করতে এল না জিকো? আলো কেন জ্বলছে না ঘরে?

অবশ্য পায়ে হেঁটে কোথাও গিয়ে থাকতে পারে জিকো। কিন্তু জিকোকে ভাল করেই জানে জাভেদ-উপায় থাকলে বাড়ি থেকে আস্তাবল পর্যন্ত, ব্যস, এর বেশি হাঁটতে সে রাজি নয়। তবে কি সে কেবিনেই আছে? রোজকার মত বেরিয়ে না এসে তাকে সাবধান করে দিতে চাইছে কোন ব্যাপারে? নাকি সে অসুস্থ বা আহত হয়ে পড়ে আছে ঘরে?

সাবধান করতে চাইলে ঠিক কোন ব্যাপারে সাবধান করতে চাইছে সে?

র‍্যাঞ্চের পরিস্থিতি যেন ওই ঘোড়সওয়ারের আবির্ভাবেই কিছুটা বদলেছে। সন্দিগ্ধ হয়ে উঠেছে জাভেদ। যদি কেউ কেবিনে তার জন্য অপেক্ষা করত তবে নিশ্চয়ই সে আলো জ্বেলে সব কিছুই যতটা সম্ভব স্বাভাবিক আছে দেখানোর চেষ্টা করত। কেবিনের দরজার কাছে কিছু পায়ের ছাপ দেখা যাচ্ছে-দাগগুলো আবার ভাল করে পরীক্ষা করল সে।

আস্তাবল থেকেই দেখা যাচ্ছে কেবিন থেকে একটা পায়ের ছাপ গুদামের দিকে খানিকটা এগিয়ে আবার ফিরে গেছে। এগিয়ে যাওয়ার শেষ ছাপটা পিছল খাওয়া-আর ফিরে যাবার ছাপগুলো একটু দূরে দূরে আর আকারে কিছুটা বড় দেখাচ্ছে। অর্থাৎ কেবিন থেকে কেউ গুদামের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল, মাঝপথে কোন কারণে ভয় পেয়ে থেমেই দৌড়ে ফিরে গেছে আবার কেবিনের ভিতর।

চারদিক নিশ্চুপ। বৃষ্টি পড়ার মৃদু একটানা শব্দ ছাড়া আর কোথাও কোন শব্দ নেই।

বাড়ির ভিতরে ভয় পাবার কিছু থাকলে জিকো ওদিকে ফিরে যেত না। সুতরাং ভয়ের কারণটা ছিল বাইরে। পূর্ব আর উত্তর-পূর্ব দিক থেকে কোন ভয়ের কারণ নেই। ওদিকটা একেবারে খোলাঁ, লুকোবার কোন জায়গা নেই। দক্ষিণ পশ্চিমে লুকোবার জায়গা আছে বটে কিন্তু জাভেদ ওই দিক দিয়েই ফিরেছে, কোন কিছু তার নজরে পড়েনি। আর মাত্র দুটো সম্ভাবনাই আছে, তার একটা এতই অসম্ভব যে বাদ দিলেও চলে, কিন্তু অন্যটার সাথে আগন্তুকের গতিবিধি বেশ মিলে যায়।

মেসার উপর থেকে কারও পক্ষে জিকোর দিকে গুলি ছোঁড়া সম্ভব নয়, কারণ জাভেদ আর জিকো ছাড়া ওর উপর উঠার পথ আর কারও জানা নেই। কিন্তু কেবিনের পিছনে পাহাড়ের ঢাল থেকে কেউ গুলি চালালে, যেখান থেকে জিকো ফিরে গেছে সেই জায়গাটা দেখতে পাবে।

মনে হচ্ছে এটাই ঠিক। ওখানেই কেউ লুকিয়ে ছিল বা এখনও আছে। সে যেদিক দিয়ে ফিরেছে তাতে তাকে দেখতে পাবে না ওই লোক ওখানে বসে। গুদাম ঘরের কাছাকাছি যাওয়ার আগে লোকটা তাকে দেখতে পাবে না।

জাভেদ আস্তাবলেই আরও আধঘণ্টা অপেক্ষা করতে পারে চারদিক ভাল করে অন্ধকার না হওয়া পর্যন্ত, অথবা এখনই এগিয়ে গিয়ে ওকে একটা গুলি করার সুযোগ দিতে পারে।

যদি ধরে নেওয়া যায়, কেউ জিকোর দিকে গুলি করেছিল, তবে বুঝতে হবে সে যে-ই হোক না কেন, তাকে এবং সম্ভবত জিকোকেও হত্যা করাই ওর উদ্দেশ্য।

তবে এসবই ওর কল্পনা, সত্যি নাও হতে পারে। কিন্তু জাভেদ যখন ক্যানসাসে জেনারেল হফম্যানের অধীনে আর্মি ট্রেনিঙে ছিল, সেখানেও তাকে ঝুঁকি এড়িয়ে চলারই শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। ওখানে সীমান্ত এলাকায় সে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। এর পরেও তাকে যখন সান্তা ফে পাঠানো হয় যোদ্ধা হিসাবে, সেখানেও দুটো মারাত্মক ইন্ডিয়ান আক্রমণ গেছে ওদের উপর দিয়ে। কেবল সাবধানী ছিল বলেই এখনও বেঁচে আছে সে। দুই বৎসর টেক্সাসে কম্যাঞ্চিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে ওর।

কিছু একটা অঘটন ঘটেছে এ ব্যাপারে সে মোটামুটি নিঃসন্দেহ। হয়তো এই মুহূর্তে জিকো মারাত্মকভাবে আহত হয়ে পড়ে আছে কেবিনের ভিতরে। ওকে সাহায্য করতে গিয়ে নিজে মারা পড়া নেহাতই বোকামি হবে। জিকোকে সাহায্য করতে হলে প্রথমে বিপদটাকে সরাতে হবে তার পথ থেকে।

আস্তাবলের দরজা থেকে পিছনে সরে গিয়ে পায়ের গোড়ালিতে বসে একটা সিগারেট ধরাল সে। কেবিনের পিছনের ওই ঢালে একজন মানুষ লুকাবার জন্য প্রচুর জায়গা রয়েছে, কিন্তু একটা আস্ত ঘোড়া কিছুতেই ওখানে লুকানো যাবে না। সুতরাং লোকটার ঘোড়া নীচের পাহাড়ের গাছগুলোর ভিতরে কোথাও লুকানো থাকবে। র‍্যাঞ্চের পুব দিকে লুকানোর কোন জায়গা নেই, কিন্তু পাহাড়ের বাঁকে কিছু ছড়ানো গাছ আর ঝোঁপ আছে, আরও নীচে ঘন জঙ্গল। ওই ঢালে কোথাও নিজের ঘোড়াটাকে লুকিয়ে রেখে, যেখান থেকে এই র‍্যাঞ্চটার উপর নজর রাখা যায় তেমন জায়গায় ঘাপটি মেরে বসে অপেক্ষা করছে লোকটা জাভেদের জন্য।

একঘণ্টার মধ্যেই চারদিক আঁধার হয়ে যাবে। তখন আর ওর ওখানে বসে থাকার কোন মানেই থাকবে না। সুতরাং লোকটা নিশ্চয়ই ঘোড়ায় চেপে কোনখানে গিয়ে রাতের জন্য আশ্রয় নেবে। আগামীকাল আবার ফিরে এসে সুযোগ খুজবে।

একটা ইঁদুরও আশ্রয়ের জন্য একটার বেশি গর্তের ব্যবস্থা রাখে, আর জাভেদ তো মানুষ! আস্তাবলের পিছনের দেয়ালে আর একটা দরজার ব্যবস্থা করে রেখেছিল সে এই ধরনের বিশেষ পরিস্থিতির জন্যই। বানানোর পরে আজই প্রথম ওই দরজা ব্যবহার করার দরকার পড়ল তার। দরজাটা এমনভাবে খাপে খাপে কাটা কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে যে বাইরে থেকে দেখে কারও বোঝার উপায় নেই ওখানে একটা দরজা থাকতে পারে।

আলগোছে ওই দরজা দিয়ে বেরিয়ে আস্তাবলের পিছনে জঙ্গলের ভিতর অদৃশ্য হলো জাভেদ। ওই লোকটা যেখানে বসে আছে সেখান থেকে ওকে দেখতে পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। অত্যন্ত দ্রুত চক্রাকারে ঘুরে নিজেকে আড়াল রেখে এগিয়ে চলল সে যেখানে ঘোড়াটা লুকানো আছে বলে সে ধারণা করছে, সেই দিকে। একটা ঝোঁপের পিছনে দম নেওয়ার জন্য দাঁড়াল জাভেদ। ভুল করছে না তো? হয়তো সত্যিই পায়ে হেঁটে জিকো কোথাও গেছে।

কিন্তু কোথায়? তার ঘোড়াটা রয়েছে আস্তাবলে, বৃষ্টি পড়ছে-এর মধ্যে কোথায়ই বা যেতে পারে জিকো-আর তা ছাড়া সেই রহস্যজনক ঘোড়সওয়ারই বা কোথায় অদৃশ্য হলো?

ওই ঢালের উপর থেকে কেউ কাউকে অ্যামবুশ করে মারতে চাইলে সে নিজেও তৈরি থাকবে বিপদ দেখলে সরে পড়ার জন্য। ঘোড়াটাকে লুকালেও বেশি দূরে রাখবে না। জাভেদ ভেবে দেখল সেরকম সম্ভাব্য জায়গা মাত্র চারটে আছে। একটা হচ্ছে ঢালের উপরই পাথরে একটা বিরাট গর্ত, আর একটা যেখানে কতগুলো বড় বড় পাথর কাছাকাছি পড়ে আছে, তৃতীয়টা একফালি ঘন ঝোঁপ আর চতুর্থটা হচ্ছে ব্যাঙ্ক থেকে প্রায় দুশো ফুট নীচে পাহাড়ের মধ্যে একটা বড় খাঁজ। ওঁই খাজ থেকেই সবচেয়ে সহজে ওই ঢালে ওঠা বা নামা যায়, আর ওখান থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে পালানোও সবচেয়ে সোজা।

সমান ধারায় বৃষ্টি পড়ে চলেছে। মৃদু বাতাসে গাছের পাতাগুলো নড়ছে। বাতাসে দু’একটা ঠাণ্ডা বৃষ্টির ফোঁটা তার ঘাড় বেয়ে নীচে নামছে। বর্ষাতির নীচে তার উইনচেস্টারের মাথাটা মাটির দিকে মুখ করে ধরে পরবর্তী সুবিধাজনক জায়গার দিকে দ্রুত পায়ে সরে যাচ্ছে জাভেদ।

প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে। যে কোন সময়ে লোকটা তার ঘোড়র কাছে ফিরে আসার জন্য রওনা হতে পারে। প্রতি পদক্ষেপেই বিপদ ঘটতে পারে এখন জাভেদের। তাই ভাল করে চারদিক না দেখে একপাও এগুচ্ছে না সে।

অনেক উপরে একটা ছোট পাথর গড়ানোর শব্দ হলো।

ফাঁকা জায়গাটা একছুটে পার হয়ে বড় বড় পাথরগুলোর কাছে পৌঁছে গেল জাভেদ। কোন ঘোড়া লুকানো নেই ওখানে-কোন পায়ের ছাপও নেই। হাতে সময় খুব কম। নীচের খাজটাই সবচেয়ে সম্ভাব্য জায়গা ধারণা করে সেদিকেই এগুলো সে।

পাতায় বৃষ্টি পড়ার মৃদু শব্দ হচ্ছে। দিনের আলোকে প্রায় পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলেছে ঘনিয়ে আসা রাত্রির কালো অন্ধকার।

একটা পাথরের আড়ালে অন্ধকার ছায়ায় একটু দাঁড়াল জাভেদ। চোখ, কান, নাক-সমস্ত সত্তা দিয়েই পারিপার্শ্বিক অবস্থাটাকে যাচাই করে বুঝে নিতে চেষ্টা করল সে, তারপর আবার গাছের ফাঁক দিয়ে এগিয়ে চলল। খাজের কাছে এসে বাঁক ঘুরেই ঘোড়াটাকে দেখল জাভেদ।

পাহাড় থেকে কিছুটা বেরিয়ে এসেছে একটা পাথর, তারই নীচে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে ঘোড়াটা।

তা হলে তার ধারণাই ঠিক।

একটা পাইন গাছের গুড়ির সাথে সেঁটে দাঁড়াল জাভেদ। পুরো অন্ধকার হয়ে গেছে এখন চারদিক।

গাছের পাতাগুলোর সাথে ফিসফিস করে কথা বলছে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো। পাখিরা নড়াচড়া বন্ধ করেছে। খরগোশ আর পাখিরা বৃষ্টির মধ্যে আশ্রয় খুঁজে নিয়ে আজ রাতের মত অবসর নিয়েছে। নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছে ঘোড়াটা, তার আশেপাশের পাথরগুলো পানিতে ভিজে কালো দেখাচ্ছে।

বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে। রাইফেলটাকে এবার অন্য হাতে আলগা করে ধরল জাভেদ। ডান হাতের ঠাণ্ডা হয়ে জমে আসা আঙুলগুলোকে নেড়েচেড়ে কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনল সে। খাজটা অন্ধকারের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে, প্রায় ধরাই যায় না ওটা কোথায়। ঘোড়াটা একটু নড়ে উঠতেই ভিজে জিনটা একটু চকচক করে উঠল।

পাথরে বুটের ঘষা খাওয়ার আওয়াজ পাওয়া গেল হঠাৎ-একটা নুড়ি গড়িয়ে পড়ল।

আলতোভাবে রাইফেলটা দুহাতে কোমর পর্যন্ত তুলে ধরল জাভেদ। দরকার। হলেই তুলে দ্রুত গুলি ছুঁড়বে।

একটা মুহূর্ত নিঃশব্দে কেটে গেল। তারপরেই আবার বালির উপর পায়ের শব্দ উঠল। একটা কালো আকৃতি ছায়ার মত এগিয়ে গেল খাজটার দিকে। লোকটা তার ঘোড়ার কাছে পৌঁছবার একটু আগে মুখ খুলল জাভেদ।

কাকে খুঁজছ তুমি?

শাঁ করে ঘুরে দাঁড়াল লোকটা। একটা ছোট আলোর ঝলক জাভেদের দিক নির্দেশ করল অন্ধকারে। জবাবে উইনচেস্টারটাও তার বক্তব্য পেশ করল। বুলেটের ধাক্কাটা অনুভব করল জাভেদ গাছটার উপর। গাছের বাকল চৌচির হয়ে ছিটকে তার চোখে-মুখে লাগল। আর একটা গুলি করল জাভেদ। লোকটা যে অত্যন্ত ক্ষিপ্র আর ভাল পিস্তল চালাতে পারে তা বোঝা গেছে ওর জাভেদের কথা কানে যাওয়া মাত্র ঘুরে গুলি করা দেখে। লোকটাকে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখল সে-ঘোড়াটা নাক দিয়ে একটা শব্দ তুলে সভয়ে একটু পিছিয়ে গেল! গাছের আড়ালে আর একটু সরে গিয়ে অপেক্ষা করল জাভেদ।

বোকার মত এখনই ওর দিকে ছুটে যাবে না সে। লোকটা আসলেই গুলি খেয়ে পড়েছে না ভান করছে নিশ্চিত জানে না জাভেদ। নিশ্চল হয়ে দাড়িয়ে অপেক্ষা করছে সে। বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই।

ঘোড়াটা আবার নাক ঝাড়ল, বারুদের গন্ধ পছন্দ হচ্ছে না ওর। বাতাসে জাভেদের বর্ষাতির কোনাটা একটু নড়ে উঠল।

লালচে আগুনের শিখা দেখা গেল আবার, বর্ষাতিতে একটা টান অনুভব করল জাভেদ। সাথে সাথেই পরপর দুবার গুলি করল সে ওদিকে লক্ষ্য করে।

আবার চুপচাপ-বৃষ্টির শব্দ। অন্ধকারে চোখ সয়ে এসেছে এখন। মাটিতে পড়ে থাকা দেহটা দেখতে পাচ্ছে সে।

সে জানে লোকটা মরে গেছে, কিন্তু তবু অপেক্ষা করে রইল ও।

কাকে মেরেছে সে? কী করছিল সে এখানে, শহর আর লোকালয় ছেড়ে এতদূরে? এই জায়গাটা সে কীভাবে চিনল? মাত্র জনা ছয়েক লোক এসেছে তার র‍্যাঞ্চে এই গত চার বৎসরে

খুন করতে এসেছিল লোকটা তাতে কোন সন্দেহ নেই, কারণ তা না হলে অন্ধকারে মানুষের গলা শুনেই গুলি করে বসত না। গুলি চালানোয় পটু ছিল লোকটা। খুব চতুরতার সাথে সে ঘুর পথে অলক্ষ্যে আসতে চেয়েছিল এখানে।

মিনিটের পর মিনিট পার হয়ে যাচ্ছে কিন্তু তবু অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে রইল জাভেদ। অনেক সময়েই দেখা গেছে এসব ক্ষেত্রে যে প্রথম নড়েছে সে-ই মারা পড়েছে। অনেক দেখে ধৈর্য ধরতে শিখেছে সে। আরও কতক্ষণ পর দম বেরুনোর শব্দের সাথে মাটিতে বুট ঠোকার শব্দ শুনল জাভেদ। মরেছে লোকটা।

আর একটা গাছের পিছনে এগিয়ে এসে দাড়াল সে, আবার গুলি করার জন্য রাইফেলটা তৈরি আছে তার।

লোকটার খোলা হাতের পাশে পড়ে থাকা পিস্তলের নলটা চকচক করছে। গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে ওর দিকে এগিয়ে গেল জাভেদ। বারুদ আর রক্তের গন্ধে ঘোড়াটা বাধা অবস্থাতেই যতদূর সম্ভব পিছনে সরে গিয়ে বারবার নাক দিয়ে শব্দ করছে!

‘রও। রও।’

শান্ত ঠাণ্ডা গলা শুনে আশ্বস্ত হলো ঘোড়াটা। পশুদের পোষ মানাতে ওস্তাদ জাভেদ। ওরা কেন যেন বিশ্বাস করে তাকে। দস্যি পশুও সহজেই ওর বাগ মানে।

রাইফেলটা তৈরি রেখে পা দিয়ে গুতো দিল জাভেদ লোকটার গায়ে। কোন সাড়া পাওয়া গেল না দেখে ওকে চিত করল সে। ওর পাশে হাঁটু গেড়ে বসে বর্ষাতি দিয়ে আড়াল করে একটা ম্যাচ জ্বালাল ওর মুখের সামনে। মুখটা সামান্য হাঁ করা, খোলা চোখ দুটোতে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে।

যুবক-একুশ কি বাইশ বৎসর হবে বয়স। চিকন, লম্বা আর কঠিন একটা মুখ! ঠোঁট দুটো পাতলা, কপালটা উঁচু। পিস্তলের খাপটা নিচু করে ঝুলানো, সামনের দিকটা পায়ের সাথে ফিতে দিয়ে বাঁধা।

দেহটা তুলে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চাপাল জাভেদ, তারপর রাইফেল আর পিস্তল তুলে নিয়ে ঘোড়াটাকে হটিয়ে নিয়ে চলল তার র‍্যাঞ্চের দিকে।

র‍্যাঞ্চের আঙিনায় পৌঁছতেই দরজা খুলে লণ্ঠন হাতে বেরিয়ে এল জিকো। কাছে এসে মরা লোকটার মুখটা বাতির সামনে তুলে ধরে দেখল সে

চেনো ওকে?

না, তুমি চেনো? জানতে চাইল জাভেদ।

না, আমিও ঠিক চিনি না, তবে চেহারাটা যেন কোথায় দেখেছি মনে হচ্ছে। জিকোর কপালে একটা পট্টি দেখতে পেল জাভেদ

ওটা কি এরই কাজ?

তোমার জ্যাকেট পরা ছিলাম আমি-জায় খতম করে দিয়েছিল আমাকে, জাভেদের দিকে চাইল সে। কিন্তু ঘটনাটা কী, বলো তো?

কী জানি, কিছুই মাথায় ঢুকছে না আমার। ট্রেইলটা দেখার পর থেকে সবকিছু বর্ণনা করল জাভেদ। মনে হয় কেউ আমাকে অথবা তোমাকে খুন করতে চাচ্ছে।

একটু ভাবল জিকো। তোমাকেই, বলল সে। আমার শত্রুরা সবাই এখন মৃত। ঘোড়ার পিঠে মৃতদেহটার দিকে চেয়ে সে আবার বলল, ওকে তা হলে আগামীকাল সকালেই কবর দেব?

না, কৌতূহলী মানুষ আমি। ঘটনা পুরোপুরি জানতে হবে আমাকে। ওকে ঘোড়ার পিঠে ভাল করে বেঁধে ঘোড়াটাকে ছেড়ে দেব।

একমুহূর্ত চুপ করে থেকে জিকো সমর্থন করল ওকে। ঠিক, ওটা করার কথা মাথায় আসেনি আমার।

হয়তো বুদ্ধিটা কাজে লাগবে। ঘোড়াটা তার নিজেরও হতে পারে কিংবা ভাড়া করা হয়েছে ওটা, যা-ই হোক ঘোড়াটার বাড়ি ফিরে যাওয়াই স্বাভাবিক। আর ঘোড়াটা যদি এদিককার না হয়, তবে যেখানে সে শেষবার খাওয়া-দাওয়া করেছে, রাত কাটিয়েছে, সেখানেই ফিরবে ও।

ভালই শিখেছ তুমি, জাভেদ। ইন্ডিয়ান ফন্দি সবই আয়ত্ত করেছ।

দেহটা পরীক্ষা করে দেখল জিকো। ওর গায়ে তিনটে গুলি লেগেছে দেখা যাচ্ছে। লোকটা কঠিন ছিল বলেই মনে হয়।

ক্ষিপ্র আর চতুরও ছিল, যোগ করল জাভেদ। খুব ভাল তাক ছিল ওর। অন্ধকারে দুটো গুলি করেছিল ও, তার একটা সোজা আমার বুকে লাগত মাঝে গাছটা না থাকলে। অন্যটা আমার বর্ষাতি ফুটো করে বেরিয়ে গেছে। বন্দুকবাজ লোক, মনে হয় এই কাজের জন্যে ওকে ভাড়া করেছিল কেউ।

কে হতে পারে?

সেটাই এখন প্রশ্ন। যে লোকের ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস, কিছু না কিছু শত্রু তার চলার পথে জুটেই যায়। কিন্তু তাই বলে এমন শত্রুতা হয় না যে এত কষ্ট স্বীকার করে এই বিজন জায়গায় ধাওয়া করে আসবে খুন করতে।

দেখি, লণ্ঠন দাও তো?

ঘোড়ার মার্কাটা পরীক্ষা করে দেখার জন্য লণ্ঠন হাতে নিল সে। একটা অর্ধবৃত্তের নীচে কেবল একটা অক্ষর ‘টি’ লেখা রয়েছে, কোন মার্কা নেই। লোকটার পকেট হাতড়েও কিছু বোঝা গেল না। সামান্য কিছু টাকা রয়েছে। পকেটে, কোন চিঠি বা নামধাম পাওয়া গেল না। কিন্তু এখানে আসার একটা কিছু কারণ নিশ্চয়ই ছিল আর

জাভেদ, একটু সময় নিল জিকো কথাটা বলতে, গম্ভীর আর উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে ওর মুখ। তোমার খুব সাবধান থাকা উচিত। বোঝাই যাচ্ছে, যে ওকে পাঠিয়েছে খুব সাবধানী লোক সে। কোন প্রমাণই রাখেনি ওরা, যেন ধরা পড়লে বা মারা গেলেও কিছুই ফঁস না হয়।

ঘোড়াটার ব্যাপারে সাবধান হয়নি ওরা।

না, কিন্তু ঘোড়াটা এই এলাকার না। ও রকম ছাপ আগে কখনও দেখিনি।

সে যা-ই হোক ঘোড়াটাকে নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও খাওয়ানো হয়েছে, পানি দেওয়া হয়েছে। দানা খাওয়া ঘোড়া এটা, আমার বিশ্বাস অন্তত এই এলাকাটা চেনার জন্যেও ওকে দু’চারদিন থাকতে হয়েছে। ঘোড়াটা সেখানেই ফিরে যাবে।

সকালে ছাড়বে?

না, এখনই। ওকে এখনই ছেড়ে দেব আমরা, সকালে আমি পায়ের ছাপ দেখে পিছু নেব ওর। আকাশের দিকে চাইল জাভেদ। বৃষ্টি থেমে যাবে শিগগিরই, দাগগুলো মাটিতে থেকে যাবে, পিছু নিতে কোন অসুবিধা হবে না।

ঘোড়াটাকে দক্ষিণ মুখে কিছুটা হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়ে ওর পাছায় জোরে চাপড় কষাল জাভেদ। ঘোড়াটা একটু লাফিয়ে উঠে পিঠের বোঝা সহ রওনা হয়ে গেল ওই পথে। খুরের শব্দ মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে কেবিনে ফিরল ওরা।

কফি চড়ানো আছে চুলোয়-একটু কড়া হবে কফিটা, কেবিনে ঢুকে ঘোষণা করল জিকো।

আর কী আছে? এতক্ষণে খেয়াল করল জাভেদ সারাদিনের ধকলের পরে এখন ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত আর অবসন্ন বোধ করছে সে।

বীনস, গরুর মাংস…আর কী চাই?

লণ্ঠনটা রেখে একটা কুপি ধরাল জিকো। হ্যাট আর বর্ষাতি খুলে দেয়ালের গায়ে ঝুলিয়ে রাখল জাভেদ। তারপর চেয়ারটা টেনে আগুনের কাছে নিয়ে পা-টা একটু গরম করতে বসল সে।

ঘরটা লম্বা ধরনের। আজ অনেকবারই তার এই কেবিনের আরামের কথা মনে হয়েছে ঠাণ্ডায় বাইরে থাকার সময়ে। জাভেদের অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল এই রকম একটা ঘর আর পরিবেশে বাস করবে সে। কেবল একটা মেয়েমানুষের পরশের অভাব এখন-এ ছাড়া সবই রয়েছে এখানে। আরাম আয়েশে থাকার মত শক্ত মজবুত বাড়ি। চমৎকার দৃশ্য চারদিকে। এ ছাড়া নিজেদের নিরাপত্তার জন্যও ভাল ব্যবস্থা রয়েছে এই বাড়িতে। এইসব এলাকায় এর দরকার আছে, কারণ এখানকার মানুষ সব সময়ে আইন মেনে চলে না। জানালাগুলো চওড়া করে বানানো হয়েছে, হয়তো একদিন ওই জানালার ধারে থাকবে জিরেনিয়াম বা ওই জাতীয় কোন সুন্দর ফুল গাছ-সাদা, লাল, গোলাপী আর বেগুনী ফুল ধরবে তাতে। ঘরের ভিতর পাম্প করে পানি তোলার বন্দোবস্ত রয়েছে-কোন মেয়ের বারবার সিঁড়ি বেয়ে নেমে গিয়ে পানি টানতে হবে না।

দুটো সিংহ মেরে এসেছি আমি এবার, হঠাৎ বলল জাভেদ।

আমাদের স্টকের কী খবর?

এতদিনে চারটা কি পাঁচটা গরু মরা পড়েছে মাত্র। সম্ভবত এই সিংহগুলো নতুন আমদানী হয়েছিল। দুটোকেই একই ফাঁদে ধরেছি আমি। সিংহের দেহে শক্তি আছে প্রচুর কিন্তু মাথায় কিছু নেই। পরপর দুই রাতে একই জায়গায় একই ফঁদে ধরা পড়েছে ওরা। নেকড়ে হলে এটা সম্ভব হত না।

শক্ত কাঠামোর লোক জিকো। ইন্ডিয়ান মায়ের দিক থেকে পেয়েছে সে শক্তি, আর আমেরিকান বাপের থেকে পেয়েছে কাজে লেগে থাকার ক্ষমতা। গরম খাবারের প্লেটটা বাড়িয়ে দিয়ে কফি ঢালতে আরম্ভ করল সে। টেবিলে বসে খেয়ে নাও জাভেদ, সারাদিন পরিশ্রম করে ক্লান্ত তুমি।

শার্টের হাতা গুটিয়ে নিয়ে হাতমুখ ধুতে শুরু করল জাভেদ। তার পেশীবহুল হাত দুটো দেখা যাচ্ছে। ঘরে তৈরি সাবান দিয়ে ভাল করে ফেনা তুলে হাতমুখ ধুয়ে নিল ও। তোয়ালে দিয়ে হাত মুখ আর মাথা মুছতে মুছতেও সে চিন্তা করছে ওই অচেনা মৃত লোকটার কথা ভেবে বের করতে চেষ্টা করছে ওর এখানে। আসার পিছনে আসল উদ্দেশ্য কী থাকতে পারে।

ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল সে। ক্লান্তিতে খাওয়ার আর কোন রুচি নেই। গত দুইদিনে একশো মাইলেরও বেশি চলতে হয়েছে তাকে ঘোড়ার পিঠে, সব গরু-মহিষগুলোকে একত্র করার জন্য। অন্য একটা নতুন এলাকায় তাড়িয়ে নিতে হয়েছে ওগুলোকে তার একাই। অনেক কাজও করতে হয়েছে তাকে জলাশয় পরিষ্কার করা, নতুন গরু-মহিষের বাচ্চাগুলোকে মার্কা মারা, দুটো সিংহ ফাঁদ পেতে ধরা, তারপর একটা ভালুক শিকার করা, সবই তার একা হাতেই করতে হয়েছে।

ভাল কথা, বলে উঠল জাভেদ। আমার ঘোড়ার পিঠে করে কিছু ভালুকের মাংস নিয়ে এসেছি আমি।

থাক এখন, এই ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় নষ্ট হবে না ওটা।

সিংহের মাংস খেয়েছ কোনদিন?

অনেকবারই খেয়েছি। খুবই ভাল। প্রথম এর কথা শুনি আমি কিট কার্সনের একটা লোকের কাছে। পাহাড়ী লোকটার সবচেয়ে প্রিয় খাবার ছিল সিংহের মাংস।

নিজের কাপে কফি ঢেলে নিয়ে জিকো আবার বলল, পেট ভরে খাও, জাভেদ। আরও অনেক খাবার আছে।

পিঠে বানিয়েছ তুমি?

না। মাথা তুলে বাতাসে ভেসে আসা লোভনীয় গন্ধটা কে দেখল জাভেদ। বেয়ার সাইন?

আগেই বুঝেছিলাম গন্ধ তোমার নাকে ঠিকই যাবে। ঘরে ঢুকেই যখন তুমি জিজ্ঞেস করলে না, বুঝলাম খুব পরিশ্রান্ত তুমি। আমার মনে আছে ছোটকালে আমার মা যখন ভো-নার্ট বানাতেন, স্কুল থেকে বা বাইরে থেকে ফিরে আমি ঠিকই গন্ধ পেতাম। তা সে যত ঘণ্টা আগেই বানানো হোক না কেন আমি টের পেতামই।

কই দাও দেখি কয়টা? তুমি কোন কাজের না হলেও তোমার হাতের বেয়ার সাইন খাবার জন্যেই তোমাকে রাখতে হত আমার সত্যি, আজ পর্যন্ত কোথাও এত চমৎকারর বেয়ার সাইন কাউকে বানাতে দেখলাম না।

এমনও দিন গেছে যখন একটানা তিনদিন ধরে আমাকে কেবল বেয়ার সাইনই বানাতে হয়েছে। বানিয়ে ঠেকি লাগিয়ে দিয়েছি কিন্তু শেষ পর্যন্ত থাকেনি একটাও। লোকজন অনেক মাইল দূর থেকেও চলে আসত আমার হাতের বেয়ার সাইন খাবার লোভে।

এরপর চুপ হয়ে গেল দুজনেই।

কেউ কথা বলছে না। দুজনেই চিন্তামগ্ন। নীরবে খেয়ে চলেছে জাভেদ। হঠাৎ সে খেয়াল করল একাই খাচ্ছে ও। মুখ তুলে প্রশ্ন করল, কী হলো, তুমি খাচ্ছ না?

আগেই খেয়ে নিয়েছি আমি। ফার্মের জন্তুগুলোকে খাওয়াতে কেবিন থেকে বেরুতেই গুলি চালাল লোকটা। প্রথমে ঠিক করেছিলাম শালাকে দেখে নেব, কিন্তু যখন টের পেলাম ব্যাটা আমাকে বেকায়দায় আটকে ফেলেছে এই কেবিনে, তখন স্থির হয়ে বসে খাওয়াটা সেরেই নিলাম। ছোটকালেই শিখেছি ঘুম আর খাওয়া এ দুটো সুযোগ পেলেই সেরে নিতে হয়।

উঠে গিয়ে প্লেট বোঝাই করে ডো-নাট নিয়ে এল জিকো। সাধ মিটিয়ে খেয়ে নাও, জাভেদ। অনেক বানিয়েছি।

জিকো…লোকটা কে ছিল বলে তোমার ধারণা?

বন্দুকবাজ-কোন সন্দেহ নেই। পিস্তলের খাপ পায়ের সাথে ফিতে দিয়ে বাধা-এমন চমৎকার রাইফেল-প্রথমগুলিতেই আমার কপাল ছিলে দিয়েছে দূর থেকে-ভাড়াটে বন্দুকবাজ গুণ্ডা ছাড়া আর কেউ হতেই পারে না ও

রাইফেলটা নিয়ে যত্নের সাথে পরিষ্কার করতে শুরু করল জাভেদ। ফাঁকে ফাঁকে একবারে আস্ত এক একটা ডোনাট মুখে পুরছে বা কফিতে চুমুক দিচ্ছে।

বাড়তে বাড়তে এখন সাতশো মত দাড়িয়েছে তার গরু-মহিষের সংখ্যা। ল্যাসো দিয়ে বন্য ঘোড়া ধরে পোষ মানিয়ে বেশ ভালই একটা মাসট্যাঙ ঘোড়ার দল গড়ে তুলেছে জাভেদ। সবগুলো জম্ভকে একসাথে না রেখে বিভিন্ন পাহাড়ের ফাঁকে মাঠে চরে বেড়াবার সুযোগ করে দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় রেখেছে সে। তার আশেপাশে আর কোন র‍্যাঞ্চ নেই বলে ওদের এদিক ওদিক চলে যাবার কোন সম্ভাবনা নেই। তাই বিশাল এলাকাটা পুরোপুরি নিজের র‍্যাঞ্চের মতই ব্যবহার করছে জাভেদ। শীতকালে ফার্মের জীবজন্তুকে খাবার দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা সত্যিই কঠিন কাজ হয়ে দাড়ায়। বরফে ঘাস প্রায় সবই ঢাকা পড়ে যায়। কোথায় পাহাড়ের আড়ালে ঘাস ঢাকা পড়েনি সেসব জায়গা খুঁজে খুঁজে পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করে নিজের পশুগুলোকে সেই সব এলাকায় রেখে আসে সে।

উপযুক্ত যত্ন পেয়ে দ্রুত হারে বেড়ে উঠেছে তার পশুর সংখ্যা। আগামী বৎসর কিছু বিক্রি করবে বলে স্থির করেছে সে। অনেক খেটে আর বুদ্ধি খরচ করে পশুগুলোকে টিকিয়ে রেখেছে জাভেদ। বিরাট র‍্যাঞ্চ করে বড়লোক হতে সে কোনদিনই চায়নি-তার ছোট আস্তানাতেই তপ্ত সে

ভোরে উঠেই মোজা আর জামা পরে নিল জাভেদ। আগুনটাকে খুঁচিয়ে একটু উস্কে লকলকে আগুন তৈরি করার জন্য কিছু মোটা পাইন কাঠ চাপাল তার উপর। তারপর কেতলিতে পানি ভরে আগুনে চাপাল কফির জন্য।

শেভ করে স্নান সেরে তৈরি হয়ে নিল জাভেদ। দাড়ি রাখে না সে, কিন্তু গোফটা কাচি দিয়ে ছেটে পরিপাটি রাখাই চাই তার। আর ওটা ওকে মানায়ও খুব ভাল।

জিকো এসে ঢুকল। তোমার জন্যে প্রেটি সে সোরেলটাকে জিন ছড়িয়ে সেজে রেখেছি। দিনের অবস্থা ভালই-আকাশ পরিষ্কার য়ে এসেছে।

ধন্যবাদ, জিকো।

আমিও আসব তোমার সাথে?

না। এদিকে অনেক কাজ পড়ে আছে, আর তা ছাড়া র‍্যাঞ্চটাকে একেবারে খালি রাখা এখন ঠিক হবে না। র‍্যাঞ্চ পাহ: দাও তুমি, রাইফেলটা হাতের কাছেই রেখো আর কেবিন ছেড়ে বেশি দূরে কোথাও যেয়ো না।

দাঁত বের করে হাসল জিকো। আমি আধা ইন্ডিয়ান, ভুলে যাচ্ছ কেন?

ভুলিনি, তোমার ইন্ডিয়ান অর্ধেক ঠিকই নিজেকে সামলাতে পারবে কিন্তু তোমার আমেরিকান অর্ধেকটাকে নিয়েই ভয়!

তোমার জন্যে কিছু খাবার আর বেয়ার সাইন পোটলা করে দিয়ে দিয়েছি ঘোড়ার পিঠে।

বাকস্তিনের কোটটা পরে নিয়ে আস্তাবলের দিকে গেল জাভেদ। সোরেলটা ট্রেইল করার জন্য খুব ভাল। মরগ্যান আর মাসট্যাঙের মিলনের ফল। তাগড়া, আর বেশ ছুটতে পারে।

ঘোড়ায় চেপে বসল জাভেদ। ঘোড়ার পিঠে হাত রেখে জিকো বলল, তুমি খুব সতর্ক থেকো। ওই লোকটার মুখ চেনাচেনা বলছিলাম-খারাপ লোকজনের সাথেই ওকে আমি দেখেছি বলে মনে হচ্ছে।

জিকো অবশ্য মনে মনে জানে ওকে সাবধান করার কোন দরকার নেই। কি পাহাড়ে কি জঙ্গলে, জাভেদ যে কোন অ্যাপাচির মতই ট্রেইল অরসরণে পটু। দুই বৎসর টেক্সাসে বনরক্ষী হিসাবে বেশ নাম কিনেছিল সে। তবে ওর চিরকালের অভ্যাস, একেবারে নাচার না হলে কখনও গুলি করে না ও

মাটিতে ঘোড়ার পায়ের চিহ্ন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। গতকালের বৃষ্টির পানি অনেকটা কেটে গেছে। গতরাতে র‍্যাঞ্চ থেকে বেরিয়ে প্রথম কিছুদূর ঘোড়াটা ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটেছে, তারপর গতি কমিয়ে শেষ পর্যন্ত হাঁটা ধরেছে। কয়েকখানে বোঝা যায় ঘোড়াটা থেমে পঁড়িয়ে ইতস্তত করেছে, হয়তো পথটা সঠিক ভাবে চিনে নেবার জন্যই। গুয়াডালুপ ক্যানিয়নে নীচে নেমে সোজা ডান দিকে রওনা হয়েছে ঘোড়াটা।

স্যান সিদ্ৰো কেবল নামে মাত্র শহর। দুটো বড় আর একটা ছোট দোকান, দুটো বার-আসলে তিনটে, কিন্তু তৃতীয়টা মাঝেমধ্যে থাকার জন্য ঘর ভাড়া দেয় বলে ওরা ওই বারটাকে হোটেল বলে। আর কিছু বাড়িঘর আছে ওখানে-বেশিরভাগই কাঁচা। দুপুরের সামান্য আগেই জাভেদ শহরে পৌঁছল।

চারটে ঘোড়া বাধা রয়েছে ঘোড়া রাখার জায়গায় লোকজন কেউ নেই রাস্তায়। ঘোড়াগুলোর মধ্যে তিনটে একই মার্কার, কিন্তু মার্কাটা এই এলাকায় অপরিচিত। নিজের ঘোড়াটাকেও ওগুলোর পাশে বেঁধে রেখে বারে ঢুকল জাভেদ।

বারের ভিতর চারজন লোক বসা। দুজন জাভেদের অচেনা, তৃতীয়জন এখানকার ডেপুটি শেরিফ বব রকেটি আর চতুর্থজন ন্যাসিমিয়েনটোর ফাঁদ-পাতা শিকারী স্টিভ লোগান।

সামান্য মাথা ঝাঁকিয়ে অভিবাদন সেরে বব জিজ্ঞেস করল, কোথাও চলেছ নাকি, জাভেদ? বৎসরের এই সময়ে তোমাকে এদিকে দেখব আশা করিনি।

মাঝে মধ্যে ঘর ছেড়ে বেরুতে হয় মানুষকে, জবাব দিল জাভেদ। কৌতূহলী চোখে অচেনা দুজনকে জরিপ করে নিচ্ছে সে। লোক দুটোর শক্ত সমর্থ চেহারা কিন্তু এখানে কী করছে এরা? আশেপাশে এখানে কোথাও ওই ‘এম’ মার্কার র‍্যাঞ্চ নেই, তবে? আর তৃতীয় আর একজনের থাকার কথা, সে-ই বা কোথায়?

ডেপুটি শেরিফ ববও চিন্তা করছে। এর আগে সে দুটো আইন ছাড়া শহরে মার্শালগিরি করে এসেছে। আরও দুই একটা শহরে বিয়ের আগে সে কৃতিত্বের সাথেই শেরিফ আর ডেপুটি শেরিফের কাজ করেছে। কিন্তু বিয়ের পরে দুই ছেলেমেয়ের বাপ সে এখন-ঝামেলা আর চায় না ও, তাই ইচ্ছে করেই শান্তিপূর্ণ নিরিবিলি শহরটায় কাজ নিয়ে বদলি হয়ে এসেছে।

অস্ত্রের ব্যবহার ভালই জানে বব, নিজের কাজও খুব ভাল মতই বোঝে। সেইজন্যই জাভেদকে এত ভয় তার। রীতিমত শঙ্কিত বোধ করছে সে ওকে দেখে।

ওর মত মানুষ আগেও দেখেছে বব। বিল হিকক, কোর্টরাইট এদের দেখেছে সে, কিন্তু জাভেদ একটু অন্যরকম। অনেকটা টিলগ ম্যান, জিলেট বা জন হিউ এর মত। মনে মনে সে জানে জাভেদের মত মানুষ একবার খেপলে তাকে সামলানো সত্যিই মুশকিল।

চুপচাপ মানুষ জাভেদ। তাকে মদ খেতে খুব কমই দেখেছে বব। আজকে বারে তার উপস্থিতিতে বেশ অস্বস্তি বোধ করছে সে। নিজের কাজ সে ঠিকই বোঝে, আর সে এ-ও জানে, জাভেদের আজকের এই শহরে হঠাৎ করে হাজির হবার আসলেই কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। মাত্র দুই সপ্তাহ আগেই সে শহর থেকে তার প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে নিয়ে গেছে। দুতিন মাসের আগে তার আর নতুন সাপ্লাইয়ের দরকার হবার কথা নয়। সে যে মদ খেয়ে মাতাল হতে বা কারও সাথে দেখা করতে আসেনি তা বোঝাই যাচ্ছে। অভিজ্ঞ শেরিফ আবার মুখ তুলে জাভেদের দিকে চেয়ে দেখল-নিঃসন্দেহের বিপদ ঘনিয়ে আসার পূর্বাভাস দেখতে পাচ্ছে সে।

নিজের গ্লাসটা নিয়ে অন্যমনস্কভাবে নাড়াচাড়া করতে করতে পরিস্থিতিটা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছে বব। অস্বাভাবিক ঘটনা কি কিছু ঘটেছে? কী এমন ঘটে থাকতে পারে যার কারণে জাভেদ আজ শহরে এসেছে?

উত্তরটা নিতান্তই সোজা। তিনজন অপরিচিত লোক যারা এসেছে শহরে তাদের প্রত্যেকেই কঠিন লোক, সব কয়জনই সশস্ত্র। ওদের পোশাক সাধারণ কাজ করে খেটে খাওয়া মানুষের চেয়ে অনেক কেতাদুরস্ত। পয়সার অভাব নেই অথচ খেটে খায় না, তবে কী করে ওরা-বন্দুকবাজি? ডাকাতি?

স্টেজ কোচ এসে পৌঁছবার সময় হয়ে এল, মন্তব্য করল ডেপুটি শেরিফ।

বৎসরের এই সময়টায় খুব একটা ভিড় থাকে না স্টেজে, বারের পিছন থেকে বলে উঠল ফ্রেড। লোকজনের দোষ দেয়া যায় না এতে, বারের উপর কনুইয়ে ভর দিয়ে দাঁড়াল সে। সবাই তুষার পড়ার আগে শীতের সময় এই অঞ্চলটাকে এড়িয়ে চলে।

অচেনা দুজনের মধ্যে একজন ফিরে চাইল। খুব শীত পড়ে নাকি এখানে?

মাথা ঝাঁকাল বব তার গ্লাসের দিকে চেয়ে। জায়গাটা অনেক উঁচু। সমুদ্র থেকে প্রায় এক মাইল। এই শহর থেকেও আশেপাশের এলাকা আরও উঁচুতে। এই জাভেদের কথাই ধরো, হাতের ইশারায় জাভেদকে দেখাল বব, ওর আস্তানা তো এখান থেকে তাও আধ মাইল উঁচুতে। আর ঠাণ্ডা? তা শূন্যের নীচে চল্লিশ ডিগ্রী পর্যন্ত যেতে আমি নিজেই দেখেছি।

দরজা খুলে একজন বিশালদেহী লম্বা লোক ঘরে ঢুকল। লম্বায় হয়তো জাভেদের থেকে মাত্র ইঞ্চিখানেক বেশি হবে, কিন্তু ওজনে অন্তত তিরিশ পাউন্ড বেশি। পেশীপুষ্ট কাঁধের উপর ওর চৌকো মাথাটা বসানো। এগিয়ে এল লোকটা। ওজন তার গতির ক্ষিপ্রতা বিন্দুমাত্র খর্ব করেনি। জাভেদের দিকে চেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েও আবার পরক্ষণেই তীক্ষ্ণ চোখে ফিরে চাইল লোকটা।

কোথায় যেন তোমাকে দেখেছি আমি, বলল সে।

অসম্ভব কী? জবাব দিল জাভেদ।

এ দিকেই থাকো নাকি তুমি?

অচেনা লোক দুজন সিধে হয়ে দাঁড়াল বারের পাশে। শেরিফও সচেতন হলো।

হ্যাঁ। ছোট্ট জবাব দিল জাভেদ।

লোকটা একটু ইতস্তত করল, যেন আরও কিছু বলবে কিন্তু ঠিক সেই সময়ে বাইরে থেকে একটা উঁচু-গলার চিৎকার শোনা গেল। ঘোড়ার খুরের শব্দ তুলে স্টেজ-কোচটা দরজার বাইরে থামল।

জাভেদের মনে হলো বব যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তবু নতুন লোক তিনজন দরজা দিয়ে বেরুবার আগে সে নড়ল না।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল সে। স্টেজ-কোচটা দাঁড়িয়ে আছে দেখা যাচ্ছে। ওটার পিছনে একটা ঘোড়া বাধা।

স্টিভ ভিতরে ঢুকল, শেরিফ, বলল সে। বাইরে ঘোড়ার পিঠে করে একটা মড়া নিয়ে এসেছে ওরা।

বারের পিছন থেকে ফ্রেড বেরিয়ে এল। জাভেদ ছাড়া আর সবাই বেরিয়ে গেল কী হয়েছে দেখতে। নিজের গ্লাসটা আবার ভরে নিল জাভেদ।

কৌতূহলী চোখে স্টিভ ফিরে চাইল ওর দিকে। তুমি দেখতে গেলে না? প্রশ্ন করল সে।

আমি? চোখ তুলে ওর দিকে তাকাল জাভেদ, মরা মানুষ আগেও দেখেছি আমি। গ্লাস তুলে ঢক করে এক ঢোকে শেষ করে ফেলল সে হুইস্কিটুকু। আজ যে কেন মদ খেলো তা সে নিজেও জানে না। আসলে মর্দ খেতে বিশেষ ভাল লাগে না তার। অল্প খেলে মোটেই ধরে না তাকে। আর ধরার মত বেশি খেয়েও দেখেছে, কিন্তু সেই অনুভূতিটা ভাল লাগেনি তার।

আবার দরজাটা খুলে গেল। লোকজন ধরাধরি করে বারে পুল খেলার ছোট বিলিয়ার্ড টেবিলটার উপর রাখল মৃতদেহটা। বিশাল লোকটা ঢুকল ওদের পিছন পিছন। ওর মুখে বিস্ময় আর রাগ ফুটে উঠেছে। ফ্রেড আর ববের সাথে আর একটা লোক ঢুকল, বোঝাই যায় ওই লোকটাই স্টেজ ড্রাইভার।

এখান থেকে প্রায় মাইল দশেক আগে, বলছে স্টেজ ড্রাইভার। হঠাৎ দেখি একটা ঘোড়া আমাদের দিকে হেঁটে আসছে। ভাবলাম এটা শেরিফের দেখা দরকার, তাই তোমার কাছেই নিয়ে এলাম।

বিরক্ত মুখে মৃত লোকটার দিকে চাইল শেরিফ। তার ভাবটা এই যে কেন আবার এই ঝামেলা বয়ে আনতে গেলে তোমরা? চলেই তো যাচ্ছিল-এই দেশ ছেড়ে চলে গেলেই বা কার কী ক্ষতি হত?

তোমরা কেউ চেনো একে? প্রশ্ন করল বব।

কেউ জবাব দিল না তার প্রশ্নের। স্টিভ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইল জাভেদের দিকে। ব্যাপারটা ববের চোখ এড়াল না।

কয়েকটা গুলি খেয়েছে লোকটা, বলে উঠল ফ্রেড। আমার মনে হয় এটা গতকাল সন্ধ্যার ঘটনা। শেরিফ ওর দিকে ভুরু কুচকে তাকাতেই সে অপ্রস্তুত ভাবে একটু হাসল। যুদ্ধের সময়ে ডাক্তারদের সাথে কাজ করতে হয়েছিল আমাকে, তাই জখম সম্পর্কে কিছুটা ধারণা আছে আমার, কৈফিয়ত দিল সে

গত সন্ধ্যার ঘটনা হলে অনেক দূর থেকেও এসে থাকতে পারে ঘোড়াটা, মন্তব্য করল বব।

জাভেদ পরিষ্কার বুঝতে পারছে শেরিফের মাথার ভিতর কী চিন্তা চলেছে। সে ভাবছে, তা হলে এই ঘোড়াটা জাভেদের র‍্যাঞ্চের কাছ থেকেও এসে থাকতে পারে। অবশ্য জেমেজ থেকেও যে আসতে পারে না তা নয়-কিন্তু বব যথেষ্ট বুদ্ধি রাখে মাথায়।

সবগুলো জখমই ওর সামনের দিকে হয়েছে, মন্তব্য করল জাভেদ

সেটাই তো স্বাভাবিক, বলে উঠল স্টিভ লোগান। লোকটা যে শাইনি ডিক!

নামটা শুনেই ঝট করে ওর দিকে ঘুরে দাঁড়াল বব। বলো কী! কিন্তু সে তো একজন নামকরা ভাড়াটে খুনী, ও এদিকে আসতে যাবে কেন?

তা আমি কী করে বলব? কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল স্টিভ। হয়তো কেউ তার কোন শত্রুর পিছনে পাঠিয়েছিল ওকে।

ডিক নিশ্চয়ই অন্তত পাঁচ-ছয়জনকে ঘায়েল করেছে মরার আগে, বলল ফ্রেড।

সেটা সবাই জানে, ওকে সমর্থন করল স্টিভ। কতজনকে যে ও খতম করেছে গত সন্ধ্যায় কে বলতে পারে?

বিশাল দেহ লোকটা স্টিভের দিকে ফিরে ধমকে উঠল, চুপ করো, বেশি কথা বলছ তুমি!

কেন তোমার পছন্দ হচ্ছে না? মোলায়েম স্বরেই জিজ্ঞেস করল স্টিভ। ফুটখানেক লম্বা শিকারের ছুরিটা আনমনে নাড়াচাড়া করছে সে।

থামো তো তোমরা, বাধ সাধল শেরিফ। জাভেদ বুঝন উপযুক্ত শেরিফ বব, গোলযোগের গন্ধ ঠিকই টের পেয়েছে লোকটা।

দরজা খুলে একটা লোক ঢুকেই বিশাল লোকটাকে সমোধন করে বলল, ম্যাট, মিস পেজ যাবার জন্যে তৈরি, গাড়ি নিয়ে এসেছি আমি।

ওদের সাথে জাভেদও বেরিয়ে এল রাস্তায়, পিছন পিছন ববও এল।

একজন লম্বা যুবক মেয়েটাকে স্টেজ থেকে নামতে সাহায্য করছে। গাঢ় বাদামী রঙের চুল মেয়েটার। জাভেদ ওর দিকে তাকাতেই মেয়েটাও চোখ তুলে চাইল-সবুজ চোখ ওর। মিস পেজকে সাথে করে এক্কাগাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল লোকটা। ম্যাটও যোগ দিল ওদের সাথে। ম্যাট লোকটাকে কী যেন বলতেই সে কুদ্ধ চোখে কটমট করে ফিরে তাকাল তার দিকে। ম্যাটকে বকাঝকা করল লোকটা নিচু স্বরে, মেয়েটা নীরবে দাঁড়িয়ে শুনছে।

মনস্থির করে ফেলেছে বব। সে ওদের দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, তোমরা কি এখানে বসবাস করবে বলে ঠিক করেছ?

ম্যাট ঘুরে ববের দিকে ফিরে জবাব দিল, হ্যাঁ, আমরা আপাতত ডেভিডের বাড়িটা ভাড়া নিয়েছি, আমাদের গরু-মহিষগুলো এসে পৌঁছলেই আমরা ভাচে ক্রীকের দিকে সরে গিয়ে র‍্যাঞ্চ খুলব।

বব কী যেন বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই জাভেদ বলে উঠল, ওদিকে র‍্যাঞ্চ পাওয়ার কোন আশা নেই তোমাদের।

সবার চোখ জাভেদের উপর পড়ল।

কেন আশা নেই জানতে পারি? উদ্ধত কণ্ঠে জানতে চাইল ম্যাট।

কারণ, কাজ সারতে পারেনি সে, শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল জাভেদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *