০১. খুনের দায় – প্রথম পরিচ্ছেদ

ভারী জুতোর গটমট শব্দ তুলে কামরায় ঢুকল লোকটা। ফাইল থেকে চোখ তুলে একনজর দেখেই চিনতে পারল রানা। বেশ লম্বা-চওড়া, বয়স কম-বেশি পঞ্চাশ, খেলোয়াড়ি একটা ভাব আছে চেহারায়, মাথাজোড়া বিশাল টাক, নীল চোখ, পরনে ভাল দরজির তৈরি দামি পোশাক। ‘মিস্টার মাসুদ রানা, ছোট্ট একটা কাজ নিয়ে এসেছি আপনার কাছে। আমাকে মনে আছে তো? লইয়ার অ্যাডাম ক্লিপটন-ও-ও-ই যে, বছর খানেক আগে সেই পাগলি অলিভা-র কেসে মাফিয়া ডন মারিয়ো মারকাস আর সলিসিটার হাওয়ার্ড ব্লেচারের পক্ষে লড়েছিলাম…’

‘কিন্তু জিততে পারেননি, জেল খাটতে হয়েছে ওদেরকে।’ হাসিমুখে বলল রানা, ‘আপনার তো কোনও কাজে আমার কাছে আসার কথা নয়, মিস্টার ক্লিপটন।’

‘আপনার যোগ্যতাই টেনে এনেছে আমাকে, মিস্টার রানা। অতীতের কোনও কথা মনে রাখি না আমি,’ বলে রানার চেয়ারের পাশে দাঁড়ানো বড়জোর সাড়ে চার ফুট লম্বা, কালো, পাটকাঠির মত শুকনো লোকটার দিকে ভ্রূ কুঁচকে চাইল লইয়ার। ‘এই পিওনটাকে এখান থেকে ভাগানো যায়? একটা গুরুত্বপূর্ণ…’ রানাকে মাথা নাড়তে দেখে থেমে গেল সে।

‘না,’ বলল রানা দৃঢ়কণ্ঠে। ‘ইনিই নিউ ইয়র্ক শাখার বর্তমান চিফ। ইনি থাকবেন। যা বলতে এসেছেন, এঁর সামনেই বলুন।’ আবছা ইঙ্গিতে দু’জনকেই বসতে বলল রানা।

‘ডেঁড়িয়ে থাকতেই ভাল্লাগচে, সার!’ বলল বত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পনড়ব বেঁটে লোকটা। ক্যালক্যাটা থেকে বাংলাদেশে মাইগ্রেট করা দাগী চোর ছিল সে একসময়। জেল খেটেছে জীবনের বেশিরভাগ সময়। সব ছেড়ে রানার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে মানুষটা একসময় ভালবাসার বাঁধনে। রানাকে এতই ভক্তি করে যে ওর সামনে কিছুতেই চেয়ারে বসবে না গিলটি মিয়া। ‘কিচু মনে করবেন না, সার। সেই সক্কাল থেকে তো বসেই আচি…’

আর একবার গিলটি মিয়ার উপর অসন্তুষ্ট দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে রানার সামনের চেয়ারে বসল লইয়ার ক্লিপটন। বড় একটা শ্বাস ফেলে বলল, ‘একজন লোককে খুঁজছি আমি। এটাই কাজ।’

‘এই কাজ নিয়ে আমাদের কাছে এসেছেন কেন? পুলিশকে জানান। কিংবা কোনও প্রাইভেট আই-কে দিন কাজটা।’

‘এটা পুলিশের কোনও ব্যাপার নয়, মিস্টার রানা,’ যেন রানার নিরাসক্তি হতাশ করেছে ওকে। ‘কী ব্যাপার, কাজ দরকার নেই নাকি আপনাদের?’

‘কাজের অভাব নেই, আবার তেমন একটা চাপও নেই। আসল কথা, এটা আমাদের লাইনের কাজ নয়।’

‘যা চাইবেন সেই ফি পেলে কি আপনি…’

‘আমাদের ফি সম্পর্কে ধারণা আছে আপনার?’

মাথা নাড়ল লইয়ার। ‘বলুন, কত দিতে হবে আপনাকে?’ গিলটি মিয়ার দিকে ফিরল রানা। ‘শোনাও দেখি, কত পেলে করবে তুমি কাজটা?’

লোকটার উপর চোখ বুলাল গিলটি মিয়া। মনে মনে বলল, ‘নাহ্‌! এ-লোককে এট্টুও পচোন্দ হচ্চে না আমার!’ মুখে বলল, ‘সব কতা না শুনে, কদ্দিনের কাজ না জেনে নিদ্দিষ্ট কিচু তো বলা যাচ্চে না, সার। একটা ধারণা দিতে পারি বড়জোর। আমাদেরকে লিলে পেত্যেক দিনের লেগে দু’ থেকে পাঁচ হাজার টাক-, থুড়ি, ডলার মজুরি গুনতে হবে। আগাম দিতে হবে দু’দিনের ফিশ।’

কথাগুলো অবশ্য বাংলায় বলেনি ও, নিউ ইয়র্কের সাদা লোকগুনো বাংলা বোজে না। তাই ইংরেজি-বাংলা-হিন্দি- জার্মান-ফ্রেঞ্চ-ইটালিয়ান, মোটকথা পৃথিবীর তাবৎ ভাষা মিলিয়ে কাজ চালানোর মত নিজের একটা বুলি তৈরি করে নিয়েছে ও। আর আশ্চর্য হলেও সত্যি, ওর কথা বুঝতে কারও অসুবিধে হয় না, সবাই কী করে জানি বুঝে নেয় ওর বক্তব্য। এই লোকও বুঝেছে।

‘অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে না?’ ফি-র বহর শুনে ভিরমি খেল লইয়ার। ‘শুনে তো মনে হচ্ছে, আইন ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে এরকম একটা অফিস নিয়ে বসলেই ভাল করতাম।’

‘আপনাকে আঁটকাচ্চে কে? সেইটেই করুন না, মিশটার,’ একগাল হেসে নিষ্পাপ চোখ মেলে বলল গিলটি মিয়া।

‘আপনার এই কেস লিয়েই আরাম্ব কত্তে পারেন গোয়েন্দাগিরি।’ গিলটি মিয়ার দিক থেকে চোখ সরিয়ে রানার মুখের দিকে চাইল ক্লিপটন। ‘ঠিক আছে, উপযুক্ত ফি দিতে রাজি আছি আমি। ব্যাপারটা হয়েছে কী…’

‘প্লিজ, ওর সঙ্গে যান। ওর অফিসে বসে কাজটা বুঝিয়ে দিন। খাতায় নোট নিতে হবে ওর, অগ্রিম টাকা নিয়ে রসিদও দেবে ও-ই। আমার ধারণা, দু’দিনের বেশি লাগবে না ওর এই কাজে।’

‘কিন্তু আপনি শুনবেন না…’

‘শুনব। এই ঘর থেকে আপনাদের সব কথাই শোনা যাবে।’ দেয়ালে বসানো স্পিকার দেখাল রানা ইঙ্গিতে। ‘কাজটা ও-ই করবে, তবে কাজ শুরু হওয়ার পর প্রয়োজনে আমার পরামর্শ নেবে। যান।’

মাস দুয়েকের জন্য গিলটি মিয়াকে রানা ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির নিউ ইয়র্ক শাখার দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছে ঢাকা থেকে। যদিও এই দেশটা ওর পচোন্দো নয়, রানার নির্দেশে আসতেই হয়েছে বাদ্য হয়ে। ক্লিপটনকে সঙ্গে নিয়ে নিজের কামরায় ফিরে বিশাল সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওপাশে বসল সে রিভলভিং চেয়ারে। আইনজীবী বসল সামনের গদিমোড়া চেয়ারে। বার দুই দোল খেয়ে নিয়ে বেল টিপল গিলটি মিয়া। জিজ্ঞেস করল, ‘কী খাবেন, মিশটার আদম? চা না কপি?’

সামনের লোকটা মাথা নাড়ছে দেখে বেয়ারাকে বলল, ‘কেবিন সায়েবকে পেঠিয়ে দাও দিকিন।’

ক্যাভিন এসে বাউ করতেই তার দিকে কলম আর প্যাড এগিয়ে দিল গিলটি মিয়া। ‘এ ভদ্দরনোক যা বলেন, লিকে ল্যাও তো, ভাই। জানই তো, আমি এক্কেবারে বকলম; আবার এ-ও জান, পড়তে পারি সব। কাজেই সাবদানে লিকবে, স্যাঙাৎ, কিচু যেন ছুটে না যায়। ঠিক আচে?’

‘ইয়েস, বস্‌,’ বলে একটা চেয়ারে বসে পড়ল স্যাঙাৎ। গত দেড়টি মাস গিলটি মিয়াকে পরম গুরু মেনে নিয়ে মন দিয়ে শিখছে ক্যাভিন হাওয়ার্ড গোয়েন্দাগিরির নিত্যনতুন, অভূতপূর্ব সব কৌশল।

শুরু করল অ্যাডাম ক্লিপটন।

‘আমি খুঁজছি রবার্ট স্ট্যানলি নামের এক লোককে। বছর দেড়েক আগে স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে মোট বিশ লাখ ডলারের সম্পত্তি রেখে মারা গেছেন এই লোকের চাচা, আর্থার হেনরি। উইলে এই রবার্ট স্ট্যানলিকে দিয়ে গেছেন তিরিশ হাজার ডলার। তখন থেকেই উইলের এগজিকিউটার হিসেবে খুঁজছি আমি ওই লোককে। ওকে না পেলে উইলটা কার্যকর করা যাচ্ছে না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর মাসকয়েক আগে লোকটাকে লোকেট করা গেল ফ্রান্সের নিস-এ। জানা গেল, স্ট্যানলি ওখানে হিপ্পি আদর্শের গাঁজা খাওয়া বিদ্রোহী এক অখ্যাত তরুণ পেইণ্টার। সঙ্গে সঙ্গে আমি এয়ারমেইলে চিঠি দিয়ে তাকে জানালাম তার প্রাপ্য টাকার কথা, ওটা নেয়ার জন্যে ওকে এখানে আসতে হবে, তা নইলে অন্যান্য ভাগীদারদের কাউকেই সম্পত্তির ভাগ দেয়া যাচ্ছে না। সাধারণ ডাকে উত্তর এল সেচিঠির। ও জানতে চায়: টাকাটা পাঠিয়ে দিলে কী হয়, কেন ওকে কষ্ট করে নিউ ইয়র্কে যেতে হবে। বার কয়েক চিঠি চালাচালির পর শেষ পর্যন্ত সপ্তাহ দুয়েক আগে প্লেনে উঠেছিল ও এখানে আসবে বলে। তুমি… আপনি হয়তো খবরটা পড়েছেন, প্লেনটা কেনেডি এয়ারপোর্টে ক্রাশ করে আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়।’

‘লে হালুয়া! তাহালে ওকে আর এই দুনিয়ায় খুঁজে লাব কী? ওপারের কোনও ডিটেকটিবকে…’

‘খবরের কাগজে লিখেছে: ওই দুর্ঘটনায় যে তিনজন প্রাণে বেঁচেছিল, স্ট্যানলি তাদের একজন।’

‘ও, তা-ই বলুন, বেড়ালের জান। তারপর?’

‘পিছনের দিকে সিট পেয়েছিল ও। অ্যাকসিডেণ্টের ধাক্কায় প্লেনের লেজটা খসে যাওয়ায় ছিটকে বাইরে পড়ে আগুন আর মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গিয়েছে।’

‘হাঁ। কপালের জোর আচে বলতে হবে। পঁচালব্বই জনের মদ্যে বেরালব্বই জনই যকোন খতম, তকোন এটাকে কপাল ছাড়া আর কী বলা যায়, বলুন।’

লইয়ার বুঝে নিল, সব খবরই রাখে এই পিচ্চি জোকার-একে ছোটনজরে দেখা ঠিক হবে না।

‘কাছেই ব্রুক হাসপাতাল, সেখানে নিয়ে যাওয়া হলো ওকে। দেখা গেল, নিশ্চিত মৃত্যুর কবল থেকে বেঁচে যাওয়ায় কিছুটা উদভ্রান্ত, কিন্তু সারা শরীরে কোথাও কোনও জখম নেই ওর। এটা জেনে পরদিন সকালে হাসপাতালে ফোন করে ওর সঙ্গে কথা বলতে চাইলাম। ওরা বলল: হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই বাইরে কোথাও ফোন করেছিল ও, কয়েক মিনিটের মধ্যে এক সুন্দরী মহিলা এসে নিয়ে গেছে ওকে। এরপর থেকে আর কোনও খবর নেই-হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে রবার্ট স্ট্যানলি। কয়েকটা কাগজে বিজ্ঞাপন ছেপে কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি।’

‘খবর লিয়ে দেকেচেন, এই ইস্ট্যানলি ওর পরিবারের লোকেদের সাতে যোগাযোগ করেচে কি না?’

‘করেনি। এ হচ্ছে সম্পত্তির মালিক পরলোকগত আর্থার হেনরির ছোট ভাইয়ের পোষ্যপুত্র। পরিবারের কেউ ওকে দু’চোখে দেখতে পারে না। ছোটবেলা থেকেই নাকি বেয়াড়া কিসিমের ছিল রবার্ট, কারও সাথেই পড়তা পড়ত না। ওর পালক বাপ-মা সাত বছর আগে রোড অ্যাক্সিডেণ্টে মারা যাওয়ার পর আরও বেপরোয়া হয়ে যায় ও, কিছুদিনের মধ্যে চলে যায় দেশ ছেড়ে, তারপর থেকেই লাপাত্তা। আর্থার হেনরির মৃত্যুর পর সঙ্গত কারণেই তাঁর উত্তরাধিকারীরা অস্থির হয়ে উঠেছে তাদের প্রাপ্য বুঝে নেওয়ার জন্যে; অনেক টাকার ব্যাপার তো, সারাক্ষণ খোঁচাচ্ছে আমাকে।’

চুপচাপ খানিকক্ষণ চিন্তা করল গিলটি মিয়া। তারপর বলল, ‘কত বললেন? তিরিশ হাজার? বেকার এক আটিশের লেগে এ তো অনেক টাকা। বে থা করেচে?’

‘না, আমি যদ্দূর জানি, করেনি। আমি আসলে চিনি না ওকে, একটা ফটো পর্যন্ত দেখিনি। পরিবারের সবাই শেষ দেখেছে ওকে বহু বছর আগে, ওর যখন চার বছর বয়স। ওর পালক বাপও কিছুটা উদ্ভট কিসিমের লোক ছিল, বিয়ে করেছিল এক রেড ইণ্ডিয়ান মেয়েকে। ওর চাচা যে মনে করে ওকে উইলে কিছু দিয়ে গেছে, তা দেখে পরিবারের সদস্যরাই শুধু নয়, আমিও তাজ্জব হয়ে গেছি। কারও সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখেনি বলেই ওকে খুঁজে বের করতে এত সময় লেগেছে আমার।’

‘ওর খোঁজ পেলেন কী করে, মিশটার আদম ব্যাপা… থুড়ি, কিলিপটন?’

‘আমি না, ওরই এক কাজিন কাগজে ওর নামটা দেখে আমাকে ফোন করেছিল। নিসের আমেরিকান কনসুলেটের সামনে পিকেটিং করছিল কয়েকজন আর্টিস্টকে সঙ্গে নিয়ে। পুলিশ বেঁধে নিয়ে যায় ওদের। আন্দাজে ভর করে একটা চিঠি ছেড়ে দিলাম। জানা গেল, এ-ই সেই লোক। এত লেখালিখির পর একটি মাত্র তথ্য জানা গেছে ওর সম্পর্কে-ওর বয়স ছাব্বিশ বৎসর, ব্যস, আর কিচ্ছু না।’

‘আপনার এ তথ্য মোটেই কাজের কিচু লয়, আদম সায়েব। ঠিক আচে, আমরা চেষ্টার তুটি করব না, তবে পেত্যেকদিনের লেগে খরচ পড়বে আপনার আড়াই হাজার করে। একোন বুজে দেকুন, রাজি?’

‘বেশ। ওর খোঁজ পেলেই আমাকে জানাবেন।’ উঠে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে মোটাসোটা একটা ওয়ালেট বের করে নিজের ভিজিটিং কার্ড আর দু’দিনের ফি গুনে দিল লোকটা ক্যাভিনের হাতে। সঙ্গে সঙ্গে একটা রসিদ লিখে দিল ক্যাভিন। রসিদ নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবার আগে নীল চোখের দৃষ্টি রাখল লোকটা গিলটি মিয়ার উপর। ‘কাজটায় গোপনীয়তা বজায় রাখলে খুশি হব।’ ‘কী বললেন?’ জিজ্ঞেস করেই নিজেকে সামলে নিল গিলটি মিয়া। ‘ঠিক আচে, তাই হবে।’

অ্যাডাম ক্লিপটন বেরিয়ে যেতেই রানার কামরায় এসে ঢুকল গিলটি মিয়া। দেড়মাস পর রানাকে দু’দিনের জন্য একা পেয়েছিল, মোটকু লোকটা এসে বাজে একটা কাজ চাপিয়ে দিয়ে সব ভজকট করে দিয়ে গেল বলে বিরক্ত।

‘কী বুজলেন, সার? বাজে সোমায় নষ্ট না?’

‘কীভাবে এগোবে ভাবছ?’ পাল্টা প্রশড়ব করল রানা।

‘সেই তো থোড়-বড়ি-খাড়া আর খাড়া-বড়ি-থোড়! হাঁসপাতাল থেকে শুরু কত্তে হবে একোন। জানা দরকার ছোকরা ওখেন থেকে পালাই-পালাই করল কেন, গেলই বা কার সাতে, কোতায়। সাঁজ তো হয়ে এল, ভাবচি, এখুনি একবার গিয়ে খোঁজ লিয়ে আসি।’

‘চলো, আমিও যাব তোমার সঙ্গে,’ সামনের ফাইলটা বন্ধ করে আউট ট্রে-তে নামিয়ে রেখে বলল রানা। ‘তার আগে, দাঁড়াও দু’টো টেলিফোন সেরে নিই।’

একটা ক্রেডিট রেটিং হাউসে ফোন করে এক বন্ধুকে দুটো নাম দিয়ে তাদের রেটিং জানাবার অনুরোধ করল রানা। প্র ম নামটা নিউ ইয়র্কের অ্যাডাম ক্লিপটন, দ্বিতীয়টা নিস-এর রবার্ট স্ট্যানলি। এরপর নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক পরিচিত সাংবাদিকের কাছ থেকে জেনে নিল প্লেন ক্রাশের সঠিক সময়টা।

ব্রুক হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ডিউটি অফিসারকে রানা এজেন্সির লাইসেন্স দেখিয়ে ওদের আগমনের উদ্দেশ্য জানাল রানা। বলল: রবার্ট স্ট্যানলিকে দরকার তার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্য ত্রিশ হাজার ডলার বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে লোকটা কোথায় যে হাওয়া হয়ে গেল, খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। দুর্ঘটনার দিন যেসব ডাক্তার-নার্স ডিউটিতে ছিলেন তাঁদের সঙ্গে কথা বলা গেলে হয়তো কিছু সূত্র পাওয়া যেত। সব শুনে ভদ্রলোক ইণ্টারকমের মাধ্যমে ব্যবস্থা করে ওদের সঙ্গে একজন ওয়ার্ড-বয়কে দিলেন ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেয়ার জন্য।

নার্স দুজনের কাছ থেকে রবার্ট স্ট্যানলির চেহারার একই বর্ণনা পাওয়া গেল: লম্বা, স্পোর্টসম্যানের মত একহারা গড়ন, ওজন পঁচাত্তর কেজির মত, কালো চুল, সাদামাটা চেহারা। আন্দাজ, ত্রিশের মত হবে বয়স। কোটের বেশ কিছু অংশ পুড়ে গিয়েছিল। ডাক্তার বললেন, ‘রবার্ট স্ট্যানলির শরীরে কোথাও কোনও আঘাত বা জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কেবল কিছুটা নার্ভাস দেখাচ্ছিল। বলল: ব্যথা অনুভব করছে না, সেডেটিভের কোনও প্রয়োজন নেই। ঘণ্টাখানেক পর একটু সুস্থির হয়ে বাইরে কোথায় যেন ফোন করল। বিশ মিনিটের মধ্যেই বছর পঁচিশেকের সুন্দরী এক মহিলা এসে দেখা করল ওর সাথে। তারপর ডাক্তারদের কারও বারণ না মেনে চলে গেল ও মেয়েটির সঙ্গে-কোথায়, কে জানে!’

‘বেডে শুয়েই ফোন করেছিল?’ জানতে চাইল রানা। ‘হ্যাঁ।’

‘গুড। তা হলে তো নিশ্চয়ই কোথায় ফোন করেছিল তার রেকর্ড রয়েছে সুইচবোর্ডে। নম্বরটা আমাকে দেওয়া যাবে?’ ‘নিশ্চয়ই।’

নম্বরটা নিয়ে ফিরে এল ওরা এজেন্সির অফিসে। গিলটি মিয়া বলল, ‘কেবিনের এক বন্দু আচে, সার, টেলিফোন কোম্পানিতে।’

‘বেশ, ডাকো ওকে।’

ইনভেস্টিগেশনে ওর সাহায্য দরকার শুনে বত্রিশ পাটি দাঁত বেরিয়ে পড়ল ক্যাভিন হাওয়ার্ডের। তিন মিনিটের মধ্যে জানা গেল নম্বরটা ফিলিপ শেফার্স নামে এক লোকের, ঠিকানা: ১৪৪২/ডি, পিজিয়ন লেন, কুইন্সভিল রেসিডেনশিয়াল এরিয়া, নিউ ইয়র্ক।

রানা জানে, ওখানে নিমড়ব-মধ্যবিত্তদের বাস। রাস্তার দু’পাশে ছোট ছোট অনেকগুলো একতলা বাড়ি আছে ওখানে লাইন দিয়ে।

‘চলো, বাড়িটা চিনে আসা যাক,’ বলল রানা। ক্যাভিনের দিকে চেয়ে হাসল, ‘তুমিও চলো।’

উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল ছোকরা। চোখদুটো জ্বলছে সন্ধ্যাতারার মত। সোজা কথা? রানা এজেন্সির চিফের সঙ্গে চলেছে সে একটা কেসের সমাধানে, তাঁকে সাহায্য করতে! বাপরে, বাপ!

নম্বর মিলিয়ে চিনতে অসুবিধে হলো না। বাড়িটার সামনে ছোট্ট লন। দরজা বন্ধ। ধীর গতিতে গাড়ি চালিয়ে পুরো এলাকাটা একবার ঘুরে দেখে চলে এল ওরা অফিসের কাছাকাছি এক রেস্তোরাঁয়। এখানে ভাল বাংলাদেশী রানড়বা পাওয়া যায়। খাওয়ার পর গিলটি মিয়া ও তার সাকরেদকে বিদায় দিয়ে সেঁটে একটা ঘুম দেবে বলে চলে গেল রানা নিজের অ্যাপার্টমেন্টে। ঠিক হলো, আগামীকাল সকাল থেকে শুরু হবে ওদের কাজ। দায়িত্বে থাকবে গিলটি মিয়া, সহকারী ক্যাভিন হাওয়ার্ড। দুই দিনের মধ্যে খুঁজে বের করতে হবে স্ট্যানলিকে। কাজটার শেষ দেখেই রানা চলে যাবে লস অ্যাঞ্জেলেস শাখা পরিদর্শনে।

পরদিন সকাল দশটায় ফোন করল রানা ক্রেডিট অফিসে। এরা এফবিআই-এর চেয়েও ভাল রেকর্ড রাখে। বন্ধু জানালো, ‘রবার্ট স্ট্যানলির উপর কোনও রেকর্ড নেই; তার মানে লোকটা বাউণ্ডুলে, বাঁধা কোনও চাকরি বা কাজ নেই-অর্থাৎ, ক্রেডিট রিস্ক। তবে ওই অ্যাডাম ক্লিপটনকে ধার দিলেও ঠকবি। একটা অ্যাপ্লায়ান্স স্টকে বড় দান মারতে গিয়ে আচ্ছা ধোলাই খেয়েছে লোকটা বছরখানেক আগে। আইন ব্যবসায় ওর রোজগার বছরে বড়জোর বিশ হাজার ডলার, কিন্তু খরচ করে তার দ্বিগুণেরও বেশি-বাড়ি রয়েছে শহরতলির ধনী এলাকায়, দুটো গাড়ি এবং একটা খরুচে বউ পোষে, গোটা দুই অভিজাত ক্লাবের মেম্বার। দেনায় গলা পর্যন্ত ডুবে আছে লোকটা। মাস কয়েক আগে শেয়ার মার্কেটে বেশ ভাল একটা দান মেরে কিছু কিছু ঋণ শোধ করেছে। কিন্তু এখনও প্রচুর দেনা। ধনী পরিবারে জন্ম। নিঃসন্তান এক কাকা মারা গেলে উত্তরাধিকার সূত্রে অনেক টাকার মালিক হবে। কিন্তু কাকাটা কিছুতেই মরছে না, ঊনআশি বছর বয়সেও পাল্লা দিয়ে নিয়মিত টেনিস খেলে চলেছে ছেলে- ছোকরাদের সাথে। ভাতিজার চেয়ে অনেক ফিট। বুঝলি এখন?’

‘হুঁ,’ বলল রানা। ‘শোন্‌, আরেকজনের ক্রেডিট রেটিং জানা দরকার। নামটা হচ্ছে: ফিলিপ শেফার্স। নিউ ইয়র্কেই, কুইন্সভিল রেসিডেনশিয়াল এরিয়ায় থাকে। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে বলতে পারবি না?’

‘দশ মিনিটেই পারব। যখন খুশি রিং দিস্‌, অফিসেই আছি।’

বন্ধুকে ধন্যবাদ জানিয়ে রিসিভার নামিয়ে রাখল রানা। সকাল সাতটায় ক্যাভিনকে নিয়ে বেরিয়েছে গিলটি মিয়া। রানাকে কাজ দেখিয়ে সন্তুষ্ট, এবং স্যাঙাৎকে মুগ্ধ করবার সুযোগ পেয়ে টগবগ করে ফুটছে সে উৎসাহ, উত্তেজনায়। একটা ফাইল টেনে নিয়ে মন দিল রানা সেটায়। মুচকি হাসল ক্যাভিনের লেখা গিলটি মিয়ার মন্তব্য পড়ে: ওর ধারণা, ওই কেসের দজ্জাল বুড়িটাকে যদি পা বেঁদে উল্টো করে ঝুলিয়ে দোয়া যেত, তাহালে সত্যি কতাটা বেরিয়ে আসত নির্ঘাত!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *