০১. ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চল

আইভানহো – স্যার ওয়ালটার স্কট

স্যার ওয়ালটার স্কটের জন্ম ১৭৭১ সালে, স্কটল্যান্ডের এডিনবরায়। মাত্র দেড় বছর বয়সে তিনি হাড়ের অসুখে আক্রান্ত হন, পরিণামে চিরদিনের জন্যে একটা পা তাঁর খোঁড়া হয়ে যায়। পনের বছর বয়স হওয়ার আগেই পাঠ্যতালিকার বাইরে প্রচুর বই তিনি পড়ে ফেলেন এবং ইতিহাস ও স্কটল্যান্ডে প্রচলিত গল্প-গাথার ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। একুশ বছর বয়েসে তিনি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বাবাকে খুশি করার জন্যে এখানে তিনি আইন শাস্ত্র নিয়ে লেখাপড়া করেন। অবসর সময়ে তিনি ইতিহাস পড়তেন বা স্কটিশ লোক-কাহিনী সগ্রহ করতেন।

১৭৯৭ সালে জনৈক ফরাশি উদ্বাস্তুর কন্যাকে বিয়ে করেন ওয়ালটার স্কট। মেয়েটির নাম শার্লট শারপেনটিয়ের। ১৭৯৯ সালে সেলার্কশায়ারের শেরিফ নিযুক্ত হন স্কট।

১৮০৫ সালে প্রথম উপন্যাস লেখায় হাত দেন ওয়ালটার স্কট। নাম ওয়েভারলি। কিছুদূর লেখার পর উপন্যাসটি ফেলে রাখেন তিনি। শেষ করেন প্রায় দশ বছর পর ১৮১৪ সালে। সেই বছরই বইটি প্রকাশিত হয়, এবং অভাবনীয় জনপ্রিয়তা লাভ করে।

১৮১৮ সালে স্যার উপাধিতে ভূষিত করা হয় ওয়ালটার কটকে। ১৮৩২ সালে মারা যান এই অমর ঔপন্যাসিক।

.

ভূমিকা

এ কাহিনীর শুরু ইংল্যান্ডে, আজ থেকে প্রায় সাড়ে সাতশো বছর আগে, ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে। নরম্যান রাজা সিংহ-হৃদয় রিচার্ড তখন ইংল্যান্ডের সিংহাসনে। যখন এ কাহিনীর যবনিকা উঠছে রিচার্ড তখন দেশের বাইরে, মুসলমানদের হাত থেকে পবিত্র নগরী জেরুজালেম উদ্ধারের জন্যে যুদ্ধ করছেন প্যালেস্টাইনে। তার হয়ে ইংল্যান্ড শাসন করছেন তার ভাই জন। ইংল্যান্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণ স্যাক্সন গোত্রের লোক। তারা মোটেই খুশি নয় জনের শাসনে। এর প্রধান কারণ স্যাক্সনদের প্রতি তার নির্দয় আচরণ।

আরেকটা কারণে জনসাধারণ বিক্ষুব্ধ। প্রায় দুশো বছর আগে ১০৬৬ সালে ইংল্যান্ড দখল করে নরম্যানরা। ফ্রান্স থেকে আসা এই জাতি খুব শিগগিরই রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের সর্বস্তরে স্যাক্সনদের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ইংল্যান্ডের বেশির ভাগ বড় সরকারি পদ, জমিদারী দখল করে বসে তারা। এবং স্থানীয় স্যাক্সনদের নিচু শ্রেণীর মানুষ হিশেবে গণ্য করতে থাকে। এই কারণে স্যাক্সন ও নরম্যানদের ভেতর অবিশ্বাস এবং রেষারেষি লেগেই থাকতো। জনের আচরণে এই অবিশ্বাস আর বিক্ষোভ শুধু বেড়েই ওঠেনি, রীতিমতো রাজ বিদ্রোহের রূপ নিতে চলেছে।

এই যখন ইংল্যান্ডের অবস্থা তখনই শুরু হচ্ছে আমাদের কাহিনী।

.

০১.

ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চল।

বিশাল শেরউড বনভূমির ওপর ধীরে ধীরে নেমে আসছে সন্ধ্যার আঁধার। গাছপালা যে-সব জায়গায় ঘন সে-সব জায়গায় এর ভেতরই যেন রাত হয়ে গেছে। বনের মাঝামাঝি স্থানে একটুখানি ফাঁকা জায়গা। ঘাসে ছাওয়া। কোনো গাছ নেই সেখানে। চারপাশে বড় বড় ওকের ঝোপ। এক ধারে ছোট একটা টিলা। তার ওপর ছড়িয়ে আছে ছোট বড় নানা আকারের পাথর। হয়তো প্রাগৈতিহাসিক কোনো কালে বর্বর বনবাসীরা তাদের দেবতার উদ্দেশ্য উৎসর্গ করেছিলো ওগুলো। টিলার মাথায় পাথরগুলোর গায়ে এখনও খেলা করছে দিনশেষের সোনালি আলো। ফাঁকা জায়গাটার ওপাশে দূরে জমতে শুরু করেছে ঘন কালো মেঘ। মাঝে মাঝে ভেসে আসছে বজ্রগর্জনের অস্পষ্ট আওয়াজ।

ফাঁকা জায়গার এক প্রান্তে এক পাল শুয়োর চরে বেড়াচ্ছে। কাছেই দুজন লোক। একজন দাঁড়িয়ে, একজন বসে। যে লোকটা দাঁড়িয়ে তার বয়েস বসে থাকা লোকটির চেয়ে একটু বেশি। উদ্বিগ্ন চোখে সে তাকিয়ে আছে ক্রমশ আঁধার হয়ে আসা আকাশের দিকে। আর যে বসে আছে সে গভীর চিন্তায় মগ্ন, যেন বিশ্বরহস্যের সমাধান আজই তাকে করতে হবে।

দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার চেহারায় অদ্ভুত এক বন্য ভাব। সাদাসিধে পোশাক পরনে। হাঁটু পর্যন্ত লম্বা ভেড়ার চামড়ার কোট, কোমরে বাঁধা চওড়া চামড়ার ফিতে; পায়ে চটি, তা-ও চামড়ার ফিতে দিয়ে আটকানো। কোমরের ফিতের এক দিকে ঝুলছে একটা শিঙা, অন্যদিকে গোঁজা বড় একটা দুধার ছোরা। মাথায় টুপি নেই। চুলগুলো এলোমেলো। গালভর্তি চাপ দাড়ি। সম্ভবত চুলের তলনায় দাড়িই লম্বা বেশি। লোকটার গলায় বাঁধা একটা পেতলের আটা। তাতে ছোট ছোট অক্ষরে খোদাই করা: বিউলফ-এর পুত্র গাৰ্থ, রদারউডের জমিদার সেড্রিক-এর জন্মক্রীতদাস।

জমিদারের শুয়োরের পাল দেখাশোনা করে সে।

কম বয়েসী লোকটার চেহারা, পোশাক-আশাক একটু অন্য ধরনের। গার্থের চয়ে বছর দশেকের ছোট সে। মুখে গাম্ভীর্যের মুখোশ আঁটা। চেহারা দেখে কারো পক্ষে আন্দাজ করা সম্ভব নয় তোক হাসানোই তার কাজ। পরনে রঙচঙে রেশমী কোর্ট; মাথায় টুপি, দেখতে মোরগের ঝুঁটির মতো, ছোট ছোট ঘণ্টা বাধা তার সাথে। লোকটা মাথা নাড়লেই টুং-টাং শব্দে বেজে ওঠে সেগুলো। মাথা স্থির করে বসে থাকা তার স্বভাবে নেই, তাই টুং-টাং আওয়াজেরও বিরাম নেই। দুই হাতে তার দুটো রুপোর বালা। পায়ে গার্থের মতোই চামড়ার চটি; মোজা, একটার রঙ লাল, অন্যটা হলুদ। গার্থের মতো এ লোকটিরও গলায় একটা পেতলের আঙটা। তাতে ছোট ছোট অক্ষরে খোদাই করা: উইটলেস-এর পুত্র ওয়াম্বা, রদারউডের জমিদার সেড্রিক-এর জন্মক্রীতদাস।

জমিদার সেড্রিকের মাইনে করা ভাঁড় সে। মনিবকে হাসানোর জন্যে উদ্ভট কথাবার্তা বলা, অঙ্গভঙ্গি করাই তার কাজ।

একে সন্ধ্যা হয়ে আসছে, তার ওপর মেঘ জমছে আকাশে। ব্যস্ত হয়ে উঠলো গার্ক। পালের শুয়োরগুলোকে এক জায়গায় জড়ো করার জন্যে শিঙা ফুকতে লাগলো। কিন্তু লাভ হলো না। বার কয়েক মাথা নেড়ে, ঘোঁত ঘোঁত শব্দ করে যেমন চরছিলো তেমনি চরে বেড়াতে লাগলো শুয়োরগুলো। ঘাসের ভেতর থেকে খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে ওক ফল।

আরো কয়েকবার শিঙা বাজালো গাৰ্থ। শেষে বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো, জাহান্নামে যা, শুয়োরের বাচ্চারা! সঙ্গের কুকুরটাকে লেলিয়ে দিলো শুয়োরগুলোর ওপর। চিৎকার করলো, ধর, ধর, ফ্যাংস!

লাফিয়ে উঠেই ঘেউ ঘেউ করতে করতে ছুটলো ফ্যাংস। কিন্তু সে বেচারার এক ঠ্যাং ঘোড়া, বয়েসও হয়েছে বেশ। যৌবনের ক্ষিপ্রতা আর নেই। শরীরে, গলায় জোরও কমে এসেছে। শুয়োরগুলো পাত্তাই দিলো না ওকে, যেন খাচ্ছিলো খেয়ে যেতে লাগলো।

অবশেষে সঙ্গীর শরণাপন্ন হলে গার্থ।

ওঠো তো, ওয়াম্বা, আমাকে একটু সাহায্য করো, বলা সে। এতগুলো শুয়োর একা এক জায়গায় জড় করা চাট্টিখানি কথা? তুমি যাও, পেছন দিক দিয়ে গিয়ে তাড়িয়ে আনো আমার দিকে।

ওঠবার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না ওয়াম্বার ভেতর। জবাবও দিলো না। যেমন ছিলো তেমনি চিন্তিত মুখে তাকিয়ে রইলো বিরাট বিরাট ওক গাছগুলোর দিকে।

কি ব্যাপার, কালা হয়ে গেলে নাকি? কথাগুলো বললাম কানে ঢুকলো না?

ঢুকেছে, গাৰ্থ, ধীরে ধীরে অলসকণ্ঠে জবাব দিলো ওয়া। প্রথমবারেই ঢুকেছে। এবং সেই থেকে আমি আমার পা দুটোর সাথে আলাপ করছি ব্যাপারটা নিয়ে। কিন্তু ওরা স্রেফ নড়তে চাইছে না।

মানে!

মানে ওরা বলছে, এখন যদি শুয়োরের পালের পেছনে ছোটাছুটি করি, আমার কাপড়-চোপড়ের বারোটা বেজে যাবে। তার চেয়ে, ওদের পরামর্শ হচ্ছে, শুয়োরগুলো যেমন চরছে চরুক, তুমি ফ্যাংকে ডেকে নাও।

তোমার কি মাথা খারাপ হলো, ওয়াম্বা! দেখছো সন্ধ্যা হয়ে আসছে, আকাশে মেঘ জমছে, যে কোনো সময় ঝড়-বাদল শুরু হবে, আর তুমি বলছে, যেমন চরছে চরুক, বলতে বলতে গাৰ্থ একাই এগিয়ে গেল শুয়োরগুলোকে জড়ো করার জন্যে।

ওয়াম্বা জবাব দিলো, ভুল বললাম কোথায়? দুচার দিনের ভেতরই তো ওরা নরম্যান হয়ে যাবে, সুতরাং চরছে চরুক না।

যত্ত সব গাঁজাখুরি কথা! শুয়োরের পাল আবার নরম্যান হয় কি করে? আমার সাথে ইয়ার্কি মারছো?

শোনো তাহলে, আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি। তার আগে বলল, তুমি কাদের চরাতে নিয়ে এসেছো?।

কাদের আবার, দেখতে পাচ্ছে না?

পাচ্ছি, তবু শুনতে চাই তোমার মুখ থেকে।

আর কথা পেলে না-পাজী একপাল শুয়োর চরাতে এনেছি আমি।

বেশ বেশ। এবার বলো তো, এই শুয়োরগুলোকেই চামড়া ছাড়িয়ে, ধুয়ে পরিষ্কার করে যখন টেবিলে রাখা হবে তখন কি বলা হবে?

এ আবার কি ধরনের প্রশ্ন! পর্ক বলা হবে।

তাহলেই বোঝো, তোমার মতো স্যাক্সনরা যখন চরাতে নিয়ে আসে, তখন ওরা থাকে শুয়োরের পাল। কিন্তু যখন নরম্যান প্রভুদ্দে পেটে যাওয়ার জন্যে টেবিলে ওঠে তখনই হয়ে দাঁড়ায় পর্ক। তেমনিভাবে বঁড় হয় বিফ, সাধারণ বাছুর হয়ে যায়। তাই বলছিলাম, যেমন চরছে চরুক না, কদিন বাদেই তো ওদের নরম্যান নামকরণ হবে পর্ক।

ইতোমধ্যে ফ্যাংসের সহায়তায় শুয়োরগুলোকে এক জায়গায় জড় করতে পেরেছে গাৰ্থ। ওয়ার কথা শুনে বিরক্তি ওরা চোখে তাকাল ওর দিকে।

যত সব ফাঁকিবাজি কথা! বললো সে।

এ-সময় দূর থেকে ভেসে এলো অনেকগুলো ঘোড়ার খুরের আওয়াজ।

আরে, কারা যেন আসছে! ওয়াম্বা বলে উঠলো। মনে হচ্ছে এদিকেই!

গার্থ বললো, যে খুশি আসুক, তাতে তোমার কি? বিরক্তি এখনো কাটেনি তার।

আমার আবার কি? একবার দেখলে দোষ আছে কোনো?

গাধা! আকাশের দিকে তাকাও, দেখতে পাচ্ছে না, কি সাংঘাতিক ঝড় আসছে? ঐ দেখ বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে! ঐ শোনো বাজের আওয়াজ!

গার্থের কথা শেষ হতে না হতেই বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হলো। উঠে দাঁড়ালো ওয়া। কিন্তু তাড়াহুড়োর কোনো লক্ষণ দেখা গেল না তার ভেতর। ধীর স্থির ভঙ্গিতে গার্থের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। ওর সাথে সাথে বয়োরের পাল তাড়িয়ে নিয়ে চললো সে-ও।

ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ ক্রমশ কাছিয়ে আসছে। কৌতূহল বেড়ে উঠলো ওয়ার। একটু একটু করে পিছিয়ে পড়লো সে।

কি হলো, ওয়াম্বা, তাড়াতাড়ি এসো, তাড়া লাগালো গাৰ্থ। এক্ষুণি ঝড় বাদল শুরু হয়ে যাবে।

ওর কথা কানে নিলো না ওয়া। পিছিয়েই রইলো সে। মাঝে মাঝে পেছন ফিরে তাকাচ্ছে।

কিছুক্ষণের ভেতর ওদের ধরে ফেললো অশ্বারোহীরা।

.

সংখ্যায় তারা দশজন। একেবারে সামনের দুজন, দেখলেই বোঝা যায় হোমরা চোমরা গোছের লোক। বাকিরা তাদের সহযাত্রী বা অনুচর। দুজনের একজন ধর্মযাজক, বেশ উঁচু পদমর্যাদার। মোটাসোটা লোকটার মাংসল লাল মুখে সদা প্রসন্ন ভাব। দামী কাপড়ের গাউন পরনে, হাতা এবং গলার কিনারাগুলোয় দামী ফার লাগানো। কলারে আঁটা বড় একটা সোনার কাঁটা। অনায়াস দক্ষতায় তেজী ঘোড়াটাকে চালিয়ে আসছেন তিনি। সঙ্গে দুজন ভৃত্য। পিঠে মালপত্র চাপানো দুটো ঘোড়া টেনে আনছে তারা। এই দুই ভূত্যের পেছন পেছন আসছে ধর্মযাজকের অপর দুই সঙ্গী, দুজন পুরোহিত।

যাজকের সহযাত্রী একজন নাইট। সাধারণ নয়, টেম্প-এর খেতাব পাওয়া নাইট* বয়েস চল্লিশের কোঠায়। দীর্ঘদেহী, ছিপছিপে গড়ন, পেশল শরীর, গায়ের চামড়া রোদে পুড়ে তামাটে বর্ণ নিয়েছে। চেহারায় বেপরোয়া ভাব। অহষ্কারের সাথে হিংস্রতা আর নিষ্ঠুরতা মিশলেই কেবল এমন ছাপ পড়তে পারে মানুষের চেহারায়। এক নজর দেখলেই বোঝা যায় লোকটা যোদ্ধা, জীবনে অনেক প্রতিকূলতা সয়েছে, এবং আরো সইবে। লাল একটা আলখাল্লা পরনে। ডান কাঁধে একটা শাদা ক্রস, তার খেতাবের চিহ্ন। আলখাল্লার নিচে পরে আছে লোহার জালের জামা। নিম্নাঙ্গেও লোহার পোশাক। হাতে লোহার জালের দস্তানা। মাথায় ধাতব শিরোম্রাণ। কোমরে দীর্ঘ তরবারি, খাপে মোড়া। ধর্মযাজকের মতোই দারুণ একটা ঘোড়ায় চেপে আসছে সে। পেছনে তার যুদ্ধের ঘোড়া, যুদ্ধের সাজ পরা, এক ভৃত্য লাগাম ধরে টেনে আনছে। আরেক ভূত্য বয়ে আনছে তার ঢাল ও বর্শা। বর্শার মাথায় একটা পতাকা বাঁধা, কুশ আঁকা তাতে। ঢালটা তিন কোনাচে, হলদে রঙের কাপড়ে মোড়া। এই দুই ভৃত্যের পেছনে আরো দুজন ভৃত্য। দীর্ঘদেহী দুজনই। গায়ের রঙ কালো। রেশমী ঢোলা পোশাক তাদের গায়ে। মাথায় টুপি। এক পলক দেখেই বলে দেয়া যায় তারা প্যালেস্টাইনী আরব।

স্থির দাঁড়িয়ে আছে গার্থ এবং ওয়া। বিস্মিত চোখে দেখছে ছোট্ট মিছিলটাকে। ইতোমধ্যে ওয়ার মতো গাৰ্থও কৌতূহলী হয়ে উঠেছে। ধর্মযাজককে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই চিনতে পেরেছে সে। জরভক্স মঠের প্রায়োর (প্রধান পুরোহিত) তিনি। নাম অ্যায়মার। ধর্মযাজক হওয়া সত্ত্বেও শিকার খুব প্রিয় তার, খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারেও খুব উৎসাহী তিনি, এ ছাড়াও স্বভাবের আরেকটি বিশেষ দিক হলো, কোনো ধরনের জাগতিক ভোগবিলাসেই তার অরুচি নেই। এ তল্লাটের আর দশজন মানুষের মতো গার্থও জানে এসব কথা। তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রায়োর অ্যায়মারকেঅভিবাদন জানিয়ে নাইট টেম্পলারের দিকে তাকালো সে।

লোকটাকে এ অঞ্চলে কখনো দেখেছে বলে মনে হলো না ওর।

গার্থের অভিবাদনের জবাবে প্রায়োর বললেন, তোমাদের মঙ্গল হোক। জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, বলতে পারো, এদিকে রাতের মতো আশ্রয় পাওয়া যেতে পারে কোথায়?

গাৰ্থ এবং ওয়াম্বাও তখন হাঁ করে তাকিয়ে আছে ধর্মযাজকের সঙ্গী ও তার প্রাচ্যদেশীয় অনুচরদের দিকে। অ্যায়মারের প্রশ্ন তারা শুনতেই পেলো না।

যাজক আবার প্রশ্ন করলেন, একটা কথা জানতে চেয়েছিলাম তোমাদের কাছে।

এবার সংবিত ফিরলো গার্থের। বললো, জি, বলুন।

এদিকে রাতের মতো আশ্রয় পাওয়া যেতে পারে এমন কোনো জায়গা আছে?

না, কাছাকাছি তেমন কোনো জায়গা আছে বলে আমার জানা নেই, জবাব দিলো ওয়া। তবে একটু কষ্ট করে আরো কয়েক মাইল যদি এগিয়ে যান, ব্রিক্সওয়ার্ধের মঠ পাবেন। ওখানকার প্রায়োর নিশ্চয়ই আপনাদের আশ্রয় দেবেন। মনে হয় ভালো খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থাও করতে পারবেন উনি। রাতটা আরামেই কাটবে আপনাদের।

না, না, ব্রিক্সওয়ার্থ মঠ অনেক দূর, বললেন অ্যায়মার, এই ঝড় বৃষ্টির ভেতর অতদূর যাওয়া যাবে না। আরো কাছে কোনো জায়গা নেই?

যা আছে, তবে খুব কাছে না; আর ওখানে গেলে রাতের বেলায় ঘুমের আশা ছাড়তে হবে আপনাদের। উপাসনা করে কাটাতে হবে সারারাত। এই যে এই পথ ধরে এগিয়ে গেলে পাবেন সন্ন্যাসী কপম্যান হারে আশ্রম। উনিও নিশ্চয়ই আপনাদের পেয়ে খুশি হবেন।

এ প্রস্তাবটাও মনঃপূত হলো না যাজকের। বিরক্তির সঙ্গে মাথা নাড়লেন তিনি।

তাঁর সঙ্গী নাইট টেম্পলার এবার কথা বললেন।

আমার ধারণা, স্যাক্সন সেড্রিকের বাড়ির কাছাকাছি এসে গেছি আমরা। সেখানেই চলুন না, প্রায়োর।

হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন, জবাব দিলেন অ্যায়মার। গাৰ্থ ও ওয়ার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, রদারউডের সেড্রিকের বাড়িটা কোথায় বলতে পারো তোমরা?

অ্যাঁ, হ্যাঁ, তা বোধহয় পিরবো, জবাব দিলো গাৰ্থ। তার কণ্ঠস্বরে সাহায্য করার ইচ্ছার চেয়ে অনিচ্ছাই প্রকাশ পেলো বেশি। তবে আপনারা সেখানে পৌঁছাতে পারবেন কিনা জানি না, পথটা খুব ঘোরপ্যাচের। তাছাড়া, যদি শেষ পর্যন্ত বাড়িতে পৌঁছানও, গিয়ে হয়তো দেখবেন বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।

আমরা এসেছি শুনলে ওরা খুশি হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে আসবে, গর্বিত শোনালো নাইট টেম্পলারের কণ্ঠস্বর।

তাই কি! তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বললো গাৰ্থ। ওর প্রভুর মতো ও-ও নরমানদের মনে প্রাণে ঘৃণা করে! নাইটের কথা ওর কাছে রীতিমত ঔদ্ধত্যপূর্ণ মনে হয়েছে। এক মুহূর্ত বিরতি নিয়ে সে যোগ করলো, তার মানে আপনি বলতে চাইছেন আমার মনিব আপনাদেরকে আশ্রয় দিয়ে কৃতার্থ হবেন? না, জনাব নাইট, আপনাদের কোনো সাহায্য আমি করতে পারছি না।

মুহূর্তে চোখ দুটো অগ্নিশিখার মতো জ্বলে উঠলো নাইট টেম্পলারের।

ব্যাটা স্যাক্সন শুয়োরপালক, তোর এত বড় স্পর্ধা! চিৎকার করে উঠে চাবুক তুললো সে।

পলক ফেলার আগেই গ্লার্থের হাত পৌঁছে গেছে ছুরির বাঁটে। তৈরি সে। নাইট চাবুক দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করলেই ছুরি চালাবে। তাড়াতাড়ি ঘোড়া নিয়ে দুজনের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন প্রায়োর অ্যায়মার।

না, না, কোনোরকম মারামারি চলবে না! বললেন তিনি। স্যার ব্রায়ান, আমরা এখন প্যালেস্টাইনে নেই, কথাটা মনে রাখবেন। ওখানে বিধর্মীদের সাথে যখন যা ইচ্ছা করেছেন, ভালো কথা, তাই বলে এখানেও যদি তেমন করতে চান তাহলে মুশকিল আছে।

দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস বইছে নাইটের। এখনো রাগ যায়নি। তবু যাজকের কথায় চাকুটা নামিয়ে নিলো সে। ঘোড়াটাকে কয়েক কদম এগিয়ে নিয়ে ওয়াম্বার সামনে দাঁড়ালেন অ্যায়মার। একটি রৌপ্যমুদ্রা দিলেন ওর হাতে। বললেন, তুমি নিশ্চয়ই বলতে পারবে সেড্রিকের বাড়ি কোন দিকে?

চুপ করে আছে ওয়াম্বা।

ক্লান্ত পথচারীদের সাহায্য করা খ্রীষ্টান হিশেবে তোমার কর্তব্য, তাই? আবার বললেন ধর্মযাজক।

নিশ্চয়ই। কর্তব্য মানে?-এক নম্বর কর্তব্য! কিন্তু, ফাদার, আসল কথাটা কি, বলবো? আপনার সঙ্গীর মেজাজ দেখে আমার মাথা ঘুরছে। আমি নিজেই আজ পথ চিনে আমার প্রভুর বাড়ি পৌঁছুতে পারবো কিনা সন্দেহ, তো আপনাকে কি জানাবো?

কি আবোল-তাবোল বকছো? ইচ্ছে করলেই তুমি পথটা দেখিয়ে দিতে পারো।

বেশ, তাহলে এই পথ ধরেই চলে যান। যতক্ষণ না একটা পাথরের ক্রুশ দেখতে পাবেন ততক্ষণ নাক বরাবর এগিয়ে যাবেন। দেখবেন কুশটার কাছে চারটে পথ এসে মিশেছে চারদিক থেকে। সোজা যাবেন না, ডানে যাবেন না, পেছনে তো ফিরবেনই না। তাহলে কাকি থাকলো কি? বাঁ দিক। হাঁ, বাঁ দিকের পথ ধরে এগোবেন, আমার মনে হয় ঝড় ভালো মতো আসার আগেই আপনারা আশ্রয়ে পৌঁছে যাবেন।

অনেক অনেক ধন্যবাদ। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন, বলে সঙ্গীর দিকে তাকালেন অ্যায়মার। চলুন তাহলে, স্যার ব্রায়ান। আর দেরি করলে ভিজতে হবে।

হ্যাঁ চলুন।

অনুচরদের নিয়ে ওয়াম্বার দেখানো পথে ঘোড়া ছোটালেন প্রায়োর ও নাইট টেম্পলার।

ওঁদের ঘোড়ার আওয়াজ-মিলিয়ে যেতেই একে অন্যের দিকে তাকিয়ে প্রাণ খুলে হাসলো গার্থ আর ওয়াম্বা। গার্থ বললো, তোমার পরামর্শ মতো গেলে আজ সারা রাতেও রদারউডে পৌঁছুতে পারবে না ওরা।

তা না পারুক, শেফিল্ডে তো পৌঁছুবে। আমার মনে হয় সেটাই ভালো হবে ওদের জন্যে।

হ্যাঁ, ভালোই করেছো ভুল পথে পাঠিয়ে। ওরা নরম্যান। দুজনই। বাড়িতে আশ্রয় চাইলে আমার মনে হয় কিছুতেই রাজি হতেন না মনিব। ঐ চোয়াড়ে নাইটটার মেজাজ তো দেখলেই, কি হতো তারপর?

নির্ঘাত হাতাহাতি বেধে যেঙ্গে, বললে ওয়াম্বা। যদি কোনো রকমে একবার লেডি রোয়েনাকে দেখতে ঐ বদমাশটা, আমি ভাবতেও পারছি না কি ঘটতো।

হ্যাঁ, মনিবের ঝামেলা আরেকটু বাড়তো আর কি। চলো এগোই।

.

বেয়াদবগুলোকে একটু শিক্ষা দিতে চাইলাম, আপনি বাধা দিলেন কেন? কিছুদূর আসার পর জিজ্ঞেস করলো নাইট টেম্পলার স্যার ব্রায়ান দ্য বোয়াগিলবার্ট।

শিক্ষা দিতে চাইছিলেন না ঝগড়া বাধাতে চাইছিলেন? জবাব দিলেন যাজক। ওদের কথাগুলো খেয়াল করেননি? সেড্রিক ওদের মনিব, ওদের গায়ে হাত তুললে সেড্রিক আপনাকে ছেড়ে কথা কইতো না। এই লোকটার সম্পর্কে ভাললা মতো জেনে রাখা দরকার আপনার।

বলুন শুনি, বললো বটে কিন্তু খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে যে তা মনে হলো না ব্রায়ানের কণ্ঠস্বর শুনে।

অত্যন্ত ধনী জমিদার এই সেড্রিক। এর মতো ধনশালী স্যাক্সন এ অঞ্চলে আর আছে বলে আমার জানা নেই। যেমন ধনী তেমনি দাম্ভিক ব্যাটা। লোকে তাকে স্যাক্সন সেড্রিক বললে সে গর্ব অনুভব করে। আমাদের, নরম্যানদের ও মনে প্রাণে ঘৃণা করে। প্রতিবেশী রেজিনাল্ড ট্রুত দ্য ববায়েফ বা ফিলিপ ম্যালভয়সিঁর মতো দুর্ধর্ষ, প্রতাপশালী নরম্যান জমিদারদের সাথে পর্যন্ত বিরোধ বাধাতে সে ভয় পায় না। ভীষণ বদমেজাজী–অনেকটা আপনার মতোই। সুতরাং সাবধান থাকবেন ওর সাথে কথা বলার সময়।

তা থাকবে। আপনি সেড্রিক সম্পর্কে যা বললেন তাতে মনে হচ্ছে ব্যাটার মন পেতে অনেক কিছু সইতে হবে আমাকে। ঠিক আছে, দরকার হলে সইবো। যার সৌন্দর্যের খ্যাতি দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে সেই লেডি রোয়েনাকে দেখবার জন্যে এটুকু কষ্ট না হয় আমি স্বীকার করলাম। কিন্তু, ফাদার, একটা কথা বলুন তো, মেয়েও কি বাপের মতোই নরম্যানদের ঘৃণা করে?

সেড্রিক ওর বাবা নয়, বললেন প্রায়োর। অভিভাবক। সম্পর্কের আত্মীয়। তাহলেও রোয়েনাকে ও নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসে।

আচ্ছা!

হ্যাঁ। আর রোয়েনার সৌন্দর্য সম্পর্কে তো আগেই আপনাকে বলেছি, এ তল্লাটে অমন সুন্দরী আর একটাও আছে কি না সন্দেহ।

আমরা একটা বাজি ধরেছিলাম, মনে আছে তো আপনার?

নিশ্চয়ই আছে। আমি যেমন বলেছি রোয়েনা যদি তেমন সুন্দরী না হয়, আমার কলারের এই সোনার কাঁটা আপনি পাবেন; আর আমার কথা যদি ঠিক হয় আপনি আমাকে দেবেন দশ পিপে ভালো ফরাসি মদ।

হ্যাঁ। তবে কথা হলো কি, রোয়েনার রূপ কেমন বিচার করবো। তো আমিই, সুতরাং ধরে নিতে পারেন, সোনার কাঁটাটা আপনি হারাচ্ছেন।

সে যখন হারাবো তখন দেখবো। এবার দয়া করে আপনি একটু চুপ করুন দেখি। এখন থেকেই মুখ বুজে থাকা অভ্যাস না করলে সেড্রিকের সামনে কি না কি বলে বসবেন, শেষে এই ঝড় বাদলের ভেতর পথে রাত কাটাতে হবে।

তা ঠিক, তা ঠিক। বেশ, আমি তাহলে এখন থেকে চুপ করেই থাকবে। তার আগে আরেকটা প্রশ্ন, সেড্রিকের নিজের কোনো ছেলে মেয়ে নেই?

আছে। একটাই মাত্র ছেলে, উইলফ্রিড অভ আইভানহো। ছেলেটাকে ও বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।

নিজের একমাত্র ছেলেকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।

বললাম কি তাহলে? ভীষণ বদমেজাজী লোক এই সেড্রিক। ওর মতের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে, সে যে-ই হোক, তার আর রক্ষা নেই। শোনা যায় আইভানহো রোয়েনাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলো বলেই ওকে বাড়িছাড়া করেছে সেড্রিক।

কেন! রোয়েনাকে বিয়ে করলে দোষ কি?

কিছুই না। সেড্রিক যেটা চায় না আইভানহোসেটা চায়, এ-ই দোষ। সেড্রিকের ইচ্ছা স্যাক্সন রাজকুমার অ্যাথেলস্টেনের সাথে রোয়েনার বিয়ে দেবে। যাকগে ওসব কথা, ঐ যে সেই ক্রুশ, এবার বাঁয়ে মোড় নিতে হবে।

না ডানে, প্রতিবাদ করলো নাইট টেম্পলার।

কি আশ্চর্য, ডানে কেন! সবিস্ময়ে বললেন অ্যায়মার। লোকটা তো বললো বয়ে যেতে!

হ্যাঁ। কিন্তু আমার বিশ্বাস বদমাশটা মিথ্যে বলেছে। ডানের পথ ধরে গেলেই আমরা সেড্রিকের বাড়ি পৌঁছাবো।

আমার কিন্তু তা মনে হয় না, বললেন ধর্মযাজক। একটা রূপার মুদ্রা দিয়েছি…।

ইতোমধ্যে বৃষ্টি বেশ চেপে এসেছে। সন্ধ্যাও ঘুরে গেছে অনেকক্ষণ আগে। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ভিজতে ভিজতে তর্ক করতে লাগলেন দুজন। হঠাৎ করেই প্রায়োরের চোখ পড়লো কুশটার গোড়ায়। বিদ্যুতের আলোয় দেখতে পেলেন একটা মানুষ পড়ে আছে সেখানে।

আরে, কে যেন পড়ে আছে ওখানে! কুশটার দিকে ইশারা করে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি। না কি মরে গেছে?

হুগো, বর্শার আগা দিয়ে একটা খোঁচা মারো তো ব্যাটাকে! এক ভূতের দিকে ফিরে আদেশ করলো নাইট টেম্পলার।

খোঁচা খেয়ে উঠে দাঁড়ালো লোকটা।

কী ব্যাপার? আমাকে এমন বিরক্ত করার মানে? হৈ-চৈ করে উঠলো সে। শুয়ে শুয়ে একটু চিন্তা ভাবনা করছিলাম, তার ভেতর এ কী ঝামেলা!

কিছু মনে কোরো না, প্রায়োর বললেন, স্যাক্সন সেড্রিকের বাড়িটা কোন দিকে আমরা জানতে চাই। সেজন্যে বাধ্য হয়েই তোমাকে বিরক্ত করতে হলো।

স্যাক্সন সেড্রিকের বাড়ি? আমিও তো সেখানেই যাবো। আমাকে একটা ঘোড়া দিতে পারবেন?–তাহলে আপনাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে পারি। বেশ, দিচ্ছি তোমাকে ঘোড়া, নিয়ে চলো আমাদের, বলে স্যার ব্রায়ান ভৃত্যকে আদেশ করলো তার অতিরিক্ত ঘোড়াটা ওকে দিতে।

ঘোড়ায় চাপলো লোকটা। এবং ওয়াম্বা যে দিকের কথা বলেছিলো তার উল্টোদিকে যেতে শুরু করলো। অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে প্রায়োরের দিকে তাকালেন নাইট টেম্পলার। যেম বোঝাতে চাইলেন, কেমন, বলেছিলাম না ডান দিকেই যেতে হবে?

কিছুক্ষণ পর তারা পায়ে চলা পথ বেয়ে বনের ভেতর ঢুকলেন। কয়েকটা ছোট ছোট নালা পেরোলেন। তারপর বড় রাস্তায় উঠলেন।

নিঃশব্দে পথ চলছেন সবাই। হঠাৎ লোকটা বললো, আর কিছুদূর গেলেই সেড্রিকের বাড়ি।

এতক্ষণ নীরব থাকলেও ভেতরে ভেতরে কৌতূহলে মরে যাচ্ছিলেন ধর্মযাজক। এবার আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। লোকটার পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন।

আমি একজন তীর্থযাত্রী, জবাব দিলো লোকটা। সবে তীর্থ করে ফিরেছি পবিত্র ভূমি জেরুজালেম থেকে।

যুদ্ধে না জেতা পর্যন্ত ওখানে থাকলেই ভালো হতো না? প্রশ্ন করলো টেম্পলার।

হাসলো লোকটা। স্যার নাইট ঠিকই বলেছেন। তবে কথা হলো গিয়ে, যারা ঈশ্বরের নামে শপথ নিয়ে ক্রুসেডে যোগ দিয়েছিলেন তাঁরাই যখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এত দূরে চলে এসেছেন তখন আমার মতো একজন সাধারণ তীর্থযাত্রী ওখানে থাকলেই কি উপকার হতো, না থাকলেও বা কি ক্ষতি হবে?

চোখ মুখ লাল হয়ে উঠলো স্যার ব্রায়ানের। অভ্যাসবশেই যেন হাত চলে গেল চাবুকের ওপর। এবারও তাকে বাধা দিলেন প্রায়োর। ফিসফিস করে বললেন, থামুন তো, কি করছেন বার বার! লোকটার দিকে তাকিয়ে যোগ করলেন, তুমি তো এখানকার পথঘাট ভাললাই চেনো মনে হচ্ছে। যেভাবে বনের ভেতর দিয়ে নিয়ে এলে!

এ এলাকায়ই আমার জন্ম, জবাব দিলো তীর্থযাত্রী। বড়ও হয়েছি এখানে।…আমরা এসে গেছি। সামনের বাড়িটাই সেড্রিকের।

ঝড় এখনো তেমন মারাত্মক চেহারা নেয়নি, তবে বৃষ্টি পড়ছে মুষলধারে। সেড্রিকের বাড়িটা দেখামাত্র খুশি হয়ে উঠলো সবাই।

বিরাট জায়গা নিয়ে বাড়ি। লম্বা, নিচু একটা দালান; সামনে পেছনে অনেকগুলো উঠান। নরম্যান দুর্গবাড়ি সাধারণত যেমন হয় তেমন নয়। তাই বলে অরক্ষিতও নয়। নিরাপত্তা ব্যবস্থা মোটেই দুর্বল নয় বাড়িটার। চারদিকে জল ভর্তি পরিখা। বাড়িতে ঢোকার একমাত্র পথ একটা ঝুলসেতুর ওপর দিয়ে। ফটক খুলে সেতু নামিয়ে দিলে লোকজন ভেতরে ঢুকতে পারে, সেতু উঠিয়ে রাখলে কারো পক্ষে ঢোকা সম্ভব নয়। পরিখা সাঁতরে ঢোকার আশা বৃথা, কারণ জলের ভেতর থেকেই পাড়া উঠে গেছে উঁচু পাথরের প্রাচীর।

ঝুলসেতুর সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো দলটা। নিজেদের উপস্থিতি ঘোষণা করার জন্যে উচ্চৈস্বরে শিঙা বাজাতে লাগলো নাইট টেম্পলার ব্রায়ান। ভিজে কাকের মতো অবস্থা সবার। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছাদের আশ্রয় চাই।

————–
* টেম্পল-এর খেতাব পাওয়া নাইট অর্থাৎ নাইট টেম্পলাররা যতটা না সৈনিক তার চেয়ে বেশি পুরোহিত। সাধারণত সাত বংশের সন্তানরা এই খেতাব পেতো। কৃচ্ছসাধনের মাধ্যমে সাদাসিধা জীবনযাপন এবং প্যালেস্টাইনের পবিত্র ভূমি উদ্ধারের জন্যে আমৃত্যু যুদ্ধ করার শপথ নিতে হতো তাদের। টেস্-এর নাইট হতে পারাটা সে যুগে অত্যন্ত সম্মানের ব্যাপার ছিলো। ইউরোপের সকল অংশের খ্রীষ্টানই এই খেতাব পাবার যোগ্য বলে বিবেচিত হতো। মি দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, সব নাইট টেম্পলার তাদের শপথ রক্ষা করতো না। সৈনিক হিশেবে যোগ্য হলেও কৃচ্ছসাধনের ব্যাপারে তাদের আগ্রহ ছিলো কম। ভোগবিলাসের জীবন কাটাতেই তারা পছন্দ করতো। অনেকে সাধারণ মানুষের সাথে রীতিমতো নিষ্ঠুর আচরণ করতেও পিছপা হতো না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *