কান্তার মরু – ১০

মাঝরাতের দিকে ঘুম ভাঙল রানার। গুপ্ত স্থান থেকে ও ছোরাটা বের করতে উঠে বসল আবু হাতেম। আলখাল্লার ভাঁজ থেকে একই রকম আরেকটা ছোরা বের করে কুঁড়েঘরের আবছা আঁধারে একগাল হাসল। এক দিক দিয়ে, আজ রাতটা বাছা ঠিক হয়নি ওদের, কারণ চাঁদমামা ভাগেড়ব-ভাগড়বীদের প্রতি সুবিচার করছে না। আজ জ্যোৎস্না রাত।
আবু হাতেমকে আগে যেতে দিল রানা। পর্দা হিসেবে ব্যবহৃত ডালপালা সাবধানে ফাঁক করল ও। আবু হাতেম ওর হাত ধরে টানতেই সামনে এগোল রানা।
নিঃশব্দে পর্দা গলে বেরিয়ে গেল লোকটা। ওকে অনুসরণ করল রানা। মর্মর শব্দ যাতে না হয় সেজন্যে আলগোছে ডালপালা বসিয়ে দিল জায়গামত। দ্বাররক্ষী দু’জন রানাদের দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসে, মাথা নত। তিনটে মস্ত বড় পাত্র পায়ের কাছে মাটিতে নামানো। ছোরা দিয়ে ওদের দিকে ইঙ্গিত করল রানা।
ওরা সামনে এগোতে বাঁয়ে রানার পাশে খানিকটা সরে এল আবু হাতেম। রানার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিঃশব্দে পা ফেলছে। গার্ডদের আর ওদের মধ্যকার বালির ঢিবিটা পেরিয়ে এল দু’জনে। গার্ডদের কাছে পৌঁছনোর ঠিক আগ মুহূর্তে, রানার পায়ের নিচে শক্ত মাটি গুঁড়ো হয়ে যেতে, ডান পাশের গার্ডটা নড়ে উঠল। এক লাফে সামনে গিয়ে পড়ল রানা, বাঁ হাতে গলা পেঁচিয়ে ধরে রুদ্ধ করে দিল লোকটার চেঁচামেচির সুযোগ। ঘাড়ের নার্ভ সেন্টারে প্রচণ্ড এক চাপ দিল এবার রানা। সামনে বস্তার মত ঢলে পড়ল গার্ড। রানা ঘুরে তাকাতে দেখতে পেল অপর গার্ডের শরীর থেকে ছোরা টেনে বের করছে আবু হাতেম।
‘বন্দুক নিয়ে আসি।’ ফিসফিস করে আওড়াল লোকটা। রানা মুখ খুলতে পারার আগেই মিলিয়ে গেল অন্ধকারে।
পাশের কুঁড়েঘরটা থেকে বেরিয়ে এসে, নিঃশব্দে উটের পাল লক্ষ্য করে ছুটল আলী দাঈ আর জোসেফ ক্রেন। রানা আহত — নিহত পাহারাদারদের অস্ত্র তুলে নিল। একটা ইসরাইলী সাবমেশিন গান, একটা লী এনফিল্ড ও প্রাচীন একটা স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন .৩৮ হাতে এসে গেল। গুলি বাছাই করে কুদরত চৌধুরীর দিকে রাইফেলটা বাড়িয়ে দিল রানা।
‘জীবনে কোনদিন গুলি ছুঁড়িনি,’ বললেন মিসাইল বিশেষজ্ঞ।
‘জুলেখা?’ বিড়বিড় করে বলল রানা।
‘রাইফেলটা দাও,’ বলল যুবতী, ‘লোড করতে পারলে শূট করতে অসুবিধা হবে না।’
রানা তখনই শিখিয়ে দিল লী এনফিল্ড লোড করার কায়দা। .৩৮টা বিজ্ঞানীকে দিয়ে বলল, ‘টার্গেটকে কাছে না পেলে বড় একটা কাজে দেবে না এটা। চান্স পেলে তলপেট লক্ষ্য করে ট্রিগার টিপে দেবেন।’
ছায়ার আড়ালে, রানার বাঁ দিকে নড়ে উঠল কিছু একটা। পাঁই করে ঘুরে সেদিকে রানা সাবমেশিনগান তাক করতেই চাপা কণ্ঠে বলে উঠল জুলেখা, ‘থামো, থামো। আমাদের ডানাকিল কমরেড।’
পরমুহূর্তে ওদের সঙ্গে যোগ দিল আবু হাতেম। হাতে রাইফেল তার, কোমরে পিস্তল বাঁধা। ‘এখন বহুত লোক খুন করতে পারি আমি!’ বড়াই করে বলল।
‘না,’ মাথা নেড়ে বললেন কুদরত চৌধুরী। ‘তোমার গ্রামে নিয়ে চলো আমাদের।’
‘র‍্যাস হাউজে শুধু একটামাত্র গার্ড আছে,’ বলল ডানাকিল।
‘চলো,’ বলল রানা, পা চালাল উটের খোঁয়াড়ের উদ্দেশে। সাত-পাঁচ ভাবনা চলছে রানার মাথায়। ‘মালদিনিকে খতম করে রেখে যাব নাকি?’ হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে বলল। ওর বিশ্বাস মালদিনিকে সাবড়ে দিতে পারলে ওর সংগঠন ধ্বংস হয়ে যাবে।
‘আগে আমাদের পালানোটা বেশি দরকার,’ জরুরী কণ্ঠে বলল জুলেখা। ‘ওর অবস্থান জেনে গেছ, চাইলে যখন ইচ্ছে আবার ফিরে আসতে পারবে কিংবা লোক পাঠাতে পারবে। কিন্তু আমার কথা একটু ভাবো। এতদিন উপযুক্ত মানুষের অভাবে পালাতে পারিনি। তোমাকে দেখে আশায় বুক বেঁধেছি। আমাকে এই জালিমটার হাত থেকে বাঁচাও, দোহাই তোমার।’
‘ও ঠিকই বলেছে, রানা,’ বললেন বৃদ্ধ বিজ্ঞানী। ‘বেচারীকে আসমারা থেকে কিডন্যাপ করে আনে শয়তানটা। ও ছেলেমানুষ, ওর একটা জীবন আছে না? কেন ওই বুড়ো হাবড়াটাকে বিয়ে করতে যাবে ও?’
ওদের অনুরোধ ফেলতে পারল না রানা, কথাগুলোয় যুক্তিও রয়েছে। মালদিনিকে খুন করতে গিয়ে ধরা পড়লে ও তো মরবেই, নিরপরাধ এই মানুষগুলোও বাঁচবে না।
বাংলাদেশী দূতাবাসে পৌঁছনোটা এখন বেশি জরুরী। বিসিআই যখন জানবে মালদিনির বেশিরভাগ মিসাইলই বাতিল মাল, এবং ওর ক্যাম্পের অবস্থান রানার জানা হয়ে গেছে, তখন লোকটার নিউক্লিয়ার ব্ল্যাকমেইল সামাল দেয়ার একটা না একটা উপায় মেজর জেনারেল রাহাত খান ঠিকই বের করে ফেলবেন।
উটের খোঁয়াড়ের সামনে চলে এল ওরা। মৃত এক ডানাকিল গার্ড পড়ে রয়েছে গেটের পাশে। মোটা তার দিয়ে গেটটাকে বেঁধে রাখছে আলী দাঈ, এতটাই শক্ত করে যে বেশ কয়েক মিনিট লেগে যাবে প্যাঁচ খুলতে। কাছেই ছোট্ট এক কুঁড়ের পাশে পাঁচটা উট
অপেক্ষা করছে। ওগুলোকে স্যাডল পরাতে ব্যস্ত জোসেফ ক্রেন।
‘ওকে হেল্‌প্‌ করো,’ কুদরত চৌধুরী বললেন আবু হাতেমকে।
‘বেচারী জানোয়ারগুলো,’ আওড়াল ডানাকিল।। ‘সোমালীরা উট চেনে না, ওদের মন বোঝে না।’
কুঁড়ে রেইড করে ক্যান্টিন ও ক্যান্‌ড্‌ ফুড যেখানে যা পেল জড় করল রানা, জুলেখা আর কুদরত চৌধুরী।
‘আমরা তৈরি,’ বলল আলী দাঈ। ‘এগুলো মেয়ে উট।’
মেয়ে আর পুরুষ উটে কি পার্থক্য জেনে নিতে হবে, মনে মনে স্থির করল রানা। অবিশ্বাস্য সহ্যক্ষমতা আর বদমেজাজ ছাড়া আজ পর্যন্ত এদের আর কোন বৈশিষ্ট্য চোখে পড়েনি ওর।
গ্রামটা প্রায় ছাড়িয়ে এসেছে এসময় গুলি আরম্ভ করল এক রাইফেলধারী। বাতাসে শিস কেটে গুলিগুলো পার হয়ে যেতে, সাবমেশিনগানটা নামিয়ে নিয়ে উঁচু স্যাডলে ঘুরে গেল রানা। অগিড়বস্ফুলিঙ্গ লক্ষ্য করে, এক ঝাঁক গুলিবর্ষণ করল ও। উটের যা চলনভঙ্গি, লাগাতে পারবে আশা করেনি রানা, কিন্তু বন্ধ হয়ে গেল ও পক্ষের গুলিচালনা।
‘জলদি করো,’ তাগাদা দিলেন কুদরত চৌধুরী।
‘সেটা এই জীবগুলোকে বলুন,’ পাল্টা বলল রানা।
সোমালীদের বুদ্ধিমত্তার প্রতি আবু হাতেমের মনোভাব যা-ই হোক, বলতেই হবে বাছা বাছা উট চুরি করেছে আলী দাঈ। দুনিয়ার দ্রুততম জানোয়ার নয় উট, বলাইবাহুল্য। গ্রামে ঘোড়া থাকলে এতক্ষণে ওদের ধরে ফেলত তাও সত্যি। তবে গতি মন্থর হলেও বিশ্বাস রাখা যায় উটেদের ওপর, শেষমেষ জায়গামত ঠিকই পৌঁছে দেবে।
গ্রাম ত্যাগের দু’ঘণ্টা পর, নিচু পাহাড়সারির মধ্য দিয়ে এবং নদীর আশপাশের বালুময় চিলতে ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে উটচালনা করছিল রানারা। একটু পরে, আবু হাতেম ইশারায় মোড় ঘুরে পানির দিকে যেতে নির্দেশ করল।
‘যত খুশি পানি খাক উটগুলো,’ বলল ও। ‘ক্যান্টিন পানিতে ভরে নাও। আর যতটা পারো নিজেরাও গেলো।’
‘নদী অনুসরণ করলেই পারি আমরা,’ বৃদ্ধ বিজ্ঞানী মন্তব্য করলেন। ‘উজানে যাচ্ছি, এবং যেতেও চাই সেদিকে।’
‘নদী পারের লোকজন ওদের দোস্ত,’ যে গ্রামটা থেকে পালিয়েছে ওরা, আবু হাতেম তর্জনী দেখাল সেদিকে। ‘এরা আমার বন্ধু না। নদীর ধার ধরে খুঁজবে আমাদের। মরুভূমিতে যাব আমরা।’
‘যুক্তি আছে ওর কথায়,’ বিজ্ঞানীকে বলল রানা। ফিরল ডানাকিল গাইডের দিকে। ‘পর্যাপ্ত পানি আর খাবার আছে আমাদের সঙ্গে?’
‘না,’ বলল আবু হাতেম। ‘কিন্তু পেয়ে যাব হয়তো। আর নয়তো যাদের আছে তাদের দেখা পাব।’ রাইফেলে চাপড় দিল। ‘আমি যখন এসেছি, ভেলায় চড়ে এসেছি,’ বললেন কুদরত চৌধুরী। ‘জার্নিটা তখন খুব বেশি লম্বা মনে হয়নি, আর…’
‘মরুভূমি,’ ওঁর কথা কেড়ে নিল রানা। ‘ক্যান্টিন ভরতে শুরু করুন। মালদিনি সবার সামনে দিয়ে আপনাকে নদীপথে নিয়ে এলে বুঝতে হবে, তীরে ভাল প্রভাব আছে ওর।’
‘এটা ভেবে দেখিনি তো,’ বললেন বিজ্ঞানী। ‘মরুভূমি,’ বলল আলী দাঈ, ‘বাস করার জন্যে মরুভূমি দারুণ জায়গা।’
‘তা যা বলেছ,’ টিটকারি মেরে সায় জানাল জোসেফ ক্রেন।
কে কার চেয়ে ভাল উট সামলায়, এবং মরুবিশেষজ্ঞ হিসেবে কে কাকে টেক্কা দেবে, তার প্রতিযোগিতা চলছে আবু হাতেম ও আলী দাঈর মধ্যে। এদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যতক্ষণ লাভবান হচ্ছে চিন্তা নেই, ভাবল রানা, কিন্তু খাবার-পানি কমে এলে ওরাই না আবার রানাদের বিরুদ্ধে ঘোঁট পাকায়। তাছাড়া আবু হাতেমের এলাকায় প্রবেশের পর তার আচরণ কেমন হবে রানা সে ব্যাপারেও চিন্তিত। তখনও কি বন্ধু ভাববে ওদের, নাকি বাগে পেয়ে খুন করে কিছু নতুন বালা বাগাতে চাইবে?
নদী পেরিয়ে রাতের আঁধারে পালাচ্ছে দলটা। রানা লক্ষ করেছে পুব থেকে উত্তরে এগোচ্ছে ওরা, ফলে ঊষার আলো ফুটি ফুটি করতে পশ্চিমের ছায়াময় পাহাড়সারি দূরে মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে। ক্ষণিকের জন্যে, আবু হাতেমের বিবেচনা বোধ সম্পর্কে রানার মনে প্রশেড়বর উদয় হলো। লোকটা মরুভূমির বিরূপ পরিবেশে অভ্যস্ত, কিন্তু আর সবাই তো তা নয়, তারা ভয়ঙ্কর অসহায় এখানে।
কিন্তু পরে মনে হলো লোকটার প্ল্যানে কোন ফাঁক নেই। মরুভূমির জঘন্যতম অঞ্চলের ওপর দিয়ে নিয়ে চলেছে, গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ উপেক্ষা করছে, এভাবে হয়তো দূর উত্তরে, তিগ্রাই প্রদেশে পৌঁছে মালদিনির প্রভাব বলয় থেকে মুক্ত হতে পারবে ওরা। যথার্থ কারণ ছিল, আবু হাতেমের পর্যাপ্ত পানি নিতে বলার পেছনে। পশ্চিমমুখো না হওয়া অবধি ধু-ধু, জ্বলন্ত বালির বুকে থাকতে হবে দলটিকে।
অবশেষে মাঝবিকেলে ওদের থামতে নির্দেশ দিল আবু হাতেম। বাতাসের ঝাপ্টায় উড়ছে বালি। উঁচু বালির ঢিবিগুলোর মাঝে একটা অবতলের মত সৃষ্টি হয়েছে। পুবের ছোট্ট এক ফোকর দিয়ে কেবল প্রবেশ করা যায় প্রাকৃতিক বৌলটার মধ্যে। গোটা দশেক উট রাখার মত সুপরিসর জায়গাটা, বিশ্রামের জন্যে আদর্শ।
রানা কৃতজ্ঞচিত্তে নেমে পড়ল। আড়মোড়া ভেঙে, বরাদ্দ থেকে পান করল সামান্য পানি। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে আশা করা যায় ছায়া দেবে ঢিবিগুলো।
ছায়া! টনি গ্রেগের সরবরাহ করা ইউরোপীয় পোশাকের পিন্ডি চটকাল রানা মনে মনে। আহা, এমুহূর্তে যদি এগুলো পাল্টে স্থানীয় আলখাল্লা গায়ে চড়াতে পারত। যাত্রার শেষ দিকে, পানি, লোকজন আর জন্তু-জানোয়ার চোখে পড়ছিল রানার-বলাবাহুল্য, কল্পনায়। আরেক ঢোক পানি গিলে এযাত্রা টিকবে কিভাবে ভাবতে লাগল ও।
‘পাহারা বসাতে হবে?’ আবু হাতেমকে জিজ্ঞেস করল রানা।
‘হ্যাঁ। ওরা পিছু নেবে। লোকলস্কর আর উটের অভাব নেই ওদের। একদিনে আমাদের ট্র্যাক বাতাসে মুছে যাবে না। আমি আর সোমালীটা দিনের বেলা পাহারা দেব। তুমি রোদের মধ্যে ভাল দেখতে পাবে না। ক্রেন আর তোমার ডিউটি রাতে।’
এতটাই ক্লান্ত, খেতে মন চাইছে না, রানা লক্ষ করল আবু হাতেম বুকে হেঁটে সবচাইতে উঁচু ঢিবিটায় গিয়ে উঠল। আত্মগোপন করে এলাকাটা জরিপ করার জন্যে নিজের কবর রচনা করল বালিতে। ওর উটের ছায়ায় শুয়ে চোখ বুজল রানা। একসময় কাঁধ ধরে আলী দাঈ ঝাঁকাতে ঘুম ভাঙল। সূর্য পাটে বসেছে।
‘এখন তোমার পালা,’ বলল আলী দাঈ। ‘কিছু খেয়ে নাও।’
রানা ওকে ঘুমাতে যেতে বলে, বীফের একটা টিন খুঁজে বের করল। ঘুমন্ত কুদরত চৌধুরীকে টপকে টিনটা আনতে হয়েছে ওকে। বৃদ্ধ বিজ্ঞানীর শারীরিক অবস্থা বিশেষ সুবিধের নয়। এরকম আর কটা দিন টিকবেন কে জানে। কোথায় অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরী আর কোথায় ইথিওপিয়ার কান্তার মরু। বেচারা! ইচ্ছে করেই ওঁকে পাহারা দেয়া থেকে বাদ রেখেছে ওরা। বীফের কৌটো খুলে বালির উঁচু ঢিবিটার উদ্দেশে পা বাড়াল।
আবু হাতেম আর আলী দাঈ আবছা এক পায়ে চলা পথ তৈরি করেছে। ওটা অনুসরণ করল রানা, বেগ পাচ্ছে দ্রুত পরিবর্তনশীল ঢালের ওপর দেহ-ভারসাম্য বজায় রাখতে। মাথার ওপর অগুনতি নক্ষত্র রাতের মরুর স্বচ্ছ বাতাস, সারা দিনের অসহ্য গরমের পর, কেমন কাঁপ ধরিয়ে দেয় শরীরে। ঢিবির চূড়ায় বসে খাওয়ায় মন দিল রানা। গরুর মাংস লবণে ভর্তি, বিস্বাদ। কি আর করা, এখন এই-ই খেতে হবে।
আগুন জ্বালেনি ওরা। পশ্চিমের পর্বতমালায় আরেকটা দল রয়েছে, বেঁচে থাকার প্রশেড়ব রানাদের চাইতে অনেক আত্মবিশ্বাসী তারা, পিছু নিয়ে ওদেরকে অতর্কিতে হামলা করবে শত্রুপক্ষ সে ভয় করছে না। ছোট্ট করে আগুন জ্বাললেও, নির্মল বাতাসে আর রাতের অন্ধকারে সেটাকেই উজ্জ্বল আলোক-সঙ্কেতের মত দেখাচ্ছে। মালদিনির লোকদের ভুল পথে নিয়ে যাক ওটা, কামনা করল রানা।
মাথার অনেক ওপর থেকে জেটপে−নের গোঁ-গোঁ শব্দ ভেসে এল। মুখ তুলে চাইল রানা। বাতি পিট পিট করছে, কমপক্ষে আট হাজার ফীট উচ্চতা বজায় রেখেছে ওটা অনুমান করল ও। মালদিনির পে−ন-হেলিকপ্টার নেই। ইথিওপিয়ানরা আকাশ থেকে ওকে স্পট করতে পারল না কেন, প্রশ্নটা আবারও পেঁচিয়ে গেল মগজের মধ্যে। হয়তো ঘাটে ঘাটে পয়সা দিয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ লোকজনদের ঠুঁটো করে রেখেছে লোকটা, ব্যাখ্যা দাঁড়
করাল মনে মনে।
নাহ, আর সম্ভব নয়। একটু গড়িয়ে না নিলে আর চলছে না। যাত্রার ধকলে ঢলে পড়তে চাইছে শরীর। নির্দিষ্ট সময় শেষ হতেই ঢিবির ঢাল বেয়ে নেমে এল রানা।

জোসেফ ক্রেন যখন পাহারায়, এমনি সময় হামলাটা করল মালদিনির লোকেরা। ওর হুঁশিয়ারী চিৎকারে মুহূর্তে সজাগ হয়ে গেল রানা। .৩৮ এর ছোট, ভোঁতা গর্জনটা এবার শুনতে পেল। পাল্টা জবাব দিল কমপক্ষে গোটা দুই অটোমেটিক আর কয়েকটা রাইফেল। রানা ছোঁ মেরে ওর সাবমেশিনগান তুলে নিল।
টলমল করতে করতে তিন আক্রমণকারী ঢিবি বেয়ে নেমে আসছে, সঙ্গে চলছে ফায়ারিং। কাঁধে বাট ঠেকিয়ে অ্যাকশনে সামিল হলো রানা। নিচে যখন নামল, দলটার কেউই নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নেই।
ওর পাশ থেকে ‘বুম’ ‘বুম’ শব্দ করছে জুলেখার রাইফেল। সাঁ করে মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেল একটা বুলেট। আবু হাতেম, কুদরত চৌধুরী আর আলী দাঈ যুদ্ধে যোগ দিয়েছে, যুগপৎ ওপেন করেছে ফায়ার। ঢিবির ফাঁক-ফোকর দিয়ে মূলত স্রোতের মত ধেয়ে আসছে প্রতিপক্ষ। দলবদ্ধতার কারণে আসলে কপাল পুড়ছে ওদের। সহজেই রানারা টপাটপ ফেলে দিচ্ছে শত্রুদের।
যত দ্রুত শুরু হয়েছিল, ঠিক ততটাই দ্রুত থেমে গেল সব গোলমাল। চারধারে নজর বুলিয়ে আরও টার্গেট খুঁজল রানা। অবতলের মধ্যখানে ওরা চারজন দাঁড়িয়ে। ওদের একটা উট মাটিতে শুয়ে ছটফট করছে। অন্যগুলো ঘাবড়ে গিয়ে ডাকাডাকি করছে আর ছুটে পালানোর পাঁয়তারা করছে।
‘ওগুলোর ব্যবস্থা করো, আলী,’ জরুরী কণ্ঠে বলল রানা।
লোকটা দৌড়ে গেল উটেদের কাছে।
‘আমি ওখানটা পাহারা দিচ্ছি,’ বলল আবু হাতেম, তর্জনী দেখাল মূল আক্রমণটা যেদিক থেকে এসেছিল। ‘তুমি জোসেফের খোঁজ নাও!’
চাঁদের উদ্ভাসিত আলোয় ছড়িয়ে পড়ে থাকা দেহগুলোর উদ্দেশে বেপরোয়ার মত ছুটল ডানাকিল। যে তিনটেকে গুলি করেছিল তাদের দিকে সন্তর্পণে এগোল রানা। ফোকরের দিক থেকে একটা আর্তচিৎকার কানে এল। চকিতে চাইল রানা। কিলবিল করছে একটা দেহ, সেটার দিকে অস্ত্র নির্দেশ করছে আবু হাতেম।
রাইফেলের শব্দ হওয়ার আগেই ঘুরে গেল রানা। তালগোল পাকিয়ে পড়ে থাকা লোক তিনটের জট ছাড়াতে ব্যস্ত হলো। একজনকে মনে হলো মৃত, কিন্তু বাকি দু’জন গুরুতর জখম হলেও শ্বাস নিচ্ছে। ওদের অস্ত্র জব্দ করে, আহতদের নিজেদের ক্যাম্পের দিকে ছেঁচড়ে টেনে নিয়ে এল রানা। তারপর ঢিবির চড়াই বাইতে আরম্ভ করল।
পেছন থেকে এসময় গুলির শব্দ হলো। পাঁই করে ঘুরল রানা, অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছে। এক লোকের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে জুলেখা। রানা লক্ষ করছে, আরেকজনের কাছে সরে গেল যুবতী, আধমরা লোকটাকে মাথায় গুলি করল মেয়েটা। তারপর ঢিবির ঢালে রানার সঙ্গে এসে যোগ দিল।
‘এদের নিয়ে কি করবে?’ রানাকে প্রশ্ন করল।
‘এখানে রেখে যাব ভাবছি।’
‘আমরা কখন গেছি, কোন্‌দিকে গেছি মালদিনিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানর জন্যে?’ হেসে উঠল যুবতী। ‘ওরা আমাদের খুন করতে এসেছিল, রানা, বন্দী করে নিয়ে যেতে নয়।’
‘চৌধুরী সাহেব কোথায়?’
‘ওঁকে আড়ালে থাকতে বলেছি,’ জানাল জুলেখা।
জুলেখাকে পেছনে নিয়ে ঢিবিতে উঠে এল রানা। চূড়ার কাছে নিথর শুয়ে জোসেফ ক্রেন। দেহটা উল্টে দিয়ে মুখ থেকে বালি ঝেড়ে দিল রানা। মুখের ভেতর থেকে রক্তের ধারা গড়িয়ে নামল কষা বেয়ে। গোটা বুক ও তলপেট গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে লোকটার। বালিতে লাশটা শুইয়ে রেখে বুকে হেঁটে চূড়ায় উঠে এল রানা। উঁকি দিল আলগোছে।
ঢালের মাঝামাঝি হাত-পা ছড়ানো একটা দেহ নজর কাড়ল প্র মে। যাক, একজনকে অন্তত খতম করে গেছে জোসেফ। পাহারা দিতে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিল কিনা ভাবল রানা, নাকি শত্রুপক্ষ আসছে টেরই পায়নি? চন্দ্রালোকিত মরুতে ওদের উট দেখা যেতে পারে, কিন্তু দৃষ্টিসীমার মধ্যে কিছুই দেখতে পেল না ও।
উটে চেপেই এসেছে ওরা। যানবাহন হলে শব্দ পাওয়া যেত। এলাকাটা তনড়ব তনড়ব করে নিরীখ করছে রানা, শরীরটা নুইয়ে রেখেছে যাতে চাঁদের আলোয় সিলুয়েট ওর প্রকাশ হয়ে না পড়ে। বেশিক্ষণ নয়, সামান্য পরেই এক বালির ঢিবির আবছায়ায় উটগুলো নজরে এল ওর। প্রতিপক্ষের দু’জন লোক ওগুলোর কাছে দাঁড়ানো, তাদের উত্তেজিত ভাব-ভঙ্গি বলে দিচ্ছে অবতলের ঘটনা সম্পর্কে তারা স্পষ্টতই স্নায়ুর চাপে ভুগছে। রানাদের ক্যাম্পে আসার রাস্তার মধ্যখানে ওদের অবস্থান। কাজেই আবু হাতেমের হাতে সঙ্গীদের নির্মম মৃত্যু, ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ওরা দেখতে পায়নি।
খুব সাবধানে, শূটিং পজিশনে নিয়ে সাবমেশিনগান তাক করতে লাগল রানা। কিন্তু সাবধানতা সত্ত্বেও ধরা পড়েই গেল। একটা লোক চেঁচিয়ে উঠে ওকে লক্ষ্য করে রাইফেল তুলল। চকিতে এক পশলা গুলিবর্ষণ করল রানা, লোকটাকে লাগাতে ব্যর্থ হলেও, তার লক্ষ্য টলিয়ে দিল। ফলে শত্রুর রাইফেলের বুলেট ওর অনেকখানি বাঁয়ে বালি ছিটকে তুলল। ভয় পেয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল গোটা কয়েক উট।
দ্বিতীয় লোকটা লাফিয়ে সওয়ার হলো একট উটের পিঠে।
এবার সময় নিয়ে লক্ষ্যস্থির করার সুযোগ পেল রানা। গুলিবিদ্ধ আরোহীকে ফেলে মরুভূমিতে ছুটে পালাল জানোয়ারটা। ফাঁকটার কাছে হঠাৎ এক ছায়ামূর্তি উদয় হলো, পরমুহূর্তে রানার মুখের ক’ইঞ্চি তফাতে বালি ছিটকে উঠল। গোলাগুলির শব্দে আতঙ্কিত উটগুলোর দিগ্বিদিক্‌ ছোটাছুটির ফলে পাল্টা গুলি চালাতে ব্যর্থ হলো রানা। কিন্তু পরমুহূর্তে নেই হয়ে গেল জানোয়ারগুলো, ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলেছে মরুভূমির বুকে-সওয়ারীদের ফেলে। মাটিতে কালো মত একটা পিণ্ড পড়ে আছে, আধো আলো আধো অন্ধকারে। রানা লক্ষ করল, ঝিক করে উঠল একটা ছোরা। আর তারপর কানে এল এক পিলে চমকানো আর্তচিৎকার।
ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়াতে দেখা গেল একজনকে। বালিতে মুখ গুঁজে পড়ে রয়েছে অপরজন। এসময় হাঁচড়ে পাঁচড়ে ঢিবির মাথায় উঠে এল জুলেখা। সাবমেশিনগান রানার হাতে রেডি।
‘ছোরাবাজটা আবু হাতেম,’ বলল জুলেখা।
‘ঠিক জানো?’
‘হ্যাঁ।’
‘তোমার নাইট ভিশন তো দারুণ!’
উঠে দাঁড়াল ওরা। ডানাকিল রানাদের উদ্দেশে হাত নেড়ে নেচেকুদে অস্থির।
‘আলী দাঈকে বলো গিয়ে আর গুলি না করতে,’ রানা বলল জুলেখাকে।
‘করবে না। উটেদের সঙ্গে লেগে আছে সে।’
ঢাল বেয়ে হড়কে নেমে আবু হাতেমের সঙ্গে যোগ দিল রানা।
‘ছুরির খেল ভাল দেখিয়েছ,’ প্রশংসার সুরে বলল।
‘আমরা ওদের খতম করেছি,’ বলল লোকটা, বন্ধুসুলভ ভঙ্গিতে রানার কাঁধে হাত রাখল।
‘আলী দাঈর কি খবর? ও ক’জনকে মারল?’
‘ওই সোমালী? ফুহ্‌, মারবে কি, দেখোগে ভয়ে নিজেই হয়তো মরে পড়ে আছে।’ আঁধারে চারধারে দৃষ্টি বুলাল লোকটা। ‘ওদের কাছে যদি রেডিও থেকে থাকে? হয়তো মারা পড়ার আগে মালদিনিকে খবর দিয়ে গেছে। এক ব্যাটার পিঠে একটা জিনিস দেখেছি। রেডিও মনে হলো।’
‘রেডিও? কই দেখি,’ সাগ্রহে বলল রানা।
রানাকে একটা মৃহদেহের কাছে নিয়ে এল ডানাকিল। লাশের বহন করা খোলা প্যাকের ভেতরটা লক্ষ করল রানা। হ্যাঁ একটা ফিল্ড ট্র্যান্সিভারই বটে। লং রেঞ্জের।
‘এটা রেডিওই,’ বলল ও।
পরমুহূর্তে এক ঝাঁক বুলেট রানার পা ঘেঁষে চুরমার করে দিল ট্র্যান্সিভার। ভেতরটা ছিনড়বভিনড়ব হয়ে উড়ে গেল যন্ত্রাংশের নানা পার্টস। ঘুরে দাঁড়িয়ে আবু হাতেমকে গুলি চালনা বন্ধ করতে বলবে, তার আগেই ম্যাগাজিন খালি। একপাশে রাইফেলটা ছুঁড়ে
ফেলে দিল ডানাকিল।
‘এখন আর আমাদের খুঁজে পাবে না,’ বলল লোকটা। ‘কেউ রেডিও ব্যবহার করে আমাদের খোঁজ পাচ্ছে না।’
‘দুনিয়ার কেউ না,’ সায় জানাল ঈষৎ ক্ষুব্ধ রানা। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত মৃতদেহগুলোর মাঝ দিয়ে পথ করে নিয়ে উটগুলোর কাছে ফিরে এল ওরা। মরুভূমির জংলীটার ওপর মেজাজ দেখিয়ে কোন লাভ নেই। ও-ই তো গাধার মত চুপ করে না থেকে, আগে বোঝাতে পারত লোকটাকে, রেডিওটা ব্যবহার করে মুক্তি চেয়ে বার্তা পাঠানো যায়। তাহলে নিশ্চয়ই ওটা ধ্বংস করতে যেত না আবু হাতেম। বাঁচতে চাইলে, বুঝতে পারছে রানা হাড়ে হাড়ে, এদের মত চিন্তা-ভাবনা নিয়ে চলতে হবে মরুভূমিতে।
‘কয়েকটা দুঃসংবাদ আছে, রানা,’ ক্যাম্পে ফিরতে বললেন কুদরত চৌধুরী। ‘আমি জানি না ড্রাগ শেষ হলে আমার অনুচররাও বিপক্ষে চলে যাবে কিনা। আর আসল খারাপ খবরটা হলো, যে উটটার পিঠে বেশিরভাগ খাবার-দাবার ছিল সেটা মারা পড়েছে। ওর মাল-পত্র, আর প্রচুর পানি ছড়িয়ে ছিটিয়ে নষ্ট হয়েছে। এখনও পানি চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। আলী দাঈ যতটা পারে বাঁচানর চেষ্টা করছে।’
‘কি বলছেন?’ আবু হাতেমের জিজ্ঞাসা।
ধীরে ধীরে পুরোটা ইতালিয়ানে বলল ওকে জুলেখা।
‘মালদিনির লোকদের কাছে পানি থাকতে পারে।’
‘ছিল, কিন্তু মাত্র তিনজনের ক্যান্টিনে। এবং সেগুলোও আধখালি। উটের পিঠে পানি ছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু এখন ওগুলোকে পাবে কোথায়? বেওয়ারিশ জানোয়ারগুলো কোন্‌ নরকে ঘুরে বেড়াচ্ছে কে জানে!’
‘আমাদের এ জায়গা ছাড়তে হবে,’ বলল আবু হাতেম।
‘হ্যাঁ,’ বলল রানা। ‘হামলা করার আগেই হয়তো রেডিও ব্যবহার করেছিল ওরা।’ আলী দাঈর কাছে গেল ও। ‘কি খবর?’
‘ভাল,’ জবাব এল। ‘উটের অন্তত অভাব হবে না।’
উটে চেপে রাতেই রওনা হয়ে গেল দলটা। আবু হাতেম ও আলী দাঈ দু’জনেই অবিরাম জরিপ করে গেল মরুভূমি। সূর্য উঠতে পেছনে দিগন্ত নিরীখ করল, অনুসরণকারীদের চিম দেখতে পায় যদি। রানাও লক্ষ করল, কিন্তু স্থানীয়দের চোখ এড়াচ্ছে এমন কিছু দেখার আশা নেই, জানে ও। সম্ভবত সবার অলক্ষে পালাতে পেরেছে ওরা।
‘মালদিনির হাত কতদূর লম্বা?’ জুলেখাকে প্রশ্ন করল রানা।
‘আজ-কালের মধ্যে ওর প্রভাববলয় পেরোতে পারব আমরা।
কোন সর্দার যদি অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে, বড়সড় এলাকা নিয়ে শাসন করে, তাকে চিনে যায় আদ্দিস আবাবা। মালদিনি তেমন নয়, মানে আমার ধারণা আরকি। এখনও তো হুমকি দিতে শুরু করেনি সে।’
পানির অপ্রতুলতা ভাবাচ্ছে রানাকে। প্রচণ্ড দাবদাহ ডিহাইড্রেটেড করে দিচ্ছে সবাইকে। পানির রেশনিং এতটাই কঠোরভাবে মেনে চলেছে ওরা, গলায় সার্বক্ষণিক বালির অস্তিত্ব
টের পাচ্ছে রানা। মাথা ঝিম্‌ ঝিম্‌ করছে ওর, জ্বরাক্রান্ত অনুভূতি।
সেদিন বিকেলে থামলে পর, আবু হাতেমকে সমস্যাটা নিয়ে প্রশ্ন করল রানা।
‘আরও চারদিনের পানি লাগবে আমাদের,’ বলল সে। ‘কিন্তু দু’দিনের মধ্যে, পাহাড়ের দিকে মোড় নিয়ে পানির খোঁজ বের করে ফেলতে পারব। বন্দুকঅলা লোকজনের দেখাও পেয়ে যেতে পারি।’
‘পানি কোন সমস্যা না,’ সায় দিয়ে বলল আলী দাঈ।
ওকে অগ্রাহ্য করল ডানাকিল।
‘পানি কোথায় পাব জানো তুমি?’ কুদরত চৌধুরীর প্রশ্ন।
‘না। দুধ কোথায় আছে জানি। চেয়ে থাকুন, দেখতে পাবেন।’
নিজের উটের কাছে গিয়ে, শূন্য এক চামড়ার থলে স্যাডল থেকে তুলে নিল ও। পরম সতর্কতায় পরখ করে নিশ্চিত হলো ফুটো-ফাটা নেই ওটায়, এবার পিছু সরে এসে উটগুলোকে নিরীখ করল। একটার দিকে হেঁটে গিয়ে গল্প জুড়ে দিল। জন্তুটা সরে গেল ওর সামনে থেকে।
‘জানোয়ারটা পালালে ব্যাটাকে হাঁটতে হবে,’ ঘোষণা করল আবু হাতেম।
আলী দাঈ বকবক করেই চলেছে। উটটা সমঝদারের মত শুনছে মনে হলো। সামান্য একটু পিছু হটে, ঠায় দাঁড়িয়ে ছোট মানুষটাকে লক্ষ করছে। এবার ঘাড়টা একটুখানি সামনে আনল, থুতু দেবে না কামড় ভেবে পেল না রানা। চুরি করার পর থেকে নিজের উটটার সঙ্গে ব্যক্তিগত লড়াই চলছে ওর, এবং পায়ে চার চারটে বেদনাময় কামড় খেয়ে এ মুহূর্তে হারু পার্টি সে।
মৃদু কণ্ঠে কথা বলে যাচ্ছে আলী দাঈ। উটটা এগিয়ে এল, নাক ঘষল, অপেক্ষা করছে মানুষটা কখন ওকে আদর করবে। ধীরে সুস্থে ওটার গায়ের কাছে সেঁটে আসছে সোমালী, নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিল একটা পাশ। মুখ চলছে, লম্বা জানোয়ারটার নিচে পৌঁছে হাত বাড়াল দুধের বাঁট ধরতে। দাঁড়ানর ভঙ্গি পাল্টে গেল উটটার।
‘আগে কখনও হয়তো এগুলোর দুধ দোয়ানো হয়নি,’ বলল জুলেখা।
‘ওকে খুন করে ফেলবে,’ বলল আবু হাতেম।
‘আল্লার কাছে দোয়া করো যেন না করে,’ বলল রানা। ‘ও মরলে আমরাও কেউ বাঁচব না।’
কুলুপ পড়ল ডানাকিলের মুখে। আলী দাঈকে লক্ষ করছে রানা। অত্যন্ত ধীর-শান্ত গতিতে নড়াচড়া করছে সে, দুধ দোয়ানোর জন্যে মিষ্টি কথায় ভোলাতে চাইছে উটটাকে। বউকেও কেউ বাসর রাতে এত মধুর কথা বলে না। আচমকা বাঁট চেপে ধরে থলেটা নিয়ে এল সে জায়গা মতন। ঝাঁকি দিয়ে সরে গেল জানোয়ারটা। মুহূর্তের জন্যে কেমন থমকে মত গেল আলী দাঈ। স্থাণুর মতন দাঁড়িয়ে এখন। হঠকারী পদক্ষেপ নিলে চোখের
পলকে পগার পার হয়ে যাবে উটটা। এবং এর অর্থ, মরুভূমিতে দলের অন্তত একজন মারা পড়বে। জুলেখা, কুদরত চৌধুরী, আবু হাতেম আর রানা নিস্পন্দ থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। উটটাকে লক্ষ করে রানার ধারণা হলো, গরুর কিংবা ছাগলের দুধ
দোয়ানোর মত সহজ করে প্রকৃতি এদেরকে গড়েনি।
আরেকবার উটটার কাছ ঘেঁষে এল আলী দাঈ। শরীরের এক পাশে ধরে রেখেছে থলেটা। সেই আগের প্রক্রিয়া এবারও খাটাতে চেষ্টা করল ও। এদফায় বাঁট চেপে ধরতে মৃদু গান গেয়ে উঠল যেন উটটা, এবং তারপর নীরব হয়ে গেল। দ্রুত হাতে দুধ দোয়াচ্ছে আলী দাঈ, মাঝে মধ্যে থলেটা সরে গেলে লাথি মেরে বালির খুদে ফোয়ারা তুলছে উট। অবশেষে, সরে এল ও, তার আগে মৃদু আদুরে চাপড় দিল ওটার পশ্চাদ্দেশে। এবার সঙ্গীদের দিকে ঘুরে তাকাল, বেরিয়ে পড়েছে বত্রিশ পাটি দাঁত।
চামড়ার থলে উপচে পড়ছে দুধে। লম্বা এক চুমুক দিয়ে রানার কাছে হেঁটে এল সোমালী। ‘মজা আছে,’ বলল। ‘খেয়ে দেখো।’ থলেটা বৃদ্ধ কুদরত চৌধুরীর দিকে বাড়িয়ে দিল রানা। বিজ্ঞানী চুমুক দিলেন মুখ বিকৃত করে।
‘সোমালীরা উটের দুধ খায়,’ ফস করে বলে বসল আবু হাতেম। ‘ওরা উটের বাচ্চা।’
ক্রুদ্ধ গর্জন ছেড়ে কোমরে গোঁজা ছুরিতে টান দিল আলী দাঈ। ডানাকিল তার নিজের ছুরি ইতোমধ্যে বের করে ফেলেছে। বিদ্যুৎগতিতে লাফিয়ে পড়ে রানা লোক দুটোকে কোনমতে ঠেকাল। দু’জনের মাঝখানে দাঁড়ানোর মত বোকামি করেনি ও। কিন্তু অতর্কিতে চেপে ধরাতে দু’হাতে দু’জনকে মাটিতে নুইয়ে দিতে পারল। সাবমেশিনগান তাক করল এবার ও। ‘যথেষ্ট হয়েছে!’
পরস্পরকে দৃষ্টি দিয়ে ভস্ম করে দিল ওরা।
‘আমাদের উটের দুধ খাওয়াতে পারবে তুমি?’ আবু হাতেমের কাছে জবাব চাইল রানা।
লোকটা ওর কথার জবাব দিল না।
এবার আলী দাঈর উদ্দেশে ফিরে বলল রানা, ‘তুমি আমাদের গাইড করে মরুভূমি পার করতে পারবে?’
‘ও অপমান করেছে আমাকে,’ বলল সোমালী।
‘আর তোমরা দু’জনেই আমাকে অপমান করেছ!’ গর্জে উঠলেন বিজ্ঞানী। ওদিকে রানা তাক করে ধরে আছে সাবমেশিনগান।
সাবধানে শব্দ বাছাই করে, ধীর-সংযত ইতালিয়ানে বলল রানা, ‘তোমরা একে অন্যকে মারতে চাইলে ঠেকাতে পারব না আমি। এই বন্দুক দিয়ে তোমাদের সর্বক্ষণ পাহারা দেয়া সম্ভব নয়। আমি জানি তোমরা বংশগতভাবে শত্রু। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো। তোমাদের মধ্যে একজন যদি মরো-কিংবা আমাদের কেউ একজন যদি মরে-সবাই মরব।’
‘কিভাবে?’ আবু হাতেম জিজ্ঞেস করল।
‘শুধু আলী দাঈর পক্ষেই দুধ জোগানো সম্ভব। আর তোমার পক্ষে সম্ভব আমাদের মরুভূমি পার করা।’
‘আর তোমরা দু’জন?’ সোমালীর প্রশ্ন। ‘চৌধুরী সাহেবের কথা বলছি না। উনি আমাদের ওস্তাদ।’
‘আমি মরলে মালদিনি পুরো মরুভূমি তো নেবেই আরও অনেক জমি কব্জা করে নেবে। তোমাদেরকে তনড়ব তনড়ব করে খুঁজবে সে, ওর সঙ্গে বেঈমানী করেছ যেহেতু। এবং একমাত্র জুলেখাই সময় মত তার লোকেদের সতর্ক করতে পারবে, যাতে অস্ত্রশস্ত্র এনে লোকটাকে ওরা খুন করতে পারে।’
ক’মুহূর্তের নীরবতার পর দেহের পেশী শিথিল হলো আবু হাতেমের। ছোরাটা খাপবন্দী করল সে। তারপর দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
‘তুমি যোদ্ধাদের নেতা। তুমি বলছ যখন বিশ্বাস করলাম। সোমালীটাকে আর অপদস্থ করব না কথা দিচ্ছি,’ চেঁচিয়ে বলল।
‘বেশ,’ বলল রানা, চাইল নিচের দিকে। ‘যা হয়েছে ভুলে যাও। ছোরাটা ভরে রাখো।’
খাপে ছোরা ভরে ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়াল আলী দাঈ। ওর অভিব্যক্তি পছন্দ হলো না রানার। একে চোখে চোখে রাখতে হবে।
‘খেতে ভাল না,’ বলল জুলেখা, থলেটা বাড়িয়ে ধরল রানার দিকে। ‘কিন্তু পুষ্টিকর।’
লম্বা করে শ্বাস টেনে ঠোঁটের কাছে তুলল ওটা রানা। দুর্গন্ধে বমি এল ওর। এর তুলনায় ছাগলের গন্ধযুক্ত দুধ স্বর্গসুধা বলা চলে। প্যাকেটে করে বেচলেও এ জিনিস কারও গলা দিয়ে নামবে কিনা সন্দেহ। খুদে খুদে পিণ্ড ভাসছে দুধে, এবং রানা নিশ্চিত নয়, ওগুলো ক্রিম, চর্বি নাকি থলের নোংরা। দুধটার স্বাদও জঘন্য।
ডানাকিলের হাতে থলেটা গছিয়ে দিয়ে মিষ্টি সুবাতাসে বুক ভরে নিল রানা। ওটা থেকে পান করল লোকটা, মুখখানা বিস্বাদ করে রানা ও জুলেখার দিকে চাইল, তারপর থলে তুলে দিল সোমালীর হাতে। প্রাণ ভরে পান করে খুশির হাসি হাসল আলী দাঈ।
‘উটের দুধ পেলে আর কিছুই খাওয়া লাগে না,’ বলল।
‘উটের দুধ এই প্র ম খেলাম আমি,’ বলল জুলেখা।
‘আমি তো ভেবেছিলাম ইথিওপিয়ায় সবাই এর দুধ খায়।’
‘তোমাদের দেশে গরীব মানুষ নেই, রানা? তারা অখাদ্য-কুখাদ্য খায় না?’ পাল্টা বলল জুলেখা।
আপনা থেকেই মাথা নত হয়ে গেল রানা আর বিজ্ঞানীর।
ইথিওপিয়ার চাইতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক ভাল। কিন্তু তাই বলে কি লোকে সব স্বাস্থ্যকর, সুস্বাদু খাবার খাচ্ছে? মোটেই না। গরীব মানুষদের পুষ্টির অভাব তো রয়েইছে, যারা সচ্ছল তারাও কি বাজার থেকে নির্ভেজাল জিনিস পাচ্ছে?
‘হ্যাঁ, খায়,’ স্বীকার করল রানা।
ফের উটে চেপে বাকি দিনটা পাড়ি দিল ওরা। সূর্যাস্তের ঠিক আগে, সুবিস্তৃত এক প্রান্তরের মাঝামাঝি এসে পৌঁছল। আবু হাতেম উট থেকে নেমে, স্যাডলব্যাগ থেকে দড়ি বের করল। পা বেঁধে রাখবে উটগুলোর।
‘পাহারা দিলে,’ বলল ও, ‘কেউ এখানে অতর্কিতে চমকে দিতে পারবে না আমাদের।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *