২৭. মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত

মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত

ইমাম যুহরী উরওয়া সূত্রে হযরত আইশা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন : আর তখন তিনি ছিলেন মক্কায় আমাকে দেখানাে হয়েছে হিজরত ভূমি। তা কোলাহলপূর্ণ এলাকা, খজুর বৃক্ষ পরিবেষ্টিত কৃষ্ণ প্রস্তরময় দু’টি অঞ্চলের মধ্যখানে তা অবস্থিত। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন একথা বলেন, তখন কিছু লোক মদীনার দিকে হিজরত করে এবং মুসলমানদের মধ্যে যারা হাবশায় হিজরত করেছিলেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ ফিরে এসে মদীনায় হিজরত করেন। ইমাম বুখারী এ বর্ণনা করেন। হযরত আবু মূসা (রা) নবী (সা) থেকে বর্ণনা করেছেন। আমি স্বপ্নে দেখি যে, আমি মক্কা থেকে এমন এক ভূমিতে হিজরত করছি, যা খজুর বৃক্ষ পরিবেষ্টিত। আমার ধারণা হল যে, এলাকাটা হবে ইয়ামামা বা হিজর, দেখা গেল যে তা মদীনা অর্থাৎ ইয়াছরিব। ইমাম বুখারী অন্যত্র দীর্ঘ এ হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম মুসলিম আবু কুরাইব সূত্রে আবদুল্লাহ ইবন কায়স-এর বরাতে নবী (সা) থেকে দীর্ঘ হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। বায়হাকী হাফিয সূত্রে জারীর (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহ আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন :

আল্লাহ তা’আলা আমার প্রতি ওহী প্রেরণ করেন, এ তিনটি শহরের যেখানেই অবস্থান করবে তা-ই হবে তোমার হিজরত ভূমি— মদীনা, বাহরাইন বা কিন্নাসিরীন। বিজ্ঞজনেরা বলেন যে, এরপর তার জন্যে মদীনাকেই সুনির্দিষ্ট ভাবে নির্ধারিত করে দেয়া হয়। তখন তিনি তার সঙ্গী সাহাবীদেরকে সেখানে হিজরত করার নির্দেশ দান করেন।

এ হাদীছটি অতিশয় গরীব (অর্থাৎ কোন এক যুগে মাত্র একজন রাবী হাদীছটি রিওয়ায়াত করেন)। আর ইমাম তিরমিয়ী তাঁর জামি” গ্রন্থের মানাকিব তথা গুণাবলী অধ্যায়ে আবৃ

আম্বার. সূত্রে জারীর থেকে এককভাবে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। তাঁর বর্ণিত হাদীছে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন : আল্লাহ তা’আলা আমার প্রতি ওহী করেন যে, এ তিন স্থানের যেখানেই তুমি অবতরণ করবে। তাহলে তোমার হিজরত-স্থল : মদীনা, বাহরাইন অথবা কিন্নাসিরীন। এরপর ইমাম তিরমিয়ী বলেন, : হাদীছটি গরীব। ফযল ইবন মূসা ব্যতীত অপর কোন সূত্রে আমরা হাদীছটি জানি না। আবু আম্মার এককভাবে হাদীছটি বর্ণনা করেন।

বর্ণনাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অবশ্য তিনি একথাও বলেছেন যে, তিনি আবু যুর আ সূত্রে হিজরত সংক্রান্ত একটা মুনকার তথা অগ্রহণযোগ্য হাদীছ বর্ণনা করেছেন। আল্লাহই ভাল ७ी(न्ना।

ইবন ইসহাক বলেন, আল্লাহ্ তা’আলা যখন নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা যুদ্ধের অনুমতি দান

করেন :

أدن للذين يقاتلون بيائهم ظلموا وان اللّه على نصرهم لقديرون الذين

اخر جوامن دیار هم بغیر حق الاً آن یقو لوار بنا اللهٔ (الحج : ۳۹) “যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হলো তাদেরকে, যারা আক্রান্ত হয়েছে। কারণ তাদের প্রতি জুলুম

বাড়ীঘর থেকে অন্যায়ভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে শুধু এ কারণে যে, তারা বলে— আল্লাহ আমাদের পালনকর্তা (২২ : ৩৯)।

আল্লাহ যখন যুদ্ধের অনুমতি দান করেন, ইসলামের ব্যাপারে আনসার গোত্র রাসূলের আনুসরণ করেন, রাসূলকে তারা সাহায্য করেন, তারা রাসূলের অনুসারীকেও সাহায্য করেন এবং অনেক মুসলমান আনসারদের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেন, তখন রাসূল (সা) তাঁর কওমের সঙ্গী-সাখী এবং মক্কায় বসবাসরত মুসলমানদেরকে মদীনায় হিজরত করার নির্দেশ দান করে আনসার ভাইদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য বলেন। এ নির্দেশে তিনি বললেন : আল্লাহ তা’আলা তোমাদের জন্য এমন কিছু ভাই এবং এমন কিছু স্থানের ব্যবস্থা করেছেন, যেখানে তোমরা নিরাপত্তা লাভ করবে। ফলে তারা দলে দলে বের হলেন আর রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার জন্য আপন পালনকর্তার নির্দেশের অপেক্ষায় মক্কায় অবস্থান করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাহাবীগণের মধ্যে কুরায়শের বনু মাখিযুম শাখা থেকে যিনি সর্ব প্রথম হিজরত করেন। তিনি ছিলেন আবু সালামা আবদুল্লাহ ইবন আব্দুল আসাদ ইবন হিলাল ইবন আবদুল্লাহ ইবন উমর ইবন মখযুম। আকাবার বায়আতের এক বছর পূর্বে তিনি হিজরত করেন। হাবশা থেকে মক্কায় ফিরে আসার পর কুরায়শের নির্যাতনের মুখে তিনি হাবশায় ফিরে যাওয়ার সংকল্প করেন। মদীনায় তাঁর কিছু ভাই আছে বলে জানতে পেরে তিনি মদীনায় হিজরত করতে মনস্থ করেন।

ইবন ইসহাক বলেন, : আমার পিতা সালামা ইবন আবদুল্লাহ ইবন উমর সূত্রে তদীয় দাদী উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণনা করে বলেন, : আবু সালামা যখন মদীনায় হিজরত করার সিদ্ধান্ত

নেন, তখন তিনি আমার জন্য তার সওয়ারী প্ৰস্তুত করেন এবং আমাকে তার পিঠে আরোহণ করান এবং আমার পুত্ৰ সালামা ইবন আবু সালামাকে আমার কোলে দেন। তারপর আমাকে নিয়ে বের হয়ে তাঁর সওয়ারী চালনা করেন। বনু মুগীরার লোকেরা তাকে দেখে তার দিকে তেড়ে এসে বলে : তুমি নিজে তো আমাদেরকে অশ্রাব্যকর হিজরত করে যাচ্ছে, সে যাও, কিন্তু আমাদের এ কন্যাকে নিয়ে কি কারণে আমরা তোমাকে দেশে দেশে সফর করতে দেবো? উম্মু সালামা বলেন, তাই তারা তার হাত থেকে উটের রশি ছিনিয়ে নেয় এবং তার নিকট থেকে আমাকেও নিয়ে নেয়। তিনি বলেন, এসময় বনু আবদুল আসাদ অর্থাৎ আবু সালামার বং লোকেরা ক্রুদ্ধ হয়ে বললো, আল্লাহর কসম, আমরা আমাদের বংশের সন্তানকে তার কাছে থাকতে দেবো না। তোমরা তো আমাদের সঙ্গীর নিকট থেকে তাকে ছিনিয়ে নিয়েছ। উন্মু সালামা বলেন, আমার পুত্ৰ সালামাকে নিয়ে তারা পরস্পরে টানা-হেঁচড়া করে এবং শেষ পর্যন্ত তারা তার হাতকে ছাড়িয়ে নেয়। বনু আবদুল আসাদ তাকে নিয়ে চলে যায় এবং বনু মুগীরা * আমাকে তাদের কাছে আটকিয়ে রাখে এবং আমার স্বামী আৰু সালামা একা মদীনা অভিমুখে রওনা হলেন। তিনি বলেন, : এভাবে তারা আমার, আমার স্বামী এবং সন্তানের মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে দেয়। তিনি বলেন, : প্রতিদিন ভোরে আমি বের হতাম এবং প্রান্তরে গিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত কান্নাকাটি করতাম। এক বছর বা তার কাছাকাছি সময় পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত বনু মুগীরার মধ্য থেকে আমার চাচাত ভাই এসে আমার অবস্থা দেখে আমার প্রতি দয়া পরবশ হয়ে বনু মুগীরাকে বলে :

এ অসহায় নারীটির প্রতি জুলুম-অবিচার থেকে তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না? তার স্বামী এবং সন্তানের মধ্যে তোমরা তো বিচ্ছেদ ঘটালে। তিনি বলেন, তখন তারা আমাকে বলে : তুমি ইচ্ছা করলে তোমার স্বামীর সঙ্গে মিলিত হতে পার। তিনি বলেন, এ সময় আবদুল আসাদ গোত্রে লোকজন আমার সন্তানকে আমার নিকট ফিরিয়ে দেয়। তিনি বলেন, এ সময় আমার উটনী রওনা হয় এবং আমি আমার সন্তানকে আমার কোলে তুলে নিই। তারপর আমার স্বামীর উদ্দেশ্যে আমি মদীনায় রওনা হই এবং এসময় আল্লাহর সৃষ্টিকুলের কেউই আমার সঙ্গে ছিল না। এমনকি আমি যখন “তানঈমে’ এসে পৌঁছি, তখন বনু আদি গোত্রের উছমান ইবন তালহা। ইবন আবু তালহার সাথে আমার সাক্ষাত হয়। তিনি আমাকে বললেন, হে আবু উমায়্যার কন্যা!

সঙ্গে আর কেউ আছে কি? আমি বললাম : আল্লাহ তা’আলা এবং আমার এ সন্তানটি ছাড়া আমার সাথে আর কেউ নেই। তখন তিনি বললেন, : আল্লাহর কসম, আমি তো তোমাকে একা ছাড়তে পারি না। এ বলে তিনি আমার উটের লাগাম ধরে আমার সঙ্গে চলতে থাকেন। আল্লাহর কসম, আরবের যেসব লোকের সঙ্গে আমি চলেছি, তাদের মধ্যে তার চেয়ে বেশী ভদ্র কাউকে দেখিনি আমি। কোন মনাযিলে উপনীত হলে তিনি আমার জন্য উটকে বসাতেন এবং নিজে পেছনে সরে যেতেন। আমি নিচে অবতরণ করলে তিনি সওয়ারী থেকে হাওদাটি নামাতেন এবং দূরে গাছের সঙ্গে বেঁধে তিনি নীচে বিশ্রাম গ্ৰহণ করতেন। রওনা করার সময় এলে তিনি উটের নিকট এগিয়ে আসতেন, উটকে এগিয়ে দিতেন এবং উটকে তৈয়ার করে তিনি নিজে দূরে সরে যেতেন এবং আমাকে বলতেন : তুমি সওয়ার হও। আমি উটের পিঠে ঠিক

মতো সওয়ার হয়ে বসলে তিনি এসে উটের লাগাম ধরতেন এবং আমাকে নিয়ে তিনি অগ্ৰে অগ্ৰে চলতেন। এভাবে তিনি আমাকে মনযিলে নিয়ে যেতেন। আমাকে মদীনায় নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত তিনি আমার সঙ্গে এরূপই করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত কুবায় বনু আমর ইবন আওফের জনপদের প্রতি দৃষ্টি পড়লে তিনি বলে উঠলেন : এ জনপদেই তোমার স্বামী রয়েছেন। আর আবু সালামা সে জনপদেই অবস্থান করছিলেন। আল্লাহ তা’আলার বরকত ও কল্যাণ নিয়ে তুমি সে জনপদে প্ৰবেশ কর।

একথা বলেই তিনি মক্কার পথে রওনা হয়ে যান। তিনি বলতেন : ইসলামের কারণে আবু সালামার পরিবারের লোকজন যেসব বিপদাপদের সম্মুখীন হয়েছে। অন্য কোন পরিবারের লোকজন তেমন বিপদের সম্মুখীন হয়েছে বলে আমার জানা নেই এবং উছমান ইবন তালহার চাইতে ভদ্র মানুষ আমি কখনো সঙ্গী হিসাবে পাইনি। এ উছমান ইবন তালহা ইবন আবু তালহা। আল আবদারী হুদায়বিয়ার সন্ধির পর ইসলাম গ্ৰহণ করেন। তিনি এবং খালিদ ইবন ওয়ালীদ এক সঙ্গে হিজরত করেন। উহুদ যুদ্ধের দিন তাঁর পিতা, তিন ভাই-হারিছ, কিলাব এবং মুসাফি এবং তাঁর মামা উছমান ইবন আবু তালহা-এরা সকলেই শহীদ হন। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার এবং তার চাচাত ভাই শায়বার নিকট কা’বা শরীফের চাবি অর্পণ করেন। তার চাচাত ভাই শায়াবা ছিলেন বনু শায়বার আদি পুরুষ। জাহিলী যুগে কা’বা শরীফের চাবি তাদের নিকট ছিল। নবী (সা) ইসলামী যুগেও তা বহাল রাখেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা। নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন :

إن اللّه يأمركم أن تُؤدّوالأمانات إلى أهلها

“নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দেন। আমানত তার হকদারকে প্রত্যাৰ্পণ করতে” (৪ : Gebyr)।

ইবন ইসহাক বলেন, : আবু সালামার পর প্রথম যে ব্যক্তি মদীনায় হিজরত করেন তিনি হলেন বনী আব্দীর মিত্র আমির ইবন রাবীআী। তাঁর সঙ্গে তাঁর স্ত্রী লায়লা বিনত আবু হাছমা আল-আদবিয়াও ছিলেন। এরপর বনু উমাইয়া ইবন আবদে শামস-এর মিত্র আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ। ইবন রিয়াব ইবন ইয়ামার ইবন সূরুরা ইবন সুবরা ইবন কাবীর ইবন গানাম দূদান এবং আসাদ ইবন খুযায়মা। তিনি পরিবার-পরিজন এবং তার ভাই আবদ আবু আহমদকেও সঙ্গে নিয়ে গমন করেন। ইবন ইসহাকের বর্ণনানুযায়ী তার নাম ছিল আবদ। কারো কারো মতে তার নাম ছিল ছুমামা। সুহায়লী বলেন, : প্ৰথম অভিমতই বিশুদ্ধতর, আর আবু আহমদ ছিলেন দুষ্টি শক্তিহীন ব্যক্তি, কিন্তু কোন দিশারী-সহকারী ব্যতীতই তিনি মক্কার উচ্চভূমি নিম্নভূমি ঘুরে বেড়াতেন। তিনি একজন কবিও ছিলেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন আবু সুফিয়ান ইবন হারব এর কন্যা ফারিআহ। আর তার মাতা ছিলেন। উমায়মা বিনত আবদুল মুত্তালিব ইবন হাশিম। হিজরত বনু জাহাশের ঘরবাড়ী জনশূন্য করে দেয়।

এক দিনের ঘটনা। মক্কার উচ্চভূমি দিয়ে যাচ্ছিলেন উতবা ইবন রাবীআ, আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব এবং আবু জাহল ইবন হিশাম। উতবা দেখতে পেলেন যে, বনু জাহাশের

8 O–

বসত বাড়ির দরজা রুদ্ধ। তাতে কেউ বসবাস করে না। এ অবস্থা দেখে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আরোহণকারী বলে উঠে?

و کلی دار و ان طالبات سلامتها–یو ما سستدر کها النکباء و الحوابযে কোন গৃহ যত দীর্ঘ দিন তা নিরাপদে থাকুক না কেন, একদিন বায়ুপ্রবাহ তা গ্রাস করবে, আচ্ছন্ন করবে তাকে ধ্বংসলীলা।

ইবন হিশাম বলেন, এই কবিতাটি আবু দাউদ আয়াদীর কাসীদ থেকে নেয়া হয়েছে। সুহায়লী বলেন, আবু দাউদের নাম হল হানযােলা ইবন শারকী। কারো কারো মতে তাঁর নাম হারিছা। এরপর উতবা বললো, বনু জাহাশের গৃহ জনশূন্য পড়ে আছে বসবাস করার কেউ নেই। তখন আবু জাহল বললো : তবে এ ফাল ইবন ফাল-এর জন্য কোন তুমি রোদন করছ? এরপর আব্বাসকে উদ্দেশ করে বলে এতো তোমার ভাতিজার কােণ্ড। সেই তো আমাদের দলে ভাঙ্গন ধরিয়েছে, আমাদের ঐক্য বিনষ্ট করেছে এবং আমাদের মধ্যকার আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন

করেছে।

ইবন ইসহাক বলেন : এরপর আবু সালামা আমির ইবন রাবীআ এবং বনু জাহাশ কুবায় মুবাশশির ইবন আবদে মুনযির-এর নিকট অবস্থান করতে থাকেন। এরপর মুহাজিরগণ দলে দলে আগমন করতে থাকেন। ইবন ইসহাক বলেন, : বনু গানাম ইবন দৃদান ইসলাম গ্রহণ করে এবং তাদের নারী-পুরুষরা হিজরত করে মদীনায় আগমন করেন। আর তারা ছিলেন আরব্দুল্লাহ ইবন জাহাশ, তার ভাই আবু আহমদ। উক্কশা ইবন মিহসান, ওয়ােহবের পুত্র শুজা ও উকবা

উবায়দা, সাখবারা ইবন উবায়দা, মুহাম্মদ ইবন আবদুল্লাহ ইবন জাহাশি এবং তাদের নারীদের মধ্যে যয়নব বিনত জাহাশ, বিনত জাহাশ উন্মে হাবীব বিনত জাহাশ জুদামা বিনত জন্দল, উন্মু কায়স বিনত মিহসান, উন্মু হাবীব বিনত সুমামা, আমিনা বিনত রাকীশ এবং সাখবারা বিনত তামীম। মদীনায় তাদের হিজরত প্রসঙ্গে আবু আহমদ ইবন জাহাশ নিম্নোক্ত কবিতা রচনা

করেন :

و لمار آتنی ام احمد غاد یا–بذمة من اخشی بغیب و ارهب

যে সত্তাকে আমি না দেখে ভয় করি ভোরে তার পানে রওনা হওয়ার সময় উন্মে আহমদ

যখন আমাকে দেখে ফেলে।

تقول فامسا كنت لابد فاعلافيمم بنا البلدان و لننا يثرب

তখন সে বলে : তোমাকে যদি হিজরত করতেই হয়, তবে ইয়াছরিব থেকে দূরে সরে অপর কোন নগরে আমাদেরকে নিয়ে চল।

فقلت لها ما يثرب بمظنة – و ما يشا الرحمن فالعبد يركب – তাকে আমি বললাম, ইয়াছরিব আমার আকাঙ্ক্ষার স্থান নয়, রহমান যা চান ইনসান তো সেদিকেই ধাবিত হয়।

الی الله و جهی و الرسولی و من یقم–الی الله یو ما و جبهه لا یخیب–আল্লাহ এবং রাসূলের দিকেই আমার মুখ ফিরালাম। আর যে আল্লাহর দিকে মুখ ফিরাবে সে কোন দিন ব্যর্থ মনোরথ হবে না।

কতো উপদেশদাতা বন্ধুকে আমরা বিসর্জন দিয়েছি, বিসর্জন দিয়েছি, কতো উপদেশদাতা নারীকে, অশ্রুজিলে ক্ৰন্দনরত আর বিলাপরত অবস্থায়।

تری ان و ترا ناعی با عن بلاد نا–ونحن نری ان الرغائب نطلب তারা মনে করতো জুলুম আমাদের শহর থেকে দূরে (তাই হিজরত নিম্প্রয়োজন)। আর

دعوت بنى غنم لحقن دمسائهم–و للحق لما لاح للناس مسلحب আমি বনু গুনামকে আহবান জানিয়েছি তাদের রক্তের হিফাযতের তরে, সত্যের তরে, যখন তা প্ৰকাশ পায় জনগণের নিকট স্পষ্ট ভাবে।

اجابوا بحمد الله لما دعاهم – الى الحق داع و النجاح فاو عبوا–যখন তাদের ডাকা হয়, তারা আল-হামদু লিল্লাহ বলে সাড়া দেয়। যখন আহবান করে তাদেরকে আরোহণকারী সত্যের দিকে, সাফল্যের দিকে, তখন তারা সাড়া দেয়।

و کنتا و اصحا بنا فار قوا الهدی–اعانوا علینا بالسلاح و اجلبوا–আমরা এবং আমাদের বন্ধুরা দূরে ছিলাম হিদায়াত থেকে। তারা আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্ৰ ধারণ করে এবং হামলা চালায়।

کفوجین اما منتهما فموفق–علی الحق مهدی و فوج معذب–তারা ছিল যেন দু’টি বাহিনী, একটি ছিল তাওফীকধন্য হিদায়াতের পথে, আর অপর বাহিনী ছিল আযাবে নিপতিত।

طاغوا و تمنوا کذبة و از لهم ع–ن الحق ابلیس فاخ ابوا و خیابواএকটা বাহিনী বিদ্রোহ করে আর মিথ্যা আশা করে আর ইবলীস তাদের পদস্থলিত করে। ফলে তারা হয় ব্যর্থ মনোরথ।

ورعنا الى قول النبى محمد – فطاب ولاة الحق منا وطيبوا–

আমরা প্রত্যাবর্তন করি নবী মুহাম্মাদের বাণীর প্রতি। ফলে সত্যের সাধকরা হয় আমাদের প্রতি প্ৰসন্ন।

نمت بار حام اليهم قريبة–و لا قرب بالارحام اذ لا تقرب – আমরা তাদের সঙ্গে নৈকট্যের সম্পর্ক দ্বারা সম্পর্ক স্থাপন করি, আর আত্মীয়তার সম্পর্কের তোয়াক্কা না করলে তা মযবুত হয় না। এমন সম্পর্ক কোন কাজেও আসে না।

فای ابن اختت بعد نسا یامن نکم–وایة صعر بعد صهری یر قبসুতরাং আমাদের পর কোন বোনের ছেলে তোমাদের থেকে নিরাপদ থাকবে, আর আমার জামাই হওয়ার পর কোন জামাইয়ের প্রতীক্ষায়?

ستعلم يومسا اينا اذ تزايلوا–وزيل امر الناس للحق اصوبএক দিন তুমি জানতে পারবে আমাদের মধ্যে কে সত্যের নিকটতর, যখন জনগণের ব্যাপার নিয়ে তারা বিবাদে জড়িয়ে পড়বে।

ইবন ইসহাক বলেন: এরপর (হিজরতের উদ্দেশ্যে) বহির্গত হন উমর ইবন খাত্তাব এবং আইয়্যাশ ইবন আবী রাবীআী। নাফি আবদুল্লাহ ইবন উমর সূত্রে তার পিতা থেকে বর্ণনা করে বলেন, আমি যখন হিজরতের সংকল্প করি, তখন আমি, আইয়াশ ইবন আবু রাবীআ এবং

স্থানে মিলিত হয়ে প্রতিজ্ঞা করি যে, আমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি প্ৰত্যুষে সেখানে পৌঁছতে পারবে না, ধরে নেয়া হবে যে, সে আটকা পড়েছে। সুতরাং তার সঙ্গীদ্বয় তোর অপেক্ষায় না থেকে যাত্ৰা অব্যাহত রাখবে। ভোরে আমি এবং আইয়াশ তানায়ুব উপস্থিত হই। আর হিশাম, আটকা পড়ে এবং নির্যাতনের শিকার হয়। মদীনায় পৌছে আমরা কইবনয় বনু আমর ইবনু আওফের পল্লীতে অবস্থান করি। আবু জাহল ইবন হিশাম এবং হারিস ইবন হিশাম বেরিয়ে আইয়াশের নিকট আসে। আর আইয়াশ ছিলেন উভয়ের চাচাত ভাই এবং বৈমাত্রেয় ভাই। আর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তখনো মক্কায় অবস্থান করছিলেন। এরা দু’জন আইয়্যাশের নিকট আগমন করে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাকে জানায় যে, তোমার মা মানত করেছেন যে, তোমাকে না দেখে তিনি মাথার চুল আচড়াবেন না। তিনি আরো মানত করেছেন যে, তোমাকে না দেখা পর্যন্ত তিনি কোন ছায়ায় বসবেন না। এসব শুনে তার অন্তর বিগলিত হয়। আমি তাকে বললাম, আল্লাহর কসম, এরা আসলে তোমাকে দীন থেকে বিচ্যুত করতে চায়। কাজেই তাদের ব্যাপারে তুমি সতর্ক থাকবে। আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, উকুন তোমার মাকে উত্যক্ত করলে তিনি অবশ্যই চিরুনী ব্যবহার করবেন। আর মক্কার উষ্ণতা তীব্র আকার ধারণ করলে তিনি অবশ্যই ছায়ায় যাবেন। আইয়াশ বললেন, আমি আমার মায়ের কসম পূর্ণ করবো এবং মক্কায় আমার যে ধন-সম্পদ রয়েছে তাও নিয়ে আসবো। তিনি বলেন, আমি তাকে বললাম, আল্লাহর কসম, তুমি তো ভাল করেই জান যে, আমি কুরায়শের মধ্যে সর্বাধিক ধনী ব্যক্তি। আমার অর্ধেক সম্পদ তোমাকে দান করবো, তবু তুমি তাদের সঙ্গে যেয়ো না। তিনি বলেন, ফলে তিনি তাদের সঙ্গে

বের হতে অস্বীকার করেন। তিনি যখন এটা অর্থাৎ মক্কায় ফিরে যাওয়া ছাড়া আর সবই

অস্বীকার করলেন, তখন আমি তাকে বললাম যে, তুমি যখন যা করার তাই করবে। তখন আমার এ উটনীটি গ্রহণ করা। এটি উচ্চ বংশজাত এবং অনুগত উটনী। তুমি তার পিঠে চড়বে। আর

এদের কোন বিষয় তোমাকে সন্দেহে ফেললে তার পিঠে চড়ে তুমি ফিরে আসবে। ফলে উটনীর

পিঠে চড়ে তিনি তাদের উভয়ের সঙ্গে বের হলেন, পথিমধ্যে আবু জাহল তাঁকে বলেঃ ভাই

তোমার উটনীর পিঠে বসতে দেবে! আইয়াশ বললেন। কেন নয়! অবশ্য অবশ্যই তিনি উটনী

বসালেন আর তারা দু’জনেও উটনী বসালো। তারা সকলে মাটিতে নামলে দু’জনে ছুটে এসে

তাকে কষে বেঁধে ফেলে এবং মক্কায় পৌঁছে তার প্রতি নিযাতন চালায়। উমর বলেন, আমরা

বলতাম, যে ব্যক্তি পরীক্ষায় পড়েছে আল্লাহ তার তাওবা কবুল করবেন না। আর তারাও। নিজেদের জন্য একথাই বলতো। এ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনায় আগমন করেন এবং আল্লাহ

তা’আলা নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন :

a مصر e2 : 2 g। سمیہ ه . م . به ه که به ه مه ۶ ه. مه ۱ ممه و لا و جی. سم و سمه

يغفر الذنوب جميعا ………. وأنتم لا تشعرون . বল, হে আমার বান্দাগণ তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হবে না। আল্লাহ সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তোমরা তোমাদের পালনকর্তার অভিমুখী হও এবং তার কাছে আত্মসমৰ্পণ কর তোমাদের নিকট আযাব আসার পূর্বে। তার পরে তোমাদেরকে সাহায্য করা হবে না। তোমাদের প্রতি তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে উত্তম যা নাযিল করা হয়েছে তোমরা তার অনুসরণ করা তোমাদের উপর অতর্কিত ভাবে তোমাদের অজ্ঞাতসারে আযাব আসার পূর্বে (©ö 8 Qxጋ-¢¢)।

উমর (রা) বলেন, আমি উপরোক্ত আয়াত লিপিবদ্ধ করে হিশাম ইবন আস-এর নিকট প্রেরণ করি। হিশাম বলেন, : লিপিটি আমার নিকট পৌঁছলে আমি “বীতুয়া” উপত্যকায় উঠতে উঠতে ও নামতে নামতে তা পাঠ করতে থাকি। কিন্তু তার মর্ম উদ্ধার করতে পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত আমি দু’আ করি : হে আল্লাহ! আমার নিকট আয়াতটি নাযিলের মর্ম স্পষ্ট করে দিন! তখন আল্লাহ আমার অন্তরে এ ভাবের উদয় ঘটান যে, এটি তো আমাদের প্রসঙ্গেই নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের সম্পর্কে যা বলাবলি করতাম এবং আমাদের সম্পর্কে লোকেরা যা বলাবলি করতো, সে প্রসঙ্গেই আয়াতগুলো নাযিল হয়েছে। তিনি বলেন, আমি আমার উটের নিকট ফিরে এলাম এবং তার পিঠে সওয়ার হয়ে মদীনায় গিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে মিলিত হলাম। ইবন হিশাম উল্লেখ করেন যে, ওয়ালীদ ইবন মুগীরা হিশাম ইবন আস এবং ‘আইয়াশ ইবন আবু রাবীআকে মদীনায় নিয়ে আসে। তাদের দু’জনকে মক্কা থেকে চুরি করে নিজের উটের উপর সওয়ার করে মদীনায় নিয়ে আসে আর সে নিজে তাদের সঙ্গে পায়ে হেঁটে আসে। পথে পা ফসকে গিয়ে তার আঙ্গুল যখম হলে সে বলে :

هل انت الا اصابع دمیت–وفی سبیلی الله ما لقبیت

তুমি তো একটা আঙ্গুল বৈ নও! রক্তাপুত হয়েছে। আর যা কষ্ট করলে তা তো করলে আল্লাহর রাস্তায়ই।

ইমাম বুখারী আবুল ওয়ালীদ সূত্রে বারা” ইবন আযিবা (রা)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন? সর্বপ্রথম যিনি আমাদের নিকট আগমন করেন, তিনি ছিলেন মুসআব ইবন উমায়র, তারপর ইবন উম্মে মাকতুম। এরপর আমাদের নিকট আগমন করেন আম্মার এবং বিলাল। মুহাম্মাদ ইবন বাশ্মশার বারা” ইবন আযিবা সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, : সর্বপ্রথম আমাদের নিকট আগমন করেন মুসআব ইবন উমােয়র এবং ইবন উম্মে মাকতুম এবং এরা দু’জনে লোকদেরকে কুরআন মজীদ শিখাতেন। এরপর আগমন করেন বিলাল, সাআদ এবং আম্মার ইবন ইয়াসির। এরপর নবী করীম (সা)-এর ২০ জন সাহাবীর একটা দল নিয়ে উমর ইবন খাত্তাব আগমন করেন। তারপর আগমন করেন রাসূলুল্লাহ্ (সা)। রাসূলের আগমনে মদীনাবাসীরা যতটা আনন্দিত হয়, ততটা আনন্দিত হতে তাদেরকে আমি আর কখনো দেখিনি। এমনকি নারীরাও রাসূলের আগমনের কথা বলাবলি করে। তাঁর আগমন পর্যন্ত আমি মুফাস্সাল সূরাগুলোর মধ্যে সূরা ‘আলা’ শিখে নেই। আর ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ গ্রন্থে ইসরাঈল সূত্রে বারা ইবন আযিবা থেকে অনুরূপ হাদীছ বর্ণনা করেন। তাতে স্পষ্ট করে একথার উল্লেখ রয়েছে যে, মদীনায় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আগমনের পূর্বেই সাআদ ইবন আবু ওয়াক্কাস আগমন করেছিলেন। মূসা ইবন উকবা যুহরী সূত্রে ধারণা ব্যক্ত করেন যে, সাআদ ইবন আবু ওয়াক্কাস রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পরে হিজরত করেন। তবে প্রথমোক্ত মতটিই বিশুদ্ধ।

ইবন ইসহাক বলেন : উমর ইবন খাত্তাব (রা) এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীদের মধ্যে ছিলেন তাঁর ভাই যায়দ ইবন খাত্তাব, আমার ও আবদুল্লাহ— এরা দু’জন ছিলেন সুরাকা। ইবন মু’তামির এর পুত্র, উমরের কন্যা হাফসার স্বামী খুনায়স ইবন হুযাফা সাহিমী এবং তার চাচাত ভাই সাঈদ ইবন যায়দ ইবন আমর ইবন নুফায়ল— তাদের মিত্র ওয়াকিদ ইবন আবদুল্লাহ তামীমী, বনু আজল এবং বনু বুকােয়র থেকে তাদের মিত্ৰদ্ধয় খাওলা ইবন আবু খাওলা এবং মালিক ইবন আবু খাওলা এবং বনু সাআদ ইবন লায়াছ থেকে তাদের মিত্ৰ ইয়াস, খালিদ, আকিল এবং আমির, এঁরা কুবায় বনু আমর ইবন আওফ-এর শাখা গোত্র রিফাআ ইবন আবদুল মুনযির ইবন যিমীর-এর গৃহে অবস্থান করেন।

ইবন ইসহাক বলেন, এরপর এক এক করে মুহাজিরদের আগমন-ধারা অব্যাহত থাকে। তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ এবং সুহায়ব ইবন সিনান ইবন হারিছ ইবন খাযরাজের ভাই খুবায়ব ইবন ইসাফ-এর গৃহে অবস্থান করেন সুন্নাহ নামক স্থানে। কেউ কেউ বলেন, তালহা আসআদ ইবন যুরোরার গৃহে অবস্থান করেন।

ইবন হিশাম বলেন, : আবু উছমান নাহন্দী সূত্রে আমি জানতে পেরেছি যে, সুহায়ব হিজরতের ইচ্ছা করলে কুরায়শের কাফিররা তাকে বলে, তুমি তো আমাদের কাছে এসেছিলে নিঃস্ব, হীন ও তুচ্ছ অবস্থায়। এরপর তোমার ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে এখন তো তুমি বেশ মর্যাদাসম্পন্ন আর এখন তুমি এখান থেকে চলে যেতে চাও তোমার জান আর মাল নিয়ে।

আল্লাহর কসম, তা হতে পারবে না। তখন সুহায়ব (রা) তাদেরকে বললেন, কি বল, আমি সম্পদ তোমাদের হাতে তুলে দিলে তোমরা কি আমার পথ ছেড়ে দেবে? তারা বলে, হ্যা, অবশ্যই। তখন সুহায়ব বললেন, : আমি আমার সমস্ত সম্পদ তোমাদের হাতে অৰ্পণ করলাম। এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট পৌঁছলে তিনি বলেন, : ৩-৫-~ … অ—-, সুহায়ব লাভবান হয়েছে লাভবান হয়েছে সুহায়াব। আর ইমাম বায়হাকী (র) বলেন, : হাকিম আবু আবদুল্লাহ সূত্রে সাআদ ইবন মুসাইয়াব সুহায়ব সূত্রে বর্ণনা করেন : রাসূলুল্লাহ’ (সা) বলেছেন :

“আমাকে (স্বপ্নযোগে) তোমাদের হিজরত-ভূমি দেখানাে হয়েছে। তা দেখানো হয়েছে দুই কঙ্করময় ভূমির মাঝখান থেকে। তা হবে হয় হিজর, অথবা তা হবে ইয়াছরিব।”

সুহায়ব বলেন, : রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনা অভিমুখে রওনা হন, তাঁর সঙ্গে রওনা হন আবু বকর (রা)। আমি তাঁর সঙ্গে বের হওয়ার সংকল্প করেছিলাম। কিন্তু কিছু সংখ্যক কুরায়শী যুবক আমাকে বাধা দেয়। সে রাত আমি দাঁড়িয়ে থাকি, বসতে পারিনি। তারা বললো, তার পেটের কারণে আল্লাহ তাকে তোমাদের থেকে মুক্ত রেখেছেন। আসলে আমার পেটে কোন অসুখ ছিল না। ফলে তারা ঘুমিয়ে পড়লে চুপিসারে আমি বেরিয়ে পড়ি, তাদের কিছু লোক আমার সঙ্গে এসে মিলিত হয়। আমি বেরিয়ে আসার পর তারা আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়। আমি তাদের বলি, আমি তোমাদেরকে কয়েক উকিয়া স্বর্ণ দান করলে তোমরা আমার পথ ছেড়ে দেবে? তোমরা কথা রাখবে তো? তারা তাই করে। আমি তাদের সঙ্গে মক্কা ফিরে আসি এবং তাদেরকে বলি, তোমরা দরজার দেহলিজ খুঁড়ে দেখ। কারণ, সেখানে ঐ উকিয়াগুলো আছে! আর অমুক নারীর কাছে যাও এবং তার কাছ থেকে দুই জোড়া পরিধেয় বস্ত্ৰ নিয়ে নাও। রাসূলুল্লাহ্ (সা) কুবা থেকে মদীনায় যাওয়ার পূর্বে আমি তাঁর নিকট উপস্থিত হই। আমাকে

یا ابا یحیی ربح البیع : آ۶۱) > (2) {{2}}ه)

তখন আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার আগে তো কেউ আপনার কাছে আসেনি

এবং জিবরাঈল (আ) ব্যতীত কেউ আপনাকে এ খবর দেয়নি। ইবন ইসহাক বলেন, : হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব, যােয়দ ইবন হারিছা আবু মারছাদ, কুনান্য ইবন হুসাইন এবং তাঁর পুত্র মারছাদ-এরা উভয়েই গোনাবী এবং হামযার মিত্র। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আযাদকৃত গোলাম আনিসা এবং আবু কাবশা। এরা কুবায় বনু আমর ইবন আওফ গোত্রের কুলছুমা ইবন হিন্দাম-এর গৃহে অবস্থান করেন। আবার কেউ কেউ বলেন, সাআদ ইবন খায়সামার গৃহে অবস্থান করেন। আবার কারো কারো মতে বরং হামযা অবস্থান করেন আসআদি ইবন যুরোরার গৃহে। আসল ব্যাপার আল্লাহই ভাল জানেন।

ইবন ইসহাক বলেন, উবায়দা ইবন হারিছ এবং তার দুই ভাই তুফায়াল ও হুসাইন এবং বনু আবদুন্দদার-এর সুয়াইবিত ইবন সাআদ ইবন হুরায়মালা এবং মিসতাহ ইবন উছাছা, বনু আবদ বনু কুসাই-এর তুলায়াব ইবন উযােয়র এবং উতবা ইবন গাযওয়ান-এর আযাদকৃত গোলাম খাকবাবি কুবায় বা’লাজালান গোত্রের আবদুল্লাহ ইবন সালামার গৃহে অবস্থান করেন। আর

একদল মুহাজিরসহ আবদুর রহমান ইবন আওফ অবস্থান করেন সাআদ ইবন রবী’-এর গৃহে।। আর সুবােয়র ইবন আওয়াম এবং আবু সুবরা ইবন আবু রাহাম অবস্থান করেন। মুনয্যির ইবন

করেন। আর মুসআব ইবন উমােয়র অবস্থান করেন সাআদ ইবন মুআয-এর গৃহে। আর আবু হুযায়ফা ইবন উতবা এবং তার আযাদকৃত গোলাম সালিম অবস্থান করেন সালামার গৃহে।। উমাবীর উদধূতি দিয়ে ইবন ইসহাক বলেন যে, বনু হারিছার খুবায়ব ইবন আসাফ-এর গৃহে তিনি অবস্থান করেন। আর উতবা ইবন গাযওয়ান অবস্থান করেন বনু আবদুল আশহলে আব্বাদ ইবন বিশ্বর ইবন-ওয়াক্কাশ এর গৃহে। আর উছমান ইবন আফফান অবস্থান করেন বনু নাজ্জার মহল্লায় হাস্সান ইবন ছাবিত এর ভাই আওস ইবন ছাবিত ইবন মুনযির-এর গৃহে।।

ইবন ইসহাক বলেন, একদল অবিবাহিত মুহাজির অবস্থান করেন সাআদ ইবন খায়৷ছামার গৃহে। কারণ, তিনি নিজেও ছিলেন অবিবাহিত। আসল ব্যাপার কি ছিল তা আল্লাহই ভাল জানেন। ইয়াকুব ইবন সুফিয়ান আহমদ ইবন আবু বাকব সূত্রে ইবন উমরের উদধূতি দিয়ে বলেন : মদীনায় উপস্থিত হয়ে আমরা আসবা অঞ্চলে অবস্থান করি। (আমাদের মধ্যে ছিলেন) উমর ইবন খাত্তাব আবু উবায়দা ইবন জাররাহ এবং আবু হুযায়ফার আযাদকৃত গোলাম সালিম। আবু হুযায়ফার আযাদকৃত গোলাম সালিম তাদের মধ্যে ইমামতি করতেন। কারণ, তাদের মধ্যে তিনি কুরআন পাঠে বেশী পারঙ্গম ছিলেন।

পরিচ্ছেদ

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হিজরত

আল্লাহ পাক বলেন :

وقل ربي أدخلني مدخل صدق وأخرجنى مخرج صدق واجعل لى من لدنك

للطائات يرا

“ব’ল, হে আমার পালনকর্তা! আমাকে প্রবেশ করাও কল্যাণের সাথে এবং আমাকে বের কর কল্যাণের সাথে এবং তোমার নিকট থেকে আমাকে দান কর সাহায্যকারী শক্তি” (১৭ : bro)

এভাবে দুআ করার জন্য আল্লাহ তা’আলা তার নবীকে নির্দেশ দেন। কারণ, এতে রয়েছে আসন্ন প্রসন্নতা এবং দ্রুত নিস্ক্রমণের পথ। তাই তো আল্লাহ তা’আলা তাকে নবীর শহরের প্রতি হিজরত করার অনুমতি দান করেন, সে স্থানে রয়েছে সাহায্যকারী এবং বন্ধু ভাবাপন্ন লোকজন।

জন্য আনসার তথা সাহায্যকারী।

আহমদ ইবন হাম্বল এবং উছমান ইবন আবু শায়বা জারীর সূত্রে ইবন আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন :

“রাসূল (সা) মক্কায় ছিলেন, এরপর তাকে হিজরতের নির্দেশ দান করা হয় এবং তার উপর নাযিল করা হয় :

SLS S SS S SLLLSSS CSSS SC S LS S LSLS SS L S SSS CS SS وقل ربتِ آذختنی مداخل صدقہ কাতাদা বলেন اذخلَبَّنی مدخل صدقية অর্থ كة}}s-start, آخر جنی مخرج صدق অর্থ মক্কা থেকে হিজরত আর 1,…, ALL 1. এ.151 3–1 J, ৯, অর্থ আল্লাহর কিতাব, তার নির্ধারিতকরণ এবং দণ্ডবিধি প্রভৃতি বিধানসমূহ।

ইবন ইসহাক বলেন, : রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাহাবী মুহাজিরদের হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ (সা) নিজের হিজরতের জন্য অনুমতির অপেক্ষায় মক্কায় অবস্থান করছিলেন এবং আটকা পড়া বা নির্যাতনগ্রস্ত ব্যক্তিবর্গ ছাড়া তাঁর সঙ্গে পেছনে কেউ থেকে যাননি। যারা মক্কায় থেকে যান, তাদের মধ্যে আলী ইবন আবু তালিব এবং আবু বকর ইবন আবু কুহাফা রাযিয়াল্লাহু আনহুমাও ছিলেন। আর আবু বকর (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট হিজরতের জন্য প্রায়ই অনুমতি চাইতেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে বলতেন : “তুমি তাড়াহুড়া করো না, হয়তো আল্লাহ তোমাকে একজন সঙ্গী দান করবেন।”এ সময় আবু বকর (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গী হওয়ার আকাজক্ষা পোষণ করতেন। কুরায়শরা যখন দেখলো যে, দেশের বাইরে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গী-সাখী এবং সমর্থক একটি দল সৃষ্টি হয়ে গেছে এবং তারা মুহাজির সাহাবীদেরকেও বের হয়ে তাদের নিকট গমন করতে দেখলো তখন তারা বুঝতে পারলো যে, তারা এমন এক স্থানে অবতরণ করেছে এবং সেখানে তারা নিরাপদ স্থান করে নিয়েছে, তখন তাদের আশঙ্কা জাগলো যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আয়োজন সম্পন্ন করেছেন। তখন তারা তার প্রসঙ্গ (আলোচনা করার জন্য) ‘দারুন নােদওয়ায়’ সমবেত হয়। আর এ দারুন নান্দওয়া” ছিল কুসাই ইবন কিলাব-এর গৃহ। কুরায়শরা পরামর্শের জন্য এখানে সমবেত হতো। এবং সেখানে পরামর্শক্রমে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতো। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ব্যাপারে তারা শংকিত হয়ে সিদ্ধান্ত গ্ৰহণ করার নিমিত্ত দারুন নাদওয়ায় সমবেত হওয়া ঠিক করে।

যার বিরুদ্ধে কোন অপবাদ সম্পর্কে আমি জ্ঞাত নই এমন রাবী আবদুল্লাহ ইবন আবু নাজীহ সূত্রে আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস থেকে ইবন ইসহাক বৰ্ণনা করেন : কুরায়শের লোকেরা যখন এ বিষয়ে একমত হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা ও পরামর্শের দিনক্ষণ নির্ধারণ করে এবং দারুন নাদওয়ায় একত্রিত হওয়া সাব্যস্ত হয় এবং তারা এ দিনটার নামকরণ করে ইয়াওমুন যাহমা’ তথা ভিড়ের দিন। এ দিন সকালে অভিশপ্ত ইবলীস একজন প্রবীণের বেশভূষা ধারণ করে উক্ত পরামর্শ-গৃহের দরজায় এসে দাঁড়ায়। তাকে দরজায় দেখে লোকেরা তার সম্পর্কে জানতে চায়। সে বলে : নাজদের একজন শায়খ। তোমাদের কর্মসূচী সম্পর্কে জানতে পেরে তোমরা কী আলোচনা কর তা শোনার জন্য উপস্থিত হয়েছেন। হতে পারে উত্তম প্ৰস্তাব আর হিতকর মতামত দান থেকে তোমাদেরকে তিনি বঞ্চিত করবেন না। তার বক্তব্য শুনে সকলে বললো, ঠিক আছে। দয়া করে ভেতরে এসে বসুন। শায়াখে নাজদী ভেতরে প্রবেশ করে তাদের সঙ্গে বসে। কুরায়শের সন্ত্রান্ত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে এ সমাবেশে যারা সমবেত হয়,

8S–

তাদের মধ্যে ছিল উতবা, শায়বা, আবু সুফিয়ান, তুয়ায়মা ইবন আব্দী এবং জুবােয়র ইবন মুতঙ্গম ইবন আব্দী, হারিছ ইবন আমির ইবন নাওফিল, নযর ইবন হারিছ, আবুল বুখতারী ইবন হিশাম, যামআ ইবন আসওয়াদ, হাকীম ইবন হিযাম, আবু জাহল ইবন হিশাম, হাজ্জাজের দু’পুত্ৰ নাবীহ ও মুনব্বিহ, উমাইয়া ইবন খলফ প্রমুখ। কুরায়শ আর কুরায়শের বাইরের আরো অনেকে এ পরামর্শ সভায় উপস্থিত হয়, যাদের সংখ্যা অগণিত। পরামর্শ সভায় উপস্থিত লোকজন একে অপরকে বলে, লোকটার ব্যাপার তো তোমরা দেখতেই পাচ্ছে। আমাদের বাদে তার অন্য অনুসারীদেরকে নিয়ে আমাদের উপর হামলা চালাবার ব্যাপারে তার সম্পর্কে তো আমরা নিরাপদ নই। কাজেই তার ব্যাপারে তোমরা ঐকমত্যে উপনীত হও। বর্ণনাকারী ইবন ইসহাক বলেন : এরপর তারা পরস্পরে পরামর্শ করে। তাদের মধ্যে একজন বক্তা—কথিত আছে যে, সে ছিল আবুল বুখতারী ইবন হিশাম–সে বলে, লোহার শিকলে তাকে বেঁধে ঘরের মধ্যে বন্দী করে রাখতে হবে। এরপর লক্ষ্য রাখতে হবে যে, তার পূর্বে এ ধরনের কবি, যথা যুহায়র, নাবিগা যুবইয়ানী প্ৰমুখের কী পরিণতি হয়েছিল, একেও যাতে তাদের পরিণতি বরণ করতে হয় এবং সেও যেন তাদের মতো মরতে পারে, সে দিকেই সকলকে লক্ষ্য রাখতে হবে {

তার এ বক্তব্য শ্রবণ করে “শায়াখে নাজদী’ বলে উঠে— না, আল্লাহর কসম, এটা তো কোন যুক্তিযুক্ত অভিমত হল না। (আমি তো তোমাদের নিকট থেকে এমন হাসম্পদ পরামর্শ আশা করিনি।)। কারণ, আল্লাহর কসম, তোমাদের কথা মত তোমরা তাকে আটক করলে, তার কথা বাইরে ছড়িয়ে পড়বে। তার বন্ধু সঙ্গী-সাথীদের কাছে পৌছে যাবে এবং অবিলম্বে তারা তোমাদের উপর হামলা চালিয়ে তাকে তোমাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেবে। আর এভাবে দিন দিন তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, শেষ পর্যন্ত তারা তোমাদের উপর জয়ী হবে। কাজেই তোমাদের পক্ষ থেকে এটা তো কোন সঠিক সিদ্ধান্ত হলো না।

শায়াখে নাজদীর এ বক্তব্য শুনে তারা পুনরায় পরামর্শ করতে বসে। একজন বললো : আমাদের মধ্য থেকে তাকে বহিষ্কার করতে হবে, নির্বাসনে পাঠাতে হবে, দেশ থেকে নির্বাসিত করার পর সে কোথায় গেল বা কী করলো, তা নিয়ে আমাদের কোন মাথা ব্যথা থাকবে না। আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, সে আমাদের থেকে দূরে চলে গেলে আমরা তার থেকে মুক্ত হলাম। আর আমরা নির্বিবাদে আমাদের কাজ করে যেতে পারবো। আগে যা করতাম তা-ই

করবো।

শায়াখে নাজদী বললো, তোমাদের জন্য এটা তো কোন অভিমত হল না। তোমরা দেখতে পোচ্ছ না। তার কথা কতো চমৎকার, বক্তব্য কতো মিষ্টি মাখা এবং চিত্তাকর্ষক। কিভাবে সে কথা দ্বারা মানুষের মন জয় করে নেয়। তোমরা তাকে বহিষ্কার করলে আরবের কোন না কোন গোত্র তাকে আশ্রয় দেবে। নিজের কথা আর বচন দ্বারা সে তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করবে। শেষ পর্যন্ত সে লোকগুলো তার অনুসারী হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত সে তার অনুসারীদেরকে নিয়ে তোমাদের উপর চড়াও হবে। তোমাদের হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেবে। এরপর তোমাদের সঙ্গে যথেচ্ছ আচরণ করবে। কাজেই তার সম্পর্কে তোমরা অন্য কোন চিন্তা করতে পার।

তখন আবু জাহল ইবন হিশাম বলে উঠে? আমি আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, এ লোকটি সম্পর্কে আমার ভিন্ন মত আছে। আমি মনে করি, আমি যা ভাবছি, তোমরা (অনেক) পরেও তা ভাবতে পারবে না। লোকজন বলে উঠে, হে আবুল হাকাম! কী তোমার সে ভিন্নমত? সে বললো : আমি মনে করি যে, আমরা প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন তাগড়া সম্ভান্ত যুবক বাছাই করে নেবো, সে যুবক হবে সম্মান আর মর্যাদার অধিকারী। আমরা প্রতিটি যুবকের হাতে তুলে দেবো একটা করে শাণিত তরবারি এক ব্যক্তির মতো তারা সকলে একযোগে তার উপর আঘাত হানবে। তার জীবনলীলা সাঙ্গ করবে। এভাবে আমরা তার উৎপাত থেকে শান্তি আর মুক্তি লাভ করবো। যুবকরা যখন এ কাজটা করবে, তখন তার রক্ত সকল গোত্রের মধ্যে বিভক্ত ও বণ্টিত হবে। আর বনু আবদ মানাফ তার কাওমের সকল গোত্রের সঙ্গে যুদ্ধ করতে সক্ষম হবে না। ফলে তারা আমাদের নিকট থেকে রক্তপণ গ্ৰহণ করতে রায়ী হয়ে যাবেন। আমরা অনায়াসেই সে রক্তপণ পরিশোধ করবো।

ইবন ইসহাক বলেন, শায়াখে নাজদী বলে : এ ব্যক্তি যা বললো এটাই তো সঠিক কথা। এটাই হলো অভিমতের মতো অভিমত। আর কোন কথা আর কোন অভিমত দরকার করে না। এ ব্যাপারে সকলে একমত হয়ে বৈঠক সমাপ্ত করে এবং সকলে নিজ নিজ ঘরে ফিরে যায়। ইতোমধ্যে জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট আগমন করে তাঁকে বললেন, : যে শয্যায় আপনি ঘুমাতেন। আজ রাতে সে শয্যায় আপনি ঘুমাবেন না। ইবন ইসহাক বলেন, রাত

সকলে মিলে তাঁর উপর হামলা চালাবে। তাদের উপস্থিতি আঁচ করতে পেরে রাসূলাল্লাহ (সা) আলী ইবন আবু তালিবকে বললেন, : আমার এই সবুজ হাযরামী চাদর গায়ে দিয়ে তুমি আমার শয্যায় শুয়ে পড়ে। এ চাদর গায়ে দিয়ে ঘুমালে তাদের পক্ষ থেকে তোমাকে কোন অগ্ৰীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে না। আর রাসূলাল্লাহ (সা) সাধারণত এ চাদর গায়ে দিয়েই ঘুমাতেন।

ইবন ইসহাক যে কাহিনী বর্ণনা করেছেন, ঠিক একই কাহিনী বর্ণনা করেছেন ওয়াকিদী, আইশা, ইবন আব্বাস, আলী, সুরাকা। ইবন মালিক ইবন জাশম প্ৰমুখের বরাতে। ওয়াকিদীর বর্ণনার সঙ্গে ইবন ইসহাকের বর্ণনার অনেকটা মিল আছে এবং তার বর্ণনাও পূর্ববতী বৰ্ণনার অনুরূপ।

ইয়াখীদ ইবন আবু যিয়াদ মুহাম্মদ ইবন কা’ব কুরায়ীর সূত্রে ইবন ইসহাক বলেন, কুরায়শের লোকজন যখন রাসূলাল্লাহ্ (সা)-এর গৃহের দরজায় জমায়েত হয়, তখন তাদের মধ্যে আবু জাহলও ছিল। তারা সকলেই দরজায় দাঁড়িয়ে। আবু জাহল বললো, মুহাম্মদের ধারণা তোমরা তার অনুসরণ করলে তোমরা আরব-আজমের বাদশাহ বনে যাবে, মৃত্যুর পর পুনরুজীবিত হবে এবং তোমাদের জন্য জর্দানের উদ্যানের মতো উদ্যান বানানো হবে। আর তা না করলে তোমরা ধ্বংস হবে, যবাই হবে, মৃত্যুর পর আবার জীবিত হবে এবং তোমাদের জন্য আগুন সৃষ্টি করা হবে এবং তাতে তোমাদেরকে দন্ধীভূত করা হবে।

বর্ণনাকারী ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলাল্লাহ্ (সা) গৃহ থেকে বের হন, এক মুঠে ধূলো হাতে নিয়ে বলেন, “হ্যা, আমি একথা বলি, আর তুমিও তাদের একজন।” আল্লাহ তাদের চোখে আবরণ সৃষ্টি করেন, তারা তাকে দেখতে পায়নি। কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করতে করতে তাদের দিকে ধূলো ছিটাতে ছিটাতে রাসূল (সা) বের হয়ে যান : يكس والقرأن الحكيم انك لمن المرسلين …… فهم لا يبصرون. “ইয়াসীন, শপথ জ্ঞানগর্ভ কুরআনের। তুমি অবশ্যই রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত। তুমি সরল পথে প্রতিষ্ঠিত। কুরআন অবতীর্ণ পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু আল্লাহর নিকট থেকে। যাতে তুমি সতর্ক করতে পার এমন এক জাতিকে, যাদের পিতৃপুরুষদেরকে সতর্ক করা হয়নি, যার ফলে ওরা গাফিল। ওদের অধিকাংশের জন্য সে বাণী অবধারিত হয়েছে। সুতরাং ওরা ঈমান আনবে না। আমি ওদের গলদেশে বেড়ি পরিয়েছি। চিবুক পর্যন্ত। ফলে ওরা উর্ধ্বমুখী হয়ে গেছে। আমি

ওদের সম্মুখে প্রাচীর ও পশ্চাতে প্রাচীর স্থাপন করেছি এবং ওদেরকে আবৃত করেছি। ফলে ওরা দেখতে পায় না” (৩৬ : ১-৯৯)।

তাদের প্রত্যেকের মাথার উপর মাটি নিক্ষেপ করে তিনি (নবী সা) যেখানে যাওয়ার ইচ্ছা! করেছিলেন, সেখানে চলে গেলেন। তাদের মধ্যে একজন লোকও ছিল না। যার মাথায় ধুলো লাগেনি। এরপর তাদের সঙ্গে ছিল না-এমন এক আগন্তুক আগমন করে জিজ্ঞাসা করলো: তোমরা এখানে কিসের জন্য আপেক্ষা করছো? তারা বললো : আমরা মুহাম্মদের জন্য অপেক্ষা করছি। লোকটি বললো : আল্লাহ তোমাদেরকে ব্যর্থ করেছেন। আল্লাহর কসম, সে তো তোমাদের প্রত্যেকের মাথায় মাটি নিক্ষেপ করে বেরিয়ে গেছে। সে তো বেরিয়ে গেছে তার প্রয়োজনে। তোমরা কি দেখতে পোচ্ছ না তোমাদের উপর কী আছে। বর্ণনাকারী ইবন ইসহাক বলেন : এরপর তাদের প্রত্যেকে নিজ নিজ মাথায় হাত দিয়ে মাটি পায়। এরপর তারা মুহাম্মদকে খুঁজতে থাকে। তারা শয্যায় আলী (রা)-কে দেখতে পায়। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চাদর গায়ে জড়িয়ে তিনি শুয়ে আছেন। (মনের আনন্দে এবং সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত ও নির্বিকার চিত্তে)। এ অৱস্থা দেখে তারা বললো : আল্লাহর কসম, এতো মুহাম্মদ তার চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। ভোর পর্যন্ত তারা এ ভাবে পাহারা দিতে থাকে। ভোর হলে তারা দেখতে পায় যে, তার শয্যা থেকে আলী (রা) বেরিয়ে এসেছেন। তখন তারা বলে : যে আমাদেরকে বলেছিল, সে তো ঠিকই বলেছিল।

ইবন ইসহাক বলেন, : সেদিন যে উদ্দেশ্যে কাফিররা সমবেত হয়েছিল, সে প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ নাযিল করেন : و اذ يمكر بك الذين كفروا ليثبنوك أو يقتلوك أو يخرجوك ويمكرون

ويمكر اللّة واللّة خير الماكرين. আর (হে মুহাম্মদ!) তুমি সে সময়ের কথা স্মরণ কর, যখন তারা (কাফিররা) তোমার

বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তোমাকে বন্দী করার জন্য, তোমাকে হত্যা করা বা নির্বাসিত করার জন্য। তারা ষড়যন্ত্র করে, আল্লাহও কৌশল অবলম্বন করেন। আর আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী (৭ :৩০)।

আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেনঃ آم یقولون شاعر ناتر بصی به اریب المنون قل تر بصوا فانی معکم من

8 لمتربص بین ‘ওরা কি বলতে চায় যে, সে একজন কবি? আমরা তার মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছি। তুমি (হে মুহাম্মদ) বল, তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমিও তোমাদের সঙ্গে প্রতীক্ষারতদের অন্তর্ভুক্ত আছি” ((x & లిం-ని)।

ইবন ইসহাক বলেন, : এ সময় মহান আল্লাহ তার নবী (সা)-কে হিজরতের অনুমতি দান করেন।

পরিচ্ছেদ

রাসূলুল্লাহ্ (সা) নিজে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন এবং তাঁর সঙ্গে ছিলেন আবু বকর সিদীক রাযিয়াল্লাহ। আনহু। আর এ ঘটনা ছিল ইসলামের ইতিহাসে হিজরী গণনার সূচনাকাল। উমর (রা)-এর শাসনকালে এ বিষয়ে সাহাবায়ে কিরামের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের প্রতি আল্লাহ প্ৰসন্ন হোন। উমর (রা)-এর জীবনী গ্রন্থে আমরা বিষয়টা সবিস্তারে আলোচনা করেছি।

ইমাম বুখারী (র) মাতার ইবন ফযল সূত্রে ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন? রাসূলুল্লাহ (সা) চল্লিশ বছর বয়সে নবুওয়াত লাভ করেন। মক্কা মুকাররামায় ১৩ বছর কাল অবস্থান করেন। এ সময় তাঁর নিকট ওহী নাযিল হয়। এরপর তাকে হিজরতের নির্দেশ দেয়া হয় এবং তিনি হিজরত করেন। দশ বছর (মদীনায় অতিবাহিত করেন) এবং ৬৩ বছর বয়সে তিনি ইনতিকাল করেন। নবুওয়াত লাভের এয়োদশ বর্ষে রবিউল আউয়াল মাসে তিনি হিজরত করেন। আর হিজরতের দিনটি ছিল সোমবার। ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করে বলেন, তোমাদের নবী (সা) জন্মগ্রহণ করেছেন সোমবারে। মক্কা থেকে (মদীনার উদ্দেশ্যে) বহির্গত হন সোমবারে। তিনি নবুওয়াত লাভ করেন সোমবারে। তিনি

মদীনায় প্ৰবেশ করেন সোমবারে এবং তিনি ইনতিকাল করেন সোমবারে।

মুহাম্মদ ইবন ইসহাক বলেন, : আবু বকর (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট হিজরতের অনুমতি চাইলে তিনি বলেন, তাড়াহুড়া করবে না (বরং ধৈর্যধারণ কর এবং অপেক্ষা করতে থাক) আল্লাহ হয়তো তোমার জন্য একজন সঙ্গী জুটািবেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মুখে একথা শুনে তিনি আশা পোষণ করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) নিজেই তাঁর সঙ্গী হবেন। তিনি দু’টি সওয়ারী ক্রয় করেন। নিজ গৃহে রেখে হিজরতের জন্য প্রস্তুতির উদ্দেশ্যে সেগুলোকে সযত্নে লালন করেন। ওয়াকিদী বলেন, : হযরত আবু বকর (রা)। আটশ’ দিরহামের বিনিময়ে সওয়ারী দুটি ক্রয় করেছিলেন।

ইবন ইসহাক নির্ভরযোগ্য সূত্রের উদধূতি দিয়ে উরওয়া ইবন যুবায়র থেকে উন্মুল মু’মিনীন হযরত আইশা (রা)-এর বরাতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন : রাসূলুল্লাহ্ (সা) প্রতিদিন

সকালে বা বিকালে এক বেলায় আবু বকর (রা)-এর ঘরে আসতে ভুলতেন না। হয় সকালে, না হয় বিকালে অবশ্যই আগমন করতেন। শেষ পর্যন্ত সেদিনটি উপস্থিত হলো, যেদিন আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাসূল (সা)-কে হিজরত করা এবং মক্কা থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে বের হওয়ার অনুমতি দিলেন। হযরত আইশা (রা) বলেন, : এদিন রাসূলুল্লাহ (সা) দুপুরে আমাদের গৃহে আগমন করেন। এটা ছিল এমন এক সময়, যে সময় তিনি সাধারণত আসতেন না। রাসূলুল্লাহ (সা)-কে দেখে আবু বকর (রা) বলেন, : নিশ্চয়ই কোন ঘটনা ঘটেছে, যে জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) এমন অসময়ে আগমন করেছেন। হযরত আইশা সিদীকা (রা) বলেন, : তাকে দেখে আবু বকর (রা) তার খাট থেকে একটু সরে বসেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) খাটে উপবেশন করলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকটে আমি এবং আমার বোন আসমা বিনত আবু বকর ছাড়া অন্য কেউ ছিল না। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, : তোমার নিকট থেকে আন্যদেরকে বের করে দাও। আবু বকর (রা) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তারা উভয়েই তো আমার কন্যা (অন্য কেউ নয়)। আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোন। ব্যাপার কী? রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : ‘আল্লাহ তা’আলা আমাকে হিজরত এবং (মক্কা থেকে) বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছেন।” আইশা (রা) বলেন, তখন আবু বকর (রা) বলেন, : ইয়া রাসূলাল্লাহ। আপনার সাহচর্য পাবো তো? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, : হ্যা, সাহচর্য পাবে। আইশা (রা) বলেন :

আল্লাহর কসম, এদিনের আগে আমি কখনো বুঝতে পারিনি যে, কোন মানুষ আনন্দোও কাঁদতে পারে, যতক্ষণ না এ দিন আমি আবু বকরকে কাঁদতে দেখেছি। এরপর তিনি বললেন : ইয়া নাবিয়্যাল্লাহ! এ দু’টি সওয়ারী আমি এ উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করে রেখেছি। এরপর তারা দুজনে আবদুল্লাহ ইবন আরকান্দকে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পথপ্রদর্শক হিসাবে নিযুক্ত করে নেন। ইবন হিশাম বলেন, : কারো কারো মতে একে আবদুল্লাহ ইবন আরীকত বলা হয়। এ লোকটি ছিল বনু দিউল ইবন বকর গোত্রের লোক আর তার মা ছিল বনু সাহিম ইবন আমার-এর লোক। সে ছিল মুশরিক। লোকটি তাদের দু’জনকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। উভয়ে দু’টি উট লোকটির হাতে অৰ্পণ করেন। উট দু’টি তার কাছেই ছিল এবং সে নির্ধারিত সময়ের জন্য সেগুলোর লালন-পালন করে।

ইবন ইসহাক বলেন, : আমরা যতদূর জানতে পেরেছি, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন মক্কা থেকে (মদীনার উদ্দেশ্যে) বের হন, তখন এ সম্পর্কে আলী ইবন আবু তালিব, আবু বকর সিদীক (রা) এবং তার পরিবারের লোকজন ছাড়া আর কেউ তা জানতো না। আর আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তো রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে যান এবং তাঁর নিকট লোকজনের যে সব আমানত ছিল, তা ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিয়ে যান। মক্কায় কারো নিকট কোন দুর্মুল্য ও লোভনীয় বস্তু থাকলে তা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট আমানত রাখা হতো। কারণ, তারা তার সত্যবাদিতা ও আমানতদারী সম্পর্কে অবগত ছিল।

ইবন ইসহাক বলেন, : রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন বের হওয়ার ব্যাপারে মনস্থির করলেন তখন তিনি আবু বকর ইবন আবু কুহাফার নিকট আসেন এবং তারা দু’জনে গৃহের পেছন দিক থেকে

খিড়কি পথে বের হন। আর আবু নুয়াইম ইবরাহীম ইবন সাআদ সূত্রে মুহাম্মদ ইবন ইসহাক থেকে বর্ণনা করে বলেন, আমি জানতে পেরেছি যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন মক্কা ত্যাগ করে আল্লাহর নির্দেশে হিজরতের উদ্দেশ্যে মদীনার পথে বের হন, তখন তিনি বললেন, :

“আলহামদু লিল্লাহ। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। (সৃষ্টি করার আগে) আমি তো কিছুই ছিলাম না, কোন বস্তুই ছিলাম না। হে আল্লাহ! দুনিয়ার ভয়াবহতা, কালের কঠোরতা এবং দিবা-রাত্রির বিপদাপদের উপর তুমি আমাকে সাহায্য কর। হে আল্লাহ! সফরে তুমি আমাকে সঙ্গ দাও, আমার পরিবারে তুমি আমার প্রতিনিধিত্ব কর, তুমি আমাকে যে জীবিকা দিয়েছ, তাতে বরকত দান কর, আর তুমি আমাকে কেবল তোমারই অনুগত কর এবং সুন্দর আখলাকের উপর আমাকে দৃঢ় রোখ। প্ৰভু পরওয়ারদিগার। আমি তোমার নিকট নিজেকে সমর্পণ করেছি, কাজেই আমাকে তোমার প্রিয়পাত্র বানাও। আর আমাকে মানুষের নিকট সমর্পণ করো না। হে দুর্বলদের পালনকর্তা! তুমিই তো আমার পালনকর্তা। তোমার প্রদীপ্ত চেহারার উছিলায় আমি পানাহ চাই, যার আলোকে আলোকপ্রাপ্ত হয়েছে আসমান-যমীন, যার দ্বারা দূরীভূত হয়েছে সবরকম অন্ধকার, যার কারণে সুস্থ-সুন্দর হয়েছে পূর্ববতী আর পরবতীদের কর্মকাণ্ড, আমি তোমার নিকট পানাহ চাই আমার নিকট তোমার গযব। আপতিত হওয়া থেকে। আমি পানাহ চাই আমার উপর তোমার ক্ৰোধ আপতিত হওয়া থেকে। আমি তোমার নিকট আরো পানাহ চাই তোমার নিআমতের অবসান থেকে। অকস্মাৎ তোমার শাস্তি আপতিত হওয়া থেকে। তোমার প্রদত্ত শান্তি বিদূরিত হওয়া থেকে এবং পানাহ চাই তোমার যাবতীয় অসন্তুষ্টি থেকে। আমার বিবেচনায় তুমিই তো পরকালের মালিক,

আর আমার নিকট আছে আমার সাধ্যমত উত্তম আমল। তুমি ব্যতীত কোন শক্তি নেই, নেই কোন সাধ্য।”

ইবন ইসহাক বলেন, : এরপর তাঁরা দু’জনে মক্কার নিম্নভূমিতে অবস্থিত ছাওর পাহাড়ের একটি গুহায় আশ্রয় গ্রহণের উদ্দেশ্যে রওনা হন। দু’জনে গুহায় প্রবেশ করলেন। আর হযরত আবু বকর (রা) তাঁর পুত্র আবদুল্লাহকে নির্দেশ দিয়ে যান তাদের সম্পর্কে লোকজন কী বলাবলি

করছে, দিনের বেলা তা যেন মনোযোগ সহকারে শুনে এবং সন্ধ্যায় দিনের খবরাখবর নিয়ে যেন তাদের নিকট আসে। আর তাঁর আযাদকৃত গোলাম আমির ইবন ফুহায়রাকে নির্দেশ দান করেন। দিনের বেলা তার মেষ চরাবার জন্য। আর সন্ধ্যায় যেন সে মেষ তাদের নিকট গুহায় নিয়ে আসে। সুতরাং আবদুল্লাহ ইবন আবু বকর (রা) দিনের বেলা কুরায়শের মধ্যে অবস্থান করে তারা কী সব পরামর্শ করছে, তা শুনতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এবং আবু বকর (রা) সম্পর্কে তারা কী বলছে, তিনি তা-ও শুনতেন এবং রাত্ৰিবেলা তাদের নিকট এসে সেসব তাদেরকে অবহিত করতেন। আর ‘আমির ইবন ফুহায়রা দিনের বেলা মক্কার রাখালদের সঙ্গে মেষ চরাতেন। আর রাতের বেলা তাদের নিকট মেষ নিয়ে আগমন করতেন। আবু বকর (রা) সহ দু’জনে দুধ দোহন করতেন এবং মেষ যাবাহ করে আহারের ব্যবস্থা করতেন। ভোরে আবদুল্লাহ ইবন আবু বকর তাদের নিকট থেকে মক্কায় আগমন করলে আমির ইবন ফুহায়রা মেষ নিয়ে তাকে অনুসরণ করতেন এবং তার পদচিহ্ন মুছে ফেলতেন। এ সম্পর্কে একটু পরেই প্রমাণ স্বরূপ ইমাম বুখারীর বর্ণনা উল্লেখ করা হবে।

ইবন জারীর অন্য সনদে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবু বকর সিদীক (রা)-এর আগে ছাওর গুহায় পৌছেন এবং যাওয়ার সময় আলী (রা)-কে বলে যান তার চলে যাওয়া সম্পর্কে হযরত আবু বকর (রা)-কে অবহিত করার জন্য, যাতে করে হযরত আবু বকর (রা) তাঁর সঙ্গে গিয়ে মিলিত হতে পারেন। হযরত আবু বকর সিদীক (রা) পথিমধ্যে তাঁর সঙ্গে গিয়ে মিলিত হন। এ বর্ণনাটি নিতান্তই গরীব পর্যায়ের। কেবল গরীবই নয়, বরং প্রসিদ্ধ বর্ণনাসমূহের পরিপন্থী। আর প্রসিদ্ধ বর্ণনা এই যে, তারা দু’জনে এক সঙ্গে বের হয়েছিলেন।

ইবন ইসহাক বলেন, : আসমা বিনত আবু বকর (রা) সন্ধ্যায় তাদের জন্য যথোপযুক্ত খাদ্য নিয়ে আসতেন। এ প্রসঙ্গে আসমা (রা) বলেন, : রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং আবু বকর (রা) বের হওয়ার পর কুরায়শের একদল লোক আমাদের নিকট আসে। তাদের মধ্যে আবু জাহল ইবন হিশামও ছিল। তারা এসে আবু বকর (রা)-এর গৃহের দরজায় দাঁড়ালে আমি গৃহ থেকে বেরিয়ে আসি। তারা জিজ্ঞেস করলো : হে আবু বকর তনয়া! তোমার পিতা কোথায়? তিনি বর্ণনা করেন যে, আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আব্বা কোথায় আছেন আমার জানা নেই। আসমা বলেন? (এ কথা শ্রবণ করার পর) আবু জাহল— আর সে ছিল খাবীছ বজাত— হাত উঠিয়ে সজোরে আমার মুখে এমন এক চপেটাঘাত করে যে, তাতে আমার কানের বালি (দুল) পড়ে যায়। তারপর তারা চলে যায়।

ইবন ইসহাক ইয়াহইয়া ইবন আব্বাদ সূত্রে আসমা থেকে বর্ণনা করে বলেন, : রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে আবু বকর (রা)-ও বের হন। তিনি তাঁর সমুদয় সম্পদ সঙ্গে নিয়ে বের হন, যার পরিমাণ ছিল ৫/৬ হাজার দিরহাম। এ সম্পদ তিনি সঙ্গে করে নিয়ে যান। হযরত আসমা (রা) বলেন, এরপর দাদা আবু কুহাফা আমাদের ঘরে আসেন। আর ইতোমধ্যে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, আমি তো দেখছি, সে নিজের এবং অর্থ-সম্পদের দিক থেকেও তোমাদেরকে বিপদে ফেলে গেছে। তিনি বলেন যে, আমি বললাম, না, তা হতে পারে না হে দাদা! তিনি আমাদের জন্য অনেক সম্পদ রেখে গেছেন। তিনি বলেন,

আব্বাজান ঘরে যে পাত্রে টাকা-কড়ি রাখতেন, সে পাত্রে আমি প্রস্তরখণ্ড রেখে কাপড় দিয়ে ঢেকে দেই এবং তাতে দাদাজানের হাত রেখে বলি : দাদাজান, এ মালের উপর আপনি হাত বুলিয়ে দেখুন। তিনি বলেন, দাদা আবু কুহাফা সে পাত্রে হাত রেখে বলেন, : কোন অসুবিধা নেই। সে তোমাদের জন্য এ সম্পদ রেখে দিয়ে ভালই করেছে। এতেই তোমাদের ব্যয় নির্বাহ হবে। আসমা বলেন, আসলে তিনি কোন সম্পদ রেখে যাননি, কেবল বৃদ্ধ দাদাকে প্ৰবােধ দেয়ার জন্যই আমি এমনটি করেছিা!

ইবন হিশাম বলেন : কোন এক জ্ঞানী ব্যক্তি আমাকে জানান যে, হাসান বসরী বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং আবু বকর (রা) রাত্ৰিবোলা গুহার মুখে আসেন এবং প্রথমে আবু বকর (রা) গুহায় প্রবেশ করেন। সেখানে সাপ-বিছু কিছু আছে কিনা দেখার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) একা বাইরে থাকেন। এ বর্ণনায় শুরু এবং শেষ উভয় দিক থেকে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে।

আবুল কাসিম বাগাবী দাউদ ইবন আমর সূত্রে আবু মুলায়কা থেকে রিওয়ায়াত করেন যে, নবী করীম (সা) যখন গুহার উদ্দেশ্যে বের হন। আর আবু বকর তাঁর সঙ্গে ছিলেন, তখন আবু বকর (রা) কখনো নবীজীর সামনে আবার কখনো পেছনে থাকতেন।

এ সম্পর্কে নবী (সা)-এর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেনঃ আমি যখন আপনার পেছনে থাকি, তখন আশংকা জাগে না জানি সম্মুখ থেকে কোন বিপদ আসে, আবার আমি যখন সামনে থাকি, তখন আশংকা হয় না জানি পেছন থেকে কোন বিপদ দেখা দেয়। গুহার মুখে প্রবেশ করে আবু বকর (রা) বলেন, : আপনি অপেক্ষা করুন, আমি ছিদ্রপথে হাত রেখে দেখি, যদি কোন জন্তু থেকে থাকে, তাহলে আগে আমাকে দংশন করুক। নাফি” বলেন, আমি জানতে পেরেছি যে, গর্তে একটা ছিদ্র ছিল, ছিদ্র দিয়ে বের হয়ে কোন জন্তু বা অন্য কিছু রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে কষ্ট দেয়। কিনা, সে আশংকায় হযরত আবু বকর (রা) ছিদ্রের মুখে তাঁর পা রেখে তা বন্ধ করে দেন। এ বর্ণনা মুরাসাল সূত্রের। হযরত আবু বকর সিদীক রাযিয়াল্লা, আনহুর জীবনী গ্রন্থে আমরা এ মুরসাল বর্ণনা, আরো কিছু প্রমাণ উল্লেখ করেছি। আর ইমাম বায়হাকী (র) আবু আবদুল্লাহ সূত্রে ইবন সীরীন থেকে বর্ণনা করে বলেন যে, উমর (রা)-এর শাসনামলে কিছু লোক হযরত আবু বকর (রা)-এর উপর হযরত উমর (রা)-কে শ্রেষ্ঠত্ব দান করে ৷ খলীফা উমর (রা) এ সম্পর্কে জানতে পেরে বলেন, : আল্লাহর কসম, আবু বকর (রা)-এর জীবনের একটি রজনী উমরের গোটা পরিবারের চাইতে উত্তম। আর আবু বকর (রা)-এর জীবনের একটা দিন উমরের গোটা পরিবারের চাইতে উত্তম। ইবন সীরীন বলেন, : রাসূলুল্লাহ (সা) রাত্ৰিবেলা বের হন এবং গুহার দিকে এগিয়ে যান। আর তাঁর সঙ্গে আছেন আবু বকর (রা)। তিনি কখনো রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আগে আগে চলেন, আবার কখনো পেছনে পেছনে। রাসূলুল্লাহ (সা) ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলেন :

হে আবু বকর! তোমার কী হয়েছে যে, তুমি কখনো আমার পেছনে আবার কখনো সামনে চলছো? জবাবে আবু বকর (রা) বলেন :

8S–

ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার অনুসন্ধানে বের হওয়া লোকদের কথা চিন্তা করে আমি আপনার পেছনে হাঁটি, আবার আপনার জন্য কাফিরদের ওৎ পেতে থাকার কথা চিন্তা করে আপনার সামনে থাকি (যাতে কেউ আপনাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করলে আমি আমার জীবন দিয়ে হলেও আপনার জীবন রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করতে পারি)। হযরত আবু বকর (রা)-এর জবাব শুনে রাসূল (সা) বললেন :

হে আবু বকর! কোন কিছু ঘটলে তুমি কি চাও যে, আমার স্থলে তোমাকে স্পর্শ করুক? হযরত আবু বকর (রা) বললেন, : অবশ্যই। যে সত্তা আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, সে সত্তার কসম। উভয়ে গুহার মুখ পর্যন্ত পৌঁছলে হযরত আবু বকর (রা) বললেন :

ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি একটু অপেক্ষা করুন, আমি আপনার জন্য গুহা পরিষ্কার করে নিই। এরপর তিনি গুহার ভেতরে প্রবেশ করেন এবং গুহা পরিষ্কার করেন। এ সময় তার মনে পড়লো যে, একটা ছিদ্র বন্ধ করা হয়নি। তখন তিনি বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ। একটু অপেক্ষা করুন, আমি পরিষ্কার করে নিই, তিনি ভেতরে প্রবেশ করে তা পরিস্কার করে বললেন, : ইয়া রাসূলাল্লাহ! এবার আপনি প্রবেশ করুন! তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) প্রবেশ করলেন। উমর (রা)

বলেন, :

যে সত্তার হাতে আমার জীবন, সে সত্তার কসম, সেই একটি মাত্র রাত উমরের গোটা পরিবারের চাইতে উত্তম।

বায়হাকী ঘটনাটি হযরত উমর (রা)–এর বরাতে অন্য ভাবে বর্ণনা করেছেন। তাতে বলা হয়েছে : আবু বকর (রা) কখনাে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সামনে দিয়ে চলেন, কখনো পেছন দিয়ে, কখনো ডান দিক দিয়ে, আবার কখনো বাম দিক দিয়ে। সে বর্ণনায় একথাও আছে যে, চলতে চলতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পদদ্বয় অবশ হয়ে পড়লে হযরত আবু বকর (রা) তাকে কাধে তুলে নেন এবং তিনি ছিদ্রগুলোর মুখ বন্ধ করে নেন। একটা গর্ত অবশিষ্ট ছিলো, হযরত আবু বকর (রা) পায়ের গোড়ালি দিয়ে সে ছিদ্র বন্ধ করেন। তখন সৰ্প তাঁকে দংশন করলে চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। এসময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবু বকর (রা)-কে বলেন :

بر سم. م مر حمر

“তুমি বিষন্ন হয়ে না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।”

এ বর্ণনাধারাটি গরীব ও মুনকার পর্যায়ের। বায়হাকী জুদুব ইবন আবদুল্লাহ সূত্রে বলেন, গুহায় হযরত আবু বকর (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গী ছিলেন। এসময় পাথরে লেগে তাঁর হাত যখম হলে তিনি বলেন, :

أن أنت الأ أصبع دميت – وفى سبيل اللّه مألقيت“তুমি তো একটা আঙ্গুল বৈ কিছুই নও, আর তোমাকে যা স্পর্শ করেছে, তাতো করেছে। কেবল আল্লাহর রাস্তায়ই।”

আর ইমাম আহমদ (র) হযরত ইবন আব্বাসকে উদধূত করে নিম্নোক্ত আয়াত সম্পর্কে বলেন, : واذ يمكر بك الذين كفروا ليثبتوك

আর স্মরণ কর, কাফিররা যখন তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিল তোমাকে বন্দী করার জন্য (y & నిO)।

তিনি বলেন, কুরায়শের লোকেরা এক রাত্রে মক্কায় পরামর্শ করে। কেউ বলে, সকাল বেলা তাকে শক্ত ভাবে বাঁধবে। কথাটি তারা নবী করীম (সা)-কে ইঙ্গিত করে বলেছিল। আবার কেউ বলে, না, বরং তাকে হত্যা করো। আবার কিছু লোক বলে, না, বরং তাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করতে হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তার নবীকে অবহিত করলেন। হযরত আলী (রা) সে রাত্রে নবী (সা)-এর শয্যায় কাটান। আর নবী করীম (সা) বের হয়ে গুহা পর্যন্ত পৌঁছেন। আর মুশরিকরা আলী (রা)-কে নবী (সা) মনে করে সারারাত ঘেরাও করে রাখে। ভোরে তারা তার উপর হামলা চালাতে গিয়ে আলী (রা)-কে দেখতে পায়। এভাবে আল্লাহ তাদের ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে দেন। তখন তারা বলে, তোমার সঙ্গীটি কোথায়? তিনি বললেন, আমি জানি না। তখন তারা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পদচিহ্ন অনুসরণ করতে লাগলো। পাহাড় পর্যন্ত পৌছে তারা কিছু ঠাহর করতে পারলো না। তারা পাহাড়ে আরোহণ করলো এবং গুহা। পর্যন্ত পৌঁছলো। তারা গুহার মুখে মাকড়সার জাল দেখতে পেলো। তারা বলাবলি করতে লাগলো, এতে কেউ প্রবেশ করলে তো তার মুখে মাকড়সার জাল থাকতো না। গুহায় তিনি তিন রাত কাটান। এটির সনদ হাসান। গুহার মুখে মাকড়সার জাল বুনা সম্পর্কে যে কাহিনী বর্ণিত আছে। তন্মধ্যে এটাই উত্তম। আর এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূলের প্রতি সাহায্যসহায়তার অন্যতম।

বিভিন্ন সূত্র উল্লেখ করে হযরত হাসান বসরী থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী করীম (সা) এবং আবু বকর (রা) গুহা পর্যন্ত হেঁটে যান। ওদিকে কুরায়শরা নবী করীম (সা)-কে খুঁজতে খুঁজতে সেখানে পৌছে। কিন্তু তারা গুহার মুখে মাকড়সার জাল দেখে বলে : এখানে তো কেউ প্রবেশ করেনি। এ সময় নবী করীম (সা) দাঁড়িয়ে নামায আদায় করছিলেন আর আবু বকর (রা) তাকে পাহারা দিচ্ছিলেন। এ সময় আবু বকর (রা) নবী করীম (সা)-কে বললেনঃ

এরা আপনার স্বজাতির লোকজন, এরা আপনাকে খুঁজছে। আল্লাহর কসম, নিজের সম্পর্কে আমার কোন চিন্তা নেই। তবে আপনার কোন ক্ষতি হোক তা আমার কাছে অসহ্য। তখন নবী يا ابا بكر لا تخفف ان الله معنا 8 أ6 66 46 CR اق (31) دمة

“হে আবু বকর! কোন ভয় নেই; নিশ্চয়ই আমাদের সঙ্গে আল্লাহ আছেন।”

হযরত হাসান বসরী (র) থেকে এটি মুরসাল ভাবে বর্ণিত। আর সমর্থক বর্ণনাদি থাকায় এ বর্ণনাটি হাসানও বটে। এতে অতিরিক্ত আছে, গুহায় নবী করীম (সা)-এর নামায আদায় করা,। আর নবী (সা) কোন বিষয়ে চিন্তায় পড়লে নামায আদায় করতেন। আর এ ব্যক্তি অর্থাৎ আবু।

(রা) থেকে বর্ণনা করে বলেন যে, হযরত আবু বকর (রা) তাঁর সন্তানকে বলেন, বৎস! লোকদের মধ্যে অপ্রত্যাশিত কোন ঘটনা ঘটলে তুমি গুহায় এসে আমাদেরকে জানাবে, যেখানে আমি এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) আত্মগোপন করে থাকবো। কেউ কেউ একথাটা কবিতায় ব্যক্তি نسج داود ما حامی صاحب الغار و کان الفخار، للعنکبوت بهٔ ۹) آتlگ آبی) ۹۹

“দাউদী জাল (অর্থাৎ লৌহ অস্ত্ৰ) গুহাবাসীকে হিফাযত করেনি, এ ক্ষেত্রে কৃতিত্ব হচ্ছে মাকড়সার! ”

এটাও কথিত আছে যে, দু’টি কবুতর গুহার মুখে বাসা বেধেছিল। কবি রিবক আস-সারসারী একথাটা কবিতায় ব্যক্ত করেন এ ভাবে :

فغمى عليه العنكبوت بنسجهوظل على الباب الحمام يبيض

মাকড়সা জাল বুনে তাকে ঢেকে রাখে আর (গুহার) মুখে কবুতর ডিম পাড়ে (এ ভাবে তাঁকে হিফাযত করে)।

হাফিয ইবন আসাকির ইয়াহইয়া ইবন মুহাম্মদ সাঈদ সূত্রে বর্ণনা করেন। তাঁর বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে, আবু মুসআব মান্ধী বলেন, আমি যায়দ ইবন আরকাম, মুগীরা ইবন শু’বা এবং আনাস ইবন মালিক (রা)-কে আলোচনা করতে শুনেছি যে, গুহার রজনীতে আল্লাহ তা’আলা।

তা’আলা মাকড়সাকে নির্দেশ দিলে মাকড়সা উভয়ের মধ্যস্থলে জাল বিস্তার করে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চেহারা মুবারক আচ্ছাদিত করে নেয় এবং দু’টি বুনো কবুতরকে আল্লাহ তা’আলা। নির্দেশ দান করলে কবুতর দু’টি পাখা ঝাপটাতে ঝাপটাতে মাকড়সার জাল এবং বৃক্ষের মধ্যস্থলে এসে বসে। আর কুরায়শের প্রতিটি গোত্রের যুবকরা এগিয়ে আসে। তাদের হাতে লাঠি, ধনুক আর ডাণ্ডা। তারা যখন রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে দু’শ হাত পরিমাণ দূরে, তখন তাদের পথ-প্রদর্শক সুরাকা। ইবন মালিক ইবন জুশাম, মুদলিজী বললেন : এ পাথর পর্যন্ত, তো বুঝা যাচ্ছে (যার উপর পদচিহ্ন বর্তমান রয়েছে), তবে এরপর কোথায় তার পা পড়েছে। আমি জানি না। তখন কুরায়শী যুবকরা বলে, তুমি রাত্রি বলে ভুল করনি তো? ভোর হলে তাদের পথ-প্রদর্শক বলে— গুহায় দৃষ্টি দিয়ে দেখ। লোকেরা গুহা দেখার জন্য ছুটে আসে। যখন নবী (সা)-এর মধ্যখানে আনুমানিক ৫০ হাত দূরত্ব বাকী, তখন কবুতর দু’টি ডাক দিয়ে উঠে। তখন তারা বললো, গুহায় তাকাতে কিসে তোমাকে বারণ করেছে? সে বললো— আমি গুহার মুখে দু’টি বুনো কবুতর দেখতে পাচ্ছি। তাই আমি বুঝতে পারি যে, গুহার ভেতরে কেউ নেই। রাসূলুল্লাহ্ (সা) একথা শুনতে পান এবং বুঝতে পারেন যে, এ কবুতর দু’টির মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা তাদের দু’জনকে হিফাযত করেছেন। কবুতর দু’টিকে আল্লাহ তা’আলা বরকত দান করেন এবং হেরোমে তাদেরকে স্থান দান করেন আর সেখানে তারা বাচ্চা দেয়, যেমন তুমি দেখতে পাচ্ছি। এ ধারায় বর্ণনাটি নিতান্ত গরীব পর্যায়ের।

বর্ণনা করে বলেছেন, গুহায় অবস্থানকালে আমি নবী করীম (সা)-কে বললাম, তাদের কেউ নিজের পায়ের দিকে তাকালেই পায়ের নিচে আমাদেরকে অবশ্যই দেখতে পাবে। তখন নবী يا ابا بكر ما ظنك ياثنين الله ثالثهما ؟ 3 6617 46ة (TI) الاiة 6ة

“হে আবু বকর! সে দু’জন সম্পর্কে তোমার কী ধারণা যাদের তৃতীয় জন হলেন আল্লাহ তা’আলা? ইমাম বুখারী এবং মুসলিম তাদের সহীহ গ্ৰন্থদ্বয়ে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। কোন কোন সীরাত গ্ৰন্থকার উল্লেখ করেন যে, আবু বকর (রা) একথা বললে তখন নবী করীম (সা) বললেন, তারা এ দিক থেকে আসলে আমরা অবশ্যই ঐদিকে চলে যেতাম। তখন হযরত আবু বকর (রা) গুহার দিকে তাকিয়ে দেখেন যে, এক দিক থেকে তা ফাক হয়ে গেছে। আর সমুদ্র তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর অপর প্রান্তে নীেকা বাঁধা আছে। আল্লাহর মহান কুদরত আর বিশাল ক্ষমতার কাছে এটা অসম্ভব অবাস্তব এবং অগ্রাহ্য নয়। তবে শক্তিশালী এমনকি দুর্বল সনদেও এমন হাদীছ বর্ণিত নেই। আমরা নিজের পক্ষ থেকে কোন কিছু প্রমাণ করতে চাই না। তবে যে হাদীছের সনদ বিশুদ্ধ বা হাসান, আমরা কেবল তেমন হাদীছই উল্লেখ করি, কেবল সে হাদীছের কথাই আমরা বলি। মহান আল্লাহই ভাল জানেন।

আর হাফিয আবু বকর আল-বাযযার ফযল ইবন সাহল সূত্রে হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তাঁর পুত্ৰকে বলেছিলেন : বৎস! মানুষের মধ্যে যখন কোন ঘটনা ঘটে, তখন তুমি গুহায় আসবে, যেখানে আমাকে আত্মগোপন করতে দেখেছি। আমি এবং রাসূলুল্লাহ (সা) তাতে আত্মগোপন করেছি। তুমি সেখানে যাবে। কারণ, সকাল-সন্ধ্যা তথায় রিফিক আসবে। এরপর ইমাম বাযযার (হাদীছটি সম্পর্কে) মন্তব্য করেন : খািলফ ইবন তামীম ব্যতীত অন্য কোন রাবী হাদীছটি বর্ণনা করেছেন বলে আমার জানা নেই। আমি (অর্থাৎ গ্রন্থকার) বলি : বৰ্ণনাকারীদের একজন মূসা ইবন মাতীর যঙ্গাফ এবং মাতরূক—অর্থাৎ রাবী হিসাবে তিনি নির্ভরযোগ্য নন। বরং দুর্বল এবং তাঁর রিওয়ায়াত গ্রহণযোগ্য নয়। আর মুহাদিছ ইয়াহইয়া ইবন মুঈন তো তাকে মিথ্যাবাদী বলে আখ্যায়িত করেছেন। সুতরাং তার বর্ণিত হাদীছ গ্রহণযোগ্য নয়।

আর ইউনুস ইবন বুকােয়র মুহাম্মদ ইবন ইসহাক সূত্রে উল্লেখ করেন যে, তারা দু’জন গুহায় প্ৰবেশকালে তৎপরবতী কালে তাদের গতিবিধি এবং সুরাকা। ইবন মালিক-এর কাহিনীতে পরে বর্ণনা করা হবে–যে পংক্তিসমূহ হযরত আবু বকর (রা) আবৃত্তি করেন, তন্মধ্যে নিম্নোক্ত कदिऊा७ि छिल?

قال النبی و لم اجزاع یوفر نی–و نحین فی سدف من ظلمة الغار لا تخش شینا فان الله ثالثنا–و قد توکلی لی منه باظهارনবী করীম (সা) বলেন, আমি ব্যাকুল হইনি, আমাকে সান্তুনা দানের জন্য তিনি বলেন, আর আমরা ছিলাম গুহায় অন্ধকারের আবরণে আচ্ছাদিত

তুমি কােন কিছুর ভয় করবে না, কারণ, আল্লাহ হলেন আমাদের মধ্যে তৃতীয়, আর তিনি তো আমার দায়িত্ব নিয়েছেন (দীনকে) জয়যুক্ত করার।

আর হাফিয আবু নুআয়ম যিয়াদ সূত্রে মুহাম্মদ ইবন ইসহাকের উদধূতি দিয়ে এ দীর্ঘ কাসীদাটি এবং তার সঙ্গে অন্য কাসীদাও উল্লেখ করেছেন। আল্লাহই ভাল জানেন।

আর ইবন লাহীআ আবুল আসওয়াদ সূত্রে উরওয়া ইবন যুবােয়র থেকে বর্ণনা করে বলেন : রাসূলুল্লাহ (সা) হজ্জের পর অর্থাৎ যেখানে আনসারগণের বায়আতে আকাবার পর ফিলহাজ্জ মাসের অবশিষ্ট দিনগুলো এবং মুহাররম ও সফর মাস মক্কায়ই অবস্থান করেন। এরপর কুরায়শের মুশরিকরা একমত হয় এবং সকলে মিলে ষড়যন্ত্র করে যে, তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে হত্যা বা বন্দী করবে। অথবা তারা তাকে দেশ থেকে নিবসিত করবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাসূল (সা)-কে অবহিত করে তার উপর আয়াত নাযিল করেন :

واذ يمكر بك الك بن كفروا الأية–” “যখন কাফিররা তোমার সম্পর্কে ষড়যন্ত্রকরছিল যে … রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলী (রা)-কে নির্দেশ দান করলে আলী তাঁর শয্যায় সে রাত্রে ঘুমােন। আর রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও হযরত আবু বকর (রা) বেরিয়ে যান। ভোরে কাফিররা তাদের দু’জনের খোজে চতুর্দিকে বের হয়। মূসা ইবন উকবা তার মাগাষী গ্রন্থে এরকমই উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং আবু বকর (রা) গুহার উদ্দেশ্যে বের হন রাত্ৰিবেলা। ইতোপূর্বে হাসান বসৱী সূত্রে বর্ণিত ঘটনা সম্পর্কে ইবন হিশাম রাত্ৰিবেলার সফর সম্পর্কে স্পষ্ট করে বলেছেন। ইমাম বুখারী (র) ইয়াহইয়া ইবন বুকােয়র সূত্রে নবী সহধর্মিণী হযরত আইশা সিন্দীকা (রা)। সূত্রে বর্ণনা করেন। আইশা (রা) বলেন, : আমার যখন জ্ঞান-বুদ্ধি হয়, তখন থেকেই আমি পিতা-মাতাকে দীন পালন করতে দেখে আসছি। আমাদের উপর এমন কোন দিন অতিবাহিত হতো না, যেদিন সকাল-বিকাল দিনের দু’প্রান্তে রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের গৃহে আগমন না। করতেন। মুসলমানরা যখন নির্যাতনের শিকার হলেন, তখন আবু বকর (রা) ইথিওপিয়ায় হিজরত করেন। তিনি যখন ‘বারকুল গিমাদ” পৌঁছেন, তখন ইবনুন্দ দাগিন্নার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাত হয়। আর ইনি ছিলেন ‘ফারাহ গোত্রের নেতা। হযরত আইশা সিদীকা (রা) এ প্রসঙ্গে ইবনুন্দ দাগিন্না কৃর্তৃক তাকে মক্কায় ফিরায়ে আনার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। ইথিওপিয়ায় হিজরত প্রসঙ্গে আমরা সে ঘটনা আলোচনা করেছি। সেখানে একথাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত আবু বকর সিদীক (রা) ইবনুন্দ দাগিন্নাকে বলেছিলেন, আমি তোমার আশ্রয় ফিরিয়ে দিচ্ছি এবং আল্লাহর আশ্রয়ে সস্তুষ্টি প্রকাশ করছি। আইশা (রা) বলেন, নবী করীম (সা) তখন মক্কায় ছিলেন এবং তিনি মুসলমানদেরকে বললেন, : তোমাদের হিজরত ভূমি-স্বপ্নযোগে আমাকে দেখানো হয়েছে, তা দুই কঙ্করময় ভূমির মধ্যস্থলে খেজুর বাগান পরিবেষ্টিত স্থান। তখন যাদের

তাদের কেউ কেউ মদীনায় প্রত্যার্বতন করেন। আর আবু বকর (রা) মদীনায় হিজরত করার জন্য প্ৰস্তৃতি গ্রহণ করেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে বললেন, : অপেক্ষা কর, আশা করি আমাকে হিজরতের অনুমতি দেয়া হবে। তখন আবু বকর (রা) বলেন : আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোন! আপনি কি তাই আশা করেন? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, হ্যা।

১. বারকুল গিমাদ ইয়ামানের একটা স্থানের নাম। ভিন্ন মতে মক্কার পেছনে দিবা-রাত্রি ৫ দিনের দূরত্বে একটা

স্থানের নাম।

তখন রাসূলের সঙ্গে হিজরতে সাখী হওয়ার জন্য আবু বকর নিজেকে সংযত রাখেন এবং তিনি দু’টি বাহনকে : মাস যাব বাবলা গাছের পাতা খাইয়ে প্রস্তুত করেন। কোন কোন ঐতিহাসিক ৬ মাস যাবত ঘাস-পানি খাওয়ানোর কথা উল্লেখ করেছেন?

ইবন শিহাব যুহরী উরওয়া সূত্রে আইশা (রা) থেকে বর্ণনা করে বলেন যে, আইশা (রা) বলেছেন : একদিন আমরা দুপুরের গরমে আবু বকর (রা)-এর গৃহে বসা ছিলাম। তখন কেউ একজন আবু বকরকে বললোঃ ঐ দেখ মাথায় রুমালসহ রাসূলুল্লাহ্ (সা) আগমন করছেন, এমন এক সময় সাধারণত যে সময় তিনি আগমন করেন না। তখন আবু বকর (রা) বললেন, আমার পিতামাতা তার জন্য কুরবান হোন! আল্লাহর কসম, কোন বিশেষ ব্যাপারই তাকে এ সময় নিয়ে এসে থাকবে। আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আগমন করে অনুমতি চাইলে তাঁকে অনুমতি দেয়া হয়। তিনি গৃহে প্রবেশ করে বললেনঃ তোমার নিকট থেকে সকলকে বের করে দাও। তখন আবু বকর (রা) বললেন, : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা আপনার জন্য কুরবান হোন! তারা তো আপনার পরিবারেরই লোক : অন্য কেউ নয়। তখন তিনি বললেন— আমাকে হিজরতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। আবু বকর (রা) বললেন, : আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সাহচর্য জুটবে তো? নবী করীম (সা) বললেন, হ্যা। তখন আবু বকর (রা) বললেন, : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার এ দু’টি বাহনের একটি আপনি গ্রহণ করুন। রাসূলুল্লাহ বললেন, মূল্যের বিনিময়ে। আইশা (রা) বলেন, আমরা তড়িঘড়ি তাদের জন্য সফরের সম্বল প্ৰস্তুত করি এবং তা একটি থলেতে পুরে দেই। আসমা বিনত আবু বকর তার কোমর বন্ধ থেকে একটা টুকরা ছিড়ে নিয়ে থলের মুখ বেঁধে দেন। এ কারণে তার নাম হয় যাতুন নিতাকাইন–দু কোমরবন্ধের অধিকারিণী।

আইশা (রা) বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং আবু বকর (রা) ছাওর পর্বতের গুহায় প্রবেশ করেন এবং তিন রাত সেখানে আত্মগোপন করে থাকেন। আবদুল্লাহ ইবন আবু বকর তাদের সঙ্গে রাত্রি যাপন করতেন। তিনি তখন বিচক্ষণ যুবক। ভোর রাত্রে তিনি মক্কায় এসে কুরায়শের সঙ্গে কাটাতেন যেন এখানেই তিনি রাত্রে ছিলেন। কথাবার্তা শুনে মনে রাখতেন এবং অন্ধকার ঘনিয়ে এলে তাদের কাছে গিয়ে সে বিষয়ে তাদের জানাতেন। হযরত আবু বকর (রা)-এর আযাদকৃত গোলাম আমির ইবন ফুহায়রা দিনের বেলা তাদের মেষ চরাতেন। আর রাতের কিছু অংশ অতিবাহিত হলে তাদের নিকট মেষ নিয়ে আসতেন এবং তারা দুধ পান করে রাত্রি যাপন করতেন। অন্ধকার থাকতেই আমির ইবন ফুহায়রা মেষ নিয়ে ফিরে আসতেন। উপযুপরি তিন রাত তিনি এরকম করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং আবু বকর (রা) পরিশ্রমিকের বিনিময়ে জনৈক ব্যক্তিকে পথ-প্ৰদৰ্শক নিয়োগ করেন। লোকটি ছিল বনী দাউলের শাখা গোত্র বনু আবদ ইবন আব্দীর লোক এবং০একজন দক্ষ পথ-প্রদর্শক। “আস ইবন আবু ওয়াইল সাহিমীর পরিবারের সাথে তার ছিল গভীর বন্ধুত্ব এবং সে ছিল এদের মিত্র। কুরায়শের কাফিরমুশরিকদের ধর্মে সে বিশ্বাসী ছিল। তাঁরা দু’জনে তাকে বিশ্বাস করে সওয়ারী তার কাছে অর্পণ করেন এবং তিন দিন পর ভোরে সওয়ারী নিয়ে গুহার মুখে হাযির হওয়ার জন্য তাকে বলে দেন। এসময় আমির ইবন ফুহায়রা এবং পথ-প্রদর্শককে নিয়ে তারা সমুদ্র উপকূলীয় পথে রওনা হন।

ইবন শিহাব (যুহরী) সুরাকা ইবন মালিক মুদলিজীর ভাতিজা আবদুর রহমান ইবন মালিক মুদলিজী সূত্রে তাঁর পিতার বরাতে বলেন যে, তাঁর পিতা সুরাকী ইবন মালিক ইবন জু শামকে বলতে শুনেছেন যে, আমাদের নিকট কুরায়শ কাফিরদের দূত আসে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বা আবু বকর (রা)-কে হত্যা বা বন্দী করার পুরস্কারের ঘোষণা নিয়ে। তিনি বলেন, আমার স্বগোত্র বনী মুদলিজের একটা মজলিসে আমি উপবিষ্ট ছিলাম, এমন সময় তাদের এক ব্যক্তি আমাদের দিকে এ গিয়ে এসে সম্মুখে দাঁড়ায়। আমরা তখনো উপবিষ্ট আছি। লোকটি বললো, হে সুরাকা! আমি সবে মাত্র উপকূলীয় পথে কিছু লোক দেখে এসেছি, আমার ধারণা এরা মুহাম্মদ এবং তার সঙ্গী হবে। সুরাকী বলে, আমি বুঝতে পারলাম যে, তারা তো আসলেই তারা। কিন্তু আমি তাদেরকে বললাম যে, না, ওরা তারা নয়। তুমি হয়তো অমুককে দেখে থাকবে, যে আমাদের সম্মুখ দিয়ে একটু আগে চলে গেছে। এরপর আমি মজলিসে কিছু সময় অবস্থান করি, তারপর উঠে দাঁড়ায় এবং গৃহে প্রবেশ করি। আমি আমার ঘোড়া বের করে আনার জন্য বাদীকে নির্দেশ দেই। আমি তাকে টিলার পেছনে ঘোড়া নিয়ে আমার অপেক্ষায় থাকতে বলি এবং আমি বর্শা নিয়ে ঘরের পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে পড়ি। আমার ঘোড়ার নিকট আসি, তার উপর সওয়ার হই, তাকে ছুটাই আর সে ছুটে যায় এবং আমাকে তাদের কাছে নিয়ে যায়। আমাকে নিয়ে ঘোড়াটি হোঁচটি খায় এবং আমি তার পিঠ থেকে নিচে পড়ে যাই। আমি উঠে দাঁড়ায় এবং তৃণের প্রতি হাত বাড়াই এবং তা থেকে ভাগ্য গণনার তীর বের করে তার সাহায্যে ভাগ্য পরীক্ষা করি; তাদের ক্ষতি আমি করবো কি না তা জানার চেষ্টা করি। যা আমি পসন্দা করি না। তাই বের হলো। ভাগ্য পরীক্ষার তীরের বিরোধিতা করে আমি ঘোড়ায় সওয়ার হই, ঘোড়া আমাকে কাছাকাছি নিয়ে যায়। এমনকি আমি রাসূলুল্লাহর তিলাওয়াতের শব্দ শুনতে পাই। কোন দিকে তাঁর লক্ষ্য নেই; আর আবু বকর তখন এদিকে ওদিকে-তাকাচ্ছিলেন। আমার ঘোড়ার দু’পা মাটিতে আটকা পড়ে হাঁটু পর্যন্ত দেবে যায়। আমি ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যাই। আমি উঠে দাঁড়ায়, ঘোড়াকে শাসনাই। সেও উঠে, কিন্তু সামনের পা দু’টি মাটি থেকে বের করতে পারলো না। সে যখন সোজা হয়ে দাঁড়ালো, তখন তার সামনের দু’পায়ের নীচ থেকে ধূলা উড়ে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আবার আমি তীর দ্বারা ভাগ্য পরীক্ষা করলাম। এবারও তা-ই বের হলো, যা আমার অপসন্দ। আমি তাদেরকে অভয় দিলাম। তারা দাড়ালেন। আমি ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে তাদের নিকটে পৌছি। মাটিতে আটকা পড়ে আমার যে দশা হয় তাতে মনে এমন ভাবের উদয় হয় যে, অবিলম্বে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দীন জয়যুক্ত হবে। তখন আমি তাকে বললাম, আপনার জাতি আপনাকে ধরিয়ে দেয়ার পুরস্কার ঘোষণা করেছে। তাদেরকে নিয়ে লোকেরা যা করতে চায়, সে সম্পর্কে আমি তাদেরকে অবহিত করলাম এবং আমি তাদেরকে পথের সম্বল আর সামগ্রী দানের প্ৰস্তাব পেশ করলাম। তারা আমাকে কোন জবাব দিলেন না। কোন কথা আমার নিকট জিজ্ঞাসাও করলেন না। কেবল এ টুকুই বললেন যে, আমাদের বিষয়টা গোপন রাখবে।

এ ব্যাপারে নির্দেশ দেন। তিনি আমাকে চামড়ার টুকরায় নিরাপত্তা পত্র লিখে দেন। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) সম্মুখে অগ্রসর হন।

তাঁর পিতা থেকে, তিনি তার চাচা সুরাকা থেকে এ কাহিনী বর্ণনা করেন। তবে ব্যতিক্রম এই যে, তিনি একথা উল্লেখ করেনঃ গৃহ থেকে বের হওয়ার পরই ভাগ্য পরীক্ষার জন্য তীর বের

8

করেন। তখন এমন তীর বের হয়, যা তার পসন্দ ছিল না। তাই বলে তার জন্য তা ক্ষতিকরও ছিল না। শেষ পর্যন্ত সুরাকা তাদের কাছে নিরাপত্তার আবেদন জানায়। তাতে একথাও উল্লেখ আছে যে, তাকে নিয়ে ঘোড়া চার বার হেঁচট খায়। আর এ সবই ঘটে তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ধারণের মাধ্যমে। আর এতে এমন তীর বের হয়ে আসে, যা তার পসন্দনীয়ও ছিল না। আবার তার জন্য ক্ষতিকরও ছিল না। শেষ পর্যন্ত সুরাকী তাদেরকে অভয় দান করে। সুরাকা তাদের নিকট এ অনুরোধও জানায় যে, তিনি যেন তাকে এমন একটি লিপি লিখে দেন যা হবে তার এবং রাসূলের মধ্যে একটি স্মারক স্বরূপ। সুরাকা বলে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে হাডিড, কাগজের টুকরা বা কাপড়ের টুকুরার উপরে একটা লিপি লিখে দেন। তাতে একথাও উল্লেখ করা হয় যে, তাইফ থেকে প্রত্যাবর্তনের পথে জিয়িরারানায় রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ লিপি অর্থাৎ নিরাপত্তা পত্র দেখে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেনঃ এ দিনটি উত্তম আচরণ আর বিশ্বস্ততার দিন। তাকে আমার নিকটে নিয়ে এসো। আমি তার নিকটে এলাম এবং ইসলাম গ্রহণ করলাম। ইবন হিশাম বলেন, : সে হল আবদুর রহমান ইবন হারিছ ইবন মালিক ইবন জুশাম। আর এটি একটি বিশ্বস্ত বিবরণ।

সুরাকা যখন ফিরে আসে (এ অনুসন্ধানী অভিযান থেকে) সন্ধানকারী দলের কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তাকে ফেরত দিয়ে বলতো, এ দিকে এ পর্যন্তই থেমে যাও। (অর্থাৎ এ দিকে গিয়ে লাভ হবে না, কেউ নেই।) যখন প্রকাশ পেল যে, রাসূলুল্লাহ (সা) নিশ্চিত মদীনা পৌঁছছেন, তখন সে লোকজনের নিকট সে সব বিষয় আর ঘটনা প্ৰকাশ করতে শুরু করে, যা সে প্রত্যক্ষ করেছে এবং তার মাধ্যমে এ ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে। তখন কুরায়শের সরদাররা তার পক্ষ থেকে অনিষ্টের আশংকা করে। তারা এ আশংকাও করে যে, এটা তাদের অনেকের ইসলাম গ্রহণের কারণ হয়ে যেতে পারে। আর সুরাকা ছিল বনী মুদলিজ গোত্রের নেতা। তখন অভিশপ্ত আবু জাহল বনু মুদলিজ গোত্রের নিকট নিম্নোক্ত কবিতাটি লিখে পাঠায় :

بنی مدلج انی اخاف سفیهکم–سراقة مستفو لنصر محمد علیکم به الا یفرق جمع کم–فیصبح شتی بعد عز و سودد অর্থাৎ বনী মুদলিজ গোত্রের লোকজন! তোমাদের নির্বোিধ সুরাকা সম্পর্কে আমার ভয় হয়, মুহাম্মদকে সাহায্য করে সে তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট করবে। তোমাদের উচিৎ তাকে ঠেকানো, যাতে করে কোন ফাটল ধরাতে না পারে তোমাদের ঐক্যে। ফলে মর্যাদা আর

কর্তৃত্বের পর তোমরা হয়ে পড়বে শতধা বিভক্ত। আবু জাহলের জবাবে সুরোকা নীচের কবিতাটি লিখে পাঠান :

أباحكُم واللّه لو كنت شاهدًا – لامر جوادى اذ تسوخ قوائمهআবুল হাকাম! তুমি যদি দেখতে আমার ঘোড়ার পা যখন দেবে যায় মাটিতে,

می و ن را می

<、* 」。 •, و ہ یہ .ޅ4 .ޗ ހ a 3 á, í *。 ・1 。 ܐ عجبیت و لم تشکلک بان محمدا–رسول و برهان فمن ذا يقاومة

তবে তুমি অবাক হতে। সন্দেহ করতে না যে, মুহাম্মদ রাসূল এবং প্রমাণ, কে আছে, যে তাঁর মুকাবিলা করতে পারে?

علیلات فکف القوم عنه فاننی آخال لنا یوم استبد و معالمهٔ

তোমার কর্তব্য হলো লোকজনকে তার থেকে নিবৃত্ত করা, আমার ধারণা একদিন তার দীনের নিদর্শনসমূহ প্ৰকাশ পাবে।

بامر تو د النصر فیه فانهم–وان جمیع الناس طراب مسالمه

যাতে তুমিও তাকে সাহায্য করতে আকাঙ্ক্ষী হবে, কারণ তারা এবং সকল মানুষ তার সঙ্গে সন্ধি করতে উদগ্ৰীব হবে।

উমাবী তদীয় ‘মাগায়ী’ গ্রন্থে আবু ইসহাক সূত্রে এ কবিতাটি উদধূত করেছেন আর আবু নুআয়ম উল্লেখ করেছেন যিয়াদ সূত্রে ইবন ইসহাক থেকে এবং আবু জাহলের কবিতায় এমনকিছু শ্লোক যোগ করেছে যাতে কুফারী বা নাস্তিক্যবাদী চিন্তাধারা রয়েছে। ]

আর ইমাম বুখারী (র) ইবন শিহাবের সনদে বলেন যে, উরওয়া ইবন যুবােয়র আমাকে জানান যে, যুবােয়র (রা) যখন সিরিয়া থেকে একটি মুসলমান বাণিজ্য কাফিলার সাথে ফিরছিলেন এসময় তার সাথে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাক্ষাৎ ঘটে। তিনি তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং হযরত আবু বকর (রা)-কে সাদা কাপড় উপহার দেন। এদিকে মদীনার মুসলমানরা মক্কা থেকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বহির্গত হওয়ার কথা শুনতে পান। তারা প্রতিদিন ভোরে ‘হাররা’ নামক স্থানে এসে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জন্য অপেক্ষায় থাকতেন এবং দুপুরের খরতাপে ঘরে ফিরতেন। এ ভাবে দীর্ঘ অপেক্ষার পর একদিন তারা নিজ নিজ গৃহে ফিরে গেছেন এমন সময় জনৈক ইয়াহুদী কোন প্রয়োজনে একটু উঁচু ঘরের উপর উঠে। সে রাসূলুল্লাহ (সা) ও তার সঙ্গীদেরকে দেখতে পায়। তারা সাদা পোশাক পরিহিত ছিলেন। তাদের সাদা পোশাকের উজ্জ্বলতা যেন মরীচিকাকে হার মানাচ্ছিল। ইয়াহুদী উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার দিয়ে উঠলো : হে আরব সমাজ! এই যে তোমাদের ঈন্সিত ব্যক্তি এসে পড়েছেন, যার অপেক্ষায় তোমরা প্রহর গুণছিলে। মুসলমানরা অস্ত্রের দিকে ছুটে যান এবং অস্ত্ৰে সজ্জিত হয়ে হাররার উচু ভূমিতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে সাদর সম্ভাষণ জ্ঞাপন করেন এবং তিনি তাদেরকে নিয়ে ডান দিকে মোড় নেন এবং শেষ পর্যন্ত বনু আমর ইবন আওফের মহল্লায় অবতরণ করেন। আর এ দিনটি ছিল রবিউল আউয়াল মাসের এক সোমবার। আবু বকর (রা) লোকজনের উদ্দেশ্যে দণ্ডায়মান হন, আর রাসূলুল্লাহ (সা) চুপচাপ বসে থাকেন। আর অন্যদের মধ্যকার যারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে ইতোপূর্বে দেখেননি তাঁরা এগিয়ে এসে আবু বকর (রা)-কে অভিবাদন জ্ঞাপন করা শুরু করেন : রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বদন মুবারকে রৌদ্রের উত্তাপ পতিত হলে হযরত আবু বকর (রা) চাদর দিয়ে তাকে ছায়া দেন। তখন লোকজন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে চিনতে পারেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বনু আমর ইবন আওফের মহল্লায় দশ রাতের কিছু বেশীকাল অবস্থান করেন। এখানে তিনি একটি মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন। যার ভিত্তি তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত। এটি ছিল বিখ্যাত মসজিদে কুবায়। এই মসজিদে রাসূলুল্লাহ (সা) নামায আদায় করেন। এরপর তিনি সওয়ারীর পিঠে আরোহণ করেন এবং তার সঙ্গে লোকজনও হেঁটে চলেন। শেষ পর্যন্ত মদীনায় মসজিদে নববীর স্থানে গিয়ে উট বসে পড়ে। এখানে রাসূলুল্লাহ্ (সা) নামায আদায় করেন। তার সঙ্গে অন্যান্য মুসলমানরাও নামায আদায় করেন। যে স্থানে রাসূলুল্লাহ (সা) এবং অন্যান্য মুসলমানগণ নামায আদায় করেন সেটি ছিল সুহাইল এবং সাহল নামের দু’জন ইয়াতীম বালকের, যারা ছিল আসআদ ইবনু যুরারার প্রতিপালনাধীন। স্থানটি ছিল খেজুর শুকানাের খলা। এখানে উট বসে পড়লে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন :

هذا ان شاء الله السمنزل – ইনশাআল্লাহ, এটিই হচ্ছে অবতরণ স্থল। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইয়াতীম বালকদ্বয়কে ডেকে আনান এবং মসজিদ নিমাণের জন্য স্থানটির মূল্য জানতে চান। বালকদ্বয় বলে, ইয়া রাসূলাল্লাহ! (সা) আমরা স্থানটি আপনাকে দান করবো। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের নিকট থেকে দান হিসাবে স্থানটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। শেষ পর্যন্ত তিনি টাকা দিয়ে স্থানটি ক্রয় করে সেখানে মসজিদ বানান। মসজিদ নিমণিকালে রাসূলুল্লাহ (সা) নিজে তাদের সঙ্গে ইট বহন করেন। এ সময় তিনি নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করতেন :

هذا الحمال لأحمال، خيبر – هذا ابر ربنا واطهر – এ (ইট) বহন করা খায়বর-এর ফলমূল বহন করার মত নয়, হে আমাদের পালনকর্তা! এ বহন করা অতি পুণ্যময় ও অতি পবিত্ৰ।

নবী করীম (সা) এ সময় আরো আবৃত্তি করতেন :

لاهم ان الاجر اجر الاخرة – فارحم الانصسار والمهاجر ه–হে পরওয়ারদিগার! পরকালের পুরস্কারই আসল পুরস্কার। সুতরাং তুমি দয়া করে আনসার ও মুহাজিরদের প্রতি।।*

কোন একজন মুসলমানের নামে এ কবিতাগুলো চালু হলেও তাঁর নাম আমি জ্ঞাত নই। ইবন শিহাব (যুহরী) বলেন, : এ কবিতার পংক্তি ছাড়া রাসূলুল্লাহ (সা) অন্য কোন পূর্ণ কবিতা আবৃত্তি করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। এটা বুখারী শরীফের শব্দমালা। ইমাম বুখারী এককভাবে এ কবিতাগুলো উল্লেখ করেছেন। ইমাম বুখারীর উল্লিখিত কবিতার সমর্থনে আরো অনেক বর্ণনা রয়েছে। তবে তাতে উন্মু মা’বাদ আল খুযাইয়ার ঘটনার উল্লেখ নেই। আমরা এখানে ধারাবাহিক ভাবে একের পর এক প্রয়োজনীয় আলোচনা করবো।

(রা) থেকে বর্ণনা করে বলেন, : আবু বকর (রা) ১৩ দিরহাম দিয়ে আযিব-এর নিকট থেকে একটা খীন ক্রয় করেন। তখন আবু বকর (রা) আয়িবকে বললেন, তাকে বল, যেন বীনটি আমার ঘরে পৌঁছিয়ে দেয়। তখন তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন বের হলেন, তখন আপনি কেমনটি করেছিলেন আমাদেরকে তা না বলা পর্যন্ত তা আপনার বাড়ীতে পৌঁছিয়ে দেবাে না। কারণ এ সময় আপনি তাঁর সঙ্গে ছিলেন। তখন আবু বকর (রা) বললেন, : আমরা

১. মূল গ্রন্থে এ ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর সীরাতে ইবন হিশামে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ সময় لا عباش الا عیش الاخرة حس–اللهم ار حم الانصار و الهاجر ه 8 169۹°۹।|۶۹||۴||||||||||P۹۶۹| আখিরাতের জীবনই আসল জীবন, হে আল্লাহ! রহম কর আনসার মুহাজিরদের প্রতি। আর রাসূলুল্লাহ ও الاعیش الاعیش الاخرة–اللهم فار حم الهاجرین والانصارهٔ 9 ) آ۹۶ (آب) —আখিরাতের জীবন ছাড়া কোন জীবন নেই, হে আল্লাহ! মুহাজির ও আনসারদের প্রতি রহম কর।

বের হই রাত্রের শেষ প্রহরে। দিবারাত্র সফর করতে থাকি। শেষ পর্যন্ত বেলা ঠিক দুপুরে আমি চোখ খুলে চতুর্দিকে তাকালাম। এই আশায় যেন আমরা কোন ছায়ায় আশ্রয় নিতে পারি। অকস্মাৎ একটা বড় পাথর সামনে পড়ে, এগিয়ে গিয়ে দেখি সামান্য ছায়া। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্য আমি জায়গাটি সমান করি, তার জন্য চাদর বিছাই এবং বলি-ইয়া রাসূলাল্লাহ! বিশ্রাম করুন। তিনি বিশ্রাম করলেন। এরপর আমি বের হয়ে সন্ধানরত কাউকে দেখতে পাই কিনা, লক্ষ্য করতে থাকি। এ সময় একজন মেষ চারককে দেখতে পাই। তাকে জিজ্ঞাসা করি, তুমি কার মেষ চারক হে বালক? সে বলে, এক কুরায়শী ব্যক্তির। সে মালিকের নাম বলে, আমি তাকে চিনতে পারি। আমি তাকে বলি, তোমার মেষ পালের মধ্যে কি দুধেল মেষ আছে? সে বলে, আছে বৈ কি! আমি বলি তুমি কি আমার জন্য দুধ দোহন করবে? বললো, হ্যা। এরপর আমি তাকে নির্দেশ দিলে সে একটা ছাগল নিয়ে আসে। আবার তাকে নির্দেশ দিলে সে ওলান ধূলা-বালিমুক্ত করে। আবার নির্দেশ দিলে সে ধূলা বালি থেকে হাত পরিষ্কার করে। আমার সঙ্গে একটা পাত্র ছিল। পাত্রের মুখে ছিল একটা কাপড়ের টুকরা। সে আমার জন্য সামান্য পরিমাণ দুধ দোহন করে। আমি দুধ পেয়ালায় ঢালি, তার নিচের অংশ ঠাণ্ডা হয়। এরপর আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট আগমন করি এবং তাঁকে দুধ টুকু দিয়ে দেই। এসময় তিনি জেগে গিয়েছিলেন। আমি নিবেদন করি, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা)। আপনি পান করুন। তিনি পান। করলেন, আমি তাতে খুশী হলাম। এরপর বললাম, প্ৰস্থান করার সময় হয়েছে কি? তারপর আমরা রওনা হলাম। আর (কুরায়শের) লোকজন তখনো আমাদেরকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। সুরাকা ইবন মালিক ইবন জুশাম ছাড়া কেউ আমাদের সন্ধান পায়নি। আর সে ছিল ঘোড়ার পিঠে সওয়ার। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)!! অনুসন্ধানী ব্যক্তিটি তো আমাদের নিকট এসে গেছে! তিনি বললেন, :

لأتحزن ان اللّه معنا

“তুমি বিচলিত হয়ে না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” এমন কি তার এবং আমাদের মধ্যে এক, দুই বা তিন বর্শা পরিমাণ দূরত্ব থাকা অবস্থায় আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)!! অনুসন্ধানী তো একেবারেই আমাদের নিকটে এসে গেল, আমাদের নাগাল পায় পায় আর কি! এ বলে আমি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। রাসূলুল্লাহ (সা) জিজ্ঞাসা করলেন : তুমি কাদছো কেন? আমি বললাম]

আপনার জন্য। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার জন্য বদদু’আ করে বললেন :

اللهم اکفناه بما شئت “হে আল্লাহ! তুমি যেভাবে ইচ্ছা তার থেকে আমাদেরকে হিফাযত কর।” এরপর তার

ঘোড়ার পা পেট পর্যন্ত শক্ত মাটিতে দেবে যায় এবং সে লাফ দিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে

বলে?

“হে মুহাম্মদ! আমি নিশ্চিত বুঝতে পেরেছি যে, এটা আপনার কাজ! আপনি আল্লাহর নিকট দুআ করুন, আমি যে বিপদে আছি, তিনি যেন আমাকে তা থেকে নাজাত দেন। আল্লাহর কসম

থাকবো। (অর্থাৎ তাদেরকে দেখবো না এবং আপনার সন্ধান দেবো না)। এ হল আমার তীরদান। আপনি তা থেকে একটা তীর নিয়ে নিন। অমুক অমুক স্থানে আপনি আমার উট আর মেষের নিকট দিয়ে অতিক্রম করবেন। সেখান থেকে প্রয়োজন অনুপাতে আপনি নিয়ে নেবেন।”

“তাতে আমার কোন প্রয়োজন নেই”— এ বলে রাসূলুল্লাহ তার জন্যে দুআ করেন। তার ঘোড়া মুক্তি পায়। সে তার লোকজনের নিকট ফিরে যায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং আমি অব্যাহত ভাবে চলতে থাকি। শেষ পর্যন্ত আমরা মদীনায় এসে পৌছি। লোকেরা তাকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপনের জন্য এগিয়ে আসে। রাস্তায় রাস্তায় আর ছাদে ছাদে লোক বেরিয়ে আসে।

الله اكبر جاء رسول الله جاء محمد صل الله عليه وسلم

“আল্লাহু আকবার, রাসূলুল্লাহ এসেছেন, মুহাম্মদ এসেছেন” বলে শিশুরা আর সেবকরা রাস্তায় বেরিয়ে আসে।

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কাদের বাড়ীতে অবস্থান করবেন, সে বিষয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, :

সম্মানার্থে। ভোর হলে তিনি সেখানে গমন করেন, যেখানে গমন করার জন্য তাঁকে হুকুম করা হয়েছিল।

বারা” ইবন আযিবা (রা) বলেন, মুহাজিরদের মধ্যে প্রথম যিনি আমাদের নিকট আগমন করেন। তিনি হলেন মুসআব ইবন উমায়র। ইনি ছিলেন বনু আবদুন্দারভুক্ত। এরপর আগমন করেন ইবন উন্মু মাকত ১ম, বনু ফিহরের অন্যতম সদস্য। এরপর আগমন করেন উমর ইবন খাত্তাব (রা) ২০ সদস্যের একটি দল নিয়ে। তখন আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খবর কি? তিনি বললেনঃ আমার পেছনে আসছেন। এরপর আগমন করলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন। হযরত আবু বকর (রা)। বারা ইবন আযিবা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মদীনায় আগমনের পূর্বেই আমি কতিপয় মুফাসসাল সূরা শিখে নিয়েছিলাম। বুখারী, মুসলিম হাদীসটি ইসরাঈলের সনদে বর্ণিত হয়েছে। তবে বারা’র উক্তি :

اول من قدم علينا (সর্বপ্রথম যিনি আমাদের নিকট আগমন করেন)। শুধু মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেন।

ইবন ইসহাক বলেন, : রাসূলুল্লাহ (সা) গুহায় তিন দিন অবস্থান করেন এবং তাঁর সঙ্গে ছিলেন আবু বকর (রা)। কুরায়শরা যখন থেকে তাকে সন্ধান করতে থাকে, তখন থেকেই তাকে ফেরত দিতে পারলে একশ’ উট পুরস্কার ঘোষণা করে। যখন তিন দিন অতিক্রান্ত হয়

এবং তাদের ব্যাপারে লোকজন নিরাশ হয়ে পড়ে, তখন তাদের দু’জনের এবং তার নিজের উট নিয়ে পূর্ব বর্ণিত পথ-প্রদর্শক আবদুল্লাহ হাযির হয় এবং আসমা বিনত আবু বকর খাদ্যদ্রব্যের পুটলি নিয়ে আসেন। কিন্তু তা বঁধবার জন্য রশি আনতে ভুলে যান। তারা উভয়ে রওনা হয়ে গেলে আসমা খাদ্যদ্রব্যের পাত্র ঝুলাতে গিয়ে দেখেন যে, তাতে রশি নেই। তখন তিনি কোমরবন্ধ ছিড়ে রাশি বানান এবং পুটলিটি বেঁধে দেন। একারণে তাঁকে “যাতুন নিতাকাইন” বলা

হয়।

ইবন ইসহাক বলেন, : হযরত আবু বকর (রা) দু’টি বাহনের নিকটে গিয়ে তাদের মধ্যে উত্তমটি পেশ করে বলেন, : আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোন, আপনি আরোহণ করুন! তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন :

যে উটের মালিকানা আমার নয়, আমি তাতে আরোহণ করবো না। তখন হযরত আবু বকর (রা) বলেন, : ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতামাতা আপনার জন্য। কুরবান হোন, উটটি আপনারাই। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, : না, বরং কত মূল্যে তুমি তা কিনেছো? হযরত আবু বকর (রা) বললেন, : এত এত মূল্যে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন : এ মূল্যে আমি ক্রয় করলাম। আবু বকর (রা) বললেন, : হে আল্লাহর রাসূল! তা আপনারই জন্য।

ওয়াকিদী তাঁর একাধিক সনদে বর্ণনা করেন যে, নবী করীম (সা) কাসওয়া নামক উটটি গ্রহণ করেন। তিনি একথাও বলেন যে, আবু বকর উটনী দু’টি আটশ’ দিরহামের বিনিময়ে খরিদ করেন। আর ইবন আসাকির হযরত আইশা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, তা ছিল জাদ’আ। অনুরূপভাবে সুহায়লীও ইবন ইসহাক সূত্রে এরূপ বর্ণনা করেছেন।

ইবন ইসহাক বলেন, : তারা দু’জন সওয়ার হয়ে রওনা করেন এবং আবু বকর (রা) পথিমধ্যে তাদের খিদমতের জন্য তাঁর আযাদকৃত গোলাম আমির ইবন ফুহায়রাকে তাঁর উটের পেছনে বসান। এ সম্পর্কে হযরত আসমা (রা) বলেন, : রাসূলুল্লাহ (সা) এবং আবু বকর (রা) বেরিয়ে যাওয়ার পর কুরায়শের একদল লোক আমাদের কাছে আসে। তাদের মধ্যে আবৃ জাহলও ছিল। এরপর ইবন ইসহাক আবু জাহল কর্তৃক আসমার গালে চপেটাঘাত করে এবং এর ফলে তার কানের বালি (দুল) পড়ে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করেন, যা পূর্বেই বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত আসমা (রা) বলেন, : আমরা তিন রাত অতিবাহিত করি। আমরা জানতাম না। যে, তিনি কোন দিকে গিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত মক্কার নিম্নভূমি থেকে জনৈক জিন আগমন করে আরবদের মধ্যে প্রচলিত কয়েকটা কবিতা আবৃত্তি করতে করতে। লোকেরা তার আওয়ায্য শুনছিল, কিন্তু তাকে দেখতে পাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত মক্কার উচ্চভূমি থেকে বেরিয়ে এসে সে

আবৃত্তি করে :

جزیی الله رب الناس خیر جز ائه–رفیقین حالا خیمتی ام معبدমানুষের পালনকর্তা আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দিন সে দু’জন সঙ্গীকে, যারা অবতরণ করেছে উন্মে মা’বাদের তাঁবুতে।

তারা অবতরণ করেছে পুণ্য আর তাকওয়া নিয়ে। আর সফল হয়েছে সে ব্যক্তি, যে মুহাম্মদের সঙ্গী হয়েছে।

لیهن بنی کعب مکان فتاتهم–و معقد ها للمؤمنین بمرصد–বনু কাআবের জন্য মুবারক হোক তাদের নারীর স্থান, আর তাদের অবস্থান মুসলমানদের জন্যে শান্তিধাম।

হযরত আসমা (রা) বলেন : সে লোকটির কথা অর্থাৎ এ কবিতা শুনে আমরা বুঝতে পারি রাসূল (সা) কোন দিকে যাচ্ছেন। আমরা বুঝতে পারি যে, তিনি মদীনার দিকে যাত্রা করেছেন। ইবন ইসহাক বলেন : তারা ছিলেন চার জন : রাসূল (সা), আবু বকর (রা), আমির ইবন ফুহায়রা এবং আবদুল্লাহ ইবন আরকান্দ। ইবন ইসহাক এরূপই বলেছেন। আর প্রসিদ্ধ হল ইবন আরীকত দুয়ালী। তখন পর্যন্ত সে ছিল মুশরিক।

ইবন ইসহাক বলেন, : তাদের পথ-প্ৰর্দশক আবদুল্লাহ ইবন আরকান্দ যখন তাদের উভয়কে নিয়ে বের হয়, তখন তারা মক্কার নিম্নাঞ্চল দিয়ে পথ চলে। এরপর তাদেরকে নিয়ে উপকূলীয় অঞ্চল দিয়ে আড়াআড়ি ভাবে উসফানের নিম্নাঞ্চল দিয়ে পথ চলতে থাকে। এরপর আমাজ এবং কুদায়দ অঞ্চল অতিক্রম করার পর তাদেরকে নিয়ে আগ্রসর হয়। এরপর তাদেরকে নিয়ে সে স্থান থেকে খারার* এর পথ হয়ে ‘ছানিয়া আল-মুররা” অতিক্রম করে। সেখান থেকে তাদেরকে নিয়ে যায় ‘লাকফ’ অঞ্চলে। সেখান থেকে তাদেরকে নিয়ে অতিক্রম করে মাদলাজা লাকফ। সেখান থেকে মাদলাজা মাজাজ। এরপর তাদেরকে নিয়ে গমন করে মারজাহ মাজাজ। সেখান থেকে তাদেরকে নিয়ে যায়। যুল-আযাওয়ায়ন মারজাহ। এরপর খী কাশাদ প্রান্তরে। এরপর তাদেরকে নিয়ে যায় জান্দাজিদ-এর উপর দিয়ে। এরপর আজরাদ-এর উপর দিয়ে। এরপর তাদেরকে নিয়ে চলে আ’দা প্ৰান্তর ও যা-সালাম হয়ে তি’হিন-এর মাদলাজায়। এরপর আবাবীদ। হয়ে তাদেরকে নিয়ে অতিক্রম করে আল-কাহা অঞ্চল। এরপর তাদেরকে নিয়ে নেমে আসে। আল আরজ অঞ্চলে। এরপর একটি উটি পেছনে পড়ে গেলে আসলাম গোত্রের জনৈক ব্যক্তি— যাকে বলা হয় আওস ইবন হাজার-রাসূলুল্লাহ (সা)-কে তাঁর উটে সওয়ার করান। এ উটকে বলা হতো ইবনুর রিদা। এ উট তাঁকে মদীনা পর্যন্ত বহন করে নেয়।

আওস ইবন হাজার তার উটের সঙ্গে একজন সেবকও দেয়, যার নাম ছিল মাসউদ ইবন হুনায়দা। তাদেরকে নিয়ে বের হয় তাদের পথ-প্রদর্শক আল-আরাজ থেকে রাকুবার দক্ষিণে ছানিয়া আল আইর-এর পথে অগ্রসর হয়। ইবন হিশামের মতে এ স্থানকে বলা হয় আল গাইর (১৭L;!!)। সেখান থেকে তাদেরকে নিয়ে নেমে আসে রাম প্রান্তরে। সেখান থেকে তাদেরকে নিয়ে অগ্রসর হয়ে| কুবায় পৌঁছে। সেখানে বনু আমর ইবন আওফের পল্লীতে তিনি অবস্থান

১. মূল দুটি কপিতে আছে আল-হারার (১২) আলহারার বহু বচন (১১২। ১-৯৯) সীরাতে ইবন হিশামে আছে আল খারার (১১২]]) এটা হিজায্যের একটা স্থানের নাম। মতান্তরে মদীনার একটা উপত্যকা বা কুয়ার নাম (ইয়াকৃত প্রণীত মুজামুল বুলদান)।

করেন। এটি ছিল সোমবার রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ রাত্রি। সূর্য তখন প্রখর কিরণ দিচ্ছিল এবং তখন ছিল প্রায় দুপুরের কাছাকাছি সময়।

ওয়াকিদী সূত্রে আবু নুআয়ম এই মনযিলগুলোর অনুরূপ নাম উল্লেখ করেছেন। তবে কোন কোন মনাযিলের নামের ক্ষেত্রে তিনি ভিন্ন মতও পোষণ করেছেন। আবু নুআয়ম আবু হামিদ ইবন জাবালা সূত্রে মালিক ইবন আওস-এর মাধ্যমে তাঁর পিতাকে উদধূত করে বলেন : রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং হযরত আবু বকর (রা) হিজরত কালে জুহাফায় আমাদের উটের নিকট দিয়ে অতিক্রম কালে জিজ্ঞেস করেলেন, এ উটগুলো কার? লোকেরা বললো, আসলাম গোত্রের জনৈক ব্যক্তির। রাসূলুল্লাহ (সা) আবু বকর (রা)-এর দিকে লক্ষ্য করে বললেন : আল্লাহ চাহেন তো আমি নিরাপদ। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কি? সে বললো, মাসউদ। তিনি হযরত আবু বকরের প্রতি তাকিয়ে বললেন :

“ইনশা আল্লাহ আমি সফল হয়ে গেছি।” তিনি বলেন, এরপর তার নিকট আমার পিতা আগমন করেন এবং তাকে উটে আরোহণ করান। সে উটটির নাম ছিল ইবনুর-রিদা’।

আমি (গ্রন্থকার) বলি, ইতোপূর্বে ইবন আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কা থেকে সোমবারে বের হন এবং মদীনায় প্রবেশ করেন সোমবারে। বলা বাহুল্য, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মক্কা থেকে বের হয়ে মদীনায় প্রবেশ করার মধ্যখানে ১৫ দিন অতিবাহিত হয়েছিল। কারণ তিনি ছওর গুহায় অবস্থান করেন তিন দিন। এরপর উপকূলীয় পথ ধরে চলেন। এ পথ সচরাচর চলাচলের পথ থেকে অনেক দীর্ঘ। এ পথ অতিক্রম কালে পথিমধ্যে তিনি বনু কাআব ইবন খুযাআর উন্মু মা’বাদ বিনত কাআবের নিকট দিয়ে যান। ইউনুসের উদধূতি দিয়ে ইবন ইসহাক সূত্রে ইবন হিশাম বলেন : মহিলার নাম আতকা বিনত খলফ ইবন মা বাদ ইবন রাবীআ ইবন আসারাম। আর উমুবী বলেন, : তিনি হলেন বনী মুনকিয। ইবন

গোত্রের মিত্ৰ আতিকা বিনত তাবী’। এ মহিলার সন্তানদের মধ্যে ছিলেন মা’বাদ, নাযারা এবং হুনায়দা। এরা সকলেই আবু মা’বাদের সন্তান। আর তার নাম আকতাম ইবন আবদুল উযযা ইবন মা’বাদ ইবন রাবীআ ইবন আসরাম ইবন সামবীস। তার কাহিনী প্ৰসিদ্ধ এবং বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত, যার একটা অপরটাকে শক্তিশালী করে।

এ হল উম্মু মা’বাদ আল-খুযাইয়ার কাহিনী। ইবন ইসহাক সূত্রে ইউনুস বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) উন্মে মা’বাদের তাঁবুতে অবস্থান গ্রহণ করেন। তারা মেহমান-দারীর অভিপ্ৰায় ব্যক্ত করলে মহিলাটি বলেন, আমার নিকট কোন খাবার নেই, নেই কোন দুধেল বকরী: এ অল্পবয়সী ছাগলগুলো ছাড়া। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে একটা মেষ আনার জন্য বললেন। মেষ হাযির করা হলে তিনি ওলানে হাত বুলালেন, আল্লাহর নিকট দু’আ করলেন এবং একটা বড় পাত্রে দুধ দোহন করলেন। এমনকি দুধে ফেনা দেখা দিল এবং তিনি বললেন, : হে উন্মু মাবাদ, তুমি পান কর। উন্মু মা’বাদ বললো, না, বরং আপনিই পান করুন। আপনিই তো পান করার বেশী হকদার। তিনি উন্মু মা’বাদকে তা ফিরিয়ে দিলে তিনি পান করলেন। এরপর আরো

ЯЯ ——

একটি অল্প বয়সী ছাগী তলব করে আনান এবং সেটিকেও এরকম করেন এবং তার দুধ পান করেন। এরপর অপর একটা অল্প বয়সী বকরী তলব করে সেটিকেও এরূপ করে তার দুধ দোহন করে পথ-প্রদর্শককে পান করান। পরে আরো একটি অল্প বয়সী ছাগী তলব করান এবং সেটিকেও এরূপ করে তার দুধ আমিরকে পান করান। তারপর তিনি সেখান থেকে প্ৰস্থান করেন। ওদিকে কুরায়শের লোকজন উন্মু মা’বাদের নিকট পৌঁছে তাকে রাসূলুল্লাহ (সা) সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে। বলে : তুমি কি মুহাম্মদকে দেখেছে? তার এই এই হুলিয়া। তারা উন্মু মা বাদের নিকট তার পরিচয় পেশ করে। উন্মু মা’বাদ বলেন, : তোমরা কি বলছে কিছুই তো বুঝতে পারছি না। আমাদের নিকট এক যুবক এসেছিল, সে অল্প বয়সী বকরীর দুধ দোহন করেছে। কুরায়শরা বললো : আমরা তো তাকেই খুঁজছি।

হাফিয আবু বকর বাযযার (র) মুহাম্মদ ইবন মামার সূত্রে জাবির (রা) থেকে বর্ণনা করে বলেন : মুহাম্মদ (সা) এবং হযরত আবু বকর (রা) হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হয়ে উভয়ে গুহায় প্রবেশ করেন। গুহায় ছিল বেশ কয়েকটি ছিদ্র। তা থেকে কিছু বের হয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে যাতে দংশন না করে এ আশংকায় হযরত আবু বকর সিদীক (রা) পায়ের গোড়ালি দিয়ে একটি গর্তের মুখ বন্ধ করেন। তাঁরা দু’জন গুহায় তিন রাত্রি অবস্থান করেন। তারা সেখান থেকে বের হয়ে উন্মু মা’বাদের তাঁবুতে অবস্থান নেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে দেখে বললেন, আমি এক অনিন্দ্য সুন্দর মুখমণ্ডল দেখতে পাচ্ছি। তবে আপনাদের মেহমানদারীর জন্য এ গোত্র আমার চাইতে বেশী শক্তিশালী ও যোগ্য। সন্ধ্যা হলে মহিলাটি তার এক অল্পবয়সী ছেলে মারফত রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট একটা চাকু এবং একটা বকরী প্রেরণ করেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, চাকুটি নিয়ে যাও এবং একটি পাত্র নিয়ে এসো। তখন মহিলাটি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট (এ মর্মে) খবর পাঠায় যে, বকরীটির দুধ আর বাচ্চা কিছুই নেই। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, : আমাদের নিকট পাত্র নিয়ে এসো। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বকরীর পিঠে হাত বুলালে তা চাঙ্গা হয়ে উঠে এবং তার ওলানে দুধ নেমে আসে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) দুধ দোহন করে নিজে পান করেন এবং আবু বকর সিদীক (রা)-কে পান করান। এরপর আবার দুধ দোহন করে পাত্রে করে উন্মু মা’বাদের নিকট পাঠান। এরপর ইমাম বাযযার (র) বলেন, এ সনদ ব্যতীত (অন্য কোন সনদে)। হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। আর ইয়াকুব ইবন মুহাম্মদ ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে অন্যতম রাবী আবদুর রহমান ইবন উকবা হাদীসটি বর্ণনা করেছেন বলে আমাদের জানা নেই।

হাফিয বায়হাকী (র) ইয়াহইয়া ইবন যাকারিয়া সূত্রে আবু বকর সিদীক (রা) থেকে বর্ণনা করে বলেন, : আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে মক্কা থেকে বের হয়ে আরবের একটি কবীলার নিকট গেলাম। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এক কোণে একটা গৃহ দেখতে পেয়ে সেদিকে যেতে মনস্থ করলেন। আমরা যখন সেখানে অবতরণ করি, তখন সেখানে একজন মহিলা ছাড়া আর কেউ ছিল না। মহিলাটি বললেন : হে আল্লাহর বান্দা! আমি তো একজন মেয়ে মানুষ, আমার সঙ্গে অন্য কেউ নেই। আপনারা মেহমানদারী চাইলে কবীলার কোন প্রধান ব্যক্তির নিকট যান। কিন্তু তিনি একথার কোন জবাব দিলেন না। আর তখন ছিল সন্ধ্যার সময়। মহিলার এক পুত্ৰ সন্তান

ব্যকরী হাঁকিয়ে নিয়ে আসে। মহিলাটি সন্তানকে বলে : বৎস! এ ব্যকরী আর এ ছােরা এ দু’জন লোকের কাছে নিয়ে যাও এবং বল : আমার আম্মা বলছেন, বকরী যাবাহ করে নিজে খাবেন এবং আমাদেরকেও খাওয়াবেন। সে নবী (সা)-এর নিকট গেলে তিনি তাকে বলেন, : ছোরাটা নিয়ে যাও এবং আমার জন্য একটা পেয়ালা নিয়ে এসো। সে বললো, বকরীটি তো এখনো বাচ্চা দেয়নি। তা এখনো দুধেল নয়। তিনি বললেন, তুমি যাও (এবং পেয়ালা নিয়ে এসো)। সে পেয়ালা নিয়ে আসে। নবী করীম (সা) বকরীটির ওলানে হাত বুলান এবং দুধ দোহন করেন। এমনকি পাত্ৰ দুধে ভরে যায়। এরপর বললেন, : এ পাত্ৰ তোমার মায়ের কাছে নিয়ে যাও। তিনি দুধ পান করেন, এমনকি পরিতৃপ্ত হয়ে যান। এরপর সে পেয়ালা নিয়ে তিনি বলেন, এ ছাগীটি নিয়ে যাও এবং অন্য একটি আমার কাছে নিয়ে এসো। তিনি ঐ বকরীর সঙ্গেও এরূপ করলেন এবং এবার আবু বকর (রা)-কে পান করালেন। এরপর আরেকটি বকরী নিয়ে আসে এবং তিনি তার সঙ্গেও অনুরূপ করেন। এরপর নবী করীম (সা) নিজে পান করেন এবং আমরা রাত্রি যাপন করি। তার পরে আমরা প্ৰস্থান করি। মহিলাটি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে মুবারক বলে অভিহিত করেন। মহিলার মেষ পাল অনেক বৃদ্ধি পায়, এমনকি তা মদীনা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে।

আবু বকর (রা) গমনকালে মহিলার সন্তান তাকে দেখে চিনতে পায়। তখন সে বলে, এ লোকটি মোবারক ব্যক্তির সঙ্গে ছিল। তখন মহিলা তার দিকে দাঁড়িয়ে বলে, হে আল্লাহর বান্দা! তোমার সঙ্গে যে লোকটি ছিলেন তিনি কে? তিনি বললেন, তুমি কি জান না। তিনি কে? মহিলাটি বললেন, না। তখন তিনি বললেন, : তিনিই তো আল্লাহর নবী। মহিলাটি বললেন, আমাকে তার কাছে নিয়ে চলো। বললেন, মহিলাকে তার কাছে নিয়ে গেলে রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে আপ্যায়িত করেন এবং উপটৌকন দেন। ইবন আবদান তার বর্ণনায় অতিরিক্ত যোগ করেন : মহিলাটি বলেন : সে মুবারক ব্যক্তির নিকট গমন করার পথ আমাকে দেখাও। মহিলাটি আবু বকর (রা)-এর সঙ্গে গমন করেন এবং তাকে কিছু পনির এবং কিছু আরবীয় পণ্যসম্ভার উপহার দান করেন। রাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে পরিধেয় বস্ত্র এবং উপঢৌকন দান করেন। তিনি আরো বলেন : আমার মনে হয়, তিনি একথাও বলেছেন যে, মহিলাটি ইসলাম কবুল করেন। বর্ণনাটির সনদ হাসান। ইমাম বায়হাকী বলেন, এ কাহিনীটি উন্মু মা’বাদের কাহিনীর অনুরূপ। বলা বাহুল্য, উনিই ছিলেন উন্মু মা’বাদ।

বায়হাকী হাফিয আবু আবদুল্লাহ সূত্রে আবু মা’বাদ। খুযাঈ থেকে বর্ণনা করে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের জন্য বের হন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আবু বকর সিদীক (রা), তার আযাদ করা গোলাম আমির ইবন ফুহায়রা এবং তাদের পথ-প্রদর্শক আবদুল্লাহ ইবন আরীকত আল লায়হী। তারা উন্মু মা’বাদ। খুযাঈর তাবুর নিকট দিয়ে গমন করেন। আর উন্মু মা’বাদ ছিলেন একজন প্রৌঢ়া মোটা-সোটা মহিলা। তিনি তাবুর বাইরে বসে থাকতেন এবং আগন্তুকদেরকে আপ্যায়ন করাতেন। তারা মহিলাটিকে জিজ্ঞেস করলেন, মহিলার নিকট থেকে ক্রয় করতে পারেন এমন কোন গোশত বা দুধ কি তার নিকট আছে? কিন্তু তারা তার নিকট এমন কিছুই পেলেন না। মহিলাটি আরো বলে : আমাদের কাছে কিছু থাকলে আমরা তোমাদের মেহমানাদারী করা থেকে বিরত থাকতাম না। আর গোত্রের লোকেরা

তো বিপন্ন ও দুৰ্ভিক্ষ পীড়িত। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকিয়ে দেখেন যে, তাঁবুর এক প্রান্তে একটা বকৱী আছে। তিনি বললেন, উন্মু মা’বাদ-এ বকরীটা কেমন? মহিলাটি জবাব দিল, দুর্বলতার কারণে অন্য বকরীদের সঙ্গে চলতে না পেরে এটি পেছনে পড়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা) জিজ্ঞাসা করলেন : তার কি দুধ আছে? মহিলা বললেন, তাতো নিতান্তই দুর্বল। দুধ আসবে কোখোঁকে? বললেন, তুমি কি আমাকে তার দুধ দোহন করার অনুমতি দেবে? মহিলাটি বললোঃ তাতে দুধ থাকলে দোহন করে দেখতে পারেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বকরীটিকে আনতে বললেন। বকরীটি হাযির করা হলে তিনি আল্লাহর নাম নিয়ে বকরীটির গায়ে হাত বুলানি। ওলানা মুছে দেন। আল্লাহর নাম নিয়ে একটা বড়সড় পাত্ৰ আনতে বলেন, যাতে একদল লোকের তৃপ্তি হতে পারে। বকরীটি চাঙ্গা হয়ে উঠে। রাসূলুল্লাহ সজোরে দুধ দোহন করেন। এমনকি পাত্রটি ভরে যায়। আর তিনি সে দুধ মহিলার নিকট প্রেরণ করেন। তিনি পান করেন, পান করেন তাঁর সঙ্গীরাও একের পর এক করে বারবার। তারা তৃপ্ত হলে পর তিনি (রাসূলুল্লাহ) নিজে পান করেন। এ সময় তিনি বলেন, : اسانی القوم آخر هم “জাতিকে যে পান করায় সে সকলের শেষে পান করে থাকে ৷”

এরপর তিনি পুনরায় বকরীটির দুধ দােহন করেন। তাঁরা সেখানে রাত্রি যাপন করেন। দুধ টুকু রেখে তারা প্ৰস্থান করেন।

তিনি বলেন, অল্পক্ষণ পরই মহিলাটির স্বামী আবু মা’বাদ দুর্বল কৃশ, শক্তি-সামৰ্থ্যহীন মেষ গুলো তাড়া করতে করতে ফিরে আসে। এসব মেষে মজা খুব সামান্যই ছিল। দুধ দেখে স্বামীটি অবাক হয় এবং জিজ্ঞাসা করে, হে উম্মু মা’বাদ! এ দুধ কোথেকে এলো? দুধ দেয়ার মতো বকরী তো ঘরে একটাও নেই। যে বকরীগুলো আছে সেগুলোতো নেহাৎ অল্প বয়সী। উম্মু মা বাদ বললো : না, আল্লাহর কসম, আমাদের নিকট দিয়ে এক মুবারক (বরকতময় ও পুণ্যবান) ব্যক্তি অতিক্রম করে গিয়েছেন। তাঁর কথা আর বচন ছিল এমন এমন। তার স্বামী বললেন, : সে মুবারক ব্যক্তিটির পরিচয় আমার কাছে পেশ কর। তাঁর বর্ণনা দাও। আমার ধারণা ইনিই সে ব্যক্তি, কুরায়শরা যাকে খুঁজছে। তখন মহিলাটি বললো : আমি এমন ব্যক্তিকে দেখেছি। যার চেহারা উজ্জ্বল গৌরবর্ণ, সুন্দর চরিত্র, লাবণ্যময় মুখ, বিরাট বাপু তাকে কদৰ্য করেনি, মাথার টাক বা ক্ষুদ্র মাথা তাকে ত্রুটিপূর্ণ করেনি, উজ্জ্বল গৌরবর্ণ ও চিত্তহারী ব্যক্তিত্ব, তার চোখ দু’টি ডাগর কালো। চোখের পলক দীর্ঘ ও ঘন, কণ্ঠস্বরে গান্তীর্য ও ভারিাক্কীপনা, উজ্জ্বল সুর্মমাখা চোখ, সরু পাতলা ভুরু, ঘাড় খাড়া সোজা, দাড়ি ঘন-কৃষ্ণ, না অতি দীর্ঘ না। অতি খাটো, যখন তিনি চুপ থাকেন তখন থাকেন গাম্ভীর্য নিয়ে, যখন তিনি কথা বলেন তখন কণ্ঠস্বর হয় ভরাট মিষ্টভাষী, থেমে থেমে কথা বলেন, বেশী কথাও বলেন না, আবার প্রয়োজনের চাইতে কম কথাও বলেন না। তাঁর কথা যেন ছড়ানো মুক্তামােলা, দূর থেকে দেখতে সুদৰ্শন ও চিত্তহারী, আর নিকট থেকে দেখলে আরো উজ্জ্বল, আরো সুন্দর, মধ্যম অবয়ব, দীর্ঘ আকৃতি নয়, যা দেখতে খারাব দেখায়, আর এমন খাটোও নয়, যা দৃষ্টিতে তুচ্ছ ঠেকে, দু’টি শাখার মধ্যস্থলে একটা শাখা, যা তিনটি শাখার মধ্যে সবচেয়ে ন্যরকাড়া, দৈহিক আকৃতিতে

তাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর। তাঁর কিছু সঙ্গী-সাখী আছেন, যারা সর্বদা তাকে পরিবেষ্টন কয়ে রাখে। তিনি কথা বললে তারা গভীর মনোনিবেশ সহকারে শুনেন, তিনি নির্দেশ দান করলে তা পালন করার জন্য তারা ছুটে যান। সকলেই তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন সকলেই তার চারিপাশে সমবেত হন। কানকথাও বলে না। আবার বেশী কথাও না। মহিলার ভাষায় রাসূলের পরিচয় এরকম।

هذا و الله صاحب قریش الذی تطالب 8 All) آ۹ آT * f&}}}}5° “আল্লাহর কসম, এ তো কুরায়শের সে ব্যক্তি, যাকে তারা খুঁজছে।” তার সঙ্গে আমার সাক্ষাত হলে আমাকে তার সঙ্গী করার জন্য আবেদন জানাতাম। এ জন্য কোন পথ পেলে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা চালাবো। আবু মা’বাদ আল-খুজাঈ বলেন, : এরপর মক্কাভূমি থেকে উচ্চকণ্ঠে বুলন্দ-আওয়াজ উখিত হয়। আসমান-যমীনে এ আওয়াজ ভেসে আসে। সকলে এ আওয়াজ শুনতে পায়। কিন্তু কোথা থেকে আসছে আর কে আওয়াজ দিচ্ছে, কেউ তা জানে না। কেউ তাকে দেখতে পাচ্ছে না। আওয়াজদাতা বলছিল :

جزیی الله رب الناس خیر جزانه–ر فیقین حالا خیمتی ام معبد মানুষের পালনকর্তা মহান আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দিন সে সঙ্গীদ্বয়কে, যারা অবস্থান নিয়েছিলেন উন্মু মা’বাদের তাঁবুতে।

তারা দু’জনে অবস্থান নেন সম্মান আর মর্যাদার সঙ্গে এবং প্রস্থান করেন। যে ব্যক্তি মুহাম্মদের সঙ্গী হয়েছে সেইতো হয়েছে সফলকাম।

فیالی قصی ماز وی الله عنکم–به من فعالی لا تجاری و سؤدد সুতরাং হে কুসাই-এর বংশধরগণ! আল্লাহ তা’আলা তোমাদেরকে কেমনতর কীর্তি আর কর্তৃত্ব থেকে বঞ্চিত করেছেন।

سالوا اختکم عین شساتها و انساء ها–فانکم ان تسئلوا الشباة تشهد তোমরা জিজ্ঞেস কর তোমাদের বোনকে তার বকরী আর ভাণ্ড সম্পর্কে। কারণ তোমরা যদি বকরীকে জিজ্ঞেস কর, তবে সেও সাক্ষ্য দেবে।

دعاها بشاة حائل فتحلبت – له بصريح ضرة الشاة مزبد তিনি সে মহিলাকে একটি অল্পবয়সী বকরী দিতে বলেন, আর তা তাঁকে দুধ দেয় স্পষ্ট রূপে, বকরীর ওলানে ছিল ফেনাযুক্ত দুধ।

فغادره رهناً لند بهالحالبیدر لها فی مصدر ثم مورد

তিনি তার নিকট দুধ দোহনকারীর জন্য দুধভর্তি ওলান রেখে যান, যা সে নারীকে দুধ দেয় দিনের শুরুতে আর শেষে (অর্থাৎ সকাল ও সন্ধ্যায়)।

তিনি বলেন, পরদিন প্রত্যুষে লোকেরা নবী করীম (সা)-কে মক্কায় আর খুঁজে পেলো না। তারা উন্মু মা’বাদের তাবুর পথ ধরে। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে মিলিত হয় (মদীনায়)। আবু মা বাদ আল-খুযাঈ বলেন, উপরোক্ত কবিতার জবাবে হাসসান ইবন ছাবিত নিম্নোক্ত কবিতা রচনা করেন :

لقد خاب قوم ذال عنهم نبیهم–و قد سر من یسری الیهم و یفتدی ব্যর্থ হয়েছে সে জাতি হিজরত করেছেন যাদের নবী, আর আনন্দিত হয়েছে সে ব্যক্তি, যে সকাল-বিকাল ছুটে যায় তাঁর পানে।

تر حل عن قوم فزالت عقولهم–و حلی علی قوم بنور مجدد এমন এক জাতির নিকট থেকে তিনি প্ৰস্থান করেছেন, যাদের জ্ঞানবুদ্ধি লোপ পেয়েছে। অপর এক জাতির নিকট অবস্থান নিয়েছেন নিত্য নতুন নূর তথা আলো নিয়ে।

هداهم به بعد الضلال أمة ربهم – وارشدهم من يتبع الحق يرشد গোমরাহীর পর তাদের পালনকর্তা তাদেরকে হিদায়াত করেছেন, পথ-প্রদর্শন করেছেন। যে সত্যের অনুসরণ করে, সে হিদায়াত পায়।

و هل ایستوی ضلال قوم تسفهوا–عمی و هداة یهتدون بمهتد জাতির গোমরাহ লোকেরা, যারা গ্রহণ করেছে নিবুদ্ধিতা আর অন্ধত্ব, তারা কি সমান হতে পারে ওদের, যারা হিদায়াত লাভে ধন্য হয়েছে?

نبی پری مالا يرى الناسا حوله – ويتلو کتاب الله فی کلی مشهد তিনি এমন এক নবী, যিনি দেখেন তার আশেপাশের লোকজন যা দেখে না এবং তিলাওয়াত করেন আল্লাহর কিতাব সকল স্থানে।

কোন দিন যদি তিনি গায়বের কথা বলেন, তবে তা সত্য প্রতিপন্ন হয় সেদিনই; অথবা পর দিন পূর্বাহে।

لیهری آ با بکر سعادة جده–بصحبته من یسعد الله ی سعد আবু বকরের জন্য মুবারক হোক তার সাধনার সৌভাগ্য সাহচর্য লাভের কারণে: আল্লাহ যাকে ভাগ্যবান করেন সে-ই হয়। ভাগ্যবান।

বনু কাআবকে মুবারকবাদ যে, তাদের বংশে মহিলাটি রয়েছেন এবং মুসলমানদের তাঁর আস্তানায় বিশ্রামের জন্য।”

১. রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জীবনীকার সুহায়লী উপরোক্ত কবিতাগুলো তৎপূর্ববতী কবিতাগুলোর সঙ্গে সম্পূক্ত করেন এবং তা জিনদের মধ্যে কোন ব্যক্তির রচনা বলে উল্লেখ করেছেন। এ কবিতাগুলো সাহাবী কবি হাসসান ইবন ছবিতের রচনা বলে তিনি মেনে নিতে চান না।

আবদুল মালিক ইবন ওয়াহাব বলেন, আমি জানতে পেরেছি যে, আবু মা’বাদ আল খুযাঈ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং হিজরত করে (মদীনায়)। নবী করীম (সা)-এর নিকট গমনও করেছিলেন। বর্ণনাটি আবু নুআয়ম-এর। এ বর্ণনার শেষে তিনি এটুকু যোগ করেন যে, আমি জানতে পেরেছি। উন্মু মা’বাদ হিজরত করেছিলেন। ইসলামও গ্রহণ করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে গিয়ে মিলিতও হয়েছিলেন। এরপর আবু নুআয়ম বকর ইবন মুহরিম আল-কালবী সূত্রে সাহাবী হুবায়শ ইবন খালিদ সূত্রে বর্ণনা করে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে যখন মক্কা থেকে বহিষ্কার করা হয়, তখন তিনি তথা থেকে মুহাজির রূপে বের হন। সঙ্গে ছিলেন। আবু বকর সিন্দীক (রা), আমির ইবন ফুহায়রা এবং তাদের পথ-প্রদর্শক আবদুল্লাহ ইবন আরীকত লাইছী। তারা উন্মু মা’বাদের তাবুর নিকট দিয়ে গমন করেন। উন্মু মা’বাদ ছিলেন বয়াস্কা কিন্তু শক্ত-সমর্থ এক মহিলা। তিনি তাবুর আঙ্গিনায় ঠায় বসে থাকতেন।

এরপর তিনি ঠিক পূর্বের মত বর্ণনা করেন। তিনি মুহাম্মদ ইবন আহমদ সূত্রে সােলীত আলবদরী থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হন। আর তাঁর সঙ্গে ছিলেন আবু বকর (রা), আমির ইবন ফুহায়রা এবং ইবন আরীকত, যে তাদেরকে পথ দেখতো। তারা উন্মু মা’বাদ আল খুযাইয়ার নিকট দিয়ে গমন করেন। মহিলাটি তাদেরকে চিনতেন না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) মহিলাটিকে বললেন :

হে উন্মু মা’বাদ! তোমার কাছে কি কিছু দুধ পাওয়া যাবে? মহিলাটি বলে : না, আল্লাহর কসম, বকরীটি তো অল্পবয়সী। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, : এ বকরীটি কেমন? মহিলাটি বলে : দুর্বলতার কারণে অন্য বকরী থেকে পেছনে পড়ে আছে। এরপর পূর্বের মতো গোটা হাদীছ বর্ণনা করেন।

বায়হাকী (র) বলেন, এ ঘটনাগুলো একই কাহিনী হতে পারে। এরপর তিনি উন্মু মা’বাদের বকরীর কাহিনীর সঙ্গে অনুরূপ কাহিনী বর্ণনা করেন। হাফিযী আবু আবদুল্লাহ কায়স ইবন নুমান থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী করীম (সা) এবং আবু বকর (রা) যখন গোপনে রওনা হন, তখন তারা একজন মেষচারকের নিকট দিয়ে গমন কালে তার কাছে দুধ চান। সে বললো, দুধ দোহন করার মতো বকরী আমার কাছে নেই। তবে একটা বকরী শীত মওসুমের শুরুতে গৰ্ভবতী। হয়েছিল, তা একটা অসম্পূর্ণ বাচ্ছা জন্ম দিয়েছিল, এখন তো তার ওলানে কোন দুধ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বকরীটি হাযির করতে বললেন। তা হাযির করা হলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে স্পর্শ করলেন, তার ওলানে হাত বুলালেন এবং তার জন্য দুআ করলেন। ফলে তার ওলানে দুধের সঞ্চার হলো এবং আবু বকর (রা) একটা ঢাল নিয়ে এলেন রাসূলুল্লাহ্ (সা) সে পাত্রেই দুধ দোহন করলেন। আবু বকর (রা)-কে তিনি দুধ পান করালেন। আবার দোহন করে রাখালকে পান করালেন। এরপর আবার দোহন করে তিনি নিজে পান করলেন। তখন রাখালটি বললো, আপনাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, সত্য করে বলুন, আপনি কে? আল্লাহর কসম, আপনার মতো মানুষ তো আমি কখনাে দেখিনি। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, : বিষয়টা তুমি গোপন রাখতে পারলে আমি তোমাকে বলবো, রাখালটি বললো, আচ্ছা। তিনি বললেন, : আমি মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। তখন রাখালটি বললো। আপনি কি সে ব্যক্তি, যার সম্পর্কে কুরায়শের

ধারণা যে, লোকটি সাবী তথা পূর্বপুরুষের ধর্ম ত্যাগী হয়ে গেছে? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, হ্যা তারা তো এমন কথাই বলে। তখন রাখালটি বললো :

“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি (আল্লাহর) নবী। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি (আল্লাহর পক্ষ থেকে) যা কিছু নিয়ে এসেছেন তাও সত্য। আসল কথা এই যে, আপনি যা করেছেন, তা কেবল একজন নবীই করতে পারেন (অন্য কেউ এমনটি করতে পারে না)। আজ থেকে আমি আপনার অনুসারী।” তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে বললেন :

বর্তমান সময়ে তুমি এটা করতে সক্ষম হবে না। তুমি যখন জানতে পারবে যে, আমি জয়যুক্ত হয়েছি, তখন তুমি আমার কাছে আসবে। আবু ঈয়ালা আল মাওসেলী জাফর সূত্রে এটি বর্ণনা করেন।

আবু নুআয়ম এখানে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের কাহিনী বর্ণনা করে বলেন, আমি ছিলাম বালিগ হওয়ার কাছাকাছি যুবক, মক্কায় আমি উতবা ইবন আবু মুআয়তের মেষ চরাতাম। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং আবু বকর (রা) আমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তখন তারা মুশরিকদের কবর থেকে বেরিয়ে আসছিলো। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, বালক তোমার কাছে কি আমাদেরকে পান করাবার মতো দুধ আছে? আমি বললাম, এটা তো আমার কাছে আমানত স্বরূপ, কাজেই আমি তো আপনাদেরকে দুধ পান করাতে পারি না। তারা দু’জনে বললেন, তোমার কাছে এমন ছোট ছাগল আছে, যা এখনো সঙ্গমের উপযুক্ত হয়নি? আমি বললাম, হ্যা। এরপর আমি তাদের দু’জনের নিকট তা নিয়ে এলাম। আবু বকর (রা) আমার কাছে ছাগলটিকে ধরলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার ওলানে হাত দিলেন। দুআ করলেন। এর ফলে ওলান দুধে ভরে গেল। এরপর আবু বকর (রা) পেয়ালার মতো একটা পাত্র নিয়ে আসলেন। তাতে দুধ দোহন করলেন। তিনি নিজে এবং আবু বকর (রা)-কে পান করালেন এবং আমাকেও পান করালেন। এরপর ওলানকে সংকুচিত হওয়ার জন্য বললে তা সংকুচিত হয়ে গেল। পরবতীতে আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট পৌঁছার পর আরয করলাম—এ পবিত্র বাণী অর্থাৎ কুরআনুল করীম থেকে আমাকে কিছু শিক্ষা দান করুন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, : তুমি তো একজন শিক্ষিত যুবক। আমি সরাসরি তাঁর যবান মুবারক থেকে ৭০টি সূরা শিক্ষা করি। এতে কেউ আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। এ প্রসঙ্গে তিনি যে বলেছেন, তারা দু’জনে মুশরিকদের কবল থেকে বেরিয়ে এসেছেন, এর অর্থ হিজরতের সময় নয়। এ হলো হিজরতের পূর্বে কোন এক পর্যায়ে। কারণ, সূচনাতেই যারা ইসলাম গ্ৰহণ করেছেন ইবন মাসউদ ছিলেন এবং মক্কায় ফিরে আসেন, সে কথা পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে। আর তাঁর এ কাহিনী বিশুদ্ধ এবং সিহাহ ইত্যাদি গ্রন্থে প্রমাণিত-প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহই ভাল জানেন।

ইমাম আহমদ (র) আবদুল্লাহ ইবন মুসআব ইবন আবদুল্লাহ যুবায়রী সূত্রে আবাদল-এর আযাদকৃত গোলাম ফাইদ থেকে বর্ণনা করে বলেন, ইবরাহীম ইবন আবদুর রহমান ইবন সাআদের সঙ্গে আমি বের হলাম। আমরা যখন আল-আরাজ নামক স্থানে পৌছি, তখন ইবন

সাআদ উপস্থিত হন। আর এ সাআদ হলেন সে ব্যক্তি যিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে রাকুবার’ পথ প্রদর্শন করেছেন। তখন ইবরাহীম বলেন, আপনার পিতা আপনাকে যে হাদীছ বলেছেন, আপনি আমাকে সে হাদীছটি বলুন। তখন ইবন সাআদ বলেন, আমার পিতা আমাকে বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের নিকট আগমন করেন, আর তাঁর সঙ্গে ছিলেন আবু বকর (রা)। আর আমাদের নিকট আবু বকর (রা)-এর একটা দুগ্ধপোষ্যা কন্যা ছিল—আর রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনার দিকে সংক্ষিপ্ত রাস্তা তালাশ করছিলেন।

এখন সাআদ তাঁকে বলেন ‘রাকুবা” উপত্যকার এই বিরান প্রান্তরে আসলাম গোত্রের দু’জন চোর রয়েছে। এদেরকে মুহানান” বলা হয়। আপনি চাইলে আমরা তাদেরকে পাকড়াও করে আনতে পারি। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, না, তাদেরকে পাকড়াও করে আনার দরকার নেই। বরং আমাদেরকেই তাদের কাছে নিয়ে চলো। সাআদ বলেন, এরপর আমরা বের হলাম। আমরা কিছু দূর এগিয়ে গেলে তাদের একজন তার সঙ্গীকে বলে : এই যে ইয়ামনী! রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের দু’জনকে ডেকে ইসলামের দাওয়াত পেশ করলেন। তারা ইসলাম গ্রহণ করে। এরপর তাদের নাম জিজ্ঞেস করলে তারা বলে–আমরা হলাম মুহানান। রাসূলুল্লাহ্ (সা) بل انتاما اlکرمان 3।| آت)6T>

(না, তোমরা মুহানান নও) বরং তোমরা তো মুকরামান” তথা সম্মানিত। রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে মদীনায় গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বলে দেন।

বর্ণনাকারী বলেন, আমরা বের হলাম। আমরা যখন কুবার নিকটে উপস্থিত হই, তখন বনু আমর ইবন আওফ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন : আবু উমামা আসআদি ইবন যুরোরা কোথায়? সাআদ ইবন খায়।ছামা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি তো আমার আগে পৌছেছেন। আমি কি এ সংবাদ দেব না? এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) অগ্রসর হলেন। তিনি একটা খেজুর বাগানে উপস্থিত হয়ে দেখেন যে, সেখানে পর্যাপ্ত পানি ভর্তি একটি হাওয রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) সেখানে হযরত আবু বকর (রা)-এর প্রতি লক্ষ্য করে বললেনঃ

হে আবু বকর! এটাই তো সে স্থান, যা আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম যে, আমি একটা হাওযওয়ালা অঞ্চলে অবতরণ করছি। যেমন বনী মুদলাজের হাওযওয়ালা অঞ্চল। বৰ্ণনাটি এককভাবে ইমাম আহমদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *