২১. হযরত খাদীজা (রা) বিনত খুওয়াইলিদ-এর ওফাত

হযরত খাদীজা (রা) বিনত খুওয়াইলিদ-এর ওফাত

সন্তুষ্ট হোন এবং তাকেও সন্তুষ্ট করুন! তাঁর শেষ বাসস্থান হিসাবে জান্নাত মনযুর করুন! নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলা হযরত খাদীজা (রা)-এর শেষ বাসস্থান জনাত নির্ধারণ করেছেন। সত্যবাদী ও সত্যবাদীরূপে স্বীকৃত প্রিয়নবী (সা)-এর বাণী দ্বারাও প্রমাণিত। তিনি হযরত খাদীজা (রা)-কে জান্নাতে মণি-মুক্তার তৈরী একটি বাসস্থানের সুসংবাদ দিয়েছেন, যেখানে থাকবে না কোন শোরগোল আর থাকবেন, কোন দুঃখ-কষ্ট।

ইয়াকুব ইবন সুফিয়ান …….. উরওয়া ইবন, যুবােয়র (রা) সূত্রে বলেছেন, নামায ফরয হওয়ার পূর্বেই হযরত খাদীজা (রা)-এর ওফাত হয়। অন্য সনদে যুহরী থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মদীনায় হিজরতের পূর্বে এবং নামায ফরয হওয়ার পূর্বে মক্কায় হযরত খাদীজা (রা)-এর ওফাত হয়। মুহাম্মদ ইবন ইসহাক বলেন, হযরত খাদীজা (রা) এবং

আবু তালিবের মৃত্যু একই বছরে হয়। বায়হাকী (র) বলেন, আমার নিকট বর্ণনা পৌঁছেছে যে, আবু তালিবের মৃত্যুর তিন দিন পর হযরত খাদীজা (রা)-এর ওফাত হয়। আবদুল্লাহ ইবন মুনন্দাহ্ তাঁর “আল মাআরিফাহ” গ্রন্থে এবং আমাদের শায়খ আবু আবদুল্লাহ হাফিয তা উদধূত করেছেন।

বায়হাকী (র) বলেন, ওয়াকিদীর ধারণা যে, আবু তালিব ও হযরত খাদীজা (রা) হিজরতের তিন বছর পূর্বে ইনতিকাল করেন। গিরিসঙ্কটের নির্বাসন থেকে তারা যে বছর বেরিয়ে এসেছিলেন সে বছরেই তাদের মৃত্যু হয়। আবু তালিবের ৩৫ দিন পূর্বে খাদীজার (রা) ওফাত হয়।

আমার মতে, তারা “নামায ফরয হওয়ার পূর্বে” বলে বুঝিয়েছেন মি’রাজের রাতে নামায ফরয হওয়ার পূর্বে। আমাদের জন্যে সমীচীন ছিল মি’রাজের ঘটনা বর্ণনার পূর্বে খাদীজা (রা) ও আবু তালিবের ওফাতের ঘটনা উল্লেখ করা যেমনটি করেছেন বায়হাকী প্রমুখ আলিমগণ! তবে একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে আমরা তাদের মৃত্যুর ঘটনা পরে উল্লেখ করেছি। অচিরেই তা” বিবৃত হবে। কারণ, এই পদ্ধতিতেই বাক্য ও ঘটনা সাজিয়ে-গুছিয়ে বর্ণনা করা যাবে। ইনশাআল্লাহ।

ইমাম বুখারী (র) বলেন, কুতীয়বা …আবু হুরায়রা সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন। জিবরাঈল (আঃ) উপস্থিত হয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! এই যে খাদীজা (রা), তিনি পাত্রের তরকারি অথবা আহার্য অথবা পানীয় নিয়ে আসছেন। আপনার নিকট। তিনি যখন আপনার নিকট উপস্থিত হবেন তখন, তার প্রতিপালক আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকে আপনি তাকে সালাম পৌছিয়ে দিবেন এবং তাকে জান্নাতের একটি বাসস্থানের সুসংবাদ দেবেন। সেটি হবে মুক্তার তৈরী। তাতে কোন শোরগোল ও দুঃখ-কষ্ট থাকবে না। ইমাম মুসলিম (র) মুহাম্মদ ইবন ফুযায়ল থেকে এটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী (র) বলেন, মুসাদাদ আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন যে, ইয়াহইয়া ইবন ইসমাঈল আবদুল্লাহ ইবন আবু আওফাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, নবী করীম (সা) কি খাদীজা (রা)-কে সুসংবাদ দিয়েছিলেন? উত্তরে আবদুল্লাহ ইবন আবু আওফা বললেন, হ্যা, তিনি সুসংবাদ দিয়েছিলেন একটি জান্নাতী গৃহের, যেটি মুক্তার তৈরী। তাতে না থাকবে কোন শোরগোল আর না থাকবে কোন দুঃখ-কষ্ট। ইমাম বুখারী ও মুসলিম এই হাদীছটি ইসমাঈল ইবন আবু খালিদ থেকেও বর্ণনা করেছেন।

সুহায়লী বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত খাদীজা (রা)-কে জান্নাতে বীশের তৈরী গৃহের সুসংবাদ দিয়েছিলেন অর্থাৎ মুক্তার বঁাশ। কারণ, তিনি ঈমান আনয়নে সকল বাধা তুচ্ছ করে অগ্ৰগামিতা লাভ করেছিলেন। ওই গৃহে শোরগোল এবং দুঃখ-কষ্ট থাকবে না। কারণ, তিনি কখনো রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলেননি এবং তাঁর নিকট শোরগোল করেননি। তিনি জীবনে কোন দিন রাসূলুল্লাহ (সা)-কে কষ্ট দেননি, দুঃখ দেননি।

ইমাম বুখারী ও মুসলিম তাদের সহীহ গ্রন্থে হিশাম ইবন উরওয়ার মাধ্যমে তাঁর পিতা সূত্রে হযরত আইশা (রা) থেকে উদধূত করেছেন যে, হযরত আইশা (রা) বলেছেন, আমি হযরত

VISON)–

খাদীজা (রা)-এর প্রতি যত ঈর্ষাকাতর ছিলাম রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অন্য কোন সহধর্মিণীর প্রতি তেমনটা ছিলাম না। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে আমার বিবাহের পূর্বেই খাদীজা (রা)-এর ওফাত হয়। ঈর্ষাকাতর ছিলাম। এ জন্যে যে, আমি তাকে বারবার খাদীজা (রা)-এর কথা আলোচনা করতে শুনতাম। উপরন্তু আল্লাহ তা’আলা রাসূল (সা)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন তাকে জন্নাতে মুক্তার তৈরী একটি বাসগৃহের সংবাদ দিতে। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) কখনাে বকরী যাবাহ করলে খাদীজা (রা)-এর বান্ধবীদের নিকট যথাসাধ্য অধিক পরিমাণে গোশত পাঠাতেন। এটি ইমাম বুখারীর ভাষ্য।

অন্য এক বর্ণনায় আছে, হযরত আইশা (রা) বলেন, খাদীজা (রা)-এর প্রতি আমি যত ঈর্ষান্বিত ছিলাম রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অন্য কোন সহধর্মিণীর প্রতি আমি তত ঈর্ষান্বিত ছিলাম না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) অধিক পরিমাণে তাঁর কথা আলোচনা করতেন বলে আমি তা করতাম। তাঁর ইনতিকালের তিন বছর পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে বিয়ে করেন। আল্লাহ তা’আলা। জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন খাদীজা (রা)-কে জান্নাতে মুক্তার তৈরী একটি বাসগৃহের সংবাদ দেয়ার জন্যে। ইমাম বুখাবী (র)-এর অন্য এক বর্ণনায় আছে, হযরত আইশা (রা) বলেন, আমি খাদীজা (রা)-এর প্রতি যত ঈর্ষাকাতর ছিলাম অন্য কারো প্রতি ততটা ছিলাম না। আমি তাকে দেখিনি কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা)-অনেক বেশী বেশী তার আলোচনা করতেন। কোন কোন সময় বকরী যাবাহ করলে তার কতক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তিনি খাদীজার (রা) বান্ধবীদের জন্যে পাঠিয়ে দিতেন। মাঝে মাঝে আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলতাম, দুনিয়াতে যেন খাদীজা ছাড়া আর কোন মহিলাই ছিল না। তখন তিনি বলতেন, সে তো স্ত্রীর ন্যায় স্ত্রী ছিল বটে। তার ঘরেই আমার ছেলেমেয়ে জন্ম নিয়েছিল।

এরপর ইমাম বুখারী (র) বলেছেন, ইসমাঈল. আইশা (রা) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, খুওয়াইলিদের কন্যা এবং খাদীজার (রা) বোন হালাহ একদিন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর শুনে খাদীজা (রা)-এর অনুমতি প্রার্থনা করার কথা রাসূল (সা)-এর মনে পড়ল। তাতে তিনি ব্যাকুল হয়ে উঠলেন এবং বললেন, হায় আল্লাহ! এ যে হালাহ এসেছে। এ ঘটনায় আমি ঈর্ষান্বিত হলাম এবং বললাম, আপনার কী হল যে, রক্তিম দু’ চোয়াল বিশিষ্ট কুরায়শী এক বুড়ীর কথা। আপনি বারবার স্মরণ করছেন। সে তো, কবেই কালের আবর্তে হারিয়ে গেছে। তার উত্তম বিকল্প আল্লাহ তা’আলা আপনাকে দান করেছেন। ইমাম মুসলিম (র) সুওয়াইদ…. আলী ইবন মুসহির থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। এতে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, হযরত আইশা (রা) হযরত খাদীজা (রা)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন সম্মানের দিক থেকে হোক কিংবা দাম্পত্য জীবনের দিক থেকে হোক। কারণ, রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত আইশা (রা)-এর উপরোক্ত মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করেননি এবং এর কোন উত্তরও দেননি। ইমাম বুখারী (র)-এর বর্ণনা থেকে তা প্রতীয়মান হয়।

পক্ষান্তরে ইমাম আহমদ. হযরত আইশা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) হযরত খাদীজা (রা) সম্পর্কে আলোচনা করলেন। তাঁর প্রশংসা তিনি আনেক দীর্ঘায়িত করলেন। তাতে মহিলাদের সাথে যা হয়ে থাকে আমারও তা হল। আমি তাতে

ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠলাম এবং বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ রক্তিম দু’ চোয়াল বিশিষ্ট এক কুরায়শী বুড়ীর চেয়ে অনেক ভাল স্ত্রী তো আল্লাহ তা’আলা আপনাকে দিয়েছেন। আমার মন্তব্য শুনে ক্ষোভে ও দুঃখে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মুখমণ্ডল এমনি বিবৰ্ণ হয়ে পড়েছিল যা ওহী নাযিল হওয়ার সময় অথবা আকাশে কাল মেঘ দেখা দেয়া কালে তা রহমতের মেঘ, না। আযাবের মেঘ এটা জানার পূর্বে ছাড়া অন্য কোন সময় আমি দেখিনি। ইমাম আহমদ (র)………. আবদুল মালিক ইবন উমােয়র সূত্রে অনুরূপ উদধূত করেছেন। ওই বর্ণনায় ৬, …।| 21, 2, … (রক্তিম দু’ চোয়াল)-এর পরে U,১। ৯। ৩-৪ – < ১, (যে প্রথম যুগে মৃত্যুবরণ করেছে) কথাটি অতিরিক্ত রয়েছে এবং এ, ঐ শব্দের পরিবর্তে ১· · · শব্দ রয়েছে।” ইমাম আহমদ (র) একা এই বর্ণনা উদধূত করেছেন।

এটি একটি ভাল সনদ। ইবন ইসহাক…… আইশা (রা) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) যখন হযরত খাদীজা (রা)-এর কথা আলোচনা করতেন, তখন তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠতেন। আইশা (রা) বলেন, একদিন আমি ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠলাম এবং বললাম, আপনার কী হল যে, আপনি ব্যাপকভাবে রক্তিম চোয়াল বিশিষ্ট ওই মহিলার কথা আলোচনা করছেন। আল্লাহ তো আপনাকে তার উত্তম বিকল্প দান করেছেন। উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, আল্লাহ তা’আলা আমাকে তার উত্তম বিকল্প দেননি। সে তো এমন এক মহিলা ছিল সবাই যখন আমাকে প্ৰত্যাখ্যান করেছে, তখন সে আমার প্রতি ঈমান এনেছে। সবাই যখন–আমাকে মিথ্যাবাদী ঠাওরিয়েছে, তখন সে আমাকে সত্যবাদীরাপে গ্ৰহণ করেছে। মানুষ যখন আমাকে কেবল বঞ্চনা দিয়েছে, তখন সে আপন ধন-সম্পদ দিয়ে আমার সহযোগিতা করেছে। আমার অন্যান্য স্ত্রী যেখানে আমাকে সন্তান দানে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে তার মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা আমাকে সন্তান দান করেছেন। এটিও ইমাম আহমদ (র)-এর একক বর্ণনা। এটির সনদে কোন সমস্যা নেই। বর্ণনাকারী মুজালিদ-এর বর্ণনার সমর্থনে ইমাম মুসলিম অন্য হাদীছ উদধূত করেছেন। তাঁর সম্পর্কে বিতর্ক সর্বজন বিদিত। আল্লাহ্ই ভাল জানেন।

“অন্যান্য স্ত্রী যেখানে আমাকে সন্তান দিতে ব্যর্থ হয়েছে অথচ তার মাধ্যমে আল্লাহ আমাকে সন্তান দান করেছেন।” রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর এ উক্তিটি সম্ভবত মারিয়া (রা)-এর ঘরে নবীপুত্ৰ হযরত ইবরাহীম (রা)-এর জন্মের পূর্বেকার। মূলত এ মন্তব্য মারিয়া কিবতিয়্যাহ (রা) রাসূলের তত্ত্বাবধানে আসার পূর্বের। এটাই নিশ্চিত। কারণ, ইতোপূর্বে আলোচিত হয়েছে এবং পরেও · আলোচিত হবে যে, একমাত্র ইবরাহীম (রা:) ব্যতীত রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সকল ছেলে-মেয়ে হযরত খাদীজা (রা)-এর ঘরেই জন্মগ্রহণ করেন। ইবরাহীম (রা)-এর জন্ম হয় মিসরবাসিনী হযরত মারিয়া কিবতিয়্যাহ-এর গর্ভে।

একদল উলামায়ে কিরাম এই হাদীছ দ্বারা প্রমাণ করেন যে, হযরত আইশা (রা) থেকে হযরত খাদীজা (রা) অধিক মর্যাদাবান ও উত্তম। অপর একদল এই হাদীছের সনদ সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। অন্য একদল এ ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, দাম্পত্য জীবনের দৃষ্টিকোণ থেকে হযরত আইশা (রা) উত্তম ছিলেন। বর্ণনা থেকে তা স্পষ্ট বুঝা যায় কিংবা এরূপ ধারণা পাওয়া

১. … এ মুখের লাবণ্য সরে গিয়ে মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

যায়। কারণ, রূপে-গুণে, যৌবন-সৌন্দর্যে এবং মনোরম সংসার জীবন যাপনে হযরত আইশা (রা) ছিলেন পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ। “আল্লাহ। আপনাকে তার উত্তম বিকল্প দান করেছেন।” এ মন্তব্য দ্বারা নিজের পবিত্ৰতা বর্ণনা করা এবং নিজেকে খাদীজা (রা) থেকে ভাল বলা হযরত আইশা (রা)-এর উদ্দিষ্ট ছিল না। কে পবিত্ৰাত্মা আর কে তা নন, সে বিচারের ভার মূলত আল্লাহরই। হাতে। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন :

“তোমরা আত্মপ্রশংসা করো না।” তিনিই ভাল জানেন মুত্তাকী কে?

আল্লাহ তা’আলা অন্যত্র বলেন, :

الم ترالی الذین باز گون آنفسهم بل اللّهٔ یزگی من ایشان “আপনি কি তাদেরকে দেখননি যারা নিজেদের পবিত্ৰ মনে করেন? না, বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পবিত্র করেন।” (৪ ° :৯)

খাদীজা (রা) ও আইশা (রা)-এর মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ—এ মাসআলাতে অতীত ও বর্তমান উলামায়ে কিরাম ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেন। শিয়াপন্থিগণ কোন মহিলাকেই হযরত খাদীজা (রা)-এর সমকক্ষ মনে করে না। যুক্তি হিসেবে তারা বলে যে, স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা তাকে সালাম জানিয়েছেন। ইবরাহীম (রা) ব্যতীত রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সকল সন্তান তাঁর গর্ভে জন্ম নেন। তাঁর জীবদ্দশায় তার সম্মানার্থে রাসূলুল্লাহ (সা) অন্য কাউকে বিয়ে করেননি। ইসলাম গ্রহণে তিনি সকলের অগ্রণী। তিনি সত্যানুসারীদের অন্যতম এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নবুওয়াত লাভের সূচনায় তিনি তাঁর নবুওয়াতের স্বীকৃতি দিয়েছেন। তাঁর জান-মাল রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জন্যে উৎসর্গ করে দিয়েছেন।

কোন দিকে অন্যজন থেকে শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। এটি সর্বজন বিদিত। তবে হযরত আইশা (রা)-কে অধিকতর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদানে যারা উৎসাহবোধ করেন, তাদের এমনো ভাবের কারণ হচ্ছে তিনি হযরত আবু বকর সিদীক (রা)-এর কন্যা। তিনি হযরত খাদীজা (রা) থেকে বেশী জ্ঞানী। বস্তৃত মেধা, জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও ভাষার প্রাঞ্জলতার ক্ষেত্রে উম্মতের কেউই হযরত আইশার (রা) সমকক্ষ নন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) হযরত আইশা (রা)-কে যত ভালবাসতেন, অন্য কাউকে ততটা নয়। তাঁর পবিত্রতা ও সতীত্বের সমর্থনে সপ্ত আকাশের উপর থেকে আয়াত নাযিল হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ইনতিকালের পর তার থেকে হাদীছ বৰ্ণনার মাধ্যমে হযরত আইশা (রা) জ্ঞানের এক বিশাল ও বরকতময় ভাণ্ডার উম্মতকে উপহার দিয়েছেন। এমনকি কেউ কেউ এ প্রসিদ্ধ হাদীছটি বর্ণনা করেছেন যে,

خذوا شطر دینگم عن الحميراء – “তোমাদের দীনের অর্ধাংশ তোমরা হুমায়রা অর্থাৎ আইশা (রা) থেকে গ্রহণ কর।” তবে সঠিক কথা হল, তাদের প্রত্যেকেই এক এক দিক থেকে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। তাদের শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়গুলো সম্পর্কে যে চিন্তা-ভাবনা ও পর্যবেক্ষণ করবে, সে অবশ্যই পরম আনন্দিত ও বিস্মিত

হবে। তবে এ বিষয়ে সর্বাধিক উত্তম পথ হল এটি আল্লাহর প্রতি ন্যস্ত করা যে, আল্লাহই ভাল জানেন তাদের দু’জনের কে অধিকতর মর্যাদাবান ও শ্রেষ্ঠ। কোন বিশেষ ক্ষেত্রে অকাট্য ও সন্দেহাতীত প্ৰমাণ পেলে সে ক্ষেত্রে নিশ্চিত মন্তব্য করা যেতে পারে। অথবা কোন ক্ষেত্রে প্রবল ধারণা জন্মালে সে বলবে যে, আমার জানা মতে আমার এই মন্তব্য পেশ করলাম। যে ব্যক্তি এ মাসআলায় কিংবা অন্য কোন মাসআলায় মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতে চায়, তার জন্যে উত্তম পন্থা হল একথা বলা “আল্লাহই ভাল জানেন”।

ইমাম আহমদ, বুখারী, মুসলিম, তিরমিয়ী, নাসাঈ প্রমুখ হিশাম, ইবন উরওয়া … আলী ইবন আবু তালিব (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন :

خیر انسانها مریم بشت عمران و خیر انسانها خدیجهٔ بنت خویلد

শ্ৰেষ্ঠ মহিলা ইমরানের কন্যা মািরয়াম এবং শ্রেষ্ঠ মহিলা খুওয়াইলিদের কন্যা খাদীজা (রা) { এর অর্থ—তারা নিজ নিজ যুগের শ্রেষ্ঠ মহিলা ছিলেন।

শুবা৷. বুররা ইবন ইয়াস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন :

کمال من الرجال کثیر و لم یگمل من النساء الاً ثلث مریم بنت عمران آسیهٔ امر آهٔ فرعون و خدیجهٔ بنت خویلد و فضل عائشة علی الیساء کفضل

“পুরুষদের মধ্যে অনেকেই কামালিয়াত অর্জন করেছেন, কিন্তু মহিলাদের মধ্যে কামালিয়াত ও পূর্ণতা পেয়েছেন তিনজন। ইমরানের কন্যা মািরয়াম, ফিরআওনের স্ত্রী আসিয়া এবং খুওয়াইলিদের কন্যা খাদীজা (রা)। আর সকল মহিলার উপর আইশার (রা) শ্রেষ্ঠত্ব তেমন যেমন সকল খাদ্যের উপর ছারীদ অর্থাৎ গোশত-রুটির মিশ্রিত খাদ্যের শ্ৰেষ্ঠত্ব।”

ইবন মারদাবিয়্যাহ এই হাদীছ তার তাফসীর গ্রন্থে উদধূত করেছেন। শু’বা ও তার পরবতী বর্ণনাকারিগণ পর্যন্ত এই হাদীছের সনদ বিশুদ্ধ। বিশ্লেষকগণ বলেন, যে অবদান ও কর্মগুণ উল্লিখিত তিন মহিলা অর্থাৎ আসিয়া, মািরয়াম ও খাদীজা (রা)-এর মধ্যে ছিল তাহল, তাদের প্রত্যেকেই এক একজন নবী-রাসূলের যিম্মাদারী গ্ৰহণ করেছিলেন এবং অত্যন্ত বিশ্বস্ততা ও নিষ্ঠার সাথে ওই যিম্মাদারী পালন করেছেন। তারা সংশ্লিষ্ট নবীগণের প্রতি ঈমান এনেছেন। আসিয়া হযরত মূসা (আ:)-কে লালন, পালন করেছেন, তার উপকার করেছেন এবং নবুওয়াত লাভের পর তাকে সত্য নবী রূপে গ্ৰহণ করে তার প্রতি ঈমান এনেছেন। মারিয়াম (আ:) তার পুত্র ঈসা (আ:)-এর যিম্মাদারী নিয়েছিলেন। পরিপূর্ণভাবে সে যিম্মাদারী পালন করেছিলেন। রিসালাত পাওয়ার পর তিনি তার প্রতি ঈমান এনেছিলেন। হযরত খাদীজা (রা) প্রিয়নবী (সা)-এর সাথে স্বেচ্ছায় ও সংগ্রহে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খিদমতে নিজের ধন-সম্পদ ব্যয় করেছিলেন। তার প্রতি ওহী নাযিল হওয়ার পর তাকে সত্য নবী রূপে গ্ৰহণ করে তার প্রতি ঈমান এনেছিলেন।

“সকল মহিলার উপর আইশার শ্রেষ্ঠত্ব তেমন সকল খাদ্যের উপর ছারোদ খাদ্যের শ্রেষ্ঠত্ব যেমন।” হাদীছের এই অংশটি শু’বা… আবু মূসা আশআরী (রা) সনদে সহীহ বুখারী এবং সহীহ মুসলিমে উদধূত আছে। আবু মূসা আশআরী (রা) বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন “অনেক পুরুষ কামালিয়াত অর্জন করেছে কিন্তু মহিলাদের মধ্যে কামালিয়াত লাভ করেছেন মাত্র ফিরআওনের স্ত্রী আসিয়া, ইমরানের কন্যা মারিয়াম। আর সকল মহিলার উপর আইশা (রা)-এর শ্রেষ্ঠত্ব সকল খাদ্যের উপর ছারীদের শ্রেষ্ঠত্বের ন্যায়। ছারীদ হল রুটি ও গোশতের সংমিশ্রণে তৈরী খাদ্য। যেমন একজন কবি বলেছেন :

اذا ما الخبز تأدمة بلحم–فذاك امانة اللّه الثريد –

“রুটির সাথে ব্যঞ্জনরূপে যখন গোশত মিশ্রিত করা হয়, তখন এটি ছারোদ খাদ্যে পরিণত হয়। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার বিশেষ।”

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বাণী “আইশার শ্রেষ্ঠত্ব অন্য নারীদের উপর।” এটি দ্বারা হয়ত ব্যাপকতা বুঝানো হয়েছে। তা হলে অর্থ হবে— হাদীছে উল্লিখিত মহিলাগণ সকলে সমমর্যাদা সম্পন্ন এবং তাদের একজনকে অন্যজনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিতে গেলে অন্য দলীল-প্রমাণ প্রয়োজন হবে। আল্লাহই ভাল জানেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *