০০১. নৈমিষারণ্য শৌণকাদি ঋষিদের প্রশ্ন ও অবতার কীর্ত্তন বর্ণনা

গরুড় পুরাণ
পূর্ব খণ্ড (গরুড় পুরাণ)
প্রথম অধ্যায়
নৈমিষারণ্য শৌণকাদি ঋষিদের প্রশ্ন ও অবতার কীর্ত্তন বর্ণনা

যিনি জন্মাজরাবিহীন অনাদি, অনন্ত, জ্ঞানস্বরূপ, মহৎ, নির্ম্মল, পাঞ্চভৌতিকদেহশূন্য, নিরিদ্রিয়, সর্ব্বভূতব্যাপী ও মায়াবিমুক্ত, সেই সর্ব্বজ্ঞ হরি ও হরকে বন্দনা করি। ১
ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহাদেব, গণাধিপতি ও দেবী সরস্বতী, এই সকল দেবতাদিগকে কর্ম্মমনোবাক্য-দ্বারা নমস্কার করি। ২
একদা পুরাণবিৎ, শান্তশীল, সর্ব্বশাস্ত্রবিশারদ, বিষ্ণুভক্ত, মহাত্মা সূত ঋষি তীর্থযাত্রা-প্রসঙ্গে নৈমিষারণ্যে উপস্থিত হইয়া শুভাসনে উপবেশন করিয়া বিষ্ণুচিন্তনতৎপর ছিলেন। ৩
এমত সময়ে তত্রত্যতপোধর, যজ্ঞশীল, শান্তিপরায়ণ, সূর্য্যসমতেজাঃ, মহাভাগ শৌনকাদি ঋষিগণ কবি সূত ঋষিকে অর্চ্চনা করিয়া স্তব করিয়াছিলেন। ৪-৫
অনন্তর মুনিগণ বলিলেন, হে সূত! আপনার সর্ব্বতত্ত্ব বিদিত আছে, আমাদিগের প্রশ্নসমূহের যথোচিত উত্তর প্রদান করিয়া সংশয় ভঞ্জন করুন। ৬-৭
এই জগতে দেবতাদিগের দেবতা কে? ঈশ্বরই বা কে? কাহাকেই বা পূজা করা যায়? ধ্যানের যথার্থ পাত্র কে? কেই বা পরিদৃশ্যমান জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করিতেছেন? কোন ব্যক্তি হইতে সনাতন ধর্ম্ম প্রবর্ত্তিত হইয়াছে? কোন ব্যক্তি দুষ্টকে বিনাশ করিয়া থাকেন? ৮
সেই দেবতার রূপ কি? কি রুপেই বা জগৎ সৃষ্টি হইল? কোন কোন ব্রত্যানুষ্ঠান করিলে তিনি সন্তুষ্ট থাকেন? কোন যোগদ্বারাই বা তাঁহাকে লাভ করা যায়? ৯
সেই জগৎকর্ত্তা কি কি রূপে অবতীর্ণ হইয়াছেন? কি প্রকারের তাঁহার বংশসম্ভব হয়? এবং ব্রাহ্মণাদি বর্ণধর্ম্ম ও ব্রহ্মচর্য্যাদি আশ্রমধর্ম্মের রক্ষক কে ও প্রবর্ত্তক কে? ১০
হে মহামতি সূত! আপনি অনুগ্রহ করিয়া আমাদিগের নিকট পূর্ব্বোক্ত বিষয়সকল সবিস্তর বর্ণন করুন। ১১
সূত কহিলেন, আমি গরুড়পুরাণ বর্ণন করিব। এই পুরাণ সর্ব্বপুরাণপ্রধান এবং বিষ্ণুকথায় পরিপূর্ণ। এই পৌরাণিককথা পূর্ব্বকালে কশ্যপের নিকট গরুড় বলিয়াছিলেন এবং আমি ব্যাসের নিকট শ্রবণ করিয়াছি। ১২-১৩
একমাত্র নারায়ণ দেবতাদিগেরও দেবতা, ঈশ্বরেরও ঈশ্বর এবং তিনিই পরমাত্মা পরব্রহ্ম, তাঁহা হইতেই এই জগতের উৎপত্তি হইয়াছে। ১৪
সেই অজরামর বাসুদেব জগদ্রক্ষণার্থ কুমারাদি নানারূপে অবতীর্ণ হইয়াছেন। ১৫
হরি প্রথমে কুমার অবতার হন। এই অবতার ভগবান বাসুদেব কৌমার অবস্থা অবলম্বন করিয়া দুশ্চর ব্রহ্মচর্য্য অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। ১৬
দ্বিতীয়ে ভৃতভাবন যজ্ঞেশ্বর হরি জগৎ রক্ষা করিবার নিমিত্ত রসাতলগতা পৃথিবীকে উদ্ধার করিব, এই অভিপ্রায়ে বরাহ-শরীর ধারণ করেন। ১৭
তৃতীয়ে দেবর্ষিত্ব পরিগ্রহ করিয়া ভগবান সাত্বত তন্ত্র বিস্তার করিয়াছেন। ঐ তন্ত্রে নিষ্কাম কর্মের প্রাধান্য বর্ণিত আছে। ১৮
চতুর্থ নরনারায়ণাবতার। এই অবতারে নারায়ণ ধর্ম্মরক্ষানার্থ কঠোর তপস্যা করিয়াছিলেন। তাঁহাকে সুরাসুরগণ অর্চ্চনা করিয়াছিল। ১৯
পঞ্চমে কপিলাবতার। এই অবতারে ভগবান সাংখ্যদর্শন প্রণয়ন করিয়া কালকৃত ধর্ম্মবিপ্লব নিবারণার্থ পণ্ডিতবর্গকে তত্ত্বনির্ণয়দ্বারা ধর্ম্মমার্গে আনয়ন করিয়াছিলেন। ২০
ষষ্ঠে দত্তাত্রেয়াবতার। নারায়ণ অত্রি ঋষির ঔরসে অনুসূয়ার গর্ভে দত্তাত্রেয় নামে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। দত্তাত্রেয় প্রহ্লাদাদির নিমিত্তে অলর্ককে আম্বীক্ষিকীবিদ্যার উপদেশ প্রদান করেন। ২১
সপ্তমে স্বায়ম্ভুবান্তরে নারায়ণ আকূতীর গর্ভে ও রুচির ঔরসে যজ্ঞনামে জন্ম গ্রহণ করিয়া অমাত্য সত্যগণও সুরগণের সহিত যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়াছিলেন। ২২
অষ্টমাবতারে নাভির ঔরসে মেরুদেবীর গর্ভে উরুক্রম নামে জন্ম পরিগ্রহ করিয়া সর্ব্বাশ্রমোচিত নারীধর্ম্ম প্রদর্শন করেন। ২৩
নবমে নারায়ণ ঋষিগণের প্রার্থনানুসারের পৃথুনামে জন্মগ্রহণ করিয়া মহোষধিরূপ দুগ্ধদ্বারা প্রজাবর্গকে জীবিত করিয়াছিলেন। ২৪
দশমে চাক্ষুষমম্বস্তরের মহাপ্রলয়কালে ভগবান মৎস্যরূপী হইয়া মৃণ্মরী নৌকাতে আরোপিত করিয়া বৈবম্বত মনুকে রক্ষা করেন। ২৫
একাদশে কূর্ম্মাবতার। যৎকালে দেব ও দানবগণ একত্রে মিলিত হইয়া সমুদ্র মন্থন করেন, ঐ সময়ে ভগবান নারায়ন কূর্ম্মরূপ পরিগ্রহ করিয়া পৃষ্ঠদেশে মন্দরাচল ধারণ করিয়াছিলেন (২৬)
দ্বাদশে ধাম্বন্তরাবতার। হরি ধম্বন্তরিরূপে অবতীর্ণ হইয়া দেবতাদিগের অশেষ উপকার সাধন করিয়াছিলেন। ত্রয়োদশে বিশ্বপতি নারায়ণ মোহিনীরূপধারণ করিয়া সুরাসুরদিগকে মোহিত করিয়াছিলেন। ২৭
চতুর্দ্দশে ভগবান নরসিংহরূপে অবতীর্ণ হইয়া, যেরূপ কটকারী ব্যক্তি শরতৃণ ভেদকরে, সেইরূপ নখদ্বারা চৈত্যরাজ দৈত্যপতি বলদৃপ্ত হিরণ্যকশিপুর বক্ষঃস্থল বিদীর্ণ করিয়া তাহার প্রাণসংহার করেন। ২৮
পঞ্চদশে বামনাবতার। হরি বামনরূপ ধারণ করিয়া বলির যজ্ঞে গমন করেন এবং ত্রিপাদ-ভূমি প্রার্থনা করিয়া বলিকে দমন ও দেবতাদিগকে স্ব-স্ব-অধিকারে পুনঃস্থাপনপূর্ব্বক রক্ষাকরিয়াছিলেন। ২৯
ষোড়শে ভগবান পরশুরামরূপে অবতীর্ণ হইয়া দেখিলেন, নৃপতিগণ ব্রহ্মদ্রোহী হইয়াছে। ভার্গব তাহাতে কুপিত হইয়া একবিংশতিবার পৃথিবীকে নিঃক্ষত্রিয়া করেন। ৩০
সপ্তদশে নারায়ণ সত্যবতীর গর্ভে পরাশরের ঔরসে ব্যাসরূপে অবতীর্ণ হন। ব্যাসদেব সমস্ত মনুষ্যকে অল্পমেধা বিবেচনা করিয়া বেদের বিভাগ করেন। ৩১
অষ্টাদশে দেবতাদিগের কার্য্য সাধনার্থ নরনারায়ণরূপে অবতীর্ণ হইয়া সমুদ্রনিগ্রহ-প্রভৃতি অশেষহিতকর কার্য্য করিয়াছিলেন। ৩২
উনিবিংশতি ও বিংশতি অবতারের জনার্দ্দন বৃষ্ণিবংশে জন্ম পরিগ্রহকরিয়া বলরাম ও কৃষ্ণ নামে বিখ্যাত হইয়া পৃথিবীর ভার হরণ করিয়াছিলেন। ৩৩
একবিংশতি অবতারে ভগবান কলির সন্ধ্যাবসানে দেবদ্বেষিদিগের মোহনার্থ মগধদেশে জিনসুত বুদ্ধরূপে আবির্ভূত হইবেন। ৩৪
অনন্তর কলির অবসানকালে রাজবর্গ নষ্টপ্রায় হইলে, জগৎপতি কল্কিনামে বিষ্ণুযশানামক ব্রাহ্মণের ভবনে অবতীর্ণ হইবেন। ৩৫
হে বিপ্রগণ! হরির কতিপয় অবতারের কথা বর্ণিত হইল। বাস্তবিক সেই সর্ব্বময় জগৎপিতা জগদ্বীশরের অবতার অসংখ্য। মনুপ্রভৃতি বেদবিদ্‌ আদি মহাত্মগণ সকলেই বিষ্ণুর অংশস্বরূপ। ৩৬
সেই মন্বাদি হইতেই এই জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় হইয়া থাকে, এজন্যই তাহারা ব্রতনিয়মাদিদ্বারা পূজনীয় হইয়াছেন। এই গরুড়পুরাণে অষ্টশতাধিক অষ্টসহস্র সংখ্যক শ্লোক আছে। পূর্ব্বকালে ব্যাসদেব আমার নিকটে এই গরুড়পুরাণ বলিয়াছিলেন। ৩৭

ইতি প্রথম অধ্যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *