২.১ ধর্মীয় কাঠামো

দ্বিতীয় অধ্যায় । ইসলাম ধর্ম । ধর্মীয় কাঠামো

ধর্ম কখনো আরব বেদুইনদের মধ্যে পরিপূর্ণ অর্থে বিস্তার লাভ করেনি। এখনো আরব বেদুইনরা বিভিন্ন ধরনের আধ্যাত্মিক, অধিবিদ্যাগত বিষয়ের প্রতি তেমন কোনো আকর্ষণ বোধ করেন না। দুর্গম ও প্রতিকূল অঞ্চলে বসবাসের কারণে তাদের মধ্যে রীতিনীতি, প্রথা বা বিধিনিষেধ ব্যতীত তেমন কোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। প্রাক-ইসলামি যুগ থেকে বেদুইনরা একদিকে যেমন স্বভাবে নমনীয় আবার অন্যদিকে মেজাজে উদ্বায়ী। কোনো কবিতার সাধারণ কোনো একটি পঙক্তিতেই তারা ক্ষুব্ধ হতে পারে অথবা অতি-আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে যেতে পারে। বেদুইনদের মধ্যে অনেকে আত্মকেন্দ্রিক ও দাম্ভিক প্রকৃতির। সর্বদা নিজের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বড়াই করার মানসিকতা তাদের মধ্যে রয়েছে। নিজেদের দুর্বল দিকগুলো, এমনকি অপরাধ ও পৈশাচিকতা নিয়েও তাদের অহঙ্কার দীর্ঘদিনের। অতীতকাল থেকে সহজে তারা বিভিন্ন কুসংস্কার ও অন্যান্য বিভ্রমের শিকার হতো। মরুভূমিতে প্রতিটি গাছ বা পাথরের নিচে কোনো না কোনো দানব লুকিয়ে আছে বলে বিশ্বাস করত। ভূমির রুক্ষতার কারণে তারা মানবসভ্যতার অন্যতম ভিত্তি কৃষিকাজ থেকে দূরে ছিল।

বেদুইনদের দৃষ্টিতে গরুর লেজ হচ্ছে অমর্যাদার প্রতীক আর ঘোড়ার মাথা হচ্ছে মর্যাদার প্রতীক। তাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল নিজেদের তাৎক্ষণিক শারীরিক চাহিদা পূরণ, দেবতার প্রতি প্রার্থনার একমাত্র উদ্দেশ্যও ছিল ওই লক্ষ্য অর্জন করা। প্রতিপক্ষ অস্ত্রধারী না হলেও কিংবা আত্মরক্ষা করার মতো প্রস্তুতি না থাকলেওতাদেরআক্রমণ করা এবং আগ্রাসী মনোভাব প্রদর্শন বেদুইনদের ক্ষেত্রে সবসময় স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। সহিংস কোনো ঘটনা প্রায়-সময়ই অত্যধিক প্রশংসিত হতো এবং তা-নিয়ে বীরোচিত কবিতাও রচনা করা হতো। অন্য ব্যক্তির স্ত্রীকে বলপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার বর্ণনা দেয়ার ক্ষেত্রে বেদুইন-কবিরা ‘অসভ্যতা’র পরিচয় দিতেন। হামলার শিকার হওয়া মহিলার গোপনীয়তা প্রকাশ, তার শারীরিক নিগ্রহ বা বিড়ম্বনার বর্ণনা দিতে বেদুইন-কবিরা নূ্যনতম বিবেকবোধের পরিচয় দিতেন না।

বেদুইনরা ঈশ্বরকে এক কৃত্রিম এবং গতানুগতিক সত্তা বলেই মনে করতেন। তারা স্বাধীন ও নৈর্ব্যক্তিক কোনো ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন না। মজার বিষয় হচ্ছে, বেদুইনরা অন্য কোনো গোষ্ঠীর সাথে প্রতিযোগিতার সময় প্রতিদ্বন্দী গোষ্ঠীর কোনো বিখ্যাত দেবতার আদলে নিজেরাও একটি দেবতা তৈরি করে উপাসনা শুরু করে দিত। ইসলাম-পূর্ব যুগে মক্কার কাবা ঘরটি বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তিতে ভর্তি এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাসনালয় ছিল। বেদুইনরা এই পবিত্র স্থানে নিয়মিত আসত এবং গভীরভাবে সমান প্রদর্শন করত। কুরাইশদের সাথে বিরোধের জের ধরে একবার জোহায়না গোষ্ঠীর নেতা আব্দুদার বিন হুদায় তার জনগণকে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাওরা নামক স্থানে কাবার মতো আরেকটি উপাসনালয় বানানোর জন্য, যাতে বেদুইনদেরকে কাবার পরিবর্তে এই উপাসনালয়ে নিয়ে আসা যায়। কিন্তু জোহায়না গোষ্ঠীর লোকজন এ কাজ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে নেতার নির্দেশ উপেক্ষা করেছিল। এজন্য হিশাম বিন মুহাম্মদ আল-কালবি (হিজরি ১২০ বা ৭৩৭ খ্রিস্টাব্দ-হিজরি ২০৪/২০৬ বা ৮১৯/৮২১খ্রিস্টাব্দ) রচিত ‘তানকিস আল আসনাম’ গ্রন্থে(২৩) ব্যঙ্গধর্মী কবিতায় জোহায়না গোষ্ঠীর জনগণকে নিয়ে উপহাস করা হয়েছে। উল্লেখ্য হিশামের এই বইটি পৌত্তলিক আরবের ধর্মীয় ধ্যান-ধারণার স্পষ্ট চিত্র উপস্থাপনের ক্ষেত্রে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র। ইসলাম-পূর্ব আরব পৌত্তলিকদের মানসিকতা বোঝার জন্য এই বই থেকে কিছু উক্তি তুলে দেয়া যেতে পারে : ‘আব্রাহা (ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আবিসিনিয়া বিজয়ের পরে ইয়েমেনের একজন খ্রিস্টান শাসক) যখন সানায় অত্যন্ত মূল্যবান পাথর ও দামি গাছের গুড়ি দিয়ে কেলিস নামের গির্জা নির্মাণ করে শপথ নিয়েছিলেন তিনি তার হাতের মুঠি ততদিন পর্যন্ত আলগা করবেন না, যতদিন না আরবরা কাবাকে পরিত্যাগ করে এই গির্জায় আসা শুরু করে। এ সংবাদ শুনে আরবের একজন নেতা এক রাত্রে কিছু লোক পাঠালেন নোংরা আবর্জনা আর মলমূত্র দিয়ে গির্জাটি নষ্ট করতে।’ এক ছেলে তার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেয়ার পরিকল্পনা করে। এজন্য প্রথমে সে জুল-খালাসা নামের এক দেবতার মূর্তির কাছে যায়। রীতি অনুযায়ী ছেলেটি তীরের ফলক নিক্ষেপ করে জানতে চায় তার পিতার হত্যাকারীকে হত্যা করে বদলা নেয়া উচিত হবে কিনা। জুল-খালাসার অমত হয় তাতে। আরব ছেলেটি তখন ক্ষুব্ধ হয়ে জুল-খালাসা দেবতাকে নিজের পৃষ্ঠদেশ প্রদর্শন করে বলে, ‘আমার মতো আপনার পিতাও যদি খুন হতেন তবে আজ আপনি আমাকে না বলতে পারতেন না।’ প্রাক-ইসলামি যুগের এক কবির ভাষায়, ‘হে জুল-খালাসা আপনার সাথেও যদি এমন অনাচার হতো, আমার মতো আপনার পিতাও যদি আজ মাটির নিচে শায়িত থাকতেন, তবে শক্ৰদের হত্যা করতে আপনি আমাকে কখনোই বারণ করতেন না।’(২৪) বিশ্বজুড়ে সে-সময়ের মানুষেরা যেখানে চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্রের পূজা করে বেড়িয়েছে তখন আরব বেদুইনরা আবিষ্ট ছিল পাথরের মধ্যে। পাথরকে কেন্দ্র করে চতুর্দিকে ঘোরা আর পাথর পূজা করা ছিল বেদুইনদের ধর্মীয় প্রথা। পাথরকে পূজা করার আরেকটি ব্যতিক্রমী রেওয়াজও ছিল তাদের মধ্যে। যেমন মরুভূমিতে যাত্রাপথের বিরতিতে বেদুইনদের প্রথম কাজ থাকত কোথাও থেকে চারটি পাথর খুঁজে বের করা। সবচেয়ে সুন্দর পাথরটাকে মাটিতে রেখে এর চারপাশে প্রদক্ষিণ করত তারা। অন্য তিনটি পাথরকে রান্নার পাত্র রাখার জন্য ব্যবহার করা হতো। এছাড়া মেষ, ছাগল বা উট কোরবানি দেয়ার সময় কোনো পাথরের সামনে এমনভাবে কোরবানি দেয়া হতো যেন পশুর রক্তে পাথরটি লাল হয়ে যায়।

প্রাচীন আরব-বেদুইনরা উপাসনায় খুব একটা আন্তরিক ছিল না। তানকিস আল আসনাম বই থেকে আরেকটি ঘটনা তুলে ধরা যায় : এক আরব তার উটগুলোকে ‘সাদ নামের এক উপাস্য-পাথরের কাছ থেকে আশীর্বাদ নিতে যায়। পশুর রক্তে রঞ্জিত লাল পাথরটি দেখে উটগুলো ভয়ে বারবার দূরে সরে যাচ্ছিল। এতে বিরক্ত হয়ে আরব ব্যক্তিটি ছোট পাথরের টুকরা নিয়ে সাদ নামের উপাস্য-পাথরটিকে ঢিল মেরে চেচিয়ে বলে, “তুমিও সাধারণ জনতার ভালবাসা-সম্মান থেকে বঞ্চিত হও! ইবনে ইসহাকের রচিত বইয়েও এই ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে এভাবে(২৫) :

‘সাদের কাছে আমরা আমাদের সৌভাগ্যের জন্য এসেছিলাম /
কিন্তু এই সাদ যখন তার সবই উড়িয়ে দিয়েছে, আমাদের তাই আর তার সাথে কোনো লেনদেন নাই।
আচ্ছা এই সাদ কি মাটির উপর দাঁড়িয়ে থাকা শুধুই একটি পাথর নয়?
সে কোনোভাবেই আমাদের চলার পথের সঠিক বা ভুল নির্দেশ দিতে পারে না।’

মদিনার প্রথম দিকের বছরগুলোতে মুহাম্মদের জীবনেও এই বেদুইন-আচরণের দেখা পাওয়া যায়। যেমন হিজরতের পর নবি যখন জোরেশোরে ইসলাম প্রচার শুরু করলেন তখনঅনেক বেদুইন অন্যান্য গোষ্ঠী থেকে ভীত হয়ে কিংবা গনিমতের মাল লাভের আশায় মুসলমানদের দলে যোগদান করে। কিন্তু যখনই মুসলিমরা কোনোভাবে বিপাকে পড়েছিল যেমন ওহুদের যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল তখনই তারা অন্য কোনো দলে ডিগবাজি দিয়ে চলে যায়, নয়তো ভয়ে নবি বা মুসলমানদের কাছ থেকে দূরে থাকত। মুহাম্মদ বেদুইনদের এই মানসিকতা খুব ভালোভাবে জানতেন। কোরানের বিভিন্ন আয়াতে এ-ধরনের বৈশিষ্ট্যের কথা বর্ণিত হয়েছে। যেমন সুরা তওবা। কালপঞ্জি অনুসারে এটি কোরানের সর্বশেষ সুরা এবং নবির বাণী হিসেবেও একে বিবেচনা করা হয়। এই সুরায় রয়েছে : অবিশ্বাস ও কপটতায় মরুবাসী আরব বেদুইনরা বড় বেশি পোক্ত। আর আল্লাহ তাঁর রসুলের ওপর যা অবতীর্ণ করেছেন তার (ন্যায়নীতির) সীমারেখা না শেখার যোগ্যতা এদের বেশি।’ (৯:৯৭)। এ কারণেই তাদের আশা ছিল, যদি এ কোনো অনারব-এর ওপর অবতীর্ণ করা হতো (২৬:১৯৮)। আসলে আরবের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে কুসংস্কার খুব গভীরে ছিল। যেনতেন কোনো চাহিদা পূরণে তারা মূর্তি বা প্রতিমার কাছে গিয়ে প্রার্থনার আশ্রয় নিত।

তবে হেজাজের, বিশেষ করে মক্কা বা ইয়াসরিব (পরবর্তীতে নামকরণ হয় মদিনা) এলাকার চিত্র এমন ছিল না। এই দুই শহরের মধ্যে বিশেষ করে ইয়াসরিবের অধিবাসীরা ইহুদি ও খ্রিস্ট ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত ছিল। ঈশ্বর শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে “আল্লাহ শব্দের ব্যবহারও তাদের মধ্যে ছিল। তারা নিজেদের ইব্রাহিমের বংশধর মনে করত। ওল্ড টেস্টামেন্টের কাহিনী অনুসরণে তারা নিজেদেরকে ইসরাইলের বংশধর বলে দাবি করত। আদম ও শয়তানের কাহিনী প্রায় সবারই জানা ছিল। তারা ফেরেশতা বিশ্বাস করত এবং তাঁদেরকে আল্লাহর কন্যা হিসেবে কল্পনা করত। তাঁদের এই ধারণা সম্পর্কে কোরানে বেশ কয়েকবার পরোক্ষভাবে বলা হয়েছে : তোমরা কি মনে কর তোমাদের জন্য পুত্রসন্তান আর আল্লাহর জন্য কন্যাসন্তান?” (সুরা নজম : আয়াত ২১)। যাহোক এই নগরবাসী বেশ কয়েকটি ইহুদি প্রথাও অনুসরণ করত। যেমন খৎনা, ওজু করা, ঋতুবতী নারীদের বর্জন করা এবং বিশ্রামের জন্য সপ্তাহের একটি দিন বরাদ্দ রাখা। এজন্য তারা পরবর্তীতে শনিবারের স্থলে শুক্রবারকে বিশ্রামের দিন হিসেবে গ্রহণ করে।

স্পষ্ট বোঝা যায় ইসলাম প্রচারের জন্য হেজাজের সামাজিক পরিবেশ একেবারে আনকোরা কিছু ছিল না। ওখানে শুধু যে পৌত্তলিকতা-বর্জনকারী কিছু আধুনিক চিন্তার মানুষ ছিলেন তাই নয়, অনেক পৌত্তলিকও সেখানে আলোর রেখার দর্শন পেয়েছিলেন। কোরানে তাঁদের কথা বেশ কয়েকবার উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন সুরা জুখরুফ-এ বলা হয়েছে : “যদি তুমি ওদেরকে জিজ্ঞেস কর, কে ওদেরকে সৃষ্টি করেছে, ওরা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। (৪৩:৮৭)। আবার সুরা আনকাবুত-এ বলা হয়েছে ; যদি তুমি ওদেরকে জিজ্ঞাসা কর, কে আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং চন্দ্র-সূর্যকে নিয়ন্ত্রণ করেন? ওরা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। তাহলে ওরা কোথায় ঘুরাপাক খাচ্ছে?’ (২৯:৬১)। মক্কার কুরাইশ পৌত্তলিকরা তাদের মূর্তিগুলোকে শক্তির প্রতীক হিসেবে এবং এর মাধ্যমে ঈশ্বরের নিকটে যাওয়া যায় বলেও বিশ্বাস করত। কুরাইশদের এরকম ভাবনার কথা কোরানে রয়েছে : “যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, আমরা এদের পূজা এজন্যই করি যে এরা আমাদেরকে আল্লাহর কাছাকাছি পৌছে দেবে।’ (৩৯:৩)।

এরপরও মক্কায় ইসলাম তেমন বিকশিত হতে পারে নি। ১৩ বছর ধরে নবুওতি প্রচারের পরও, এমন কী মনোমুগ্ধকর মক্কি সুরাগুলো প্রকাশের পরও সেখানে ইসলাম-গ্রহণকারীর সংখ্যা একশ ছড়ায়নি। নবি মুহাম্মদ ১৩ বছর ধরে দিনরাত পরিশ্রম করেও কুরাইশদের দৃঢ় অবস্থান ভাঙতে পারেননি। এই সময় যে কয়েকজন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আবু বকর, ওমর, উসমান, হামজা বিন আব্দুল মোতালেব, আব্দুর রহমান বিন আউফ এবং সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস। এছাড়া বাকিরা ছিলেন দরিদ্র পরিবারের অথবা নিচু শ্রেণির। মক্কার সমাজে তাদের কোনো প্রভাব ছিল না।

একেশ্বরবাদী হানিফ মতাবলম্বী ওয়ারাকা বিন-নওফল ইসলাম গ্রহণ না করলেও মুহামদকে সবসময় সমর্থন দিয়ে এসেছিলেন। আবু বকরকে ইসলামে নিয়ে আসার পরামর্শ তিনিই মুহাম্মদকে দিয়েছিলেন। কারণ আবু বকর মক্কার একজন প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য ও সমানিত ব্যক্তি ছিলেন। তার ইসলাম গ্রহণ স্বাভাবিকভাবে অন্যদের প্রভাবিত করবে। এবং তেমনটিই ঘটে। আবু বকরের ইসলাম গ্রহণের পর একে একে উসমান বিন আফফান, আব্দুর রহমান বিন আউফ, তালহা বিন উবায়দুল্লাহ, সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস, জুবায়ের বিন আল-আওয়াম মুসলিম হয়েছিলেন।

ইসলামের প্রসারের পেছনে এক গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে নবি মুহাম্মদের একনিষ্ঠতা এবং গভীর আত্মবিশ্বাস। যা তাঁকে অনেক সুদৃঢ় লক্ষ্য অর্জনে তাঁর আত্মবিশ্বাসকে ধরে রেখেছিল। অনেক ব্যক্তির প্ররোচনা, হুমকি-ধামকি, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ কোনো কিছুই তাঁকে টলাতে পারেনি। একই সময় মুহাম্মদেরও যথেষ্ট সম্পদ ছিল, সেগুলোকে তিনি যথাসময়ে ব্যবহার করেছেন। ইসলাম প্রচারের পঞ্চম বছরে তিনি তাঁর এক অনুসারীকে আবিসিনিয়ার খ্রিস্টান রাজা আসামা ইবনে আবজরের (নিগাস) কাছে দূত হিসেবে পাঠান, রাজা যেন তাঁর রাষ্ট্রে মক্কার পৌত্তলিকতা-বিরোধী কয়েকজন মুসলমানকে সহায়তা করেন। প্রাচীন আবিসিনিয়ার রাজাদের নিগাস নামে ডাকা হতো।-অনুবাদক)। এ-ঘটনায় মক্কার কুরাইশ-প্রধানদের টনক নড়ে। তাঁরাও নিগাসের কাছে কুরাইশ বংশের বানু শাহম গোত্রের আমর ইবনে আল-আস (৫৮৫-৬৬৪ খ্রিস্টাব্দ) এবং আব্দুল্লাহ বিন আবু রাবিয়াকে দূত হিসেবে পাঠান, যাতে সেখানকার শাসকদের বোঝানো হয় তারা যেন অভিবাসী মুসলমানদেরকে বিদ্রোহী ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।

ইসলাম প্রচারের শুরুর দিকে কুরাইশরা মুহাম্মদকে খুব একটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেননি। তারা তাঁকে পাগল, কবি, জ্যোতিষী, জিন বা শয়তানে ভর করা ব্যক্তি ইত্যাদি বলে সম্বোধন করত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মুহাম্মদের মানসিক দৃঢ়তা এবং কতিপয় উল্লেখযোগ্য সাফল্য কুরাইশদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। স্বাভাবিকভাবে কুরাইশদের সাথে নবির শক্ৰতা বাড়তে থাকে। কুরাইশ-প্রধানরা বুঝতে পেরেছিলেন যদি মুহাম্মদের প্রচারণা সাফল্য পেতে শুরু করে তবে তাদের নিজেদের জীবিকা নির্বাহের পথ ধ্বংসের মুখে পড়ে যাবে। প্রতি বছর হাজারো মানুষ একত্রিত হতো মক্কার কাবা ঘরকে কেন্দ্র করে। এটা ছিল আরবের বেদুইন গোষ্ঠীগুলোর প্রধান তীর্থস্থান। আরবের সকল কবি, সাহিত্যিক, বক্তৃতাকারীদের মিলনমেলা পরিচালিত হতো কাবা ঘরকে কেন্দ্র করে। মক্কাবাসীদের রুটি-রুজি ও কুরাইশদের মানসম্মান সবই তীর্থযাত্রীদের আসা-যাওয়ার উপর নির্ভরশীল ছিল। বেদুইনরা মূর্তিসজ্জিত কাবা ঘর (উপাসনালয়) দর্শন করতে আসত। নতুন ধর্মমতে যদি এই মূর্তিগুলো ধ্বংস করে দেয়া হয়, তবে বেদুইনরা হয়ত আর কখনোই এখানে আসবে না।

পনের বছর পর ইসলামের বিজয় যখন সাধিত হয়, মক্কার মুসলিমরাও পূর্বের মতো ঠিক তেমনি তাদের জীবিকা নির্বাহ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। ৬৩০ খ্রিস্টাব্দের আগস্টে মক্কা শহর বিজয়ের পর নাজিল হওয়া আয়াতে পৌত্তলিকদের কাবাঘরে গমন নিষিদ্ধ করা হয় এবং নিজেদের জীবিকা নিয়ে উদ্বিগ্নমক্কায় অবস্থানরত মুসলমানদেরকে সুরা তওবার ২৮ নং আয়াতের মাধ্যমে দুশ্চিন্তা দূর করা হয় ; হে বিশ্বাসীগণ অংশীবাদীরা তো অপবিত্র; তাই এ-বছরের পর তারা যেন মসজিদ-উল-হারামের কাছে না আসে। (৯:২৮)। অর্থাৎ ব্যবসায় লোকসানের ক্ষতিপূরণ তিনিই (আল্লাহ) প্রদান করবেন।

কুরাইশ-প্রধানরা যখন মুহাম্মদের ধৈর্য, ঐকান্তিকতার প্রতি লক্ষ করলো এবং নিজেদের সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারল তখন তারা তুলনামূলক ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তারা মুহাম্মদের চাচা বৃদ্ধ আবু তালিবের শরণাপন্ন হয়ে অনুরোধ জানান তিনি যেন মুহাম্মদকে ইসলাম প্রচার থামাতে বলেন এবং বিনিময়ে তাঁকে কাবা ঘর রক্ষণাবেক্ষণের এক পদে চাকুরির প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়। আবু তালিব অবশ্য ভাতিজাকে রাজি করাতে ব্যর্থ হলে প্রায় সব কুরাইশ-প্রধানই বানু হাশেমিকে সামাজিকভাবে একঘরে করার সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যবসা-বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে বেশ কয়েকদিনের জন্য হাশেমি গোষ্ঠীর সদস্যদের কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অবশ্য হাশেমি গোষ্ঠীর দুর্দশা দেখে এক সময় অন্য আরবরা এগিয়ে এলে তাদের দুঃসময়ের অবসান হয়।

এ ঘটনার পর এবং বিশেষ করে আবু তালিবের মৃত্যুর পর নবি মুহাম্মদকে থামানোর আর কোনো আশা বাকি থাকে না। কুরাইশপ্রধানরা এবার কঠোর অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রাথমিক আলোচনায় সম্ভাব্য তিনটি প্রস্তাব সামনে রাখা হয় নবি মুহামদকে উপযুক্ত হবে। শুধু একটা শর্ত থাকল যে, সকলের হাতই মুহাম্মদের রক্তে রঞ্জিত করা হবে যাতে করে ভবিষ্যতে কাউকে যেন হাশেমি গোত্রের প্রতিশোধের শিকার না হতে হয়। মুহাম্মদের নবুওতির ১২-১৩ বছরের মাথায় এই পরিকল্পনা করা হয়। যা তাঁর মক্কা থেকে মদিনায় অভিবাসিত হওয়াকে প্রভাবিত করে।

——————–
পাদটীকা
২৩. হিশাম বিন মুহাম্মদ আল-কালবি রচিত তানকিস আল আসনাম” বইটি ১৯১২ সালে আহমদ জাকির সম্পাদনায় কায়রো থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৬৯ সালে ডব্লিউ. আতাউল্লাহ কর্তৃক সম্পাদনায় প্যারিস থেকে ফরাসি অনুবাদে প্রকাশিত হয়েছে। সত্তর দশকের শুরুর দিকে ইরানের তেহরান থেকে ফার্সি অনুবাদ করেছেন সাঈদ মোহাম্মদ রেজা জালিলি নাইনি। ‘The Book of idols’ শিরোনামে ইংরেজি অনুবাদ করেছেন নাবিহ আমিন ফারিস। প্রকাশিত হয়েছে প্রিন্সটন থেকে ১৯৫২ সালে।
২৪. অনেকের মতে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর এবং কবিতা রচয়িতা একই ব্যক্তি। তাঁর নাম ইমরুল কায়েস, যাকে প্রাক-ইসলামি কবিদের রাজকুমার হিসেবে অভিহিত করা হয়। দ্রষ্টব্য : R A Nicholson, A Literary History of the Arabs, London, 1907, reprint in Cambridge 1953, pp. 103-105 to Encyclopaedia of Islam, 2nd ed., articles Dhu’l-Khalasa and Imru’ al-Kays.
২৫ . ইবনে ইসহাক রচিত ‘Life of Mohammad’ ( অনুবাদ : A Guillaume), Oxford 1955, p.37-এ উদ্ধৃত রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *