২০. অরুন্ধতী-উপাখ্যান

বিংশ অধ্যায় – অরুন্ধতী-উপাখ্যা

অনন্তর, তপস্যা করিবার জন্য একাগ্রচিত্ত সন্ধ্যাকে চন্দ্রভাগ পৰ্বতে গমন করতে দেখিয়া ব্রহ্মা, নিজ পুত্রকে বললেন। ১

ব্ৰহ্মা নিজ সমীপে আসীন, বেদ-বেদাঙ্গ-পারগ কঠোর ব্রতধারী জ্ঞান যোগী সৰ্ব্বজ্ঞ স্বীয় পুত্র বসিকে বলিলেন। ২

বসিষ্ঠ। এই মনস্বিনী সন্ধ্যা তপস্যা করিতে অভিলাষিণী হইয়া যথায় গমন করেন, তুমি তথায় গমন কর এবং ইহাকে যথাবিধি দীক্ষিত কর। ৩

মুনিবর! পূর্বে এই সন্ধ্যা আমাকে তোমাদিগকে এবং আত্মাকে কাম পরতন্ত্র দেখিয়া অত্যন্ত লজ্জা পাইয়াছিলেন। ৪

ইনি আমাদিগের এবং নিজের সেই পূর্বতন কাৰ্য্য অত্যন্ত অনুচিত হইয়াছে বিবেচনা করিয়া এখন প্রাণত্যাগ করিতে ইচ্ছুক হইয়াছেন। ৫

নিয়মশূন্য জগতে ইনি তপঃপ্রভাবে নিয়ম স্থাপন করিবেন। এখন সেই সাধ্বী-তপস্যা করিতে চন্দ্রভাগ পৰ্বতে গমন করিয়াছেন। ৬

বৎস! সন্ধ্যা, তপস্যার ভাব কিছুই জানেন না; অতএব যাহাতে তিনি এ বিষয়ে উপদেশ প্রাপ্ত হন, তাহা কর। ৭।

তুমি এই রূপ পরিত্যাগপূর্বক রূপান্তর ধারণ করিয়া সন্ধ্যাসমীপে গমন করত তপস্যা করিবার নিয়ম শিক্ষা দেও। ৮

তোমার এই রূপ দেখিলে সন্ধ্যা পূৰ্বের ন্যায় এখনও লজ্জা পাইবেন; সুতরাং তোমার সম্মুখে কিছুই বলিবেন না। ৯

এই জন্যই বলিতেছি,–তুমি নিজরূপ পরিত্যাগপূর্বক রূপান্তর অবলম্বন করিয়া মহাভাগা সন্ধ্যাকে উপদেশ দিবার জন্য গমন কর। ১০

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–তখন বসিষ্ঠ-ঋষিও “যে আজ্ঞা” বলিয়া জটাধারী তরুণ ব্রহ্মচারী বেশে চন্দ্রভাগ পৰ্ব্বতে সন্ধ্যাসমীপে গমন করিলেন। ১১

অনন্তর, বসিষ্ঠ, তথায় দেখিলেন; মানস-সরোবর সদৃশ গুণসম্পন্ন এক জলপূর্ণ দেবসরোবর এবং তাহার তীরে সন্ধ্যা। ১২

প্রদোষকালে তারকাখচিত গগনমণ্ডলে চন্দ্র উদয় হইলে গগনের যেমন শোভা হয় ফুল্ল-কমল-কুল শোভিত সেই সরোবরের তীরে সন্ধ্যা বর্তমান থাকাতে সরোবরেরও সেইরূপ শোভা হইয়াছিল। ১৩।

ঋষি বসিষ্ঠ, তথায় তাহাকে দেখিয়া তাহার সহিত সম্ভাষণ করিলেন। অনন্তর সকৌতুকে লোহিতনামক সেই বৃহৎ সরোবর দেখিতে লাগিলেন। ১৪

বসিষ্ঠ দেখিলেন, সেই সরোবর হইতে চন্দ্রভাগা নদী বিশাল গিরিসানু ভেদ করিয়া দক্ষিণ সমুদ্র উদ্দেশে গমন করিতেছেন। ১৫

হিমালয়-সানু ভেদ করিয়া গঙ্গা যেমন সাগরে গমন করিতেছেন, সেইরূপ চন্দ্রভাগা নদীও চন্দ্রভাগ পৰ্বতের পশ্চিম সানু ভেদ করিয়া সাগরাভিমুখে প্রবাহিত। ১৬

ঋষিগণ বলিলেন,–হে বিপ্রবর! সেই মহাগিরিতে চন্দ্রভাগা নদীর উৎপত্তি হইল কিরূপে? লোহিত নামক সেই বৃহৎ সরোবর কিরূপ? ১৭

সেই পৰ্বত-শ্রেষ্ঠের নাম চন্দ্রভাগা হইল কেন? আর সেই পুণ্য-সলিলা নদীর নামই বা ‘চন্দ্রভাগা’ হইল কেন? ১৮

এই সকল কথা এবং চন্দ্রভাগা নদী, লোহিত সরোবর ও চন্দ্রভাগ পৰ্ব্বতের মাহাত্ম্য শ্রবণ করিতে আমাদিগের অত্যন্ত কুতুহল জন্মিতেছে। ১৯

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–হে মুনিবরগণ! চন্দ্রভাগা নদীর উৎপত্তি বিবরণ, চন্দ্রভাগ পৰ্ব্বতের মাহাত্ম্য এবং চন্দ্রভাগ নাম হইবার কারণ ইত্যাদি তোমা দিগের জিজ্ঞাসিত বিষয় সকল শ্রবণ কর। ২০

হিমালয় পর্বতের সহিত মিলিত শত-যোজন-বিস্তৃত ত্রিশ-যোজন উচ্চ এক পৰ্বত আছে; তাহার বর্ণ কুন্দ বা চন্দ্রের ন্যায় শুক্ল। ২১

পূর্বকালে কমলাসন পিতামহ ব্রহ্মা, জগতের হিতের জন্য সেই পৰ্বতে সুধানিধি নিৰ্ম্মল চন্দ্রকে ভাগ করিয়া দেবভোজ্য এবং পিতৃভোজ্য করিয়া ছিলেন। তাহাতেই তিথির ক্ষয় বৃদ্ধি হইয়া থাকে। ২২-২৩

হে দ্বিজশ্রেষ্ঠগণ! সেই পৰ্বতে চন্দ্র বিভক্ত হইয়াছিলেন বলিয়া পূর্ব দেব গণ–সেই পৰ্বতের চন্দ্রভাগ নাম রাখেন। ২৪

ঋষিগণ বলিলেন;–যজ্ঞভাগ এবং ক্ষীরোদ-সাগর-সম্ভূত অমৃত বর্তমান থাকিতে কমলাসন, চন্দ্রকে দেবভোজ্য করিলেন কেন? ২৫

আর কব্য বর্তমান থাকিতে তাহাকে পিতৃভোজ্য করিলেনই বা কেন? গুরো! তিথি-ক্ষয়-বৃদ্ধিকালে চন্দ্র কিরূপ অবস্থাপন্ন হন? ২৬

ব্ৰহ্মন! সূৰ্য্য যেমন তিমিররাশি বিনষ্ট করেন, আপনিও সেইরূপ আমা দিগের এই সংশয় দূর করুন। হে দ্বিজোত্তম! আপনি ভিন্ন এ সংশয় ছেদন করে এমন কেহ নাই। ২৭।

মার্কণ্ডেয় বলিলেন;–পূর্বকালে দক্ষপ্রজাপতি, অশ্বিনী প্রভৃতি সাতাইশটি পরম রমণীয়া নিজ দুহিতা চন্দ্রকে প্রদান করেন। ২৮

অনন্তর শশধর, তাঁহাদিগের সকলকেই যথাবিধি বিবাহ করিয়া দক্ষের অনুমতিক্রমে স্বস্থানে লইয়া গেলেন। ২৯

অনন্তর, চন্দ্র, সেই সকল দক্ষতনয়ার মধ্যে একমাত্র রোহিণীর প্রতিই সাতিশয় অনুরাগ বশতঃ সুরত মহোৎসব-কেলিকলা-কৌতুকে তাহারই সহিত সহবাস করিতেন। ৩০

চন্দ্র, রোহিণীকেই ভজনা করিতেন; রোহিণীর সহিত আমোদ করিতেন; রোহিণী ব্যতীত অণুমাত্র সুখ লাভ করিতেন না। ৩১

অন্যান্য দক্ষ তনয়াগণ, চন্দ্রকে একমাত্র রোহিণীর প্রতি আসক্ত দেখিয়া বিবিধ উপচারে তাহার সেবা করিতে লাগিলেন। ৩২

যখন, তাহারা প্রতিদিন সেবা করিয়াও চন্দ্রের অনুরাগভাজন হইতে পারিলেন না, তখন সকলেই কূপিত হইলেন। ৩৩

অনন্তর, উত্তরফাল্পনী, ভরণী, কৃত্তিকা, আর্দ্রা, মঘা, বিশাখা, উত্তরভাদ্র পদ, জ্যেষ্ঠা এবং উত্তরাষাঢ়–এই নয়জন অত্যন্ত কূপিতা হইয়া শশধরসমীপে গমনপূর্বক চারিদিকে তাহাকে ঘিরিয়া ফেলিলেন। ৩৪-৩৫

চন্দ্রকে ঘিরিয়া তাহারা চন্দ্রের বামাঙ্কস্থায়িনী উত্তমালঙ্কার ভূষিতা রোহিনীকে দেখিলেন; দেখিলেন–চন্দ্র, তাহার প্রতি এক দৃষ্টে চাহিয়া আছেন। ৩৬

তাহারা সকলে বরবৰ্ণিনী রোহিণীকে তাদৃশ-সৌভাগ্যশালিনী দেখিয়া ঘৃতাহুতিদ্বারা অনলের ন্যায় অতিরোষে জ্বলিয়া উঠিলেন। ৩৭

অনন্তর, মঘা, উত্তরফল্গুনী, উত্তরাষাঢ়া, উত্তরভাদ্রপদ, ভরণী এরং কৃত্তিকা–শশধর ক্রোড়-স্থিতা মহাভাগা রোহিণীকে বলপূর্বক গ্রহণ করিলেন। ৩৮

তাহারা অত্যন্ত কোপ সহকারে রোহিণীকে রূঢ় কথা বলিতে লাগিলেন;–অরে দুর্বুদ্ধি। তুই বাঁচিয়া থাকিতে চন্দ্র আমাদিগের প্রতি অনুরাগী হইবেন না। অতএব আমাদিগের অনেকের মঙ্গলার্থে দুৰ্ম্মতিশালিনী তোকে বধ করিব। ৩৯-৪০

যখন তুই ঋতুমতী না থাকিস, তখনও অন্য বহুতর ঋতুমতী রমণীকে স্বামী সহবাসে বঞ্চিত করত তাহাদিগের গর্ভধারণের প্রতিবন্ধক হইয়া মহাপাপ সঞ্চয় করিস; অতএব তোকে বধ করিতে আমাদিগের কোন পাপ নাই। ৪১

ব্ৰহ্মা পূৰ্বে পুত্রকে নীতিশাস্ত্র উপদেশ দিবার সময়ে এবিষয় যাহা বলিয়াছেন, তাহা আমাদের শুনা আছে। ৪২

যেখানে একজন দুরাচারীর নিধন হইলে বহুলোকের মঙ্গল সাধিত হয়; সেখানে তাকে বধ করিলে পুণ্য হয়। ৪৩

(অশীতি রতির অন্যূন) সুবর্ণাপহারী, সুরাপায়ী, ব্ৰহ্মঘাতী, গুরুতল্পগামী (বিমাতৃগামী বা অগম্যগামী) এবং আত্মঘাতী ইহাদিগকে বধ করিলে পুণ্য হয়। ৪৪।

মার্কণ্ডেয় বলিলেন; চন্দ্র, মঘা প্রভৃতির তাদৃশ অভিপ্রায় বুঝিলেন, কাৰ্যেও তাহার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাইলেন, অতিমনোরম প্রেয়সী রোহিণীকে ভীতা দেখিলেন। ৪৫

এবং তাহাদিগকে সম্ভোগ না করাতে আপনারও সতত অপরাধ হইতেছে, মনে মনে ভাবিলেন চন্দ্র, এই সকল বুঝিয়া সুঝিয়া ভাবিয়া ও চিন্তিয়া ভীতা রোহিণীকে তাঁহাদিগের হস্ত হইতে ছাড়াইয়া লইলেন। ৪৬

চন্দ্র, রোহিণীকে ছাড়াইয়া বাহুযুগল দ্বারা আলিঙ্গনপুৰ্ব্বক কৃত্তিকা প্রভৃতি সেই কুপিত নিজ রমণীমণ্ডলকে নিবারণ করিলেন। ৪৭

তখন কৃত্তিকা, আর্দ্রা, মঘা, ভরণী–রোহিণীর দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া নিবারণতৎপর চন্দ্রের প্রতি কটূক্তি করিতে লাগিলেন। ৪৮

নিশানাথ! এই যে আমাদিগকে নিরস্ত করিতেছ, ইহাতে তোমার লজ্জা বা পাপের ভয়ও কি হইতেছে না? ছিঃ। যেন তুমি একেবারে নিতান্ত অধম হইয়াছ। ৪৯

আমরা তোমার প্রতি সতত ভক্তিমতী এবং পাতিব্ৰত্য ব্রতচারিণী; আমাদিগের সকলকে ত্যাগ করিয়া মূঢ়ের ন্যায় এক জনের প্রতি আসক্ত হইয়া রহিয়াছ। ৫০

তুমি কি বেদমূলক ধর্ম অবগত নহ? না–পূৰ্বে তাহা একেবারে শ্রবণই কর নাই? নতুবা এরূপ সজ্জন-বিগর্হিত অধর্ম কাৰ্য্য করিবে কেন? ৫১

হে সুধাকর! আমরা যথোচিতরূপে ধর্মশাস্ত্রোপদিষ্ট কৰ্ম্ম করিয়া থাকি এবং তোমার পরিণীতা রমণী; আমাদিগের কেবল মুখের দিকেও কি চাহিতে নাই? ৫২

আমাদিগের পিতা দক্ষ, নারদের নিকট ধর্মশাস্ত্রের যে কথা বলিতেছিলেন তৎকালেই তাহার প্রমুখাৎ সে কথা আমরা শুনিয়াছি। নিশাপতে। তুমি তাহা শ্রবণ কর। ৫৩

যে পুরুষ, বহু রমণীর স্বামী হইয়াও অনুরাগক্রমে একজন মাত্র পত্নীতে আসক্ত; সেই স্ত্রৈণ পুরুষ অত্যন্ত পাপী এবং তাহার যাবজ্জীবন অশৌচ অর্থাৎ সে ব্যক্তি বৈদিক কার্য্যে চিরদিন অনধিকারী। ৫৪

স্বামীর সহিত সম্ভোগ করিতে না পাইলে স্ত্রীলোকের যেরূপ কষ্ট হয়, তাহার অনুরূপ কষ্ট আর কিছুই নাই। ৫৫

যে অধম পুরুষ, সতী-ভাৰ্য্যা ঋতুমতী হইলে বিশুদ্ধ ঋতুদিনে তাহাতে উপগত না হয়, তাহার ভ্রূণহত্যা পাপ হয়। ৫৬

ভাৰ্য্যা যে পর্যন্ত আত্রেয়ী থাকে, ততদিন অর্থাৎ ঋতুর তিন দিন পর্যন্ত উপগত হওয়া নিষিদ্ধ; যদি দৈবাৎ উপগত হয়, তাহা হইলে কোন বিহিত কাৰ্য্যেই তাহার অধিকার থাকিবে না। ৫৭

বিশুদ্ধ ঋতুদিনে বহুভাৰ্য্য পুরুষের ভাৰ্য্যাসঙ্গমে প্রতিবন্ধক হইতে পারে–এমন কোন কাৰ্য্য, শাস্ত্রেও কথিত হয় নাই। ৫৮

পরিণীতা ভাৰ্য্যাদিগকে সতত সন্তুষ্ট রাখিবে, কেননা, তাহাদিগের সন্তোষে মঙ্গল, আর অসন্তোষে অমঙ্গল হইয়া থাকে। ৫১

যে ঘরে বা যে বংশে, পত্নী, পতির–এবং পতি, পত্নীর সন্তোষ বিধান করেন, তথায় নিত্যই মঙ্গল হইয়া থাকে। ৬০

যে রমণী সৌভাগ্য-মদ-গর্বিতা হইয়া স্বামীকে সপত্নীসঙ্গম করিতে না দেয়, সে জন্মান্তরে বেশ্যা হয়। ৬১

এই জন্মেও সে লোক-নিন্দা ও অধর্ম লাভ করে; আর তাহার পিতৃকুল এবং ভর্তৃকুল স্বর্গভাগী হন না। ৬২

সপত্নী, পতিকে নিরোধ করিয়া (আটকাইয়া) রাখিলে অন্যান্য সপত্নীর যে সাতিশয় দুঃখ হয়, তাহাতে নিরোধকারিণী সপত্নী এবং পতি উভয়েরই অত্যন্ত অমঙ্গল ঘটে। ৬৩

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–তাহারা এই সকল অত্যন্ত নিষ্ঠুর কথা বলিলে, চন্দ্র রোহিণীর মলিন মুখ দেখিতে কুপিত হইলেন। ৬৪।

রোহিণীও বারংবার তাহাদিগের উগ্রতা দর্শনে ভয়, শোক এবং লজ্জাবশতঃ কিছুই বলিলেন না। অনন্তর চন্দ্র, অত্যন্ত রোষভরে সেই পত্নীদিগকে অভিসম্পাত প্রদান করিলেন। ৬৫-৬৬

যেহেতু কৃত্তিকা প্রভৃতি তোমরা চারিজন, আমার সম্মুখে উগ্রভাগে তীক্ষ্ণ (কটু) বাক্য প্রয়োগ করিয়াছ, অতএব তোমর সুরসমাজেও “উগ্র” এবং “তীক্ষ্ণ” বলিয়া প্রসিদ্ধ হইবে। ৬৭

এই জন্য অর্থাৎ আমার সম্মুখে উগ্র-ভাব-প্রদর্শন প্রযুক্ত তোমারা এই কৃত্তিকা প্রভৃতি নয়জনই নিজ নিজ ভোগ্য দিনে যাত্রার উপযুক্ত হইবে না। ৬৮

দেবতা প্রভৃতি স্বর্গবাসিগণ, এবং মনুষ্য প্রভৃতি ভূতলবাসিগণ তোমাদিগকে দেখিয়া যাত্রা করিলে সেই দোষেই তাহাদিগের ইষ্টসিদ্ধ হইবে না। ৬৯

অনন্তর, তাহারা তাহার সেই অতি দারুণ শাপ শ্রবণ করিয়া এবং চন্দ্রের শাপ দেওয়া দেখিয়া তাহার হৃদয় যে অত্যন্ত নিষ্ঠুর–ইহা বুঝিয়া ক্রোধবশে সকলেই দক্ষ-গৃহে গমন করিলেন। ৭০

অশ্বিনী প্রভৃতি সকলেই পিতা দক্ষকে গদ্গদস্বরে বলিলেন,–চন্দ্র, আমাদের কাছে থাকেন না, কেবল রোহিণীকেই সতত ভজনা করেন। ৭১

আমরা সেবা করিলেও তিনি আমাদিগের ভজনা করেন না; যেন আমরা পরস্ত্রী। অবস্থানে, বিরামে, শ্রবণে এবং ভোজনে, চন্দ্র, রোহিণী ব্যতীত কিছুমাত্র সুখলাভ করেন না। ৭২-৭৩

চন্দ্র, রোহিণীর সহিত একত্র আছেন–এমন সময়ে তোমার অন্যান্য তনয়া গণকে সেইদিকে যাইতে দেখিলে, তিনি অন্য দিকে চক্ষু ফিরান, আর ফিরিয়া দেখেন না। ৭৪

স্বামীর কর্তব্য অন্য সদ্ভাব দূরে থাক, তিনি আমাদিগের মুখও দেখেন না। এখন আমরা করি কি–তাহা বলুন। ৭৫

হাঁ, এই সময়ে আমরা একদিন চন্দ্রকে অনুরোধ করি, তাহাতে চন্দ্র, আমাদিগকে নিদারুণ শাপ দিয়াছেন। ৭৬

তিনি বলিয়াছেন, তোমরা দারুণ এবং অত্যন্ত তীক্ষ্ণ-স্বভাব, জগতে এইরূপে নিন্দিত হইবে এবং অযাত্রিক হইবে। ৭৭

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–প্রজাপতি দক্ষ, কন্যাগণের কথা শুনিয়া যথায় চন্দ্র রোহিণীসহ অবস্থিত ছিলেন, তথায় তাহাদিগের সহিত গমন করিলেন। ৭৮

চন্দ্র, দূর হইতেই দক্ষ আসিতেছেন দেখিয়া আসন হইতে উঠিয়া দাঁড়াইলেন অনন্তর সেই মহামুনি নিকটে আসিলে তাহার চরণ বন্দনা করিলেন। ৭১

চন্দ্র, বিধিমত বন্দনা করিলে দক্ষ আসন পরিগ্রহ করিয়া মিষ্টভাবে এই কথা বলিলেন। ৮০

দক্ষ বলিলেন,–সকল ভাৰ্য্যার প্রতি সমান ব্যবহার কর; বৈষম্য করিও না; বৈষম্য করিলে অনেক দোষ; ব্রহ্মা বলিয়াছেন। ৮১

পত্নীর প্রতি কামানুবন্ধ-বশতই রতি ও পুত্ররূপ ফল-পত্নী হইতে হইয়া থাকে, কামানুবন্ধ সংসৰ্গাধীন; সংসর্গ আসক্তি হইতে আর আসক্তি, অভিধান এবং তন্মুলক নিরীক্ষণাদি হইতে জন্মিয়া থাকে। ৮২-৮৩

অতএব তুমি পত্নীগণের প্রতি অভিধ্যান-সহকারে অবলোকনাদি কর। ৮৪

যদি আমার এই ধৰ্ম্মানুমোদিত বাক্য প্রতিপালন না কর, তাহা হইলে লোকসমাজে নিন্দিত এবং পাপভাগী হইবে। ৮৫

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–সুমহাত্মা দক্ষের এই কথা শুনিয়া চন্দ্র, তাহার ভয়ে তখন “তাহাই হইবে” বলিলেন। ৮৬

তখন মুনি দক্ষ, কৃতকার্য হইয়া জামাতা চন্দ্র এবং কন্যাগণের সহিত সম্ভাষণপূর্বক স্বস্থানে গমন করিলেন। ৮৭

দক্ষ গমন করিলে পর, চন্দ্র সেই রোহিণীকে লইয়া তাহার প্রতি অনুরাগ বশতঃ পূৰ্বভাব অবলম্বন করিলেন; আর অন্যান্য পত্নীদিগের প্রতি পূর্বের ন্যায় আচরণ করিতে লাগিলেন। ৮৮

সেই তখনকার ন্যায় এখনও রোহিণীকে পাইয়া আর কাহারও প্রতি চাহিয়া দেখেন না; কেবল রোহিণীর সহিতই আমোদ-প্রমোদ, কেলি-কৌতুক করেন; তাহাতে তাহারা (অন্যান্য চন্দ্ৰপত্নীগণ) নিজনিজ দুর্ভাগ্যদর্শনে উদ্বিগ্নচিত্ত এবং কুপিত হইলেন। ৮৯

তাহার পিতৃসন্নিধানে গিয়া কহিলেন; পিতঃ! চন্দ্র, এখনও আমাদিগের কাছে আসেন না; সৰ্ব্বদাই রোহিণীতে আসক্ত। ৯০

তুমি এত বলিলে, তোমারও কথা রাখিল না; অতএব তুমি এখন আমাদিগকে রক্ষা কর। ৯১

অনন্তর, মুনি দক্ষ, ঈষৎ কুপিত হইয়া তৎক্ষণাৎ উঠিলেন এবং মনে মনে কর্তব্য স্থির করিয়া চন্দ্ৰসমীপে গমন করিলেন। ৯২

তখন, প্রজাপতি দক্ষ, চন্দ্রকে ভয় দেখাইয়া বলিলেন,–“সকল ভাৰ্যার প্রতি সমান ব্যবহার কর; বৈষম্য করিও না। যদি তুমি মূর্খতা-প্রমুক্ত আমার এই কথা না রাখ, তাহা হইলে হে নিশানাথ! ধর্মশাস্ত্র-মৰ্য্যাদা লঙ্ঘনকারী তোমাকে আমি অভিসম্পাত প্রদান করিব”। ৯৩-৯৪

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–অনন্তর চন্দ্র দক্ষের ভয়ে তাহার সম্মুখে “আমি ইহা করিব, আমি ইহা করিব” বলিয়া তাহা করিতে আগ্রহ-সহকারে বারবার অঙ্গীকার করিলেন। ৯৫

এইরূপে চন্দ্র, সকল পত্নীর প্রতি সমান ব্যবহার করিতে স্বীকার করিলে, দক্ষ বিদায় লইয়া চন্দ্রের সম্মতিক্রমে স্বস্থানে গমন করিলেন। ৯৬

দক্ষ চলিয়া গেলে, নিশাপতি রোহিণীর সহিত সাতিশয় বিহার করত দক্ষের কথা ভুলিয়া গেলেন। ৯৭

অশ্বিনী প্রভৃতি সেই সমস্ত মনোরমা রমণীগণ, চন্দ্রের সেবা করিতে থাকিলেও চন্দ্র, তাহাদিগের প্রতি অনুরক্ত হইলেন না, প্রত্যুত অবজ্ঞাই করিতে লাগিলেন। ৯৮

চন্দ্র, তাহাদিগকে অবজ্ঞা করিতে থাকিলে তাহারা কাতর হইয়া পিতৃ সমীপে গমনপূর্বক কাতরস্বরে রোদন করত এই কথা কহিলেন। ৯৯

হে মুনিবর! চন্দ্র, এবারও তোমার কথা রাখিলেন না; তিনি এখন আমাদিগের প্রতি পূৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক অবজ্ঞাই করিতেছেন! ১০০

অতএব আমাদিগের আর চন্দ্ৰে কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই, এখন আমরা তপস্বিনী হইব; তপস্যা করিবার নিয়ম বলিয়া দাও। ১০১

হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ! আমরা তপস্যা দ্বারা শরীর শোধিত করিয়া জীবনত্যাগ করিব; আমরা বড় দুর্ভগা, আমাদিগের জীবনে কাজ কি? ১০২।

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–কৃত্তিকা অশ্বিনী প্রভৃতি দক্ষতনয়াগণ, এই কথা বলিয়া করতলে কপোল স্থাপনপূর্বক পরস্পরে, নিকট নিকট ভূতলে বসিয়া পড়িলেন। তাহাদিগকে তাদৃশ দুঃখবিহ্বলেন্দ্রিয়া ও মলিনবদনা দেখিয়া দক্ষ রেষাবেশে অনলের ন্যায় জলিয়া উঠিলেন। ১০৩-১০৪

অনন্তর কোপপূর্ণ মহাত্মা দক্ষের নাসিকাগ্র হইতে রমণীসম্ভোগলোলুপ, অধোমুখ, নিম্নদৃষ্টি, জগতের কাসোৎপাদক–ভীষণ যক্ষ্মা রোগ উৎপন্ন হইল। তাহার দংষ্ট্রাভীষণ, বর্ণ অঙ্গারবৎ কৃষ্ণ, কেশ স্বল্প, আকৃতি অতিদীর্ঘ কৃশ, এবং শিরা-পরিব্যাপ্ত, হস্তে একগাছি দণ্ড। ১০৫-১০৭

যক্ষ্মা, দক্ষকে বলিল,–হে মুনে! আমি কোথায় থাকিব? আমি কিই বা করিব? হে মহামতে! তাহা আমাকে বলিয়া দিন। ১০৮

অনন্তর দক্ষ তাহাকে বলিলেন,–তুমি সত্বর চন্দ্ৰশরীরে গমন কর; তুমি চন্দ্রকে গ্রাস করিবার জন্য স্বেচ্ছামত তথায় বাস কর। ১০৯

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–মহাত্মা দক্ষের এই কথা শুনিয়া সেই রোগ ধীরে ধীরে চন্দ্রের সমীপবর্তী হইল। ১১০

চন্দ্রের সমীপবর্তী হইয়াই–সর্প যেমন বল্মীকস্তুপে প্রবিষ্ট হয়, সেইরূপ ছিদ্র পাইয়া সেই মহারোগ চন্দ্রের হৃদয়ে প্রবেশ করিল। ১১১

সেই নিদারুণ রাজযক্ষ্মা হৃদয়ে প্রবিষ্ট হইলে চন্দ্র, মোহ যাইলেন ও নিজের সতত বিষম দৌর্বল্য অনুভব করিতে লাগিলেন। ১১২।

হে দ্বিজগণ! সেই রোগ, উৎপন্ন হইয়া প্রথমেই রাজাতে অর্থাৎ চন্দ্রে লীন হইয়াছিল বলিয়া তাহা জগতে “রাজযক্ষ্মা” বলিয়া প্রসিদ্ধ হইয়াছে। ১১৩

অনন্তর, সেই যক্ষ্মারোগাক্রান্ত চন্দ্র গ্রীষ্মকালে স্বল্পসলিলা নদীর ন্যায় প্রত্যহ ক্ষয় পাইতে লাগিলেন। ১১৪

চন্দ্র, ক্ষয় পাইতে লাগিলে ওষধি সকল (ধান্য প্রভৃতি) ক্ষয় পাইল; ওষষি ক্ষয় হওয়াতে আর যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হইতে পারিল না। ১১৫

যজ্ঞ অভাবে দেবগণের অন্ন মারা গেল। জলদাবলী বিনষ্ট হইল, সুতরাং বৃষ্টি হওয়াও বন্ধ হইল। ১১৬।

বৃষ্টি অভাবে সকল লোকের অন্নাভাব হইল। ১১৭

হে দ্বিজবরগণ! সমস্ত লোক দুর্ভিক্ষ-বিপদে কাতর হইলে দানধৰ্ম্মাদি আর কিছুই রহিল না। ১১৮

তখন প্রজাগণ সকলেই দুৰ্বল, সার-হীন, লোলুপেন্দ্রিয় এবং কু-কৰ্ম্মরত হইয়া পাপ কাৰ্য্যই করিতে লাগিল। ১১৯

এইরূপ ভাব দেখিয়া ইন্দ্রাদি দিকপালগণ, নবগ্রহ অন্যান্য দেবগণ এবং সপ্ত সমুদ্র–সকলেই অত্যন্ত ক্ষোভ প্রাপ্ত হইলেন। ১২০

ক্ৰমে সমস্ত জগৎকে ব্যাকুল এবং দস্যুপীড়িত দেখিয়া ইন্দ্ৰপ্ৰমুখ দেবগণ সকলে ব্ৰহ্মার নিকট গমন করিলেন। ১২১

তাহারা, জগৎপতি, সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার নিকট উপস্থিত হইয়া তাহাকে প্রণামপূর্বক যথাযোগ্য আসনে উপবেশন করিলেন। ১২২

লোকপিতামহ ব্রহ্মা, পর-পরিভূতের ন্যায়, হৃতবিষয়ের ন্যায় তাহাদিগের ম্লান বদন দর্শনে বৃহস্পতি, ইন্দ্র এবং অগ্নিকে লক্ষ্য করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন।

ব্ৰহ্মা বলিলেন,–অহে দেবগণ! আসিতে ত কোন ক্লেশ হয় নাই? এখন জিজ্ঞাসা করি, কি জন্য তোমরা আসিয়াছ? তোমাদিগের দুঃখ-পীড়িত-দেহ ও ম্লানবদন দেখিতেছি? ১২৪

তোমাদিগকে বিঘ্ন-বাধাশূন্য, নির্ভয় এবং কামচারী করিয়া স্ব স্ব অধিকারে নিযুক্ত করিয়াছি; এখন আবার দুঃখিত দেখিতে পাই কেন? ১১৫

যাহা তোমাদিগের দুঃখের কারণ, বা যে তোমাদিগকে দুঃখিত করিয়া তুলিয়াছে–সম্পূর্ণরূপে তাহা কীৰ্ত্তন কর এবং মনোরথ সিদ্ধ হইয়াছে বলিয়া অবধারণ কর। ১২৬

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–অনন্তর, লোকপালক ইন্দ্র, বৃহস্পতি এবং অগ্নি, স্বয়ম্ভুর নিকটে দেবগণের দুঃখকারণ বলিতে লাগিলেন। ১২৭

হে বিধাতঃ! আমরা যে জন্য আপনার নিকট আসিয়াছি, যাহা আমা দিগের দুঃখের কারণ এবং যাহাতে আমাদিগের শ্রী মলিন হইয়াছে তৎসমস্ত শ্রবণ করুন। ১২৮

হে লোক-পিতামহ! কোন স্থানেই আর যজ্ঞ হয় না; যাহাদিগের কোন বাধা ছিল না–কোন ভয় ছিল না; সেই সমস্ত প্রজাগণ এখন ক্ষয় পাইয়াছে। ১২৯

পৃথিবীতে এখন দানাদি ধর্ম নাই, তপস্যা নাই; মেঘে বৃষ্টি করে না, ভূমণ্ডল জলহীন হইয়াছে। ১৩০

ওষধি ও শস্য সকল বিনষ্ট; লোক সমস্ত ব্যাকুল; বিপ্রগণ দস্যু-পীড়িত; আর তাহারা বেদধ্বনি করেন না। ১৩১

অনেক প্রজা অন্নাভাবে মরিতেছে। যজ্ঞভাগ না থাকাতে আমরাও অন্নহীন হইয়াছি। ১৩২

তাহাতেই আমরা দুর্বল ও শ্রীহীন; কোনরূপেই স্বস্তি লাভ করিতে পারিতেছি না। ১৩৩

চন্দ্র, চক্ৰগতি দ্বারা বহুদিন রোহিণীমন্দিরে বৃষরাশিতে অবস্থিত আছেন, তিনি এখন ক্ষীণ এবং জ্যেৎস্না-হীন। ১৩৪

দেবতারা যখনই অন্বেষণ করেন, তখনই দেখেন,-চন্দ্র, তাহাদিগের অগ্রে নাই। হে বিধাতঃ! তিনি কখনও দেবসভাতে আইসেন না। ১৩৫

রোহিণীকে ত্যাগ করিয়া প্রায় কখনই তিনি কোন স্থানে যান না, তবে অন্য কেহ না থাকে ত একটু আধটু বাহিরে আইসেন। ১৩৬

তখন দেখা যায় তাহার সকল কলা গিয়াছে, কেবল একটী কলা অবশিষ্ট আছে। হে লোকেশ। এইরূপ অবস্থা বিপর্যয় সর্বত্রই হইয়াছে। ১৩৭

তদ্দর্শনে আমরা দিশাহারা হইয়া আপনার শরণাগত হইয়াছি। কালকঞ্জাদি অসুরমণ্ডলী, যাবৎ পাতাল হইতে উঠিয়া আমাদিগকে পীড়া না দেয়, তন্মধ্যেই আমাদিগকে এই ভয় হইতে পরিত্রাণ করুন। ১৩৮-১৩৯

জগতের, এইরূপ ব্যতিক্রম কেন যে হইয়াছে, সেই বিপ্লব কারণ আমরা অবগত নহি। ১৪০

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–দিব্যদর্শী পিতামহ, দেবগণের এই বাক্য শ্রবণে ক্ষণ কাল চিন্তা করত সেই সুরশ্রেষ্ঠদিগকে বলিলেন;–যে কারণে লোকবিপ্লব হইতেছে এবং যে উপায়ে তাহার শান্তি হইবে–দেবগণ সকলে তাহা শ্রবণ কর। ১৪১-৪২

চন্দ্র, অশ্বিনী প্রভৃতি সাতাইশ জন বরাঙ্গনা দক্ষ তনয়াকে বিবাহ করেন। ১৪৩

সকলকে বিবাহ করিলেন বটে, কিন্তু অনুরাগবশতঃ সৰ্ব্বদা রোহিণীর নিকটেই থাকিতেন, অন্য কাহারও নিকটেই যাইতেন না। ১৪৪

অনন্তর, অশ্বিনী প্রভৃতি ছাব্বিশজন বরারোহা রমণী সকলেই দুভাগ্য-জ্বরে পীড়িত হইয়া স্বয়ংই নিজ নিজ পিতৃ-সন্নিধানে গমন করিলেন। ১৪৫

চন্দ্র, অনুরাগক্রমে রোহিণীর সহিত যেরূপ ভাব করেন, আর তাহাদিগের প্রতি যেরূপ ভাব করেন–তাহারা দক্ষের নিকট তাহা ব্যক্ত করেন। ১৪৬

অনন্তর মহাবুদ্ধি দক্ষ, জামাতাকে মিষ্টবাক্যে স্তব করিয়া ও বহুতর সুন্বত বাক্য বলিয়া কন্যাগণের জন্য তাহাকে অনুরোধ করেন। ১৪৭

সুমহাত্মা দক্ষ, নিজের ইচ্ছামত চন্দ্রকে অনুরোধ করিলে তিনি সকল পত্নীর প্রতিই সমান ব্যবহার করিতে স্বীকার করেন। ১৪৮

চন্দ্র, তাহাদিগের সকলের প্রতি সমান ব্যবহার করিতে অঙ্গীকার করিলে মুনিশ্রেষ্ঠ দক্ষ স্বস্থানে গমন করিলেন। ১৪৯

মুনিবর দক্ষ চলিয়া গেলে, চন্দ্র সেই সকল পত্নীর প্রতি বৈষম্য পরিত্যাগ করিলেন না। তাহার পত্নীগণ তাহাতে অত্যন্ত কুপিত হইয়া পিতৃসমীপে গমন করিলেন। ১৫০

তনন্তর দক্ষ, তনয়াগণের জন্য চন্দ্রকে অনুরোধ করিয়া সকল পত্নীতেই সমান ব্যবহার করিতে প্রতিজ্ঞা করাইলেন এবং বললেন; চন্দ্র! যদি তুমি এহ সকলগুলির প্রতিই সমান ব্যবহার না কর, তাহা হইলে আমি তোমাকে শাপ দিব। অতএব অসামঞ্জস্যের কার্য করিও না। ১৫১-১৫২

পুনরায় দক্ষ চলিয়া গেলে, চন্দ্র, যখন তাহাদিগের প্রতি স্বীকার মত সমান ব্যবহার না করিলেন; তখন তাহারা রোষাবেশে পুনরায় যাইয়া দক্ষকে বলিলেন; চন্দ্র, তোমার কথা রক্ষা করিলেন না; তিনি আমাদিগের কাছে আইসেন না; আমরা তপস্যা করিব; তোমার নিকটে থাকিব। ১৫৩-১৫৪

মুনি দক্ষ, তাহাদিগের এই কথা শুনিয়া অত্যন্ত কুপিত হইলেন; তখন তাহার মন চন্দ্রকে ক্ষয়কারক শাপ দিবার জন্য উৎকণ্ঠিত হইল। ১৫৫

কুপিত মহামুনি শাপ দিতে উৎসুকচিত্ত হইলে তাহার নাসিকাগ্র হইতে ক্ষয় নামে মহারোগ নির্গত হইল। ১৫৬

সুমহাত্মা দক্ষ, রোগকে চন্দ্রের নিকটে পাঠাইয়াছেন; রোগও চন্দ্র-শরীরে প্রবিষ্ট হইয়াছে; সেই রোগই চন্দ্রকে ক্ষীণ করিয়া ফেলিয়াছে। ১৫৭

মহাত্মা চন্দ্র, ক্ষীণ হইয়াছেন বলিয়া তাহার জ্যোৎসাও ক্ষীণ হইয়াছে; জ্যোৎস্না ক্ষীণ হওয়াতে সকল ওষধি ক্ষয় পাইয়াছে। ১৫৮

ওষধি অভাবে জগতে আর যজ্ঞ হইতেছে না; যজ্ঞ অভাবে অনাবৃষ্টি, তাহাতেই সমস্ত প্রজা ক্ষয় হইয়াছে। ১৫৯।

যজ্ঞভাগ-উপভোগ ব্যতীত তোমাদিগের সেইরূপ দুৰ্বলত্ব এবং ব্যতিক্রম হইয়াছে। যে জন্য জগতের ব্যতিক্রম হইয়াছে, তাহা তোমাদিগকে বলিলাম; হে দ্বিজোত্তমগণ! যে উপায়ে ঐ বিপদের শান্তি হইবে তাহা শ্রবণ কর। ১৬০-১৬১

বিংশ অধ্যায় সমাপ্ত। ২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *