১৮. মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর রাত্রিভ্রমণ

মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর রাত্রিভ্রমণ

রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মি’রাজ ও নৈশ ভ্রমণের হাদীছগুলো ঐতিহাসিক ইবন আসাকির তাঁর গ্রন্থে “নবুওয়াতপ্ৰাপ্তির প্রথম দিকের ঘটনাবলী” অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন। তবে ইবন ইসহাক ওইগুলো উল্লেখ করেছেন নবুওয়াত লাভের ১০ বছর পরের ঘটনাবলীব সাথে। বায়হাকী (র) মূসা ইবন উকবা সূত্রে যুহরী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর রাত্রিকালীন বিশেষ ভ্রমণের ঘটনা ঘটেছে তার মদীনায় হিজরতের এক বছর পূর্বে; তিনি বলেছেন যে, ইবন লাহইয়াহ আবু আসওয়াদ সূত্রে উরওয়া থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। হাকীম….. ইসমাঈল সুদী (র) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হিজরতের ১৬ মাস পূর্বে মি’রাজের রাত্ৰিতে বায়তুল মুকাদাসে তার উপর পাঁচ ওয়াকত নামায ফরয করা হয়। সুতরাং সুদীর বর্ণনা অনুসারে মি’রাজের ঘটনা ঘটে যুল-কাদা মাসে আর যুহরী ও উরওয়া (র)-এর বর্ণনানুসারে ওই ঘটনা ঘটে রবিউল আউয়াল মাসে। আবু বকর ইবন আবু শায়াবা… জাবির ও ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তারা দু’জনে বলেছেন যে, হাতীর বছরে রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার রাসূলুল্লাহ্ (সা) জন্মগ্রহণ করেন। পরবতীতে একই তারিখে তিনি নবুওয়াত প্রাপ্ত হন। ওই তারিখে তার মি’রাজ সংঘটিত হয়। ওই তারিখে হিজরত করেন এবং ওই তারিখেই তিনি ইনতিকাল করেন। অবশ্য, এই বর্ণনার সনদে বিচ্ছিন্নতা আছে।

হাফিযী আবদুল গনী ইবন সারুর মুকদ্দিসী তার সীরাত গ্রন্থে এ তারিখটিই গ্ৰহণ করেছেন। অবশ্য, তিনি অন্য একটি হাদীছও উল্লেখ করেছেন, সেটির সনদ বিশুদ্ধ নয়। ওই হাদীছটি আমরা রজব মাসের ফয়ীলত প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছি। সেটি এই যে, মি’রাজের ঘটনা ঘটেছিল রজব মাসের ২৭ তারিখের রাতে। আল্লাহই ভাল জানেন।

কেউ কেউ মনে করেন যে, রজব মাসের প্রথম জুমুআর রাতে (বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে) মি’রাজ, অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই রাতকে “লায়লাতুর রাগাইবা” বলা হয়। ওই রাতে বিশেষ নামায আদায়ের রেওয়াজের উদ্ভব হয়েছে। বস্তৃত এর কোন গ্রহণযোগ্য দলীল নেই আল্লাহই ভাল জানেন। এ প্রসংগে কেউ কেউ এই কবিতা পাঠ করেন :

ليلة “الجمعة عرج بالنبى – ليلة الجمعة أول رجب–অর্থাৎ “জুমুআর রাত সে তো মর্যাদাময় রাত। রজব মাসের প্রথম জুমুআর রাতে নবী করীম (সা)-এর মি’রাজ অনুষ্ঠিত হয়।”

এই কবিতায় দুর্বলতা আছে। যারা জুমুআর রাতে মি’রাজ সংঘটিত হওয়ার অভিমত পোষণ করেন, তাদের বক্তব্যের সমর্থনে আমরা এই কবিতা উল্লেখ করলাম।

Հ Գ

আল্লাহ তা’আলার বাণী

سبسبحان الذی اسرای بعبدم لیلا من الم تجسد الحرام الی المسجد الاقطسى

الذی بار گنتا حولهٔ لنریهٔ من ایتنا انهٔ هو السمیع البصیر. পবিত্ৰ মহিমময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রজনীযোগে ভ্ৰমণ করিয়েছিলেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসায়— যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বরকতময় তাকে আমার নিদর্শন দেখাবার জন্যে। তিনি সর্বশ্রোতা সর্বদ্ৰষ্টা (১৭ : ১)। এ আয়াত প্রসংগে আমরা এ সম্পর্কিত প্রায় সকল হাদীছ উল্লেখ করেছি। সুতরাং সেখান থেকে সুদৃঢ় সনদ বিশিষ্ট হাদীছগুলো এবং এ বিষয়ক আলোচনা আমরা এখানে উল্লেখ করব। তা-ই যথেষ্ট হবে। ইবন ইসহাকের বক্তব্যের সার কথাগুলোও আমরা উল্লেখ করব। কারণ, ইতোপূর্বে উল্লিখিত অধ্যায়গুলো উল্লেখ করার পর তিনি বলেছেন, তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-কে রাত্রিকালীন ভ্রমণ করানাে হল মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত। মসজিদুল আকসা হল ইলিয়া এলাকার বায়তুল মুকাদাসে। ইতোমধ্যে মক্কার কুরায়শ ও অন্যান্য গোত্রের মধ্যে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে। ইবন ইসহাক আরো বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর রাত্রিকালীন বিশেষ ভ্ৰমণ তথা মি’রাজ সম্পর্কে যাদের হাদীছ আমার নিকট পৌছেছে তাঁরা হলেন ইবন মাসউদ (রা), আবু সাঈদ (রা), আইশা (রা), মুআবিয়া (রা), উন্মে হানী (রা) বিনত আবু তালিব, হাসান ইবন আবু হাসান (রা), ইবন শিহাব যুহরী (র), এবং কাতাদা (র) প্রমুখ বিশেষজ্ঞগণ। তাঁরা সকলে কিন্তু ঘটনার সকল দিক বর্ণনা করেননি। বরং এক একজন এক এক অংশ বর্ণনা করেছেন। মূলত রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মি’রাজের ঘটনায় আমার নিকট যে সকল তথ্য পৌছেছে, সেগুলোর মধ্যে ঈমানী পরীক্ষা রয়েছে। এটি মূলত মহান আল্লাহর অপরিসীম কুদরত ও শক্তির বহিঃপ্রকাশ। জ্ঞানী লোকদের জন্যে এর মধ্যে বহু শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হিদায়াত, রহমত এবং ঈমানদারদের জন্যে দৃঢ়তার উপাদান। এটি নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলার সুমহান কর্ম। রাসূলুল্লাহ (সা)-কে যা দেখানোর ইচ্ছা ছিল তা দেখানোর জন্যে মহান আল্লাহ তাকে যেভাবে চেয়েছেন যেরূপে চেয়েছেন, সেরূপে ভ্ৰমণ করিয়েছেন। ফলে তিনি মহান আল্লাহর অনন্য কুদরত ও শক্তির নিদর্শন প্রত্যক্ষ করলেন। যে কুদরত ও শক্তি দ্বারা আল্লাহ যখন যা চান, তখন তা করতে পারেন।

আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট বুরাক উপস্থিত করা হল। এটি সেই বাহন, পূর্ববতী নবীগণ যার উপর সওয়ার হতেন। সেটি তার কদম রাখে তার দৃষ্টির প্রান্ত সীমায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সেটিতে সওয়ার হলেন। তাঁকে নিয়ে সাখী জিবরাঈল (আঃ) যাত্ৰা করলেন। আসমান ও যমীনের মধ্যবর্তী নিদর্শনগুলো তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে দেখাচ্ছিলেন। তাঁরা বায়তুল মুকাদ্দাস গিয়ে পৌঁছলেন। সেখানে হযরত ইবরাহীম (আ), মূসা (আ) ও ঈসা। (আ)-সহ অনেক নবী-রাসূলের সাথে সাক্ষাত হয়। তার অভ্যর্থনার জন্যে তারা সেখানে সমবেত হয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে নিয়ে নামায আদায় করেন। এরপর তাঁর সম্মুখে তিনটি পাত্ৰ উপস্থিত করা হয়। একটিতে দুধ, একটিতে মদ এবং একটিতে ছিল পানি। তিনি দুধের

পাত্র থেকে পান করলেন। এরপর জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বললেন, “আপনি নিজে হিদায়াতপ্রাপ্ত হলেন আপনার উম্মতকেও হিদায়াতপ্রাপ্ত করলেন।”

হাসান বসরী (র) সূত্রে মুরসাল রূপে ইবন ইসহাক বলেন, জিবরাঈল (আ) রাসূলুল্লাহ (সা)-কে ঘুম থেকে তুললেন। এরপর তাকে নিয়ে মাসজিদুল হারামের দরজায় এলেন। তাকে বুরাকের পিঠে আরোহণ করালেন। এটি গাধা ও খচ্চরের মাঝামাঝি আকারের একটি সাদা রঙের সওয়ারী। সেটির দু’ উরুতে দুটো ডানা ছিল। ডানা দুটো দ্বারা সে পা দুটো ঢেকে রেখেছিল। সে কদম রাখছিল তার দৃষ্টির শেষসীমায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, এরপর জিবরাঈল (আ) আমাকে বুরাকের পিঠে তুললেন। তারপর আমাকে নিয়ে যাত্রা করলেন। আমরা যাচ্ছিলাম এক সাথে। একে অন্য থেকে অদৃশ্য হইনি।

আমি বলি, ইবন ইসহাকের উল্লিখিত কাতাদা (র)-এর হাদীছে। এরূপ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) যখন বুরাকের পিঠে উঠার ইচ্ছা করলেন, তখন সে দাপাদাপি করে তাকে পিঠে নিতে অসম্মতি উত্থাপন করছিল। তখন তার কেশরে হাত রেখে জিবরাঈল (আঃ) বললেন, হে বুরাক! তুমি যা করছে তার জন্যে কি তোমার লজ্জা হয় না? আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ (সা)-এর পূর্বে এমন কোন বান্দা তোমার পিঠে চড়েননি যিনি আল্লাহর নিকট তার চাইতে অধিক সম্মানিত। একথা শুনে বুরাকটি লজ্জিত হলো। তার দেহ থেকে ঘাম বের হতে শুরু করে। সে শান্ত হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার পিঠে আরোহণ করলেন। হাসান বসরী (র) তাঁর বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) যাত্রা শুরু করলেন। তাঁর সাথে রইলেন। হযরত জিবরাঈল (আঃ)। তাঁরা বায়তুল মুকাদাসে গিয়ে পেঁৗছলেন। সেখানে হযরত ইবরাহীম (আ) মূসা (আ), ও ঈসা। (আ)-সহ অনেক নবী-রাসূলের সাথে তাদের সাক্ষাত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) ইমাম হয়ে তাদেরকে নিয়ে নামায আদায় করলেন। এরপর ইবন ইসহাক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মদের পরিবর্তে দুধের পাত্র গ্রহণ করার ঘটনা এবং তাকে উদ্দেশ করে জিবরাঈল (আ.)-এর “আপনি হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়েছেন এবং উম্মতকেও হিদায়াতপ্রাপ্ত করেছেন। আর আপনাদের জন্যে। মদ হারাম করা হয়েছে” মন্তব্য করার কথা উল্লেখ করেছেন।

বর্ণনাকারী বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ (সা)মক্কায় ফিরে এলেন এবং সকাল বেলা কুরায়শী লোকদেরকে এ ঘটনা বলতে শুরু করলেন। কথিত আছে যে, অধিকাংশ লোক তার বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করলো এবং একদল লোক ইসলাম গ্রহণের পর মুরতাদ ও ধর্মত্যাগী হয়ে যায়। হযরত আবু বকর (রা) তা শোনা মাত্র সত্য বলে মেনে নেন। তিনি বলেন, আমি তো সকাল-সন্ধ্যা তার আসমানী সংবাদগুলো বিশ্বাস করি। তাহলে তাঁর বায়তুল মুকাদ্দাস যাওয়ার সংবাদ বিশ্বাস না করার কী আছে? বর্ণিত আছে যে, হযরত আবু বকর সিদীক (রা) বায়তুল মুকাদ্দাসের অবস্থা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট জানতে চেয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে বায়তুল মুকাদাসের অবস্থা জানান। সেদিন থেকে আবু বকর (রা) সিন্দীক তথা সত্যপ্ৰাণ উপাধিতে ভূষিত হন। হাসান (র) বলেন, এ প্রসংগে আল্লাহ্ তা’আলা নাযিল করলেন :

وما جعلنا الرؤيا التى آريناك الأفتنة للناس ‘আমি যে দৃশ্য আপনাকে দেখিয়েছি তা কেবল মানুষের পরীক্ষার জন্যে’ (১৭ : ৬০)।

ইবন ইসহাক উন্মে হানী সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে রাতে ভ্ৰমণ করানো হয়েছে আমার ঘর থেকে। সে রাতে ইশার নামায আদায়ের পর তিনি আমার ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। ফজরের একটু পূর্বে তিনি আমাদেরকে ঘুম থেকে জাগালেন। আমরা যখন ভোর বেলা তার সাথে ফজরের নামায আদায় করলাম, তখন তিনি বললেন, হে উন্মে হানী! গতরাতে এই ভূমিতে আমি তোমাদের সাথে ইশার নামায আদায় করেছি। তারপর আমি বায়তুল মুকাদ্দাস যাই এবং সেখানে নামায আদায় করি। এখন আবার তোমাদের সাথে ফজরের নামায আদায় করলাম তাতো দেখলেই। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) সেখান থেকে বের হতে যাচ্ছিলেন। আমি তার চাদরের প্রান্ত ধরে বললাম, হে আল্লাহর নবী! একথা। আপনি কারো নিকট বলবে না। বললে তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী ঠাওরাবে এবং আপনাকে কষ্ট দেবে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, আল্লাহর কসম, আমি তা অবশ্যই বলব। তিনি তা বললেন। এরপর ঠিকই লোকজন তার কথা প্রত্যাখ্যান করে তাকে মিথ্যাবাদী ঠাওরালো। ঘটনার প্রমাণ স্বরূপ তিনি বললেন, আমি অমুক স্থানে অমুক গোত্রের কাফেলাকে অতিক্রম করেছি। আমার সওয়ারীর চলার শব্দে ওরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছিল। ফলে তাদের একটি উট কাফেলা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। পলায়নকৃত উটের অবস্থান আমি তাদেরকে জানিয়ে দিই। আমি তখন সিরিয়ার দিকে যাচ্ছিলাম। বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে আমি মক্কা অভিমুখে যাত্ৰা করি। সাহনান নামক স্থানে এসে আমি অমুক গোত্রের কাফেলার সাক্ষাত পাই। তারা সকলে তখন নিদ্রামগ্ন। তাদের একটি পাত্রে পানি ছিল। কিছু একটা দিয়ে তারা সেটি ঢেকে রেখেছিল। ওই ঢাকনা উঠিয়ে আমি ওখান থেকে পানি পান করি। এরপর যেমনটি ছিল তেমনটি ঢেকে রাখি। এর প্রমাণ হল ওদের কাফেলা এখন তানঈম পাহাড়ের উচুস্থান থেকে “বায়দা” নামক স্থানে অবতরণ করছে। তাদের উট পালের সম্মুখে রয়েছে একটি খাকি রংয়ের উট। তার মধ্যে দুটো চিহ্ন আছে। একটি কাল অপরটি সাদা-কালো মিশ্রিত। লোকজন তখন দ্রুত ছানিয়া অর্থাৎ তানঈম পাহাড়ের চূড়ার দিকে ছুটিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বর্ণিত সম্মুখস্থ উটটি তারা দেখতে পেল না। তবে কাফেলার লোকজনকে ওদের পানি-বাক্স ও উট সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। ওরা উত্তরে ঠিক তাই বলেছে। যেমনটি রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইতোপূর্বে বলেছিলেন।

ইউনুস ইবন বুকােয়র আসবাত সূত্রে ইসমাঈল সুদী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ওই কাফেলা ফিরে আসার পূর্ব মুহুর্তে সূর্য প্রায় অস্তমিত হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আল্লাহর নিকট দুআ করলেন। আল্লাহ্ তা’আলা সূর্যকে স্থির রেখে দিলেন। ইত্যবসরে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বর্ণনা মুতাবিক ওই কাফেলাটি এসে পড়লো। এরপর সূর্য অস্তমিত হল। বস্তৃত সেদিন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জন্যে এবং অন্য একদিন নবী ইউশা। ইবন নূন-এর জন্যে সূর্য স্থির থেকেছিল। এ ছাড়া কারো জন্যে সূর্য কোন দিন স্থির থাকেনি। এটি বায়হাকীর বর্ণনা।

ইবন ইসহাক বলেন, যার বিশ্বস্ততা সম্পর্কে আমি সন্দেহ করি না এমন এক লোক আমার নিকট বর্ণনা করেছেন আবু সাঈদ (রা) থেকে। তিনি বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলতে শুনেছি, বায়তুল মুকাদ্দাস কেন্দ্ৰিক কাজকর্মগুলো আমি যখন শেষ করলাম, তখন আমার নিকট উধ্বারোহণের বাহন নিয়ে আসা হল। ওই রকম সুন্দর ও মনােরম কিছু আমি ইতোপূর্বে

বাছাই করার ঘটনাও কি বায়তুল মুকাদ্দাসে ঘটেছে, না আকাশে ঘটেছে সে বিষয়েও ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে।

মোদ্দাকথা, বায়তুল মুকাদ্দাসের কাজকর্ম শেষ করার পর তাঁর জন্যে উর্ধ্বারোহণের বাহন প্ৰস্তুত করা হয়। এটি ছিল একটি সিঁড়ি বিশেষ। সেটিতে চড়ে তিনি আকাশে উঠলেন। এ সময়ে তিনি বুরাকে আরোহণ করেননি। অবশ্য কেউ কেউ মনে করেন যে, এ সময়ে তিনি বুরাকে আরোহণ করেছিলেন। বুরাকটি বরং তখন বায়তুল মুকাদ্দাসের দরজায় বাধা ছিল ভ্ৰমণ শেষে মক্কায় ফিরে আসার জন্যে। মি’রাজে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এক আকাশ ছেড়ে অপর আকাশ এরপর পরবতী আকাশ অতিক্রম করে পর্যায়ক্রমে সপ্তম আকাশ অতিক্রম করলেন। প্রত্যেক আকাশে সেখানকার নেতৃস্থানীয় ও বড় বড় ফেরেশতাগণ এবং নবী-রাসূলগণ তাঁর সাথে সাক্ষাত করেন এবং তাঁকে অভিনন্দন জানান। যে সকল নবী-রাসূলের সাথে তাঁর সাক্ষাত ঘটেছিল। তিনি তাদের নামও উল্লেখ করেছেন। যেমন প্রথম আকাশে হযরত আদম (আ), দ্বিতীয় আকাশে ইয়াহয়া ও ঈসা (আ),১ চতুর্থ আকাশে ইদরীস (আ:) এবং ষষ্ঠ আকাশে মূসা (আ:)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়েছে বলে বিশুদ্ধ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। আরো বর্ণিত আছে যে, সপ্তম আকাশে সাক্ষাত হয়েছে ইবরাহীম (আ:)-এর সাথে। তিনি সেখানে বায়তুল মা’মূরের সাথে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। বায়তুল মামুরে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করেন। তারা সেখানে নামায আদায় ও তাওয়াফ ইত্যাদি ইবাদত করে থাকেন। এরপর বেরিয়ে যান। কিয়ামত পর্যন্ত ওই ফেরেশতাগণ দ্বিতীয়বার বায়তুল মামুরে আসবেন না। এরপর তিনি নবীদের অবস্থান-স্থল অতিক্রম করেন। তিনি এমন এক সমতল স্থানে গিয়ে পৌছেন, যেখান থেকে কলমের লেখন-শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে তাঁর নিকট সিদরাতুল মুনতাহা (সীমান্তের কুলবৃক্ষ) উপস্থিত করা হয়। সেটির পাতাগুলো হাতির কানের মত এবং ফলগুলো হিজর অঞ্চলের কলসীর মত। তখন একাধিক উজ্জ্বল রংয়ের বিশেষ বস্তুসমূহ ওই কুল বৃক্ষকে আচ্ছাদিত করে ফেলে। বৃক্ষে ছড়ানাে পক্ষীকুলের ন্যায় ফেরেশতাগণ ওই বৃক্ষে আরোহণ করে। স্বর্ণের পতঙ্গগুলো বৃক্ষটিতে উড়াউড়ি করতে থাকে। আল্লাহ তা’আলার জ্যোতিতে ওই বৃক্ষ আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে। প্রিয়নবী (সা) তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে তাঁর নিজস্ব অবয়বে দেখতে পান। তাঁর ছয়শ’ পাখা। এক পাখা থেকে অপর পাখার দূরত্ব যমীন থেকে আসমানের দূরত্বের সমান। এ প্রসংঙ্গে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন :

নিশ্চয়ই তিনি তাকে আরেক বার দেখেছিলেন সিদরাতুল মুনতাহার নিকট। যার নিকট

অবস্থিত বাসোদ্যান। তাঁর দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি (৫৩ : ৫)। অর্থাৎ তাঁর দৃষ্টি লক্ষ্যস্থলে সীমাবদ্ধ ছিল। ডানেও যায়নি, বামেও যায়নি কিংবা উপরেও উঠেনি। এটি হল

১. মূল কিতাবে ৩য় ও ৫ম আকাশের উল্লেখ নেই। সীরাত-ই ইবন হিশামে আছে যে, তিনি ৩য় আকাশে

ইউনুস (আ:) ও ৫ম আকাশে হারূন (আ:)-কে দেখেছেন।

পরিপূর্ণ স্থিরতা ও প্রশংসনীয় শিষ্টাচার। এটি হল দ্বিতীয়বার দেখা। আল্লাহ তা’আলা হযরত জিবরাঈল (আঃ)-কে যে আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন, সে আকৃতিতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবার সহ তাকে দু’বার দেখলেন। ইবন মাসউদ (রা) আবু হুরায়রা (রা), আবু যার ও আইশা (রা) এরূপ বর্ণনা করেছেন। উপরোক্ত আয়াতের পূর্ব আয়াতসমূহ এই :

তাঁকে শিক্ষা দান করে শক্তিশালী প্রজ্ঞাসম্পন্ন সত্তা। সে নিজ আকৃতিতে স্থির হয়েছিল। তখন সে উধৰ্ব্বদিগন্তে। এরপর সে তার নিকটবতী হল। অতি নিকটবতী। ফলে তাদের মধ্যে দু’ধনুকের ব্যবধান রইল। অথবা তারও কম। তখন আল্লাহ তা’আলা তার বান্দার প্রতি যা ওহী করার তা ওহী করলেন (৫৩ : ৫)। এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল আবতাহ অঞ্চলে। হযরত জিবরাঈল (আঃ) তাঁর সুবিশাল আকৃতি নিয়ে ভূমি থেকে আকাশ পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকটবতী হলেন। উভয়ের মাঝে মাত্র দু’ধনুকের ব্যবধান রইল। কিংবা তারও কম।

এটিই বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা। প্ৰবীণ ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবায়ে কিরাম-(রা)-এর বক্তব্য থেকে তা-ই প্ৰতীয়মান হয়।

এ প্রসংগে হযরত আনাস (রা) থেকে শুরায়ক (র) বর্ণনা করেছেন যে, খোদ আল্লাহ তা’আলা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকটবতী হলেন এবং উভয়ের মাঝে দুই ধনুক কিংবা তারও কম ব্যবধান রইল। এ ব্যাখ্যা মূলত বৰ্ণনাকারীর নিজস্ব উপলব্ধিও হতে পারে। বর্ণনাকারী এটিকে হাদীছের মধ্যে শামিল করে দিয়েছেন। আল্লাহই ভাল জানেন। এটি যদি মূলত হাদীছের অংশ হয়েই থাকে, তাহলে এটি আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যা নয় বরং অন্য কোন প্রসংগজনিত বক্তব্য। আল্লাহই ভাল জানেন।

ওই রাতে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দা মুহাম্মাদ (সা) তাঁর উম্মতের উপর দিনে-রাতে ৫০ ওয়াকত নামায ফরয করে দিয়েছিলেন। এরপর প্রিয়নবী (সা) মহান আল্লাহ এবং মূসা (আ)-এর নিকট একাধিকবার যাতায়াত করেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা’আলা ৫০ ওয়াকত থেকে তা ৫ ওয়াকতে নামিয়ে আনেন এবং আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, এই ৫ ওয়াকত মূলত ৫০ ওয়াকত। একে দশ অনুপাতে। এই সূত্রে ওই রাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) মহান আল্লাহর সাথে কথোপকথনের সুযোগ লাভ করেন। হাদীছ বিশারদগণ এ বিষয়ে প্রায় সকলে একমত। তবে তিনি মহান আল্লাহকে দেখতে পেরেছেন। কিনা সে বিষয়ে ইমামগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একদল বলেছেন, তিনি অন্তৰ্চক্ষু দিয়ে মহান আল্লাহকে দু’বার দেখেছেন। হযরত ইবন আব্বাস (রা) ও তার অনুসারী একদল লোক একথা বলেছেন। অন্য একি বর্ণনায় এসেছে যে, হযরত ইবন আব্বাস (রা) ও অন্যান্যরা শর্তহীন দেখার কথা উল্লেখ করেছেন। সেটিও তিনি অন্তৰ্চক্ষু দ্বারা দেখেছেন বলে ধরে নিতে হবে। শর্তহীন দীদারের কথা যারা বলেছেন, তাদের মধ্যে আবৃ হুরায়রা (রা) ও ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (র) অন্যতম। কেউ কেউ স্পষ্টভাবে এবং জোর দিয়ে বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আল্লাহ্ তা’আলাকে প্রত্যক্ষভাবে স্বচক্ষে দেখেছেন। ইবন

জারীর এ অভিমত গ্ৰহণ করেছেন এবং পরবতী যুগের একদল উলামায়ে কিরাম তাকে অনুসরণ করেছেন। স্বচক্ষে দেখেছেন বলে যারা মত প্ৰকাশ করেছেন, তাদের অন্যতম হলেন শায়খ আবুল হাসান আশআরী। সুহালী তাই বৰ্ণনা করেছেন। শায়খ আবু যাকারিয়া নবভীও এমত গ্ৰহণ করেছেন বলে তার ফাতাওয়া গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। w

একদল বিশ্লেষক বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক আল্লাহর দীদার লাভ সম্পর্কিত কোন ঘটনা-ই ঘটেনি। সহীহ মুসলিমে উল্লিখিত হযরত আবু যর (রা)-এর বর্ণিত একটি হাদীছের সূত্র ধরে তাঁরা এ কথা বলেন। হযরত আবু যর (রা) বলেন, আমি বললাম। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আপনার প্রতিপালককে দেখেছেন? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন,,,,, ১১। —বরং নূরাই আমি প্রত্যক্ষ করেছি। অপর বর্ণনায় আছে, তিনি বলেছেন,,,,–1, আমি নূর দেখেছি। এ প্রেক্ষিতে তাঁরা বলেন যে, ধ্বংসশীল চক্ষুদ্বারা চিরন্তন সত্তাকে দেখার ঘটনা ঘটেনি। কোন কোন আসমানী কিতাবে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা’আলা হযরত মূসা (আ:)-কে বলেছিলেন, হে মূসা! কোন জীবিত মানুষ আমাকে দেখলে তার নিশ্চিত মৃত্যু হবে এবং কোন শুষ্ক বস্তু আমাকে দেখলে ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। অবশ্য এ বিষয়ে পূর্ববতী ও পরবতী উলামায়ে কিরামের মধ্যকার মতভেদ সর্বজন বিদিত। আল্লাহই ভাল জানেন।

এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) বায়তুল মুকাদাসে নেমে এলেন। বাহ্যিকভাবে মনে হয় যে, মহান আল্লাহর সান্নিধ্য থেকে ফিরোসার সময় অন্যান্য নবীগণও তাঁর সম্মানার্থে তাঁর সাথে পৃথিবীতে অবতরণ করেন। সম্মানিত প্ৰতিনিধিগণের আগমনের ক্ষেত্রে যা ঘটে থাকে। আগন্তুকের আগমনের পূর্বে তারা কারো নিকট সমবেত হন না। এজন্যেই উর্ধের্ব আরোহণের সময় যখনই যে নবীর পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছেন, সে নবীর পরিচয় জানিয়ে এবং সে নবীকে সালামের আহ্বান জানিয়ে হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলেছেন, ইনি অমুক, তাকে সালাম দিন। বস্তৃত উর্ধ্বারোহণের পূর্বে যদি সবাই বায়তুল মুকাদ্দাসে সমবেত হতেন, তাহলে পুনরায় পরিচয় করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন হতো না। এর পক্ষে একটি দলীল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, 447.1.1 831.~। এL 1.14 —যখন নামাযের সময় হলো, তখন আমি তাদের ইমামতি করলাম। ওই ওয়ার্কত নিশ্চয়ই ফজরের নামাযের ওয়াকত। আল্লাহর নির্দেশে জিবরাঈল (আ.)-এর ইঙ্গিতে তিনি তাদের ইমামতি করলেন। এ ঘটনা থেকে জানা যায় যে, কোন স্থানে অধিকতর মর্যাদাবান ইমাম উপস্থিত থাকলে সেখানে বাড়ীর মালিক নয় বরং উক্ত ইমাম-ই ইমামতি করবেন। কারণ, বায়তুল মুকাদাস অন্যান্য নবীদের মহল্লা ও বাসস্থান হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ্ (সা) সেখানে ইমামতি করেছেন।

এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) সেখান থেকে বের হয়ে বুরাকে আরোহণ করলেন এবং মক্কায় ফিরে এলেন। তখন তিনি ছিলেন পরিপূর্ণ শান্ত সমাহিত। ওই রাতে তিনি এমন সব ঘটনা ও নিদর্শন দেখেছেন অন্য কোন লোক তার কিছুটা দেখলেও হত-বিহবল ও অজ্ঞান হয়ে যেত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা) ছিলেন পরিপূর্ণভাবে স্থির ও শান্ত। তবে তিনি আশংকা করছিলেন যে, এ সংবাদ প্ৰকাশ করলে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকজন তাকে মিথ্যাবাদী প্ৰতিপন্ন করতে পারে। তাই তিনি প্রথমে নাম ও হাল্কা ভাবে তাদেরকে ওই রাতে তার বায়তুল মুকাদাসে যাওয়ার ঘটনা

জানালেন। আবু জাহল (তার প্রতি আল্লাহর লা’নত) দেখল যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) সুস্থির ও শান্তভাবে মসজিদুল হারামে বসে আছেন। সে বলল, নতুন কোন সংবাদ আছে কি? রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, হ্যা, আছে। সে বলল, কী সংবাদ? তিনি বললেন, এ রাতে আমাকে বায়তুল মুকাদ্দাসে ভ্রমণ করানো হয়েছে। আশ্চর্যান্বিত হয়ে সে বলল, বায়তুল মুকাদ্দাসে তিনি বললেন, হঁ্যা, তাই। সে বলল, আচ্ছা আমি যদি তোমার সম্প্রদায়ের লোকদেরকে ডেকে আনি এজন্যে যে, তুমি আমাকে যা জানিয়েছ তাদেরকেও তুমি তা জানাবে তা হলে তুমি কি ওদেরকেও তা জানাবে? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, আলবৎ জানাব, আবু জাহলের ইচ্ছা ছিল সে কুরায়শদেরকে একত্রিত করবে যাতে তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মুখ থেকে এ অভিনব ও অকল্পনীয় কথা শুনতে পায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে একত্রিত করা যাতে তিনি এ ঘটনা তাদেরকে জানাতে পারেন এবং তাঁর বার্তা তাদের নিকট পৌছাতে পারেন। আবু জাহল সবাইকে ডেকে বলল, হে কুরায়শ সম্প্রদায়! কালবিলম্ব না করে সবাই এখানে সমবেত হও! নিজ নিজ আসর থেকে উঠে এসে সকলে সেখানে এসে হাযির হল। আবু জাহল বলল, তুমি এইমাত্র আমাকে যা জানালে তা এবার তোমার সম্প্রদায়ের লোকজনকে জানাও। ওই রাতে তিনি যা দেখেছেন এবং বায়তুল মুকাদ্দাস উপস্থিত হয়েছেন, সেখানে নামায আদায় করেছেন এসকল ঘটনা তিনি তাদেরকে জানালেন। এ ঘটনা অসম্ভব ও অবিশ্বাস্য ঘোষণা দিয়ে তাদের কেউ হাত তালি দিয়ে আবার কেউ বা শিস দিয়ে তাঁর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করলো’। মুহুর্তের মধ্যে এ সংবাদটি সমগ্র মক্কায় ছড়িয়ে পড়লো। লোকজন এসে হযরত আবু বকর (রা)-এর নিকট উপস্থিত হয় এবং বলে যে, মুহাম্মাদ (সা) তো এরূপ এরূপ কথাবার্তা বলছেন। আবু বকর (রা) বললেন, তোমরা কি তাঁর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করছ? তারা বলল, তা তো বটেই, আল্লাহর কসম, তিনি যে এমন এমন কথা বলছেন!! হযরত আবু বকর (রা) বললেন, তিনি যদি তা বলে থাকেন তবে তিনি অবশ্যই সত্য বলেছেন। আবু বকর (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট হাযির হলেন। কুরায়শী মুশরিকগণ তাঁর পাশে ছিল। তিনি এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট জানতে চাইলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) পুরো ঘটনা তাঁকে অবহিত করলেন। আবৃত বকর (রা) বায়তুল মুকাদাসের বর্ণনা শুনতে চাইলেন। তা এজন্যে যে, মুশরিকগণ যেন ওই বর্ণনা শুনতে পায় এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বক্তব্যের সত্যতা উপলব্ধি করতে পারে। অবশ্য বিশুদ্ধ রিওয়ায়াতে আছে যে, বায়তুল মুকাদ্দাসের বিবরণ জানতে চেয়ে প্রশ্ন করেছিল মুশরিকরা। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, এরপর আমি তাদেরকে বায়তুল মুকাদাসের বর্ণনা শুনাতে লাগলাম। কতক বিষয়ে আমার অস্পষ্টতা থাকায় আল্লাহ তা’আলা আমার সম্মুখ থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত সকল অন্তরায় সরিয়ে দিলেন। ফলে আমার মনে হচ্ছিল যে, বায়তুল মুকাদ্দাস এখন আকীলের ঘরের পাশে। তা দেখে দেখে আমি তার বিবরণ দিচ্ছিলাম। হযরত আবু বকর (রা) বললেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বায়তুল মুকাদ্দাসের যে বর্ণনা দিলেন তাতো তিনি ঠিকই বলেছেন।

রাসূলুল্লাহ্ (সা) ওদের ব্যবসায়ী কাফেলার পাশ দিয়ে গিয়েছেন এবং ওদের পাত্র থেকে পানি পান করেছেন বলে যে ঘটনা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। ইবন ইসহাক তা উল্লেখ করেছেন। এভাবে আল্লাহ্ তা’আলা ওদের নিকট দলীল-প্রমাণ সুদৃঢ় করলেন এবং বিষয়টি

তাদের নিকট স্পষ্ট হয়ে পড়ল। ফলে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের প্রেক্ষিতে যারা ঈমান আনয়নকারী, তারা ঈমান আনয়ন করল আর প্রত্যাখ্যানকারীরা দলীল-প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও কুফরী করল। এ প্রসংগে আল্লাহ তা’আলা বলেন, :

الرؤيا التى أريتاك الأفتنة للناس আমি যে দৃশ্য আপনাকে দেখিয়েছি তা এবং কুরআনে উল্লিখিত অভিশপ্ত বৃক্ষটিও কেবল মানুষের পরীক্ষার জন্যে। অর্থাৎ যাচাই করা ও পরখ করে নেয়ার জন্যে।

হযরত ইবন আব্বাস (রা) বলেন, মি’রাজের রাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) যা দেখেছেন, তা তার চোখের দেখা ও প্রত্যক্ষ দর্শন ছিল। প্রাচীন ও আধুনিক সকল উলামায়ে কিরাম এ বিষয়ে একমত যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মি’রাজ অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাঁর দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে। অর্থাৎ

সশরীরে সজ্ঞানে তিনি গমন করেছেন। মিরাজের রাতে তার বাহনে আরোহণ এবং উধৰ্ব্বজগতে গমন ইত্যাদি কর্মকাণ্ড তা-ই প্রমাণ করে। এ জন্যে মহান আল্লাহ বলেন? سبحان الذى أسرى بعيدم الليلاً من المسجد الحرام – الى المسجد الاقطسى

الذی بار گنتا حولهٔ لنریهٔ

“পবিত্র ও মহিমময় তিনি— যিনি তাঁর বান্দাকে রজনীযোগে গমন করিয়েছিলেন মসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসায়। যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বরকতময় তাকে আমার নিদর্শন দেখানোর জন্যে। তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্ৰষ্টা” (১৭ : ১)।

কোন অসাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন বর্ণনার সময় তাসবীহ বা আল্লাহর পবিত্ৰতা ঘোষণা করা হয়। তাতে বুঝা যায় যে, মি’রাজ সংঘটিত হয়েছিল সশরীরে। তা ছাড়া দেহ ও রূহ-এর সমন্বিত অবস্থার ক্ষেত্রেই কেবল আবদ বা বান্দা শব্দ প্রযোজ্য। উপরন্তু ওই মি’রাজ যদি নিদ্রিত অবস্থায় হয়ে থাকত, তবে কাফিরগণ তখনই তা অস্বীকার করত না এবং সেটিকে অসম্ভবও মনে করত না। কারণ নিদ্রার মধ্যে এরূপ কিছু দেখা কোন আশ্চর্যের বিষয় নয়। এরপর প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) সজাগ অবস্থায় সশরীরে মি’রাজে গিয়েছেন বলে তাদেরকে জানিয়েছিলেন, নিদ্রার মধ্যে নয়। বর্ণনাকারী শুরায়ক সূত্রে হযরত আনাস (রা)-এর বর্ণিত হাদীছে আছে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন :

اساتیقظات فاذا آنافی الحجرতারপর আমি সজাগ হলাম এবং দেখলাম। আমি কা’বার হাতীমে অবস্থান করছি বস্তুত এটি বর্ণনাকারী শুরায়কের ভুল বর্ণনাগুলোর অন্তর্ভুক্ত। অথবা এটা বলা হবে যে, এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরকে তিনি “সজাগ হওয়া” বলেছেন। হযরত আইশা (রা)-এর বর্ণিত হাদীছে। এরূপ মর্ম ধরে নেয়া হয়েছে। হযরত আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাইফে গেলেন। তাইফের লোকেরা তাকে প্রত্যাখ্যান করল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, আমি চরম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে ফিরে আসলাম। তারপর আমি সজাগ হলাম। কারণ আল-ছা আলিব নামক

স্থানে এসে। আবু উসায়দ-এর হাদীছে আছে যে, তিনি তাঁর পুত্রকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট নিয়ে এসেছিলেন তার মুখে প্রথম খাবার দেয়ার জন্যে। তিনি তাঁর পুত্রকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কোলে রাখলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) লোকজনের সাথে আলাপচারিতায় মগ্ন ছিলেন। ইতোমধ্যে আবু উসায়দ তাঁর পুত্রকে সেখান থেকে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন। এবার রাসূলুল্লাহ্ (সা) সজাগ হলেন। কিন্তু শিশুটিকে দেখতে পেলেন না। জিজ্ঞাসাবাদে লোকজন বলল যে, শিশুটির পিতা তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। তখন তিনি ওই শিশুটির নাম রাখলেন মুনযির। বস্তৃত উপরোক্ত হাদীছসমূহে শুরায়কের ভুল বলার চাইতে সজাগ হওয়া অর্থ “সনিৎ ফিরে পাওয়া ও সচকিত হওয়া” নেয়াই উত্তম। আল্লাহই ভাল জানেন।

ইবন ইসহাক……. হযরত আইশা (রা) বলতেন যে, ما فقد جسد رسول اللّه صلّى اللّه عليه وسلّم ولكن اللّه أسرى بروحها রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দেহ দুনিয়া থেকে স্থানান্তরিত হয়নি। বরং আল্লাহ্ তা’আলা রূহানীভাবে অর্থাৎ তাঁর রূহকে রাত্রি ভ্রমণে নিয়ে গিয়েছিলেন। ইবন ইসহাক আরো বলেন যে, ইয়াকুব ইবন উতবা আমাকে জানিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মি’রাজ সম্পর্কে মুআবিয়া (রা)-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন যে, সেটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য স্বপ্ন।

ইবন ইসহাক বলেন, তাদের দু’জনের কথাও অগ্রাহ্য করার মত নয়। কারণ হাসান (র)। বলেছেন :

و ما جعلنا الرعايا التى أريناك الأفتنة للناس – আয়াতটি মি’রাজ সম্পর্কে নাযিল হয়েছিল এবং যেমনটি ইবরাহীম (আ) বলেছিলেন

یا بنی انی آری فی المنام آنی آذبحالتহে প্রিয় পুত্র! আমি তো স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যাবাহ করছি (৩৭ : ১০২)। হাদীছে আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন :

تنام عینی و قلبی یقظان “আমার চোখ নিদ্রামগ্ন হয়। কিন্ত অন্তর থাকে সজাগা”। ইবন ইসহাক বলেন, মূলত কী ঘটেছিল তা আল্লাহ তা’আলা-ই-ভােল জানেন। বস্তুত তাঁর

মি’রাজ সংঘটিত হয়েছে এবং আল্লাহর যে সকল কুদরত তাঁর দেখার তা তিনি দেখেছেন। সেটি ঘুমের মধ্যে হোক আর সজাগ অবস্থায়ই হোক তার সবই সত্যও যথার্থ।

আমি বলি, ইবন ইসহাক এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছেন। তিনি বরং উভয়টাই সম্ভব বলে মনে করেন। তবে আমি বলি যে, মি’রাজ সংঘটিত হয়েছিল সজাগ অবস্থায় তাতে কোন সন্দেহ-সংশয় নেই। এ সম্পর্কিত দলীলাদি পূর্বে আলোচিত হয়েছে। “রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দেহ স্থানান্তরিত হয়নি এবং তার রাত্রি ভ্রমণ রূহানী ভাবে হয়েছে”। হযরত আইশা (রা)-এর এই মন্তব্যও এটা প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মি’রাজ হয়েছিল

নিদ্রিত অবস্থায় স্বপ্নযোগে, যেমনটি ইবন ইসহাক মনে করেছেন। বরং রূহানী ভাবে মি’রাজ সংঘটিত হলেও নিশ্চিতভাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তখন সজাগ ছিলেন— নিদ্রিত নয়। তিনি বুরাকে আরোহণ করেছেন। বায়তুল মুকাদাসে গিয়েছেন, আকাশে আরোহণ করেছেন এবং যা দেখেছেন তা’ সজাগভাবে দেখেছেন, স্বপ্নে নয়। হযরত আইশা (রা) ও তার মতের সমর্থকগণ সম্ভবত এটিই বুঝিয়েছেন। ইবন ইসহাক যে নিদ্রিত অবস্থায় বুঝেছেন তা’ তাদের উদ্দিষ্ট নয় } আল্লাহই ভাল জনেন।

জ্ঞাতব্য : মি’রাজ গমনের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সা) হয়তো স্বপ্ন দেখেছিলেন তা আমরা অস্বীকার করি না। কারণ, তিনি যে সব স্বপ্ন দেখতেন তা পরে ভোরের আলোর মত বাস্তব রূপে দেখা যেতো। ইতোপূর্বে ওহী নাযিলের সূচনা বিষয়ক হাদীছে আলোচিত হয়েছে যে, ওহী সম্পর্কে যে ঘটনা ঘটেছে তা ঘটার পূর্বে তিনি তা স্বপ্নে দেখেছিলেন। এ স্বপ্ন ছিল তার পরবতী কর্মের ভিত্তি, ভূমিকা, পূর্বাভাস ও প্রস্তুতি স্বরূপ।

উলামায়ে কিরাম এ বিষয়ে মত দ্বৈধতা প্রকাশ করেছেন যে, বায়তুল মুকাদাস পর্যন্ত রাত্রি ভ্রমণ এবং মি’রাজ বা উর্ধ্বগমন দুটো একই রাতে ঘটেছে, নাকি দুটো ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন দু’রাতে ঘটেছে?

তাদের একদল বলেন যে, বায়তুল মুকাদাস পর্যন্ত ভ্ৰমণ হয়েছিল সজাগ অবস্থায় আর মি’রাজ বা উৰ্ধগমন হয়েছিল স্বপ্নে। মুহাল্লাব ইবন আবু সাফরা তাঁর রচিত। সহীহ বুখারীর . ভাষ্যগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, একদল বিশ্লেষক বলেছেন ইসরা বা রাত্ৰিভ্ৰমণ সংঘটিত হয়েছিল দু’বার–একবার নিদ্রিত অবস্থায় রূহানীভাবে আর একবার সশরীরে সজাগ অবস্থায়।

হাফিয আবুল কাসিম সুহায়লী তাঁর শায়খ আবু বকর ইবনুল আরাবী আল-ফকীহ থেকে অনুরূপ অভিমত বৰ্ণনা করেছেন। সুহায়লী বলেন, এই মন্তব্যের মাধ্যমে এ বিষয়ে বর্ণিত সকল প্রকারের হাদীছের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা যায়। কারণ শুরায়ক সূত্রে হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, “এটি হল তেমন যে, তার অন্তকরণ সজাগ থাকে, চক্ষুদ্বয় ঘুমায় কিন্তু অন্তর ঘুমায় না।” রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মন্তব্য তারপর আমি সজাগ হলাম এবং নিজেকে কাবাঘরের হাতীম অংশে দেখতে পেলাম” সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি দ্বারা ব্যাপারটি স্বপ্নযোগে ঘটেছিল তা বুঝা যায়। অন্যান্য হাদীছ দ্বারা বুঝা যায় যে, তিনি তখন সজাগ ছিলেন। কেউ কেউ একথা দাবী করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সজাগ অবস্থায় একাধিকবার ইসরা বা রাত্রিভ্রমণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এমনকি কারো কারো মন্তব্য এমন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) চার বার মি’রাজে গিয়েছেন। মদীনায় আসার পরও তার মিরাজ সংঘটিত হয়েছে। এ সকল হাদীছের মধ্যে সমন্বয় সাধন হিসেবে শায়খ শিহাবুদ্দীন আবু শামা (র) বলেছেন যে, মি’রাজ সর্বমোট তিনবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। একবার বুরাকযোগে মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদাস পর্যন্ত। একবার বুরাকযোগে মক্কা থেকে সরাসরি উর্ধাকাশ পর্যন্ত, যা হুযায়ফা (রা)-এর হাদীস থেকে প্রতীয়মান হয়। আর একবার মক্কা থেকে রায়তুল মুকাদাস হয়ে উৰ্ব্বকাশ পর্যন্ত। এ প্রেক্ষিতে আমরা বলি যে, হাদীছে বর্ণিত শব্দের বিভিন্নতার প্রেক্ষিতে যদি এ মন্তব্য করা হয়, তবে দেখা যাবে যে,

হাদীছে বর্ণিত প্রকৃত অবস্থা তিনের অধিক। এ ব্যাপারে যারা পরিপূর্ণভাবে অবগত হতে চান, তারা যেন আমার তাফসীর গ্রন্থে

سبحان الذى أسرى بعبده الليلاً من المسجد الحرام الى المسجد الأقصى – আয়াতের ব্যাখ্যা দেখে নেন। পক্ষান্তরে কোন বর্ণনায় বায়তুল মুকাদাস গমনের উল্লেখ কোন বর্ণনায় আকাশে আরোহণের উল্লেখের প্রেক্ষিতে যদি এই প্রকারভেদ করা হয়, তবে কোন স্পষ্ট প্রমাণ ব্যতিরেকে এমন প্রকারভেদ মেনে নেয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। আল্লাহই ভাল জানেন।

আশ্চর্য ব্যাপার এই যে, ইমাম বুখারী (র) প্রিয়নবী (সা)-এর ইসরা বা রাত্রিভ্রমণের ঘটনা উল্লেখ করেছেন আবু তালিবের মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করার পর। এব্যাপারে তিনি ইবন ইসহাকের অনুসরণ করেছেন যে, ইবন ইসহাক মি’রাজের ঘটনা উল্লেখ করেছেন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মক্কী জীবনের শেষ দিকের কর্মকাণ্ডের মধ্যে! কিন্তু এ ঘটনাকে আবু তালিবের ইনতিকালের পরে উল্লেখ করে তিনি ইবন ইসহাকের বিপবীত কাজ করেছেন। কারণ ইবন ইসহাক আবু তালিবের ইনতিকালের ঘটনা উল্লেখ করেছেন মিরাজের ঘটনা উল্লেখ করার পর। মূলতঃ মক্কী ঘটেছিল তা’ আল্লাহই ভাল জানেন।

মোদ্দাকথা, ইমাম বুখারী (র) ইসরা (রাত্ৰিভ্ৰমণ) ও মি’রাজ (উর্ধ্বারোহণ) এ দুয়ের মাঝে

পার্থক্য করেছেন এবং পৃথক অধ্যায়ে তা বিন্যস্ত করেছেন। এ সূত্রে তিনি বলেছেন, “ইসরা বিষয়ক হাদীছ এবং আল্লাহ তা’আলার বাণী :

سببخن الذی استری بعبده لیلا–

সম্পর্কিত অধ্যায়

ইয়াহয়া ইবন বুকায়ার…….. জাবির ইবন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি শুনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন : لما كذبتنى فريش كنت فى الحجر فجلّى اللّة إلى بيت المقدّس فطفقت

احیث هم عن ابیاتم وأنا أنظر اليه –

কুরায়শের লোকেরা যখন আমাকে মিথ্যাবাদী ঠাওরিয়েছিল, তখন আমি কা’বা গৃহের হাতীম অংশে ছিলাম। আল্লাহ্ তা’আলা আমার নিকট বায়তুল মুকাদ্দাসকে দৃশ্যমান করে দিলেন। ফলে সেটি দেখে দেখে সেটির নিদর্শনসমূহ সম্পর্কে আমি তাদেরকে অবহিত করতে লাগলাম। ইমাম মুসলিম, তিরমিয়ী, নাসাঈ (র) যুহরীর মাধ্যমে আবু সালামা সূত্রে হযরত জাবির (রা) থেকে এ হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। তদুপরি ইমাম মুসলিম, নাসাঈ ও তিরমিয়ী (র) আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে নবী করীম (সা) থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

এরপর ইমাম বুখারী (র) মি’রাজোর হাদীছ অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন যে, হুদবা… মালিক ইবন সা’সাআ থেকে বর্ণিত রাত্রিভ্রমণের রাতটি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের নিকট

বর্ণনা করেছেন যে, আমি কা’বা গৃহের হাতীম অংশে শায়িত ছিলাম। কখনাে কখনাে তিনি হাতীম শব্দের পরিবর্তে হিজর শব্দ ব্যবহার করেছেন। হঠাৎ এক আগন্তুক আমার নিকট এসে উপস্থিত হন এবং এখান থেকে ওখান পর্যন্ত চিরে ফেলেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমার পাশে জারূদ নামের এক ব্যক্তি ছিলেন। আমি তাকে বললাম, “এখান থেকে ওখান পর্যন্ত” দ্বারা কী বুঝানো হয়েছে? উত্তরে তিনি বললেন, এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কণ্ঠনালীর গোড়া থেকে নাভি পর্যন্ত অংশ বুঝানাে হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বর্ণনা এই : এরপর তিনি আমার হৃৎপিণ্ড বের করে আনেন। তিনি আমার নিকট একটি ঈমানভর্তি স্বর্ণপাত্র নিয়ে আসেন এবং তা দ্বারা আমার হৃৎপিণ্ড ধুয়ে দেন। তারপর তা যথাস্থানে রেখে দেন এবং আমার দেহ পূর্বের ন্যায় করে দেন। এবার আমার নিকট একটি বাহন উপস্থিত করা হয়। সেটি ছিল আকারে খচ্চরের চেয়ে ছােট এবং গাধার চেয়ে বড়। সেটির রং ছিল সাদা। বর্ণনাকারী জারূদ বললেন, হে আবু হামযা সেটি কি বুরাক? আনাস (রা) বললেন, হ্যা, সেটি বুরাক। সেটি তার পা রাখে দৃষ্টির শেষ সীমায়। আমি সেটিতে আরোহণ করি। হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমাকে নিয়ে চললেন। প্রথম আকাশে পৌঁছে তিনি দরজা খুলতে বললেন। প্রশ্ন করা হল, আপনি কে? “আমি। জিবরাঈল”। তিনি উত্তর দিলেন। পুনঃ প্রশ্ন করা হল, আপনার সাথে কে আছেন? উত্তরে বললেন, সাথে আছেন মুহাম্মদ (সা)। বলা হল, তাকে নিয়ে আসার জন্যে কি পাঠানো হয়েছিল? জিবরাঈল (আঃ) বললেন, : হ্যা, তাই। বলা হল, তবে তাকে সাদর অভিনন্দন, কতই না উত্তম। আগন্তুক তিনি!” এরপর দরজা খুলে দেয়া হল। উপরে উঠে দেখতে পাই সেখানে হযরত আদম (আ) রয়েছেন। জিবরাঈল (আঃ) বললেন, ইনি আপনার পিতা আদম, তাকে সালাম দিন। আমি সালাম দিলাম। তিনি সালামের উত্তর দিলেন, এবং বললেন “সুস্বাগতম সুসন্তানের প্রতি, সৎকর্মশীল নবীর প্রতি।”

এবার জিবরাঈল (আঃ) আমাকে নিয়ে দ্বিতীয় আকাশে আসলেন। তিনি দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি জিবরাঈল (আ)। বলা হল, “আপনার সাথে কে? তিনি বলেন, সাথে আছেন মুহাম্মদ (সা)। বলা হল, তাকে নিয়ে আমার জন্যে কি পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যা, তাই। বলা হল, “তৰে তাকে সুস্বাগতম, কত উত্তম আগন্তুক তিনি। এরপর দরজা খুলে দেয়া হল। উপরে উঠে আমি দেখতে পেলাম হযরত ঈসা। (আ) ও ইয়াহইয়া (আঃ)-কে। তারা দু’জনে খালাত ভাই। জিবরাঈল (আঃ) বললেন, ইনি ইয়াহইয়া এবং উনি হচ্ছেন ঈসা (আ), আপনি ওঁদেরকে সালাম দিন। আমি সালাম দিলাম। তারা সালামের উত্তর দিলেন। তারা বললেন, সুস্বাগতম সৎকর্মশীল ভাইকে! সুস্বাগতম সৎকর্মশীল নবীকে! এবার জিবরাঈল (আঃ) আমাকে নিয়ে তৃতীয় আকাশ পর্যন্ত উঠলেন। তিনি দরজা খুলতে বললেন, বলা হল আপনি কে? “আমি জিবরাঈল, তিনি উত্তর দিলেন। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, সাথে আছেন মুহাম্মদ (সা)। বলা হল কি নিয়ে আমার জন্যে সংবাদ পাঠানো হয়েছিল? জিবরাঈল (আঃ) বললেন, “হ্যা, তাই।” বলা হল, সুস্বাগতম তাকে। কত উত্তম আগন্তুক তিনি। “এরপর দরজা খোলা হল। উপরে উঠে আমি দেখতে পেলাম হযরত ইউসুফ (আ:)-কে। জিবরাঈল (আঃ) বললেন, ইনি ইউসুফ (আ), তাকে সালাম

দিন! আমি তাকে সালাম দিলাম। তিনি সালামের উত্তর দিলেন এবং বললেন, “সুস্বাগতম সৎকর্মশীল ভাই ও সৎকর্মশীল নবীকে ৷” এবার জিবরাঈল (আঃ) আমাকে নিয়ে উঠলেন :র্থ আকাশে। তিনি দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি জিবরাঈল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, “আমার সাথে মুহাম্মদ (সা) রয়েছেন। বলা হল, তাকে নিয়ে আসার জন্যে কি পাঠানো হয়েছিল? জিবরাঈল (আ) বললেন,” হ্যা তাই বটে।” বলা হল, সুস্বাগতম। তাকে। কত উত্তম আগন্তুকই না। তিনি। উপরে উঠে আমি দেখতে পেলাম হযরত ইদরীস (আ:)-কে। জিবরাঈল (আঃ) বললেন, “ইনি হলেন ইদরীস (আ), তাকে সালাম দিন! আমি সালাম দিলাম; তিনি সালামের উত্তর দিলেন এবং বললেন, সুস্বাগতম সৎকর্মশীল ভাইকে এবং সৎকর্মশীল নবীকে ৷” এবার জিবরাঈল (আ) আমাকে নিয়ে ৫ম আকাশের দ্বারপ্রান্তে আরোহণ করলেন। তিনি দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, “আমি জিবরাঈল। বলা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, আমার সঙ্গে রয়েছেন মুহাম্মদ (সা)। বলা হল, তাকে নিয়ে আসার জন্যে কি পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যা, তাই বটে। বলা হল, সুস্বাগতম তাকে কতই না উত্তম আগন্তুক তিনি! উপরে উঠে দেখলাম সেখানে হারূন (আঃ) রয়েছেন। জিবরাঈল (আঃ) বললেন, ইনি হারূন (আ), তাকে সালাম দিন। আমি সালাম দিলাম। তিনি সালামের উত্তর দিলেন। তারপর বললেন, সুস্বাগতম সৎকর্মশীল ভাই ও সৎকর্মশীল নবীকে। এবার জিবরাঈল (আঃ) আমাকে নিয়ে ৬ষ্ঠ আকাশ পর্যন্ত উঠে এলেন। তিনি দরজা খুলতে বললেন। বলা হল আপনি কে? তিনি বললেন, আমি জিবরাঈল। বলা হল, আপনার সঙ্গে কে? বললেন, সাথে হযরত মুহাম্মদ (সা)। বলা হল, তাকে নিয়ে আসার জন্যে কি পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যা তাই বটে। বলা হল, সুস্বাগতম। তাকে কতইনা উত্তম আগন্তুক তিনি! উপরে উঠে দেখলাম সেখানে হযরত মূসা (আ) রয়েছেন। জিবরাঈল (আঃ) বললেন, ইনি মূসা (আ), তাকে সালাম দিন। আমি তাকে সালাম দিলাম। তিনি সালামের উত্তর দিলেন এবং বললেন, সুস্বাগতম সৎকর্মশীল ভাইকে এবং সৎকর্মশীল নবীকে। আমি যখন তাঁকে অতিক্রম করলাম, তখন তিনি কেঁদে ফেললেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হল, কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন কাঁদছি এ জন্যে যে, এই স্বল্প বয়সী নবী, আমার পরে তিনি প্রেরিত হয়েছেন। অথচ আমার উন্মতের চাইতে তার উম্মত অধিক সংখ্যায়।

জান্নাতে যাবে।

এবার জিবরাঈল (আঃ) আমাকে নিয়ে ৭ম আকাশ পর্যন্ত এলেন। তিনি দারযা খুলতে বললেন। বলা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি জিবরাঈল। বলা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, আমার সঙ্গে আছেন মুহাম্মদ (সা)। বলা হল, তাকে নিয়ে আসার জন্যে কী পাঠানাে হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যা, তাই বটে। বলা হল, সুস্বাগতম তাঁকে, কত উত্তম আগন্তুকই না। তিনি। উপরে উঠে দেখি সেখানে হযরত ইবরাহীম (আ:)। জিবরাঈল (আ.) বললেন, ইনি আপনার পূর্বপুরুষ ইবরাহীম (আ), তাকে সালাম দিন! আমি তাকে সালাম

১. মূল আরবী পাঠে ৫ম আকাশে হযরত হারূন (আ.)-এর উল্লেখ বাদ পড়েছে। সম্ভবত এটি মুদ্রণ প্রমাদ।

সম্পাদকদ্বয়

দিলাম। তিনি সালামের উত্তর দিলেন। তারপর বললেন, সুস্বাগতম সৎকর্মশীল সন্তান ও সৎকর্মশীল নবীকে। এবার আমাকে উঠানাে হল সিদরাতুল মুনতাহা তথা সীমান্তের কুল বৃক্ষের নিকট। সেখানে :টি নদী। দুটো বাহিরে, দুটো ভেতরে। আমি বললাম, জিবরাঈল! এ গুলো কী? তিনি বললেন, ভেতরের দুটো নদী বেহেশতের মধ্যে প্রবহমান আর বাইরের দুটো হল নীল নদী ও ফোরাত নদী। এবার আমাকে নেয়া হল বায়তুল মামুরে। প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতা তার মধ্যে প্রবেশ করেন। এরপর আমার নিকট হাযির করা হল একপাত্ৰ মদ, একপাত্র দুধ ও একপাত্ৰ মধু। আমি দুধের পাত্ৰটি বেছে নিলাম। জিবরাঈল (আঃ) বললেন, এটি ফিতরাত ও সঠিক প্রকৃতির প্রতীক, যা আপনার মধ্যে এবং আপনার উম্মতের মধ্যে রয়েছে। এরপর আল্লাহ তা’আলা আমার উপর প্রত্যহ ৫০ ওয়াকত নামায ফরয করলেন। আমি ফিরে আসছিলাম। আসার পথে দেখা হয়। হযরত মূসা (আ:)-এর সাথে। তিনি বললেন আপনাকে কী নির্দেশ দেয়া হয়েছে? আমি বললাম, প্রত্যহ ৫০ ওয়াকত নামায আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি বললেন, আপনার উন্মত তো প্রতিদিন ৫০ ওয়াকত নামায আদায় করতে পারবে না। আল্লাহর কসম, আপনার পূর্বে মানুষ সম্পর্কে আমি অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি এবং বনী ইসরাঈলের লোকদের সাথে আমি সরাসরি মেলামেশা করেছি। আপনি বরং আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যান এবং আপনার উম্মতের জন্যে আরো সহজ বিধানের প্রার্থনা জানান। আমি প্রতিপালকের নিকট ফিরে গেলাম। তিনি দশ ওয়াকত কমিয়ে দিলেন। আমি ফিরে এলাম হযরত মূসা (আঃ)–এর নিকট। তিনি আমাকে পূর্বের ন্যায় পরামর্শ দিলেন। আমি পুনরায় গেলাম প্রতিপালকের নিকট। এবার তিনি আরো ১০ ওয়াকত কমিয়ে দিলেন। আমি ফিরে এলাম হযরত মূসা (আঃ)-এর নিকট। তিনি পূর্বের ন্যায় বললেন। আমি ফিরে গেলাম প্রতিপালকের নিকট। এবার তিনি আরো ১০ ওয়াকত কমিয়ে দিলেন। আমি পুনরায় ফিরে এলাম মূসা (আ:)-এর নিকট। তিনি পূর্বের ন্যায় বললেন। আমি পুনরায় গেলাম প্রতিপালকের নিকট। এবার আমাকে নির্দেশ দেয়া হল প্রতিদিন ১০ ওয়াকত নামায আদায় করার জন্যে। আমি ফিরে এলাম মূসা (আ:)-এর নিকট। তিনি পূর্বের ন্যায় বললেন। আমি আবার ফিরে গেলাম প্রতিপালকের নিকট। এবার আমাকে নির্দেশ দেয়া হল প্রতিদিন পাচ ওয়াকত নামায আদায় করার জন্যে। আমি ফিরে এলাম মূসা (আ:)-এর নিকট। তিনি বললেন, কী আদেশ দেয়া হয়েছে? আমি বললাম, আমাকে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াকত নামায আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মূসা (আ) বললেন, আপনার উম্মত দৈনিক পাঁচ ওয়াকত নামায আদায় করতে সক্ষম হবে না। আপনার পূর্বে আমি মানুষ সম্পর্কে প্রচুর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি এবং বনী ইসরাঈলের লোকদের সাথে আমি সরাসরি মেলামেশা করেছি। সুতরাং আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যান এবং আপনার উম্মতের জন্যে আরো সহজ করে দেয়ার প্রার্থনা জানান। আমি বললাম, আমি আমার প্রতিপালকের নিকট অনেক প্রার্থনা করেছি। আবার প্রার্থনা করতে আমি লজ্জাবোধ করছি। আমি বরং এই নির্দেশের প্রতি আমার সন্তুষ্টি প্রকাশ করছি এবং তা মেনে নিচ্ছি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, আমি যখন মূসা (আ:)-কে অতিক্রম করে এলাম, তখন একটি ঘোষণা শুনতে পেলাম, “আমি আমার ফরয ও কর্তব্য নির্ধারণ করে দিয়েছি। এবং আমার বান্দাদের বােঝা লাঘব করে দিয়েছি। ইমাম বুখারী (র) এ স্থলে এ হাদীছটি বর্ণনা করেছেন।

ইমাম বুখারী (র) তার সহীহ গ্রন্থের অন্যত্ৰ ইমাম মুসলিম, ইমাম তিরমিয়ী ও ইমাম নাসাঈ (র) বিভিন্ন সনদে কাতাদার মাধ্যমে আনাস (রা) সূত্রে মালিক ইবন সা’সাআ থেকে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। আমরা আনাস ইবন মালিক সূত্রে উবায় ইবন কাআব (রা) থেকে আবার আনাস ইবন মালিক সূত্রে আবু যর (রা) থেকে এবং আরো একাধিক সনদে আনাস ইবন মালিক থেকে হাদীছখানা উদ্ধৃত করেছি। তাফসীর গ্রন্থে আমি সবিস্তারে সেগুলো উল্লেখ করেছি। আলোচ্য হাদীছে বায়তুল মুকাদাসের কথা উল্লেখ করা হয়নি। এর কারণ হিসেবে বলা যায় যে, ওই বিষয়টি সুপ্ৰসিদ্ধ এবং সর্বজন বিদিত হওয়ায় কোন কোন বর্ণনাকারী তা বাদ দিয়েছেন অথবা সংশ্লিষ্ট বর্ণনাকারী হাদীছের ওই অংশটি ভুলে গিয়েছেন। অথবা তার নিকট যে অংশটি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, সে অংশটি উল্লেখ করেছেন। অথবা অবস্থাভেদে বর্ণনাকারী হাদীছ বিস্তারিত ও পরিপূর্ণ ভাবে বর্ণনা করেছেন আবার শ্রোতার জন্যে যে অংশটি অধিকতর কল্যাণকর সেটি রেখে বাকীটি বাদ দিয়েছেন। যারা বলে যে, পৃথক পৃথক ঘটনার প্রেক্ষিতে বর্ণনার বিভিন্নতা হয়েছে, তাদের কথা সত্য থেকে বহুদূরে। বস্তুত ঘটনা ঘটেছে মাত্র একটাই। কারণ, প্রত্যেক বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক নবীগণকে সালাম দেয়ার উল্লেখ আছে। প্রত্যেক বৰ্ণনায় নবীগণের সাথে তার পরিচিত হওয়ার কথা উল্লেখ আছে এবং প্রত্যেক বৰ্ণনায় নামায ফরয হওয়ার কথা উল্লেখ আছে। তাহলে এ প্রকারের ঘটনা একাধিকবার সংঘটিত হওয়া কেমন করে সম্ভব? একাধিকবার সংঘটিত হওয়া অসম্ভব ও অবাস্তব। আল্লাহই ভাল জানেন।

এরপর ইমাম বুখাবী (র) বলেছেন, হুমায়াদী ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। আল্লাহ তা’আলার বাণী :

و ما جعلنا الرايا التى أريناك الأفتنة للناس –

(আমি যে দৃশ্য আপনাকে দেখিয়েছি, তা কেবল মানুষের পরীক্ষার জন্যে) সম্পর্কে তিনি বলেছেন, এটি স্বচক্ষে দেখা ঘটনা। বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত মি’রাজের রাতে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে তা দেখানাে হয়েছে। কুরআনে উল্লিখিত অভিশপ্ত বৃক্ষ সম্পর্কে তিনি বলেন, সেটি হল যাকুম বৃক্ষ।

পরিচ্ছেদ

শব-ই মি’রাজের পরের দিন জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট মধ্যাহ্নের পরপরই এসেছিলেন। তিনি নামাযের নিয়ম-কানুন ও সময় সবিস্তারে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জানিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও সাহাবীগণকে একত্রিত হওয়ার জন্যে বললেন। সবাই একত্রিত হলেন। জিবরাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহ (সা)-কে নিয়ে পরের দিন সকাল পর্যন্ত নির্ধারিত নামান্যগুলো আদায় করলেন। মুসলমানগণ রাসূলুল্লাহ (সা)-এর অনুসরণ করছিলেন আর তিনি অনুসরণ করছিলেন জিবরাঈল (আ.)-এর। এ প্রসংগে ইবন আব্বাস ও জাবির (র” ) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন :

امنی جبرانیل عند البیت مرتین–

-س–ه

“জিবরাঈল দু’বার আমার ইমামতি করেছেন বায়তুল্লাহ শরীফের নিকট।”

দু’বার তিনি নামায্যের শুরু ওয়াকত ও শেষ ওয়াকত সম্পর্কে অবগত করিয়েছেন। সুতরাং শুরু ও শেষ এবং এ দুয়ের মধ্যবর্তী সময়টুকু নামাযের সময় বলে গণ্য হয়। কিন্তু মাগরিবের সময় বর্ণনায় তিনি এরূপ ব্যাপ্ত ও বিস্তৃত সময়ের শিক্ষা দেননি সহীহ মুসলিমে উল্লিখিত হযরত আবু মূসা, বুরায়দা ও আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা)-এর হাদীছ থেকে তা জানা যায়।

করেছি। সকল প্ৰশংসা আল্লাহর জন্যে। সহীহ বুখারীতে উল্লিখিত আছে যে, মামার… আইশা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, প্রথম নামায ফরয হয়েছিল দু’ রাকাআত করে। পরবতীতে সফরকালীন নামায তা-ই থেকে যায় আর মুকীম ও স্থানীয় অধিবাসীর নামাযে রাকাআতের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। যুহরী সূত্রে ইমাম আওযাঈ এবং মাসরূক সূত্রে ইমাম শা’বী হযরত আইশা (রা) থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। এরূপ বর্ণনায়ু সমস্যা সৃষ্টি হয় বটে। কারণ, হযরত আইশা (রা) সফর অবস্থায় পূর্ণ নামায আদায় করতেন যা তার বর্ণিত হাদীছের বিপরীত। হযরত উছমান (রা)-ও তাই করতেন। আল্লাহ তা’আলার বাণী :

و اذا ضرباتم فی الار ضد فلیس علیکم جناح آن تقصر وا من الصلوةان خفتم

. . . . . . . . . ان بیفتنکم الذین کفر و با যখন তোমরা দেশ-বিদেশ সফর করবে, তখন যদি তোমাদের আশংকা হয় যে, কাফিরগণ তোমাদের জন্যে ফিতনা সৃষ্টি করবে, তবে নামায সংক্ষিপ্ত করলে তোমাদের কোন দােষ নেই (৪ : ১০১)। আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীর গ্রন্থে আমি এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

বায়হাকী বলেন, হাসান বসরী এই অভিমত পোষণ করেন যে, মুকীমের নামায শুরু থেকেই চার রাকাআত করে ফরয করা হয়েছে। এ প্রসংগে তিনি একটি মুরসাল হাদীছ বৰ্ণনা করেছেন যে, শব-ই-মি’রাজের পরবতী দিন রাসূলুল্লাহ (সা) যুহরী ও আসরের নামায আদায় করেছেন চার রাকাআত করে। মাগরিব তিন রাকাআত, তন্মধ্যে প্রথম দু’রাকআতে উচ্চৈঃস্বরে কিরাআত পাঠ করেছেন। ইশার নামায আদায় করেছেন চার রাকাআত।

তন্মধ্যে প্রথম দু’রাকাআত কিরাআতে পাঠ করেছেন উচ্চৈঃস্বরে। ফজর আদায় করেছেন দুরাকাআত, উভয় রাকাআতে উচ্চৈঃস্বরে কিরাআত পাঠ করেছেন।

আমি বলি, হযরত আইশা (রা) তার উপরোল্লিখিত বক্তব্য দ্বারা সম্ভবত একথা বুঝিয়েছেন যে, শব-ই-মি’রাজের পূর্ব পর্যন্ত নামায ছিল দুরাকাআত দুরাকাআত। তারপর যখন পাঁচ ওয়াকত নামায ফরয হল, তখন মুকীমদের জন্যে এখন যে বিধান কার্যকর অর্থাৎ পূর্ণ নামায আদায় করা সে হিসাবেই ফরয হল। আর সফর অবস্থায় দুরাকাআত করে আদায়ের অনুমতি দেয়া হল। যেমনটি পাঁচ ওয়াকত ফরয হওয়ার পূর্বে ছিল। এ ব্যাখ্যানুসারে হযরত আইশা (রা)-এর বর্ণনা নিয়ে কোন সমস্যা থাকে না। আল্লাহই ভাল জানেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *