১৬. দক্ষ-যজ্ঞ

ষোড়শ অধ্যায় – দক্ষ-যজ্ঞ

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–সতী-সহচর শম্ভু সুবর্ণ-রজতে বিচিত্র, রত্নকন্দর শোভিত, বাল-সূৰ্যসন্নিভ, তুঙ্গশিখরে সমাগত হইলেন। ১

তথায় স্ফটিক-প্রস্তরময়, হরিত-বৃক্ষরাজি-শোভিত, বিচিত্র-কুসুমিত লতা ও সরোবরযুক্ত গিরিরাজ নগরী-সন্নিহিত শিখরাংশে বৃষধ্বজ সতীসহ বহুদিন বিহার করিলেন। ২

তথায় কমল বিকসিত, নীলোৎপল প্রস্ফুটিত, ফুল, কুসুমিত দ্রুমদল বিটপে অলিকুল গুঞ্জরিত; চক্রবাক, কলহংস, হংস, মদগু, মত্ত সারস, বক ও ময়ূরগণের শব্দ ও পুংস্কোকিল-কুলের মধুর কলম্বনে সতত শব্দময়,-মৃগগণ সেবিত, কিন্নর, কিন্নরী, সিদ্ধ, অপ্সরা, যক্ষ, বিদ্যাধরী ও দেবগণের বিহার-ভূমি, পাৰ্বতীয় কন্যা ও পুরন্ধ্রিবর্গে পরিবৃত সেই শিখরদেশে বীণাতন্ত্রীর মৃদুমধুর ঝঙ্কার-মিশ্ৰিত মৃদঙ্গ পটহ শব্দের সঙ্গে অপ্সরাগণের সকৌতুক নৃত্য, সুগন্ধবতী অপার্থিব লতা এবং উর্ধ্ব-ফুল্ল কুসুমরাজি-সংবৃত নিকুঞ্জাবলী;-শোভার এক শেষ। ৩-৮

এই সুশোভন স্বর্গতুল্য স্থানে শঙ্কর, দিবমানের দশ সহস্র বৎসর সতীসহ সানন্দে বিহার করিলেন। ৯

শঙ্কর কখন কৈলাসে যাইলেন, কখন দেবদেবীপরিবৃত সুমেরু-শিখরে যাইলেন। ১০

কখন দিকপালগণের উদ্যান-কাননে গমন করিলেন, কখন বা পৃথিবীতলে যাইলেন; এইরূপ নানাস্থানে গিয়া তথায় তথায় সতীসহ অত্যন্ত বিহার করিলেন। ১১

সতীগত-চিত্ত মহাদেবের দিবা রাত্রি জ্ঞান হয় নাই; বেদ তপস্যা ও শমদমাদি মনে পড়ে নাই; কেবল সতীর প্রীতিবিধানই তাহার কর্তব্য কাৰ্য্য হইল। ১২

সতী, সকল স্থানে সকল সময়ে একমাত্র শিবমুখই দেখিতে লাগিলেন; মহাদেবও সর্বদা সৰ্বত্ৰ কেবল দাক্ষায়ণীর বদনমণ্ডলই দেখিতে লাগিলেন। ১৩

শিব-দাঙ্গায়ণী এইরূপ পরস্পর সংসর্গে ভাব-জলসেচন দ্বারা পরস্পরের অনুরাগ-বৃক্ষ বর্ধিত করিতে লাগিলেন। ১৪

এই সময়ে ত্রিভুবনহিতকারী দক্ষ, সৰ্ব্ব-জীবন মহাযজ্ঞ করিতে আরম্ভ করেন। ১৫

সেই যজ্ঞে অষ্টাশীতি সহস্র ঋত্বিক হোতৃকার্যে ব্যাপৃত, চতুঃষষ্টি সহস্র দেবর্ষি উদগাতা, নারদ প্রভৃতি বহুতর ঋষিই অধ্বর্য্যু এবং হোতা। ১৬

সৰ্ব্বদেবগণসহ স্বয়ং বিষ্ণু এই যজ্ঞের অধিষ্ঠাতা; স্বয়ং ব্রহ্মা ইহার বেদ বিধিপ্রদর্শক। ১৭

এই যজ্ঞে সকল সকল দিকপালগণ, দ্বারপাল ও রক্ষক। তথায় মূর্তিমান যজ্ঞ স্বয়ং উপস্থিত হন, ধরামণ্ডল যজ্ঞবেদী হইলেন। ১৮

সেই যজ্ঞ-মহোৎসবে শীঘ্র শীঘ্র রাশি রাশি হবি গ্রহণ করিবার জন্য স্বয়ং অগ্নি সহস্র সহস্র নিজ দেহ প্রকাশ করেন। ১৯

একৈক-পবিত্র-পাণি মরীচি প্রভৃতি ঋষিগণ এই কার্যের প্রধান সহায় হন। তাঁহারা সামধেনী মন্ত্র (অগ্নি প্রজ্বালন মন্ত্র) দ্বারা সৰ্ব্বত্র অগ্নি প্রজ্বলিত করেন। সপ্তর্ষিগণ, দিক, বিদিক্‌, ভূমণ্ডল ও গগনমণ্ডল শ্রুতি-স্বরে পূর্ণ করত সামগান করেন। ২০-২১

সু-মহাত্মা-দক্ষ, সেই যজ্ঞে বরণ করেন নাই;–এইরূপ কেহ ছিল না। ২২

দেবতা, দেবর্ষি, মনুষ্য, পশু, পক্ষী, উদ্ভিদ, তৃণ, সিদ্ধ, সাধ্য, বিদ্যাধর, গন্ধৰ্ব্ব, যক্ষ, নাগ, আদিত্য, ঋষি, স্থাবরমণ্ডল–দক্ষ, সেই মহাযজ্ঞে সকলকে বরণ করেন। ২৩-২৪

কল্প, মন্বন্তর, যুগ, বর্ষ, মাস, দিবা, রাত্রি, কলা, কাষ্ঠা, ও নিমেষাদি সকলেই দক্ষকর্তৃক বৃত হইয়া তথায় সমাগত হন। ২৫

 এ মহর্ষি, রাজর্ষি, দেবর্ষি, পুত্ৰামাত্যসৈন্য সমভিব্যাহারে, নৃপতি এবং বসু প্রমুখ গণ-দেবতা–সকলেই দক্ষকর্তৃক বৃত হইয়া যজ্ঞে গমন করেন। ২৬।

কীট, পতঙ্গ, জলজ প্রাণী, বানর, ঘোরবিঘ্নকর, শ্বাপদ, মেঘ, পৰ্বত, নদী, সমুদ্র, সরোবর ও দীর্ঘিকা–সকলেই বৃত হইয়া তথায় গমন করেন। ২৭

পাতালবাসী অসুর এবং দেবতুল্য সমস্ত রমণীগণও তথায় গমন করিলেন। তাহারা সকলেই সেই যাযজুক দক্ষের যজ্ঞে স্ব স্ব হবির্ভাগ গ্রহণ করিবার জন্য তথায় গমন করেন। ২৮

মুনি দক্ষ, স্থাবরজঙ্গমাত্মক সমুদায় জগৎ অর্চনাপূর্বক বরণ করিয়া সৰ্বস্ব দক্ষিণ যজ্ঞ আরম্ভ করেন। ২৯

মহাত্মা দক্ষ, “মহাদেব কপালী, অতএব তিনি যজ্ঞার্হ নহেন” বিবেচনা করিয়া সে যজ্ঞে তাহাকে বরণ করেন নাই। ৩০

সতী আপনার প্রিয়তনয়া হইলেও, কপালীর ভার্যা বলিয়া সে যজ্ঞে দোষদর্শী দক্ষ, তাহাকে আহ্বান করেন নাই। ৩১

পিতা তাদৃশ উত্তম যজ্ঞ আরম্ভ করিয়াছেন, কিন্তু আমি কপালীর ভাৰ্য্যা বলিয়া আমাকে আহ্বান করেন নাই, ইহা তত্ত্বানুসন্ধানপূর্বক শ্রবণ করিয়া সতী দক্ষের প্রতি সাতিশয় ক্রুদ্ধ হইলেন। তখন সতী,-আরক্ত-নয়না ও আরক্তবদনা হইয়া দক্ষকে শাপদগ্ধ করিতে মনস্থ করিলেন। ৩২-৩৩

তিনি কোপাবিষ্ট হইলেও তৎক্ষণাৎ পূর্ব প্রতিজ্ঞা স্মৃতিপথারূঢ় হওয়াতে তখন আর দক্ষকে শাপ দিলেন না, মনে মনে ইহা স্থির করিলেন;–শাপ দিবার আবশ্যকতা নাই, আমি পূৰ্বেই দক্ষকে দৃঢ়নিয়ম-বন্ধ করিয়া দিয়াছি যে, আমার প্রতি তোমার অবজ্ঞা উপস্থিত হইলেই আমি নিশ্চয় প্রাণত্যাগ করিব। ৩৪-৩৫

যখন আমাকে কন্যারূপে প্রার্থনা করত বহুকাল আমার স্তব করে, তখন আমি এই নিয়ম করিয়া দিয়াছি; শাপে কাজ নাই, আমি সেই নিয়ম পালন করিব। ৩৬

সতী দেবী ইহা চিন্তা করিয়া জগন্ময় নিষ্কাম ঘোরতর নিজ নিরুপম নিত্য রূপ স্মরণ করিলেন। ৩৭

তখন দাক্ষায়ণী শ্রী হরির যোগনিদ্ৰাস্বরূপ নিজ রূপ স্মরণ করত মনে মনে চিন্তা করিলেন; ব্রহ্মার কথামত দক্ষ যে জন্য আমাকে স্তব করিয়াছিল; তাহার কিছুই হইল না, শঙ্কর এখনও অপুত্রক। ৩৮-৩৯

এখন দেবগণের কেবল একটি কাৰ্য্য হইয়াছে, শঙ্কর আমার জন্যই রমণীর প্রতি অনুরক্ত হইয়াছেন। ৪০

আমি ভিন্ন আর কোন রমণীই শঙ্করের অনুরাগবর্ধনে সমর্থ হইবে না; অতএব শিব অন্য রমণীকে গ্রহণ করিবেন না। ৪১

তথাপি আমি পূর্বকৃত প্রতিজ্ঞাবশতঃ এই দেহত্যাগ করিব; তৎপরে ত্রিভুবনের হিতার্থ আমি পুনরায় এই হিমালয়ে প্রাদুর্ভূত হইব। ৪২

পূর্ব হইতেই শম্ভু, সুরগৃহসদৃশ রমণীয় হিমালয়প্রস্থে আমার সহিত বহুকাল বিহার করিতে প্রীতিযুক্ত আছেন। ৪৩

তথায় চাৰ্ব্বঙ্গী ব্রতচারিণী মেনকাদেবী, পৰ্ব্বতবংশীয়াদিগের মধ্যে সুশীলা এবং পুরস্ত্রীবর্গের প্রধান। ৪৪

তিনি আমাকে মা’র ন্যায় সামঞ্জস্যভাবে সকল কাৰ্য্য করিতে বলেন; তাহার উপর আমার বড় অনুরাগ হইয়াছে, তিনিই আমার মা হইবেন। ৪৫

আমি পৰ্বতবংশীয়া কন্যাগণের সহিত বহুকাল বাল্যক্রীড়া করত মেনকা দেবীর পরমানন্দ সম্পাদন করিব। ৪৬

তৎপরে আমি পুনরায় শিবের অতি প্রিয়তমা ভাৰ্য্যা হইব; তখন আমি উপায় দ্বারা নিশ্চয়ই দেবকাৰ্যসকল সাধন করিব। ৪।

দক্ষনন্দিনী এইরূপ চিন্তা করত দক্ষের নিদারুণকৰ্ম্ম স্মরণমাত্রে ঘোর রোষাবেশে জ্বলিয়া উঠিলেন। ৪৮

তখন কোপরক্ত-নয়ন সতী, যোগবলে শরীরের সকল দ্বার রোধ করিয়া কুম্ভক করিলেন। সেই মহাকুম্ভকে তদীয় প্রাণ-বায়ু ব্ৰহ্মরন্ধ্র ভেদ করিয়া নির্গত হইল। ৪৯-৫০

অন্তরীক্ষস্থিত দেবতাসকল তাহাকে প্রাণত্যাগ করিতে দেখিয়া শোকাশ্রু পূর্ণনয়নে হাহাকার করিতে লাগিলেন। ৫১

অনন্তর সতীর ভগিনী-তনয়া বিজয়া তাহাকে দেখিতে আসিয়াছিলেন; তিনি সতীকে মৃত দেখিয়া শোকাবেগে মূহুর্মুহুঃ আর্তনাদ করিতে লাগিলেন। ৫২

হায় সতি। কোথায় গেলে; হায়! সতি। তোমার একি হইল!! হায় মাসি। তখন এইরূপ উচ্চতর আর্তনাদ হইতে লাগিল। ৫৩

সতি। তুমি অপ্রিয় শ্রবণেই প্রাণত্যাগ করিলে, আর আমি ঈদৃশ ঘোর অপ্রিয় স্বচক্ষে দেখিয়া জীবনধারণ করিব কিরূপে? ৫৪

বিজয়া করতল দ্বারা বারংবার সতীর মুখমার্জনা এবং এইরূপ সকরুণ বিলাপ করত তাহার মুখ আঘ্রাণ করিতে লাগিলেন। ৫৫

নয়নজলে সতীর রক্ষঃস্থল ও বদনমণ্ডল অভিষিক্ত করত করযুগল দ্বারা তদীয় কেশপাশ উত্তোলিত করিয়া তাহার মুখ নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। ৫৬

শোকাকুলিতেন্দ্রিয় বিজয়া মস্তক উন্নমিত ও অবনমিত করত মস্তকে ও বক্ষঃস্থলে করাঘাত করিতে লাগিলেন। ৫৭

আর অশ্রুপূর্ণকণ্ঠা বিজয়া এই কথা বলিতে লাগিলেন;-তোমার জননী বীরিণী, তোমার এই মৃত্যু-সংবাদ পাইয়া শোকাবেগে জীবনধারণ করিবেন কিরূপে? দেখিতেছি, তিনি প্রাণত্যাগ করিবেন। ৫৮

তোমার পিতা তাদৃশ নির্দয় এবং ক্রূরকর্মা হইলে ও তোমার মরণ-সংবাদ শুনিয়া প্রাণধারণ করিবেন কিরূপে? ৫৯

দক্ষ, তোমার প্রতি নিজকৃত নৃশংস ব্যবহার স্মরণ করিয়াই বিশেষ শোকাকুল হইবেন। ৬০

দক্ষ, যাজ্ঞিক হইয়াও যজ্ঞবিষয়ে মূর্খ; তিনি যজ্ঞে প্রবৃত্ত হইয়াছেন কেন? তিনি শ্রদ্ধাশূন্য ও বুদ্ধিহীন; যজ্ঞ করিতে সমর্থ হইবেন বা কিরূপে? ৬১

আমি অত্যন্ত রোদন করিতেছি, হায় মা! আমাকে উত্তর দাও; নির্দয় আমি তোমার শোকে প্রাণকেও শল্যসম বোধ করিতেছি। ৬২

তুমি কি কখন শিবকৃত কোন অপ্রিয় কাৰ্য্য স্মরণ করিতেছ; তাই রোষাবেশে আমার সহিত কথা কহিতেছ না। ৬৩

সেই চক্ষু, সেই বচন-চাতুরীময় বদন, সেই তোমার নাসিকা;–ইহাদিগের বিভ্রম কোথায় গেল? তোমার হাস্য কোথায় গেল? ৬৪

তোমার বিভ্রমহীন নয়নযুগল, নাসিকা এবং ঈষৎ-হাস্যহীন মুখ দেখিয়া মহাদেব সহিয়া থাকিবেন কিরূপে? ৬৫

আমি এই শিবের আশ্রমে আসিলে, কে আর মা! হাসিতে হাসিতে বার বার সুমধুর সত্য কথা বলিবে? ৬৬

মা! তোমার ন্যায় বন্ধু-বান্ধবে স্নেহবতী পতি-চিত্তানুসারিণী সৰ্ব্বলক্ষণা ক্ৰান্তা আর কোন্ রমণী হইবে? ৬৭

দেবি। দেবদেব মহাদেব, তোমার বিরহে শোকাকুল-চিত্ত, দুঃখিত, নিরুৎসাহ ও নিশ্চেষ্ট হইয়া থাকিবেন। ৬৮

সতীকে মৃত দেখিয়া অতি দুঃখিত-হৃদয়া ও শোকাকুলা বিজয়া এইরূপ বিলাপ করত, কাঁপিতে কাঁপিতে ঊর্ধভুজে চীৎকার শব্দে ভূতলে পতিত হইলেন। ৬৯

ষোড়শ অধ্যায় সমাপ্ত ॥ ১৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *