১৬. আ’শা ইবন কায়সের ঘটনা

’শা ইবন কায়সের ঘটনা

ইবন হিশাম বলেন, খাল্লাদ ইবন কুররা প্রমুখ বকর ইবন ওয়াইলের উস্তাদগণের সূত্রে হাদীছ বিশারদদের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আশা ইবন কায়স (ইবন ছা’লাবাহ ইবন ইকাবাহ ইবন সা’ব ইবন আলী ইবন বকর ইবন ওয়াইল) ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সাক্ষাতের জন্যে যাত্রা করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রশংসায় তিনি নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করেন :

ألم تغتمض عيناك، ليلة أرمدا – وبت كما بات السليم مسهداচোখের পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে গত রাতে তুমি কি চোখ বন্ধ করতে পারেনি? আর তাই কি রাত্রি যাপন করেছে। সুস্থ অথচ নিদ্রাহীন ব্যক্তির ন্যায়।

وماذالك من عشق النساء وأئما – تناسيت قبل اليوم خالة مهددًا – এই নিদ্রাহীনতা তো নারীপ্রেমের কারণে নয়, বরং অনেক পূর্বেই তুমি মুহাদাদ নামক রমণীর কথা ভুলে গিয়েছে।

ولكن ارى الدهر الذى هو خانن – اذا أصلحت كفاى عاد فأفسد ا– আমি বিশ্বাসঘাতক যুগকে দেখেছি যে, আমার দু’হাত যখন কোন কিছু শুধরিয়ে দেয়। ওই যুগ। তখন পুনরায় সেটিতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং সেটিকে নষ্ট করে দেয়।

كهولا وشبانا فقذت وثروة – فللَّه هذا الذهر كيف تردّد ا– এই যুগের ঘূর্ণিপাকে আমি অনেক প্রৌঢ় লোক, নওজোয়ানকে এবং অনেক ধন-সম্পদ হারিয়েছি। হায় আল্লাহ। এ যুগ কী ভাবে ওলট-পালট হয়।

و مازلت ابغی المال مذانا یافع–ولید او کهلاً حین شبات و امر داআমি অবিরাম ধন-সম্পদ অর্জনে ব্যস্ত ছিলাম। শৈশব, যৌবন এবং প্রৌঢ়ত্ব সকল বয়সে আমি তাই করেছি।

و آیتذل العینس المراقبل تغتلی–مسافة مابین النجیئر فصر خداএখন আমি আমার খাকী রঙের দ্রুতগামী অশ্ব ছুটিয়েছি। নাজীর ও মারখাদ অঞ্চলের মধ্যবর্তী দূরত্ব অতিক্রম করার লক্ষ্যে।

ألا أي هذا الستانلى أين تممت – فان لها فى أهل يثرب موعدا

হে লোক, যে আমাকে জিজ্ঞেস করছি আমার গন্তব্য কোথায়? তুমি শুনে নাও, আমার অশ্ব ইয়াছরিব পৌছার জন্যে প্ৰতিজ্ঞাবদ্ধ।

فان تستالى عنى فيارب سائل – حفى عن الاعش بم حيث–أصنعدا– তুমি যদি তবু আমার ব্যাপারে প্রশ্ন কর, তবে এমন বহু প্ৰশ্নকর্তা আছে, যারা খুব ভালভাবে জানে আশা কোথায় অধিষ্ঠিত।

أجدت برجليها النجاد وراجعت – يداها خنافا لينا غير أحردا – লক্ষ্যস্থলে দ্রুত পৌছার জন্যে আমি আমার অশ্বের পেছনের পা দুটোকে উচু ভূমির দিকে দ্রুত চালিয়েছি এবং সামনের পা দুটোকে সে আলতোভাবে আমার প্রতি ঝুকিয়ে দিয়েছে। আমি তাকে অলসতা করার সুযোগ দিইনি।

وفيها اذا ما هجرت عجر فية – اذا خلت حرباء الظهيرة أصيد – মধ্যাহ্নে বেপরোয়া গতিতে সে যখন সেটিকে দুপুরের প্রচণ্ড খরতাপে ছুটেছে, তখন সেটিকে মনে হয়েছে যেন এক মাস্তবড় অহংকারী অশ্ব।

واليت لا اوى لها من كلالة – ولاً من حفى حتى ثلاقي محمدًاআমি কসম করেছি যে, ক্লান্ত হয়ে পড়লেও এবং দীর্ঘ পথ অতিক্রমের কারণে তার পা

গুলো ক্ষত-বিক্ষত এবং রক্তাক্ত হয়ে গেলেও আমি তাকে বিশ্রাম করতে দেব না। যতক্ষণ না সে মুহাম্মাদ (সা)-এর খেদমতে গিয়ে পৌছে।

مثلی ما ثناخی عند باب ابن هاشم–تراحی و تلقی من فواضله ندیহাশিমের বংশধর (মুহাম্মাদ)-এর দরজায় গিয়ে পৌঁছতে পারলে সে বিশ্রাম করতে পারবে এবং তার অফুরান অনুগ্রহ লাভে ধন্য হবে।

نبی یری مالاترون وذگرهٔ–آغار لغماری فی البلاد و انجداতিনি এমন একজন নবী যে, তোমরা যা দেখতে পাও না তিনি তা দেখতে পান। আমার জীবনের শপথ, তার আলোচনা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে এবং সব কিছুর উপর বিজয় মণ্ডিত

ठू6श6छ।

لهٔ صدقات ما تغب و نائل–فلیس عطاء الیوم مانغهٔ غداতিনি অনবরত দান সাদাকা করেন। এমন নয় যে, একদিন দিলেন আরেক দিন বন্ধ রাখলেন। একদিনের দান-দক্ষিণা তাঁর পরের দিনের দান-দক্ষিণার জন্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।

أجدّك لم تسمع وصاة محمد – نبي الاله حيث أوضى وأشهد ا– তোমার অদৃষ্টির কসম, তুমি কি মুহাম্মদ (সা)-এর উপদেশ শুননি? তিনি তো আল্লাহর নবী। বস্তুত তিনি উপদেশ দিয়েছেন এবং সত্যের সাক্ষ্য দিয়েছেন।

اذا أنت لم ترحل بزاد من التُقى – ولا قيمت بعد الموت من قد تزودًا তুমি যদি তাকওয়া রূপ পাথেয় নিয়ে যেতে না পার এবং মৃত্যুর পর এমন লোকের সাথী হতে না পোর, যে তাকওয়ার পাথেয় নিয়ে গিয়েছে, তবে তুমি নিশ্চয়ই।

ندمت على أن لاً تكون كمثله – فترصد للأمر الذي كان أرصد ا– তুমি লজ্জিত হবে এ জন্যে যে, তুমি ওই পাথেয় সংগ্ৰহকারীর ন্যায় হতে পারলে না এবং সে যে মহান নিআমতের অপেক্ষায় থাকবে তুমি তার অপেক্ষায় থাকতে পারবে না।

فاياك والميتات لأتقر بثها – ولاً تأخذن سهما حديدا لتقصد ا– তুমি অবশ্যই মৃতপ্রাণী পরিহার করবে। ওগুলোর নিকটেও যাবে না। প্রাণী শিকারের জন্যে লোহার তীর (জুয়ার উদ্দেশ্যে) ব্যবহার করবে না।

وذا النَّصب المنصوب لأتنسكنّه – ولا تغيّد الأوثان واللَّة فاعيد ا– কখনাে উপাস্য রূপে স্থাপিত প্রতিমার পূজা করো না এবং দেবদেবীর উপাসনা করো না। বরং একমাত্র আল্লাহ তা’আলার ইবাদত করবে।

والأتقر بن جارة كان سرها – عليك حراما فانكحن أو تأبدا– তোমার জন্যে যার শ্ৰীলতাহানি হারাম এমন প্রতিবেশিনীয় নিকটও যেও না। সম্ভব হলে বিধিসম্মত ভাবে বিয়ে কর, নতুবা তার নিকট থেকে দূরে সরে থাক।

وذا الرحم القربى فلاً تقطعته – لعاقبة ولاً الأسير المقيد ا– ঘনিষ্ঠ ও নিকটাত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছেদ করো না। তাতে তোমার পরিণাম কল্যাণকর হবে। আর কারারুদ্ধ বন্দী লোকের সাথেও সম্পর্কচ্ছেদ করো না।

وسبخ على حين العشية والضحى – ولاً تحمد الشيطان واللّه فأحمد ا– সকাল, সন্ধ্যায় তাসবীহ পাঠ করো শয়তানের প্রশংসা করো না। একমাত্র আল্লাহ তা’আলার প্রশংসা করবে।

ولا تسخرن من بائسرذى ضرارة – ولا تحسبن المال للمرء مخلد ا– দীন-দুঃখী ও দুঃস্থ লোক দেখে কখনো ঠাট্রা-বিদ্রপ করো না। ধন-সম্পদ মানুষকে চিরস্থায়ী ও চিরজীবী করে রাখবে তেমন ধারণা কখনো করো না।

ইবন হিশাম বলেন, মক্কা অথবা মক্কার নিকটবতী পৌছার পর কুরায়শের এক মুশরিক লোক তাঁর সম্মুখে এসে দাঁড়ায়। তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে তারা তাকে জিজ্ঞেস করে, তিনি জানান যে ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট তিনি যাবেন। কুরায়শী লোকটি তাকে বলে, হে আবু বাসীর! ওই মুহাম্মাদ তো ব্যভিচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। আশা বললেন, আল্লাহর কসম আমার তো ব্যভিচারের আদৌ কোন প্রয়োজন নেই। লোকটি তখন বলে, হে

আবু বাসীর! তিনি তো মদ্যপান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। আশা বললেন, আল্লাহর কসম, মদের প্রতি তো আমার চরম দুর্বলতা রয়েছে। ঠিক আছে আমি তাহলে এবারকার মত ফিরে যাব এবং এই এক বছর তৃপ্তি সহকারে মন্দ পান করে নেব। তারপর মুহাম্মদ (সা)-এর নিকট ফিরে এসে ইসলাম গ্রহণ করব। এ যাত্রা তিনি ফিরে যান। ওই বছরেই তাঁর মৃত্যু হয়। পুনরায় রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট ফিরে আসার সুযোগ তার হয়ে উঠেনি।

এ ঘটনা ইবন হিশাম, এখানে উল্লেখ করেছেন। এটি এখানে উল্লেখ করায় মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক কর্তৃক ইবন হিশাম অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে; তার একটি এই যে, মদপান হারাম ঘোষণা করা হয়েছিল বনু নায়ীর যুদ্ধের পর মদীনাতে। এর বিস্তাৱিত বিবরণ পরে আসবে। তাহলে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, ইসলাম গ্রহণের জন্যে কবি আশার মদীনা যাত্ৰা অনুষ্ঠিত হয়েছিল হিজরতের পর। তার কবিতায়ও সে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন :

ألا أبهذا السائلى أين بممت – فان لها فى أهل يثرب موعد ا– হে প্ৰশ্নকারী!! আমার গন্তব্য কোথায়? বস্তুত ইয়াছরিববাসীদের সাথে আমার সাক্ষাতের প্ৰতিশ্রুতি রয়েছে।

সুতরাং ইবন হিশামের উচিত ছিল এ ঘটনাটি এখানে উল্লেখ না করে হিজরতের পরের কোন এক অধ্যায়ে উল্লেখ করা। আল্লাহই ভাল জানেন।

সুহায়লী বলেন, সম্ভবত এটি ইবন হিশাম এবং তাঁর অনুসরণকারীদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। কারণ এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, মদ্যপান নিষিদ্ধ হওয়ার বিধান নাযিল হয়েছে উহুদ যুদ্ধের পর মদীনায়।

কেউ কেউ বলেছেন, যে ব্যক্তি পথিমধ্যে আ“শাকে বাধা দিয়েছিল এবং ঐ বাক্যালাপ করেছিল, সে ছিল আবু জাহল ইবন হিশাম। উতবা ইবন রাবী আর ঘরে বয়ে সে আশাকে এসব কথা বলেছিল।

আবু উবায়দা উল্লেখ করেছেন যে, আমির ইবন তুফোয়লই আশাকে ওই সব কথা বলেছিলেন এবং তা বলেছিলেন যখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাক্ষাতের জন্যে মক্কায় যাচ্ছিলেন। আবু উবায়দা এও বলেছেন যে, “পরের বছর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট এসে আমি ইসলাম গ্রহণ করব।” আশার এই বক্তব্য তাকে কুফরীর সীমানা থেকে বের করে ঈমানের গণ্ডিভুক্ত করতে পারেনি। অর্থাৎ এ বক্তব্য দ্বারা তিনি যে মুসলমান বলে গণ্য হবেন না। এ ব্যাপারে সকলে একমত। আল্লাহই ভাল জানেন।

এরপর ইবন ইসহাক এখানে ইরাশী, এর ঘটনা উল্লেখ করেছেন। ইরাশী থেকে আবু জাহল যে উট ক্রয় করেছিল, তার মূল্য বুঝে নেয়ার জন্যে ওই লোক কিভাবে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট এসেছিল এবং কিভাবে আল্লাহ তা’আলা আবু জাহলকে লাঞ্ছিত করেছিলেন যে, শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ধমক খেয়ে সে উটের মূল্য পরিশোধ করেছিল, তার সবই তিনি উল্লেখ করেছেন। ইতোপূর্বে ওহী নাযিলের সূচনা এবং সে সময়ে মুসলমানদের প্রতি মুশরিকদের জুলুম-অত্যাচার অধ্যায়ে আমরা ইরাশীর ঘটনা উল্লেখ করেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *