১৪. শিব-বিহার

চতুর্দশ অধ্যায় শিববিহার

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–অনন্তর, জলদাবলী গর্জন করিতে থাকিলে সতীপতি মহাদেব, বিষ্ণু প্রভৃতিকে বিদায় দিয়া হিমালয় পর্বতে গমন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন, শিব, আনন্দ-শালিনী সতীকে উত্তুঙ্গ বৃষভ-পৃষ্ঠে আরোহণ করাইয়া রমণীয়-নিকুঞ্জ-শোভিত হিমালয় প্রস্থে গমন করিতে লাগিলেন। ১-২

তখন সেই চারুহাসিনী সুদতী দাক্ষায়ণী, বৃষোপরি শিবসমীপে অবস্থিত হওয়াতে শশধরসমীপে মেঘমালার ন্যায় অত্যন্ত শোভা পাইতে লাগিলেন। ৩

ব্ৰহ্মাদি প্রধান প্রধান দেবগণ, ব্রহ্মার মানস পুত্র মরীচি প্রভৃতি ঋষিগণ, দক্ষ প্রজাপতি এবং সুরাসুর সকলেই আনন্দিত হইলেন। ৪

প্রমথগণ–কেহ কেহ শঙ্খধ্বনি কতত, কেহ কেহ করতালি প্রদান করত কেহ কেহ বা হাস্য করত, বৃষধ্বজের অনুগমন করিতে লাগিল। ৫

শিব ব্রহ্মাদিকে বিদায় দিলেও তাহারা পরমানন্দে কিয়দ্দূর পর্যন্ত শিবের অনুসরণ করিলেন। ৬

অনন্তর, ব্ৰহ্মাদি দেবগণ ও ব্রহ্মার মানস পুত্রগণ শিবের সহিত সম্ভাষণ করিয়া শীঘ্রগামী রথে আরোহণপূর্বক স্ব স্ব স্থানে গমন করিলেন। ৭

দেবগণ, সিদ্ধগণ, অপ্সরোগণ, যক্ষগণ ও বিদ্যাধরগণ প্রভৃতি যাঁহারা যাঁহারা তথায় সমাগত হইয়াছিলেন, তাঁহারা সকলে শিবের নিকট বিদায় লইয়া নিজ নিজ গৃহে গমন করিলেন। মহাদেব, দার-পরিগ্রহ করিলে তাহারা সকলেই হৃষ্টচিত্ত হইয়াছিলেন। ৮-৯

অনন্তর, মহাদেব, সতীসহ আমোদজনক অতি প্রিয় স্বস্থান কৈলাসে বৃষ হইতে অবতীর্ণ হইলেন; সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার প্রমথগণও তথায় উপস্থিত হইল। ১০

অনন্তর বিরূপাক্ষ, সেই দক্ষ-নন্দিনীকে পাইয়া নন্দী প্রভৃতি নিজগণকে গিরি-গুহা হইতে বিদায় দিলেন। ১১

বিদায় দিবার সময় তাহাদিগের সকলকেই এই সূনৃত (সত্যপ্রিয়) কথা বলিয়া দিলেন, যখন আমি তোমাদিগকে স্মরণ করিব, তখন তোমাদিগের চিত্ত চঞ্চল হইবে। হে প্রমথগণ। চিত্ত চঞ্চল হইলেই তোমার আমার নিকটে সমাগত হইবে।১২-১৩

নন্দী ভৈরবাদি প্রমথগণ, মহাদেবকর্তৃক এবরূপ কথিত হইয়া হিমালয় পর্বতে মহাকৌষী-নদী-প্রপাত সন্নিধানে গমন করিলেন। ১৪

তাহারা চলিয়া যাইলে মহাদেব, মোহিত হইয়া বহুদিন সতীসহ নির্জনে নিরন্তর সাতিশয় ক্রীড়াসক্ত হইলেন। ১৫

মহাদেব, কোন দিন, বন্য পুষ্প আহরণপূর্বক মনোহর মালা গাঁথিয়া সতীর হারস্থানীয় করিয়া দিলেন। ১৬

কোন দিন, সতী, দর্পণে আপন মুখ দেখিতেছেন, এমন সময় মহাদেব চুপিচুপি পশ্চাতে গিয়া সেই দর্পণে আপনার মুখও দেখাইলেন। ১৭

কোন দিন মহাদেব, সতীর কুন্তলপাশ উন্নমিত করিয়া উল্লাসযুক্ত হইলেন, তখন বার বার সেই কেশরাশি বাঁধিয়া দিতে লাগিলেন, খুলিতে লাগিলেন, আবার পরিষ্কার করিতে লাগিলেন। ১৮

মহাদেব, সতীর সহজ-রক্ত চরণযুগল অনুরাগবশে উজ্বল-অলক্তকরসে রঞ্জিত করিয়া দিলেন। ১৯

যে সকল কথা অন্যের নিকট উচ্চৈঃস্বরে এবং শীঘ্র বলা যায়; শিব সতীর আনন স্পর্শ করিবার জন্যই সেই সকল কথা তাহার কাণে কাণে এবং বিলম্ব করিয়া বলিলেন।

মহাদেব, অদূরে লুকাইয়া থাকিয়া অন্যমনস্ক সতীর পশ্চাদ্ভাগে সযত্নে ধীর পদক্ষেপে আগমনপূর্বক দুই হাতে তাহার চক্ষু টিপিয়া ধরিলেন। ২১

বৃষধ্বজ, মায়াবলে সেইখানে অন্তর্হিত হইয়াই সতীকে আলিঙ্গন করিলেন; সতী ভয়চকিতা ও ব্যাকুলা হইয়া পড়িলেন। ২২

মহাদেব সুবর্ণকমলকলিকা সদৃশ তদীয় কুচযুগলে মৃগনাভি দ্বারা ভ্রমরাকারে তিলক করিয়া দিলেন। ২৩

মহাদেব, সতীর স্তনযুগল হইতে সহসা হার উন্মোচনপূর্বক বারংবার তাহাতে হাত দিলেন। ২৪

শিব,–কেয়ূর, বলয় এবং তরঙ্গ (অলঙ্কার বিশেষ) সেই সেই অলঙ্কার স্থান হইতে বারম্বার খুলিয়া আবার পরাইয়া দিলেন। ২৫

দেখ, এই কালিকা (মেঘজাল) গমন করিতেছে, এ তোমার সবর্ণা সখী; মহাদেব এই কথা বলিলে সতী যেমন সেদিকে দৃষ্টিপাত করিলেন, তৎক্ষণাৎ তিনি সতীর স্তনদ্বয় গ্রহণ করিলেন। ২৬

কোন সময়ে, প্রমথনাথ, মদনোন্মত্ত মনে সেই হৃদয়বল্লভার সহিত আনন্দে নানাবিধ লীলা করিলেন। ২৭

শঙ্কর, কখন বন্যপুষ্প ও পদ্মপুষ্প আহরণ করিয়া সতীর সর্বাঙ্গ পুষ্প ভরণে ভূষিত করিলেন। ২৮

সতীপতি হর, আনন্দিত ও মোহিত হইয়া সকল রমণীয় গিরিকুঞ্জে তাহার সহিত বিহার করিলেন। ২৯

বৃষধ্বজ, শয়নে, উপবেশনে, অবস্থানে এবং গমনাদি চেষ্টাতে ক্ষণকালের জন্যও সতী না থাকিলে স্বস্তি লাভ করেন নাই। ৩০

শিব, বহুকাল কৈলাস গিরিকন্দরে সতীসহ বিহার করিয়া হিমালয় পর্বতে মহাকোষী-নদী-প্রপাতের নিকটে গমন করিলেন। ৩১

বৃষধ্বজ, হিমালয় পর্বতে প্রবিষ্ট হইলে কামও রতি-বসন্তের সহিত তথায় গমন করিলেন। ৩২

কামদেব, তথায় গমন করিলে, বসন্ত-শঙ্করসমীপে বৃক্ষ, জল ও ভূমণ্ডলে নিজ শোভা বিস্তার করিলেন। ৩৩।

তখন তরুগণ সুপুস্পিত হইল; লতাসকল কুসুমিত হইল; সরোবরে পদ্ম ফুটিল, কমলে ভ্রমর বসিল। ৩৪

বসন্ত তথায় প্রবিষ্ট হইলে, সুগন্ধি-কুসুম-গন্ধে আমোদিত সুগন্ধ মলয়ানিল বহিতে লাগিল। ৩৫

যেমন নিপুণ ব্যক্তি, তক্ৰ (ঘোল) মন্থন করিয়া তাহা হইতে ঘৃত উত্থাপন করে; সেইরূপ, বসন্ত, মুনিগণের চিত্ত মথিত করিয়া কামপ্রবৃত্তিরূপ সার উদ্ধার করিয়া দিলেন। ৩৬

সন্ধ্যাকালীন অর্ধচন্দ্রের ন্যায় পলাশ-কুসুম-রাশি মদনাস্ত্রের ন্যায় বিরাজ করিতে লাগিল। ৩৭

তখন দেবগণ, সদা প্রমোদ-মত্ত হইলেন। তখন সরোবরে কমলবৃন্দ, সকল জনগণকে মোহিত করিতে উদ্যত সুবদনা জলদেবতার ন্যায় দীপ্তি পাইতে লাগিল। ৩৮।

স্বর্ণবর্ণ-কুসুমরাজিমণ্ডিত মনোহর নাগকেশর-তরুগণ, কামদেবের রথধ্বজের ন্যায় শঙ্করসমীপে বিরাজ করিতে লাগিল। ৩৯

চম্পকতরুশ্রেণী, বিকসিত-কুসুমসমূহ দ্বারা আপনার ‘হেমপুষ্প’ নাম নিরন্তর ব্যক্ত করিতে লাগিল। ৪০

পাটল-বৃক্ষসকল এরূপভাবে কুসুমিত হইল,–তাহাতে সমস্ত দিত্মণ্ডল, প্রফুল্ল পাটলাকুসুমে পাটলবর্ণ হইয়া উঠিল। ৪১

কুসুমিত লবঙ্গলতা নিজ সুগন্ধে মলয়-পবনকে আমোদিত করিয়া কামিজনের চিত্ত অত্যন্ত মোহিত করিতে লাগিল। ৪২

মাধবী-কুসুম-সুবাসিত রতিক্রীড়াময় মনোহর বনভূমিসকল মাধবী-কুসুম গন্ধ-লুব্ধ অলিকুলে সঙ্কুল হইয়া বড়ই শোভা পাইল। ৪৩

চুতপাদপনিকরের বিটপাগ্রভাগ সতেজে উদ্গত ও সুন্দর মুকুলিত হইল; তাহাতে ঐ বৃক্ষশ্রেণী মদন-শর-সমুহ-সংবৃতবৎ শোভা পাইতে লাগিল। ৪৪

পরম জ্যোতিঃ প্রকাশ হইলে মুনিগণের চিত্ত যেরূপ নিৰ্ম্মল হইয়া বিরাজ পায়; সেইরূপ, সরোবরাদির জল ফুল্ল-কমল-পরিবৃত ও নিৰ্ম্মল হইয়া শোভা পাইল। ৪৫

যেমন তত্ত্ব জ্ঞানীর হৃদয় হইতে মমত্ব দূর হয়, সেইরূপ তুষাররাশি, সূর্যরশ্মি সম্পর্কে গগনতল হইতে অপসৃত হইল। ৪৬।

তথায় কোকিলগণ অতীব নিঃশঙ্কচিত্ত প্রাণীপীড়ক মদনের কুসুম-জ্যা শব্দের ন্যায় নিরন্তর শব্দ করিতে লাগিল। ৪৭

তথায় বনমধ্যগত কুসুমমধুপায়ী মধুকরনিকর, মানিনী-মান-বুভুক্ষু স্মরশার্দূলের হুঙ্কারবৎ কূজন করিতে লাগিল। ৪৮।

চন্দ্রের সকল কলাই এতদিন শিশিররাশির মধ্যে ডুবিয়াছিল; এখন চন্দ্র পৃথিবীর জনগণকে মোহিত করিবার জন্য কুশলে সেই সকল কলা ক্রমে ধারণ করিতে লাগিলেন। ৪৯

তখন পতিসহ রমণীগণের যেমন রমণীয়তা হইল; সেইরূপ শশধরসহ রজনীদেবীও প্রসন্ন এবং তুষারহীন হইলেন। ৫০

সেই সময়ে মহাদেব, গিরিরাজ হিমালয়ের সংবৃত নিকুঞ্জ ও কন্দর মধ্যে সতীসহ সুললিত বিহার করিতে লাগিলেন। ৫১

কল্যাণী দাঙ্গায়ণীও তাহার সহিত এরূপ সুচারু বিহার করিলেন যে, তিনি ক্ষণকালও না থাকিলে শিবের ধৈর্য্যচ্যুতি হইত। ৫২

সতী দেবী সম্ভোগ বিষয়ে তাহার হৃদয়ের অতীব প্রিয় হইলেন। যেন সতী, শিবকে সেই মধুর শৃঙ্গাররস পান করাইতেই শিবের অন্তরে প্রবিষ্ট হইলেন। ৫৩

মহাদেব দাঙ্গায়ণীর সমগ্র দেহ স্বহস্তগ্রথিত পুষ্পমাল্য দ্বারা ভূষিত করিয়া নৰ্মলীলা করিলেন। ৫৪

যেমন সংযমী পুরুষ আত্মজ্ঞানে প্রবিষ্ট হয়, সেইরূপ মহেশ্বর, আলাপ, অবলোকন, হাস্য ও সম্ভাষণ দ্বারা সতীর অন্তরে প্রবেশ করিলেন। ৫৫

সতী-মুখ-চন্দ্রের সুধাপানে মহেশ্বরের শরীর দৃঢ় হইল; তাই তিনি কখনই শেষের সে ক্ষীণ অবস্থা প্রাপ্ত হইবেন না। ৫৬

মহাদেব, দাঙ্গায়ণীর মুখ কমল সৌরভে, অসামান্য সৌন্দর্য্য ও লীলানৈপুণ্য দ্বারা বদ্ধ হইয়া রজ্জুবদ্ধ মাতঙ্গের ন্যায় আর কোনরূপ চেষ্টা করিলেন না। ৫৭

এইরূপে মহেশ্বর, হিমালয় পর্বতের নিকুঞ্জ প্রস্থ ও কন্দর মধ্যে সতীসহ প্রতিদিন বিহার করিতে লাগিলেন। হে মুনীন্দ্রগণ! তাহার এইরূপ বিহার করিতে করিতে দেবপরিমাণে চতুর্বিংশতি বৎসর অতীত হইল। ৫৮

চতুর্দশ অধ্যায় সমাপ্ত ॥ ১৪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *