১৩. পাণিনি দর্শন

১৩. পাণিনি দর্শন

এই দর্শন ভগবান পাণিনি মুনির প্রণীত, ইহাতে কি বেদস্থ কি লৌকিক সকল সংস্কৃত শব্দই সাধিত ও ব্যুৎপাদিত হইয়াছে, এমত সংস্কৃত শব্দ প্রায় দৃষ্ট হয় না, যাহার সহিত পাণিনিদর্শনের সম্পর্ক নাই, ফলতঃ যেমন সংস্কৃত শব্দ হউক সকলই পাণিনি দর্শন অমুসন্ধান করিলে এক প্রকার সাধিত, ও বুrৎপাদিত হইতে পারে, অধুনা পাণিনি দর্শনের সদৃশ সকল পদ সাধন বিষয়ে আর দ্বিতীয় গ্রন্থ নাই। যদিও মুগ্ধবোধ প্রভূতি অন্যান্য আধুনিক ব্যাকরণ দ্বারাও কতক গুলি পদ সাধিত হইতে পারে বটে, কিন্তু ঐ সকল ব্যাকরণ দ্বারা বেদ ব্যাখ্যা করণেচ্ছু ধাৰ্ম্মিক জনগণের সম্পূর্ণ উপকার দশে না, যে হেতু আধুনিক ব্যাকরণরচনাকৰ্ত্তার বৈদিক শ দ মাধনের উপায় স্বরূপ আর স্বতন্ত্র স্থত্ৰাদি রচনা করেন নাই, কিন্তু তাহাতে এমত বিবেচনা করিও না যে আধুনিক ব্যাকরণকর্তা মহোদয়গণের বৈদিক শব্দ সম্পৰ্কীয় সুত্রাদি সম্পাদনের সম্পূর্ণ শক্তি ছিল না, কারণ যেমন যে ব্যক্তির বৃহৎ ব্রহৎ ব্ৰক্ষাদি সমাকীর্ণ পৰ্ব্বত্তোত্তোলনে সামর্থ্য থাকে, সে ব্যক্তি অনায়াসেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্ৰক্ষাদিও উত্তোলন করিতে পারে ; সেইরূপ যে ব্যক্তি ব্যাকরণ রচনা করিতে পারে, তাহার পক্ষে বৈদিক শ দ সম্পৰ্কীয় স্থত্রাদি রচনা অতি সহজ, তবে যে ঐ মহোদয়গণ ঐ বিষয়ের স্থত্রাদি রচনা করেন নাই তাহার তাৎপৰ্য্য এই, আধুনিক ব্যাকরণ সকল কেবল বালকদিগের আপাততঃ সংস্কৃত ভাষায় ব্যুৎপত্তির নিমিত্ত বিরচিত হইয়াছে এতদ্ব্যতীত আর কেন উদেশ্য নাই, সুতরাং ষেরূপে বালকগণের কাটতি সংস্কৃত ভাষায় ব্যুৎপত্তি জন্মে তদ্রুপে বিরচিত হইলেই পর্য্যাপ্ত হয়, তাহাতে আর বৈদিক শব্দ সাধনের আবশ্যক কি ; বরং তাহ রচনা করিলে অপ্রাসঙ্গিক গ্রন্থ বিস্তারাদি দোষ ঘটিবারই সম্পূর্ণ সম্ভাবনা, অতএব আধুনিক ব্যাকরণকৰ্ত্তা মহোদয়গণের এতাদৃশ মূঢ়াভিসন্ধি অনুসন্ধান না করিয়া তাহাদিগের প্রতি কোন অসুযোগ করা যে অকৰ্ত্তব্য তাহার আর সন্দেহ নাই । সে যাহা হউক যখন এই দর্শনে সংস্কৃত শব্দ সকল সাধিত ও বুrৎপাদিত হইয়াছে তখন এই দর্শনের যে শব্দমুশাসন ও ব্যাকরণ, এই দুইটী নাম সুসঙ্গত হইতেছে, তাহা অার বল বাহুল্য । ব্যাকরণ শাস্ত্র প্রধান বেদাঙ্গ, অর্থাৎ বেদের যে শিক্ষা, কম্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দেীগ্রন্থ ও জ্যোতিষ ভেদে ছয়ট অঙ্গ আছে, তাহার মধ্যে প্রধান অঙ্গ, ব্যাকরণ, যেমন, যজ্ঞাদিরূপ কৰ্ম্মের প্রধান অঙ্গের নিম্পত্তি হইলে অন্যান্য গুণীভূত অঙ্গের অননুষ্ঠান জন্য স্বর্গাদি স্বরূপ প্রকৃত ফলের কোন হানি হয় না, সেইরূপ যে ব্যক্তি ষড়ঙ্গ বেদ অধ্যয়নে অশক্ত হইয়া বেদাঙ্গের প্রধানীভূত ব্যাকরণ শাস্ত্র অধ্যয়ন করে তাহারও ষড়ঙ্গবেদাধ্যয়ন জন্য প্রকৃত ফলপ্রাপ্তি বিষয়ে কিছু মাত্র ক্ষতি হয় না । এ সকল ব্যক্তিরই অবশ্য কর্তব্য ও হিতকর ৰে ব্যাকরণ শাস্ত্র পাঠ তাহ সিদ্ধ হইল । ব্যাকরণশাস্ত্র অধ্যয়ন করিলে সংস্কৃত ভাষায় ব্যুৎপত্তি জন্মে, সংস্কৃত ভাষায় ব্যুৎপত্তি থাকিলে মান উপকার দশে—বেদাদি শাস্ত্রের রক্ষা হয়, এবং সাধুশ দপ্রয়োগাদি দ্বার জনসমাজে অসীম সুখ্যাতি, অসামান্য মান্যতা, অসংখ্য সম্পত্তি ও অসদৃশ বিদ্যানন্দ ভোগ করিয়া অস্তে সংসার যাত্রা সম্বরণ পুরঃসর স্বৰ্গধামে অধিবাস হয়, ইহা অপেক্ষ সংসারী ব্যক্তির অভিলষণীয় আর কি আছে ।

শব্দ দুই প্রকার ; নিত্য আর অনিত্য । নিত্যশব্দ একমাত্র স্ফোট, তদ্ভিন্ন বর্ণাত্মক শব্দসমুহ অনিত্য । বর্ণতিরিক্ত স্ফোটাত্মক ষে একটা নিত্যশদ আছে, তদ্বিষয়ে অনেক গ্রন্থে অনেক যুক্তি প্রদর্শিত হইয়াছে ; তন্মধ্যে প্রধান যুক্তি এই, স্ফোট না থাকিলে কেবল বর্ণাত্মক শব্দদ্বারা অর্থবোধ হইত না । দেখ ইহা সকলেই স্বীকার করিয়া থাকেন অকার, গকার, নকার ও ইকার এই চারিট বর্ণ রূপ যে অগ্নিশদ ভদ্বারা বহ্নির বোধ হয়। কিন্তু তাহ কেবল ঐ চারিীি বর্ণদ্বারা সম্পাদিত হইতে পারে না, কারণ যদি ঐ চারিটী বর্ণের প্রত্যেক বর্ণদ্বারা বহির বোধ হইত, তাহ। হইলে কেবল আকার কিংবা গকার উচ্চারণ করিলেও বহির বোধ না হয় কেন ? এই দোষ পরিহারের নিমিত্ত ঐ চারিটী বর্ণ একত্রিত হইয়া বহ্নির বোধ জন্মিয় দেয়, এই কথা বলাও বালকত্তা প্রকাশ মাত্র, যেহেতু বর্ণ সকল আগুবিনাশী, পর পর বর্ণের উৎপত্তিকালে পুৰ্ব্ব পুৰ্ব্ব বর্ণ সকল বিনষ্ট হইয়া যায়, সুতরাং অর্থ বোধের কথা দূরে থাকুক তাহদিগের একত্রাবস্থানই সস্তুবে না । অতএব বলিতে হইবে ঐ চারিট বর্ণদ্বারা প্রথমতঃ স্ফোটের অভিব্যক্তি অর্থাৎ দুটত জন্মে, পরে স্ফুট স্ফোটদ্বারা বহ্নির বোধ হয় ।

এস্থলে কেহ কেহ পূৰ্ব্বোক্ত রীতিক্রমে পুৰ্ব্বপক্ষ করিয়া থাকেন, প্রত্যেক বর্ণদ্বারা স্ফোটের অভিব্যক্তি স্বীকার করিলে পূৰ্ব্বোক্ত প্রত্যেক বর্ণদ্বারা অর্থবোধস্থলীয় দোষ ঘটে, এবং সমুদয় বর্ণদ্বারা অভিব্যক্তি স্বীকার করিলেও সেই দোষ ঘটে । অতএব উভয় পক্ষেই এ দোষ জাগরকে আছে তবে স্ফোটস্বীকারের প্রয়োজন কি ? ইহার সিদ্ধান্ত এই, যেমন একবার পাঠদ্বারাই পাঠ্যগ্রন্থের তাৎপর্য্যসমুদায় অবধারিত হয় না, কিন্তু বারংবার আলোচনা দ্বারা উহা দৃঢ়ৰূপে অবধারিত হয়, সেইরূপ প্রথমবর্ণ অকারদ্বারা স্ফোটের কিঞ্চিম্মাত্র স্কুটত৷ জন্মিলেও সম্পূর্ণ স্কুটত জন্মে না, পরে দ্বিতীয় ও তৃতীয়াদি বর্ণদ্বারা ক্রমশঃ দুটতর ও দুটতম হইয়া স্ফোট বহির বোধক হয়, নতুবা কিঞ্চিম্মাত্র স্ফুট হইলেই ষে স্ফোট অর্থবোধক হয় এমত নহে। যেমন নীল পীত ও রক্তাদি বর্ণের সান্নিধ্যবশতঃ এক স্ফটিক মণিই কখন নীল, কখন পীত, কখন বা রক্ত রূপে প্রতীয়মান হয়, সেইরূপ স্ফোট এক মাত্র হইলেও ঘট ও পটাদিরূপ বিভিন্ন বর্ণদ্বারা অভিব্যক্ত হইয়া ঘট ও পটাদি রূপ ভিন্ন ভিন্ন অর্থের বোধক হয় ।

এই স্ফোটকেই শাদিকের সচ্চিদানন্দ ব্রহ্ম বলিয়া স্বীকার করেন, সুডরাং শব্দ শাস্ত্র আলোচনা করিতে করিতে ক্রমশঃ অবিদ্যানিবৃত্তি হইয়। মুক্তিপদ প্রাপ্তি হয়, এজন্য ব্যাকরণ শাস্ত্রের ফল যে মুক্তি তাহা ও প্রাচীন পণ্ডিতগণ কহিয়াছেন যথা, ব্যাকরণ শাস্ত্র মুক্তির দ্বারস্বরূপ, বাঞ্জলা পহ, চিকিৎসাতুল্য, এবং সকল বিদ্যার মধ্যে পবিত্র । অথবা এই ব্যাকরণশাস্ত্র সিদ্ধিসোপানের প্রথম পদার্গণস্থান (অর্থাৎ যাহার সিদ্ধ হইবার অভিলাষ আছে, তাহাকে প্রথমতঃ ব্যাকরণের উপাসনা করিতে হয়) এবং মোক্ষমার্গের মধ্যে সরল রাজবক্স স্বরূপ ।

 

(প্রুফরীড আবশ্যক)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *