১৩. ধ্যানযোগে মহাদেবের বিশ্বদর্শন

ত্রয়োদশ অধ্যায় ধ্যানযোগে মহাদেবের বিশ্বদর্শন

অনন্তর, নারায়ণ মহেশ্বরকে ব্ৰহ্মাণ্ডসংস্থান দেখাইলেন;-জলরাশিস্থিত ব্ৰহ্মাণ্ড সৃষ্টি-সময়ের ন্যায় বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। ১

মহেশ্বর, সেই ব্রহ্মাণ্ডমধ্যে প্রকাশকারী কমলোদরসন্নিভ আরক্ত-বর্ণ জ্যোতির্ময় জগৎপতি ব্রহ্মাকে দেখিলেন। ২

আবার সৃষ্টির জন্য পৃথগভূত শরীরী জ্যোতিঃসমুজ্জ্বল কমলাসন চতুর্ভুজ ব্ৰহ্মাকে ব্ৰহ্মাণ্ডমধ্যে মুহুর্মুহুঃ দেখিলেন। ৩

মহাদেব দেখিলেন;–সেই ব্ৰহ্মমূৰ্ত্তি সেইখানেই তিনভাগে বিভক্ত হইল; তাহার উর্ধ্বভাগে ব্ৰহ্মা, মধ্যভাগে বিষ্ণু ও অন্তভাগে শিব হইলেন। ৪

আবার দেখিলেন, পূর্বমূর্তি; আবার তাহা তিনভাগে বিভক্ত হইল; উর্ধ্বভাগ ব্ৰহ্মাকারে, মধ্যভাগ নারায়ণাকারে ও শেষভাগ শিবাকারে পরিণত হইল। ৫

এইরূপ সেই শরীর বারংবার ত্রিধা-বিভক্ত হইতে লাগিল–দেখিলেন। ৬

মহেশ্বর, এই সম্পূর্ণ জগন্মণ্ডলকে স্বীয় গর্ভে অবলোকন করিলেন। তিনি দেখিতে লাগিলেন;–কখন বিষ্ণুদেহ ব্ৰহ্মদেহে লীন হইল। ৭

কখন ব্ৰহ্মদেহ বিষ্ণুদেহে লয় পাইল; কখন শম্ভুদেহ বিষ্ণুদেহে মিশাইয়া গেল; কখন বিষ্ণুদেহ শম্ভুদেহে বিলীন হইল; কখন বা শম্ভুদেহ ব্ৰহ্মদেহে মিলাইল। ৮

এইরূপ বারম্বার পরস্পরের দেহে লয় পাইতে লাগিল এবং তিনজনেই একীভূত হইতে লাগিলেন। বামদেব আবার দেখিলেন; সেই অভিন্ন দেহ বিভিন্ন হইল। ৯

আবার সেই দেহ পরমাত্মাতে বিলীন হইল। ১০

শম্ভু, তন্মধ্যে দেখিলেন, বৃহৎ-বৃহৎ-পৰ্বতসমূহে বিরলসংবৃতা অনন্ত জলশায়িনী পৃথিবী। পুনরায় দেখিলেন, যেন সৃষ্টি কাল, ব্ৰহ্মা সমস্ত সৃষ্টি করিতেছেন; আপনি শিব, গরুড়াসন বিষ্ণু এবং ব্রহ্মা সকলেই পৃথক হইয়াছেন।১১

তখন দেখিলেন; দক্ষ প্রজাপতি, নিজ প্রমথগণ, মরীচি প্রভৃতি ব্ৰহ্মপুত্র ঋষিগণ, বীরিণী এবং সতী। ১২।

দেখিলেন, সন্ধ্যা, রতি, কাম, শৃঙ্গার, বসন্ত, হাব, ভাব, মায়াগণ, ঋষিগণ, দেবগণ, মরুদগণ। ১৩

দেখিলেন;-ঘনঘটা, চন্দ্র, সূৰ্য্য, বৃক্ষ, লতা, তৃণ, সিদ্ধ, বিদ্যাধর, যক্ষ, রাক্ষস, কিন্নর, মানুষ, ভুজঙ্গ, নক্র, মৎস্য, কচ্ছপ। দেখিলেন,–উল্কা, নির্ঘাত, ধূমকেতু, কৃমি, কীট, পতঙ্গ। ১৪-১৫

ধূর্জটি দেখিলেন;-কতকগুলি ব্যক্তি রমণীসহ মৈথুনভাবে প্রবৃত্ত; কেহ উৎপন্ন হইয়াছে, কেহ উৎপন্নপ্রায়; কেহ বা আসন্ন-মৃত্যু। ১৬

পরমেশ্বর শম্ভু দেখিলেন;–কতকগুলি ব্যক্তি হাসিতেছে; কতকগুলি ক্রীড়া করিতেছে; কতকগুলি বিলাপ করিতেছে; কতকগুলি বা দৌড়িতেছে। ১৭

মহাদেব দেখিলেন;–কতিপয় ব্যক্তি দিব্যালঙ্কারভূষিত মাল্যচন্দনচর্চিত হইয়া নিরন্তর ক্রীড়া করিতেছে। ১৮

দেখিলেন;–কতিপয় তপোধন মুনি, ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের নামাদি কীৰ্ত্তন ও তাহাদিগের স্তব করিতেছেন। ১৯

দেখিলেন;–কেহ কেহ নদীতীরে তপোবনে তপস্যা করিতেছেন; কেহ কেহ স্বাধ্যায়–বেদ অধ্যয়নে বা বেদাধ্যাপনে ব্যাপৃত রহিয়াছেন। ২০

তখন শিব, সপ্তসাগর নদী ও দেব-সরোবর সকল দেখিতে পাইলেন। আর তিনি আপনাকে পৰ্বতারূঢ় দেখিলেন। ২১

আর দেখিলেন;-মায়া লক্ষ্মীরূপে নারায়ণকে আর সতীরূপে শঙ্কররূপী আপনাকে অতীব মোহিত করিতেছেন। ২২

দেখিতে লাগিলেন; তিনি যেন সতীর সহিত কৈলাস, সুমেরু ও মন্দর পৰ্বতে এবং শৃঙ্গার-রসপূর্ণ দেবোদ্যানে বিহার করিতেছেন। ১৩

যেরূপে সতী, সেই দেহত্যাগ করিয়া হিমালয়নন্দিনী হইলেন, আপনি আবার তাহাকে প্রাপ্ত হইলেন, যেরূপে অন্ধকাসুর নিহত হইল, যেরূপে কার্তিকেয় উৎপন্ন হইলেন এবং তিনি যেরূপে তারকাসুরকে বধ করিলেন, তৎকালিক ভবিষ্যৎ ঘটনা হইলেও বৃষধ্বজ, তৎসমস্তই বিস্তারিতরূপে দেখিতে পাইলেন। ২৪-২৫

বিষ্ণু, নরসিংহরূপে যে প্রকারে হিরণ্যকশিপুকে বধ করেন, কালনেমি ও হিরণ্যাক্ষ তৎকর্তৃক যেরূপে নিহত হয়, তিনি পূৰ্বে দানবগণের সহিত যেরূপে যুদ্ধ করিয়াছিলেন, এবং যেরূপে যে যে দৈত্য বিনাশ করিয়াছিলেন, তৎকালিক ভবিষ্যৎ ঘটনা হইলেও দেবাদিদেব তৎসমস্তই দেখিতে পাইলেন। ২৬-২৭

মহাদেব, ব্ৰহ্মা হইতে সিদ্ধ-বিদ্যাধর-মনুষ্য-গ্রহ-নক্ষত্রাদি পর্যন্ত সমস্ত জগৎ প্রপঞ্চই পৃথক পৃথকরূপে দেখিয়া অবশেষে দেখিলেন; তিনি যেন তৎসমস্ত সংহার করিতেছেন। ২৮

সংহার শেষে দেখিলেন, ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর এই তিনজনমাত্র অবস্থিত; এই চরাচর জগৎ শূন্য। ২৯-৩০

শূন্যতার আবাসভূমি এই নিখিল জগন্মণ্ডলে অবশিষ্ট তিনজনের একজন ব্রহ্মা, বিষ্ণুশরীরে লীন হইলেন; আর একজন শিব, তিনিও বিষ্ণু শরীরে প্রবিষ্ট হইলেন। ৩১

তখন রুদ্রদেব, এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে একমাত্র অব্যক্তরূপী বিষ্ণুকেই দেখিতে পাইলেন; তদ্ভিন্ন আর কিছুই দেখিতে পাইলেন না। ৩২

অনন্তর দেখিলেন;–বিষ্ণুও অত্যন্ত উদ্ভাসমান জ্যোতির্ময় নিত্যতত্ত্ব পরমাত্মাতে বিলীন হইলেন। ৩৩।

অনন্তর দেখিলেন;–কেবল নিত্য জ্ঞানময়, আনন্দময়, জ্ঞানগম্য অদ্বিতীয় তুরীয় ব্ৰহ্ম, আর কিছুই পাইলেন না। ৩৪

শম্ভু, নিজ শরীর মধ্যেই পরমাত্মা অর্থাৎ ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের একত্ব ও পৃথকৃত্ব আর জগতের সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় দেখিতে পাইলেন। ৩৫

তখন শম্ভু, স্বপ্রকাশ শান্ত নিত্য অতীন্দ্রিয় একমেবাদ্বিতীয়ং ব্রহ্ম পরমাত্মাকেই দেখিতে পাইলেন, আর কিছুই দেখিতে পাইলেন না। ৩৬

তখন শিব,-কে ব্রহ্মা, কে বিষ্ণু, কে শিব, আর কিই বা জগৎ– পরমাত্মা হইতে এ সকলের ভেদ গ্রহণ করিতে পারিলেন না। ৩৭

শিব এইরূপ দেখিতেছেন, ইত্যবসরে হরি তদীয় শরীর মধ্য হইতে নির্গত হইলেন। তখন মায়াও বৃষধ্বজ শরীরে প্রবেশ করিলেন। ৩৮

জনার্দন, শম্ভুর নিকটে দেবত্রয়ের অভিন্নতা ও পার্থক্য প্রদর্শনপূর্বক তদীয় শরীর হইতে সত্বর বহির্গত হইলেন। ৩৯

সংযতচিত্ত মহাদেব সমাধি ত্যাগ করিলে মায়ামোহিত সেই দেবাধিদেবের মন সতীর প্রতি ধাবিত হইল। ৪০

হে দ্বিজোত্তমগণ! অনন্তর, মহেশ্বর, দাক্ষায়ণীর প্রফুল্ল-কমল-সন্নিভ মনোহর বদনমণ্ডলের দিকে বার বার দৃষ্টিপাত করিতে লাগিলেন। ৪১

অনন্তর, শঙ্কর-দক্ষ মরীচি প্রভৃতি ঋষিগণ নিজ প্রমথগণ, ব্রহ্মা এবং বিষ্ণু ইহাদিগকে তথায় দেখিয়া বিস্মিত হইলেন। ৪২

তখন জনার্দন, বৃষধ্বজ মহাদেবকে বিস্ময়াবিষ্ট দেখিয়া প্রসন্নবদনে ঈষৎ হাস্য করত তাহাকে বলিলেন;–শঙ্কর! তুমি ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরের একত্ব ও অনেকত্ব বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলে, এখন তাহা তুমি বেশ বুঝিয়াছ ত? ৪৩-৪৪

হে মহাদেব! প্রকৃতি, পুরুষ, কাল এবং মায়া, ইহারা–কে এবং কিরূপে, তাহা তুমি নিজ শরীরাভ্যন্তরেই দেখিতে পাইয়াছ। ৪৫

সদা শান্ত পরম মহৎ এক ব্ৰহ্ম কিরূপ? এবং তিনি নানারূপ হইলেন কিরূপে? ৪৬

মার্কণ্ডেয় বলিলেন; হে দ্বিজোত্তমগণ! ভগবান বৃষধ্বজ, ভগবান মধুসূদন কর্তৃক এইরূপ জিজ্ঞাসিত হইয়া এই যথার্থ বাক্য বলিতে লাগিলেন। ৪৭

পরম মঙ্গল-স্বরূপ শান্ত অনন্ত অচ্যুত একমাত্র ব্রহ্মই বিদ্যমান; তদ্ভিন্ন আর কিছুই নাই; হরে! নিখিল জগন্মণ্ডলই তাহা হইতে অভিন্ন; সৃষ্টিকার্যের জন্যই তিনি কাল প্রভৃতি রূপে প্রকাশমান। ৪৮

সেই নিরঞ্জন পরব্রহ্মই সমস্ত ভূতের উৎপত্তি-কারণ, আমরা তিনজন তাহারই অংশ; সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করিবার জন্য তাহারই রূপত্ৰয় বিভিন্ন ভাবে বিরাজ করিতেছে। ৪১

আমি, তুমি, ব্রহ্মা, কাল, প্রকৃতি বা অন্য কেহ–আমরা তাহার স্বরূপ হইলেও তদীয় প্রেরণা ভিন্ন কিছুই করিতে পারি না। ৫০

ভগবান্ বলিলেন,–হে বৃষধ্বজ! তুমি এই সার বুঝিয়াছ, সার সার কথাও বলিলে। ৫১

ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর-আমরা তিনজন তাঁহারই অংশ। অতএব হে শম্ভো! তুমি যদি ব্ৰহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের একত্ব বুঝিয়া থাক, তাহা হইলে আর ব্রহ্মাকে বধ করিতে পারিতেছ না। ৫২

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–মহাদেব, অমিততেজা বিষ্ণুর এই সকল কথা শুনিয়া এবং দেবত্রয়ের একতা দর্শন করতে ব্রহ্মাকে আর বধ করিলেন না। ৫৩

বিষ্ণু, যেরূপে শম্ভুকে ব্ৰহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরের অভেদ বুঝাইয়াছিলেন, তৎসমস্তই আমি তোমাদিগকে এই বলিলাম। এক্ষণে প্রস্তুত কথা বলিব, সন্দেহ নাই। ৫৪ ত্রয়োদশ অধ্যায় সমাপ্ত। ১৩

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *