১২. ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরের অভেদ

দ্বাদশ অধ্যায় ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরের অভেদ

ঋষিগণ বলিলেন,হে দ্বিজপুঙ্গব! জনার্দন, শিবের নিকট ব্ৰহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরের যে অভিন্নতা কীৰ্ত্তন করিয়াছিলেন, তাহা আমরা শুনিতে ইচ্ছা করি। ১

বিপ্রবর! গরুড়ধ্বজ কিরূপেই বা ত্রিদেবের একত্ব প্রদর্শন করিলেন, তাহা বলুন। আমাদিগের অত্যন্ত কৌতূহল জন্মিতেছে। ২

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–দেবত্রয়ের অভেদ প্রতিপাদন ও একত্ব প্রদর্শন-বিবরণ পরমপবিত্র, পরম গোপনীয়,–মুনিমণ্ডলী তাহা শ্রবণ করুন। ৩

হে মুনিবরগণ! গোবিন্দ, শিবকর্তৃক জিজ্ঞাসিত হইয়া সাদরে তাহাকে সম্বোধনপূর্বক দেবত্রয়ের অভেদ কীৰ্ত্তন করিতে লাগিলেন। ৪

পূৰ্বে জগৎ ছিল না, এই পরিদৃশ্যমান সমস্তই, প্রসুপ্তের ন্যায় তমোগুণের দুর্ভেদ্য আবরণে আবৃত, অলক্ষ্য ও অপরিজ্ঞাত ছিল। ৫।

তখন দিবা-রাত্র ছিল না; পৃথিবী ছিল না; জ্যোতি ছিল না; আকাশ ছিল না; জল ছিল না; বায়ু ছিল না; অধিক কি অন্য কিছুই ছিল না। ৬

থাকিবার মধ্যে–সূক্ষ্ম নিত্য অতীন্দ্রিয় অব্যক্ত, অবিশেষণ, অদ্বয় জ্ঞানময়, এক পরম ব্রহ্ম ছিলেন। ৭

হে ভূতনাথ! আর ছিলেন–সৰ্ব্বগত সনাতন প্রকৃতি-পুরুষ ও জগৎকারণ অখণ্ড কাল। ৮

হে মহেশ্বর। সেই যে এক পরম ব্রহ্ম, আমাদিগের এই রূপত্ৰয় তাহারই অর্থাৎ তিনিই এই তিনরূপে বিভক্ত; সেই জগদীশ্বরেরই কাল নামে আর একটী নিত্যরূপ আছে; তাহা অনাদি অনন্ত এবং নিজের কোন না কোন অংশবিশেষে জনকতা-সম্বন্ধ-সত্তা প্রযুক্ত সৰ্ব্বভূতেরই কারণ অর্থাৎ দণ্ড ক্ষণ মূহুর্তাদি-কালের অংশ; যে দণ্ড ক্ষণ বা মূহুর্তাদিতে সে বস্তুর উৎপত্তি, সেই দণ্ডাদি সেই বস্তুর কারণ; এইরূপে কালের অংশ কারণ হয় বলিয়া অংশী অখণ্ডকালও কারণ-পদ-বাচ্য। ৯-১০

অনন্তর স্বয়ং ব্রহ্ম, সৃষ্টি করিবার অভিপ্রায়ে প্রকৃতিকে বিক্ষোভিত করিয়া স্বপ্রকাশক শক্তিবলে নিরুপম ভাস্বর রূপে প্রকাশিত হন। ১১

প্রকৃতি সংক্ষুব্ধ হইলে মহত্তত্ত্ব উৎপন্ন হইল, পশ্চাৎ মহত্তত্ত্ব হইতে ত্রিবিধ (সাত্ত্বিক রাজসিক তামসিক) অহঙ্কারের উৎপত্তি। ১২

অহঙ্কার হইতে পঞ্চতন্মাত্র; সৰ্বব্যাপক পরমেশ্বর শব্দতন্মাত্র হইতে মূর্তি হীন আকাশ সৃষ্টি করেন। ১৩

হে মহেশ্বর। অনন্তর তিনি রসতন্মাত্র হইতে জল সৃজন করিলেন; নিরাধার সেই জলরাশিকে নিজ মায়াবলে স্বয়ং ধারণ করিলেন। ১৫

অনন্তর প্রভু পরমেশ্বর, সমভাবাপন্ন গুণত্রয়-স্বরূপে অবস্থিত প্রকৃতিকে সৃষ্টির জন্য বিক্ষোভিত করিলেন। ১৫

অনন্তর প্রকৃতি, সেই কারণ-জলে ত্রিগুণময় জগদ্বীজ অব্যগ্রভাবে স্থাপিত করিলেন। ১৬

সেই বীজ ক্রমে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়া সুবিশাল সুবর্ণময় অণ্ডাকারে পরিণত হইল। অনন্তর, সেই অণ্ড, বিশাল জলরাশিকে নিজ গর্ভমধ্যস্থ করিল। ১৭

জলরাশি সেই স্বর্ণময় অণ্ডের গর্ভে অবস্থিত হইলে পরমেশ্বর, সেই জলধারণী মায়াবলেই সমুদয় ব্রহ্মাণ্ডমণ্ডলকে ধারণ করিলেন। ১৮

সেই অণ্ডের বাহিরের সকল ভাগই জল, বহ্নি, বায়ু এবং আকাশ দ্বারা ক্রমে ক্রমে আবৃত। ১৯

জলরাশি–সপ্তসমুদ্র, নদী, সরোবর এবং দীর্ঘিকাদি পরিমাণেই ব্রহ্মাণ্ডের অভ্যন্তরে অবস্থিত; অন্য জল ব্রহ্মাণ্ডের বাহিরে ছিল। ২০

স্বয়ং পরমেশ্বর, ব্রহ্মা-স্বরূপে এই অণ্ড মধ্যে এক দৈববর্ষ বাস করিয়া সেই– অণ্ড ভেদ করিলেন। ২১

হে মহেশ্বর! তৎপরে তাহাতে জরায়ুরূপ সুমেরু ও অন্যান্য পৰ্বত সকলের অভ্যন্তরস্থ জলরাশি হইতে সপ্তসমুদ্র উৎপন্ন হইল। ২২

সেই সপ্তসমুদ্রমধ্যে ত্রিগুণময়ী পৃথিবী-ঈশ্বর প্রকৃতির নিয়োজিত গন্ধতন্মাত্র হইতে উৎপন্ন হইল। ২৩।

পৰ্বতাদি উৎপত্তির পূর্বে পৃথিবী উৎপত্তি হয়। ব্রহ্মাণ্ডখণ্ডের বিচিত্র সংযোগে পৃথিবী অত্যন্ত কঠিনাকৃতি। ২৪

সৰ্ব্বলোকগুরু ব্রহ্মা সেই পৃথিবীতে অবস্থিত। ২৫

যখন ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যস্থ ব্ৰহ্মা ব্যক্ত হন নাই–তখন, রূপতন্মাত্র হইতে তেজ উৎপন্ন হয়। ২৬

সৰ্ব্বভূতের জীবন সৰ্বত্ৰগ পবন, প্রকৃতির নিয়োজিত স্পর্শতন্মাত্র হইতে উৎপন্ন হইয়াছিল। ২৭

সেই অণ্ডের ভিতর বাহিরে অতুলনীয় জল, তেজ, বায়ু এবং আকাশদ্বারা ব্যাপ্ত ছিল। আর সকল বস্তুই কেবল অণ্ডগর্ভে ছিল। ২৮

হে মহেশ্বর। অনন্তর ব্রহ্মা প্রকৃতির ইচ্ছাক্রমে ত্রিগুণময় নিজ শরীরকে তিন ভাগে বিভক্ত করিলেন; হে শম্ভো! এই বিভক্ত শরীরত্রয় ত্রিগুণময় হইল। ২৯

হে মহেশ্বর। সেই অখণ্ড শরীরের ঊর্ধ্বভাগ চতুর্মুখ চতুর্ভুজ কমল-কেশর সন্নিভ আরক্তবর্ণ বিরিঞ্চিশরীরে পরিণত হইল। ৩০

মার্কণ্ডেয় উবাচ এতদ্ভুত্ব বচস্ত বিষ্ণোরমিততেজসঃ। হর্ষোৎফুল্লমুখঃ প্রোচে পুনরেব জনার্দন। ৩৯

তাহার মধ্যভাগে একমুখ, শ্যামবর্ণ, শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী চতুর্ভুজ বিষ্ণুশরীর। ৩১

আর অধোভাগে পঞ্চানন চতুর্ভুজ স্ফটিকবৎ শুক্লবর্ণ শিবদেহ হইল। ৩২

অনন্তর, জগৎপালক পরমেশ্বর, ব্রহ্মার শরীরে সৃষ্টিশক্তি নিযোজিত করিয়া আপনিই ব্রহ্মরূপে সৃষ্টিকর্তা হইলেন। ৩৩।

হে মহেশ্বর! তিনি বিষ্ণুশরীরে স্থিতি শক্তি নিজ মায়া প্রকৃতি ও নিজ জ্ঞানশক্তি নিযোজিত করিলেন। ৩৪

হে মহেশ্বর! এইরূপে পরমেশ্বর মদ্রূপে স্থিতিকর্তা হইলেন। আমাতে সর্বশক্তি নিয়োজিত করাতে আমি সর্বদা তৎস্বরূপে বিরাজমান। ৩৫

তখন পরমেশ্বর, শম্ভুশরীরে প্রলয়কারিণী শক্তি নিযোজিত করিলেন; সেই পরমেশ্বরই শম্ভুরূপে প্রলয়কৰ্ত্তা হইলেন। ৩৬

অতএব পরম জ্যোতির্ময় জ্ঞানস্বরূপ সেই অনাদি প্রভু ভগবানই–এই তিন শরীরে স্বয়ং বিরাজমান। এক পরমেশ্বরই সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয় এই তিন কাৰ্য্য করাতে ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং শিব-পৃথক পৃথক্ সংজ্ঞা প্রাপ্ত হইয়াছেন। ৩৭।

অতএব তুমি, আমি এবং বিধাতা আমরা বস্তুত পৃথক্‌ নহি। পূর্বোক্ত রূপেই আমাদিগের শরীর, রূপ ও জ্ঞান বিভিন্ন হইয়া পড়িয়াছে। ৩৮।

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–মহাদেব, অমিততেজা বিষ্ণুর এই কথা শুনিয়া হর্ষ প্রফুল্ল-বদনে পুনরায় তাহাকে বলিলেন। ৩৯

ঈশ্বর বলিলেন,–জ্যোতির্ময়, নির্লেপ, পরমেশ্বর যদি এক অর্থাৎ অদ্বিতীয় হইলেন, তাহা হইলে আবার মায়া কে? কাল কে? প্রকৃতি কে? ৪০

পুরুষই (জীবাত্মা) বা কাহারা? ইহারা কি পরমেশ্বর হইতে পৃথক্‌?–যদি পৃথক হন তাহা হইলে, পরমেশ্বর এক অর্থাৎ অদ্বয় হইলেন কিরূপে? হে গোবিন্দ! তৎসমস্ত এবং পরমেশ্বরের প্রভাব যথাযথরূপে আমার নিকট কীৰ্ত্তন কর। ৪১

ভগবান বলিলেন,–তুমিই ধ্যানস্থ হইয়া জ্যেতির্ময় নিত্য অক্ষয় আত্মস্বরূপ পরমেশ্বরকে আত্মাতে অবলোকন করিয়া থাক। ৪২।

প্রভো! তুমিই স্বয়ং ধ্যানযোগে মায়া, প্রকৃতি, কাল ও পুরুষ (জীবাত্মা) সমূহ অবগত হইয়া থাক, অতএব তুমি ধ্যান করিতে প্রবৃত্ত হও। ৪৩

এখন তুমি আমার মায়ায় মোহিত হওয়াতে, সেই পরম-জ্যোতিঃ বিস্মৃত হইয়া বনিতা-রত হইয়াছ। ৪৪

হে প্রমথনাথ! এখন আবার তুমি রোষাবেশে আপনি আপনা ভুলিয়া আমাকে প্রকৃতি প্রভৃতির স্বরূপ জিজ্ঞাসা করিতেছ। ৪৫

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–অনন্তর মহাদেব, তাহার সুনিশ্চিত বাক্য শ্রবণ করিয়া মুনিগণসমক্ষে যোগাবলম্বনপূর্বক ধ্যানস্থ হইলেন। ৪৬

মহেশ্বর, বদ্ধপৰ্য্যঙ্কাসনে মুদ্রিত নয়নে আত্মাতে আত্ম-চিন্তা করিতে লাগিলেন। ৪৭

এইরূপে পরব্রহ্ম চিন্তা করিতে করিতে তাঁহার শুভ্র শরীর, অদ্ভুততেজঃ সমুজ্জ্বল হইয়া অতিশয় দীপ্তি পাইল। তখন মুনিগণ সেই শরীরের দিকে দৃষ্টিপাত করিতে পারিলেন না ৪৮

শম্ভু ধ্যানমুক্ত হইলে, বিষ্ণুমায়া তৎক্ষণাৎ তাহাকে পরিত্যাগ করিলেন। তখন ধূর্জটি তপঃস্তেজঃসমুজ্জ্বল হইয়া অত্যন্ত দীপ্তি পাইতে লাগিলেন। ৪৯

যে সকল প্রমথগণ, সেবা করিবার জন্য শিবসমীপে অবস্থিত ছিল, তাহারা “ইনি শঙ্কর কি সূৰ্য” ইহা বিচার করিয়া স্থির করিতে পারিল না। ৫০

তখন স্বয়ং বিষ্ণুই গাঢ়সমাধিমগ্নচিত্ত ধূর্জটির শরীরাভ্যন্তরে জ্যোতীরপে প্রবেশ করিলেন। ৫১

অব্যয় নারায়ণ স্বয়ং তাহার জঠরে প্রবেশপূর্বক সমস্ত সৃষ্টিক্রম প্রদর্শন করিলেন। ৫২

শম্ভু–প্রথমেই স্থূল-সূক্ষ্মভাব-বর্জিত বিশেষণহীন নিত্যানন্দময় অথচ আনন্দশূন্য অদ্বিতীয় অতীন্দ্রিয় নির্মল। ৫৩

সকলের অদৃশ্য অথচ সৰ্ব্বদ্রষ্টা জগতের মূল কারণ আনন্দময় পরমবস্তু পরমাত্মাকে এবং আত্মাকেও তৎস্বরূপে দর্শন করিলেন। ৫৪

বাহ্যজ্ঞানশূন্য মহেশ্বর, তদ্গতচিত্তে দেখিলেন,–প্রকৃতি তাহারই স্বরূপ, কেবল সৃষ্টির জন্য ভিন্নতা প্রাপ্ত হইয়াছেন। ৫৫

দেখিলেন;-প্রকৃতি এক,–পরমেশ্বরের সমীপে বিভিন্নবৎ রহিয়াছেন। আর দেখিলেন, প্রকৃতি-নিরত পুরুষ সমূহ; ইহারাও প্রকৃতির ন্যায় কেবল সৃষ্টির জন্যই ভিন্নতা প্রাপ্ত হইয়াছেন। ৫৬

হে দ্বিজসত্তমগণ! যেমন অজস্র স্ফুলিঙ্গ বহুবিস্তৃত পাবকের অংশ, সেইরূপ এই পুরুষসমূহও পরমেশ্বরের অংশ। ৫৭

সেই পরম জ্যোতিই নিরন্তর কালরূপে প্রকাশ পাইতেছেন। এই কালেরই অংশবিশেষ-সৃষ্টি স্থিতি ও প্রলয়ের কারণ। ১৮

চন্দ্রশেখর দেখিলেন;-প্রকৃতি, পুরুষ, কাল সকলই পরমেশ্বর হইতে অভিন্ন; তবে সৃষ্টির জন্য ভিন্নতা প্রাপ্ত হইয়াছেন এইমাত্র। ৫৯

আবার পৃথগভূত সেই সকল বস্তুকে অভিন্ন দেখিলেন। তখন দেখিলেন; “একমেবাদ্বয়ং ব্রহ্ম নেহ নানাস্তি কিঞ্চন”, একমাত্র অদ্বিতীয় ব্ৰহ্ম ভিন্ন ইহ জগতে দ্বিতীয় বস্তু কিছুই নাই। ৬০

শিব দেখিলেন; সেই ব্রহ্মই প্রকৃতি ও কালরূপে প্রকাশ পান; তিনিই পুরুষরূপে সংসারে প্রবৃত্ত হন। ৬১

ভোগ করিবার জন্য প্রাণিগণের শরীরে অধিষ্ঠান করেন। শঙ্কর দেখিলেন,–সেই প্রকৃতিই মায়ারূপে হরি হর বিরিঞ্চিকে এবং অন্যান্য প্রাণিসকলকে মোহিত করেন। মায়ানাম্নী প্রকৃতিই স্ত্রীরূপে প্রাণিগণকে সতত সন্মোহিত করেন। ৬২-৬৩

তিনিই হরি-প্রিয়া লক্ষ্মী; তিনি সাবিত্রী; রতি, সন্ধ্যা; তিনিই সতী; তিনিই সতী-জননী বীরিণী। ৬৪।

সেই স্বয়ং প্রকৃতি বুদ্ধিরূপিণী; তাহাকেই লোকে চণ্ডিকাদেবী বলিয়া থাকে। স্বয়ং মহেশ্বর ধ্যানমাৰ্গ-রত হইয়া অবিলম্বে এই সমস্ত দর্শন করিলেন। ৬৫

হে দ্বিজোত্তমগণ! স্বয়ং নারায়ণ, মহেশ্বরকে মহদাদিভেদে সৃষ্টি-পরিপাটি, কাল, প্রকৃতি ও পুরুষবৃন্দ প্রদর্শন করিয়া আর আর যাহা দেখাইলেন, তাহা শ্রবণ কর। ৬৬।

দ্বাদশ অধ্যায় সমাপ্ত। ১২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *