১১. শিব-বিবাহ

একাদশ অধ্যায় শিব-বিবাহ

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–পূর্বেই বলিয়াছি, ব্রহ্মা স্মরণ করিবামাত্র নারদ এবং ব্ৰহ্মার অন্যান্য সমুদয় মানস পুত্রগণ যেন বায়ুচালিত হইয়া সমাগত হইলেন।১

তখন মহাদেব-সেই ঋষিবৃন্দ, ব্ৰহ্মা এবং প্রমথগণ সমভিব্যাহারে বিবাহের উপযুক্ত সময়ে সানন্দে দক্ষালয়ে যাত্রা করিলেন। ২

প্রমথগণ আনন্দভরে শঙ্খ, পটহ, ডিণ্ডিম, তূৰ্য্য ও বংশ প্রভৃতি বাদ্য বাজাইতে বাজাইতে শঙ্করের অনুগমন করিতে লাগিল। ৩

কতকগুলি প্রমথ, করতলে তালবাদ্য করিয়া পদধ্বনি করত অতিবেগে বিমানারোহণে বৃষধ্বজের অনুগমন করিতে লাগিল। ৪

বিবিধাকার প্রমথগণ বাদ্যশব্দ শুনিয়া নানাবিধ শব্দে কোলাহল করত নির্গত হইল। ৫

অনন্তর, দেব, গন্ধৰ্ব্ব ও অপ্সরোগণ-নৃত্য-গীত-বাদ্য ও আমোদ প্রমোদ করত সানন্দে বৃষধ্বজের অনুগমন করিতে লাগিলেন। ৬

হে বিপ্রশ্রেষ্ঠগণ! সেই তরুণতর গন্ধৰ্ব্ব ও প্রমথগণের শব্দে সমস্ত দিত্মণ্ডল ও ভূমণ্ডল পরিপূর্ণ হইল। ৭।

নিজগণ-পরিবৃত কামদেবও মহাদেবকে অত্যন্ত হর্ষিত ও মোহিত করত শৃঙ্গাররসাদি সমভিব্যাহারে তাহার সমক্ষেই তাঁহার অনুগমন করিতে লাগিলেন। ৮

মহেশ্বর, বিবাহ করিতে গমন করিলে ব্ৰহ্মাদি সমুদায় দেববৃন্দ, স্বেচ্ছা ক্রমেই মনোহর বাদ্যোদম করিতে লাগিলেন। ৯

হে দ্বিজোত্তমগণ! তখন দিত্মণ্ডল সুপ্রসন্ন হইল; অগ্নিত্রয় প্রশান্তভাবে প্রজ্বলিত হইতে লাগিল; পুষ্পবৃষ্টি হইতে থাকিল। ১০

সুগন্ধ পবন বহিতে লাগিল; বৃক্ষসকল কুসুমিত হইল; অসুস্থ প্রাণীরাও সুস্থভাব ধারণ করিল। ১১

হংস, সারস, কলহংস, ময়ূর ও চাতকবৃন্দ–যেন মহাদেবকে প্রেরণ করিবার জন্যই সুমধুর শব্দ করিতে লাগিল। ১২

ভুজঙ্গ, ব্যাঘ্রচর্ম, জটাজূট এবং শশিকলাই তাহার বর-ভূষণ হইল; সেই ভূষণেই তিনি সাতিশয় শোভা পাইতে লাগিলেন। ১৩

অনন্তর, মহেশ্বর শীঘ্রগামী বেগশালী বলীবর্দ আরোহণে ব্রহ্মা ও নারদাদি সমভিব্যাহারে ক্ষণমধ্যে দক্ষালয়ে গিয়া উপস্থিত হইলেন। ১৪

অনন্তর, মহাতেজা দক্ষ,–মহাদেব এবং ব্রহ্মাদিকে আসিতে দেখিয়া স্বয়ং গাত্রোত্থানপূর্বক তাহাদিগকে যথাযোগ্য আসন প্রদান করিলেন। ১৫

দক্ষ পাদ্যাদিদ্বারা তাহাদিগের যথোচিত পূজা করিয়া মানস মুনিবৃন্দের সহিত সম্ভাষণ করিলেন। ১৬

হে দ্বিজোত্তমগণ! অনন্তর দক্ষ, শুভমুহূর্তে শুভলগ্নে নিজ দুহিতা সতীকে সহর্ষে শিবের হস্তে সম্প্রদান করিলেন। ১৭

তখন বৃষধ্বজ, আনন্দ সহকারে বৈবাহিক-বিধি অনুসারে বরতনু দাঙ্গায়ণীর পাণিগ্রহণ করিলেন। ১৮

ব্রহ্মা এবং নারদাদি মুনিগণ, সুশ্রাব্য ঋগ্‌-যজুঃ-সাম গানদ্বারা মহেশ্বরের সন্তোষ সাধন করিলেন। ১৯

কতকগুলি প্রমথ বাদ্য করিতে লাগিল; অপর কতকগুলি নৃত্য করিতে লাগিল; মেঘদল, গগনতলে সমবেত হইয়া পুষ্পবৃষ্টি করিল। ২০

অনন্তর গরুড়ধ্বজ, অতিবেগসম্পন্ন গরুড়ে আরোহণ করিয়া কমলা সমভিব্যাহারে শম্ভু সমীপে আগমনপূর্বক এই কথা বলিলেন। ২১

ভগবান বলিলেন,–মহেশ্বর! বর্ণ-বৈপরীত্যে আমি যেমন কমলাযোগে শোভা পাইতেছি, সেইরূপ তুমিও এই স্নিগ্ধ-নীলাঞ্জন-শ্যামলা দাঙ্গায়ণীর সংসর্গে শোভা পাইতেছ। ২২-২৩

তুমি ইহার সহকারিতায় দেবগণ ও মনুষ্যগণকে রক্ষা কর, তুমি ইহার সহযোগে সংসারীদিগের সতত মঙ্গলসাধন কর; হে শঙ্কর! তুমি ইহার সাহায্যে যথাযোগ্যরূপে দস্যুগণকে সংহার করিবে। ২৪

যে ব্যক্তি ইহাকে দেখিয়া বা ইহার রূপলাবণ্যের কথা শুনিয়া ইহার প্রতি সাভিলাষ হইবে, হে ভূতনাথ! তুমি তাহাকে বধ করিবে; এ বিষয়ে বিচার বিতর্ক করিতে হইবে না। ২৫

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–হে দ্বিজগণ! সৰ্ব্বজ্ঞ মহাদেব, হৃষ্টচিত্ত পরমেশ্বর নারায়ণকে প্রীতিভরে “তাহাই হইবে” বলিলেন। ২৬

অনন্তর ব্রহ্মা, চারুহাসিনী দক্ষনন্দিনীকে দেখিয়া কামাবিষ্টচিত্তে তাহার মুখাবলোকন করিতে লাগিলেন। ২৭

ব্রহ্মা বারবার সতীর মুখের দিকে সতৃষ্ণ দৃষ্টিনিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তখন তিনি অবশ হইয়া আবার ইন্দ্রিয়বিকার প্রাপ্ত হইলেন। ২৮

হে দ্বিজোত্তমগণ! তখন উজ্জ্বল দহনসন্নিভ ব্ৰহ্মবীৰ্য, মুনিগণের সমক্ষেই ভূতলে নিপতিত হইল। ২৯

হে দ্বিজবরগণ! অনন্তর সেই বীৰ্য্য হইতে–সম্বৰ্ত্ত, আবর্ত পুষ্কর এবং দ্রোণ নামে নির্ঘোষকারী মেঘচতুষ্টয় গর্জন ও বারিধারা বর্ষণ করত উৎপন্ন হইল। ৩০

সেই মেঘদল গগনমণ্ডল আচ্ছন্ন করিলে এবং ঘোরতর গর্জন করিতে থাকিলে মহাদেব, দাক্ষায়ণীদেবীকে দেখিয়া অত্যন্ত কামমোহিত হইলেন। ৩১

তখন শঙ্কর, কামমোহিত হইলেও নারায়ণের বাক্যস্মরণে শূল উদ্যত করিয়া ব্ৰহ্মাকে বধ করিতে অভিলাষী হইলেন। ৩২

ব্রহ্মাকে বধ করিবার জন্য শম্ভু শূল উদ্যত করিলে মরীচি, নারদ প্রভৃতি দ্বিজবরগণ হাহাকার করিতে লাগিলেন। ৩৩

দক্ষও শঙ্কিতচিত্তে সত্বর সম্মুখে আসিয়া, হস্ত উত্তোলনপূর্বক “মৈবং মৈবং” (এরূপ করিবেন না, এরূপ করিবেন না) বলিয়া ভূতনাথকে নিষেধ করিতে লাগিলেন। ৩৪।

অনন্তর মহেশ্বর, দক্ষকে সন্মুখবর্তী দেখিয়া নারায়ণ-বাক্য স্মরণ করাইতে করাইতে এই কথা বলিলেন,–হে বিপ্রবর প্রজাপতে। নারায়ণ এইমাত্র এইখানেই যাহা বলিলেন, আমিও তাহা করিতে স্বীকার করিয়াছি। ৩৫-৩৬

“যে ব্যক্তি এই রমণীকে সকামচিত্তে দর্শন করিবে, তুমি তাহাকে বধ করিবে”-বিষ্ণুর এই বাক্য ব্ৰহ্মাকে বধ করিয়া সফল করিব। ৩৭

ব্ৰহ্মা, সকাম হইয়া এই সতীকে দর্শন করত স্খলিতবীৰ্য্য হইল কেন? যখন অপরাধ করিয়াছে, তখন অবশ্যই ইহাকে বধ করিব। ৩৮

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–মহাদের এই সব কথা বলিতেছিলেন, ইত্যবসরে সৰ্বজগৎ-প্রভু বিষ্ণু শীঘ্র তাহার সম্মুখবর্তী হইয়া তাহাকে ব্ৰহ্মবধ করিতে নিষেধ করত বলিলেন,–হে ভূতনাথ! এই জগৎস্রষ্টা জগৎপূজ্য ব্রহ্মাকে বধ করিও না। ইনিই সতীকে তোমার ভাৰ্য্যা করিয়া দিয়াছেন। ৩৯-৪০

শম্ভো। এই চতুরানন, প্রজাসৃষ্টি করিবার জন্যই প্রাদুর্ভূত হইয়াছেন; ইনি বিনষ্ট হইলে জগৎসৃষ্টি করিতে পারে, এমন প্রাকৃত-পুরুষ এখন আর নাই। ৪১

আমরা তিন জনেই পুনঃপুনঃ সৃষ্টি-স্থিতি-সংহার করি; তন্মধ্যে সামঞ্জস্য মত কোন কাৰ্য্য এই ব্রহ্মা করেন, কোন কাৰ্য আমি করি, কোনটী বা তুমি কর। ৪২

এই তিন জনের মধ্যে একজন বিনষ্ট হইলে তাহার কাৰ্য্য করিবে কে? অতএব হে বৃষধ্বজ! তুমি বিধাতাকে বধ করিও না। ১৩

ঈশ্বর বলিলেন; আমি এই চতুরাননকে বধ করিয়া প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করিব; সৃষ্টিকর্তার অভাব হয়, আমিই স্থাবর-জঙ্গম প্রজা সৃষ্টি করিব। ৪৪

অথবা আমি নিজ তেজঃপ্রভাবে অন্য বিধাতা সৃষ্টি করিব; তিনিই আমার আদেশে সৰ্ব্বদা সৃষ্টি করিবেন। ৪৫

প্রভো! আমি এই বিধাতাকে বিনাশ করিয়া প্রতিজ্ঞা পালন করত এক জন সৃষ্টিকর্তা সৃজন করিব; হে চতুভুজ। এ কাৰ্য্য করিতে আমাকে বারণ করিও না। ৪৬

মার্কণ্ডেয় বলিলেন,–চতুর্ভুজ,–গিরশের এই কথা শুনিয়া প্রসন্ন মুখে ঈষৎ হাস্য করত পুনরায় বলিলেন, এ কাজ করিও না। ৪৭

হে দ্বিজোত্তমগণ। তিনি ঈশ্বরকে বলিলেন; নিজের উপর ঐ প্রতিজ্ঞা করা উচিত হয় না। ৪৮

অনন্তর, শম্ভু পুনরায় বলিলেন; বিধাতা আমার আত্মা কিরূপে? এই অগ্রবর্তী বিধাতা প্রত্যক্ষতই ভিন্ন বলিয়া লক্ষিত হইতেছে। ৪৯

তখন ভগবান্ গরুড়ধ্বজ–মহাদেবের সন্তোষ সাধন করত মুনিগণসম্মুখে হাস্য করিয়া বলিলেন; ব্রহ্মা তোমা হইতে ভিন্ন নহেন; তুমি ব্ৰহ্মা হইতে বিভিন্ন নহ; আমিও তোমাদিগের উভয় হইতে ভিন্ন নহি; আমাদিগের আত্মা চিরদিন অভিন্ন। ৫০-৫১

প্রধান অপ্রধান, খণ্ড অখণ্ড ও সাকার জ্যোতির্ময় (নিরাকার) স্বরূপে অবস্থিত আমারই দুই-ভাগ তোমরা দুইজন; আর আমি এক ভাগ। ৫২

তুমিই বা কে? আমিই বা কে? আর ব্রহ্মাই বা কে?-পরমাত্মস্বরূপী আমারই এই বিভিন্ন তিন অংশ, সৃষ্টি-স্থিতি-সংহারের কারণ। ৫৩

তুমি আপন মনে আত্মচিন্তা কর,-মনে কর জগন্মণ্ডল আত্মার উপর প্রতিষ্ঠিত; আর ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের অভিন্নভাব হৃদয়ে গাঢ়-প্রবিষ্ট কর। ৫৪

হে হর। যেমন এক ব্যক্তিরই মস্তক ও গ্রীবাদি ভেদে অনেক অঙ্গ; সেই রূপ আমারও তিন অংশ। ৫৫

সেই যে আত্মপরপ্রকাশ, কূটস্থ, অব্যক্ত, অনন্ত, নিত্য, দীর্ঘহ্রস্বাদি বিশেষণ বর্জিত পরাৎপর পরমজ্যোতি–তাহাই আমরা,-ভিন্ন নহি। ৫৬

মার্কণ্ডেয় বলিলেন, মহাদেব তাহার এই কথা শুনিয়া বিমোহিত হইলেন; তিনি এই অভিন্নতা অবগত থাকিলেও অন্যচিন্তায় তাহা বিস্মৃত হওয়াতে বিভিন্নরূপে প্রতীয়মান ব্ৰহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের অভিন্নতা এবং একরূপ দেবত্রয়ের বিশেষণভেদের কথা গোবিন্দকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন। ৫৭-৫৮

অনন্তর, নারায়ণ শিব-কর্তৃক জিজ্ঞাসিত হইয়া দেবত্রয়ের অভিন্নতা-কীর্তন ও একত্ব প্রদর্শন করিলেন। ৫৯

তখন মহাদেব, নারায়ণের মুখ-কমল-কোষ হইতে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের অভিন্নরূপতা শ্রবণ ও স্বরূপ দর্শন করিয়া কুসুম-মধু-সন্নিভ আরক্তবর্ণ বিধাতাকে আর বধ করিলেন না। ৬০ একাদশ অধ্যায় সমাপ্ত ॥ ১১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *