০৮. ইরাশী-এর বর্ণনা

ইরাশী-এর বর্ণনা

ইউনুস ইবন বুকায়ার বলেন, মুহাম্মদ ইবন ইসহাক……. আবদুল মালিক ইবন আবু সুফিয়ান ছাকাকী থেকে বর্ণনা করেন তিনি বলেন, বাবেল তথা ব্যাবিলনের ইরাশ অঞ্চলের একজন লোক কতক উট নিয়ে মক্কায় এসেছিল। আবু জাহল ইবন হিশাম, তার নিকট থেকে উটগুলো ক্রয় করে। কিন্তু মূল্য পরিশোধে সে অযথা বিলম্ব করতে থাকে। ইরাশী লোকটি কুরায়শের গণ্যমান্য লোকদের সভায় আসে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তখন মসজিদের একপাশে বসা ছিলেন। সে বলল, হে কুরায়শ গোত্র! আমার পক্ষে আপনাদের মধ্য থেকে কে আবু জাহল ইবন হিশামের উপর শক্তি প্রয়োগ করতে পারবেন? সে আমার পাওনা পরিশোধ করছে না।

১. ইরাশী শব্দটি ইরাশ নামক স্থানের সাথে সম্পর্কযুক্ত।

আমি একজন ভিনদেশী মুসাফির। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দিকে ইঙ্গিত করে তারা বলল, ওই যে লোকটি দেখছ, তুমি তার নিকট যাও! তিনিই পারবেন তোমার পাওনা উসুল করে দিতে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও আবু জাহলের মধ্যে বিরাজমান বিরোধপূর্ণ সম্পর্কের কারণে তারা এমনটি বলেছিল। ইরাশী এসে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পাশে দাঁড়ায়। সে তাকে সকল বৃত্তান্ত অবহিত করে। তিনি তার সাথে রওনা হন। লোকজন যখন দেখল, রাসূলুল্লাহ (সা) ইরাশী লোকটির সাথে যাচ্ছেন, তখন তারা একজন লোককে বলল, তুমিও তাঁর পেছনে পেছনে যাও এবং তিনি কি করেন তা লক্ষ্য কর। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবু জাহলের বাড়ীতে উপস্থিত হন এবং দরজায় আঘাত করেন। আবু জাহল বলে “কে?” “আমি মুহাম্মাদ, তুমি বেরিয়ে এসো। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, সে বেরিয়ে, আসে। তখন তার মুখমণ্ডল ছিল রক্তহীন ফ্যাকাশে। ভয়ে তার চোহারা বিবৰ্ণ হয়ে গিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, এ লোকটির পাওনা চুকিয়ে দাও! সে বলল, ঠিক আছে, দাড়াও, এখনি আমি ওর পাওনা চুকিয়ে দিচ্ছি। সে ঘরে যায় এবং ফিরে এসে ইরাশী লোকটির পাওনা দিয়ে বুঝিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা) ফিরে আসেন এবং লোকটিকে বলেন, এবার তুমি তোমার পথে চলে যেতে পোর। ইরাশী পুনরায় কুরায়শীদের মজলিসে এসে উপস্থিত হয়। সে বলে, ওই লোকটিকে আল্লাহ তা’আলা উত্তম প্রতিদান দিন! আমার পাওনা আমি বুঝে নিয়েছি। ওরা যে লোকটিকে পাঠিয়েছিল। সে ওদের নিকট ফিরে আসে। তারা তাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কী দেখলে? সে বলে, যা ঘটেছে তা তো এক অতীব আশ্চর্য ঘটনা। আল্লাহর কসম, মুহাম্মাদ (সা) গিয়ে তাঁর দরজায় আঘাত করেন। তাতে আবু জাহল দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। যেন তাঁর দেহে তখন প্ৰাণ ছিল না। মুহাম্মদ বললেন, এই লোকের পাওনা চুকিয়ে দাও!” আবু জাহুল বললেন, হ্যা তাই হবে, তুমি দাড়াও, আমি তার পাওনা নিয়ে আসছি। এরপর সে ঘরে প্রবেশ করে এবং তার পাওনা এনে তাকে দিয়ে দেয়। তাদের কথাবার্তা শেষ হওয়ার পর অবিলম্বে আবু জাহল সেখানে হাযির হয়। তারা বলে, হায় হায়, তোমার কী হয়েছিল? যে কাজ তুমি করেছ, আল্লাহর কসম আমরা তো ইতোপূর্বে কখনো তা হতে দেখিনি। সে বলল, হায়!! আল্লাহর কসম, প্রকৃত ঘটনা এই যে, মুহাম্মাদ আমার দরজায় আঘাত করে এবং আমি তার কণ্ঠস্বর শুনতে পাই। তাতে আমি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। এরপর আমি তার নিকট বেরিয়ে আসি। তখন আমি তার মাথার উপর দিয়ে একটি বিশালাকার উট দেখতে পাই। ওই উটের মাথা, ঘাড় ও দাতের ন্যায় ভয়ংকর ও বিরাট মাথা ঘাড় ও দাত আমি কখনো দেখিনি। আল্লাহর কসম, যদি আমি ওই পাওনা দিতে অস্বীকার করতাম, তাহলে ওই উটি নিশ্চয়ই সুমামাকে খেয়ে ফেলত।

পরিচ্ছেদ ইমাম বুখারী (র) বলেন, আইয়াশ ইবন ওয়ালীদ… উরওয়া ইকন যুবােয়র থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি ইবন ‘আসকে বলেছিলাম, মুশরিকগণ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি কঠোরতম যে আচরণ করেছে, তা আমাকে একটু বলুন। তিনি বললেন, একদিন কা’বা গৃহের হাতীম অংশে রাসূলুল্লাহ (সা) নামায আদায় করছিলেন। তখন উকবা ইবন আবু মুআয়ত

সেখানে উপস্থিত হয়। সে তার কাপড় দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর গলা পেঁচিয়ে সজোরে টান দেয়। তখন হযরত আবু বকর (রা) সেখানে উপস্থিত হন এবং উকবাকে ঘাড় ধরে সরিয়ে দিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে মুক্ত করেন। তখন হযরত আবু বকর (রা) নিম্নোক্ত আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, :

একজন লোককে তোমরা কি কেবল এজন্যেই হত্যা করবে যে, সে বলে আমার প্রতিপালক আল্লাহ। অথচ সে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ সহ তোমাদের নিকট এসেছে। সে মিথ্যাবাদী হলে তার মিথ্যাবাদিতার জন্যে সে দায়ী হবে। আর যদি সে সত্যবাদী হয়, সে তোমাদেরকে যে শাস্তির কথা বলে তার কতক তোমাদের উপর আপতিত হবেই। আল্লাহ তা’আলা সীমালংঘনকারী ও মিথ্যাবাদীকে সৎপথে পরিচালিত করেন না (৪০ : ২৮) {

এ হাদীছের সমর্থনে আল্লামা বায়হাকী (র) হাকিম… উরওয়া থেকে বর্ণনা করেছেন তিনি বলেছেন যে, আমি আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন ‘আসকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রতি কুরায়শদের শক্রতার জঘন্যতম প্রকাশরুপে আপনি কোন ঘটনা দেখেছেন? তিনি বললেন, এ বিষয়ে আমি যা দেখেছি তা হল, তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ একদিন কা’বা শরীকের হাতীম অংশে সমবেত হয়েছিল। সেখানে তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রসংগ আলোচনা করে। তারা বলে যে, এই লোকটির ব্যাপারে আমরা যা ধৈর্য ও সংযম প্ৰদৰ্শন করছি এরূপ ধৈৰ্য ধারণ করতে আমরা কখনো কাউকে দেখিনি। সে আমাদের ধৈর্যশীল ও জ্ঞানবান লোকদেরকে মুখ ঠাওরাচ্ছে। আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে গালমন্দ করছে আমাদের দীন-ধর্মের সমালোচনা করছে আমাদের ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি করছে আমাদের দেবতা ও উপাস্যদেরকে গাল দিচ্ছে। তার ব্যাপারে আমরা এখন এক মহাসংকটের সম্মুখীন।

তারা হুবহু এ কথা বা এমর্মের বক্তব্য রেখেছিল অথবা তারা আলোচনা করছিল ঠিক ওই সময়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সেখানে এলেন এবং সোজা এসে হাজারে আসওয়াদ চুম্বন করেন। এরপর তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে তিনি তাওয়াফ করতে শুরু করেন। তাকে উদ্দেশ্য করে তারা বিভিন্ন কটুক্তি করতে থাকে। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মুখমণ্ডলে এর প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তবু তিনি তাওয়াফ চালিয়ে যেতে থাকেন। দ্বিতীয় চক্করে যখন তিনি তাদেরকে অতিক্রম করছিলেন, তখনও তারা তাঁকে লক্ষ্য করে কটুক্তি করে। তৃতীয়বারও যখন তারা এরূপ করলো, তখন তিনি তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, হে কুরায়শ সম্প্রদায়! তোমরা কি শুনছো? আমি কিন্তু তোমাদের জন্যে এমন বিষয় নিয়ে এসেছি। যাতে তোমাদের যাবাহ হওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তার বক্তব্য শুনে তাদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সকলের মধ্যে পিন-পতন নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। সবাই তখন স্থির ও অনড় যেন তাদের মাথায় পাখি বসেছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে নিন্দমুখর

SS–

ব্যক্তিটি সে বক্তব্যটি গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করে বলে-হে আবুল কাসিম! ভালোয় ভালোয় এখান থেকে চলে যাও, তুমি তো মূখ্য নও। রাসূলুল্লাহ্ (সা) চলে গেলেন। পরের দিন তারা সকলে পুনরায় হাতীম অংশে সমবেত হয়। আমিও তাদের সাথে ছিলাম। তারা একে অন্যকে বলে, তোমরা যা কিছু করো না। আর সে যা কিছু করেছে তা তো তোমাদের সবারই আছে। এমনকি যখন সে তোমাদের অপসন্দের কথা বলেছে তোমরা তাকে ছেড়ে দিয়েছ।

ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এসে সেখানে উপস্থিত হন। তারা সবাই একযোগে তার উপর আক্রমণ চালায়। সকলে তাকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তিনি তাদের দীন-ধর্ম ও উপাস্যদের যে দোষত্রুটি বর্ণনা ও সমালোচনা করেন, সেগুলো উল্লেখ করে তারা বলে, তুমিই কি এরূপ বলে থাক? রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, হ্যা, আমিই এরূপ বলে থাকি। তাদের একজনকে আমি দেখলাম যে, সে তার চাদরের উভয় প্রান্ত কষে ধরে তার গলায় পেচিয়ে সজোরে টানছে। এদিকে তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে হযরত আবু বকর (রা) তার প্রতিবাদ করে বলছিলেন, তোমাদের সর্বনাম হোক। তোমরা একজন মানুষকে কি কেবল এ জন্যেই হত্যা করবে যে, সে বলে আমার প্রতিপালক আল্লাহ? তখন তারা তাঁকে ছেড়ে চলে যায়। কুরায়শদের নিষ্ঠুর আচরণসমূহের মধ্যে এটিই আমার দেখা নিষ্ঠুরতম আচরণ।

পরিচ্ছেদ

রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁর সাহাবীগণের প্রতি কুরায়শ নেতৃবর্গের আক্রোশ, তার

সমবেত উপস্থিতি এবং তাকে তাদের হাতে সোপর্দ করার দুরাশা। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ইচ্ছায় চাচা আবু তালিব তাঁকে তাদের হাতে সোপর্দ করতে অস্বীকৃতি জানালেন।

‘ইমাম আহমদ (র) বলেন, ওয়াকী’ ………… আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন, আল্লাহর পথে আমি এমন নির্যাতন ভোগ করেছি যা অন্য কাউকে ভোগ করতে হয়নি। আল্লাহর পথে আমি এমন ভয়-ভীতির মুখোমুখি হয়েছি। অন্য কেউ তেমনটি হয়নি। রাতে-দিনে ত্রিশ দিন আমার এমন কেটেছে যে, আমার নিকট এবং বিলালের নিকট কোন জীবের আহারযোগ্য কিছুই ছিল না। বিলাল তার বগলের নীচে যেটুকু খাদ্য রেখেছিল তা ব্যতীত। তিরমিয়ী ও ইবন মাজাহ হাম্মদ ইবন সালামাহ থেকে এ হাদীছটি উদ্ধৃত করেছেন। তিরমিয়ী একে সহীহ ও হাসান বলে অভিহিত করেছেন।

মুহাম্মদ ইবন ইসহাক বলেন, চাচা আবু তালিব রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি অপোর দয়া দেখিয়েছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে রক্ষা করেছেন এবং তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) অব্যাহত গতিতে দীন প্রচারে আল্লাহ নির্দেশ পালন করে গিয়েছেন। কোন কিছুই তাকে দীন প্রচার থেকে বিরত রাখতে পারেনি। কুরায়শরা যখন দেখতে পেল যে, তাদেরকে পরিত্যাগ করা এবং তাদের উপাস্যদের সমালোচনা করা ইত্যাকার তাদের অপসন্দনীয় কাজগুলো থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বিরত থাকছেন না এবং তারা এও দেখল যে, চাচা আবু তালিব তাঁর প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে যাচ্ছেন, তার পাশে দাঁড়িয়ে এবং তাকে ওদের হাতে সোপর্দ করতে

হয়। প্রতিনিধি দলে ছিল উতবা ইবন রাবীআ, শায়বা ইবন রাবীআ (ইবন আবদ শামস ইবন আবাদ মানাফ ইবন কুসাই), আবু সফিয়ান সাখার ইবন হারব ইবন উমাইয়া ইবন আবদ শামস, আবুল বুখতারী আস ইবন হিশাম (ইবন হারিছ ইবন আসাদ ইবন আবদিল উদ্যযা ইবন কুসাই, আসওয়াদ ইবন মুতিব ইবন আসাদ ইবন আবদিল উষযা, আবু জাহল তার নাম আমর ইবন হিশাম, ইবন মুগীরা ইবন আবদুল্লাহ ইবন উমর ইবন মািখযুম, ওয়ালীদ ইবন মুগীরা ইবন আবদিল্লাহ ইবন উমার ইবন মািখযুম ইবন ইয়াকযা ইবন মুররা ইবন কাআব ইবন লুওয়াই নাবীহ ও মুনাব্বিহ— এদের দু’জনের পিতা হাজ্জাজ ইবন আমির ইবন হুযায়ফা ইবন সাঈদ ইবন সাহম ইবন আমর ইবন হাসীস ইবন কাআব ইবন লুওয়াই, “আস ইবন ওয়াইল ইবন সাঈদ ইবন সাহিম। ইবন ইসহাক বলেন, তাদের সাথে আরো কেউ ও থাকতে পারে।

তারা বলল, হে আবু তালিব! আপনার ভাতিজা তো আমাদের উপাস্যদেরকে গলি মন্দ করে, আমাদের ধর্মের সমালোচনা করে, আমাদের বিজ্ঞজনদেরকে মূখ্য বলে আখ্যায়িত করে এবং আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকে পথ ভ্ৰষ্ট রূপে চিহ্নিত করে। সুতরাং আপনি হয় আমাদের দুর্নােম করা থেকে তারা বিরত রাখবেন, নতুবা তার ও আমাদের মধ্যস্থল থেকে আপনি সরে দাঁড়াবেন। কারণ, তার ধর্মমতের বিরোধিতায় আপনি ও আমাদের ন্যায় আছেন, তখন আমরা তাকে দেখে নিব।

আবু তালিব তাদের সাথে নম্রভাবে কথা-বার্তা বললেন এবং ভালোয় ভালোয় তাদেরকে বিদায় দিলেন। তারা চলে গেল, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যথা নিয়মে তার কাজ চালিয়ে যেতে লাগলেন, তিনি আল্লাহর দীন প্রচার ও মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। ফলে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে তাদের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে উঠে। এদিকে কুরায়শদের মধ্যে পরস্পর অধিকহারে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কথা আলোচিত হতে থাকে। ফলে, তারা তার বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার চিন্তা-ভাবনা করে এবং একে অন্যকে এ জন্যে প্ররোচিত করে। তারা দ্বিতীয়বার আবু তালিবের নিকট আসে। তারা বলে, হে আবু তালিব। আমাদের মধ্যে আপনি একজন প্ৰবীণ মর্যাদাবান ও সন্ত্রান্ত লোক। আপনাকে আমরা বলেছিলাম, আপনার ভাতিজাকে আমাদের সমালোচনা থেকে বিরত রাখতে, আপনি কিন্তু তাকে থামিয়ে রাখেননি। আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে গালি দেয়া জ্ঞানী-গুণীদেরকে মুৰ্থ বলা এবং আমাদের উপাস্যদের সমালোচনা করার ন্যায় অনাচার আমরা আর সহ্য করব না। শেষ পর্যন্ত হয় আপনি তাকে আমাদের থেকে বিরত রাখবেন নতুবা এর ফলশ্রুতিতে আমরা তার এবং আপনার উপর চড়াও হব। যতক্ষণ না আমাদের দু’পক্ষের কোন এক পক্ষ ধ্বংস হয়। তারা হুবহু তাকে একথা বা এমর্মের অন্য কোন কথা বলেছিল। এরপর তারা ওখান থেকে প্রস্থান করে। স্বগোত্রীয়দের লোকদের বিচ্ছেদ-বেদনা ও শক্ৰতা আবু তালিবের নিকট গুরুতর ঠেকে। আবার রাসূলুল্লাহ (সা)-কে ওদের হাতে সোপর্দ করা কিংবা তাকে অপমানিত করার ব্যাপারেও তিনি কোনমতে সম্মত ছিলেন না।

ইবন ইসহাক বলেন, ইয়াকুব ইবন উতবা বলেছেন, কুরায়শের নেতৃবর্গ যখন আবু তালিবকে একথা বলল, তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে ডেকে আনলেন এবং বললেন, “ভাতিজা! তোমার সম্প্রদায়ের লোকেরা আমার নিকট এসে এরূপ এরূপ বলেছে। তারা যা যা

বলেছিল তিনি তা তাঁকে শুনালেন। সুতরাং তুমি নিজেও বঁচি আমাকেও বাঁচতে দাও! আমার মাথায় এমন বােঝা চাপিয়ে দিও না যা বহন করার ক্ষমতা আমার নেই। তাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ধারণা করলেন যে, তার চাচার মনোভাবের পরিবর্তন ঘটেছে এবং তিনি তাকে ত্যাগ করতে এবং ওদের হাতে তুলে দিতে যাচ্ছেন। তাঁকে রক্ষায় ও সহযোগিতায় তার চাচা অক্ষম হয়ে পড়েছেন। এ প্রেক্ষাপটে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “আল্লাহর কসম, ওরা যদি আমার ডান হাতে সূৰ্য এবং বাম হাতে চন্দ্ৰ এনে দেয় এই শর্তে যে, আমি ওই কাজ ছেড়ে দিব, তবু আমি তা ছেড়ে দেব না যতক্ষণ না আল্লাহ্ এই দীনকে বিজয়ী করেন কিংবা ওই পথে আমার মৃত্যু হয়। দুই চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠলো এবং তিনি কেন্দেই ফেললেন। তারপর ওখান থেকে উঠে গেলেন। তিনি যখন ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন আবু তালিব তাকে ডেকে বললেন “ভাতিজা! তুমি নিকটে আস। তখন তিনি কাছে আসলেন এবং আবু তালিব বললেন, “ভাতিজা! তুমি যাও, তোমার মন যা চায় তুমি তা বলতে থােক। আল্লাহর কসম, আমি কখনাে তোমাকে ওদের হাতে তুলে দেব না।”

ইবন ইসহাক, বলেন, কুরায়শরা বুঝতে পারল যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে ত্যাগ করতে এবং তাঁকে হস্তান্তর করতে আবু তালিব রাষী নন। বরং তাঁর জীবন রক্ষায় আবু তালিব প্রয়োজনে কুরায়শদেরকে ত্যাগ করতে এবং তাদের শক্ৰতা বরণ করে নিতে প্ৰস্তৃত। তখন তারা আম্মারা ইবন ওয়ালীদ ইবন মুগীরাকে তাঁর নিকট নিয়ে যায়। তারা তাঁকে বলে, হে আবু তালিব! এ হল ওয়ালীদের পুত্র আম্মারা। কুরায়শ বংশের শ্রেষ্ঠতম সাহসী ও সর্বাধিক সুদৰ্শন যুবক। আপনি তাকে গ্ৰহণ করুন। তার জ্ঞান-গরিমা, বিদ্যা-বুদ্ধি ও শক্তি-সাহস আপনার জন্যেই উৎসগীকৃত থাকবে। আপনি তাকে পুত্ররূপে গ্ৰহণ করুন। সে একান্ত আপনার হয়েই থাকবে। বিনিময়ে আপনার ভাতিজাকে আপনি আমাদের হাতে তুলে দিন। সে তো আপনার ধর্ম এবং আপনার পূর্ব-পুরুষদের ধর্মের বিরোধিতা করছে। আপনার ঐক্যবদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে ফাটল ধরিয়েছে এবং আমাদের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদেরকে মুখ ঠাওরাচ্ছে। আপনি তাকে আমাদের হাতে তুলে দিন, আমরা তাকে খুন করে ফেলি। তার বিনিময়ে আমরা তো এ যুবকটিকে আপনার হাতে তুলে দিচ্ছি। তখন আবু তালিব বললেন, তোমরা আমার নিকট যে প্রস্তাব দিয়েছ, আল্লাহর কসম, তা অত্যন্ত মন্দ প্ৰস্তাব বটে। তোমাদের ছেলেটি তোমরা আমাকে দিবে যেন আমি তাকে খাইয়ে-পরিয়ে হৃষ্টপুষ্ট করে তুলি। আর আমার ছেলেটিকে আমি তোমাদের হাতে তুলে দিব যাতে তোমরা তাকে হত্যা করতে পার? আল্লাহর কসম, তা কখনো হবার নয়।

মাতুঙ্গম ইবন আদী ইবন নাওফিল ইবন আবদ মানাফ ইবন কুসাঈ বলল, হে আবু তালিব! আল্লাহর কসম, আপনার সম্প্রদায়ের লোকেরা আপনার নিকট ইনসাফ ভিত্তিক প্রস্তাব দিয়েছিল এবং যা আপনি অপসন্দ করেন তা থেকে আপনাকে রক্ষা করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমি দেখছি আপনি তার কোনটিই গ্ৰহণ করছেন না। মুতুঙ্গম-এর উদ্দেশ্যে আবু তালিব বললেন, আল্লাহর কসম, তারা আমার প্রতি ইনসাফ করেনি, তুমি বরং আমার জন্যে অপমানজনক এবং ওদের পক্ষে বিজয়মূলক কথাবার্তা বলছো। সুতরাং তোমার যা ইচ্ছা তা কর! অথবা তিনি এ মর্মের অন্য কোন ভাষ্য ব্যবহার করেছেন। এরপর সংকট দানা বেঁধে

وتيم و مخزوم وزهرة منهم – وكانوا لنا مولى اذا بغى النصر – তায়ম, মাখিযুম ও যুহরা গোত্রের কথাও আমি উল্লেখ করছি। সাহায্য প্রার্থনাকালে ওরা আমাদের সাহায্যকারী ছিল।

তবে আল্লাহর কসম, এখন তোমাদের মাঝে আর আমাদের মাঝে শক্রতা ও বৈরিতার অবসান হবে না। যতদিন আমাদের একজন বংশধরও জীবিত থাকে :

ইবন হিশাম বলেন, দু’টি পংক্তিতে কটুক্তি থাকার কারণে আমরা ওই দুটো পংক্তি উল্লেখ

করিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *