সামবেদীয়  নামকরণ *

অনুবাদ–ভূমিষ্ঠ হইবার পর দশরাত্রি গত হইলে, অথবা শত রাত্রি অতীত হইলে কিম্বা বৎসর পূর্ণ হইলে নামকরণের ব্যবস্থা আছে। তথাপি লৌকিকাচার বশতঃ দ্বাদশাহে, একাধিকশত রাত্রে বা জন্মদিনেও নামকরণ করিতে পারে** এই সংস্কারে প্রথমতঃ পিতা স্নান ও বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ সমাপনান্তে পার্থিবনামা অগ্নি স্থাপন পূর্বক বিরূপাক্ষ জপান্তা কুশণ্ডিকা সমাপন ফরিয়া প্রকৃতকৰ্ম্মারম্ভে প্রাদেশপ্রমাণ ঘৃতাক্ত সমিধ তূষ্ণীভাবে অগ্নিতে আহুতি দিয়া মুলের লিখিত মন্ত্রে মহাব্যাহৃতিহোম করিবে। তৎপরে মাতা কুমারকে বিশুদ্ধবস্ত্রে আচ্ছাদন পূৰ্ব্বক পতির দক্ষিণপার্শ্বে থাকিয়া উত্তরশিরা কুমারকে তৎপিতৃহস্তে অৰ্পণ করিবে। তদনন্তর মাত্রা পতির পশ্চাদ্ভাগে উত্তরদিকে গমন করিয়া স্বামীর বামপার্শ্বে উত্তরা কুশোপরি প্রাঙ্মুখী হইয়া উপবেশন করিবে। পরে পিতা “ওঁ প্রজাপয়ে স্বাহা” এই মন্ত্রে একবার আহুতি দিয় কুমারের জন্মতিথি দেবতা-হোম ও জন্মনক্ষত্র-দেবতার উদ্দেশে হোম করিবেন। যদি প্রতিপদে জন্ম হইয়া থাকে, তাহা হইলে “ওঁ প্রতিপদে স্বাহা ওঁ ব্রহ্মণে স্বাহা” এই মন্ত্রে হোম করিতে হয়। দ্বিতীয়াতে জন্ম হইলে “ওঁ দ্বিতীয়ায়ৈ স্বাহা ওঁ ত্বষ্ট্রে স্বাহা” এই মন্ত্রে; তৃতীয়া তিথিতে হইলে “ওঁ তৃতীয়ায়ৈ স্বাহা ওঁ জনার্দ্দনায় স্বাহা”; চতুর্থীতে হইলে “ওঁ চতুর্থৈ স্বাহা ওঁ যমায়। স্বাহা”; পঞ্চমীতে হইলে “ওঁ পঞ্চম্যৈ স্বাহা ওঁ সোমায় স্বাহা”; ষষ্ঠীতে হইলে “ওঁ ষষ্ঠ্যৈ স্বাহা ওঁ কুমারায় স্বাহা”; সপ্তমীতে হইলে “ওঁ সপ্তম্যৈ স্বাহা ওঁ মুনিভ্যঃ স্বাহা”; অষ্টমীতে হইলে “ওঁ অষ্টম্যৈ স্বাহা ওঁ বসুভ্যঃ স্বাহা নবমীতে হইলে “ওঁ নমে স্বাহা ওঁ পিশাচেভ্যঃ স্বাহা”; দশমীতে হইলে “ওঁ দশমৈ স্বাহা ওঁ ধর্মীয় স্বাহা”; একাদশীতে হইলে “ওঁ একাদশ্যৈ স্বাহা ওঁ রুদ্রেভ্যঃ স্বাহা”; দ্বাদশীতে হইলে “ওঁ দ্বাদশ্যৈ স্বাহা ওঁ রবিভ্য স্বাহা; এয়োদশীতে হইলে “ওঁ ত্রয়োদশ্যৈ স্বাহা ওঁ কামায় স্বাহা”; চতুর্দশীতে হইলে “ওঁ চতুর্দ্দশ্যৈ স্বাহা ওঁ যক্ষেভ্যঃ স্বাহা”; পঞ্চদশীতে হইলে “ওঁ পঞ্চদশ্যৈ স্বাহা ওঁ পিতৃভ্যঃ স্বাহা” এবং পৌর্ণমাসীতে জন্ম হইলে “ও পৌৰ্ণমাস্যৈ স্বাহা ওঁ বিশ্বেভ্যো দেবেভ্যঃ স্বাহা” এই মন্ত্রে হোম করিবে। অনন্তয় নক্ষত্রহোম করিতে হয়। কৃত্তিকা নক্ষত্রে জন্ম হইলে “ওঁ কৃত্তিকাভ্যঃ স্বাহা ওঁ অগ্নয়ে স্বাহা” এই মন্ত্রে হোম করিবে। রোহিণীতে জন্ম হইলে “ও রোহিণীভ্যঃ স্বাহা ওঁ প্রজাপহয়ে স্বাহা” এই মন্ত্রে; মৃগশিরাতে হইলে “ও মৃগশিরসে স্বাহা ওঁ সোমায় স্বাহা; আর্দ্রাতে হইলে “ওঁ আর্দ্রায়ৈ স্বাহা ওঁ রুদ্রায় স্বাহা”; পুনৰ্ব্বসুতে হইলে “ওঁ পুনৰ্ব্বসুবে স্বাহা ওঁ অদিতয়ে স্বাহা”; পুষ্যাতে হইলে “ওঁ পুষ্যায়ৈ স্বাহা ওঁ বৃহস্পতমে স্বাহা”; অশ্লেষাতে হইলে “ও অশ্লেষাভ্যঃ স্বাহা ওঁ সর্পেভঃ স্বাহা”; মঘাতে হইলে “ওঁ মঘায়ৈ স্বাহা ওঁ পিতৃভা, স্বাহা”; পূর্বফনীতে হইলে “ও পূৰ্ব্বফনীভ্যাং স্বাহা ওঁ ডগায় স্বাহা”; উত্তরফনীতে হইলে “ওঁ উত্তরফল্গুনীভ্যাং স্বাহা ওঁ অর্য্যম্নে স্বাহা”; হস্তাতে হইলে “ওঁ হস্তায়ৈ স্বাহা ওঁ সবিত্রে স্বাহা”; চিত্রাতে হইলে “ওঁ চিত্রায়ৈ স্বাহা ওঁ ত্বষ্টে স্বাহা”; স্বাতীতে হইলে “ও স্বাত্যৈ স্বাহা ওঁ বায়বে স্বাহা”; বিশাখাতে হইলে “বিশাখাভ্যঃ স্বাহা ওঁ ইন্দ্রাগ্নীভ্যাং স্বাহা”; অনুরাধাতে হইলে “ও অনুরাধাভঃ স্বাহা ওঁ মিত্রায় স্বাহা”; জ্যেষ্ঠাতে হইলে “ওঁ জ্যেষ্ঠায়ৈ স্বাহা ওঁ ইন্দ্রায় স্বাহা”; মুলাতে হইলে “ও মূলায়ৈ স্বাহা ওঁ নৈঋতায় স্বাহা;” পূৰ্বাষাঢ়াতে হইলে “ও পূৰ্বাষাঢ়াভ্যঃ স্বাহা ও অদ্ভ্য স্বাহা”; উত্তরাষাঢ়াতে হইলে “ওঁ উত্তরাষাঢ়াঃ স্বাহা ওঁ বিশ্বেভ্যা দেবেভ্য স্বাহা”; শ্রবণাতে হইলে “ওঁ শ্রবণায়ৈ স্বাহা ওঁ বিষ্ণবে স্বাহা”; ধনিষ্ঠাতে হইলে “ওঁ ধনিষ্ঠাভ্যঃ স্বাহা ওঁ বসুভ্যঃ স্বাহা”; শতভিষায় হইলে “ও শতভিষাভ্যঃ স্বাহা ওঁ বরুণায় স্বাহা”; পূৰ্ব্বভাদ্রপদে হইলে “ওঁ পূৰ্ব্বভাদ্রপদাভ্যাং স্বাহা ওঁ অজৈকপাদায় স্বাহা”; উত্তরভাদ্রপদে হইলে “ওঁ উত্তরভাদ্রপদাভ্যাং স্বাহা ওঁ অহিব্ৰধ্নায় স্বাহা”; রেবতীতে হইলে “ওঁ রেবত্যৈ স্বাহা ওঁ পূষ্ণে স্বাহা”; অশ্বিনীতে হইলে “ওঁ অশ্বিন্যৈ স্বাহা ওঁ অশ্বিনীকুমারাভ্যাং স্বাহা”; এবং ভরণীনক্ষত্রে জন্ম হইলে “ওঁ ভরণ্যৈ স্বাহা ওঁ যমায় স্বাহা” এই মন্ত্রে হোম করিবে। অনন্ত্রীর দুইটি ঘৃত প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করত সেই প্রদীপদ্বয়ে কুমারের দুইটি নাম কল্পনা করিয়া যে প্রদীপটি প্রজ্বলিত হইবে, সেই নাম নির্দেশ করিবে। পরে পিতা কুমারের মুখ, নাসিকা, নেত্র ও শ্রোত্র স্পর্শ পূৰ্ব্বক “প্রজাপতির্‌ঋষিরহর্পতির্দ্দেবতা নামকরণে বিনিয়োগঃ। ওঁ কোহসিকতমোহমোহ মৃতস্যাস্পত্যং মাসং প্রবিশাসৌ। প্রজাপতির্‌ঋষিরাদিত্যে দেবতা নামকরণে বিনিয়োগঃ। ওঁ স ত্বাহ্নে পরিদদাত্বহস্ত্বা রাত্র্যে পরিদদাতু। রাত্ৰিস্ত্বাহোরাত্ৰাভ্যাং পরিদদাত্বহোরাত্রে ত্বা অর্দ্ধমাসেভ্য। পরিদত্তামর্ফমাসাল্কা মাসেত্যঃ পরিদদাতু মাসাস্ত্বররত্তুভ্যঃ পরিদদাতু ঋতবস্ত্বা সম্বৎসরায় পরিদদাতু। সম্বৎসরস্থায় যে জরায়ৈ পরিদদাত্বসৌ। এই মন্ত্রদ্বয় জপ করিবে অর্থাৎ “তুমি কে? তুমি কোন্ জাতীয়? এই যে তুমি, তুমি অবিনাশ্য। তুমি সূৰ্যসম্বন্ধীয় মাসে প্রবেশ কর, হে অমুক! সূৰ্য্য তোমাকে দিন হইতে দিনে অর্পণ করান। দিন রাত্রিতে অর্পণ করান! অহর্নিশি অর্ধমাসে অর্পণ করান! অর্ধমাস পূর্ণমাসে, মাস ঋতুতে, ঋতু সম্বৎসরে এবং সম্বৎসর জরাগ্রস্ত ব্যক্তির পূর্ণায়ুতে প্রবেশ করান। ১-২। এই মন্ত্র পাঠ করিবে। *** কুমারের নাম সম্বোধন করিয়া অর্থাৎ অমুকদেবশৰ্ম্মন বলিয়া প্রয়োগ করিতে হয়। তদনন্তর পিতা কুমারের মাতার বাম কর্ণে “এই শ্ৰীঅমুকদেবশর্মা তোমার পুত্র” এই কথা বলিয়া কুমারের দক্ষিণ কর্ণে “তুমি অমুকদেবশর্মা” এই কথা কহিবেন। পরে কুমারকে জননীক্রোড়ে দিয়া পূৰ্ব্ববৎ মহাব্যাহৃতিহোম সাধন পূৰ্ব্বক প্রাদেশপ্রমাণ ঘৃতাক্ত সমিধ তূষ্ণীভাবে অগ্নিতে আহুতি প্রদান করত সৰ্ব্বকৰ্ম্মসাধারণ শাট্যায়নহোমাদি বাসদেব্যগানান্ত উদীচ্য কর্ম্ম সমাপন করিবে। পরিশেষে কৰ্ম্মকারষিতৃ ব্রাহ্মণকে দক্ষিণ দিতে হয়।

ইতি সমবেদীয় নামকরণ সমাপ্ত।

———-

* শৈশবসংস্কার কয়টির মধ্যে দ্বিতীয় সংস্কারকেই নামকরণ কহে। পিতা কর্তৃক জাত সন্তানের যে নাম রাখা হয়, তাহারই নাম নামকরণ। এই সংস্কার দ্বারা পিতা মাতার মনে সন্তানপালন সম্বন্ধে অবশ্যই শুভফল ফলে সংশয় নাই।

** সচরাচর এইরূপ দৃষ্ট হইয়া থাকে যে, আঁতুড়ে যে সকল শিশুর মৃত্যু হয়, তাহার অধিকাংশই দশরাত্রির মধ্যে মারা গিয়া থাকে। এই কারণেই দশ রাত্রির পর নামকরণের ব্যবস্থা হইয়াছে। নামকরণ হইলে সেই সম্বন্ধে চিত্তের একরূপ দার্ঢ্য জন্মে। নবজাত শিশু অকালে মৃত্যুমুখে পড়িলে তৎসম্বন্ধে চিন্তা ও শোক করিবার পক্ষে ঐ নামটাই একরূপ অবলম্বনস্বরূপ হয়। সুতরাং প্রথম দশদিবসের মধ্যে নাম রাখা কর্তব্য নহে। অধুনা প্রায়ই অন্নপ্রাশনের সময় নামকরণ করিতে দেখা যায়। ইহাও, শাস্ত্রীয় বা যুক্তিবিরুদ্ধ নহে। কারণ, শৈশবমৃত্যু আমাদিগের দেশে আজিকালি অতীব প্রবল। এ অবস্থায় দশ রাত্রিতে বা শত রাত্রি গতে নামকরণ না করিয়া অন্নপ্রাশনের সময় করাই যুক্তিযুক্ত।

*** এই মন্ত্রদ্বয়ের নিগূঢ় ভাব হৃদয়ঙ্গম করিলে স্পষ্টই বুঝিতে পারা যাইবে যে, ইহা দ্বারা জীবাত্মার অবিনশ্বরত্ব প্রখ্যাপিত হইয়া সন্তানের রক্ষণসম্বন্ধে যে কিরূপ সাবধানতা সহকারে দিন দিন গণনা করিয়া, যাপন করিতে হয়, তাহা বিশদরূপে প্রকাশিত হইল। ইহাতে জনক-জননীর হৃদয়ে সন্তানরক্ষণসম্বন্ধে নিশ্চয়ই শুভফল ঘটিবে সংশয় নাই। পরন্তু ইহা জিজ্ঞাস্য হইতে পারে যে, ইহা দ্বারা সন্তানের নিজের পক্ষে কি হইল? তাহার উত্তর এই যে, উহার জাতিভ্রংশকর দোষের অপনয়ন হইল অর্থাৎ যে দোষ বশতঃ জাতি বােধগম্য না হয়, সেই দোষ বিদুরিত হইল। কেননা, শাস্ত্রে ভিন্ন ভিন্ন জাতির ভিন্ন ভিন্নরূপ নামকরণের ব্যবস্থা রহিয়াছে। ব্রাহ্মণেরা নামের পরে দেবশর্মা, ক্ষত্রিয়ের ত্রাতৃবৰ্ম্মা, বৈশ্যেরা ভুতি গুপ্ত বা দাস এবং শূদ্রেরা দাস শব্দ প্রয়োগ করিবে।

Share This